কবিতা

স্পর্দ্ধাকে খোলা চিঠি

পার্থ দাস

প্রিয় স্পর্দ্ধা ,
তোর নাম নিতে পারবো না ,
আইন হাত বেঁধে রেখেছে !
সভ্য সমাজে বাঁচার কত নিয়ম ,
তবু অসভ্যরা নিশ্চিত আশ্রয়ে থাকে বেমালুম !
কখনো আইনে নাগরিকের হাত বাঁধা ,
কখনো আইনের নিজের হাতই বাঁধা ,
নতুবা অন্যতর হতে পারতো সভ্যতা ….
তুই বেঁচে থাকতিস ,
ভালোবাসা দিয়ে রোগীদের সেবা করতিস ,
করতিস তো ?

আমি তো বিশ্বাস করি না পরপারে ,
তাই জানতেও চাই না ,
কেমন আছিস ওপারে ….
যদি আমি ভুল হই ,
যদি তোর পরপারে এপারের ডাক পৌঁছয় ,
তবে চিঠিতে জানাই ,
তোর বাপ-মা শুকিয়ে যাওয়া পাঁজর নিয়ে লড়ছে ,
অভিঘাত মিলিয়ে যাবার আগেই বুঝতে পারছেন ,
কিভাবে ঠকিয়েছে প্রশাসন প্রথম খবর দেয়া থেকে …
আর একজন অনর্গল মিথ্যা বলে ,
সব ঘেঁটে দিতে চেয়েছিল …..
কি দায় তার ……?
তুই বেঁচে থাকলে ঠিক ধরে ফেলতিস ,
যেমন করে হয়তো ধরে ফেলেছিলি সব কারসাজি ,
আর তাই তোকে এই চিঠি ….

জানিস তো, তুই চলে যাবার পর ,
অনেকগুলি অঘটন ঘটে গেছে
বিনেশ শেষ পর্যন্ত কোনো পদক পায় নি …
হয়তো তুই শেষ শুন্যে মুঠি ছুঁড়েছিলি ,
বিনেশ সেমিতে যখন কুপোকাত করে কিউবাকে ….
তবু শেষ রক্ষা হল না ,
বলছিলাম না , কখনও আইনের হাতও বাঁধা থাকে ,
অনাসৃষ্টি হয় ,
আইন কি জানতো না বিনেশ আদতেই চ্যাম্পিয়ন …
আসলে বিনেশকে আমরা হারিয়ে দিয়েছি রে ….
ওরা কয়েকজন যখন তারস্বরে বিচার চাইছিলো ,
আমরা শীতঘুমে ছিলাম …
তখনই যদি আকাশ-পাতাল জুড়ে ডাক উঠতো ,
বিনেশ ওর ওজনের সোনার পদকটা পেত …
আমরা বিনেশকেও হারতে দিলেম ,
তোকেও হারালাম ……

সময়টা তো ঠিক জানি না ,
তুইও বলে যাবার সময় পাস নি ….
ময়না , ফরেন্সিক সব খতিয়ে দেখছে ….
যাঁরা সেসব বোঝেন , বলবেন ….
আজকে একটা রিপোর্ট দেখলাম কাগজে ,
তোর দেহে অনেক কাটা দাগ …..

নীরজকে নিয়ে তুই নিশ্চই ভেবে রেখেছিলি ,
সোনা তো পাবেই …..
জানি না , শেষ পর্যন্ত দেখেছিস কি না ,
নীরজ সেদিন , ৬ টা ভুল থ্রো করেছিল ….
বেমানান তাই না ?
ওর মনে কি কোথাও খোঁচা দিচ্ছিল ,
এ পৃথিবীর এক প্রান্তে , ওরই দেশে ,
একটা ভয়ংকর অন্যায় হচ্ছে ?
তাই কি , এত প্র্যাক্টিসের পরেও ,
মনসংযোগে ব্যাঘাত ঘটছিল ?
কাকতালীয়ই হবে , আমিও ওসবে বিশ্বাস করি না …
জানি , তোর বিজ্ঞানমনস্ক মনও করে না ….

আরও একটা অঘটনই বলতে হবে ….
পরশী দেশের ছোকরা নাদিম ,
যাঁর নাকি একটা ভালো বল্লম ছিল না ,
গ্রামের লোকে কৌটো নাড়িয়ে ,
বল্লম কিনে দিয়েছে ,
নামমাত্র প্র্যাক্টিসের সুযোগ করে দিয়েছে ,
কি ছোঁড়াটাই ছুঁড়লো ছোরাটা ….
মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি বল্লমের দিয়ে গেঁথে দিচ্ছে ,
যত দারিদ্র্য , অপমান , অসাম্য ….
ওর দেশের প্রতিটা অন্যায় যেন ,
ফালাফালা হয়ে যাচ্ছিল !
তুই দেখেছিস ?
না কি , সে সময়ে তোর দেহের ওপরে
চড়ে বসেছিল হায়্নার দল ….
ফালাফালা করে দিচ্ছিল তোর স্বপ্ন ,
শেষবারের মতো …..

তুই যেদিন চলে গেলি ,
সমস্ত মিডিয়া চ্যানেলে চ্যানেলে ,
তোকে নিয়ে সমবাদ , স্ক্রল ,
ওরাও নাম বলতে পারে নি ….
কেউ অভয়া , কেউ তিলোত্তমা , কেউ নির্ভয়া ,
আইন আমাদের হাত বেঁধে দিয়েছে কিনা ….

তারপর কি হল , জানিস ?
পরপারে এ পারের ডাক পৌঁছয় ?
সমগ্র কোলকাতা , রাজ্য , দেশ , বিদেশ …
আকাশ বাতাস মুখরিত হল ,
আমরা বিচার চাই …
চাই তো চাই …..
ডাক্তার , মাষ্টার , উকীল , গাইয়ে , বাজিয়ে ,
বেকার , কৃপন , ধনী …..
সবাই বেরিয়ে পড়েছে …..
এখনও কেউ কেউ রাস্তায় ….
বৃষ্টিতে ভিজছে , অহেতুক পুলিসের তাড়া খাচ্ছে ,
লাঠি খাচ্ছে , থানায় নেমন্তন্ন পাচ্ছে ,
তবু কেউ না কেউ রাস্তায় …..

গতকাল তো অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটলো ,
আইনশৃঙ্খলার অবনতির দোহাই দিয়ে ,
চিংড়ি-ইলিশের ডার্বি দিল থামিয়ে ,
কাতারে কাতারে মহামোহন বেঙ্গলীরা ,
দখল নিল যুবভীরতীর রাজপথের …
কাঁদানে গ্যাস , লাঠি , বৃষ্টি ,
সে এক উন্মাদনাই বটে ,
মোহনবাগানীর ঘাড়ে ইষ্টবেঙ্গলের সমর্থক উঠে ,
বিচার চাই , বিচার চাই , বিচার চাই ….
হাউ হাউ করে কাঁদলো কত জন ….

স্বাধীনতার পরে বিলক্ষন রাজনৈতিক আন্দোলন
দেখেছে এদেশ , রাজ্য ….
ব্রিগেডের মাথা গুনেছে দ্রোন ,
কিন্তু এত স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ?
সবাই ধরেই নিয়েছিল ,
ইন্টারনেটে মাথা খাওয়া যৌবন ,
কেবল বুঝি ওটিটি , ইন্সটা আর ফেবু দেখে ,
বাকি সবকিছু গৌন ……

একটু দেরী হয়ে গেল , মা ….
আমরা পথে নামতে একটু দেরী করে ফেললাম রে ….
যখন থেকে শুনেছি ,
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে ….
টাল সামলে দেখলাম ,
চোখ ভিজে যাচ্ছে ,
আর এক অনির্বচনীয় রাগে ,
থরথর করে কাঁপছে শরীর …..
যত মিথ্যা শুনি অনর্গল ,
থরথর করে কাঁপে মনের ভেতরে …..

আর আশঙ্কা জাগে ,
প্রমান লোপাট হলে …
যখন তদন্ত , প্রশাসক , দুষ্টু
সব নিশ্চ্ছিদ্র শিবিরে ফিসফাস করে ….

আইনের হাতও তো বাঁধা ….

জানি তুই বিচারের পথ চেয়ে আছিস ,
নিজের জন্য নয় ,
যাঁরা সময়ধারা বেয়ে পথে বেরোবে ,
কর্মস্থলে যাবে , রাত জেগে সেবা দেবে ….

আমাদের বিচার চাই । এক্ষুনি !

5 thoughts on “কবিতা

  1. কোলাজ সুন্দর। সোজা বললেন ভালো লাগলো। সিদ্ধান্ত ঠিক, আমরা সবাই বিচার চাই।
    কিন্তু বিচার পেতে গেলে, তেমন চাইতে হবে। শ্রেণীগত বিভিন্নতার শিকার আমরা, ঐক্যের অভাব লক্ষ্যণীয়। তাই বিরোধ দানা বাঁধে না।
    শেষ পর্যন্ত আমরা সাধারণ এক জোরালো চাওয়া নিয়ে দাবি করতে পারলে আমাদের লক্ষ্যপূর্ণ হবে।
    সব অপরাধের একদিন শাস্তি হবে।

    1. আপনার কথাগুলো একদম ঠিক । নানা রাজনৈতিক রংয়ের উপাসনা ছেড়ে আমরা যদি একটা ভিন্ন বর্ণের প্লাটফর্ম তৈরী করতে পারি তবেই অভীষ্টে পৌঁছনো সম্ভব ।

    1. অসংখ্য ধন্যবাদ । ভালো লেখার চাইতেও গুরুত্বপূর্ন একটা ভালো বিচার হোক ।

Leave a Reply to অসীম Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *