ভ্রমণ

হিলস্টেশনে ভোজনবিলাস

অরুণাভ দাস

ভ্রমণের সঙ্গে ভোজনের নিবিড় সম্পর্ক অনুভব করেছিলাম সেই স্কুল-বেলায়। দার্জিলিং রাজভবনের সামনে মেঘ-কুয়াশায় ঝাপসা পথের ধারে ঝুপসি মহীরূহের নীচে এক পাহাড়ি আন্টি আর তার মেয়ে এলুমিনিয়ামের পাত্রে ভরা গরম গরম মোমো বিক্রি করছিল। আগে পুলিপিঠে গুড়ে ডুবিয়ে হাজারবার খেয়েছি, কিন্তু মোমো সেই প্রথম। কনকনে শীতের ভেতরে গরম মোমোর প্রাণজুড়নো স্বাদ আজও মুখে লেগে রয়েছে, সেই মেঘ-কুয়াশায় মাখা অভিনব দৃশ্যটির মতো। তারপর থেকে হাফ সেঞ্চুরি-পার জীবনে পাহাড়ে ঘোরার কত সেঞ্চুরি হয়ে গেল, ভ্রমণের সঙ্গে ভোজনের হাজারদুয়ারি অভিজ্ঞতায় ভরে উঠল অর্জন। আজ এই অনুভবে থিতু হয়েছি যে, পাহাড়ে বেড়ানো মানে শুধু প্রকৃতি দেখা নয়, মানুষ ও তার সংস্কৃতি দেখাও। খাদ্য-সংস্কৃতি বাদ দিলে যে কোনো ভ্রমণ অসম্পূর্ণ। বেড়াতে গিয়ে ঘরের মতো মাছ-ভাত কখনো আশা করিনি। তাতে লাভের পাল্লাই ক্রমশ ভারি হয়েছে।

জুন-জুলাইতে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল কুমায়ুনে মরশুমি ফলের মেলা। আপেল, খুবানি, এপ্রিকট, আলুবোখরা ও আরও কত কী। হিমাচল প্রদেশেও তাই। মুসৌরির কুলরি বাজারে পথপাশের ওইসব বিক্রেতার পসরা দেখে কত স্মৃতি ভেসে আসে। গরমকালে মুসৌরির ট্রাফিক জ্যাম বিখ্যাত। শহরে ঢোকার ১০ কিমি আগে থেকে গাড়ির লাইন সহজে নড়ে না। দলে দলে পাহাড়ি ছেলেমেয়ে সেই সুযোগে গাড়ির জানালায় বাটি ভরে মরশুমি ফল বিক্রি করতে আসে। মুখে ফেলে বিরক্তিকর দাঁড়িয়ে থাকা এক মুহূর্তে আনন্দময় হয়ে ওঠে। একের অনুষঙ্গে একশ পূর্ব-অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে যায়। একটা গল্প বলি।

     সেবার কথা ছিল রোটাং পাস হয়ে স্পিতির সদর কাজা যাওয়ার। কিন্তু হঠাত প্রবল বৃষ্টিতে প্রচুর বরফ পড়ে পাস বন্ধ হয়ে গেল। হিমাচল ট্যুরিজমের মানালি অফিসের মাথা মিঃ ঠাকুর বললেন, সব বুকিং ক্যানসেল করে মানালির লগ হাটস-এ থেকে যান। টিন এজার ছেলে আর ভাগনা আমার সফরসঙ্গী, দুজনেই বেঁকে বসল। মানালির থৈ থৈ ভিড়ে এক বেলাও থাকবে না। মিঃ ঠাকুর উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন। বুকিং করে দিলেন চিন্ডি নামে এক অচিন ঠিকানায় হিমাচল ট্যুরিজমের হোটেল মমলেশ্বর। তখনই গাড়ি চড়ে বেরিয়ে পড়লাম। অট টানেল পার হওয়ার পর পুরো অচেনা রাস্তা, চায়েলচক, রোহান্ডা হয়ে ইতিহাস কিম্বদন্তীর গ্রাম পাঙ্গনা। ছবির মতো মন্দির স্লেট পাথরের ছাদযুক্ত। গ্রাম ছাড়াতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। চিন্ডি আরো খানিকটা দূর। কিছু না পেটে দিলে আর শরীর চলছে না। কিন্তু জনমানবহীন পাহাড়ে খাব কোথায়। এমন সময় গাড়ির চালক বোলু খুঁজে পেল খুবানির বাগান। অগণিত পাকা ফলে গাছগুলি ভরে আছে। সময় নষ্ট না করে সবাই মিলে পেড়ে মুখে চালান করতে লাগলাম। গাছ ঝাড়া দিয়ে আরো যা পেলাম তাতে পেট ভরার পর গাড়ির বুট অনেকটা ভরে উঠল। ছেলে ও ভাগনে মহা খুশি। ওদের বলতে লজ্জা হল, বছর কয়েক আগে গাড়োয়াল হিমালয়ের কানাতালে (মুসৌরি-টেহরি রোড) এক স্ট্রবেরির বাগানে এভাবেই কাউকে কিছু না বলে গাছ থেকে ফল চুরি করে খাচ্ছিলাম। কপাল এমন, বাগানের মালিক দেখে ফেললেন। আমার অপরাধবোধ শতগুণে বাড়িয়ে দিয়ে এক ঝুড়ি স্ট্রবেরি উপহার দিয়ে গেলেন, যার বাজারমূল্য কলকাতায় হাজার টাকার কাছাকাছি হবে।

দিল্লি থেকে বেলা এগারোটায় কপিল কুমারের সুইফট ডিজায়ারে রওনা হয়েছিলাম। মীরাট ছাড়িয়ে একবারই ধাবায় খেতে দাঁড়ানো। দুপুরের খাওয়া৷ একতাল মাখন মাখানো রুটির সঙ্গে মাশরুম মশালা ও সয়া চাপ। এগুলো উত্তরে এলেই খাই। শেষ পর্বে দুই স্কুপ আইসক্রিম। ধাবা থেকে বেরিয়ে সাহারানপুর পর্যন্ত একের পর এক মাখন-মসৃণ টোল রোড। প্রসঙ্গত বলি, এই রাস্তায় যাতায়াত নিয়ে ২৪০০ টাকা টোল দিতে হয়েছে। তা কিয়ে দুঃখ নেই। জ্যামে আটকানো শুরু দেরাদুনের আগে চিল্লা ফরেস্ট (এখন রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক) থেকে, যেখানে একটা মাত্র মান্ধাতার আমলের ওয়ানওয়ে ব্রিজ খুবই বেগ দেয়। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে দিল মুসৌরির হোটেল পৌঁছনোর শেষ ১ কিমি আগের রাস্তা। পাক্কা দেড় ঘন্টা কেটে গেল এটুকু পার হতে। ভাগ্যিস না ঠাণ্ডা-না গরম মনোরম আবহাওয়া, বন্ধ গাড়িতে বসে বেগ পেতে হল না। হোটেলে ঢুকে ফ্রেস হয়ে ঘন্টাখানেক পর যখন মল রোডের উদ্দেশ্যে বেরলাম তখন ঘড়িতে পৌনে আটটা। সবে সন্ধে হচ্ছে। কিন্তু রাস্তায় সেই জ্য্যাম কাটেনি, বরং আরো ঘোরাল হয়ে উঠেছে। পা-দুটির ওপর ভরসা করে শর্টকার্ট ও সিড়িপথে অবশেষে যখন মল রোড পৌঁছনো গেল তখন আলোয় আলোয় ঝলমল করছে লাইব্রেরি চক ও বাজার। দুপুরের পর আর খাওয়া হয়নি। পাহাড়ে হাঁটাহাঁটি করে খিদে আরো চনচনে হয়ে উঠেছে। কোথাও না দাঁড়িয়ে রিকশয় কুলরি। দেড় কিমি যেতে জনপ্রতি ৫০ টাকা। তারপর কিছুটা হেঁটে মুসৌরির সবচেয়ে বিখ্যাত খাওয়ার জায়গা কালসঙ্গ পৌঁছে দেখি ওয়েটিং-এ থাকা ক্ষুধার্থ পাবলিকের লাইন সিড়ি উজিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। কিন্তু দাঁড়ালে হবে না। কাল না হয় বেলাবেলি কালসঙ্গে খাব। আজ হঠাত আসা টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উল্টোদিকে মহারাজা মাল্টি ক্যুইজিন রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকে পড়লাম। ঠিক হল, মাল্টি ক্যুইজিন যখন, ফিউশন খাব। ইন্ডিয়ান স্টার্টার, তারপর চাইনিজ ও কন্টিনেন্টাল নন-ভেজ। স্টার্টার হিসাবে নেওয়া হল মাটন শিক কাবাব। মুখে তোলার আগেই ঘ্রাণে অর্ধ ভোজন ও দর্শনে কোয়ার্টার ভোজন সমাপ্ত। মহারাজায় মেন কোর্সে বাকি যা যা খেয়েছিলাম, অন্য একদিন বলা যাবে। শুধু এটুকু বলি, বেশি রাতের দিকে যদি খিদে পায় তবে খাব বলে লাইব্রেরি চকের কুমার্স বেকারি থেকে রেড ভেলভেট পেস্ট্রি কিনে হোটেলে ফিরলাম। রাত প্রায় এগারোটা। মুসৌরির পথঘাট তখনও মুসাফিরের ভিড়ে জমজমাট। নীচের রাস্তা যথারীতি জ্যামজমাট। হোক না পিক সিজন, আমাদের দার্জিলিং গ্যাংটক এত রাত অব্দি এভাবে জাগে না।

কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে প্রথম দার্জিলিং ভ্রমণ, তখনকার হবু ডাক্তার এক দাদার সঙ্গে। দলে আরো কয়েকজন ছিল। মেঘ পাহাড়ের দেশে সে এক অনাবিল আনন্দের অভিজ্ঞতা। কে জানত, দার্জিলিংয়ে জানালা খুলে রাখলে মেঘপুঞ্জ ঘরে ঢুকে যায়? কে-বা ভাবতে পারে, সামনের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য এক লহমায় ঘন কুয়াশার ইরেজারে মুছে সাফ হয়ে যেতে পারে। আবার কয়েক মুহূর্ত পরে ঝকঝকে রোদ্দুর। দিগন্তে ঝলমল করে উঠল কাঞ্চনজঙ্ঘা। ওই বয়সে প্রকৃতির এ সব ম্যাজিক কল্পনার অতীত, মনে হয়েছিল, স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তা এখানেই। এমনই এক মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলার সকালে জলাপাহাড়কে বেষ্টন করা রাস্তাটায় হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। রাজভবনের কাছে দেখি, এক বিশ্রামের ছাউনির তলায় মধ্যবয়সী নেপালি মা ও তার কিশোরী মেয়ে গোল গোল এলুমিনিয়ামের পাত্র সাজিয়ে বসে আছে। সেই পাত্রের ভেতরে জীবনে প্রথম মোমো দর্শন। অনেকটা হেঁটে তখন চনমনে খিদে। কিন্তু পুলিপিঠে খেতে মন চায় না। সঙ্গীরা মহা উৎসাহে একেক প্লেট নিয়ে ফেলল দেখে দ্বিধাভরে হাত বাড়াই। মুয়াশামাখা হালকা গরম মোমোতে কামড় বসাতেই চমক, আরে, এ তো পুলিপিঠে নয়। ভেতরে নারকেলের চিহ্ন নেই। তার জায়গায় বাঁধাকপি, স্কোয়াস ও অল্প পিঁয়াজের অপূর্ব নোনতা-ঝাল পুর ভরা। খোলসটা শক্ত নয় মোটেও। সেই থেকে পুলিপিঠের নেপালি সংস্করণের সঙ্গে নিবিড় সখ্য আমার। কিন্তু এতই মূর্খ ছিলাম, অনেকদিন অবধি জানতাম না উপাদানভেদে মোমোর আরো নানা রকমের সংস্করণ হয়।

     প্রথম চিকেন মোমো ও তার জাতভাই চিকেন ডাম্পলিং খাই কলকাতায়। তখন ভ্রমণ পত্রিকার সাব এডিটর। এক সহকর্মী দিদি কী যেন উপলক্ষে খাইয়েছিল। ছুটির পর সকলে মিলে হইহই করে গেলাম। এক্সাইড মোড় আর এলগিন রোডের মধ্যবর্তী গলি, বিখ্যাত আসলি লক্ষ্মীবাবু কা সোনা-চাঁদি কা দোকানের সারি অতিক্রম করে। প্রায়ান্ধকার পরিবেশে কলকাতার ভেতরে আর এক নেপাল বা তিব্বত যেন। কয়েকটি নেপালি পরিবার দোকানগুলি চালায়। গায়ে গায়ে বসে অনেক লোক চিকেন পর্ক ভেজ মোমো, ডাম্পলিং, থুকপা খেয়ে চলেছে। আমরাও খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেলাম। যেখানে খেয়েছিলাম সেদিন, হামরো মোমো নামে সে দোকানটা এখন সম্ভবত নেই। খান তিনেক মোমোর দোকান এখনো আছে গলিতে, সবই বাঙালি পরিচালিত। মেনুতেও প্রচুর সংযোজন এসেছে। চাউমিন চিলি চিকেনের মতো পদের কদর বেশি। তাও ওদের স্টিমড মোমোতে আজো পাহাড়ের রূপ রস গন্ধ লেগে আছে।

     পাহাড়ে আর একটা অপূর্ব স্বাদের মোমোর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তা হল চিজ মোমো। দার্জিলিংয়ে প্রথম মোমো দর্শনে প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল, তেমনই চিজ মোমোর প্রথম স্বাদ গ্রহণ একটি ঐতিহাসিক পর্বের সঙ্গে যুক্ত। তখন ভ্রমণ পত্রিকার সাব-এডিটর। ১৯৯২ সাল নাগাদ একটা বিজ্ঞাপন এল দপ্তরে, গাড়ি চড়ে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার নিকটতম বিন্দুতে তৈরি হয়েছে অতিথিনিবাস, সিকিম ট্যুরিস্ট সেন্টার। জায়গার নাম পেলিং। পশ্চিম সিকিমের অচিন পাহাড়ে। বিজ্ঞাপনদাতা নিমন্ত্রণ করলেন পত্রিকার প্রতিনিধিদের। তিনজন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পৌঁছে গেলাম সেই অচিন পাহাড়ে। আজকের পেলিংয়ের সঙ্গে সেদিনের কোনো তুলনাই চলে না। আপার লোয়ার মিডল পেলিং বলে কিছু ছিল না। জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ি গ্রাম। মূল রাস্তার ধারে তিনটি অতিথিনিবাস। প্রথমেই প্রধান হোটেল, তারপর আমাদের আস্তানা সিকিম ট্যুরিস্ট সেন্টার ও তার সামান্য দূরে হোটেল গারুদা। ব্যস, বাকি পেলিং প্রকৃতির লীলানিকেতন। শেষ প্রান্তে হেলিপ্যাড। তার একধারে বড়ো একটা চোর্তেন। সিকিম ট্যুরিস্ট সেন্টারের বাড়িটা দোতলা। একতলার একাংশে পোস্ট অফিস। বাকিটা অতিথিনিবাস। ছাদে উঠলে দিনে-রাতে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। চাঁদের আলোয় তার রূপ দেখে রোমাঞ্চিত। এক সন্ধ্যায় পাশের দুটি হোটেল দেখতে গেলাম। প্রধান হোটেল খুবই সাদামাটা। শ্রী ও শ্রীমতী প্রধান চালান। আমাদের মাখন চা পান করালেন। গারুদা হোটেল তুলনায় সাজানো গোছানো। ওরা খাওয়ালেন চিজ মোমো। সেই প্রথম। আমি চিজ-এর ভক্ত। কী যে ভালো লাগল খেয়ে, বলে বোঝানো যাবে না। আমার আগ্রহ দেখে ওরা আরো কয়েকটি প্যাকেটে দিয়ে দিলেন। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে তাই দিয়ে ডিনার হয়ে গেল। এর পরে স্বর্গীয় স্বাদের চিজ মোমো খেয়েছি কার্শিয়াং-এ ডাউহিল রোডে দ্য নেস্ট-এর মালকিন অলকা মাসিমার হাতে বানানো। উনি যা বানাতেন তাই-ই অপূর্ব। অনেকে বলেন, কার্শিয়াং ট্যুরিস্ট লজের চিকেন মোমো দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে সেরা। আমার ব্যক্তিগত মত, বিশ বছর আগের মান আর নেই। কিন্তু এখনো দারুণ চাহিদা। রসিক পর্যটক দার্জিলিং যাওয়ার পথে গাড়ি থামিয়ে ঠিকই খেয়ে যান। এখানে সবই স্টিমড মোমো। পাহাড়ে ফ্রায়েড বা প্যান ফ্রায়েড মোমোর যতটুকু চল হয়েছে, সবই বহিরাগত পর্যটকদের বিচিত্র খাদ্যরুচির কথা ভেবে। অনেকে বলেন সেরা জাতের যথার্থ চিব্বতি চরিত্রের মোমো যদি খেতে হয়, যেতেই হবে দার্জিলিংয়ের কুয়েঙ্গা রেস্তোরাঁতে।

কিন্নর থেকে ফেরার পথে এশিয়ার সবচেয়ে বড়োলোক গ্রামগুলি দেখে এলাম। ফল পাকার মরশুমের শুরুতে হিমাচল প্রদেশে সে এক আশ্চর্য ভ্রমণ। সেই একটি দিনের রসময় স্মৃতি সহজে ভোলা যাবে না। সবুজ পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তার ওপরে বিছিয়ে রয়েছে প্রচুর রসাল ফল। এগুলিকে স্থানীয় লোক বলেন শক্করপাড়ে, ইংরেজিতে যার নামটি বরং সকলের চেনা, আপ্রিকট। লাল ও গোলাপিতে মেশা সেরা জাতের গোল্ডেন আপেলের অর্চাড এস্টেট শীতলবনে যাবার পথে স্বয়ং প্রকৃতির দ্বারা এমন রসাল ও রঙিন অভিবাদন যে পাব, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আসলে এদিকে আসার কথা ছিল না। সফরসঙ্গী তপন দা গ্রামে একটি হোমস্টে খুলতে চান। সেই ব্যাপারে কথা বলার জন্য সোজা রাস্তা ছেড়ে শীতলবনে ঢোকা। জীবনের বহু অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, চেনা রাস্তার বাইরে গেলে আনন্দের ভাণ্ড পরিপুর্ণ হয়ে ওঠে। ভাগ্যই বলতে হবে, আজ তেমন ব্যতিক্রমী একটি দিন। রাস্তার দুধারে পাহাড়ের বুক পিঠ মাথা জুড়ে শুধুই ফলের বাগান, মাইলের পর মাইল। যত দূর চোখ যায়। ফলভারে নুয়ে পড়েছে কাতারে কাতারে গাছ। পাতা দেখা যাচ্ছে না বললে চলে। জুন মাসের মাঝ বরাবর যদি এই অবস্থা হয়, না জানি জুলাই আগস্টে ফল পাকার ভরা মরশুমে কত রঙের বান ডাকবে। রসময় হয়ে উঠবে আকাশ বাতাস। আপেল, নাসপাতি, আপ্রিকট, খুবানি ও স্ট্রবেরিরি মেলায় এখনই শরীর ও মন বেসামাল হবার অবস্থা। সত্যি আজ আমাদের এক অন্য ভ্রমণ।

      শতদ্রু নদীর তীরে রামপুর শহর পাহাড়ের কোলে হলেও খুব ঘিঞ্জি আর উচ্চতা কম বলে গরম জায়গা। সকলে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বুশাহার রাজ্যের তৃতীয় রাজধানী পদম প্যালেসে কাঠ ও পাথরে গড়া শিল্পকর্মের অনিন্দ্যসুন্দর যুগলবন্দী এক ঝলকে দেখে নিয়ে বলতে গেলে পালিয়ে চলেছি হিমাচল প্রদেশের ফলবাগিচা শীতলবনে। শীতলবন আসলে একটি বিরাট অর্চাড এস্টেট, এশিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষদের যমজ গ্রাম কোটগড় থানেদারের এক প্রান্তে। রামপুরের সীমানা ছাড়িয়ে ৪ কিমি দূরে নোগলি নামে এক জায়গায় জাতীয় সড়ক ছেড়ে ও শতদ্রু নদীর হাত ছেড়ে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে শাঁখা রাস্তা ধরলাম। যেন কোনও ভোজবাজিতে চারদিক আশ্চর্য রকমের শুনশান হয়ে এল। পাহাড়ের প্রান্তসীমা ধরে পাক খেতে খেতে ক্রমশ আকাশপানে উঠে চলেছি। রামপুর ও নোগলির গা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া যৌবনদীপ্ত স্ফীত শতদ্রু ক্রমশ ফিতে, ফিতে থেকে সাপ, সাপ থেকে কুমারীর সিঁথি হতে হতে অতল সবুজের রাজ্যে হারিয়ে গেল। জানালা দিয়ে চারদিকে দৃষ্টি যত দূর যায় সবুজ রঙের হাজারটা শেড। এই রাস্তায় গ্রাম বা বসতি বেশ কম। অনেক দূর অন্তর সামান্য কটি ঘরবাড়ি। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। নীল আকাশের নীচে পরমা প্রকৃতির অপার শান্তিময় খেলাঘর। সকালের সোনালি আলোয় প্রকৃতির সেই রূপের স্বর্গীয় সুষমা সকলকে নীরব করে দিয়েছে। শুধু চোখে দেখা আর মন দিয়ে অনুভব করা। রাস্তা যেন আর ফুরাতে চায় না। কিন্তু মসৃণ এবং গন্তব্য খুব বেশি দূর নয়। সময় লাগার মজা অন্যখানে। কোটগড় থানেদার গ্রামের যত কাছে যাই, ততই গাড়ি হোঁচট খেতে খেতে চলে। যত চলে তার চেয়ে বেশি থামে। আসলে রাস্তার ধারে ফলবাগান শুরু হওয়া ইস্তক দেখা যাচ্ছে, পাকা ফল পড়ে বিছিয়ে রয়েছে নীচেটা। এমন ভগবানদত্ত উপহার রাস্তায় ছেড়ে আসার মতো বোকা আমরা কেউ নই। কয়েক মিটার যাই আর গাড়ি থামাই। সকলে দুদ্দাড় করে রাস্তায় নেমে পাশ থেকে ফল কুড়োই। দুহাত ভরে উঠলে আবার এগিয়ে চলি। গাড়ির সিটের ওপরে হাত খালি করে দিয়ে নতুন উদ্যমে আবার নেমে পড়ি। কে জানে, এত ফল কত দিনে খাওয়া যাবে। আসলে খাওয়ার কথা তখন ভাবার অবকাশ নেই, কুড়িয়ে তোলাটাই তখন নেশার মতো পেয়ে বসেছে। এতদূর পর্যন্ত আমার কথাগুলি বিশ্বাস না হলে পরের ছুটিতেই ঘুরে আসুন। হিমাচল প্রদেশে পরিচিতির জোরালো আলো পাওয়া হিলস্টেশনগুলি যখন লোকের ভিড়ে হাঁসফাঁস, তখন কোটগড় থানেদার গ্রামের বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা শীতলবন ভুবনজোড়া ফলের সম্ভার নিয়ে রসিক বন্ধুর পথ চেয়ে বসে থাকে।

সিমলায় শীত সারা বছর। সমতলের অতিথিদের ঘুম ভাঙে একটু বেলা করে। উঠতেই খিদে পায়। চা-বিস্কিটের পর হোটেলের সেট ব্রেকফাস্টে মন ওঠে না। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি। বাইরে প্রাণপ্রাচুর্যে ঝলমল করছে হিমাচলের রাজধানী। যত বেলা বাড়বে, ততই বাড়বে ব্যস্ততা। জমজমাট বাজারের ভেতর দিয়ে ওপরদিকে হাঁটা। শাকসবজি ও ফলের রকমফের দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। চড়াই, সে যতই হালকা হোক, খিদে বাড়িয়ে দেয়। প্রথম পড়াও লক্কর বাজারে সীতারাম এন্ড সন। সিমলার অন্যতম প্রাচীন ধাবা স্টাইল স্ট্রিট ফুড স্টল। রিগ্যাল বিল্ডিংয়ের কাছে এন সি কমপ্লেক্স-এ। ব্রিটিশ আমল থেকে এখানকার চানা-বাটুরা, ভেজ টিক্কি ও বাঙালির প্রিয় পুরি-ভাজি বিখ্যাত। অনুপম খের ও প্রীতি জিন্টার মতো সেলিব্রেটিরা আজও সিমলা সফরে সীতারামের চানা-বাটুরা খাবেনই। সকাল সাড়ে দশটায় তেমন ভিড় নেই। প্লেট হাতে আড্ডা জমে গেল। অপূর্ব স্বাদ চানা মশলার, কিন্তু বাটুরা আমরা যেমন খাই তেমন নয়। অনেকটা বড়ো লুচির মতো, অত্যন্ত পেলব। এদের পারাটি কুলচা নামে আরেকটি পদও সিমলায় বিখ্যাত।

     সীতারাম এন্ড সন থেকে সামান্য দূরে লক্কর বাজারের ব্যস্ততম এলাকা ডি আর সি কমপ্লেক্সে শর্মাজ বার্গার এন্ড টিক্কি কর্নার। দোকান ১০ ফুট বাই ৬ ফুট, কিন্তু সকাল থেকে বিক্রির বহর দেখলে চক্ষু চড়কগাছ। অনেক হিমাচলিকেও দেখেছি শর্মাজ-এ ব্রেকফাস্ট ও বিকেলের টিফিন খেতে লাইন দিতে। অনেকবারের সফরে খেতে দাঁড়াই বা না দাঁড়াই, এই ফুড স্টলটিকে কখনো খালি থাকতে দেখিনি। এদের মন্ত্রগুপ্তি খাবারের স্বাদের সঙ্গে মালিকের অমায়িক ব্যবহার। শর্মাজেই পাবেন হিমাচলি সিড্ডু। পুরভরা বার্গার সদৃশ বস্তু, চাটনি ও মেয়োনিজ সহযোগে খেতে হয়। এছাড়াও হটডগের হট সেল। কুরকি, স্যান্ডুইচ, বার্গার, টিক্কি সবই বিকোচ্ছে মুড়ি-মুড়কির মতো। সিড্ডু একটা করে খেলাম। তারপর এক প্লেট কুরকি। কুরকি হল ভেজিটেবল কাটলেটের হিমাচলি সংস্করণ। দুটো আঙুলের সমান সরু ও লম্বা করে বানানো। এর সঙ্গেও দেওয়া হয় পর্যাপ্ত পরিমানে মেয়োনিজ ও মশলাদার এক ধরনের চাটনি। কুরকির আরো অনেক দোকান আছে সিমলায়। বিকেলের দিকে গেলেই হল। আপাতত বেলা বাড়ছে। পেটের শান্তি হল মানে মলে ঘুরতে যেতে হবে এবার। কালীবাড়ি পর্যন্ত হাঁটব। গাড়ি নিয়ে জাখু পাহাড়ের ওপরে মন্দির দেখে আসতে পারি। ঘোড়ায় চড়তেও বাধা নেই। কিন্তু কয়েক পা হাঁটার পর এক বন্ধু বায়না ধরল, মশলাদার নানা কিছু তো খাওয়া হল, এইবার টক-মিষ্টি অন্যরকম কিছু মুখে দিলে মন্দ হয় না। নিয়ে গেলাম ঠাকুর ভ্রাতা নামে শহরের অন্যতম পুরনো ও বিখ্যাত আচার-মোরব্বার দোকানে। এটাও মল রোডে। এ দোকান একসময় ব্রিটিশ মেমসাহেবদের প্রিয় ছিল। অনেক রকমের আচার মোরব্বার বাহারি আয়োজন। পুরনো রেসিপিতে বদল এসেছে সামান্যই। আমলা মোরব্বা ও গাজরের মোরব্বা পরখ করি।

     মলে ও তার আশেপাশে অনেক ঘোরাঘুরি হল। সিমলায় হটডগ ও বার্গারের রোডসাইড দোকান এতই যে, খিদে পাওয়া মাত্র হাতের কাছে পঞ্চাশ-একশ মিটারের মধ্যে একটা না একটা মিলে যাবে। দোকান যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন, কারো স্বাদ ও মান নিয়ে অভিযোগ করার জায়গা নেই। ৫০-৬০ টাকায় আর কোন হিলস্টেশনেই বা দুপুরে খাওয়া যায়? কিন্তু এতে পুরো পেট ভরে এমন নয়। তাই নতুনতর খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। এবার আরামদায়ক উৎরাই৷ শের-এ পাঞ্জাব ছাড়িয়ে পায়ে পায়ে মেহেরচাঁদ ব্রাদার্সে। সবাই ভালোবেসে বলে ‘মেরুজ।’ ১৯০২ সালে স্থাপিত সিমলার প্রাচীনতম মিষ্টির দোকান। ভিড় লেগেই আছে। পুরনো রেসিপির জায়গায় আধুনিকতা এসেছে। কিন্তু বৈচিত্র‍্যে আজও অতুলনীয়। যা যা খেলামঃ দুধ মালাই ও কোকোর সংমিশ্রণে তৈরি ছোটো বর্গাকার চকলেট, শুকনো নারকেল ও অন্যান্য ফল দিয়ে তৈরি পাঞ্জিরি লাড্ডু, চিনি ও বেসনের বরফি মেহেসু, কাজু কুলফি। এ সবই কেজি দরে বিক্রি হয়। স্থানীয়দের দেখলাম বেশি রসমালাই ও গাজরের হালুয়া খেতে।

     দুই-এক বন্ধুর একলপ্তে এত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস নেই। তাদের বায়না মশলাদার ঝাল-নোনতা কিছু খেতেই হবে। সেটা কুরকি হলে মন্দ হয় না। ওদের নিয়ে গেলাম কাছেই আরেক পুরনো ও নামি স্ট্রিট ফুডের দোকানে। আসলে বেকারি। কিন্তু এদের কুরকি ও মোমো দারুণ জনপ্রিয়। মল রোডের কৃষ্ণা বেকারি। ভিড় ঠেলে প্লেট নেওয়াই কঠিন। অনেকটা করে মেয়োনিজ দেয় সঙ্গে। মোমোর সঙ্গে মেয়োনিজ ছাড়াও দেওয়া হয় লঙ্কার আচার ও পুদিনার চাটনি। মনে পড়ে যায়, আগেরবার আরেকটা দোকানে সুস্বাদু কুরকি ও মোমো খেয়েছিলাম বেশ কম দামে। দোকানের দাম ড্রিগেন। লোয়ার বাজারে ঢোকার মুখে হঠাত খুঁজে পাওয়া। এদের ভেজ চাইনিজ ফুডেরও বেশ নামডাক আছে।

     কুরকি খাওয়া হলে একজন বায়না ধরল, শীতের দেশে আইসক্রিম খাব না, তা কি হয়? আবার পুরনো পথে ফিরে যাওয়া এমব্যাসি আইসক্রিমসে। এরাই সিমলায় সবচেয়ে খ্যাতনামা আইসক্রিম বিক্রেতা। ফ্রুট সান্ডি সাঁটালাম। তারপর আবার সোজা মলে। বিকেলের আলোয় আর রঙিন মানুষের ভিড়ে চেনা জায়গাটা নতুন হয়ে ধরা দিল। ভিড়ের লেজ ধরে লাইব্রেরির পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে উঠে যাই। দু মিনিট হাঁটলে টাক্কা বেঞ্চ। ভিউপয়েন্ট থেকে লোয়ার সিমলা যেন পটে আঁকা ছবি। কিন্তু এখানে সকলে আসে গোলগাপ্পা, ভেলপুরি, চাট খেতে। মেলার পরিবেশ। গোলগাপ্পা বা ফুচকা সারা দেশে পাওয়া যায়৷ কিন্তু প্রতিটি জায়গার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। সিমলার গোলগাপ্পা পরিবেশিত হয় দু’তিন রকমের উপাদেয় চাটনি সহযোগে৷ দই-ফুচকা বেশ স্বাদু। টাক্কা বেঞ্চে আছে ১৯৪৮ সালে স্থাপিত সিমলার সবচেয়ে পুরনো ফ্রুট চাটের দোকান। কিন্তু এতবারের সফরে একবারও খাওয়া হয়ে ওঠেনি। যেমন, আজ যাওয়া হল না সিমলার আর এক প্রিয় ঠেক বা ঠিকানা ঠান্ডা সড়কের চৌরা ময়দান এলাকায় ভার্মা টি স্টলে। সিমলার ক্রমবিলীয়মান বনভূমির খানিকটা অবশিষ্ট আছে এখানে, চা দোকানের অতীত গরিমার মতো। ভার্মা টি স্টল ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের কাছে পরিচিত কেওয়াল কা ধাবা নামে। কেওয়াল (কেবল) ও সামসের সিং ব্রিটিশ আমলে এই রোডসাইড বিপনী গড়ে তোলেন। এখন চালাচ্ছেন এদেরই পঞ্চম প্রজন্ম। আগে নাকি ভাঙাচোরা ঝুপড়ি ছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটেন চা পান করে এমনই অভিভূত হন যে, দোকান পাকা করার টাকা দেন। এখানে সকলে চায়ের সঙ্গে বাটার বান খান।

     সন্ধ্যেয় আলো ঝলমল মল থেকে খানিক হেঁটে কালীবাড়ি পৌঁছে যাই। বাঙালির প্রিয় ঠিকানা। সিমলা কালীবাড়িতে কুপন কিনে খাওয়া। আমরা কখনো দুপুরে খাইনি। ম্যালে ঘোরার ফাঁকে বিকেল বেলায় কুপন কেটে রাখতাম, আটটার পর গুটিগুটি খেতে যেতাম। সিজনে গেলে মনে হয়, পুরো বাংলাটাই উঠে এসেছে সিমলায়। একদল লোক হাইবেঞ্চ লো বেঞ্চে বসে খাচ্ছে, আরো বড়ো একটা দল করিডোরে অপেক্ষারত। আয়োজক ও পরিবেশকরা হিমশিম। ভোজনরসিক বাঙালির মহা মিলনমেলা। পরিবেশের গুণে চিরচেনা বাঙালি পদগুলো নতুন করে ভালো লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *