চিন্তাবিদ অম্লান দত্ত : ব্যক্তিগত স্মৃতি
মারুফ হোসেন
প্রথম যেদিন অম্লান দত্তের বাড়িতে যাই, একটা লেখার ব্যাপারে কথা বলতে গেছিলাম। সুশীলদার সঙ্গে। কাজটা মূলত সুশীলদার। আমি ড্রাইভার। সল্টলেকে। একটি বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে। অম্লান দত্তের সঙ্গে মুখোমুখি বসে আছি, বিরাট একটা সৌভাগ্য। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, বিশ্বভারতী ও উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, চিন্তক, মানবতাবাদী, সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক প্রাবন্ধিক অম্লান দত্ত। খুব সংক্ষিপ্ত ছিল প্রথমদিনের আলাপ। বেরিয়ে আসবার মুখে বললাম, আপনাকে একটা প্রণাম করতে চাই। তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘প্রণাম নয়, পরে যেদিন আসবে চা খাওয়াব।’ কয়েকদিন পর সুশীলদা (সুশীল সাহা, লেখক সম্পাদক) জানালেন, ‘অম্লানবাবুর লেখাটা হয়ে গেছে চলো নিয়ে আসি।’ আমি আবার ড্রাইভার। অম্লান দত্তের বসার ঘরের সোফায়।
অম্লান দত্ত প্রথমেই আমাকে বললেন, ‘কী চা খাবে বলো।’ বললাম, ‘না, থাক, আপনার কষ্ট হবে, চা খাব না।’ উনি বললেন, ‘আমার কষ্ট হবে না, বলো কোন চা খাবে?’ মনে মনে তখন পুলকিত বোধ করছি। এত বড়ো একজন মানুষ নিজের হাতে চা তৈরি করে দেবেন। সারা জীবন মানুষকে গল্প করে বেড়াতে পারব, এ সৌভাগ্য ছাড়া যাবে না। বললাম, ‘ঠিক আছে যে চা আপনার বানাতে সব থেকে কম কষ্ট হবে সেই চা-ই খাব।’ উনি মৃদু হেসে একটু বুঝতে বলে চলে গেলেন। ভেতর থেকে টুংটাং শব্দ। আমি আর সুশীলদা বসে আছি। টেবিল থেকে দু একটা পত্র পত্রিকা বই তুলে দেখছি। কিছুক্ষণ বাদে তিনি এলেন একটা ট্রেতে তিন কাপ চা নিয়ে। প্রথমেই আমার কাছে এসে বললেন, ‘এখানে তিন রকম চা আছে তোমার যেটা পছন্দ সেটা তুলে নাও।’ আমি বিস্মিত। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে তখন, আশি বছরেরও বেশি বয়সী একজন মানুষকে এতটা পরিশ্রম করালাম! একটা কাপ তুলে নিলাম। এরপর সুশীলদাকে দুটো চা থেকে একটা বেছে নিতে বললেন। এইরকম একজন স্নেহশীল ব্যক্তিত্ব অম্লান দত্ত।
তিনি সবসময় বলতেন, ‘হিন্দু মৌলবাদ, মুসলমান মৌলবাদ দুটোই খারাপ। আসলে উপমহাদেশের দেশগুলির মধ্যে মৌলবাদের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। আর এ কারণে দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরি হচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র বিপন্ন।’ উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় বিষয়, মানুষের আচরণ নিয়ে তিনি সর্বদাই চিন্তা করতেন। বলতেন, ‘আমার মনে হয় আপাতত আমাদের বেশ কিছুকাল দেশবিভাগের সীমারেখাগুলি মুছে দেওয়ার কথা না বলা উচিত কারণ দেশভাগের সীমারেখা মোছার কথা বললে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বলবে ভারত আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে। এতে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে মৌলবাদী জঙ্গি ক্রিয়াকলাপ বেড়ে যাবে। তারফলে ভারতেও অস্থিরতা তৈরি হবে। ফলে ভালো হবে না। তাই ১৯৪৭-এর সিদ্ধান্ত ঠিক হোক, না হোক দেশভাগের সীমারেখা মোছার বিষয় উত্থাপন না করে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক, সম্প্রীতির সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। এতেই সকলের মঙ্গল। চেষ্টা করতে হবে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার। এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মেই সাম্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও মৈত্রী সবচেয়ে বড়ো। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এসব কাজ মনে হয় করবে না, সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে।’
পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার অম্লান দত্তের বাড়িতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, বা অন্যত্র দেখা হয়েছে, দেখেছি, নিজের পেশাগত শিক্ষাগত সকল কিছুকেই অনেকটা দূরে রেখে সাধারণ হয়ে মিশে যেতে পারতেন সকলের সঙ্গে। অম্লান দত্ত এক বিরল বাঙালি ব্যক্তিত্ব।
