জেন
সেলিম মণ্ডল
১
একদিন লম্বা এক ঘুম দিয়ে জলঙ্গীর পাড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে আছি। কখনো কখনো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। অন্যদিনের তুলনায় লোকজন কম। সন্ধ্যা তখনো তার বিবাহবাসর সাজায়নি। নদী পেরিয়ে একে এক ফিরে যাচ্ছে ওপারের মানুষ। এপারের আমি নদীর সঙ্গে আত্মীয়তা করছি। এক চাচা পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করল, ভাইপো চাঁদ দেখছ নাকি? আমি বললাম, চাচা এখনো সন্ধ্যা হল না! কীভাবে চাঁদ দেখব? চাচা বলল, চাঁদ দেখার জন্য অন্ধকার লাগে নাকি! আকাশ দেখতে জানলেই চাঁদ দেখতে পাবা।
২
একবার পিঁপড়েকে এক মানুষ জিজ্ঞাসা করল, জীবন এত ছোটো কেন? পিঁপড়ে বলল, আমাকে ক্ষুদ্র দেখে কি এই প্রশ্ন করছ? জীবন কি আসলেই ক্ষুদ্র? আমি আমার ওজনের দশগুন বহন করতে পারি। এই যে এত খাবার আমি বয়ে নিয়ে যাচ্ছি তা জীবন ক্ষুদ্র বলে? তোমার কাছে জীবন ক্ষুদ্র কারণ তুমি নিজের ওজনের অধিক কিছু ভাবতে পারো না…
৩
এক ভিখারি একদিন আরেক ভিখারিকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কতটা ভিক্ষা পেলে বাড়ি ফিরে যাবে। দ্বিতীয় ভিখারি বলল, সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে যতটা পাব তা নিয়ে বাড়ি ফিরব। তখন প্রথম ভিখারি ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কখন ফিরবে? দ্বিতীয় ভিখারি তখন বলল, আমার হ্যাফব্যাগ চাল হলেই ফিরে যাব। আবার প্রথম ভিখারি জিজ্ঞাসা করল, হাফব্যাগে ফিরবে কেন? সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরলে তোমার ব্যাগভর্তি হয়ে যাবে। তখন দ্বিতীয় ভিখারি বলল, আমি যদি একব্যাগ চাল নিয়ে ফিরি তাহলে আমার পরেরদিন আর বেরোনোর তাগিদ থাকবে না। ভিক্ষার জন্য তাগিদ না থাকলে ভিখারি হওয়া যায় না৷ এই জগৎ-সংসারে যারা প্রকৃত ভিখারি তাদের অপূর্ণই বেশি থাকে। যারা পূর্ণতার জন্য বেরোয় তারা আসলে লোভী।
৪
একদিন একটা গোরু একটা পাখিকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। আজ এ গাছ, কাল ও গাছ। ঝড়বৃষ্টি হলে আরেকটা ঝামেলা… এজন্য তোমার কষ্ট হয় না? পাখি, গোরুকে জিজ্ঞাসা করল— গোরু ভাই, তুমি কি সুখী? তোমার যে বাড়ি আছে তা কি তোমার নিজের মনে হয়? গোরু বলল— হ্যাঁ, মনিব তো আমার জন্য আলাদা ঘর বানিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন নানারকম ভালো ভালো খাবার দেয়। পাখি— তাহলে তুমি সত্যিই সুখী। গোরু— অবশ্যই। এখানে কোনো দ্বিমত নেই। পাখি কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল— আজ আমি সারাদিন ঘুরব। এদেশ থেকে ওদেশ যাব। মনের আনন্দে ঘুরব। মেঘের মধ্য দিয়ে ভেসে যাব। তুমি কি তোমার গলার দড়ি খুলে যাবে কোথাও ঘুরতে? গোরু বলল— তাহলে আমার মনিবকে দুধ দেবে কে? পাখি— তুমি যদি দুধ না দাও, তাহলে মনিব কি তোমায় ছেড়ে দেবে? গোরুটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে জোরে হাম্বা হাম্বা ডাক ছাড়ল। পাখিটি মেঘের মধ্য দিয়ে উড়ে গেল।
৫
একটি মাছ ডাঙায় ওঠার পর এক মানুষের সঙ্গে আলাপ হল। কিছুক্ষণের মধ্যে দু-জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। মানুষটি মাছকে বলল, চলো ভাই আমার বাড়ি ঘুরে এসো। মাছ তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি আমিষাশী? সে উত্তরে বলল, না; আমি নিরামিষাশী। তখন বলল, তোমার বাড়ির সবাই কি তাই? মানুষটি উত্তরে বলল, হ্যাঁ। মাছটি ততক্ষণাৎ ডাঙা থেকে এক লাফ দিয়ে জলের মধ্যে পালিয়ে গেল। আর বলল, এই জল দেখেছ? এটাই আমার বাড়ি। এখানে উনুন নেই, বঁটি নেই। এখানে আমিষাশী, নিরামিষাশী নেই। ছলচাতুরি নেই।
