ছোটোগল্প

নক্ষত্র পতন

পবিত্র আচার্য

[এক]
১৫ সেপ্টেম্বর, অ্যামস্টেলভিন, নেদ্যারল্যান্ডস
ন্যান্সির চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আবেগের ক্যালিডোস্কোপ। অভিঘাত, ক্রোধ, অসহায়তা, অসাড়তা ও অস্বীকার। প্রতিটি অনুভূতি নাড়িয়ে দিচ্ছে ওকে। গভীর দুঃখের সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে সে। সে এক বিস্ময়কর বিষাদ! এইরকম দুঃখজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়নি কখনও ন্যান্সি, এর আগে। এই ঘটনা অত্যন্ত কঠোর ও পাশবিক।
গৌরব, ন্যান্সির হাজবেন্ড, বয়স সাতাশ, মেদহীন কাঠ কাঠ চেহারা। সুদর্শন ও সুপুরুষ চেহারা। গৌরব অত্যন্ত বুদ্ধিমান। জীবনে প্রতিটি কাজে, অবিশ্বাস্য ভাবে সফল। ভগবান কি করে এটা ঘটতে দিল? ন্যান্সির মনের মধ্যে তোলপাড় করে দিচ্ছে অজানা প্রশ্নের ভার। কোন পূর্ব জন্মের পাপ এসে প্রতিশোধ নিয়ে গেল কি তবে?


ঘরের ভেতর এক গাদা লোক এসে ভিড় করেছে। সবাই মিলে চেষ্টা চালাচ্ছে যদি একটুকুও ভালো লাগে ন্যান্সির। কিন্তু কিছুই ভালো লাগছে না ওর। বেদনার তীব্রতা এতটাই অসহনীয় ছিল, কিছুতেই ভুলে থাকতে পারছিল না ন্যান্সি সেইসব। তাই বাকী সকলের সহানুভূতির কথাগুলোও তেতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল কখন এরা চোখের সামনে থেকে চলে যাবে? এই লোকগুলোর প্রতি তীব্র ঈর্ষা বোধ করছিল ন্যান্সি, এদের জীবন তো এখনও ওর মতো ছারখার হয়নি। ওদের সমস্যাগুলো সব সময়ের জন্যে পূরণীয়। আর ন্যান্সির জীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়টা একটা পরীক্ষায় ফেল করার মতো বিষয় নয়, একটা প্রোমোশন মিস করা নয়, সম্পর্কের কাটাকুটিও নয়, এটি সম্পূর্ণ রূপে একটা সুখের সমাপ্তি। সারাজীবনে কোনও এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবতে পারে নি ন্যান্সি।


সবাইকে বসার ঘরে রেখে ভেতর ঘরটায় ঢুকে গেল ন্যান্সি। দরজাটা বন্ধ করে কান্না করতে লাগল। এতই বেদনাময় সেই অনুভূতি, যেন সমস্ত চোখের জল চুষে নিয়ে বালিময় শুকনো নদীর মত নুড়ি বেড় করে হাসছে ওর চোখ দুটো। এক ফোঁটা জলও বেঁচে ছিল না অশ্রু হিসাবে বেরিয়ে আসতে পারে। ঘরের জানালাটা খুলে দিলো ন্যান্সি। তারপর সামনের রাস্তাটার দিকে চেয়ে রইল চুপচাপ।


ন্যান্সি ভুবনেশ্বরে মানুষ। ওখানেই লেখা পড়া। যখন বাইশ বছর, তখন ওর বাবা বিয়ে ঠিক করেছিল গৌরবের সাথে। গৌরব প্রবাসী। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেই সরাসরি যোগ দিয়েছিল নেদ্যারল্যান্ডসে। একটানা পাঁচবছর আইটি ফার্মে কাজ করার পর পি.আর পেয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। মোটা টাকার চাকরি গৌরবের। এইরকম সুযোগ্য পাত্র পেয়ে বাড়ির সবাই খুব খুশি।


নেদারল্যান্ড থেকে গৌরব এসে পৌঁছাল ওর ভুবনেশ্বর। ওর নিজের বাড়িতে। একমাসের ছুটিতে। হৈ হৈ করে বিয়ে থা মিটে গেল। তারপর হানিমুন। ওরা দুজনে গিয়েছিল ডুয়ার্সের জঙ্গলে। চয়েসটা পুরোটাই ছিল ন্যান্সির। জ্যোৎস্নাময় রাত্রির মাঝে নিস্তব্ধ জঙ্গল। পাতাদের ফাঁকে ফাঁকে হেঁটে বেড়ানো রুপালি আলো। ঝিঁ ঝিঁ র ডাক। বন-বাংলোর জানালার পর্দাটা সরাতেই দেখতে পেলো একপাল হাতি। মাথা ঝাঁকানো গণ্ডারের দল। আর কিছু দূরে খালটাতে জল খেতে এসেছে তৃষ্ণার্ত চিতা। সে এক রোমাঞ্চকর সময়।


একমাস কেটে গেলে ফেরার সময় এসে পড়ল। গৌরব আর ন্যান্সি পাড়ি দিল নেদারল্যান্ডস এর দিকে। মিয়েন্ডার ৫৭, অ্যামস্টেলভিন। দুই কামরার ফ্ল্যাট বাড়ি, গৌরবের নিজের। বিয়ের পর প্রথমে পা রেখেই নিজহাতে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিল ন্যান্সি। ব্যাচেলার গৌরবের লণ্ড ভণ্ড গোয়াল ঘর ন্যান্সির ছোঁয়া পেয়ে প্রথম সংসারী হল। গৌরব প্রথমবার বুঝতে পারলো ওর এই ফ্ল্যাটবাড়িটা কি ভীষণরকমেরই না সুন্দর!


বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমনে স্মৃতির সারণি বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল ন্যান্সি। রাস্তায় ছুটে বেড়ানো টুকটুকে লাল রঙের ৩০০ বাসটা মনে হচ্ছিল বর্ণহীন ফ্যাকাশে। সমস্ত গতিময়তা স্তব্ধ হয়ে পৃথিবীটা আটকে গেছে যেন স্থাণুবৎ।
সকালবেলাটা ভালো লাগে না ন্যান্সির। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সংগ্রাম শুরু হয়। যেমন ভাবে ঠিক আগের রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত দায়িত্ব-কর্তব্য বোধ পালনের উত্তেজনা জেগে থাকে। সকালটাও ঠিক একইভাবে শুরু হয়। অজানা একটা দিনের চিন্তা ও ভাবনা আচ্ছন্ন করে রাখে ন্যান্সিকে।


১৫ সেপ্টেম্বর সকালটাও আলাদা ছিল না ন্যান্সির। ঘুম থেকে উঠেছিল সকাল সাতটায়। সকালের নিত্য কাজের দিকে পা বাড়াচ্ছিল ন্যান্সি। হঠাৎ ফোন কলটা পেলো। কিছুতেই ন্যান্সি মনে করতে পারছিল না ফোনের অপর প্রান্তের কথাগুলো। শুধুমাত্র মনে আছে দুটো শব্দ। “গৌরব” এবং “ডেথ”। এতই ঘন তীব্র ছিল ওই কথাগুলো সমস্ত মহাবিশ্ব কম্পিত হয়েছিল, অথচ পৃথিবীটা কেন চলছে? বাথরুমের কল থেকে জল পড়ছে। পাখিরা উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। ঘরের টিভি চ্যানেলটা চলছে। সবকিছু কেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে না? যেভাবে খরটা শোনার পর ন্যান্সি পাথরের মতো অসাড় হয়ে পড়েছে। ন্যান্সি ভাবতেই পারছে গৌরবহীন পৃথিবীটা এখনও কীভাবে চলছে?


[দুই]
১৫ সেপ্টেম্বর, বার্সেলোনা, স্পেন

ইএল পেজঃ
“৩২ বছরের যুবক নিজের অ্যাপার্টমেন্টে খুন হয়েছে। মৃত দেহ শনাক্ত করণের মতো অবস্থায় নেই।”

দ্য টেলিগ্রাফ, স্পেন
“বার্সেলোনার স্যান্ট মন জুয়িক, পুলিশ পুরো স্তম্ভিত ও বোকা বনে গেছে। আইটি কনসাল্টেন্ট মারা গেছে। প্রিলিমিনারি ইনভেস্টিগেশন এর পর জানা গেছে, দরজা ভেঙে বা জোর করে কেউ ঢোকেনি অ্যাপার্টমেন্টে।”


অলিভ প্রেস নিউজ, স্পেন
“৩২ বছরের যুবক খুন। যুবক জন্মগত ভাবে ভারতীয় হলেও বর্তমানে নেদারল্যান্ড এর নাগরিক। স্ত্রী, নেদারল্যান্ডেই থাকেন।”

গৌরব খুন হয়েছে। স্পেনের জোহান্স অ্যাপার্টমেন্টে। প্রাথমিক তদন্ত এর পর, জানানো হয়েছে ১৪ই সেপ্টেম্বর রাত দশটা নাগাদ মারা গেছে। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট অনুযায়ী কোনও আঘাত জনিত কারণ বা বিষ প্রয়োগ করে মারা হয়নি তাকে। খুন করার পরেই পুরো চেহারাটাকে বিশ্রীভাবে আঘাত করা হয়েছে। এতটাই জঘন্যভাবে, যাতে চেনার উপায়টুকুও যেন না থাকে।


নেদ্যারল্যান্ডসে আই.এন.জি ব্যাংকে কাজ করে গৌরব। আই টি কনসালটেন্ট। ব্যাংকের অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্টেশন এর জন্যে মাসকয়েক হল গৌরব যাতায়াত করছে বার্সেলোনায়। সপ্তাহে চারদিন ওখানেই থাকে। শুক্রবার সন্ধ্যায় নেদারল্যান্ড ফিরে আসে। দুই দিন কাটিয়ে, রবিবার রাতে স্পেন চলে যায়।

এভাবেই কয়েক মাস কাটছিল ওদের। কোম্পানি থেকেই স্পেনের অ্যাপার্টমেন্টটা দিয়েছিল। মাঝে মাঝেই গৌরবের কাছে যেত ন্যান্সি । বার্সেলোনার অ্যাপার্টমেন্টা ছোট। তবুও একেবারে শহরের কেন্দ্র বিন্দুতে।
নেদারল্যান্ডস এর শান্ত পরিবেশে থেকে ঝিমিয়ে পড়েছিল ন্যান্সি। এখানে লোকজন অত্যন্ত শান্ত। সন্ধ্যের পর পর মানুষ ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ে। রাস্তায় হাতে গোনা গুটি কয়েক গাড়ি। রাত দশটায় বিকেলের মত আলো থাকলেও কোন কাকপক্ষীও চোখে পড়ে না। বার্সেলোনা সত্যিই ভিন্ন। গতিময় শহর। এখানে প্রতিটি সন্ধ্যা অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল। অনেক রাত পর্যন্ত মানুষ চোখে পড়ে। অ্যাপার্টমেন্টটার পাশেই শপিং মাল। তার মেইন গেটটার পাশটায় বিচিত্র বর্ণের শুকনো পাতাময় একটা ম্যাপেল গাছ। তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে স্প্যানিশ গিটারিস্ট। কি অসম্ভব সুর তুলে গান গায় লোকটি। এই ভাষার বিন্দুমাত্র না, বুঝলেও ন্যান্সি বুঝতে পারে কতটা গভীর তার মানে। বার্সেলোনা ভালো লেগে গিয়েছিল ন্যান্সির। কিন্তু গৌরবের এই আকস্মিক মৃত্যু ওর সমস্ত ধারণা ভুল বলে প্রমাণ করল।

বাড়ি ভর্তি লোকজন। প্রজেক্টের সকলে আকস্মিক মৃত্যুর খবরটা পেয়ে এসেছে ন্যান্সিকে সান্ত্বনা দিতে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এসেছে ন্যান্সিকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে। সাথে ডাচ মিডিয়া ও ক্যামেরা মান।
ভেতরের ঘরটায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে ন্যান্সিকে অনুরোধ জানাল তদন্তকারী অফিসার। কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে।

“আপনি কি কিছু শেয়ার করতে চান আমাদের কাছে? কেমন ছিল আপনার হাজবেন্ড। তাকে কেই বা খুন করতে পারে?”

ন্যান্সি পাথরের মত স্থির। কোনও কিছু জানা নেই ওর। নিরুত্তর ও নির্বাক হয়ে বোকা বোকা চেয়ে রইল প্রশ্নকর্তার দিকে।

“ও বুঝতে পেরেছি, আপনার কাছে কোনও ক্লু নেই। ঠিক কিনা?”

এই প্রশ্নের জবাবেও ন্যান্সি চুপচাপ। কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেল, একইভাবে। প্রশ্নকর্তা পুনরায় জানতে চাইলেন, “আপনার হাজবেন্ড এর চরিত্র কেমন ছিল? কোনও মেয়ে বা বান্ধবী সম্পর্কে কিছু জানেন কি?”

ন্যান্সি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে চলে গেল বাথরুমের দিকে। চোখের মধ্যে ভাল করে জলের ঝাপটা মারল বেশ করে। তারপর আয়নায় চোখ রাখতেই দেখতে পারল নিজের বিবর্ণ মুখটাকে। গৌরব সম্পর্কে এইসব প্রশ্ন, অপরাধ মূলক কথাবার্তা একদা তাঁর নিজের বাড়িটাকে কয়েদখানা বানিয়ে দিয়েছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ন্যান্সির। একটা শক্ত দলা পাকানো কষ্ট এসে জমা হচ্ছে গলার কাছটায়।

[তিন]
১৮ সেপ্টেম্বর, বার্সেলোনা, স্পেন

তদন্তের স্বার্থে বার্সেলোনায় উড়ে গেছে ন্যান্সি। ওখানকার পুলিশ কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। এই প্রথমবার একা একা ন্যান্সি পা রাখল বার্সেলোনায়। পুরো শহরটাই খুনিদের মনে হচ্ছে। চারপাশে যত লোক এর মধ্যেই হয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে গৌরবের হত্যাকারী।

“সেনোরা ডি বিয়েনভিনেডা – মানে ওয়েলকাম ম্যাডাম। সামান্য কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আপনাকে ডাকা হয়েছে এখানে।” স্পেনিশ পুলিশ অফিসার গ্যাসিয়াস জানালেন ন্যান্সিকে।

“সি সি টিভি প্যাকেজ থেকে দেখা যাচ্ছে একজন বোরখা পরা রাত সাড়ে দশটা নাগাদ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট এর বাকী সবাইকে দেখিয়েও তার পরিচয় জানা যায়নি। কেউই বলতে পারেন নি, কোন ফ্ল্যাটে এসেছিলেন ওই লোকটি। খুনের সময় দশটা ধরলে, বোঝা যাচ্ছে সেই খুন করে পালিয়ে গেছে, আপনার হাজবেন্ডকে।” পুলিশ অফিসার আরেকবার ভিডিও ক্লিপটা দেখালেন ন্যান্সিকে।

“ঠিক বুঝতে পারছেন কি, পরিচিত কেউ কি হতে পারে?”

সারা শরীর কালো পোশাকে ঢাকা। উচ্চতা মাঝারি গড়নের। এছাড়া আর কিছু বোঝবার উপায় নেই।

“না, অফিসার। ঢাকা পোশাকের মধ্যে কাকেই বা চেনা যায়? তবে আমার মনে হচ্ছে একজন মহিলাই হবে বোধহয় ।” – ন্যান্সি ধীরে ও শান্তভাবে বলল।

“আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের ধারণাও তাই। কিন্তু আপনি কীভাবে বুঝলেন?”

“পায়ের জুতো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একজন মহিলাই হবে।”

“এছাড়াও আরও কিছু ক্লু আমরা পেয়েছি। টেলিফোন রেকর্ড ও তার কথোপকথন শুনে আমাদের ধারণা, আপনার হাজবেন্ড এর কোন মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তার নাম হল জেনি। ” – কথাটা বলার সময় কিছুটা আড়ষ্ট ও ইতস্তত করছিলেন ইনস্পেক্টর।

এই কথা শোনার পরই পুরো আকাশ ভেঙে পড়ল ন্যান্সির মাথার উপর। এটাও কি সম্ভব? “তাহলে কি ওই বোরখা পরা মহিলাই কি জেনি?” ন্যান্সি জানতে চাইল।

“আপনার হাজবেন্ড এর সাথে ফেসবুক চ্যাট এবং ও যে সব ছবি বিনিময় হয়েছে, তাতে করে জেনিকেই সন্দেহ করা যেতে পারে, খুনি হিসাবে। কিন্তু চ্যাটের হিস্ট্রি ঘেঁটে একটাও শব্দ উদ্ধার করা যায়নি, যাতে করে এই দুজনের সম্পর্কের মধ্যে সাম্প্রতিক কোনও উত্তেজনা বা কথাকাটাকাটি চলছিল কিনা?”

রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছলো ন্যান্সি। এরপর ইনস্পেক্টর এর কাছ থেকে জেনির ছবিটা চেয়ে নিয়ে দেখল একবার। অসম্ভব সুন্দরি। চেহারা দেখলেই বোঝা যায় কোন নামকরা মডেল। বার্সেলোনার বিচে বিকিনি পরে টাটকা রোদে শরীর ট্যান করছে সে। ছবিটি দেখে ন্যান্সি ঠিক বুঝতে পারছে, এটি বার্সেলোনা বিচই। ছবিটাতে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে ‘হোমেন্টেজ অ্যা লা বার্সেলোনাটা’, হেলে পড়া মনুমেন্টটা।

“আপনারা জেনির সোশাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট দেখলেই তো সব ডিটেলস পেয়ে যাবেন?” – অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ন্যান্সি জিজ্ঞাসা করল।

“আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু এই খুনি মহিলা এতটা বোকাও নয়। আমরা তদন্ত শুরু করার আগেই ইমেল আইডি, হোয়াট অ্যাপস অ্যাকাউন্ট, সোসাল নেটওয়ার্কিং অ্যাকাউন্ট সব ডিলিট করে দিয়েছে এই মহিলা।”

কি ভয়ানক শয়তানির জালেই না ফেঁসে ছিল গৌরব! খুন করার পর সমস্ত তথ্য লোপাট করার জন্যে নিজের সমস্ত চিহ্ন গায়েব করে দিয়েছে। এই পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া কত কত রহস্য যে অজানা থেকে যায়। গৌরবের খুনের রহস্যটা চিরকাল অজানা থেকে যাবে। আরেকটা নতুন কেস যুক্ত হল, অসমাধানের অভিধানে।

“যদি কখনও কোন খবর আপনি পান, প্লিজ জানাবেন আমাদের। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই কেসটার তদন্ত চালিয়ে যাব আমরা। কোনও কিছু প্রগ্রেস করলেই আপনাকে জানানো হবে।” – গভীর দুঃখের সাথে জানালেন ইনস্পেক্টর।

“প্লিজ জানাবেন। যতদিন না এই খুনির পরিচয় জানতে পারছি, আমি শান্তিতে ঘুমোতে পারব না ইনস্পেক্টর।” – কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলো ন্যান্সি।


[চার]
৩০ অক্টোবর, অ্যামস্টেলভিন, নেদ্যারল্যান্ডস


প্রায় দেড় মাস কেটে গেছে। ন্যান্সি এখন পুরোপুরি একা। দেশে ফেরার কথা ভাবছে ন্যান্সি। কিন্তু যতদিন না আইন-ই জটিলতা কেটে যাচ্ছে, নেদারল্যান্ডস গভর্মেন্ট থেকে ইন্ডিয়া যাওয়ার অনুমতিও পাচ্ছে না ন্যান্সি। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই থাকতে হচ্ছে এখানে।

একদিকে গৌরবকে হারানোর যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে। অন্যদিকে পুলিশ ও মিডিয়ার হয়রানি ক্লান্ত করে দিয়েছে। গৌরবের কাহিনি নিয়ে মিডিয়া পুরোপুরি সার্কাস করছে। পুরো ঘটনাটায় জল মিশিয়ে সম্পূর্ণ তামাশায় পরিণত হয়েছে। গৌরবকে নিয়ে ওর প্রজেক্টের বাকী সবাই ভুলভাল কল্পকাহিনি বানাচ্ছে। ওর কামলালসা নিয়ে মিথ্যা রটনা রটছে। প্রতিটি মানুষের কাছেই যেন একরকমের ব্যাখ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবই কানে আসছে ন্যান্সির। একেকজন দেখা করতে আসে ন্যান্সির সাথে, আর অন্যের কল্পিত কাহিনি কথায় কথায় শুনিয়ে যায়। ন্যান্সির মনের কোমল প্রাচীরটাতে শক্ত কুঠারাঘাত করে। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মানুষেরা মুখ এতটাই নিষ্ঠুর একটা মৃত মানুষকে নিয়ে গল্প বানাতে পর্যন্ত থামে না। গৌরবের মৃত্যু রহস্যটা উদ্‌ঘাটন করাটা যেন ন্যান্সির চাইতেও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে বাকী লোকেদের।

একেকটা দিন পেরিয়ে যায়। মাস পেরিয়ে যায়। গৌরবের মৃত্যু রহস্য যেন অসমাধান হওয়া কেসগুলোর সাথে আরেকটা নতুন কেসের সংযোজন। মিডিয়াও ধীরে ধীরে থিতিয়ে পড়ছে। পুলিশ মিডিয়াও হাল ছেড়ে দিয়েছে। ন্যান্সিও ভুলতে বসেছে সবকিছু। গৌরবের চলে যাওয়া জীবনের সব চেয়ে বড় ক্ষতি। তবুও দুঃখকে বুকে চেপে বসে থাকার নতুন করে কোনও অর্থ খুঁজে পায় না ন্যান্সি। গৌরব চলে গেছে। কিন্তু তাকে তো বাঁচতে হবে।
হঠাৎ করে আসা একটা ফোন ন্যান্সির বুকে ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা। নতুন করে নড়ে চড়ে বসেছে ন্যান্সি।


“আমি জানি কে খুন করেছে আপনার হাজবেন্ডকে। আমার সাথে দেখা করুন অ্যামস্টারড্যাম ড্যাম স্কয়ারে। বড় দোলনাটার পাশে। সন্ধে সাতটা নাগাদ। পুলিশকে জানানোর চেষ্টা করলে তার ফল বিশেষ ভালো হবে না।”

“কিন্তু আপনি কে?” – কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল ন্যান্সি।

“আমি আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। আশাকরি আমাকে চিনতেও আপনার কোনও অসুবিধে হবে না।” – ফোনের অপর প্রান্তের লোকটির গলার স্বর অত্যন্ত ভারী এবং ঘন।

“কিন্তু আমি আপনার কথায় বিশ্বাস করব কেন?”

“বিশ্বাস করতে আপনি বাধ্য। নিশ্চয় আপনি ভুল করবেন না, আপনার স্বামীর প্রকৃত হত্যাকারী কে সেটি নিশ্চয়ই আপনি জানতে চাইবেন?”

ভয়ে কাঁপতে লাগল ন্যান্সি। কি হিংস্র লোকটি? একে তো খুন করেছে, অন্যদিকে থ্রেট করছে, পুলিশকে জানানো চলবে না। যে ব্যথা বেদনায় সময়ের ভারে চাপা পড়ে গিয়েছিল ন্যান্সির, তা পুনরায় জাগর দিয়ে উঠল।
অ্যামস্টেলভিন সেন্ট্রাম থেকে ট্রামে চেপে বসল ন্যান্সি। লেইড সেপ্লিন নেমে হাঁটা লাগাল ড্যাম স্কোয়ারের দিকে। গিজগিজে মানুষের ভিড় এই এলাকাটায়। রাস্তার পাশে একদল ছেলে মেয়েরা নাচানাচি করছে। ড্যাম স্কোয়ার অ্যামস্টারড্যাম এর ঐতিহাসিক এলাকা। সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে ৭৫০ মিটার দক্ষিণে অবস্থিত। অ্যামস্টেল নদীর উপর যে ওরিজিনাল ড্যাম ছিল তার কাছাকাছি। এই এলাকাটায় মাঝে মাঝেই সমস্ত রকমের ইভেন্ট বসে। মেলা হয়। সমস্ত মানুষেরা এখানেই মিলিত হয়। আজও মেলা বসেছে এখানে। অসংখ্য ফুডস্টল ও মজার রাইডে ভরপুর।

ড্যাম স্কয়ারে পৌঁছে ন্যান্সি এসে দাঁড়াল বড় দোলনাটার গেটটার কাছে। ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় সাতটা। পিছন দিক থেকে একটা হাত এসে পড়ল ন্যান্সির কাঁধের উপর। চমকে উঠল ন্যান্সি।

“হ্যালো, আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন নিশ্চয়?”

লোকটির মুখের দিকে তাকাল ন্যান্সি। একটা হিমশীতল করা শিরশিরানি মেরুদণ্ড বরাবর নেমে এলো নিচের দিকে। “আপনি এখানে?”

“চিনতে পারছেন নিশ্চয়ই?” – একগাল হেসে লোকটি জানাল। তারপর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “আমরা কি দূরে ওই জায়গাটাই গিয়ে বসতে পারি। তারপর কফি খেতে খেতে গল্প করা যেতে পারে।”

ন্যান্সি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল। তারপর দুজনে মিলে হাঁটতে লাগল। লক্ষ্যস্থলটার দিকে। কিছুটা হেঁটে আসার পর, অ্যামস্টেল নদীর ধারটায় পেতে রাখা বেঞ্চের ধারটায় বসল দুজনে। পাশাপাশি। সামনের কফি শপ দেখে দুটো ক্যাপোচিনো ও ফ্রাইস আনতে গেল লোকটি। এতটা সময় ন্যান্সি নিস্তব্ধ। পাথরের মতো বসে। কোনোদিন ভাবতেও পারেনি এইভাবে লোকটির সাথে পুনরায় দেখা হবে ওর।

বার্সেলোনার সেই অদ্ভুত সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেল ন্যান্সির। শুক্রবার। অফিস ছুটির পরই গৌরবের ফোন এলো, “ন্যান্সি, রেডি হয়ে থেকো। তোমাকে দারুণ জায়গায় নিয়ে যাব আজ।”

“দারুণ জায়গা? সেটা আবার কোথায়?”

“তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। উই উইল মেক আনথিঙ্কেবেল ফান!” – গৌরবের গলার স্বরছিল ভীষণ রকমের রোমাঞ্চিত।

“ক’টার সময় বেরোবে? ডিনার করবে তো ফিরে এসে?”

“নো হানি? আমরা সাতটা নাগাদ বেরোব। আর বাইরেই খেয়ে নেব আজকে।”

“এনি হিন্টস? এইরকম উৎসব, উৎসব মেজাজ?”

“আজ এক আজব গেম খেলব আমরা। অদ্ভুত গেম। বার্সেলোনায় এতদিন থাকার পর এই গেম না খেললে, জীবনে একটা অতৃপ্তি থেকে যাবে ডিয়ার।”

“ও রিয়েলি? আমার কিন্তু ভীষণ রকমের থ্রিল হচ্ছে।”

সাতটার মধ্যে রেডি হয়ে গৌরব আর ন্যান্সি বের হল। দারুণ সুন্দর লাগছে দুজনকেই আজ। গৌরব পরেছে ক্যাজুয়াল পার্টি উইয়ার। ন্যান্সিও বেশ খোলামেলা। চোখের পাশটায় হালকা করে আকাশি নীল কাজল টেনে নিয়েছে। গোল গোল নরম গাল দুটোর উপর লাগিয়েছে হালকা আপেল রং। ঠোঁটে ঘষেছে লাল পোশাকের সাথে ম্যাচ করে চড়া লাল রঙের লিপস্টিক।

সাড়ে সাতটার মধ্যে ওরা এসে ঢুকল পাবে। ঘরের ভেতরটায় হালকা নীল আলো। স্টেজে উঠে নাচানাচি করছে কিছু কাপল। গৌরব ও ন্যান্সি এসে বসল একটি টেবিলে। ধীরে ধীরে নেশায় বুঁদ হয়ে উঠতে লাগল দুজনেই। শরীর কাঁপছে। তবুও হাল ছাড়ছে না কেউ-ই। কিছু সময়ের পর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল দুজনে। আরও জনা পঁচিশ কাপলস আগে থেকেই ছিল ওখানে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একে অপরের পার্টনার চেঞ্জ হয়ে গেল। খুপরির মত কামরায় ঢুকে গেল প্রত্যেকে। এই মজার গেমটার নাম হল “সেক্স রুলে”।


কোনও হুঁশ এর মধ্যে নেই ন্যান্সি আজ। নইলে এই ঘৃণ্য শরীরী খেলায় কিছুতেই সম্মতি দিত না সে। এই সেক্স পার্টির চক্করেই সেইদিন এই লোকটাকে শরীর দিতে হয়েছিল ন্যান্সির। সারারাতে কতবার যে ভোগ করেছিল, তার খেয়াল নেই। এই ঘটনার পর থেকে তিন দিন পুরো ঘোরের মধ্যে ছিল ন্যান্সি। ডিপ্রেশনের তীব্রতা ছিল ভয়ঙ্কর। গৌরবের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারত না সে। মনে হত অজান্তেই যে পাপের বোঝা তার শরীরে এসে বাসা করেছে। একদিন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব কিছু শেষ করে দেবে।

কফি নিয়ে ফিরে এলো লোকটি। কয়েকবার ডাকার পরও সাড়া পায় নি ন্যান্সির। অবশেষে স্পর্শ করায় ভাবনার ঘোর থেকে ফিরে এলো সে।

“প্লিজ, সেই দিনের ঘটনার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি।” লোকটি দুঃখের সাথে বলল।

“ক্ষমা?”

“জানি কোনোদিন আপনি ক্ষমা করতে পারবেন না আমায়। তবুও বলছি পুরো ব্যাপারটার নিয়ম এইরকমই?”

“কি নিয়ম জানতে পারি?”

“ওই সেক্স রুলে গেমটার মধ্যে এমন একজন লুকিয়ে থাকবে যার শরীরে বাসা বেঁধেছে এইডস এর মতো মারণ যৌনব্যাধী।”

“এই মারণ রোগটা আমার শরীরে পৌঁছে দিয়ে আপনি ক্ষমা চাইতে এসেছেন, আপনার সাহস তো কম নয়?”

“আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কারণ নিশ্চয়ই আছে। ওই রাতেই আমার দ্বিতীয় বারের জন্যে সেক্স রুলেতে অংশগ্রহণ। তখনও জানতাম না, প্রথম গেমেই অন্য আরেকটি মহিলার কাছ থেকে এই রোগটি আমার দেহে ছড়িয়ে পড়েছে।”

“আপনার সাথে এইসব আলোচনা করার জন্যে আমি এখানে আসি নি, সেটা আপনি ভাল করেই জানেন ” ন্যান্সি উত্তেজিত হয়ে বলল।

“আপনার স্বামীর খুনি সম্পর্কে জানতে চান, তাই তো?”

“হ্যাঁ, সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য?”

“তবে আর কথা না বাড়িয়ে বলে ফেলাই ভালো। আপনার স্বামী গৌরবের একই অ্যাপার্টমেন্টই আমি থাকতাম। আপনাকেও দেখেছি বহুবার। কিন্তু অপরাধ বোধের জন্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম আপনার সামনে থেকে।”

“আপনি খুনি সম্পর্কে কি জানেন বলুন।”

“১৫ ই সেপ্টেম্বর সেই রাতে কিছু সময়ের জন্যে লোড শেডিং হয়। অ্যাপার্টমেন্ট এর সি.সি.টিভি সব বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময়েই বোরখা পরা এক মহিলা ঢুকে যায় আপনাদের ঘরে।”

“তারপর?”

“সন্দেহের বসে আমি অনুসরণ করি তার পিছু পিছু। রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা সমস্ত সীন শেষ করে পুনরায় বেরিয়ে যায়। সেইসময় হঠাৎ-ই কারেন্ট চলে আসে। একঝলক আমি সেই মুখ দেখে ফেলি।”

ন্যান্সির গা হাত পা কাঁপছে। ভালো মত বসে থাকতে পারছে না সে। ন্যান্সির হাত দুটো চেপে ধরল লোকটি। তারপর ধীর এবং শান্ত গলায় বলল, “ভয় পাবেন না প্লিজ। আমি চাইলে বহু আগেই আপনাকে পুলিশে দিতে পারতাম।”
ন্যান্সির চোখ থেকে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসা একনদী জল কান্নার আকারে বেরিয়ে আসতে থাকল। মাথার উপর হাতটাকে রাখল লোকটি। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “আপনি খুন করতে গেলেন কেন?”

“সেক্স রুলের সেই পার্টির পর থেকেই আমার শরীর খারাপ করতে থাকে। গৌরব আমার সাথে ঠিক মত কথা বলতে চাইত না। যেন সমস্ত অপরাধ আমার। পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে যখন আমার রক্তে এইচ.আই. ভি পজিটিভ পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। আমাকে নেদারল্যান্ড এর বাড়িটাতে একা থাকতে বলে। এই তীব্র অনীহা, আমার প্রতি ঘৃণা আমাকে হিংস্র করে তোলে। আমি স্ব-ইচ্ছায় ওই পার্টিতে যাইনি। গৌরব সেইদিন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমায় জানায় নি, কি পার্টি? কি তার বৃত্তান্ত? যে অপরাধ বোধ ওর হাত ধরে এসে আমাকে শেষ করে দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করায় খুন করার তীব্র স্পৃহা জেগে ওঠে আমার শরীরে।”

“খুন করার ওই দিনটাই বেছে নিলেন কিভাবে?”

“আগের দিন গৌরব ফোন করে জানায়, ওই রাতে ওই সময় টাতে লোড শিডিং থাকবে কিছুক্ষণ। তাই খুব তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে আমি স্পেনে চলে যাই। রাতের ওই অন্ধকারে সবকিছু শেষ করে, পরের ফ্লাইটেই ফিরে আসি অ্যামস্টারড্যাম।” কান্নায় ভেঙে পড়ল ন্যান্সি।

“আপনি ভুলে যান সব কিছু। আপনার স্বামীর এই চলে যাওয়া একটা কঠিন রহস্য। কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না, সেই সত্যটুকু।”

ন্যান্সি মনে মনে ভাবতে থাকে, আরও এক ঘটনার কথা। জেন এর ছবি দিয়ে সোসাল মিডিয়ার আকাউন্টটা ও নিজেই বানিয়ে ছিলো, সবাইকে বিভ্রান্ত করার জন্যে । গৌরবের সাথে ওই সব চ্যাট করেছিলো জেনে বুঝে, পুরোটাই প্ল্যান মাফিক। এই সত্যটাও কেউ জানতে পারবে না কোনদিন।

অনেকটা রাত হয়েছে। মাথার উপর জেগে রয়েছে একফাঁলি কাস্তের মতো চাঁদ। সেই চাঁদের দিকটায় একমনে চেয়ে আছে ন্যান্সি। দেখছে কতগুলো তারা খসে পড়ছে মাথার উপর। মহাবিশ্ব থেকে খসে পড়া প্রতিটি উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়। কেউ জানে না সেইসব হারিয়ে যাওয়া। গৌরবের মৃত্যুটাও যেন এক অজানা নক্ষত্র পতন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *