ছোটোগল্প

মরণের হাতছানি

অনন্যা দাশ

লিডিয়ার সঙ্গে আমার আলাপ বেশ নাটকীয় ভাবে হয়েছিল সেটা বললে ভুল হবে না। সেদিন ছিল একটা প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির রাত। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল, সঙ্গে বজ্র বিদুৎ। পরদিন অফিসে দরকারি মিটিং না থাকলে আমি হয়তো সৌভিকদের বাড়িতেই আরেক রাত থেকে যেতাম। সৌভিক আর রিমা বারণ করছিল ওই রকম দুর্যোগের রাতে বেরোতে।

“কাল সকাল সকাল বেরিয়ে গেলেই তো হয়,“ সৌভিক বলতে চেষ্টা করল।     

আমি গাড়িতে সুটকেসটাকে তুলতে তুলতে ওকে বললাম, “সকাল আটটায় মিটিং, তার মানে এখান থেকে অন্তত সকাল পাঁচটায় বেরোতে হবে যদি কিছুটা সময় হাতে নিয়ে পৌঁছতে চাই তাহলে। সেটা আমার কাছে বজ্র বিদ্যুতের মধ্যে গাড়ি চালানোর চেয়েও অনেক বেশি কষ্টকর।“    

এই বলে বেরিয়ে পড়লাম প্রবল বৃষ্টি আর ঝড় মাথায় নিয়ে। হাইওয়ে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখলাম জলের ঝাপটা অনেক বেশি। বিরাট পাহাড় প্রমাণ ট্রাকগুলো যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছে তখন বিশাল জলরাশি আমার ওপর ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে তাই ঠিক করলাম লোকাল রাস্তা দিয়েই যাব। ফোনের সিগনাল রয়েছে তখনও তাই জি পি এসের শরণাপন্ন হলাম। আমাকে যে রাস্তাটা দেখালো জি পি এস সেটা ধরার জন্যে হাইওয়ে থেকে একজিট নিয়ে সেই রাস্তায় ঢুকলাম। তখন অবশ্য বুঝিনি যে ওই একটা সিদ্ধান্তের জন্যে আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে।   

ব্ল্যাকবার্ড লেন একটা সরু পাহাড়ি রাস্তা। দু পাশে প্রচুর গাছ, প্রায় জঙ্গলের মতন লাগছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। এই সব এলাকা্র রাস্তায় প্রায়ই হরিণ বেরোয় আমি জানি। অন্ধকারে হরিণকে মারলে সে তো মরবেই আর আমার গাড়িও নষ্ট হবে। প্রাণী অবশ্যই মারতে চাই না আমি আর এই রকম দুর্যোগের দিনে গাড়ি অকেজো হয়ে গেলে সেটা আরেকটা কেলেঙ্কারি হবে তাই আমি খুব সাবধানে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। বৃষ্টি পড়ে চলেছে ঝমঝমিয়ে। আমার গাড়ির ওয়াইপারগুলো একবার কাচ পরিষ্কার করে ফিরে আসতে যে টুকু সময় লাগছে তার মধ্যেও আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ মনে হল রাস্তার মধ্যিখানে সাদা কী একটা দেখলাম। আমি প্রাণপণে ব্রেকে পা দিলাম। গাড়ি বেশ আস্তেই চলছিল কিন্তু তাও বৃষ্টির জন্যে রাস্তা এত পিছল যে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে তারপর ব্রেক ধরল। ততক্ষণে যে সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আমি গাড়ি নিয়ে তার খুব কাছে চলে এসেছি। কার এই রকম আত্মহত্যা করার ইচ্ছে রে বাবা? আর যা করার করুক কিন্তু আমার গাড়ির সামনে কেন রে বাবা? খুব রাগ হল আমার। আমি গাড়ির দরজা খুলে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে হেডলাইটের আলোয় দেখলাম সামনে একটা অল্প বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার মাঝখানে। একটা রেন কোট পরে রয়েছে সে তবে তাতে কিছু লাভ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে ঝোড়ো কাক হয়ে গেছে সে। ছোটোখাটো চেহারা,  বেশ ভয় পেয়ে আছে মনে হচ্ছে।    

আমি রেগে গিয়ে চিৎকার করে বললাম, “কী ব্যাপার? আত্মহত্যা করার খুব শখ হয়েছে নাকি? আর শখ হয়েছে তা হোক কিন্তু আমার গাড়ির নিচে পড়ে মরলে তো চলবে না। আমি তো সেটা হতে দেব না।“  

মেয়েটা মিনমিন করে কী একটা বলল আমি শুনতে পেলাম না। আবার চিৎকার করে বললাম, “কী বলছো?”

মেয়েটা এবার একটু জোরে বলল, “আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে এই বৃষ্টির মধ্যে। দুর্যোগের এই রাতে ফোনের সিগনালও নেই। আপনার গাড়িতে লিফট পাওয়া যাবে লোকালয় পর্যন্ত?” 

এই রকম অবস্থায় পড়লে অন্য কেউ হয়তো ভয় পেয়ে যাবে । কেউই লিফট দিতে চাইবে না একজন উটকো অচেনা মেয়েকে কিন্তু আমি না করলাম না। কেন করব? আমি তো পুলিশে কাজ করি। এটাই তো আমাদের কাজ। মেয়েটার ফোনটায় যদি সিগনাল পাওয়া যেত তাহলে তো সে প্রথমেই আমাদের ডাকত তাকে উদ্ধার করার জন্যে। আমি বিপদকে ভয় পাই না। আমার গাড়িতে আমার সার্ভিস রিভল্ভার আছে। অনেক রকম প্রশিক্ষণও নিয়েছি আমি। ওই একরত্তি মেয়ে আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।  

আমি বললাম, “ঠিক আছে চলে এসো। কোথায় নামবে আমাকে বললে আমি সেখানেই নামিয়ে দেব।“ 

মেয়েটা জবজবে ভিজে জামাকাপড় নিয়ে আমার গাড়িতে উঠে এসে বসল। পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক। আমার এবার একটু বিরক্তি লাগল। গাড়ির সিটগুলো ভিজে ঢোল হয়ে যাবে। যাক কী আর করা যাবে। তবে একটু আশ্চর্যও লাগছিল। আমি না হয় পুলিশ তাই আমার ভয় নেই কিন্তু মেয়েটা? মেয়েটার কোন ভয় নেই কেন? আমি জানি আমি কারো কোন ক্ষতি করব না, পুলিশ না হলেও করতাম না, সেটা আমার ধাতেই নেই। কিন্তু মেয়েটা তো আর সেটা জানে না। ও তো দেখছে একটা লম্বা চওড়া ষন্ডামার্কা লোককে। সেই লোক তো ওর যে কোন ক্ষতি করতেই পারে। যাই হোক ওই সব ভেবে কাজ নেই। কার কী সমস্যা তো জানি না। আমি গাড়ির রেডিওতে গান চালিয়ে দিলাম। মেয়েটা একটু ক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর গানের সঙ্গে গলা মেলালো। ওই রকম গানের গলা আমি কারো শুনিনি। আমি রেডিওটা অফ করে দিলাম। মেয়েটা খালি গলায় গেয়ে চলল। আমি মন্ত্র মুগ্ধের মতন শুনছিলাম। কী গলা! ওর ‘এভরি নাইট আই সি ইউ’ সিলিন ডিয়নের গানটাকেও হার মানাচ্ছিল!   

আমি যেন অটো পাইলটে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। গান থেমে যেতে আমি মেয়েটাকে বললাম, “তুমি তো অসাধারণ গাও!”

মেয়েটা একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, “আপনাকে একটা কথা বলব?“
আমি বললাম, “হ্যাঁ, বলো। তবে আগে তোমার নামটা বলো।“

মেয়েটা বলল, “আমার নাম লিডিয়া।“   

“আচ্ছা লিডিয়া, বলো কী বলতে চাইছিলে।“

মেয়েটা মাথা নিচু করে বলল, “আমার গাড়ি আসলে খারাপ হয়নি।“

আমি বললাম, “অ্যাঁ!”

“হ্যাঁ। আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছি।“

“হুঁ, তা বয়স কত তোমার?”

“২১ হয়েছে গত মাসে।“

“তাহলে তো সমস্যা নেই। তুমি প্রাপ্তবয়স্ক।“

লিডিয়া বলল, “হ্যাঁ। বাবার শরীর খারাপ ছিল তাই এতদিন ওই বাড়িতে ছিলাম বাধ্য হয়ে। বাবা তিন মাস হল গত হয়েছেন। সৎ মা আমার ওপর যাচ্ছেতাই অত্যাচার করছিল তাই আর থাকতে না পেরে এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যেই পালিয়েছি।“

আমি বললাম, “হুঁ!”

লিডিয়া এবার বলল, “আপনি আমাকে একটা কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?”

আমি একটু ভেবে বললাম, “আমি তো মরিসটাউনে থাকি। সেখানে একটা ওয়াই ডাব্লু সি এ আছে যেখানে অনেক মহিলারা থাকে।“

“হ্যাঁ, দারুণ হবে।“

“তবে একটা মিনিমাম ভাড়া তো আছে ওদের। তোমার কাছে সেটা দেওয়ার মত কিছু আছে?”

লিডিয়া বলল, “হ্যাঁ, কিছু আছে। অনেক দিন ধরে জমাচ্ছিলাম এই দিনটার জন্যে। কয়েক মাস চলে যাবে আশা করি। তত দিনে কিছু একটা রোজগারের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব আশা করছি। “

“কী করার পরিকল্পনা?”

লিডিয়া অল্প হেসে বলল, “গান শোনাবো লোকেদের।“

আমি বললাম, “ও আচ্ছা। ওই গলা নিয়ে তো চাকরি অনায়াসেই পেয়ে যাওয়ার কথা। তবে আমি সেই ব্যাপারেও সাহায্য করতে পারি। আমি একজনকে চিনি। তার একটা রেস্তরাঁ কাম বার আছে। কিছুদিন আগে সে বলছিল তার ওখানে যে গাইত সে ছেড়ে দিয়েছে। সে যদি কাউকে না পেয়ে থাকে তাহলে আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখব। মাইনে হয়তো বিশাল কিছু নয় কিন্তু কাজ চালাবার মতন হয়ে যাবে।“

মেয়েটার মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল, সে বলল, “তাহলে তো দারুণ হবে।“  

আনন্দে আবার গান গাইতে শুরু করল লিডিয়া। আমি আচ্ছন্ন হয়ে ওর গান শুনছিলাম। আমার দেহ মন সব অসাড় হয়ে যাচ্ছিল যেন।

মরিসটাউন পৌঁছে লিডিয়াকে ওয়াই ডাব্লু সি এ তে নিয়ে গেলাম। তখন বৃষ্টিটা ধরেছে, যদিও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। বেশ রাত হয়েছিল কিন্তু ফ্রন্ট ডেস্কে আমার চেনা মহিলা ছিলেন তাই লিডিয়ার জন্যে ঘর পেতে অসুবিধা হল না।

লিডিয়া আমাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ম্যাট্রন মহিলার সঙ্গে ঘরে চলে গেল। আমিও গুটি গুটি পায়ে নিজের বাড়ির দিকে এগোলাম। ফোনে সিগনাল ফিরে আসতে পিং পিং করে মেসেজ ঢুকতে লাগল।

আমি বাড়ি ফিরে দু স্লাইস পিজা গরম করে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ার জন্যে তৈরি হলাম। তখন রাত একটা বাজে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে কেবল স্মৃতিকে লিখলাম, “আমি ঠিকঠাক ফিরে এসেছি। শুতে যাচ্ছি এখন। আগামীকাল সকালে জরুরি মিটিং আছে। পরে সব বলব।“ 

(২)

পরদিন মিটিংয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারলাম সেটাই ভাগ্য ভালো। আমাদের বসের বস এসেছিলেন আমাদের কিছু জ্ঞান দিতে। শুনতে শুনতে যে ঘুমিয়ে পড়িনি সেটাও বিশাল ব্যাপার।  

বিকেলে লিডিয়াকে নিয়ে অক্টোপাসে গেলাম জেকের সঙ্গে দেখা করাতে। জেক অক্টোপাস বার কাম রেস্তরাঁর মালিক। আজ লিডিয়াকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না যে গতকাল ওর ওই রকম জলে ডুবে যাওয়া ইঁদুরের মতন দশা ছিল। আজ একটা ঝলমলে জামা আর মেক আপ তাকে রীতিমত সুন্দরী করে তুলেছে। 

জেক সব শুনে আমাকে বলল, “না এখনও কাউকে পাইনি,“ বলে লিডিয়ার হাতে একটা মাইক ধরিয়ে দিয়ে বলল,”মিউজিক সিস্টামটা ওই দিকে। যদি লোকে গল্প করা ছেড়ে তোমার গান শোনে তাহলে এই চাকরিটা তোমার।“

লিডিয়া আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালো। আমি হেসে বললাম, “দেখিয়ে দাও ওদের তুমি কী রকম গাইতে পারো।“

তখন বার আর রেস্তরাঁ পুরোপুরি ভর্তি হয়নি কিন্তু আবার খালিও বলা চলে না বেশ কিছু লোকজনই রয়েছে দেখলাম। আসলে যত রাত বাড়ে তত ভিড় বাড়ে এখানে।  

লিডিয়া ইতস্তত পায়ে এগিয়ে গেল মিউজিক সিস্টেমটার দিকে। মাইকটাকে মুখের কাছে নিয়ে গেল। ওর দিকে কেউ দেখছিল না।

সে গাইতে শুরু করল। এই গানটা আমি আগে কখনও শুনিনি। ‘উইল ইউ লাভ মি ফরেভার মাই ডার্লিং’ জাতীয় কিছু একটা গান। ওর গলা যখন চড়তে শুরু করল তখন সবাই মদ খাওয়া ভুলে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। গান শেষ হতে জেক আমাকে বলল, “ওরে বাবা! এ তো আমেরিকাস গট ট্যালেন্টে গাওয়ার মতন গলা। এ আমার বারে কেন? এ তো বেশিদিন এখানে থাকবে বলে মনে হয় না।“

আমি বললাম, “যত দিন থাকবে তত দিন তোমার লাভ। এখন তো কোন গায়ক নেই তাই ও থাকুক। ওর আসলে অর্থের দরকার। বাড়ি ভাড়া, খাবার দাবারের জন্যে। আপাতত যে চাকরি পাওয়া যায় তাইই নেবে ও।“

জেক বলল, “ঠিক আছে।“  

আমি লিডিয়াকে জেকের সঙ্গে কথা বলার জন্যে ছেড়ে দিয়ে অক্টোপাস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমি এখানে থাকলে লোকজন অস্বস্তি বোধ করে। স্মৃতির বাড়িতে যেতে হবে। ও আমার আর এক রেস্কিউ। এক বছর আগে স্মৃতিকে আমি আর আমার পার্টনার জোসি মিলে একটা খারাপ অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছিলাম। স্মৃতির বাড়িতে যাওয়ার আমার আকর্ষণ হল ওর তিন বছরের কন্যা জিয়া। সে আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে আর আমারও জিয়াকে কিছুদিন না দেখলে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে। স্মৃতিকেও আমার মন্দ লাগে না তবে সে একটা খারাপ সম্পর্কের বেড়াজাল কাটিয়ে উঠেছে আবার কারো সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চাইবে কিনা বুঝতে পারি না।  আপাতত আমরা ভালো বন্ধুর মতন মিশি। তাই জিয়াও আমাকে ফ্রেন্ড বলেই ডাকে।  

লিডিয়াকে নিয়ে আসার পর দু সপ্তা কেটে গেছে। আমি মাঝে মাঝে সাদা পোশাকে জেকের বারে গিয়ে লিডিয়ার গান শুনে আসি। অদ্ভুত এক আকর্ষণ আছে ওর গানে।

গতকাল সোমবার ছিল। তা দুপুরবেলা জেক হঠাৎ ফোন করল।

আমি বললাম, “কী ব্যাপার? হঠাৎ কী মনে করে?”

জেক কখনও আমাকে ফোন করে না। আমিই করি। সোমবার দুপুর মানে এমনিতেও ওর মধ্যরাত।

জেক ভণিতা না করেই বলল, “কাল রাতে তোমাকে ডেকে ফেলছিলাম প্রায়।“

আমি বললাম, “মানে? অক্টোপাসে কিছু গন্ডগোল হয়েছিল নাকি?”

“হুঁ। লিডিয়ার গান শুনে একজন কাস্টমার পাগল হয়ে গিয়েছিল। লিডিয়াকে প্রেম নিবেদন করবেই! সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা।“

আমি হেসে ফেললাম, “আচ্ছা, তাই নাকি? তারপর?”

“তারপর আর কী? একটু বেশি মদ খেয়ে ফেলেছিল। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারছিল না। অন্য আরেকজনের সঙ্গে লাঠালাঠি লাগার জোগাড়। শেষে গ্যারি লোকটাকে বার থেকে বার করে দিতে সব শান্ত হল।“

গ্যারি হল জেকের রাঁধুনি কাম ওয়েটার কাম সব কিছু। বিশাল চেহারা তার। রান্না না করলে বডিগার্ডের চাকরি অনায়াসেই পেয়ে যেত। বারে কেউ কিছু হাঙ্গামা করলে গ্যারি এসে সামলে দেয়।

আমি বললাম, “তাহলে আর কি? সব তো ঠিকই আছে।“

জেক বলল, “আমার ভিতরের আইরিশ লোকটা বলছে লিডিয়ার অন্য নাম বিপদ। আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি। যদিও ও আসার পর থেকে আমার বারে ভিড় বেড়ে গেছে।“

আমি এবার কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, “তাতে বুঝি তোমার মন ভরছে না? আরে বাবা কিছুদিনের তো ব্যাপার। ও নিজেকে একটু সামলে নিক তারপর নিজেই বেশি অর্থের খোঁজে অন্য কোথাও চলে যাবে। ওই রকম গলা নিয়ে এই ছোটো জায়গায় পড়ে থাকবে বলে মনে হয়? আপাতত বাড়ি থেকে পালিয়েছে তাই একেবারে চার্চের ইঁদুরের মতন গরিব অবস্থা।“

জেক শুধু বলল, “হুঁ। তবে ও যখন গান গায় তখন বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটা শুরু হয়ে যায়। শুধু আমার নয় আরও অনেকেরই।“

আমি তাই শুনে হা হা করে হাসলাম আর জেক ফোন রেখে দিল।

বিকেলবেলা স্মৃতি ফোন করে বলল, “আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। খুব মাথা ধরেছে কিন্তু জিয়াকে নিয়ে ঘুমোতেও পারছি না। ওকে দুঘন্টা মতন রাখতে পারবে? তাহলে আমি একটু ঘুমোতে পারব।“

আমি বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ।“

জিয়াকে নিয়ে এলাম। পার্কে গেলাম আমরা। দোলনায় চড়তে জিয়া খুব ভালোবাসে। খালি ‘মোর, মোর’ করে। কিছুতেই নামবে না। শেষে আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে নামাতে হল। আইসক্রিম খেয়ে ক্লান্ত জিয়া গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি একটা ইন্ডিয়ান দোকান থেকে খাবার কিনে ওকে ওর বাড়িতে নামিয়ে দিতে গেলাম। 

বেল বাজাতে স্মৃতি দরজা খুলল। আমি জিগ্যেস করলাম, “কী ঘুম হল?”

আমার কোল থেকে জিয়াকে নিয়ে সে হেসে বলল, “হ্যাঁ, হয়েছে। আসলে মাইগ্রেনের যন্ত্রণা তো। একেবারে পাগল করে দেয়।“

আমি খাবারের ব্যাগটা টেবিলে নিয়ে গিয়ে খাবারগুলো বার করে করে সাজাতে লাগলাম। খাবার দেখে স্মৃতি বলল, “বাহ, তুমি খাবারও নিয়ে এসেছো! তুমি না থাকলে আমাদের যে কী হত।“

একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন রাত এগারোটা বাজে। ভোর পাঁচটায় ফোনটা এল।

আমার বস মাইকের ফোন, না ধরে উপায় নেই। তলব করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কী আর করা যাবে পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছি যখন।

হলও তাই, মাইক বলল,“পাইক্স বিচে আসতে হবে। একটা বডি ভেসে এসেছে। জোসিও আসছে।“

আমি যখন পৌঁছলাম তখন ভালোই আলো হয়ে গেছে। বালির ওপর পড়ে রয়েছে মৃতদেহটা। আমাদের লোকজন ছবি তুলতে ব্যস্ত। লোকটা জামাকাপড় জুতো মোজা সব পরে রয়েছে।

জোসি বলল, “বাবা, এতক্ষণে আসার সময় হল!”

আমি বললাম, “কী ব্যাপার?”

“মেডিকেল এগজামিনার বলেছেন ডুবে মৃত্যু। “

আমি বললাম, “সুট টাই জুতো পরে জলে নামতে গেল কেন? বিচে যারা আসে তারা তো অন্য রকম পোশাকে আসে।“

জোসি বলল, “মৃত্যুর সময় রাত একটা থেকে চারটে বলছেন। ওই সময় কে আসবে বিচে?”

“লোকটার নাম জানা গেছে?” আমি চারিদিকে দেখতে দেখতে বললাম। কোন ক্লু বা কিছুই চোখে পড়ল না।

“হ্যাঁ, আই ডি ছিল পকেটে। নর্ম্যান বিশপ। একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে ওর। দেখি ওর সঙ্গে যারা কাজ করত তাদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলতে হবে। লোকটা একাই থাকত। বউয়ের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে বছর পাঁচেক আগে।“

“ও বাবা এই খবর আবার কে দিল?”
জোসি বলল, “কারসনের সঙ্গে ওর চেনা শোনা ছিল। ওর এজেন্সি থেকে টিকিট কাটে বলল।“

কার্সন আমাদের পুলিশ ফটোগ্রাফার। মিডিয়ার লোকজন আসতে শুরু করেছে খবর পেয়ে। জোসি মুখ ভেঁচকে বলল, “এবার সার্কাস শুরু হয়ে যাবে। আমরা কেটে পড়ি। এম ই বললেন আত্মহত্যা হতেই পারে। কোন রকম ধস্তাধস্তি বা কিছুর চিহ্ন নেই। শুধু জলে ডুবে মৃত্যু। হয়তো হতাশায় ভুগছিল, কে জানে।“

নটা নাগাদ জেকের ফোন এল, আমি ধরে বললাম, “বাবা দুদিনে দু বার! আমাকে তো লটারির টিকিট কাটতে হবে মনে হচ্ছে!”

জেক গম্ভীর স্বরে বলল, “ইয়ার্কি ছাড়ো। খবর দেখেছো?”

“কোন খবর?”

“ওই যে বিচে মৃতদেহ পাওয়া গেছে।“

“আমাকে খবর দেখতে হয় না। আমি তো মৃতদেহটাকেই দেখেছি। কেন?”

জেক বলল, “আরে এই লোকটাই সেদিন আমার বারে লিডিয়াকে প্রেম নিবেদন করার জন্যে ব্যাকুল হচ্ছিল!”

“ও বাবা তাই নাকি!”   

“হ্যাঁ। রবিবার দিন আমার বারে লিডিয়াকে প্রোপোজ করছিল আর আজ নেই! গ্যারি একেই বার থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। নর্ম্যান বিশপ।”

আমি ঘটনাটার সম্পর্কে কী বলেছিল জেক সেটা মনে করার চেষ্টা করলাম, “তুমি বলেছিলে না আরেকজনের সঙ্গে নর্ম্যানের ঝগড়া হয়েছিল। কে সে?”

“জো গ্রিন। সেও অকর্মার ঢেঁকি। বারে প্রচুর বিল বাকি আছে তার। দাম দিতে বললেই তার যত রাগ বেরিয়ে আসে।“

“ও রাগী মানুষ। তার মানে সেও নর্ম্যানকে মেরে থাকতে পারে। তবে ধস্তাধস্তির কোন চিহ্ন নেই এম ই বলেছেন। এমনও হতে পারে কোন কিছু খাইয়ে আগেই অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছিল। তাহলে তো আর বাধা দিতে পারবে না।“

জেক বলল, “কী জানি আমার কেমন একটা লাগছে। আমি বলেছিলাম না আমার মন বলছে লিডিয়ার আরেক নাম বিপদ!”

আমি বললাম, “যা বাবা, লিডিয়া আবার কী করল?” 

 কিন্তু ততক্ষণে জেক ফোন ছেড়ে দিয়েছে।

সারাদিনটা জিজ্ঞাসাবাদ আর কাগজপত্র সামলাতে সামলাতেই গেল। নর্ম্যান বিশপের ট্র্যাভেল এজেন্সিতে গিয়ে সবাইকে প্রশ্ন করলাম আমি আর জোসি সারাদিন ধরে কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। আমি জোসিকে জেকের বারে নর্ম্যান আর জো গ্রিনের ঝগড়ার কথাটা বললাম। জোর ফোনে মেসেজও রাখলাম আমরা কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না।

শেষে আটটা নাগাদ বাড়ি ফেরার পথে জোসি বলল, “চল একবার জোর বাড়িতে ঢুঁ মেরেই আসি। যদি পাওয়া যায় তাকে।“

জোর বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম সব অন্ধকার। সামনের দরজায় লক ছিল কিন্তু পিছনের দরজা অর্থৎ ব্যাকডোর দেখলাম খোলা। আমরা ভিতরে ঢুকে দেখলাম জোর বাড়ির অবস্থা বেশ খারাপ। চারিদিকে মদের বোতলের ডাঁই। আধ খাওয়া পিজা প্যাকেটে প্যাকেটে পড়ে রয়েছে। জামাকাপড় চারিদিকে ছড়ানো। পচা খাবারের গন্ধ, একেবারে বিশ্রী অবস্থা। কিন্তু জোর দেখা নেই।

জোসি বলল, “পাখি উড়ে গেছে মনে হচ্ছে। লোকটা গেল কোথায়? দেখি এয়ারপোর্ট স্টেশান ইত্যাদিতে খবর পাঠাই।“

আমি বললাম, “গ্যারেজ রয়েছে কিন্তু গ্যারেজে গাড়ি নেই। মনে হয় গাড়ি নিয়েই গেছে যেখানেই গেছে।“  

জোসি বলল, “হুঁ!”

(৩)

এই ভাবেই চারদিন কেটে গেল। নর্ম্যান বিশপের মৃত্যুর কোন কিনারা করতে পারিনি আমরা এখনও। জো গ্রিনেরও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি তবে ওর গাড়িটা একটা দোকানের পার্কিং লটে পার্ক করে রাখা ছিল। এদিকে এম ই পোস্ট মর্টেম করে বলে দিয়েছেন যে নর্ম্যান বিশপের মৃত্যু জলের ডুবেই হয়েছিল। পেটে অ্যালকহল ছিল কিন্তু ততটাও নয়। লোকটা কি তাহলে আত্মহত্যা করল? এটা ঠিক যে ওর ট্র্যাভেল বিজনেস খুব একটা ভালো চলছিল না কিন্তু তা বলে…

সেদিন দুপুরে জো গ্রিনের দেহটা অন্য একটা সমুদ্র সৈকতে ভেসে উঠল। সেই একই রকম অবস্থায়। সমস্ত জামা কাপড় পরা। গায়ে আঘাতের কোন চিহ্ন নেই। ব্যাপারটা ভীষণ আশ্চর্যের মনে হচ্ছিল আমাদের। হঠাৎ দুটো লোক এই ভাবে আত্মহত্যা করবে কেন? 

রাত একটায় যখন বাড়ি ফিরলাম তখন আর কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। এই কদিনের হতাশা, কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা আমাকে ভীষণ ক্লান্ত করে দিয়েছিল। আমি ফোন অফ করে শুয়ে পড়লাম। কেউ ফোন করলেও আমি যেতে পারব না জানতাম। শরীর চলছিল না আর। 

পরদিন সকাল আটটায় যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন অনেকটা মানুষের মতন লাগছিল নিজেকে। 

ফোন অন করে দেখলাম দুটো মেসেজ রয়েছে। স্মৃতি জিগ্যেস করেছে কেমন আছি। জিয়া নাকি খুব ফ্রেন্ড ফ্রেন্ড করছে কয়েকদিন দেখা হয়নি বলে। তাই শুনে আমার মনটাও হু হু করল। সত্যিই এই সব জলে ডুবে আত্মহত্যার চক্করে জিয়ার সঙ্গে দেখা করা হয়নি।  আজ রাতেই ওদের ওখানে যাব ঠিক করে পরের মেসেজটা শুনতে গেলাম।  

জেকের মেসেজ। অদ্ভুত মেসেজ। আমি তিনবার শুনেও মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না বলে চতুর্থ বার শুনলাম, “জেক বলছি। আমি ইন্টারনেটে একটু পড়াশোনা করছিলাম।আমার মনে হয় আমি বুঝতে পেরেছি! ও আসলে যাকে বলে সাইরেন। নিজের গান দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে, নিজের রূপ দিয়ে মানুষের বুদ্ধি বিবেচনা ছিনিয়ে নেয় আর তারপর তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। নিজের গান দিয়ে সে পুরুষদের নিজের জালে জড়িয়ে ফেলে আর তারপর থেকে তার জীবনী শক্তি শুষে নেয়। ও লিডিয়া নয় লিগিয়া, বা লিজিয়া। ওটাই নাম ছিল গ্রীক মাইথলজিতে একজন সাইরেনের। ও আমাদের শেষ করে দিতে এসেছে! আমি বলেছিলাম না ওকে দেখলেই আমি বিপদের আভাস পাই। আমার স্থির বিশ্বাস নর্ম্যান আর জোকে ওই মেরেছে। আজ বিকেলে গান গাওয়ার সময় ও অদ্ভুত ভাবে আমাকে দেখছিল। যেন বুঝতে পেরেছে আমি ওর আসল পরিচয় ধরতে পেরেছি। এবার মনে হচ্ছে আমার পালা।“  

ওই মেসেজ শুনে আমার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। জেক বলে কী? লিডিয়া সাইরেন? আমি সাইরেনদের কথা শুনেছি। গল্পে আছে তারা গান গেয়ে নাবিকদের নিজেদের কাছে টেনে নিয়ে তাদের মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য করত। জো আর নর্ম্যান দুজনেই লিডিয়ার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল আমি জানি তাই কী সে ওদের দুজনকে…আর ভাবতে পারছিলাম না আমি।

কাজে গিয়ে জোসিকে শোনালাম মেসেজটা। ওকে বললাম লিডিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়া আর তাকে এখানে নিয়ে আসার কথা। ও মন দিয়ে সব শুনল। তারপর বলল, “তোমার মনে আছে তুমি ওকে কোন জায়গা থেকে গাড়িতে লিফট দিয়েছিলে?”

আমি বললাম, “না সঠিক তো মনে নেই তবে রিজপোর্ট এলাকা হতে পারে।“

জোসি বলল, “আমি খুঁজে দেখছিলাম এই রকম জামাকাপড় পরা দেহ ভেসে আসার ব্যাপার অন্য কোথাও হয়েছে কিনা। মাস ছয়েক আগে রিজপোর্টে দুটো ওই রকম কেস হয়েছিল। মৃত্যুর কোন কিনারা হয়নি। আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। মনে হয় সেটাও তোমার ওই লিডিয়ার কাজ। সেখান থেকে পালাবার জন্যে ঝড়ের রাতে তোমার সাহায্য নিয়েছিল।“   

আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল, বললাম, “চলো তাহলে ওয়াই ডাব্লু সি এ তে গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলে আসি। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।“

জোসি আমার দিকে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “তোমার মনে হয় ও তোমার জন্যে ওখানে অপেক্ষা করে বসে থাকবে?”

সত্যি ওয়াই ডাব্লু সি এ তে গিয়ে লিডিয়াকে পাওয়া গেল না।

ফেরার সময় আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম আর জোসি ফোন নিয়ে কী সব করে চলেছে বলে আমি জিগ্যেস করলাম, “কিছু খুঁজছো?”

“হ্যাঁ। সাইরেনদের নিয়ে পড়ছি। একটা লেখায় বলছে সাইরেনের জীবন ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ সে কাউকে আকৃষ্ট করে রাখতে পারে। তার গান শুনেও সেই গানের আকর্ষণের মায়াজাল ছিন্ন করে যদি কেউ বেরিয়ে আসতে পারে তাহলে সাইরেন শেষ।“

(৪)

সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ স্মৃতিদের বাড়ি যাব ভাবছি এমন সময় গ্যারির ফোন এল। সে বলল, “জেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে আজ বারে আসেনি। আমি এসে দেখি বার বন্ধ তখন আমিই খুললাম। আমাকে কিছু বলেওনি। এই রকম আগে একবারই হয়েছে যখন ওর ১০৪ জ্বর হয়েছিল। তাও আমাকে ফোন করে বলেছিল। আজ তো কোন ফোনও পাইনি। আর আমি ফোন করে দেখছি ওর ফোন অফ করা।“

বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে আমি বললাম, “ঠিক আছে আমি খোঁজ করে জানাচ্ছি।“ 

আমি ভয়ঙ্কর চিন্তায় পড়ে গেলাম। জেক বলেছিল লিডিয়া এবার ওকে টার্গেট করবে। কী করব আমি ভাবছি এমন সময়  দরজায় বেল পড়ল। এখন আবার কে এল রে বাবা ভেবে আমি দরজা খুলতে দেখি লিডিয়া দাঁড়িয়ে। হাল্কা নীল রঙের একটা ঝিলমিলে জামা পরেছে সে। চুল হাওয়ায় অল্প উড়ছে। অসাধারণ সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না।

মিষ্টি হেসে সে বলল, “সরি তোমার বাড়িতে এসে তোমাকে বিরক্ত করছি কিন্তু ভীষণ বিপদে পড়েছি আমি। একবার আসতে পারবে আমার সঙ্গে?”  

আমি পুলিশে কাজ করি। বিপদে পড়লে লোকে আমাকে ডাকবে এটা আর নতুন কী? তাই আমি বললাম,“চলো।“

আমার গাড়িতে বসে লিডিয়া আমাকে অ্যাশবেরি বিচে যেতে বলল। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে এমন সম্মোহিত হয়ে পড়লাম যে আর কিছুই বলতে পারলাম না। সোজা বিচে গিয়ে হাজির হলাম। ততক্ষণে লিডিয়া গান গাইতে শুরু করেছে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনে চলেছি। আমাকে হাতের ইশারা করে ডাকল সে। আমি ওর গানের মূর্ছনায় সম্মোহিত হয়ে ওর পিছন পিছন চললাম। আমার শরীর এবং মন কোনটার ওপরই কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না আমার। সব কিছু ছাপিয়ে শুধু লিডিয়া আর লিডিয়া। আমি যে কখন জলে নেমে পড়েছি তাও আমি বুঝিনি, হাঁটু জল থেকে কোমর পর্যন্ত জলে যখন চলে গেছি তখন প্রথম অন্য ডাকটা শুনতে পেলাম। অনেক দূর থেকে ধোঁওয়ার আড়াল ভেদ করে একটা ক্ষীণ ডাক ভেসে এল, “ফ্রেন্ড?”

আমি মাথাটা ঝাঁকালাম। আবার ভেসে এল সেই কচি গলার স্বর, “ফ্রেন্ড? তুমি কোথায় যাচ্ছো ফ্রেন্ড? আমি তো এখানে।“

জিয়া! আমার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের একটা তরঙ্গ খেলে গেল। কোমর জলে দাঁড়িয়ে এই প্রথম আমি লিডিয়ার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে পিছন ফিরে তাকালাম। ছোট্ট জিয়া দু হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাকে আকুলভাবে ডাকছে, “ফ্রেন্ড? তুমি আসবে না ফ্রেন্ড?”

সেই মুহূর্তে লিডিয়ার সম্মোহনের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারলাম আমি। পিছন ফিরে ছুটতে লাগলাম জিয়ার দিকে। তাকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিলাম আমি। একটা চিৎকার শুনে ফিরে তাকালাম। একটা বিশাল ঢেউ লিডিয়াকে ফেলে দিয়েছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।

‘সাইরেনের জীবন ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ সে কাউকে আকৃষ্ট করে রাখতে পারে। তার গান শুনেো সেই গানের আকর্ষণের মায়াজাল ছিন্ন করে যদি কেউ বেরিয়ে আসতে পারে তাহলে সাইরেন শেষ। ‘ 

জিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে বালির উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম আমি, হাত দিয়ে মুখ ঢেকে। চোখ খুলে দেখলাম জিয়া ছাড়া আরো তিনজন দাঁড়িয়ে আমাকে ঘিরে, জেক, জোসি আর স্মৃতি।

জেক বলল, “কালকে যখন আমি তোমাকে ফোন করছিলাম ও তখন আমার কথা শুনেছিল। আমি ছিলাম ওর প্রধান লক্ষ কিন্তু আমি জানতাম আমাকে বারে না পেয়ে ও তোমার কাছে আসবে তাই আজ বারে না গিয়ে তোমার বাড়ির কাছেই লুকিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ও যখন তোমাকে নিয়ে চলল তখন তোমাদের পিছু নিলাম। জোসিকে ফোন করে বলাম স্মৃতি আর জিয়াকে নিয়ে আসতে। সম্মোহনের জাল ছিঁড়তে ওরাই পারবে আমি জানতাম।“ 

আমি ধরা গলায় বললাম, “লিডিয়া?”

জোসি বলল, “ওর দেহ হয়তো কাল বা পরশু ভেসে উঠবে কোন এক বিচে। বসের জন্যে আমাদের উত্তর রেডি করেই রেখেছি, নর্ম্যান আর জোর খুনের জন্যে লিডিয়াই যে দায়ী সেটা আমরা ধরে ফেলেছি বুঝতে পেরে সে আত্মহত্যা করেছে।“ 

জিয়া এবার বলল, “ফ্রেন্ড, বাড়ি যাবে না?”

আমি উঠে দাঁড়িয়ে জিয়াকে কোলে নিলাম। বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চললাম আমরা চারজন। আকাশে তখন দ্বিতীয়ার এক ফালি চাঁদ আর হাজার তারার ঝিলমিল।

   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *