প্রাণ প্রতিষ্ঠা
শম্পা ঘোষ
নয় নয় করেও নিরুপমা দেবী এই বৃদ্ধাশ্রমে প্রায় বছর পনেরো কাটিয়ে দিলেন । তিনি যেদিন প্রথম এখানে এসেছিলেন তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দিনই এখান থেকে বের হয়ে কোথাও যান নি । আর তার সাথে সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ই কোনোদিন দেখাও করতে আসে নি । এমনকি যে তাকে এখানে রেখে দিয়ে গিয়েছে সেও আজ পর্যন্ত ফোন করে কোনো দিনই তার সাথে কোনো কথাই বলে নি । নিরুপমা দেবীর শুধু এটুকু মনে আছে তার একমাত্র সন্তান, তার সাথে দুর্ব্যবহার করে, তার দ্বিতীয় বউয়ের প্ররোচনায় তার স্বামীর রেখে যাওয়া সমস্ত টাকাপয়সা , বাড়িঘর সব কিছুই হাতিয়ে নিয়ে তাকে কী যেন একটা খাবার খাইয়ে প্রায় অসুস্থ অবস্থায় রাতের বেলা কোথায় একটা নিয়ে গিয়ে ছেড়ে এসেছিল । তারপর আর তার বিশেষ কিছু মনে পড়ে না । যেদিন একটু সুস্থ বোধ হলো সেদিন তিনি নিজেকে এই বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে পেয়েছিলেন । অনেক খোঁজ করার চেষ্টা করেছেন যে কার আনুকূল্যে আজও তিনি সুরক্ষিত ! কিন্তু এই আশ্রম থেকে বলেছে সেটা ওদের বলা বারণ তাই ওরা তাকে জানাতে পারবে না । না নিরুপমা দেবী আর কখনো তা জানার ও বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেন নি । শুধু রোজ দুবেলা ভগবানের কাছে সেই অজানা ব্যক্তির জন্য প্রার্থনা জানান যেন তার মঙ্গল হয় ।
সকালে ঘরে যে মেয়েটি রোজ তাকে ডাকতে আসে খাবার টেবিলে যাবার জন্য সেই মেয়েটি এসে জানালো নিরুপমা দেবীর সাথে কে যেন আজ বিকেলে দেখা করতে আসবে । ওদের অফিসে এইমাত্র মেইলে সেই খবর টা আসলো । মেয়েটি এসে জানিয়ে গেল কারণ মাসিমা যেন তখন তৈরি থাকে ।
খবর টা শুনে নিরুপমা দেবী ভাবতে শুরু করলেন এমন কোনো ব্যক্তির সাথে তো তার আর যোগাযোগ নেই যে তার খোঁজ নিতে পারে বা দেখা করতে পারে।
আর যে ছেলে তাকে বাড়ি ছাড়া করে দূর করে দিয়েছে সে তো কোনো দিনই চায় ও নি তার খোঁজ নিতে । নিশ্চয়ই সেও হবে না । এ তাহলে সেই সহৃদয় না তো যে তাকে এখানে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে ।
সারাটা বেলাই মনের মাঝে এই ভাবনা চিন্তার জাল বিছানোর কাজই করে গেলেন নিরুপমা দেবী । দুপুরের খাবার খেয়ে অন্য দিন নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করেন তিনি কিন্তু আজ আর নিদ্রা দেবী ও ভর করেছে না আর বিশ্রাম ও নিতে ইচ্ছে করছে না । বিকেল চারটের সময় চা খেয়েই হাত মুখ ধুয়ে একটা ভালো শাড়ি পরে বসে অপেক্ষা করতে থাকলেন কখন তার ডাক আসে । পুজোর তো আর মাত্র তিনটে দিন বাকি । এখন খুব তাড়াতাড়ি ই সন্ধ্যা নেমে পড়ছে । ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিলেন প্রায় সওয়া পাঁচটা বাজে , কি জানি যার আসবার কথা আজ আর হয়ত সে আসবে না । ভারি মন নিয়ে বসলেন আরো খানিকক্ষণ । প্রায় ছটা নাগাদ আসলো সেই আকাঙ্ক্ষিত ডাক । তিনি ধীর পায়ে অফিস ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন ।
বাইরে থেকে একজন তাকে বললো মাসিমা আপনি ভিতরে যান উনি অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য । ঘরে ঢুকতেই দেখলেন ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে শার্ট প্যান্ট পরিহিত একজন আনুমানিক বছর চল্লিশের মহিলা । চুলটা খুব ছোটো করে কাটা । চোখে একটা কালো রঙের ব্র্যান্ডেড চশমা । এতকিছুর আড়ালেও মনে হচ্ছে একে কোথায় যেন একটা দেখেছে নিরুপমা দেবী । কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না । একদৃষ্টে উভয় উভয়ের দিকে তাকিয়ে আছে যেন কতই পরিচিত । কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথাই বললেন না । হঠাৎ ই ওই মহিলা নীচু হয়ে নিরুপমা দেবীকে একটা প্রণাম করে মৃদু গলায় ডেকে উঠলো আপনি কেমন আছেন মা ? এতক্ষণে নিরুপমা দেবী চিনতে পারলেন এ যে তৃষা , তার ছেলের প্রথম বউ । অসম্ভব ভালো বুদ্ধিদীপ্ত , আত্ম অভিমানী মেয়ে ছিল সে । একটা নামি বিদেশি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতো । মাত্র বছর খানেকই তো তৃষা তাদের বাড়িতে ছিল । অফিসের সব কাজ সামলেও মেয়েটি তাকে ভীষণ যত্ন ও সেবা করার চেষ্টা করতো । এই মেয়েটির কাছে তিনি যে ভালোবাসা পেয়েছিলেন তার সিকিভাগ ও তার নিজের ছেলে তাকে কোনো দিন দেয় নি । কি জানি কেন ওদের ভালোবাসার বিয়েটা শেষপর্যন্ত টিকলো না । পরে অবশ্য বুঝেছিলেন এর জন্য দায়ী তার ছেলের নষ্ট স্বভাব । মেয়েটা টিকে থাকতে না পেরে ডিভোর্স দিয়ে চলে গিয়েছিল । যাবার আগে তৃষা নিরুপমা দেবীকে বলে গিয়েছিল তার তো নিজের মা নেই কাজেই তাকেই মা বলে মেনে নিয়েছিল । তাই তাকে যতটা সম্ভব আগলে রাখবে নিজের মায়ের সম্মান দিয়ে । তৃষা তার ওই কটাদিনের অভিজ্ঞতায় এটা বুঝে গিয়েছিল যে লোক তার মাকে সম্মান দিতে জানে না সে অন্য কাউকে কি করে সম্মান জানাবে ! মায়ের প্রতিও বিন্দুমাত্র ভালোবাসা ভক্তি এগুলো ছিল না । অত্যধিক স্বার্থপর এক ছেলে । কাজেই তখন থেকেই মনে মনে তৃষা ভেবে নিয়েছিল যদি তাকে বেরিয়ে যেতেও হয় তবুও সে তার শাশুড়ির খোঁজ নিতে ভুলবে না । প্রয়োজনে সে নিজের কাঁধে তুলে নেবে দায়িত্ব । আর এটাই ঘটে ছিল । তৃষা দেশের বাইরে চলে গেলেও একজন লোক ঠিক করে রেখে গিয়েছিল যে প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর তাকে দিত । যখন নিরুপমা দেবীকে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া গেল তখন তৃষা ওই লোকের মাধ্যমে খবর পেয়েই তাকে তুলে এই আশ্রমে রেখে দিয়ে গিয়েছিল । এখানে সব রকম বন্দোবস্ত তৃষা ওই লোকের সাহায্যেই করেছিল। আর এ ব্যাপারে কোনো কথা যাতে নিরুপমা দেবী জানতে না পারেন সেটাও তৃষার ই নির্দেশে হয় । কিন্তু আজ এতগুলো বছর বাদে যখন তৃষা স্থির করেছে সে এবার পাকাপাকিভাবে এদেশেই থাকবে তখন সে তার শাশুড়ি মাকে নিতে এসেছে তার বাড়ি । তৃষা চায় তার শাশুড়ি মা তার বাড়িতে গিয়ে তার মা হয়েই থাকবে । দেবী পক্ষের শুরু হয়ে গিয়েছে তাই তৃষা মায়ের হাতধরে নিজের বাড়ি মানে তার কাছে সেটা বাপের বাড়িরই সমান , সেই বাড়িতে প্রবেশ করবে । নিরুপমা দেবীর হাতদুটো ধরে যখন তৃষা তার অনুমতির অপেক্ষায় মুখের দিকে তাকিয়ে তখন দেখলো নিরুপমা দেবীর চোখের কোল বেয়ে টপটপ করে জল পরে তার নিজের এমনকি তৃষার পর্যন্ত বুক ভেসে যাচ্ছে সে জলধারায় । মায়ে মেয়ে মিলে একপ্রস্থ কান্নাকাটি করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল ।
প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে যেমন একদিকে দেবীর প্রবেশ হচ্ছে তেমন করেই আজ নিরুপমা নামক বাড়িটাতেও দেবীর ই প্রবেশ হলো সাথে তার রূপে লক্ষ্মী ও গুনে সরস্বতী মেয়েও আছে । আলোর ঝর্ণা ধারায় নিরুপমা নামক বাড়িটার প্রতিটা কোণা আঁধার ঘুচিয়ে আজ জ্বলজ্বল করে উঠেছে । লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্নে আজ বাড়ি তার প্রাণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ।।
