ছোটোগল্প

বৃষ্টি-অবৃষ্টি

সুকান্তি দত্ত

পৃথিবীর অনেক অনেক জ্বর, থার্মোমিটার ভেঙে খানখান। পোড়া কাঠ, পোড়া মাঠ, পোড়া বালুচর। রাতের শেষ প্রহরে জনহীন প্রান্তরে তবু শৌভিক আর অহনা মুখোমুখি। কী এক দুর্বার ও গভীর আকাঙ্ক্ষা তাদের এমন নির্জনতা আর অন্ধকারের গোপন দিয়েছে। অন্ধকারের যে-গোপন, জ্যোৎস্নায় আরও নিবিড় হয়ে ওঠে, কিন্তু জ্যোৎস্নাও পুড়ে ছাই।

  পৃথিবী থেকে বৃষ্টি হারিয়ে গেছে অনেকদিন। বৃষ্টিহীন পৃথিবীর দাউ দাউ চিতায় অগণন সম্পর্ক পুড়ে ছাই প্রতিদিন। ছাই ওড়ে, কালো কালো পোকা ওড়ে, মেঘ গর্জনের বদলে শ্মশান সাধকের অট্টহাসিতে পুড়ে যায় আকাশ বাতাস। ডিজেল পোড়া গন্ধে বিষাক্ত বাতাসে কেবল পোকা ভন ভন।

  জনহীন প্রান্তরের একধারে ছাই মাড়িয়ে মাড়িয়ে আরও কাছাকাছি এসে দাঁড়ায় দুজনে। শৌভিক বলে, পুরনো এক কবি, রবি টেগোর, ওর একটা কবিতা পড়ছিলাম—

  অহনা বলে, আস্তে, তুমি এখনও কবিতা পড়ো! কী লজ্জা! কেউ যদি শুনে ফেলে!

  কেউ নেই এখানে তুমি ছাড়া, কে শুনবে? আর শুনলেই বা কী? আমরা কি কাঊকে পরোয়া করি?

  দহন থেকে বাঁচতে ওদের দুজনেরই চোখ-নাকের ফাঁকটুকু ছাড়া আপাদমস্তক ঢাকা। শৌভিক পোশাক খুলে মুখ মাথা বের করে, হাতা গুটিয়ে নেয় কনুই অবধি, তারপর প্রাণ খুলে হাসতে থাকে।

  অহনা আঁতকে ওঠে, এ কী করছ? ছেলেমানুষি ক’রো না।

  আমরা কতদিন কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেখিনি, চুমু খাইনি, অহনা?

  অহনা থরথর কেঁপে ওঠে। বহু দূরে শুকিয়ে আসা জঙ্গল থেকে কী একটা জন্তুর কর্কশ ডাক।

  সে যে কবিতাটার কথা বলছিলাম, শুনলে না তো?

  কাঁপা গলায় অহনা, বলো।

  ধীর অথচ আবেগদীপ্ত স্বরে শৌভিক উচ্চারণ করে, ‘আমার চোখের বিজুলি উজল আলোকে / হৃদয়ে তোমার ঝঞ্ঝার মেঘ ঝলকে / এ কি সত্য?’

  চুপ করে থাকে অহনা।

  ভালো লাগল না? বুঝেছি, খুব ছোটোবেলায় আমি দু চার বার তবু বিদ্যুৎ ,মেঘ, বৃষ্টি দেখেছি, তুমি তো ও সব দেখোনি কোনোদিন, এই শব্দ গুলোর কোনও অর্থ নেই তোমার কাছে, তাই না?

  তবু, শুনে কেমন একটা অনুভূতি—বুকের মধ্যে কেমন যেন—আমার ভয় করছে শৌভিক, কেন তুমি ডাকলে আমায় এখানে?

  আমি ডেকেছি বলেই কি এসেছো? সত্যি করে বলো তো তোমারও কি দুরন্ত দুর্বার ইচ্ছে ছিল না?

  ছিল, কিন্তু—

  সব ‘কিন্তু’ আজ পুড়ে যাক এই জ্বলন্ত পৃথিবীতে।

  বহু দূরে মরা-নদীর চর থেকে শিশুদের কান্না, নারীকণ্ঠের বিলাপ। বৃষ্টি হারিয়ে গেছে অনেকদিন। তা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে কত গবেষণা, সম্মেলন, রাজনীতি; কিন্তু হায়! বৃষ্টির দেখা নেই।

  প্রথম প্রথম এ দেশে বৃষ্টি সমস্যা নিয়ে শাসক-বিরোধী দলের চাপান-উতোর চলত। সরকারি ব্যর্থতার প্রতিবাদে নানা বিরোধী দল বনধ পালন করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রীসভায় কত আলোচনা, নানা প্রস্তাব পেশ লোকসভা ও বিধানসভায়। এমন কি বিদ্বৎজনদের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছে, দেশজুড়ে প্রধান প্রধান শহরে আইপিএল-এর চিয়ার গার্ল সহযোগে বৃষ্টিযজ্ঞ করারও প্রস্তাব দিয়েছেন কোনও কোনও বিদ্বৎজন। কিন্তু, না, কাজের কাজ কিছু হয়নি।

  উন্নত দেশগুলিতে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে কৃত্রিম ভাবে অল্পস্বল্প বৃষ্টি ঝরানোর চেষ্টা চলছে, সে প্রযুক্তি নিয়েও নানা বিবাদ, পেটেন্ট সমস্যা, বেআইনি পাচার। এ নিয়ে যুদ্ধ, অশান্তি, রাষ্ট্র সংঘে আলাপ আলোচনা।

  চুপ কেন অহনা, কিছু বলো।

  কী বলব?

  আমরা কতদিন কেউ কাউকে চুমু খাইনি, ছুঁয়ে দেখিনি।

  চুমু তো অনেক দূরের কথা শৌভিক, ছোঁয়াছুঁয়ির পৃথিবীই শেষ হয়ে গেছে, তবে কেন বারবার—

  জানি, তবু—মনে হয়—

  কী?

  মনে হয় যদি সব কিছু আবার নতুন করে শুরু করা যেত।

  সব কিছু?

  হ্যাঁ, সব কিছু,–আমাদের জীবন যৌবন কাজ স্বপ্ন বেঁচে থাকা মরে যাওয়া—সব কিছু।

  মরে যাওয়া?

  কেন? ভুল বললাম অহনা? একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে, তা বলে এভাবে মরে থাকা—বেঁচে আছি কি এখনও?

  ফের চুপ অহনা। দূরে শুকিয়ে যাওয়া জঙ্গল-কঙ্কালে দাবানল। শ্মশান হয়ে যাওয়া একের পর এক জনপদে শবদেহ ঘিরে উদ্বিগ্ন গবেষকের দল ভ্যাকসিনের খোঁজে দিশাহারা। জল ছাড়া মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কিনা সে সব তত্ত্ব-আলোচনায় মগ্ন পণ্ডিতেরা অসুস্থ বোধ করে, যদিও এসি ঘর, তবুও উতপ্ত বাতাস এখানেও তাদের ছায়া রেখে যায়। পৃথিবীতে এখনও যেটুকু জল অবশিষ্ট আছে তার সিংহভাগের দখল অল্প কিছু ধনী মানুষের হাতে, পণ্ডিত-গবেষক সৈন্যবাহিনী ও সাধারণ মানুষ কম বেশি তা থেকে রেশন মারফৎ সামান্য কিছু পায়, জল চুরি-ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে, কিন্তু এভাবে আর কতদিনই বা চলবে?

  অহনা দীর্ঘ নীরবতার পর ক্ষীণস্বরে বলে, যদি নতুন করে শুরু হত সব—চুরি করা জল দিয়ে আর কতদিনই বা—হায়! তোমায় ছুঁতে আমারও ইচ্ছে করে, কিন্তু—

  পরস্পরকে ছুঁলেই আমরা মরে যাব, তাই তো?

  তাই-ই তো, ছোঁয়াছুঁয়ি বারণ এ পৃথিবীতে।

  বারণ যদি না মানি?

  বারণ মানতেই হয়, নইলে যে মরণ, তুমি তো জানো যে—

  জানি অহনা, জানি, আমাদের সব ঘর হয়ে গেছে শপিং মল, আমাদের সব দিঘি হয়ে গেছে যার যার নিজস্ব জলহীন বাথটব, আমরা মুখোমুখি কথা বলতে ভুলে গেছি, কেননা আমাদের প্রত্যেকের কানে-চোখে এঁটে আছে হেডফোন আর মোবাইল, আমাদের অনেকেরই প্রিয় খাবার মানুষেরই পোড়া মাংস!

  থাক, থাক, চুপ করো।

  কী থাকবে? কিছুই থাকবে না আর! বলতে বলতে শৌভিক অহনার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।

  তুমি কিন্তু বারণ মানছ না, তুমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছ, ছিঃ! অহনার স্বরে উদ্বেগ আর শাসন।

  অহনা এসো, আমরা বেঁচে উঠি। আমরা চুমু খাই, ভালোবাসি, অন্ধকারে মুখোমুখি বসে গান গাই। এ পোড়া পৃথিবীতে বৃষ্টি নিয়ে আসি।

  কী বলছ!

  তুমি কি বুঝতে পারছ না?

  পারছি, কিন্তু ভয় করছে!

  এসো ভালোবেসে বাঁচি, ভালোবেসে জয় করি ভয়। শৌভিক জড়িয়ে ধরে অহনাকে।

  পৃথিবীর কোথাও কোথাও, বহু বছর পর, তখন হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস, ঝিরঝির বৃষ্টি, ঝিরঝির ঝরঝর টুপটাপ, বৃষ্টি আর বৃষ্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *