রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী ও বিজ্ঞানমনস্কতা
অভিজিৎ কুমার দেব
প্রাচীন কালে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানুষ বিধাতার অভিশাপ ভাবত; রবীন্দ্রনাথের সময়ও তাই ভাবত; এ বছরের প্রচন্ড গরমেও অনেকে তেমনটাই ভেবেছে – যদিও বৈজ্ঞানিক যুক্তির ভিত্তিতে এরকম দাবী ধোপে টেকে না। রবীন্দ্রনাথ বৈজ্ঞানিক নন; তিনি সাহিত্যিক। সাধারণভাবে আমরা ধরে নেই যে সাহিত্যিকরা খুব একটা যুক্তিবিদ্যার ধার ধারেন না; তারা তর্ক করেন না; তারা আধ্যাত্মিকতা নিয়েই নিমগ্ন থাকেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী। রবীন্দ্র সাহিত্য চর্চা এবং তাঁর সংগীত সুধা উপভোগ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামাজিক কুসংস্কার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গীটা জেনে নেওয়া বর্তমান সময়েও খুব প্রাসঙ্গিক।
১৯৩৪ সালে বিহারে প্রচন্ড ভূমিকম্প হল; রিখটার স্কেলে ৮.০ মাত্রা; প্রাণহানির সংখ্যা ১২ হাজারের উপরে। সবাই হত বিহ্বল; মহাত্মা গান্ধী থেকে রবীন্দ্রনাথ সবাই বিচলিত; কিন্তু এই দু’জনের প্রতিক্রিয়া হল ভিন্ন রকমের।
শূদ্রের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যতার অত্যাচার তখনকার সময়ে বেশ প্রবল। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি নানা সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধেও সরব। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে গান্ধীজী সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি দেখে হত বিহ্বল গান্ধী বলতে শুরু করলেন – অস্পৃশ্যতা একটা পাপ; এই পাপ থেকে আসে দেবতার অভিশাপ; তার ফলে হয় ভূমিকম্প। গান্ধীর উদ্দেশ্য ভাল; তিনি অস্পৃশ্যতা দূর করতে চান; সেজন্য তিনি মানুষকে দেবতার ভয় দেখাচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লিখেছেন; তিনিও এর অবসান চান; কিন্তু তাই বলে অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রচার করে সমাজে অযুক্তির বীজ বপন করতে রবীন্দ্রনাথ রাজী নন। কোন সৎ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যও যদি সমাজে অযুক্তির বীজ বপন করা নয়, তাহলে সমাজের সদস্যদের অযৌক্তিক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় – আখেরে সেটা সমাজের জন্য কল্যাণকর হয় না। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীকে চিঠি লিখলেন – প্রাকৃতিক ঘটনার মূলে আছে জাগতিক কারণ; জাগতিক কারণের বদলে কোন দৈবশক্তির প্রভাব ধরে নেয়া একটা অযৌক্তিক চিন্তা; এমন অযৌক্তিক চিন্তা আমাদেরকে অন্ধ করবে এবং আত্মানুসন্ধানের পথ দুর্গম করবে।
গান্ধীজীর দাবী ঠিক হলে বলতে হবে ঈশ্বর বিহারের সবাইকে এক পাল্লায় তুলেছেন। শুধু অত্যাচারী ব্রাহ্মণরাই যে ভূমিকম্পে প্রাণ হারাচ্ছেন তেমন নয়। নিষ্পাপ শিশু থেকে শুরু করে নির্যাতিত শূদ্র ও গোবাদী পশুসহ বিহারের সব প্রাণীই ভূমিকম্পে প্রাণ হারাচ্ছে। আবার, অন্যান্য প্রদেশের কোন পাপীই কোন শাস্তি পাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের এই সব যুক্তিতর্কের জবাবে গান্ধীও তার মতামত লিখে জানালেন। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন – যাদের হাতে সমাজে কুসংস্কার দূর করার দায়িত্ব তারাই যদি কুসংস্কার ছড়ায় তাহলে সামাজিক অগ্রগতি কিভাবে হবে? কৈশোরে শারদীয় দেশ পত্রিকায় এই বিতর্ক নিয়ে প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সম্প্রতি অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী পড়তে গিয়ে সেই বিখ্যাত চিঠি চালাচালির গল্প আবার চোখে পড়ল।
আমাদের সৌভাগ্য আমরা একজন রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলাম; আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা তাঁকে ধারণ করতে পারি না; ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত পুরাতন তত্ত্বকে ফেলে নতুন তত্ত্ব গ্রহণ করতে দ্বিধা বোধ করি। আজকের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমরা জানি টেকটোনিক প্লেটের গতির জন্য ভূমিকম্প হয়; আগামীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যদি নতুন কোন তত্ত্ব বেরিয়ে আসে তাহলে সেদিন সেই নতুন তত্ত্বকে সত্য বলে জানব; কোন প্রাচীন তত্ত্বকেই ধ্রুব সত্য বলে মনে করার কোন কারণ নেই। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন – কতকগুলি নির্দিষ্ট মতবাদ, কাহিনী ও আচারকে ধ্রুব সত্য বলিয়া ছাত্রদের মনে সংস্কার বদ্ধ করিয়া দিলেই যথোচিত ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয় না। যাহা জীবনের সামগ্রী তাহা বাড়িবে, তাহা চলিবে। তাহা ডোবা নহে, বাঁধানো সরোবর নহে, তাহা কালের ক্ষেত্রে ধাবিত নদী।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিবসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “পূর্বপুরুষের পুনরাবৃত্তি করা মনুষ্যধর্ম নয়। জীবজন্তু তাদের জীর্ণ অভ্যাসের বাসাকে আঁকড়ে ধরে থাকে; মানুষ যুগে যুগে নব নব সৃষ্টিতে আত্মপ্রকাশ করে, পুরাতন সংস্কার কোনোদিন তাকে বেঁধে রাখতে পারে না। মহাত্মাজি ভারতবর্ষের বহুযুগব্যাপী অন্ধতা মূঢ় আচারের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ এক দিক থেকে জাগিয়ে তুলেছেন, আমাদের সাধনা হোক সকল দিক থেকেই তাকে প্রবল করে তোলা। জাতিভেদ, ধর্মবিরোধ, মূঢ় সংস্কারের আবর্তে যত দিন আমরা চালিত হতে থাকব ততদিন কার সাধ্য আমাদের মুক্তি দেয়। মনে রাখা চাই, বাহিরের শত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম করতে তেমন বীর্যের দরকার হয় না, আপন অন্তরের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করাতেই মনুষ্যত্বের চরম পরীক্ষা।”
নতুন জ্ঞানের বিকাশ ও ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলার জন্য যুক্তি তর্কের বিকল্প নেই। তবে এই বিতর্ক কিন্তু গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোন প্রভাব ফেলেনি। তাঁরা তাদের সম্পর্ক ঠিকই অটুট রেখেছেন। এই দুই ক্ষণজন্মা ব্যক্তির জীবন দর্শন অধ্যয়ন করা আমাদের জন্য তাই চিন্তা উদ্দীপক (Thought Provoking) ও চিত্তাকর্ষক।
