প্রবন্ধ

আচার-বিচার-সংস্কার কেউই মানবিকতার ঊর্ধ্বে  নয়

শতরূপা বোস রায়

আমাদের বাড়িতে সারা বছর অন্যান্য পুজোর ঘটা না থাকলেও একটি পুজো খুব ঘটা করে করা হতো – এবং তা হলো সরস্বতী পুজো। পুরোহিত মশাই আসতেন কালীঘাট থেকে। কালীঘাট মন্দিরে মেজদার ডালার দোকান ছিল। সেখানে অনেক পান্ডা পুজো দেওয়ার কাজ করতেন তাদেরই মধ্যে শনৎ বলে একজন ওড়িয়া পান্ডা ছিলেন। তিনি আমাদের পুজো করতে আসতেন। ওড়িষ্যার লোক ছিলেন ঠিকই কিন্তু তার তিন পুরুষ মনে হয় কালীঘাটে পান্ডা ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি সব পুজো করতে জানতেন এবং সব থেকে বড় কথা বাংলাটাও গড়গড়িয়ে বলতেন। আমি শনৎদাদা বলে ডাকতাম। শনৎদাদার বয়েস সে সময় ৩০ অনুর্ধ। লম্বা পেটানো চেহারা, শ্যামবর্ণ। তবে মন্ত্রোচ্চারণ যে খুব একটা স্পষ্ট ছিল তা না। সব মন্ত্র বুঝেও যে বলতেন তাও না। তবুও তিনি ব্রাহ্মণ।

 পুজো হয়ে গেলে ঠাম্মা তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। আর শনৎদাদা ইতস্ততঃ করে বলতো, “থাক থাক মা জননী! সুখী থাকো সুস্থ্য থাকো।”

একজন অশীতিপর বৃদ্ধা একজন যুবকের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেবে, শুধু মাত্র সে ব্রাহ্মণ বলে, সে প্রথা তখন প্রচলিত ছিল।

আমি ছোটবেলায় ব্রাহ্মণত্বের উন্নাসিকতার নজির নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে খেয়াল করলেও তার সঙ্গে ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা ছিল বলে তার প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি কোনোদিন। এবং সব চেয়ে বড় কথা সেই সব আচার কখনও দৃষ্টিকটুও লাগেনি। হয়তো সত্যি তখন ধর্মের চোখ দিয়ে সবটা দেখেছি। মনে হয়নি, যে সামাজিক প্রথা যা ধর্মের নিরিক্ষে হয়ে চলেছে আদি অনন্ত কাল ধরে তাকে কখনও প্রশ্ন করা যায়।

তারপর আমার ব্রাহ্মণ পরিবারে বিয়ে হলো। ঠাম্মা বলতেন আমরা ঠাকুরের অন্ন ভোগ রাঁধতে পারবো না কারণ আমরা ব্রাহ্মণ নই। বিয়ের পরে হঠাৎ মন্ত্র বলে আমি কেমন করে যেন এক স্তর ওপরে উঠে গেলাম। বিয়ের পর প্রথম সত্যনারায়ণ পুজোয় আমায় বলা হল, একটু খিচুড়ি ভোগ নারায়ণের জন্য বানালে কেমন হয়? মা বললো, “তুই কি এসে বানাতে পারবি? তোর শাশুড়িকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখি।

” বিয়ের জল গায়ে লাগলে অন্যান্য বহু পরিবর্তন হয় মেয়েদের কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খানিকটা জাতে ওঠার মতো লাগছিলো। আমি সেই ভোগ রান্নাও করেছিলাম যতদূর মনে পরে। ব্রাহ্মণত্বের অধিকার পেয়ে নিজেকে অবশ্য আলাদা ভাবে খুঁজে পাইনি আমি।

সে প্রচেষ্টা এখনো চলেছে। সমাজে নিজের জায়গা, সংসারে নিজের সঠিক মূল্যায়ন, মেয়ে হিসেবে নিজের অধিকার সেই সব খুঁজে বেড়াচ্ছি আজও। আর যেটা সব চেয়ে বেশি খুঁজি তা হলো স্বাধীনতা।

ঠোঁটে সিগারেট, হাতে রেড ওয়াইন, ছোট জামা, এই সবের মধ্যে আমার স্বাধীনতা খর্ব হয়। আমি তেমন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করিনা। আমি আমার মত করে স্বাধীন হতে চাই। আমার বন্ধন সারা আকাশ জুড়ে, আমার স্বাধীনতা খুঁজি আমি ভাতের হাড়িতে, আমার অগোছালো ঘরের এক কোণে, আমার গাছের সদ্য ফোটা গোলাপফুলে। কিন্তু বুঝি সে বড়ই ক্ষনিকের। একদিন ওই ফোটা ফুলটার মতো আমার স্বাধীনতাও ঝরে পরবে সামাজিক প্রথায়।

বিদেশে থাকি , পাশ্চত্যের নিয়ম নীতি রীতি নিয়েই আমার প্রাত্যহিক। কিন্তু আমার নরম দুধে ভাতে থাকা বাঙালি মনটা যে এখনও সেই আটকে পরে আছে আটপৌরে নিয়মাধীন একটা জীবনে। এখনও বাড়ির প্রধানের অগ্রাধিকার, তারপর বাড়ির কনিষ্ঠের তারপর যা পরে থাকে সেটা আমার ভাগের। এমনটাই তো দেখে এসেছি। আমার মা মাসি, পিসি সবাই যে এমনি করেই জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছে। সকলের শেষে, সকলের নীচে, সকলের মাঝে।

 তারা অভিযোগ করেনি। আমিও করিনা। মেনে নেওয়ার মধ্যেই হয়তো না স্বাধীনতার বীজ।

কিন্তু আজ আমাদের শহরের পুজোয় যখন মহিলা পুরোহিত এসে পুজো করবেন ঠিক করা হল তখন মনে হল এই বুঝি সকল আগল খুলে দেবার সময় এসেছে।নন্দিনীদি কে অসংখ্য ধন্যবাদ। এমন একটা দিক মেলে ধরবার জন্য। মেয়েরা কিছুটা হলেও এগিয়ে আসতে পেরেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে যাওয়ার তো প্রয়োজন নেই কিন্তু সেই সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিতে পেরেছে এটাই বা কম কথা কি?

 আর হ্যাঁ ! খানিকটা হলেও চিরাচরিত জাত পাত এবং ধর্মের বেড়াজালও ভাঙতে পেরেছে এই মহিলা পুরোহিতের পুজোর প্রথা। পৃকৃতির মধ্যেই যে সকল শক্তি নিহিত এবং মানুষের মধ্যেই নারায়ণের বাস সেকথা আবারও একবার মনে করবার সময় এসেছে বোধ করি।

***সমাপ্ত***