একটি সংকীর্ণ অব্যাহতি
পবিত্র আচার্য্য
[এক]
এইভাবেও শান্ত থাকা যায়? কিভাবে সম্ভব? মিস রুশলানা চুপচাপ বসে আছেন। তাঁর লিভিং রুমে। বাইরেটায় প্রচণ্ড অস্থির। প্রকাণ্ড অস্থিরতায় কেঁপে উঠছে আশপাশ। অথচ তিনি ভীষণভাবে শান্ত। দুটো রাস্তা অবশিষ্ট আছে তাঁর কাছে। পালিয়ে যাওয়া। কিংবা চুপচাপ আত্মসমর্পণ করা। যদি আত্মসমর্পণ করতেই হয়, সত্যি-ই কি সেটা ভীষণভাবে লজ্জার?
মিস রুশলানা মধ্যবয়স্কা। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। দেহের গঠন ভীষণভাবে দৃঢ়। গায়ের চামড়া টানটান। চকচকে সফেদ। তাঁর কঠিন চিবুক। সব চেয়ে বড়গুণ মস্তিষ্ক বরফের মতো শীতল। দেখলেই মনে হয় অনেকগুল সতেজ জীবন একসাথে ছুঁয়ে আছে তাঁকে।
তিনি থাকেন তাঁর প্রিয় শহর খারকিভে। খারকিভ ইউক্রেনের এক প্রান্তিক শহর। ইউক্রেন ও রাশিয়ার সীমানার কাছাকাছি। বেশ কয়েকদিন ধরেই এলাকাটাতে চাঞ্চল্য চলছে অতি মাত্রায়। দেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত, এটি স্লোবোদা ইউক্রেনের ঐতিহাসিক অঞ্চলের বৃহত্তম শহর। খারকিভ হল খারকিভ ওব্লাস্ট এবং আশেপাশের খারকিভ রায়ওনের প্রশাসনিক কেন্দ্র। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, শহরটি জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়ানরাই সংখ্যা গরিষ্ঠ ছিল। কিন্তু শিল্প সম্প্রসারণ এর ফলে, ইউক্রেন এর দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা এখানে এসে বসবাস শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউক্রেনীয় সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির উপর পূর্ববর্তী বিধিনিষেধ শিথিল করায়, ইউক্রেনীয়রা এই শহরে সবচেয়ে বড় জাতিগত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। তাই এই শহর অধুনা ইউক্রেনের অধিনে হলেও, রাশিয়ান সংস্কৃতির এক বিরাট ছায়া ছেয়ে আছে এখানে।
মিস রুশলানা জন্মেছিলেন রাশিয়ায়। কিন্তু খুব ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে আসেন ইউক্রেনে। তাঁর শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা, কর্মজীবনের প্রায় সবটুকু সময়-ই কেটেছে ইউক্রেনে। মিস রুশলানার মধ্যে আছে রাশিয়ান রক্ত। আর যেহেতু ইউক্রেনের জল বাতাস পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর সমস্ত শরীর মন জুড়ে আছে ইউক্রেন।
বেশ কয়েকদিন ধরেই রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত করছে খারকিভকে। শহরে এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় ১৫ বার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। বাতাসে তীব্র বারুদের গন্ধ। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ। অনবরত সাইরেনের শব্দ।
মিস রুশলানা দেখছেন, তাঁর আশপাশটা ক্ষেপণাস্ত্র এর আঘাতে ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়েছে। বড় বড় বাড়ি গুঁড়িয়ে গিয়ে পাথরের চাই-ই রূপান্তরিত হয়েছে। চারিদকটা এতটাই ফাঁকা যেন শহরের সমস্ত আলো ফোকাস করে আছে, তাঁর বাড়ির দিকে।
কিসের জন্যে এই আগ্রসন? এই যুদ্ধ-ই বা কেন? ভাবলেই মিশ রুশলানার কঠিন হৃদয়েই মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ভলগা নদীর ঢেউ। কাতারে কাতারে মানুষ চলে যাচ্ছে প্রাণচঞ্চল এই শহর ছেড়ে হয় রাশিয়া, নয়তো বা ইউক্রেনের রাজধানী ক্রিয়েভ এর দিকে।
মিস রুশলানার হাতে আর বেশি সময় নেই । রাশিয়ান সেনারা একের পর এক ঘিরে ফেলছে বিভিন্ন এলাকা। পণবন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে এলাকার মানুষজনকে। তাঁকে পালাতেই হবে বোধহয়। মিশ রুশলানার চোখ গেলো তাঁর প্রিয় পিয়ানোর দিকে। অতি ধীরে তিনি এগিয়ে গেলেন পিয়ানোর সামনের বসার টুলটায়। বোঝা যাচ্ছে না, কি সংগীত এর সুর তুলবেন তিনি পিয়ানোয়। শেষবারের মতো। শান্তি কিংবা অতি হিংস্র যুদ্ধের? এই যুদ্ধ বরাবর-ই শান্তির বিরোধি। অথচ কিসের সুখে মানুষ বেছে নেয় আগ্রাসন? ক্ষমতার বলে ছিনিয়ে নিতে চায় সবকিছু। যুদ্ধে সফলতা বলে কিছু হয় না। কারন হাজারো রক্ত ক্ষয়, মানবতার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই এই সাফল্য আসে।
মিস রুশলানা বাজিয়ে চলেছেন তাঁর প্রিয় পিয়ানো। এই সুর যতটা ক্লান্তিকর, যতটা দুঃখের তাঁর চেয়েও বেশি অভিমানের। জন্মসুত্রে তিনি রাশিয়ান। বেড়ে ওঠা ইউক্রেনে। তাই কোনও পক্ষেরই ক্ষতি হোক, তা তিনি মন থেকে চাইবেন না কিছুতেই।
হঠাৎ তীব্র চিৎকারে হুশ ফিরলো মিশ রুশলানার। চারিদকি থেকে ঘিরে ধরেছে রুশ সেনাবাহিনীরা তাঁকে।
“রকি ভিয়ারখ , ভিয়া অ্যারিস্টোভনে” – মানে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল।
[দুই]
“আপনি কেমন ফিল করছেন, মিস রুশলানা?” –মেজর ডক্টর সাবেট জিজ্ঞাসা করলেন তাঁকে।
মিস রুশালানা কনসেন্সট্রেশান ক্যাম্পের হাসপাতালের বেডে শুয়ে। চোখ রয়েছে বাইরের দিকে। অর্ধলিপ্ত। ভালো করে চোখ বন্ধ করতে পারছেন না। তীব্র বিভীষিকা গ্রাস করেছে তাঁকে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছেন, একটা প্রবল বেগে ছুটে আসা ডিনামাইট ফেটে পড়ছে।
যেদিন মিস রুশলানা সহ আরও কয়েকশ পণবন্দি খারকিভের মানুষদের নিয়ে, রাশিয়ায় ফিরছিল রুশ সেনারা। এক ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ে ডিনামাইট। মিস রুশলানার চোখের সামনেই মারা যায়, অসংখ্য প্রণবন্দি মানুষেরা। মিস রুশলানা নিজের বেঁচে ফেরাকে ধন্যবাদ জানাবেন, না ঘৃণা করবেন, কিছুতেই বুঝতে পারছেন না। জীবন নিয়ে ফিরলেও, বোমের আঘাতে ছিন্ন হয়ে গেছে তাঁর এক পা। প্রায় দুই মাস ধরে এই হাসপাতালে বন্দী । প্রথম দিকটাই বেশ কয়েকদিন অজ্ঞান ছিলেন । পরে জ্ঞান ফিরতে জানতে পারেন তাঁর এক পা বাদ দিতে হয়েছে। তখন থেকে ভীষণভাবে চুপচাপ।
মেজর সাবেটের প্রশ্নে নিরুত্তর রইলেন রইলেন মিস রুশলানা। মেজর সাবেট পালস রেট মাপলেন মিস রুশলানার। ভীষণ কম। ব্লাড প্রেসার ভীষণভাবে লো। গায়ে জ্বর আছে।
“ শুনলাম আপনি ঠিক ঠাক খাওয়া-দাওয়া করছেন না, মিস রুশলানা?” – শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন মেজর সাবেট।
মিস রুশলানা অন্য দিকে চেয়ে রইলেন। জেনেশুনে এভোয়েড করতে চাইছেন মেজরকে।
কোনও উত্তর না পাওয়ায়, মেজর সাবেট এবারে কিছুটা ধমকের সুরেই বললেন, “ আপনি কি বাঁচতে চান?”
মেজর সাবেটের জোরালো প্রশ্নে সম্বিত ফিরলো, মিস রুশলানার। বাঁচা-মরার এই হিসেব কি এতটা সহজ? সুস্থ হয়ে উঠার পর কোথায় যাবেন তিনি? রাশিয়ায় তাঁর আপনজন কেউ নেই। আর ইউক্রেন, যেখানে তাঁর নিজের ঘর ছিল, সে তো কবেই ধূলিসাৎ। ফিরে গেলেও ফিরতে পারবেন না তাঁর নিজের বাড়ি। শুধু বিভীষিকাময় অতীত নিয়ে ফিরে যেতে হবে প্রবল দুর্ভোগের মধ্যে। তাই এইভাবে বেঁচে থাকার থেকে মরে গেলেই বোধহয় ভালো হতো।
ভীষণ অস্ফুট স্বরে তিনি বললেন, “ আমি এই ভাবে বাঁচতে চাই নি কখনও? কেন বাঁচালেন আমাকে?”
মেজর সাবেটকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিলো এই সংক্ষিপ্ত উত্তর। যার গভীরতা ঘিরে রয়েছে অভিমান, ঘৃণা ও তীব্র অবসাদ। ভেতরে ভেতরে মেজর শুনতে পাচ্ছেন সেই কবিতার লাইনগুলো। নীরবে উচ্চারণ করছেন ,
আজ যুদ্ধের হাজার দিন,
অপরাধবোধ ও বেদনায় আটকা পড়ে যাচ্ছে মানবিকতা
ধূলিসাৎ হয়ে গেছে স্বপ্ন ও বেঁচে থাকা
সবাই বাঁচতে চায় স্বাধীন
এই ধ্বংসাবশেষে কোনও মুক্তি নেই , নেই শ্বাস, নেই জীবন
শুধু আছে ভাঙ্গন, ক্ষত, তীক্ষ্ণ শব্দের নীরবতা
অসীম কালোগর্ত ও অসংখ্য পিচাশের মুখ।
[তিন]
“গুড মর্নিং মেজর।’ কাঠের প্যানেলযুক্ত ডেস্কের পিছনে ইউনিফর্ম পরা সেক্রেটারি মেজর সাবেটকে হাসিমুখে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, ‘দয়া করে সরাসরি ভিতরে যান। জেনারেল আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
মেজর সাবেট গুটিগুটি পায়ে হেঁটে গেলেন একশ পা। ডান দিকে ঘুরতেই, দরজায় দেখতে পেলেন সোনালী নেমপ্লেট, “ জেনারেল ইলিয়া”। দরজাটা আস্তে করে টোকা মারলেন, তারপর ভিতের ঢুকে গেলেন।
“জাখোডি মেয়র প্রায়ামো ” মানে সোজাসুজি চলে আসুন ভেতরে। এই কণ্ঠস্বর অতিপরিচিত। একটা শক্ত ওকউড টেবিলের পিছনে বসে জেনারেল। অতি আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, মেজর সাবেটের জন্যে।
মেজর সাবেট কাছে এলে উঠে দাঁড়ালেন জেনারেল। হাত খানা বাড়িয়ে দিয়ে করমর্দন করলেন।
“ধন্যবাদ জেনারেল স্যার, আমাকে ডাকার জন্যে। “ – কৃতজ্ঞতার সাথে জানালেন মেজর।
“মিস রুশলানা কেমন আছেন?” – জেনারেল জানতে চাইলেন?
“শারীরিক ভাবে কিছুটা ভালো হলেও, মানসিক ভাবে পুরোপুরি অসুস্থ। ঠিক ঠাক খাওয়া দাওয়া করছেন না, তিনি ” মেজর প্রত্যুত্তরে জানালেন।
“মিস রুশলানাকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে, আপনি আশ্চর্য কাজ করেছেন। এখন ওনার ঠিকঠাক ভাবে সুস্থ হয়ে ওঠাটা আমাদের পক্ষে জরুরী”
“তিনি আমাদের পণবন্দি। আমাদের শত্রুপক্ষের। তবুও তাঁকে সুস্থ করার জন্যে আপনার এতটা সদিচ্ছা। আপনার প্রশংসা না করে পারছি না জেনারেল।“
জেনারেল মুচকি হাসলেন। তারপরে তাঁর আসল অভিসন্ধি প্রকাশ করলেন।
“মিশ রুশলানা কোনও সাধারণ মানুষ নন। তিনি ইউক্রেনের একজন সৈনিক। একজন গুপ্তচর। তাঁকে গ্রেপ্তার করার আগে তিনি তীব্র ফাইট করেছেন। আমাদের অন্তত দশজন সেনাকে প্রাণে মেরেছেন। তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি। কিন্তু সেইসব ডিক্রিপ্টেড। তাঁকে মানসিক ভাবে সুস্থ করে তুলে, সেই সব উদ্ধার করাটা খুব জরুরী। রাশিয়ার যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে এই ডকুমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে, আমি নিশ্চিত। “
“ইয়া স ডিল উ সিভজমজনয়ে – আমি যা সম্ভব সব করব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুস্থ করে তুলছি “ – মেজর উচ্ছ্বাস এর সাথে কথাগুলো বললো।
জেনারেলকে ধন্যবাদ দিয়ে, মেজর ফিরে যচ্ছিলেন নিজের বাড়ির দিকে। নিজের মধ্যে ঝড় অনুভব করছেন মেজর। তিনি ডাক্তার। একজন অসুস্থ মানুষকে বাচিয়ে তোলা তাঁর পেশাদার কাজের মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে জেনারেল এর অভিসন্ধি। সুস্থ হয়ে উঠলেই, ইনফরমেশান কালেক্ট এর জন্যে মিস রুশলানার উপরে চলবে অকথ্য অত্যাচার। তাঁকে প্রাণেও মেরে ফেলা হতে পারে। তা হলে তাঁকে বাচিয়ে সুস্থ করে কি লাভ? তাঁর ওপরে তিনি দশজন রাশিয়ান সেনাকে মেরে ফেলেছেন। জেনারেল ইলিয়ার চোখে, মিস রুশলানা সত্যিকারের অপরাধী। পরক্ষণেই মেজর ভাবছেন, নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে মিস রুশলানার এর অন্যথা করা ছাড়া উপায় ছিল কি?
মেজর দ্বিধাবিভক্ত। তাঁর কি উচিৎ আরও একটু বেশি সময় নেওয়া মিস রুশলানাকে সুস্থ করার ব্যাপারে? তিনি কোন পক্ষে। নিজের পেশাগত আদর্শে? তিনি একজন ডাক্তার। তাই রুগিকে সুস্থ করে তোলা, তাঁর ভালোর দিকটা তাঁর নিজের কর্তব্য এর মধ্যে পড়ে। না, যে কোনো পেশা বা শপথের আগে দেশ। তাই দেশের স্বার্থে মিস রুশলানাকে, জেনারেল এর সামনে এগিয়ে দেওয়া উচিৎ?
[চার]
ধীরে ধীরে মিস রুশলানা সুস্থ হয়ে উঠছেন। মৃত্যুর পথ থেকে এইভাবে ফিরে আসা, হয়তো তাঁর ক্ষতে কিছুটা হলেও নরম পলেপ দিয়েছে। তিনি আবার বাঁচতে চান। বিশেষ করে তিনি একজন সৈনিক। যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে, জয় হাসিল করাই তো একজন সৈনিক এর কাজ। কিন্তু মিস রুশলানা জানেন রাশিয়ান এই সেনাদের হাতে বন্দি অবস্থা থেকে ফিরে আসাটা অতিসহজ নয়।
হাসপাতালের বেডে বসে এইকথায় ভাবছিলেন একমনে। কিছু একটা উপায় বের করতেই হবে। একটা কঠিন অথচ সম্ভবপর এসকেপ রুট।
হঠাৎ কল্পনার জগত থেকে ফিরে এলেন বাস্তবে। সামনে দৃষ্টিপাত করতেই দেখতে পেলেন, জেনারেল ইলিয়া ও মেজর সারবেট এগিয়ে আসছেন তাঁর দিকে।
“কেমন আছেন মিস রুশলানা ? “ মেজর হাসিমুখে জানতে চাইলেন।
মিস রুশলানা নিরুত্তর রইলেন। তাঁকে ভীষণভাবে শান্ত লাগছিল।
“আপনি অনেকটা সময় পেয়েছেন মিস রুশলানা, এবারে আমাদেরকে সাহায্য করতে হবে আপনাকে” – জেনারেল কঠিন স্বরে কথাগুলো বললেন।
কথার তীব্রতা এতটাই তীক্ষ্ণছিল, তা মিস রুশলানাকে নাড়িয়ে দিলো মুহূর্তে।
“কি জানতে চান?”
“ডিক্রেপ্টেড কোড, আপনার হার্ডডিস্কের”
“ওতে কিছুই নেই জেনারেল, আমার ব্যক্তিগত গোপন কিছু ফটো ও পারিবারিক ফটো ছাড়া”
“আপনি মিথ্যে বলছেন মিস রুশলানা। আপনি ত্রিশ বছর ইউক্রেনের গুপ্তচর বিভাবে কাজ করেছেন। অত্যন্ত সফল একজন স্পাই। তাই আপনার কাছে কোনও তথ্য থাকবে না, সেটা হতেই পারে না।“ মেজর সারবেট এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে চললেন। তাঁকে উদ্ভ্রান্ত পাগলের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে পারলে মিস রুশলানার পেটের ভেতর থেকে কথাগুলো বের করে নিয়ে আসেন।
“আর ইনফরমেশান না পেলে কি হতে পারে, আপনি নিজেও জানেন, কি ঠিক বলছি তো “ ভীষণ গম্ভীর স্বরে জেনারেল জানালেন।
“ আপনি পণবন্দি একজন কয়েদিকে ভয় দেখাচ্ছেন। ইন্টারন্যাশানাল হিউম্যান কমিশান জানলে কি হবে?” মিস রুশলানা ভয় হীন। আসলে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলে, মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
জেনারেল ও মেজর দুজনে হাসতে হাসতে ফেটে পড়লেন। তারপর হঠাৎ-ই রেগে গেলেন জেনারেল। তাঁর রক্তচোখ থেকে বোধহয় আগুণ ফেটে বেরোচ্ছে। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছেন মেজর।
“এই কনসেন্সট্রেশান ক্যাম্পে প্রতিদিন কতজন কয়েদিকে পিঁপড়ের মতো টিপে মেরে ফেলা হচ্ছে গোপনে, আপনি জানেন? গোপন ঘেরাটোপে এতটাই সন্তর্পণে এইসব করা হচ্ছে কারোর পক্ষে টের পাওয়া সম্ভব নয়। “ – জেনারেল একটু বিরতি নিলেন।
“মিস রুশলানা আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আশায়। অন্যথায় মুহূর্তের মধ্যে আপনার জীবন শেষ করে দিতে পারি। “ মেজর সারবেট জানালেন।
“ইউক্রেন কোনদিন-ই প্রকৃত অর্থে একটা রাষ্ট্র ছিল না। এখন যা ইউক্রেন, তা আসলে প্রাচীন রুশ ভূখণ্ড। তাই ইউক্রেনকে রাশিয়ার কথা মতই চলতে হবে।“ জেনারেল জানালো ।
“ইউক্রেন স্বাধীন দেশ। তাই রাশিয়ার দখলদারি কনোও মতেই সহ্য করবে না। কিছুতেই না। “ – মিস রুশলানার কথাগুলো ভয়ের মুখেও চাবুকের মতো লাগছিলো।
মেজর সারবেট মিস রুশলানাকে শান্ত করার জন্যে হালকা ঘুমের ইঞ্জেকশান দিলেন। তারপর জেনারেল ইলিয়ার সাথে ফিরে এলেন আর্মি ক্যাম্পের হেড অফিসে। কনসেন্সট্রেশান ক্যাম্প থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।
অনেক রাতে ঘুম ভাঙল মিস রুশলানার। আশপাশ থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। পণবন্দি বাকি কয়েদিদের উপরে অত্যাচার চলছে। মিস রুশলানা স্নায়ু বরাবর বয়ে চলেছে হিমশীতল স্রোত। এই কয়েদি অবস্থা থেকে মুক্তি চাই। শুধু নিজের নয়। এই ক্যাম্পে থাকা বাকি হাজার কয়েদিদেরও। তাঁরা কেউ-ই অপরাধী নয়। তাঁদের চোখের মাঝে স্বপ্ন। ইউক্রেন এর সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে রাখা।
জানালার বাইরের দিকে তাকাতেই, আকাশের মাঝে দেখতে পেলেন রুপোর বাটির মতো চাঁদ। পূর্ণিমার আলায় ঢেকে গেছে পুরো ক্যাম্প। মনের ভেতরটায় এতটাই বিষণ্ণতার জোয়ার বইছিল, এই জ্যোৎস্নার আলো অত্যাধিক ক্লিশে বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। অন্ধকার এই হিংস্র রুশসেনাদের হাত থেকে কিভাবে সবাই-কে বের করে নেওয়া যায়? ভাবতে লাগলেন মিশ রুশলানা। একমনে ভাবতে লাগলেন আর খুঁজতে থাকলেন পথ। এক সংকীর্ণ অব্যাহতির পথ। বাইরে ভোর হচ্ছে। আকাশের কাছাকাছি থাকা পাখিরা সবার আগে সেই বার্তা পেয়ে উঠে পড়েছে। কান পাতলেই তাদের ব্যস্ত সমস্ত ডাক শুনতে পাওয়া যায়।
[পাঁচ]
মিস রুশলানা ফিরে গেছেন ইউক্রেনে। তিনি একা নন , তাঁর সাথে তিনি মুক্ত করেছেন এই ক্যাম্পের সমস্ত কয়েদিদেরকেও।
কিভের থেকে একশো কিলোমিটার দূরে এক আর্মি ক্যাম্পে রয়েছেন তিনি। মিস রুশলানা বাকী কয়েদিদের কাছে মুক্তিদাতা । সাক্ষাত ভগবান।
এখনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ হয়নি দুই দেশের। মিশ রুশলানা নিজেও জানেন না, কবে, কি ভাবে এই হিংস্র খুনি যুদ্ধ বন্ধ হবে?
যুদ্ধজয় এর ধারনা ভীষণ জটিল। যুদ্ধ একটি জটিল সামাজিক ঘটনা, যা একটি তথাকথিত দুষ্ট সমস্যা, জটিল এবং অস্পষ্ট হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাহলে, আধুনিক যুদ্ধে বিজয় কী? ইতিহাস দেখায় যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ীরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে হেরেছে বা পরাজিতরা বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। ইরাক এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধের মতো সাম্প্রতিক সশস্ত্র সংঘাতগুলি দেখিয়েছে যে কৌশলগত সাফল্য একা সামরিক শক্তি দ্বারা অর্জিত হতে পারে না এবং বিজয়ের জন্য শুধুমাত্র বিরোধীদের সামরিক সক্ষমতার পরাজয় নয় বরং মূলে থাকা গভীর সমস্যার সফল সমাধানও প্রয়োজন।
প্রকৃত জয়ের কথা সত্যি করে অনুসন্ধান করলে তা পরাজয় থেকে আলাদা করা ভীষণ কঠিন। জয় ও পরাজয় ভীষণভাবে আপেক্ষিক। তবে একটা কথা ধ্রুব সত্যি, যেকোনো যুদ্ধে লাভের চাইতে ক্ষতির পাল্লা বেশি।
এইসব জটিল কথা ভাবতে ভাবতে মিশ রুশলানা হেঁটে যাচ্ছেন নিজের অফিস ঘরে। সেই দিনটার কথা মনে পড়তেই, সমস্ত শরীর শিউড়ে ওঠে তাঁর। ভিতরে ভিতরে একটা নিস্তব্ধ হিমেল হাওয়া বয়ে যায়। ঠিক যেমন প্রবল ঝড় বাদলের পরে, সমস্ত চরাচর জুড়ে নেমে আসে নীরবতা।
“জেনারেল ইলিয়া, আপনার ল্যাপটপ ওপেন করুন। আপনার হাতে ৩০ মিনিট আছে। আপনি চাইলেই বাঁচাতে পারেন আপনার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে”
জেনারেল অফিস রুমে ল্যাপটপ খুলে বসলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসো উথলো জেনারেল এর পরিবার। স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সহ পুরো পরিবার বন্দি ইউক্রেনের সেনাবাহিনির হাতে। সকলের মুখ বাঁধা। শুধুমাত্র জেনেরেল এর স্ত্রী এর মুখ খোলা। কিছু বলতে পারলেন না তিনি। এত ভয়ে সন্ত্রস্ত শুধু মুখ থেকে উচ্চারিত হোল, ” আমাদের বাঁচাও”
“এখনো পর্যন্ত এরা অক্ষত আছে। কিন্তু…”
মিস রুশলানার কথা শেষ না হতেই, জেনারেল জানতে চাইলেন, “কি চান মিস রুশলানা?”
“নেগোশিয়েশান, মুক্তি…” পাগলের মতো হাসতে লাগলেন মিস রুশলানা। তারপর বললেন, “মেজর সারবেট এখন আপনার অফিসে, আপনার সামনা সামনি বসে। ওর চশমার ফ্রেম রং নীলচে, রয়্যাল গ্রিন টাই আর ব্রাউন জুতো পরে। কি ঠিক বলছি তো?”
জেনারেল একবার মিলিয়ে নিলেন সব কিছু। বুঝতে পারছেন, দুদে গোয়েন্দা মিস রুশলানার আতশ কাঁচের নিচে তিনি বন্দি।
পুনরায় মিস রুশলানা বলতে লাগলেন, “ মেজর সারবেটকে পাঠিয়ে আমার মুক্তির ব্যবস্তা করুণ। সাথে দশটি বাস। বাকী হাজার কয়েদিরও নিঃশর্ত মুক্তি চাই। আর হ্যাঁ, একটু অন্যরকম কিছু করার চেষ্টা করলে আপনার পুরো পরিবার নিমেষে শেষ হয়ে যাবে।“
সমস্ত কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলেন মেজর সারবেট। তিনি জেনারেল ইলিয়াকে কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, “, “যে কোনো পেশা বা শপথের আগে দেশ।“ জেনারেল এর আগে অনেকবার মেজর সারবেট কে এই কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
একটু থেমে মেজর সারবেট বললেন, “তাই এই মুক্তির আগে একবার ভেবে দেখুন জেনারাল, দেশ না আপনার পরিবার? কাকে বাঁচাতে চান আপনি?”
জেনারেল দেখছেন ঘড়ির কাঁটা অতি দ্রুত চলছে। হাতে আর সময় নেই। মেজর সারবেটকে নির্দেশ দিলেন, মিস রুশলানাকে মুক্ত করে সীমানার ওপারে পৌছে দিতে। সাথে আরও হাজার কয়েদির মুক্তি।
সেই মুক্তির কথা ভাবলে মিস রুশলানার মন খুশিতে ভরে ওঠে। এক পা তিনি খুইয়েছেন এই যুদ্ধে। কিন্তু মুক্ত করতে পেরেছেন হাজার জন সেনাকে। তাই এই সুখের ভার, নিজের অঙ্গহানির চাইতে শতগুণে সুখকর। আসলে প্রতিটি সৈনিকের জীবন-ই তো দেশের জন্যে তোলা থাকে। প্রয়োজনে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে হয় দেশের জন্যে। সেই মৃতু গর্বের।
[ছয়]
“ওয়েলকাম মেজর সারবেট” – মিস রুশলানা নিজের হাতখানা বাড়িয়ে দিলেন মেজরের দিকে। নিজের অফিস কক্ষের ভেতরে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন মেজর সারবেটকে।
“এই মিশান আপনাকে ছাড়া কিছুতেই সফল হতো না মেজর।“ মিস রুশলানা আবেগমথিত হয়ে বললেন।
“আপনার সাহায্য ছাড়া পণবন্দি হাজার কয়েদিকেও ছাড়ানো সম্ভব ছিল না মিস রুশলানা। আপনাকে ধন্যবাদ” মেজর সারবেট জানালেন।
জেনারাল ইলিয়ার পারিবারিক ছবি যোগার করে দিয়েছেন মেজর সারবেট। সাথে কয়েকটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের ভিডিও। মেজর সারবেট এর সহায়তায় হাসপাতালের সার্ভাররুম বসে, জেনারেল ইলিয়ার এর পুরো পরিবারের বন্দি অবস্থার লাইভ ভিডিও বানানো গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে। এতটাই জীবন্ত, এতটাই নিপুন জেনারেল এর চোখকেও বিভ্রান্ত করেছিল সেই সিচুয়েশান। ইউক্রেনের সেনাদের হাতে বন্দি ওই লাইভ টেলিকাস্ট পুরোটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে বানানো। জেনারেল এর স্ত্রী এর কণ্ঠস্বর হুবহু এক্কেবারে ওরিজিনাল। জেনারেল ইলিয়াকেও বোকা বানিয়েছে অতিসহজে।
“যেদিন থেকে রুশ সেনারা হানা দিয়েছিল খারকিভ, সেদিন আমি ভেবে নিয়েছিলাম, আমাকে পণবন্দি হতেই হবে। তাই, চারিদিক থেকে ক্ষেপনাস্ত্র উড়ে এলেও আমি পালাই নি, বাড়ি ছেড়ে। পুরোটাই প্ল্যান এর মধ্যে ছিলো” মিস রুশলানা প্রত্যয় এর সাথে কথাগুলো বলছিলেন।
“এক কাপ চা না কফি?” মিস রুশলানা জিজ্ঞাসা করলেন মেজর সারবেটকে?
“কফি হলে ভীষণ ভালো হয়। “ মেজর সারবেট সম্মতি জানিয়ে বললো। তারপর একটা অন্তর্বর্তী বিরতি নিয়ে পুনরায় শুরু করলেন।
ইতিমধ্যে কফি এসে পড়েছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে মেজর জিজ্ঞাসা করলেন, “ আপনি কি করে বুঝলেন আমি রাশিয়ান আর্মিতে কাজ করলেও, ইউক্রেনের গুপ্তচর?”
মিস রুশলানার মুখে বিদ্যুৎ এর ঝলক খেলে গেলো। তিনি বললেন, “ ইউক্রেনের গুপ্তচর বিভাগের প্রধান হিসাবে, আমি আগেই জানতাম আপনাকে। তাই আপনাকে প্রশ্ন করতে হয়নি কখনো।“
মেজর সারবেট অবাক হলেন না তাতে।
“আরও একটা বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। জেনারেলকে আমার পোশাক এর যে বিবরণ সেদিন দিয়েছিলেন, তা যে আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল জেনারেল ভাবতেও পারেননি। আপনার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা না করে পারছি না মিস রুশলানা।“ মেজর সারবেট হাসতে হাসতে বললেন।
ছোট্টদেশ ইউক্রেন। পারমানিবক শক্তি নেই রাশিয়ার মতো। কিন্ত দেশটা সুজলা সুফলা, প্রচুর শস্যে ভরপুর। প্রকৃতি ঢেলে দিয়েছে এই দেশকে। সাথে দিয়েছে উন্নত সাইবার শক্তি, প্রচুর বুদ্ধিমত্তা আর ভালোবাসাকে ভর করে লড়াই করার শক্তি।
মিস রুশলানা ও মেজর সারবেট জানেন, আজকের পৃথিবীতে ‘শুধু মুক্ত বাণিজ্য, মুক্ত দেশ, মুক্ত গণতন্ত্র আছে কিন্তু কোথাও মুক্ত মানুষ নেই।’
বিঃদ্রঃ পুরো গল্পটাই কাল্পনিক। তাই বাস্তবের কোনও ঘটনার সাথে মিলে গেলে, তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়।
***সমাপ্ত***
