বিরিয়ানির টানে দক্ষিণে
অরুণাভ দাস
আম্বুর থেকে থালাসেরি
ছোটোবেলায় বাইরে খাওয়ার চল ছিল না বললেই চলে। নতুন কিছু রান্নার কথা উঠলেই বাবা ফর্দ করে সব উপাদান কিনে এনে হাজির করত। তাই মাত্র দুই রকম বিরিয়ানির নাম শুনে আর বছরে বড়োজোর দুই-তিন দিন খেয়ে বড়ো হয়েছি। সেগুলি হল আওয়াধি বিরিয়ানি এবং হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি। সে সময় কলকাতা শহরের খুব কম জায়গায় এ সব খানদানি খাবার পাওয়া যেত। শহরতলিতে থাকতাম বলে গিয়ে খাওয়া ছিল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। ফলে সচরাচর সে সৌভাগ্য হয়ে উঠত না। বরং আমাদের ছোটোবেলায় বাইরে খাওয়ার স্মৃতি জুড়ে আছে মোগলাই পরোটা, নানা রকমের চপ কাটলেট। আরেকটু বড়ো হবার পর মেন রোডে রোল ও চাউমিনের দোকান গজিয়ে উঠতে দেখলাম। কলেজে উঠে প্রথম জানতে পারলাম, আলু দেওয়া বিরিয়ানি একান্তই আমাদের শহরের ডেলিকেসি ও অযোধ্যার নবাবকে কেন্দ্র করে নানা গল্প পল্লবিত হয়ে আছে গল্প-কথায়। এরই নাম কলকাতা বিরিয়ানি। কিন্তু এই জ্ঞানটি নিতান্তই অর্বাচীন কালের যে, উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম ভারত মিলিয়ে যত রকমের বিরিয়ানি, তার চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি দক্ষিণ ভারতের বিরিয়ানি। তবে, রসিকজন দক্ষিণের তথাকথিত সব বিরিয়ানিকে আদপে বিরিয়ানি পদবাচ্য বলতে নারাজ। আসলে দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দারা ভাতের মধ্যে নানা রকমের বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন। সবচেয়ে পরিচিত কার্ড রাইস ও লেমন রাইস। মশলা মাখানো ভাতমাত্রেই তাদের কাছে বিরিয়ানি বলে গণ্য হয়, এমন এক ধরনের ধারনা প্রচলিত, যার সবটা অসঙ্গত বলা যাবে না। কিন্তু এখানে বিতর্ক সরিয়ে রেখে সুখাদ্যের রসটুকু গ্রহণ করার চেষ্টা করা যাক।
স্মৃতি ঘেঁটে যতদূর মনে পড়ছে, দক্ষিণ ভারতের বিরিয়ানি প্রথম পরখ করেছি স্কুলের ছাত্রদশায় অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়া স্টেশনের রিফ্রেসমেন্ট রুমে করোমণ্ডল এক্সপ্রেসে সেকালের মাদ্রাজ ও আজকের চেন্নাই যাওয়ার পথে। উত্তর ভারতের বিরিয়ানি খাওয়া জিভ দক্ষিণের প্রথম অভিঘাত ভালোভাবে নিতেই পারেনি। আজ অনেক বছর পর এর বেশি কিছু মনে নেই। তার কিছুদিন পরে সুদূর দক্ষিণের বিরিয়ানি খেয়ে প্রথম মুগ্ধ হওয়া মীনাক্ষী মন্দিরের শহর মাদুরাইতে।বস্তুত মাদুরাইয়ের সব আমিষ খাবার একেবারেই মৌলিক চরিত্রের। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না এবং প্রথম পরিচয়ে মুগ্ধ করে।মাদুরাই ছেড়ে আমার জীবনে দক্ষিণী দিগন্ত প্রসারিত হতে সময় লাগেনি। কারণ আমার দিদির সপরিবারে দীর্ঘকালীন মাদ্রাজ প্রবাস। কলেজে পড়ার সময় গরম বা পুজোর ছুটি হলেই ওদের বাড়ি চলে যেতাম এবং সেখানে দুদিন কাটিয়ে হুট ভ্রমণে আরো দক্ষিণে।এর অনেক আগেই হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির অতুলনীয় সবাদ গ্রহণ হয়ে গিয়েছে চারমিনারের শহরেই। কিন্তু সেইচেনা ভুবনের বাইরে প্রত্যন্ত দক্ষিণ ভারতের আরো কয়েকটি বিরিয়ানির পীঠস্থান আমার ভালোলাগার মানচিত্রে চিরকালিন জায়গা করে নিয়েছে। এদের মধ্যে একটি থালাসেরি বিরিয়ানি, যার উদ্ভব ও বিকাশস্থল কেরালার থালাসেরি বা তেল্লেচেরি। অন্যটি চেন্নাই বাঙালোর হাইওয়ের ধারে আম্বুর শহরের বিখ্যাত আম্বুর বিরিয়ানি। ইতিহাস বলে, আর্কটের নবাবের ব্যক্তিগত পাচক হাসিন বেগ নবাবকে খুশি করতে প্রথম নিজস্ব রেসিপি অনুযায়ী বিরিয়ানি রান্না করেন। নবাবের রসনা তৃপ্তির পর সেই বিরিয়ানির মাহাত্ম্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে ও আর্কট বিরিয়ানি নামে পরিচিত হয়। সেই ব্জ্রিয়ানিই এখন সারা দেশে আম্বুর বিরিয়ানি নামে সুপরিচিত।
একটা সময়ে চেন্নাই থেকে বাঙালোর গাড়িতে যাতায়াত করেছি অনেকবার। তখনই ভেলোর জেলায় ট্যানারি শিল্পের জন্য বিখ্যাত এ জায়গার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। কিন্তু কেউ বলে দেয়নি যে, আম্বুরের বিরিয়ানি বিখ্যাত। একবার যাত্রাপথে প্রথম জানালেন গাড়ির চালক। কথায় আছে, যতদিন বাঁচি ততকদিন শিখি। সেই তামিল শিক্ষকের সঙ্গেই আমার প্রথম আম্বুর বিরিয়ানির সবাদ গ্রহণ। যেখানে খেতে গিয়েছিলাম সে বিপনীর নাম স্টার আম্বুর বিরিয়ানি। আসলে আর্কটের নবাবি হেঁসেলের এই ডেলিকেসি আম-জনতার ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছে আম্বুর শহরের স্টার বিরিয়ানি হোটেল। এ ছাড়াও এখানে বেশ জনপ্রিয় রহমানিয়া বিরিয়ানি হোটেল, যা নাকি ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত। একবার স্টারে টেবিল খালি না পেয়ে ডিলাক্স বিরিয়ানি হোটেল নামে আরেকটি নতুন জায়গায় খেয়েছিলাম। খুব একটা খারাপ লাগেনি। আম্বুর শহরের সব বিরিয়ানি হোটেলের নিজস্ব ক্লায়েন্টে গড়ে উঠেছে, তখনই বুঝেছি। আরো একটা মজার খবর সেদিন জেনেছিলাম, তা হল, তামিলনাড়ুর ভেলোর ও তিরুপাট্টুর জেলার অনেক লোক একেই আবার বলে থাকেন সিরাগা সাম্বা বিরিয়ানি। এটি আসলে এক বিশেষ ধরনের চালের নাম। সিরাগা সাম্বা চালের সঙ্গে মুরগির টুকরো ও নানা ধরনের মশলার সংমিশ্রণে আম্বুর বিরিয়ানি তৈরি করা হয়। লঙ্কার পেস্ট মেশানো হয় বলে অনভ্যস্ত মুখে খেতে গিয়ে একটু ঝাল লাগে। গাড়ির চালককে দেখেছিলাম প্লেটের পাশে এক গ্লাস থামস আপ নিয়ে বসতে। যাইহোক, আম্বুর বিরিয়ানির সুগন্ধ চেনা বিরিয়ানির থেকে আলাদা রকমের। মুরগি বা পাঁঠার মাংস যাই দেওয়া হোক না কেন আম্বুর বিরিয়নিতে অন্য বিরিয়ানির তুলয়ায় মাংসের ভাগ বেশি থাকে। অথেনটিক বিরিয়ানি রান্না করা হয় কাঠের জবালে, যার জন্য সবাদ ও সুগন্ধ আরো অনেক বেড়ে যায়। আম্বুর বিরিয়ানির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, এতে কোনোরকম গুঁড়ো মশলা ব্যবহার করা হয় না। লঙ্কা থেকে গরম মশলা সব ক্ষেত্রেই কেবল বাটা মশলা ব্যবহার করা হয়। সব মিলিয়ে কিন্তু খুব তেল-মশলাদার বিরিয়ানি বলা যাবে না। হালকা কিন্তু অভিনব ধরনের ভালো খেতে। এইসব তথ্য কিন্তু এক দিনে যোগাড় হয়নি। বার বার গিয়ে খাওয়ার অবসরে সংগ্রহ করা নানা জনের কাছ থেকে। ভাবলে নিজের ওপরেই রাগ হয়, যখন আম্বুর বিরিয়ানির নামগন্ধ জানা ছিল না তখন চেন্নাই থেকে বাঙালোরের রাস্তায় রানীপেট নামে এক জায়গায় মামুলি ইডলি, ধোসা ও বড়া খেয়ে যাত্রা করেছি কত কত দিন। শুধু কী আর এই রাস্তায়,সারা দেশের কত পথে, কত স্থানে অনেক খাওয়াই বাকি পড়ে গিয়েছে অজ্ঞতার কারণে।
মালাবার উপকূল অঞ্চলের বিরিয়ানি, বিশেষ করে থালাসেরি বিরিয়ানির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে চেন্নাই-বাঙালোর হাইওয়েতে বার বার চলাচলের মতো থালাসেরি বা কেরালার তেল্লেচেরিতে একবারের বেশি যাওয়া হয়নি। বিরিয়ানি ও অন্যান্য বিখ্যাত আমিষ খাবার চেখে দেখতেই যাওয়া হল এই তো সেদিন, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। এই জায়গা যে খাদ্যরসিকদের পীঠস্থান তা অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু দূরত্ব ও উপযুক্ত সফরসঙ্গীর অভাবে যেতে এতটা দেরি হয়ে গেল। বাঙালোরে বন্ধুর বাড়ি বার বার যাওয়া হয়। নিয়মিত খাওয়া হয় ইতিউতি। ২০১৯ এ ল্যান্ড করতেই বন্ধু জানিয়ে দিল, তার বাড়ির খুব কাছেই রারা এভিস নামে একটি রেস্তোরাঁ চালু হয়েছে। তাদের আসল কর্মভূমি কেরালার মালাবার উপকূলের শহর থালাসেরি। সেখানকার মাপিলা কুইজিন সম্পর্কে আগে থেকে ধারনা ছিল, পূর্বেই লিখেছি। মূলত থালাসেরির মৌলিক মাছ রান্নার কলাকৌশল সম্পর্কে সানান্য পড়াশোনা ছিল। সেইরকম কিছু পদ পরখ করে দেখব, এই আশা নিয়ে দুবন্ধুতে এক সন্ধ্যায় খালিপেটে উবর ক্যাব চড়ে সাকেত নগরের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম। ঝাঁ চকচকে রারা এভিস রেস্তোঁরা ভেতরে ও বাইরে সমান আকর্ষকভাবে সাজানো। সন্ধেবেলা খাদ্যরসিকদের ভালোই ভিড় হয়েছে। খালি টেবিল খুঁজে পেতে সাহায্য করলেন একজন কর্মী। অর্ডার করা হল সি ফুড স্যুপ, ফিস বিরিয়ানি, ম্যাঙ্গো ফিস কারি ও আইসক্রিম ফিরনি। খাবার আসার আগের সময়টুকুতে চারদিকের টেবিলে চেয়ে চেয়ে দেখলাম, মূলত নানা রকমের বিরিয়ানি খেতেই ব্যস্ত অধিকাংশ লোকজন। তার সঙ্গে অবশ্য বিচিত্র সব সাইড ডিস পরিবেশিত হচ্ছে। দশ বারো মিনিটের ভেতরে আমাদেরও খাবার দিয়ে যাওয়া হল। প্রথমে সি ফুড স্যুপ। বেশ নতুন রকমের খেতে। স্যুপ ফুরোবার আগেই মেন কোর্স পরিবেশিত হয়ে গেল। সুগন্ধি ভাতের শয্যার ওপরে বোনলেস মাছের কিউব দেখতে যেমন অপূর্ব, তেমনই সবাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। বিরিয়ানির সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করল সূর্যাস্ত রঙের গ্রেভির ভেতরে ভেসে থাকা কাঁচা আমের পাতলা টুকরো সহযোগে কয়েক পিস কিং ফিস। এমন সবাদ এবং কম্বিনেশনের খাবার আগে খেয়েছি বলে মনে পড়ল না। শেষ পাতে হিমশীতল ফিরনি দিয়ে জমে গেল মিষ্টিমুখ। সেই থেকে আমাদের থালাসেরি ক্যুইজিনের প্রেমে পড়া, বিশেষ করে বিরিয়ানির। ভারতের পশ্চিমে সমগ্র মালাবার ও কোঙ্কন উপকূলে বেশ কয়েকটি মৌলিক চরিত্রের বিরিয়ানি রান্না করা হয়। তাদের মধ্যে মালাবারের বাসিন্দা মাপিলা বা মোপলা সম্প্রদায়ের থালাসেরি বিরিয়ানির স্থান রসিকজনের কাছে সবার ওপরে। এই কথাটি সেদিন সন্ধ্যায় বাঙালোরের রারা এভিস রেস্তোরাঁয় একাধিক খাদ্যরসিকের মুখে শুনেছি। রাতে বাসায় ফেরার পর মনের কথাটি কী কৌশলে জানতে পেরে বন্ধু নিজেই বলে দিল, পরের ছুটিতে চলো থালাসেরি।
কিন্তু ইচ্ছা প্রবল হলে দ্রুত উপায় বেরিয়ে যায়। সেবারেই আমাদের পশ্চিমঘাট পর্বতের ছায়ায় ওয়াইনাডে চা-কফির বাগান ঘুরে ইতিহাসের কালিকট বা আজকের কোঝিকোড় যাওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই হয়ে ছিল। একটি দিন কেবল বাড়িয়ে নেওয়া হল কলকাতা ফেরার বিমানের টিকিট সহজেই অনলাইনে রিশেডিউল করে। কালিকট থেকে থালাসেরি গাড়িতে মাত্র ৭০-৭৫ কিমি। কালিকটের ঐতিহাসিক সুইট মিট স্ট্রিট হালুয়া ভক্তদের একটি প্রিয় ঠিকানা। কত রকমের যে হালুয়া কিনতে পাওয়া যায় তার কোনো লেখাজোকা নেই। বিস্তারিত লিখেছি পূর্ব প্রকাশিত ‘রসনার রুটম্যাপ’ বইতে। কালিকটের নানা হোটেল রেস্তোরাঁয় নানা ধরনের আমিষ খাবারও বেশ উপাদেয়। এইসব নিয়ে একটা দিন ফুটবল-পাগলদের শহতে বেশ আনন্দে কাটিয়ে দেওয়া গেল। বাজারে ঘুরে ঘুরে নানা রকমের মশলা কেনা হল কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরেই আগের দিন ভাড়া করে রাখা গাড়িতে থালাসেরি।
কেরালার উপকূলবর্তী সেকালের তেল্লিচেরি ও আজকের থালাসেরি মূলত মাপিলা বা মোপলা সম্প্রদায়ের মুসলমানদের বাসভূমি। ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে মোপলা বিদ্রোহের কথা ভালোই জানা ছিল। কিন্তু সেইসব ইতিহাসের বইতে মাপিলাদের খাওয়াদাওয়ার কথা কিছুই লেখা ছিলনা। পরে গুগলবাবার কল্যাণে তাদের মৌলিক ধরবেরখাদ্য সংস্কৃতির কথা প্রাথমিকভাবে জানতে পারি। সেই ধারনার গোড়ায়েই ধোঁয়া দিল বাঙালোরে রারা এভিসের খাওয়াদাওয়া।
খ্রিষ্টজন্মের অনেক আগে থেকেই মাপিলারা উপকূলীয় কেরালায় বসবাস করতে আসে আরব দেশ থেকে। চাষাবাদের সঙ্গে তারা ক্রমশ ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দেয়। থালাসেরি অঞ্চলের গোলমরিচ ও অন্যান্য মশলার বাণিজ্য একটু একটু করে সাগরপারের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে মাপিলারাও ভাগ্যের সন্ধানে তাতে যোগ দেয়। আরব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূর ইউরোপ মহাদেশের রোম থেকে বণিকরা আসত মালাবার উপকূলে। তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মেলামেশা করার ফলে মাপিলাদের জীবনধারা ও সংস্কৃতির ওপরে পশ্চিমী সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে শুরু করে। আবার ইউরোপীয়দের খাদ্যাভ্যাসে গোলমরিচ সহ নানারকম ভারতীয় মশলার ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে। পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ ও আরব জাতির প্রভাবে মাপিলা রন্ধনশিল্পে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার সমন্বয় ঘটতে থাকে। কিন্তু মাপিলারা তাদের পুরনো অভ্যাস অনুযায়ী রান্নায় নারকেল ও নারকেলের দুধ ও দইয়ের ব্যবহার ছাড়েনি। এ ছাড়া গরম মশলা, লঙ্কা ও কারিপাতা মাপিলা রান্নাবান্নার মৌলিক ধারাটি ধরে রাখে। ফলে এক অভিনব ও আশ্চর্য সুন্দর সবাদের দুনিয়া গড়ে ওঠে থালাসেরিকে কেন্দ্র করে। সেই দুনিয়ার শীর্ষবিন্দু আলো করে আছে থালাসেরি বিরিয়ানি। কিন্তু এখানকার অন্যান্য পদও সবাদে গুণে অতুলনীয়। যেমন, কলাপাতায় মুড়ে ভাতের সঙ্গে একসঙ্গে রান্না করা মীন পাথিরি, যা এখানে অনেকেই মধ্যাহ্ন ভোজ হিসাবে গ্রহণ করে। ভাত ও নারকেলের মিশ্রণে তৈরি পুট্টু তো থালাসেরির সীমানা ছাড়িয়ে কেরালার স জায়গাতেই অতি সুলভ। এখানে আসার দুদিন আগে ওয়াইনাডের থোলপেট্টি অভয়ারণ্যের গায়ে এক রিসর্টে মাংসের ছোটো ছোটো টুকরো সহ বাঁশের মধ্যে ভরে রান্না করা এক বিশেষ ধরনের পুট্টু খেয়েছি, যার নাম ইরাচি পুট্টু। মাপিলাদের ডিনারে পুট্টু খুবই প্রচলিত। কিন্তু সাধারণ বাঙালি পেটে নারকেলের আধিক্য কতটা সহ্য হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। মাপিলারা বার ব্রেকফাস্টে ডিম মিশ্রিত বিশেষ ধরনের ভাতের প্যানকেক খেয়ে থাকে যার স্থানীয় নাম মুট্টা সিরকা। তাদের নিরামিষ ডিসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আলিসা। কেরালার অন্যান্য জায়গাতে রান্নার উপাদান হিসাবে নারকেল তেল ব্যবহার করা হলেও থালাসেরিতে সাধারণত তার জায়গায় ঘি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এই জন্যই বলা হয় যে, এখানকার রন্ধনপ্রণালীতে আরব দেশের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আমরা মাত্র একদিনে এত কিছু খাওয়ার অভিল্বনক্যে থালাসেরি আসিনি। অন্য ঘোরা থেকে একটু সময় বার করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আপাতত সুপ্রসিদ্ধ বিরিয়ানি প্রখ করা যাবে, এই আশাতে নাচতে শুরু করেছে প্রাণ-মন। নানা উৎস থেকে যতখানি তথ্য সংগ্রহ করা গিয়েছে তা থেকে থালাসেরির সেরা বিরিয়ানি খাওয়ার জায়গাগুলির একটি তালিকা কোঝিকোড় থেকে গাড়িতে ওঠার আগেই পকেটে সযত্নে ভরে নিয়েছি। সেই তালিকায় রারা এভিসের নাম তো আছেই, তার সঙ্গে জায়গা পেয়েছে জুবিলি, ওল্ড ও নিউ প্যারিস রেস্তোরাঁ, থালাসেরি বিরিয়ানি হাট, বম্বে হোটেল, সালিম হোসেনস পার্ক ভিউ ইত্যাদি।
গাড়ির জানালা দিয়ে থালাসেরি শহরের একাংশ দেখা গেল। সুন্দর পথঘাট। চারদিকে গাছপালা। তার মধ্যে নারকেল গাছের আধিক্য। কোথাও ঘনবসতি তো কোথাও বিরল। ঢেউখেলানো লাল টালির ছাদওয়ালা ঘরবাড়ি দেখে থালাসেরির প্রাচীনত্ব বোঝা যায়। যেখানে খেতে ঢুকলাম সে ইমারতটিও পুরনো রীতি মেনে নির্মিত। ওল্ড প্যারিস রেস্তোরাঁ ৬৬ নম্বর হাইওয়ের পাশেই মাট্টামপারাম রোডের ওপরে। টালির চালা দেওয়া ইউরোপীয় ধাঁচের একতলা সাদা বাড়ি। ভেতরে ঢুকে দেখি হলঘর সাদামাটাভাবে সাজানো, কিন্তু নজর কাড়ার মতো পরিচ্ছন্ন। ওল্ড প্যারিস রেস্তোরাঁ নাকি সকাল সাতটা বাজতেই খুলে যায়। সে সময় এখানে ব্রেকফাস্ট খাওয়া যায়। ভিড় করে পরোটাপ্রেমিরা। বেলা বাড়লে বিরিয়ানি খানেওয়ালারা টেবিল চেয়ার দখল করে। আমাদের ঢুকতে বেলা দেড়টা বেজে গিয়েছে। ততক্ষণে বিরিয়ানি প্রেমিদের ভালোই ভিড় জমেছে। মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর খালি চেয়ার পাওয়া গেল। একেবারেই সাদামাটা অর্ডার দেওয়া হল, মাটন দম বিরিয়ানি ও স্যালাড। সাদা প্লেটে সাজিয়ে হালমা রঙদার বিরিয়ানি টেবিলে নামতেই খুশবুতে শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠল। সারা হলঘরেই সুঘ্রাণ। কিন্তু কোনোভাবে উগ্র বা মসলাদার বলা যাবে না। চামচে করে মুখে তুলতেই ম্যাজিক। পেলব এক সবাদের ইন্দ্রজাল জিভ ছাড়িয়ে নিমেষে ছড়িয়ে যায় অন্তরাত্মায়। এতদিন যত রকমের বিরিয়ানি খেয়েছি, তাদের সবার থেকে আলাদা থালাসেরি বিরিয়ানি। মাটনের বড়ো টুকরোতে কামড় বসিয়ে দেখি নরম তুলতুলে। এক লহমায় হাড় থেকে মাংস আলাদা হয়ে গেল। উত্তর ভারতে বিরিয়ানি প্রস্তুত করার জন্য পারস্যের ধারা অনুসরণ করা হয় অনেকাংশে। যেমন, মাংসের টুকরো নরম করতে টক দই মাখিয়ে কয়েক ঘণ্টা ম্যারিনেট করা হয়। অন্যদিকে আরব দেশের ধারা অনুযায়ী তেল্লেচেরি বিরিয়ানির মাংস নরম করার জন্য ম্যারিনেট না করে সরাসরি অনেকখানি সময় ধরে দমে রান্না করা হয়। তাপ প্রয়োগ করা হয় পাত্রের ওপর এবং নীচ উভয় দিক থেকে। অভূতপূর্ব রসনার সাগরে অবগাহন করতে গিয়ে কয়েক মিনিট কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধুরও একই অবস্থা। অথচ আমাদের চারপাশে চেয়ারে চেয়ারে স্থানীয় মানুষজন বিরিয়ানি ভোজনের আনন্দ নিতে নিতে জোর গলায় আড্ডা জমিয়েছে মালয়ালম ভাষায়। কেই কেউ বিরিয়ানির প্লেট ফুরিয়ে ফেলে আয়েস করে চুমুক দিচ্ছে দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত ফিল্টার্ড কফির গ্লাসে। এতদিনে জেনে গেছি এই অঞ্চলে সকলে কফিকে আদর করে ডাকে ‘কাপি’।
বিরিয়ানি ফুরিয়ে গেলে আমরাও কাপি পান করলাম। তারপর মাপিলা বণিকদের ইতিহাসের শহরে উদ্দেশ্যহীন এক চক্কর ঘোরাঘুরি। সন্ধে নাগাদ বড়ো শহর কোঝিকোড় পৌঁছে যাওয়া।
ডিণ্ডিগুলের থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি
গত শতকের শেষ দশকে, যখন আমি যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্র তখন বিকেলের দিকে নিয়মিত যাতায়াত ছিল একাডেমি ও রবীন্দ্রসদন চত্বরে। শিল্প সংস্কৃতির প্রতি টান ছাড়াও নানারকম মানুষ দেখার নেশায় একা বা সবান্ধব চলে যেতাম বিকেলের দিকে। ওখানেও কিছু বন্ধু জুটেছিল। তারা অপেক্ষা করত। মোবাইল ফোন ছিল না যে যখন তখন কথা হবে। মাঝেমধ্যে দেখা করে সামনাসামনি কথা বলাই ছিল বন্ধুত্ব রক্ষার দস্তুর। ১৯৯০ এর দশকের প্রথমদিকে ইউনিভার্সিটি থেকে বা আমাদের শহরতলির বাড়ি থেকে রবীন্দ্রসদন পর্যন্ত যাতায়াত আজকের মতো সহজ ছিল না। একের পর এক ট্রেন ও বাস বদলের ঝামেলা। কিন্তু অদম্য এক নেশার টানে যেন সপ্তাহে তিন-চারদিন চলেই যেতাম। ওখানে বেশ মজায় সময় কাটত। একদিন এক চিত্রশিল্পী দাদাকে যাতায়াতের ঝক্কির কথা এবং ওই এলাকায় যাবার জন্য আমার পাগলামির কথা বলতেই সে দূর থেকে একজন মানুষকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘তোরটা কিছুই পাগলামি নয়। আসল পাগল চিনে রাখ। কলকাতার বাইরে কোথাও বাড়ি বলে শুনেছি। এই চত্বরে এ শীত গ্রীষ্ম বারোমাস আসে। কাউকে কখনো ডিস্টার্ব করে না। আপন মনে ঘুরে বেড়ায়, গাছতলায় বসে জিরোয় আর সর্বক্ষণ রবীন্দ্রনাথের গান গায় আর কবিতা আবৃত্তি করে চলে। অন্যকে জাহির করার কোনো তাগিদ নেই, নিজেকেই শোনায়। এখন এখানে আসা সকলেই চিনে গিয়েছে। কেউ ঘাঁটায় না, কুশল বিনিময় করা ছাড়া। আমরা এর নাম দিয়েছি রবীন্দ্র-পাগল।’ সেদিন দারুণ অবাক হয়েছিলাম ব্যতিক্রমি মানুষটিকে দেখে। তারপর থেকে ওই এলাকায় গেলেই মানুষটিকে খুঁজতাম। সহজেই দেখা পেতাম আর ভাবতাম দুনিয়ায় কত রকমেরই না পাগল আছে! বাড়ি ফিরে গিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় রবীন্দ্র পাগলের গল্পও করেছি হয়তো। আজ সবই কম করেও তিরিশ বছর আগে ফেলে আসা স্মৃতি। কিন্তু এক বিন্দু ভুলতে পারিনি, যদিও এই দীর্ঘ সময়ের অবকাশে নিজের শহর ছাড়িয়ে দেশের নানা স্থানে এমন বহু বিস্ময়কর আত্মভোলা মানুষ দেখা হয়ে গিয়েছে, যাঁদের অদ্ভূত শখ পাগলামির পর্যায়ে পড়ে। হতে পারে, আমাদের কাছে যা অদ্ভূত মনে হয়, তা হয়তো ওইসব মানুষের কাছে স্বাভাবিক, মহা মূল্যবান মানবজীবন লাভের উদযাপন।
২০১৩ সালের ৩ আগস্ট দ্য হিন্দু পত্রিকায় লেখা হয়েছে এমনই এক বিচিত্র মানুষের কথা। তিনি এক বিস্ময়কর ভোজনরসিক। তখনই ৬০ বছর বয়সী শ্রী নাল্লাথাম্বি প্রতিদিন দুপুরে ২০ + ২০ মোট ৪০ কিমি বাসযাত্রা করতেন তামিলনাড়ুর গ্রাম থেকে ডিন্ডিগুল শহরে যাওয়ার জন্য। একটাই কারণ, দুপুরবেলায় তামিলনাড়ুর বিখ্যাত ডিন্ডিগুল বিরিয়ানি খাওয়া। অসুস্থ হলে এবং বিশেষ কোনো কাজ পড়ে গেলে তিনি দু-একদিন যেতেন না, কিন্তু বছরে ৩৫০ দিন তো যেতেনই এবং খেতেনই। মানুষটির কথা পড়া ইস্তক মাথার ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল। কী এমন আছে ডিণ্ডিগুল বিরিয়ানিতে যার টান এমন অমোঘ, সরেজমিনে পরখ করতে তো হবেই একদিন না একদিন। তারপর বছরের পর বছর গিয়েছে, কিন্তু কথাটা ভুলিনি।
অনেকেই জানেন না, উত্তর ভারতের থেকে দক্ষিণ ভারতীয় বিরিয়ানির ভ্যারাইটি বা বৈচিত্র্য অনেক বেশি। নানা শহর ও অঞ্চল তাদের নিজস্ব ধারায় বিরিয়ানি তৈরি করে বিখ্যাত। তেমনই একটি শহর পাহাড়তলির ডিন্ডিগুল। একই নামের জেলার সদর শহর। এখানকার বিরিয়ানি আর এখানকার বিশাল আকারের কলা সমগ্র তামিলনাডুতে আলাদা মর্যাদা পায়। তবে দক্ষিণ ভারতে যা বিরিয়ানি নামে পরিচিত তার সবগুলিই বিরিয়ানি পদবাচ্য কী না, তা নিয়ে রসিকমহল দ্বিধাবিভক্ত। কিন্তু ডিণ্ডিগুল বিরিয়ানি নিয়ে বিতর্ক তেমন চোখে পড়েনি। সেই বিরিয়ানির জন্য পাগল মানুষটির কথা পড়ার পর থেকে ডিন্ডিগুল বিরিয়ানির স্বাদ নেওয়ার জন্য উতলা হয়েছিলাম। বছর চারেকের অধীর অপেক্ষার পর অবশেষে একদিন সেই সুযোগ মিলে গেল। মাদুরাই থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে ডিণ্ডিগুলের উদ্দেশে পাড়ি দিলাম এক সকালে। শ্রী নাল্লাথাম্বি যে জিনিসের টানে রোজ ৪০ কিমি পাবলিক বাসে যাতায়াত করেন, খ্যাতনামা অভিনেতা শিবাজি গনেশন ওইদিকে গেলে প্রবল ব্যস্ততার ফাঁকে যেখানে খেতেনই, তার জন্য ৬৬ গুণিতক দুই কিমি চলতেই পারি, হোক সে একদিনের পাগলামি। রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ডিন্ডিগুল ৪২০ কিমি দূরে।
পাহাড়ের নীচে ছবির মতো ডিন্ডিগুল শহরের পথেঘাটে বিরিয়ানির দোকান কম নেই। প্রতিটিরই নিজস্ব ক্লায়েন্টেল তৈরি হয়ে গিয়েছে। ডাইন ইন ও অনলাইন ডেলিভারি চলছে রমরম করে। আমরা আগে থেকেই জেনে নিয়েছিলাম একটি বিশেষ জায়গার কথা, ডিন্ডিগুল বিরিয়ানির গৌরবগাথা যেখান থেকে শুরু কম করেও ৬৫ বছর আগে। আরো খোলসা করে বলা যাক। ডিন্ডিগুল বিরিয়ানিকে সারা দক্ষিণ ভারতের লোক চেনেন থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি নামে। এই বিরিয়ানির উদ্ভাবক নাগস্বামী নাইডু। ১৯৫৭ সালে তিনি ডিন্ডিগুল শহরে স্থাপন করেন আনন্দবিলাস বিরিয়ানি হোটেল। নাগস্বামী মাথায় এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি পরতেন যার নাম তামিল ভাষায় থালাপা। সেই থেকে তাঁর উদ্ভাবিত বিশেষ রেসিপিতে বানানো বিরিয়ানির নাম থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি। এটি মূলত মাটন বিরিয়ানি। এখন যুগের প্রয়োজনে চিকেন দিয়েও থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি হচ্ছে। কালক্রমে আনন্দবিলাস বিরিয়ানি হোটেলের নাম বদলে গিয়েছে। এখন (২০২১ সালের হিসাব) সারা দক্ষিণ ভারতে থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানির ৮৫টি আউটলেট। এ ছাড়াও সিঙ্গাপুর, আরব আমীরশাহী, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কার মতো বিদেশে রয়েছে ৮টি আউটলেট। মূল বিপনীতে ভিড় থাকলেও জায়গা পেতে অসুবিধা হল না৷ ভেতরটা বেশ সাজানো-গোছানো। অত্যন্ত আধুনিক, আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। একনজরে সাজসজ্জা দেখে খুব ভালো লাগল। এই দোকানের বিশেষত্ব হল, প্রত্যেক টেবিলের ভোজনরসিকদের সাহায্য করতে আলাদা আলাদা সুবেশ ও সদাহাস্যময় কর্মী মোতায়েন থাকেন, (যেমন দেখি মেনল্যান্ড চায়নার মতো সুবিখ্যাত রেস্তোঁরায়) যাদের সকলে ক্যাপটেন বলে ডাকেন। এইসব শিক্ষিত ক্যাপটেন পরীক্ষার নানা পর্যায়ের ভেতর দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তবেই সারা ভারত থেকে নিযুক্ত হন। আমাদের টেবিলের ক্যাপটেনকে দেখলাম তামিল, ইংরেজি ও হিন্দি বলতে সমান দক্ষ। বিরিয়ানি ও কাবাবের বিপননে পেশাদারিত্ব কোন পর্যায়ে উঠে গিয়েছে তা দেখতে হলে থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি হাউসের যে কোনো আউটলেটে ঢুকতেই হবে। তবে, শুধু তো সাজসজ্জা ও আদব কায়দায় হবে না, খাদ্য রসিকদের জিভকেও তৃপ্ত করতে হবে৷ সে কাজেও থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি সব দিক থেকে সফল। এখানে মাটন বিরিয়ানির দাম ৩২৫ টাকা, মাটন কিমা বল বিরিয়ানি ২৯৫ টাকা, চিকেন বিরিয়ানি ২৫৯ টাকা ও চিকেন সিক্সটিফাইভ বিরিয়ানি ২৬৯ টাকা। এছাড়া এগ, ভেজ, পনির, মাশরুম ও ভেজ থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি পাওয়া যায়। আমাদের ক্যাপটেন বলে দিলেন, ডিন্ডিগুল বিরিয়ানি খাওয়ার মজা সবচেয়ে ভালো জপমে ওঠে ‘ডালচা’ নামে এক ধরনের বিশেষ গ্রেভি জাতীয় তরকারির সঙ্গে। এটা আগে থেকে জানাই ছিল না। তাই নতুন কিছু জানার আনন্দে উদবেল হওয়া গেল। মজা পেয়ে লাফিয়ে অর্ডার করা হল। এই ডালচারও আবিষ্কর্তা নাকি নাগস্বামী নাইডু। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খুব একটা বেশি সময় না নিয়েই বড়ো রাইস প্লেটে ভরে বিরিয়ানি ও বাটিতে ডালচা পরিবেশিত হল আমাদের টেবিলে। বিরিয়ানির রূপ দেখে ও সুগন্ধ পেয়েই জিভে জল। মুখে তুলে দেখা গেল স্বাদও খুব সুন্দর এবং প্রচলিত ধারনার থেকে অনেকটাই অন্যরকম। যে চাল এই বিরিয়ানির মূল উপাদান দক্ষিণ ভারতে তার পরিচিতি সিরাগা সাম্বা রাইস নামে। ডিন্ডিগুলের লোক এই চালকে বলেন পারাক্কুম সিট্টু। সিরাগা সাম্বা চালের এমন নামকরণের কারণ হল, ছোটো গোলাকার চালের দানাগুলি জিরার আকৃতির যার জন্য সিরাগা বলা হয়। তামিল সাম্বা সিজনে এই চালের ফলন হয়। সাম্বা মরশুম হল আগস্ট থেকে জানুয়ারি মাস। অন্য ধানের থেকে সিরাগা সাম্বা ধান পাকতে একটু বেশিই সময় নেয়। সুন্দর গন্ধের জন্য একে অনেকে এরোমা রাইস বলেন। পারাক্কুম সিট্টু নামটি তো আগেই লিখেছি। আমাদের পরিচিত জিরাকাটি রাইস সম্ভবত তামিল চাল সিরাগা সাম্বার বাংলা সংস্করণ। তবে একেকরকম আবহাওয়ায় সুগন্ধের তারতম্য একেকরকম হতেই পারে।থালাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত হয় বিশেষ ধরনের দক্ষিণ ভারতীয় মশলার মিশ্রণ, যা নাগস্বামী নাইডু নিজে শিখিয়ে গিয়েছেন উত্তরসূরিদের। এইসব মশলা পড়লে সিরাগা সাম্বা চালের সুগন্ধ আরো খোলতাই হয়। তেল ঘি জাতীয় স্নেহ পদার্থের আধিক্য নেই, কিন্তু মাটনের টুকরোগুলি মুখে ফেলে সামান্য চাপ দিতেই গলে যায়, এতই নরম। এখানেই শেষ নয়, সাইড ডিস ডালচা সব দিক থেকে আলাদা রকম খেতে। টেবিলে পরিবেশিত হতেই চামচ চালিয়ে ও মুখে ফেলে দেখতে চাইলাম কী কী আছে উপাদানের মধ্যে। যা বোঝা গেল, একাধিক রকমের ডালের গ্রেভি, তেঁতুল ছাড়াও টুকরো করে দেওয়া আছে মাটনের হাড়, বেগুন ও আলু। বিচিত্র মশলায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা মিশে অভিনব স্বাদ হয়েছে। এর মশলার ভাগ এখনো গোপন, থালাপ্পাকাট্টির কিচেনের বাইরে বেরোয় না। তবে আরব দেশের হারিস বা আমাদের পরিচিত হালিমের সঙ্গে এর কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পরে জেনেছি, হায়দ্রাবাদেও তাদের নিজস্ব স্টাইলে বানানো ডালচা পাওয়া যায়। থালাপ্পাকাট্টিতে মাটন ডালচা ছাড়াও ভেজ ডালচা হয়, মেনুকার্ডে দেখলাম। কোলাম্বু হল স্যালাড যেখানে পিঁয়াজের আধিক্য। অনেকে ডালচা না খেয়ে উল্লি থাইরু নেন, যাকে স্থানীয় এক ধরনের কারি বলা যেতে পারে, কিন্তু উল্লি থাইরুর স্বাদ ততটা ভালো নয় বলে আমাদের নিতে বলা হয়নি। পরে শুনেছি, কেউ কেউ নাকি আচারের সঙ্গেও থাপাপ্পাকাট্টি বিরিয়ানি খান। কিন্তু এসব নেওয়ার সাহস হয়নি। তার চেয়ে ডালচা অনেক ভালো।
বিরিয়ানির সঙ্গে ডালচা মিশিয়ে মুখে তুলতেই ভালো লাগায় কথা বন্ধ হয়ে গেল। আলাদা করে স্টার্টার হিসাবে ডালচা খেতেও মন্দ লাগবে না বলেই মনে হয়। বিরিয়ানির প্লেট ও ডালচার বাটি চেটেপুটে শেষ করে তবেই মুখ তুলে এ ওর দিকে তাকানো। সকলের চোখে মুখেই সমান মুগ্ধতার উদ্ভাস। একমত হওয়া গেল যে, উত্তরের বিরিয়ানির থেকে এ বস্তু সব দিক থেকে আলাদা ও অন্যরকম, কেবল নামেই মিল। এক সঙ্গী বলেই বসল, বিকেলে মাদুরাই ফিরে তো কোনো কাজ নেই। ডিণ্ডিগুলে এক রাত থেকে গেলেই হয়। তাহলে ডিনারে আবার…”
মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে পড়া শ্রী নাল্লাথাম্বির কথা। তিনি শুধু ডিন্ডিগুল বিরিয়ানির সর্বোচ্চ স্তরের ভক্ত নয়, বেশ উঁচু দরের পাগল। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, আসলে খাদ্যরসিকরা সকলেই অল্পবিস্তর পাগল এবং অঞ্চলভেদে এদেশের খাবারদাবারের এমনই বৈচিত্র্য যে, তা না হবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ভাড়ার গাড়ি ছেড়ে দিতে হবে বলে বন্ধুর প্রস্তাব অনুযায়ী ডিণ্ডিগুলে সে রাতে আমাদের থাকা হয়নি। বুকের ভেতরে ইচ্ছা পুষে রেখেছি ষোলো আনা। দেখা যাক, কোনোদিন পূরণ হয় কি না।
***সমাপ্ত***
