দুর্ঘটনার পর
অনন্যা দাশ
[এক]
সকাল সকাল বোস জেঠুর ফোনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বোস জেঠু আমার নিজের জেঠু নন কিন্তু জেঠুর বাড়া। এককালে আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন আর বাবার বন্ধু, তারপর বাবা রিটায়ার করার পর মা-বাবা কলকাতা গিয়ে বসবাস শুরু করেন কিন্তু জেঠু এদেশেই থেকে যান। ইদানীং আমি পড়াশোনা করতে মার্কিন মুলুকে আসার পর জেঠুর বাড়ি প্রায়ই যাই।
জেঠু ফোনে বললেন, “সুমি তুই চটপট তৈরি হয়ে নে। তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। আমার এক বন্ধু খুব বিপদে পড়েছে তাকে বাঁচাতে হবে যাহোক করে হোক!”
আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে? কী বিপদ?”
“আরে বেচারা খুনের দায়ে ধরা পড়বে মনে হচ্ছে!” জেঠু বললেন।
“ও বাবা! তাতে আমি কী করব?”
“তুই আয় না বলছি!” জেঠু কিছুতেই না শুনবেন না।
চটপট তৈরি হয়ে নিয়ে জেঠুর বাড়ি গেলাম। বেশি দেরি করলে আবার তিনবার ফোন এসে যাবে জানি।
জেঠুও রেডি ছিলেন আমি পৌঁছতেই বললেন, “এই তো সুমি এসে গেছিস, চল ঘুরে আসি।”
জেঠিমা কিন্তু বাদ সাধলেন, বললেন, “মেয়েটা শনিবার দিন সকাল সকাল আসছে বলে আমি লুচি ভাজলাম! লুচি না খেয়ে ও কিছুতেই কোথাও যেতে পারবে না। তোমার বন্ধু এতক্ষণ যখন অপেক্ষা করেছে তখন আরো দশ মিনিটে তার কিছু হয়ে যাবে না!”
আমার ভালই হলে কিছু খেয়ে আসার সময় হয়নি আর জেঠিমার হাতের লুচি আর সাদা আলুর তরকারি যেন অমৃত!
জেঠুর সঙ্গে গাড়ি করে যেতে যেতে কথা হচ্ছিল।
“আমার বন্ধু অমর, মানে অমরজিত সিংয়ের গাড়ি সারাইয়ের গ্যারেজ আছে। অটোফিক্স নাম। ওদের বিশেষত্ব হল বাড়ি গিয়েও গাড়ি ঠিক করে দেয়। কারণ অনেকেই গাড়ি গ্যারেজে ছেড়ে আসতে চায় না। তো যাই হোক হ্যারি ওয়েলস বলে একজনের গাড়ি ঠিক করতে গিয়েছিল অমর কয়েক দিন আগে। গাড়িটাকে ঠিক করে ড্রাইভওয়েতেই রেখে এসেছিল সে। কিছুক্ষণ পর হ্যারি গাড়িটাকে নিয়ে বের হন। সঙ্গে ওঁর ভাগ্নেও ছিল। তখন হঠাৎ বুঝতে পারা যায় যে গাড়ি ব্রেক নিচ্ছে না। কোন রকমে গাড়িটাকে সাইড করতে গিয়ে পথের ধারে একটা গাছে ধাক্কা লেগে হ্যারি মারা যান আর ওঁর ভাগ্নে আহত। সে অবশ্য সেরে উঠবে। পুলিশ দেখেছে ব্রেকের তার কাটা ছিল বা ওই রকম কিছু একটা। আর অমর লাস্ট গাড়িটা ঠিক করেছিল তাই ওর দোষ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।”
অমরজিত সিংয়ের গাড়ি সারানোর ব্যবসা বেশ ভালো চলে বোঝাই যাচ্ছিল তাঁর বাড়িতে গিয়ে। তিনি তো জেঠুকে দেখে কেঁদে পড়লেন, “আমাকে বাঁচাও! আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে! অথচ আমি আমার মরা মায়ের দিব্যি দিয়ে বলছি আমি যখন গাড়িটাকে ছেড়ে এসেছিলেম তখন সাড়ে তিনটে বাজে। তখন সব কিছু টিপটপ ছিল। আমি কেন ওই রকম করব? কিন্তু পুলিশ শুনছে না!”
জেঠু বললেন, “সেই জন্যেই সুমিকে এনেছি। ও একটু চেষ্টা করে দেখুক!”
অমর আকাশ থেকে পড়লেন, “সুমি? সুমি কী করবে?”
“আরে তুমি জানো না। সুমি খুব স্মার্ট মেয়ে। কিছুদিন আগে আমার একটা সমস্যা হয়েছিল। পুলিশ কিছু করতে পারছিল না কিন্তু সুমি ঠিক করে দিল!”
আমার ওই রকম প্রশংসা শুনে আমার লজ্জাই লাগছিল। জেঠুর সমস্যার সমাধান বেশ কাকতালীয় ভাবে পেয়ে গিয়েছিলাম। নাহলে আমি মোটেই গোয়েন্দা টোয়েন্দা নই, তত বুদ্ধিই নেই আমার! গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালোবাসি অবশ্যই। সে তো সবাই ভালোবাসে। যাই হোক জেঠুর কথায় চেষ্টায় নামলাম।
[দুই]
বাসে করে হ্যারি ওয়েলসের পাড়ায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। বাস থেকে নেমে ওয়েলসের বাড়ি ৩০৬ য়ের দিকে এগোচ্ছি এমন সময় যার সঙ্গে দেখে হয়ে গেল সেই থেকেই মনে হল হয়তো আমি কিছু করতে পারব। আমাদের কলেজের ব্রেনা। কয়েকটা ক্লাস করে সে আমার সঙ্গে। ব্রেনা সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে থেমে বলল, “সুমি? তুমি এখানে কী করছ? তুমি তো কলেজের হাউসিংয়ে থাকো না?”
“হ্যাঁ, তা থাকি। একটা কাজে এদিকে এসেছি। তুমি কী এখানে থাকো নাকি?”
“হ্যাঁ, এই রাস্তাটার শেষে আমার বাড়ি।”
“আচ্ছা, তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“হ্যাঁ, বলো।”
“এই যে কদিন আগে তোমাদের পাড়াতে যিনি মারা গেলেন হ্যারি ওয়েলস, তিনি কেমন লোক ছিলেন?”
“ও ওই গাড়ি দুর্ঘটনায়? এমনিতে তো খারাপ লোক ছিলেন না কিন্তু একটু একগুঁয়ে!”
“পাড়ায় ওনার শত্রু ছিল নাকি কেউ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ব্রেনা হেসে বলল, “ও বাবা! সেটা তো যাকে বলে মিলিয়ান ডলার প্রশ্ন! পাড়ার অনেকেই হ্যারিকে পছন্দ করত না কিন্তু সব থেকে বেশি শত্রুতা ছিল ঠিক সামনের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে। টম কার্ভার আর তার স্ত্রী থাকেন ওই বাড়িতে। দুই পরিবারে সবসময় ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। বিশেষ করে টম আর হ্যারির মধ্যে। দুজনের মধ্যে ভয়ঙ্কর রেষারেষিও ছিল। কেউ যদি বলে টম, হ্যারি একটা পঞ্চাশ ইঞ্চির টিভি কিনেছে! অমনি টম গিয়ে একখানা বাহাত্তর ইঞ্চির টিভি নিয়ে চলে আসবে এই অবস্থা। হ্যারির বাড়ির জানালা কে ইঁট মেরে ভেঙ্গে দিল অমনি হ্যারি হোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশানকে টমের নামে নালিশ করে দিল। আর সেই অ্যাসোসিয়েশানের প্রধান এখন যে ভদ্রমহিলা তিনি সব সময় কেন জানি না হ্যারির পক্ষ নিতেন। টমের কাছে অমনি ফাইনের নোটিস চলে গেল। এদিকে হ্যারি নাকি চুপি চুপি টমের বাগানের কয়েকটা দামি গাছ কেটে দিয়ে এল তাতে হোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশান হ্যারিকে কিছু বলল না। আর সব থেকে বাজে ব্যাপারটা হয় যখন টমের আদরের বেড়াল কিটি হ্যারির গাড়ির তলায় চাপা পড়ে মারা যায়। সাংঘাতিক হাঙ্গামা হয়েছিল। পুলিশও এসেছিল কিন্তু শেষমেশ ব্যাপারটাকে দুর্ঘটনা বলে ধামা চাপা দেওয়া হয়, মনে হয় হোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশানের কথায়, কিন্তু টম খুশি ছিল না। অফ দা রেকর্ড বলছি, অনেকেই বলে ওই অ্যাসোসিয়েশানের প্রধানের সঙ্গে হ্যারির কিছু একটা লটঘট চলছিল বা তাকে প্রচুর ঘুষ দিত সে।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘ও বাবা! খুনি তো তার মানে সামনের বাড়িতেই থাকত!’
ব্রেনার চলে গেল আর আমি হ্যারি ওয়েলসের বাড়ির দরজার বেল টিপলাম। একজন বয়স্ক মহিলা এসে দরজা খুললেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি?”
“আমার নাম সুমি। আমি অমরজিত সিংয়ের উকিলের তরফ থেকে এসেছি। রিক আছে বাড়িতে? ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করার ছিল।”
“হ্যাঁ, আছে তবে পেন কিলার খেয়ে ঘুমোচ্ছে। আমি ওর মা ক্যাথি। হ্যারি আমার দাদা ছিল,” বলে মহিলা চোখ মুছলেন।
“আচ্ছা, রিক যখন ঘুমোচ্ছে তখন আপনার সঙ্গেই নাহয় কথা বলি। আপনার একটু সময় হবে?”
ক্যাথি আমাকে বাইরের ঘরে বসালেন। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ছেলেটার পাঁজরের তিনটে হাড় ভেঙ্গে গেছে, মাথায় চোট লেগেছে! আমি রোজ সকাল বিকেল প্রার্থনা করছি যে ও প্রাণে বেঁচে গেছে সেই জন্যে। দাদা তো চলে গেল।”
“হ্যাঁ, সেই নিয়েই একটু কথা ছিল। যে গাড়ি ঠিক করেছিল তার কাজ ভালো। আগে কখনও এই রকম হয়নি তাই আমরা ভাবছিলাম আপনার দাদার অন্য কোন শত্রু ছিল কিনা…”
ক্যাথি চোখের জল মুছে বললেন, “শত্রু কার না থাকে? কিন্তু একেবারে মেরে ফেলার মতন শত্রু, মানে খুব করার মতন শত্রু বলতে তো একজনের কথাই বলতে পারব, সামনের বাড়ির টম! দাদার ওপর তার এত রাগ যে বলবার নয়! আমার তো শুধু ওর কাথাই মনে পড়ছে! হ্যারির গাড়ির তলায় ভুল করে চাপা পড়ে গিয়েছিল ওদের বেড়ালটা তারপর ওরা একেবারে রক্তপিপাসু হয়ে পড়েছিল যেন। পুলিশকে বলেছিল দাদা ইচ্ছে করে করেছে। দাদা একটা পোকাও মারতে পারত কিনা সন্দেহ সে কিনা বেড়াল খুন করবে। ওরা আমাদের বাড়িতে ইঁট মেরে জানালার কাচ ভেঙ্গে দিয়েছিল। হোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশানের তরফ থেকে ওদের ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। তাতেও ওরা খুব চেঁচামেচি করেছিল।”
মহিলা আরো বেশ কিছু কথা বললেন তবে ব্রেনার কাছে যা শুনেছিলাম তার থেকে নতুন কিছু নয়। ভাগ্নে পেনকিলার খেয়ে ঘুম দিয়েছিল তাই তার ঘুম ভাঙ্গল না, ওর সঙ্গে কথা হল না।
এর পর আমি টম কার্ভারের বাড়ি গেলাম। ওঁর স্ত্রী বেটি দরজা খুললেন। খুব রোগা লম্বা মহিলা। আমি ওই ইন্সুরেন্স কোম্পানি থেকে এসেছির গল্পটাই বললাম।
উনি শুনে বললেন, “ও টম ঘুমোচ্ছে। ডাকছি ওকে। ওর আসলে ইনসোমনিয়া আছে। রাতে তেমন ঘুমোতে পারে না তাই দিনেরবেলা যখন ঘুম পায় ঘুমিয়ে নেয়।”
এমন সময় ওপরে ধুপধাপ শব্দ শোনা গেল। বেটি শুনে বললেন, “ওই তো উঠে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। টম? টম? একবার নিচে আসবে?”
একটু পরেই এক রোগা লম্বা ভদ্রলোক ঘরে এসে ঢুকলেন। চোখগুলো বেশ লাল আর ফোলা।
আমি পরিচয় দিতে বললেন, “লোকে বলে যে চলে গেছে তার সম্পর্কে বাজে কথা বলতে নেই কিন্তু আমার বলতে বাধা নেই যে ব্যাটা মরে যাওয়াতে আমি খুব খুশি হয়েছি! একেবারে হাড় বজ্জাত বলতে যা বোঝায় তাই ছিল লোকটা! সব সময় আমার পিছনে লাগত!”
বেটি বললেন, “আহ টম, কী হচ্ছে!”
টম তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি ছাড়ো তো! কিটিকে যখন মেরেছিল তখন তোমার কষ্ট হয়নি?”
বেটি মাথা নিচু করে চোখের জল মুছলেন।
“কিটি বেটির খুব প্রিয় ছিল। বাড়িতেই থাকত সারাদিন। সেদিন কে একটা এসেছিল বলে দরজাটা খোলা ছিল তাই সে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেটা আমাদের দোষ মানছি কিন্তু তুই গাড়ি চালাচ্ছিস তুই একবার দেখবি না? আমার স্থির বিশ্বাস ও ইচ্ছে করেই কাজটা করেছিল! আমারা দুদিনের জন্যে বেড়াতে গিয়েছিলাম, ফিরে এসি দেখি আমাদের বাগানের একটা বড়ো গাছ কে কেটে দিয়েছে! আর অ্যাসোসিয়েশানের প্রেসিডেন্ট মহিলা ফেলিসিটি খুব বাজে! সে হ্যারির কাছে ঘুষ খেয়ে সব সময় তার পক্ষেই রায় দেয়!”
আমি বললাম, “সে সব তো ঠিক আছে কিন্তু এটা কী বুঝতে পারছেন যে হ্যারি খুন হলে আপনি সব চেয়ে বরো সাসপেক্ট?”
টমের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল, “অ্যাঁ! খুন? আমি তো ভাবলাম গাড়ি সারানোর ভুলে ব্রেক ফেল করে…”
“না, গাড়ি যে সারাই করেছে তার ভুল নয়। সে অনেকদিন ধরে কাজ করছে তার ওই রকম ভুল হয় না, তাই পুলিশ অন্য আঙ্গেলও খতিয়ে দেখছে।”
টম এবার একটু ভয় পেলেন মনে হল, “ও বাবা! কিন্তু খুনই যদি হয় তাহলে আমি কেন? পাড়ার কেউই ওকে পছন্দ করত না! ওর বাঁপাশের বাড়িতে যিনি থাকেন, মিসেস কুপার তিনিও ওকে খুব অপছন্দ করেন। হ্যারি সব সময় নালিশ করত যে মিসেস কুপারের কুকুরের চিৎকারে ও ভয়ানক বিরক্ত হয়। অ্যাসোসিয়েশানে নালিশও করেছিল। এদিকে মিসেস কুপার বলেন যে হ্যারি তাঁর বাগানে কী সব চড়িয়ে দিয়েছিল এবং তাতে ওনার বাগানের সব ফুল মরে যায়। ওনার বাগানে দারুণ সব ফুল হয়। উনি ফ্লাওয়ার শোতে প্রাইজ পান। সেই নিয়ে মিসেস কুপারের সঙ্গেও হ্যারিদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল! হ্যারিকে আমি পছন্দ করতাম না ঠিকই কিন্তু খুন আমি করিনি। ওকে খুন করার হলে অনেক আগেই করে ফেলতাম আমি! এতদিন অপেক্ষা করে থাকতাম না!”
আমি শুনে ভাবলাম ‘ওরে বাবা! এ কেস তো ভয়ানক জটিল!’
“আচ্ছা ওই গাড়ি সারাবার লোকেদের আপনি দেখেছিলেন? কটা নাগাদ ওরা যায় বলতে পারবেন?”
টম বললেন তিনি খেয়াল করেননি কিন্তু বেটি বললেন, “আমি সাড়ে চারটে নাগাদও জানালা দিয়ে দেখেছি লাল টি শার্ট আর ক্যাপ পরা একজন কাজ করছে।”
আমার মাথায় একটা তার ঝনঝন করে উঠল। অমর তো বলেছিলেন উনি সাড়ে তিনিটে নাগাদ চলে যান! আবার কথা বলতে হবে।
বাইরে বেরিয়ে আমি অমরকে ফোন করলাম। উনি ধরতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনাদের গ্যারেজের কী কোন ইউনিফর্ম আছে?”
“হ্যাঁ, আছে তো! লাল টি শার্ট তাতে আমাদের নাম লেখা, লাল ক্যাপ আর কালো প্যান্ট, কেন বলো তো?”
“আপনি আমাকে বলেছিলেন যে আপনি সাড়ে তিনটে নাগাদ কাজ সেরে চলে যান অথচ এখানে হ্যারির এক প্রতিবেশীর কাছে শুনলাম যে সাড়ে চারটে নাগাদও লাল জামা লাল টুপি পরা একজন গাড়িতে কাজ করছিল!”
অমর শুনে উত্তেজিত হয়ে বললেন, “হতেই পারে না! আমি বাড়ি ফিরে আমার ছেলেকে টেনিস ক্লাসে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর ক্লাস চারটে থেকে। ও ক্লাসে ঠিক সময়ই পৌঁছেছিল সেটা সবাই বলতে পারবে টেনিস ক্লাবে। আমি সেখানেই বসে ওর খেলা দেখছিলাম। পাঁচটার সময় ক্লাস শেষ হতে ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। তাই সাড়ে চারটে নাগাদ গাড়ি ঠিক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়!”
আমি শুনে বললাম, “হুঁ, তাহলে তো অন্য কিছু চলছিল বোঝাই যাচ্ছে! ঠিক আছে আপনি শান্ত হয়ে থাকুন। অপরাধী ধরা পড়বেই!”
[তিন]
মিসেস কুপারের বাগান সত্যিই দেখবার মতন। দারুণ সুন্দর গোলাপ, ডালিয়া আরো কত কী নাম না জানা ফুল ফুটে রয়েছে। একেবারে রঙের বাহার। আমার তাড়া না থাকলে আরো বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম কিন্তু সময় নেই বেশি হাতে তাই দরজায় বেল দিলাম। মিসেস কুপার প্রথমে দরজা খুলতে চাইছিলেনই না। তবে সেটা সাবধানতার জন্যে। আমাকে চেনেন না তাই। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ম্যাজিক আই দিয়ে স্টুডেন্ট আই ডি দেখিয়ে তারপর ভিতরে ঢুকতে পেলাম। মধ্যবয়স্ক মহিলা। জামাকাপড়ের ওপর ড্রেসিং গাউন পরে ছিলেন। পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল ছোট একটা সাদা রঙের কুকুর। সে আমাকে দেখেও মোটেই চিৎকার করল না।
সব শুনে উনি বললেন, “হ্যাঁ, হ্যারিকে আমি অপছন্দ করতাম ঠিকই কিন্তু তা বলে খুন! হ্যারি আমার লাকিকে পছন্দ করত না। ও খুব বেশি ঘেউ ঘেু করে বলত। এই তো লাকিকে দেখছ! খুব শান্ত কুকুর বেচারা! মোটেই তেমন ঘেউ ঘেউ করে না।”
“আপনি নাকি বলেছিলেন যে হ্যারি আপনার বাগানের ফুল মেরে দিয়েছিল কী সব বিষ দিয়ে, সেটা সত্যি?”
“না, আমি মোটেই ওসব বলিনি। ফুল কোন কোন বছর ভাল হয় না। আবহাওয়া, পোকামাকড় অনেক কিছুই তার জন্যে দায়ী। এত বছর ধরে গাছ করছি সেটা আমি জানি। হ্যারির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল না ঠিকই কিন্তু ক্যাথির সঙ্গে দেখা হলে কথা হয়। আমি শান্তিপ্রিয়মানুষ। খুন কেন করবো? আমার কী মাথা খারাপ হয়েছে? পুলিশ কী অত বোকা? ঠিক ধরে ফেলবে আর জেলে পচতে হবে বাকি জীবন! পাগল!”
আমি একটু ভেবে বললাম, “খুব সাত্যি কথা।”
মিসেস কুপার এবার একটু গলা নামিয়ে বললেন, “তোমাকে আরেকটা খবর দিতে পারি…”
আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, “কী?”
“হ্যারির সঙ্গে তার পার্টনারেরও গন্ডগোল চলছিল। শুনেছি ওর পার্টনার নাকি ওর কাজে অখুশি ছিল। দুজনের মধ্যে খুব কথা কাটাকাটি হয়! সেই দিকটাও বাজিয়ে দেখতে পারো।”
বাবা লোকটা কী সবার সঙ্গে কেবল ঝগড়াই করে বেড়াতো নাকি? যার কাছেই যাই সে আরেকজনের নাম করে যার সঙ্গে ঝগড়া!
বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি গাড়ি চালান তো?”
“হ্যাঁ, বাবা এই ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে গাড়ি না চালিয়ে যো আছে!”
“হ্যাঁ, তা ঠিক। তা গাড়ি সারান কাকে দিয়ে?”আমি ন্যাকা সেজে জিজ্ঞেস করলাম।
“কাকে দিয়ে আবার! কাঁড়ি কাঁড়ি দাম চায় তাই নিজেই ওই কাজ শিখে নিয়েছি। খুব ভয়ঙ্কর কিছু গোলমাল না হলে নিজেই সারিয়ে নিতে পারি!”
ও বাবা তার মানে ইনিও ব্রেকের ক্ষতি করতে সক্ষম।
[চার]
ফেলিসিটি রেনোল্ডসের অফিস দেখে তাক লেগে যাওয়ার জোগাড়! একটা মেকাপ কোম্পানির অর্ধেক মালকিন সে। হ্যারিদের পাড়াতে ওর থাকাটাই আশ্চর্যের ব্যাপার! ওর তো অনেক বেশি হাইফাই এলাকায় গিয়ে থাকার কথা।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট শুধু দশ মিনিটের পাওয়া গিয়েছিল। তাই সই। আমি সোজাসুজিই বললাম, “হ্যারির প্রতি আপনার পক্ষপাতিত্ব ছিল বলে মনে করে ওই পাড়ার সবাই। ওদের ধারণা হ্যারি আপনাকে ঘুষ দিত!”
হাহা করে হেসে ফেলেলেন ফেলিসিটি, “আমাকে দেখে কী মনে হয় যে হ্যারি আমাকে ঘুষ দিতে পারবে? বা আমার দরকার আছে? আমার যেটা ঠিক মনে হয়েছে আমি সেটাই করেছি। ওই বেড়ালের চাপা পড়াটা দুর্ঘটনা বলেই মনে করি আমি। কেউ ইচ্ছে করে অমন করে না। আর ছোটখাটো অপরাধ যেমন গাছ কাটা ইত্যাদি ওই সব প্রমাণ না থাকলে কারো ঘাড়ে চাপানো যায় তুমিই বলো?”
“হুঁ, আপনি কী মনে করেন হ্যারির মৃত্যুটা খুন হতে পারে?”
“খুন? ওই পাড়াতে ওরা সবাই চুলচুলি ঝগড়া করে বটে কিন্তু খুন করবে বলে তো মনে হয় না! জানি না বাবা!”
আরো দুয়েকটা কথা বলতে বলতেই আমার দশ মিনিট শেষ হয়ে গেল। ফেলিসিটির সেক্রেটারি এসে আমাকে তাড়িয়ে দিল।
[পাঁচ]
এর পর হ্যারির অফিসে গিয়ে হাজির হলাম ঠিক অফিস বন্ধ হওয়ার একটু আগে। সেটা আসলে একটা ল অফিস। হ্যারির পার্টনার জর্জ ছিলেন না তাই ওদের সেক্রেটারি মিষ্টি মেয়েটার সঙ্গে বন্ধুত্ব জমিয়ে ফেললাম। অফিস বন্ধ হয়ে যেতে ওকে বাইরে কফি খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। মেয়েটার নাম অ্যালিস। ভারি মিষ্টি মেয়ে। যা বুঝলাম সেটা হল জর্জ আর হ্যারি দুই বন্ধু মিলে ওই ল অফিসটা শুরু করে। জর্জ ওকালতির দিকটা দেখত অ্যান্ড হ্যারি হিসেব নিকেশ অফিস চালানো এই সব। ইদানীং নাকি ওদের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। জর্জ হ্যারিকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। দুজনের মধ্যে মাঝে মাঝেই বেশ ঝগড়া হচ্ছিল। অ্যালিস নতুন কাজে ঢুকেছে ওই রকম ঝগড়া দেখে সে ঘাবড়ে যেত।
অ্যালিস এবার দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে উঠে পড়ল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা হ্যারির বাড়ি থেকে কী ওর জিনিসপত্র নিয়ে গেছে?”
অ্যালিস বলল, “না, এখনও না। জর্জ আমাকে বলেছে ওর সব জিনিস বাক্সে প্যাক করে রাখতে। আমারই কাজের চাপে করা হয়নি।তবে এই সপ্তাহের মধ্যে করে ফেলতে হবে। জর্জ বলেছে অন্য লোক নেওয়া হবে। তার জন্যে অফিসটা খালি করতে হবে।”
আমি ভাজা মাছটি উলটে খেতে পারে না মুখ করে বললাম, “ও আচ্ছা!”
অ্যালিস চলে যাওয়ার পর আমি আবার গুটিগুটি পায়ে ওদের অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। পিছনের দরজাটা দিয়ে ঢুকতে কোন অসুবিধা হল না, আমিই তো সেটাকে খুলে দিয়েছিলাম পরে এসে ঢুকব বলে।
আলো জ্বালালে বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কে কখন দেখে ফেলে তার ঠিক নেই বলে অন্ধকার অফিসে টর্চ নিয়ে হ্যারির অফিসঘে ঢুকলাম। একটু আগে যখন এসেছিলাম তখনই দেখে নিয়েছিলাম কোন অফিসটা ওর। সেটা তালা দেওয়া ছিল না। ফাইলিং ক্যাবিনেটটাতে খোঁজা শুরু করলাম। খুব বেশি অসুবিধা হল না। হ্যারি বেশ গোছানে লোকই ছিলেন।
আর সেকশানে রেনোল্ডসেই পেয়ে গেলাম ফেলিসিটির ফাইলটা। ফেলিসিটি এক কালে বারে নাচত। সেই সব কিছুর বেশ রগরগে ছবি জোগাড় করেছিলেন হ্যারি। তারপর নির্ঘাত ব্ল্যাকমেলের পর্ব চলছিল। মেকাপ কোম্পানির মালকিনের ওই রকম ছবি বাজারে বেরোলে কোম্পানির শ্তকের ক্ষতি হবে বইকি! আরেকটু খুঁজতেই জর্জ মার্টিনের ফাইলটাও পেয়ে গেলাম। সেটা আরো ভয়ঙ্কর। আঠেরো বছর বয়সে জর্জকে একবার জেলে যেতে হয়েছিল মাদক দ্রব্য বিক্রি ও চালানের জন্যে। সেই খবর বাজারে বেরলে তো জর্জের ব্যবসা একেবারেই লাটে উঠবে! চট করে অমরের নামটাও খুঁজে নিলাম, না, ওর নামে কোন ফাইল নেই। তবে যা রয়েছে ক্যাবিনেটে ওগুলো সবই কপি। অরিজিনালগুলো মনে হয় ব্যাঙ্কের লকারে কোথাও রাখতেন। হ্যারির চরিত্র যত দেখছিলাম ততই আমার মনে হচ্ছিল ওই রকম লোক খুনই হয়।
হঠাৎ বাইরের দরজাটা খোলার শব্দ হল! ওরে বাবা! অ্যালিস বলেছিল বটে জর্জ মাঝে মাঝে রাতের দিকে চলে আসেন কাগজপত্র ঘাঁটতে! টর্চ নিভিয়ে পা টিপে টিপে পিছনের দরজাটার দিকে এগোতে লাগলাম। খটাস করে একটা কিসের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম একটা গাছের টব, আসল গাছ নয় নকল অবশ্য। জর্জ শুনতে পেয়ে নিজের অফিস থেকে বেরিয়ে এসে হাঁক দিলেন ‘হু ইস দেয়ার?’ কোন রকমে দরজা অবধি পৌঁছেই বাইরে বেরিয়ে ছুট! জর্জ তখনও চেঁচিয়ে চলেছেন। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে তারপর একটা উবার ডেকে বাড়ি ফিরলাম। উফফ বাবা কী সাংঘাতিক একটা দিন কাটল!
[ছয়]
সকালে ঘুম থেকে উঠেই চার্টটা বানিয়ে ফেললাম। চোখের সামনে সব কিছু থাকলে ভাবতে সুবিধা হয়।
সাসপেক্ট মোটিভ
টম হ্যারিকে একদম পছন্দ করত না।ওদের বেড়ালটাকে গাড়ি চাপা দেওয়া হয়েছিল
বেটি ”
মিসেস কুপার ঝগড়া ছিল কুকুরের চিৎকার আর ফুলে বিষ দেওয়া, নিজে গাড়ি সারান
ফেলিসিটি হ্যারি ব্ল্যাকমেল করছিল
জর্জ হ্যারি ব্ল্যাকমেল করে নিজের সঙ্গে পার্টনারশিপে রেখেছিল, ঝগড়া হয়েছিল
একটু পরেই ব্রেনার ফোন এল। সে বলল, “সুমি তুমি শুনেছো?”
“কী?”
“টম আর বেটির পিছনের বাগান থকে প্লাস্টিকে মোড়া একটা লাল টুপি আর একটা লাল টি শার্ট পাওয়া গেছে! টমকে অ্যারেস্ট করেছে পুলিশ!”
“সেকি! কে পেলো?”
“কয়েকটা বাচ্চা খেলছিল তাদের বল পড়ে যায় ওদের বাগানে। তারাই বল কুড়োতে গিয়ে খুঁজে পায়। তাদের মধ্যে একজন বাড়িতে গিয়ে বলতে তার বাবা পুলিশে ফোন করেন।”
ফোন ছেড়ে আমি গভীর চিন্তায় পড়লাম। টম আর বেটিই যদি কাজটা করে থাকে তাহলে নিজদের ব্যাকইয়ার্ডে কেন লাল টুপি আর জামা রেখে দেবে? পুড়িয়ে ফেললেই তো পারতো। এটাতে অন্যের হাত আছে বলে মনে হচ্ছে! কেউ ওদের ফাঁসাবার চেষ্টা করছে। কে হতে পারে? পুলিশ এবার হয়তো অমরকে ছেড়ে দেবে, তাতে জেঠু খুশি হবেন।
তৈরি হয়ে আবার ওই পাড়াতে গেলাম। বেটির সঙ্গে কথা হল। খুব কাঁদছিলেন, আমি যা ভেবেছিলাম তাই বললেন, “আমরা যদি লাল টুপি আর জামা পরে ওর গাড়ির ব্রেক নষ্টও করে থাকি তাহলে কী সেই সব বাগানে লুকিয়ে রাখব? পুলিশগুলোর মাথা মোটা, কিছুতেই সেটা বুঝতে চাইছে না।”
“এই কদিনে আপনাদের বাড়িতে কে কে এসেছিল? মানে কে রেখে দিতে পারে ওটা বাগানে?”
“বেড়া টপকে তো যে কেউ রেখে দিতে পারে তবে আমাদের ফেন্স বেশ উঁচু, ডিঙিয়ে আসা সহজ নয়। বাড়িতে কে এসেছিল… ফেলিসিটি, মিসেস কুপার আর তুমি..”
“হুঁ! দেখি কী করতে পারি! আমি যখন করিনি তখন ওদের দুজনের যে কেউ হতে পারে, দুজনেরই মোটিভ আছে হ্যারিকে মারার। ঠিক আছে আমি পুলিশের সঙ্গেও কথা বলব। আমার ফোন নম্বরটা রইল আর কিছু মনে পড়লে আমাকে ফোন করবেন, কেমন?”
টম আর বেটির বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনে হল একবার ক্যাথি আর হ্যারির ভাগ্নে বিলকে দেখে যাই। কেমন আছে তারা।
দরজায় বেল দিতে ক্যাথিই এসে দরজা খুলে দিলেন।
“বিল কেমন আছে?”
“অনেকটা ভালো। হাঁটাচলা করতে পারছে। মনে হচ্ছে সেরে উঠবে। খবর পেয়েছো? পুলিশ থেকে ফোন করেছিল। ওরা টমকে ধরে নিয়ে গেছে। ওর বাগান থেকে লাল টুপি আর টি শার্ট পাওয়া গেছে। আমি তো ভাবতেই পারছি না যে টম দাদাকে খুন করবে! দুর্ঘটনা বলে তাও মেনে নিয়েছিলাম কিন্তু খুন! খুন আমি ভাবতেই পারছি না, একজন খুনির বাড়ির সামনে ছিলাম আমরা…”
ঠিক তখনই বেটির ফোনটা এল। আমার ফোনটা বেশ জোরে করা ছিল তাই বেটির কথা পাশে দাঁড়ানো ক্যাথি সব শুনতে পাচ্ছিলেন।
বেটি বললেন, “তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না আমার বাড়িতে কে কে এসেছিল, একজনের কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ক্যাথি এসেছিল একদিন এবং কিছুক্ষণ ছিল! এটা বলার জন্যেই ফোন করেছিলাম। এদের তিনজনের মধ্যেই কেউ ওই লাল টুপি আর টি শার্ট আমাদের বাগানে লুকিয়ে টমকে ফাঁসিয়েছে!”
এর পর যা ঘটল সেটা ঘটা উচিত ছিল না, আমার ভুলেই হল ব্যাপারটা। আমি সবার নাম লিখেছিলাম কিন্তু ক্যাথির নাম লিখিনি সাসপেক্ট লিস্টে! ক্যাথির তো সব থেকে বড়ো মোটিভ! হ্যারি মারা গেলে তার সব সম্পত্তি সে পাবে!
ফোনটা ছাড়তেই দেখলাম ঘটাং করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বিল উঠে এসেছে! আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে অফ করে দিয়ে সেটাকে অন্য কোথাও রেখে এল ক্যাথি। বিল ততক্ষণে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। ওর হাতে বন্দুক, তাই চেঁচানো বারণ।
ক্যাথি বলল, “ওরা টমকে ধরে নিয়ে গেছে তো যাক না। তোমার তাতে কেন এত সমস্যা হচ্ছে? তুমি যাকে বাঁচাতে চাইছিলে গ্যারেজের মালিক অমর সে তো বেঁচে গেল। তবে যদি সত্যিটা জানতে চাও তাহলে বলছি, হ্যাঁ, আমরাই দাদাকে সরিয়েছি। বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমরা ওর সঙ্গে থাকতে থাকতে। সব কিছুর জন্যে দাদার কাছে হাত পাততে হত আর দাদাও প্রতিটা জিনিসের জন্যে কথা শোনাতো। বিল জোয়ান ছেলে ওর একটু শখ ইত্যাদি থাকতে নেই? সে কী পারে বুড়োদের মতন বাঁচতে? আর দাদার স্বভাবটা তো টের পেয়েছো, সবার সঙ্গে ঝগড়া করত। কেউই পছন্দ করতা না ওকে। ওর পার্টনার জর্জ, টম, বেটি, মিসেস কুপার সবাই ওকে খুন করার মতনই অপছন্দ করত। ওই গাড়ি সারাই কোম্পানিটার লোক আগেও এসেছিল গাড়ি সারাতে তখন দেখেছিলাম লাল টি শার্ট আর টুপি পরে থাকে ওরা সেই দেখেই আমাদের মাথায় আইডিয়াটা আসে। লোকটা গাড়ি সারিয়ে চলে যাওয়ার পর বিল লাল টুপি আর টি শার্ট পরে নিয়ে চটপট কাজটা সেরে ফেলে। কেউ দেখেনি ওকে আর দেখলেও টুপি দিয়ে মুখ ঢাকা ছিল তাই ভেবেছে ওই গাড়ি সারাইয়ের কম্পানির লোক। হ্যারি সেই সময় ঘুমোচ্ছিল। দুর্ঘটনা ঘটলে সব চেয়ে আগে সন্দেহ আমাদের ওপর এসে পড়বে বলে বিলকেও ওর নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হ্যারির সঙ্গে পাঠালাম। সেটা একটা খুব চালাকির কাজ করেছিলাম আমরা, বিল অত আহত হওয়ার পর পুলিশ আর আমাদের সন্দেহ করেনি। ব্যাপারটা দুর্ঘটনা হয়েই থেকে যেত তুমি ডেঁপো মেয়ে নাক না গলালে! তখন আমাদের থেকে সন্দেহ সরাতে টমের বাগানে ওই টুপি আর টি শার্ট রেখে আসতে হল। বেটি কিছুই বুঝতে পারেনি কিন্তু হতচ্ছাড়া বাচ্চাগুলো ওগুলোকে তাড়াতাড়ি বার করে কেঁচিয়ে দিল। আরো কিছুদিন দেরি হলে বেটি ভুলে যেত কে এসেছিল না এসেছিল!”
বিল মনে হল বেশি কথাটথা বলে না। সে একটা বড়ো মাংস কাটার ছুরি নিয়ে এসে ক্যাথিকে ইশারা করে দেখালো আমার গলাটা কেটে ফেলবে কিনা।
ক্যাথি বলল, “মাথা খারাপ! ঘরে মারলে রক্তারক্তি কান্ড হবে। আজকাল পুলিশ খুব স্মার্ট টিভিতে দেখিসনি? ঠিক বার করে ফেলবে। ওকে আপাতত এই ভাবেই বেঁধে রাখি। অন্ধকার হলে কোথাও নিয়ে গিয়ে কাজটা করতে হবে।”
আমাকে একটা ঘরে বন্ধ করে দিল ওরা। এত টাইট করে হাত পা মুখ বাঁধা যে কিছু করার উপায় নেই। আমি তো কাউকে বলেও আসিনি যে আমি এখানে আসছি। আমি না ফিরলে কেউ জানতেও পারবে না। খুব হতাশ লাগছিল। খুব খিদেও পাচ্ছিল। সেই কোন সকালে বেরিয়েছি, ঠিক করে খাওয়াও হয়নি। আর হয়তো আমার ভাগ্যে খাওয়াও জুটবে না। ওই শয়তান মা-ছেলে মিলে আমাকে শেষ করে দেবে!
কতক্ষণ ওই ভাবে ছিলাম বলতে পারব না। মনের দুঃখে কেঁদে কেটে ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। হঠাৎ প্রচুর দুড়দাড় দুমদাম শব্দ শুনতে পেলাম। ক্যাথি প্রচুর চেঁচামেচি করছে শুনতে পাচ্ছিলাম কিন্তু কী বলছে ঠিক বুঝতে পাচ্ছিলাম না, দুয়েকবার মনে হল ‘ওয়ারেন্ট’ কথাটা শুনলাম। আমি আমার শরীরটাকে দেওয়ালের কাছে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে শব্দ তৈরি করার চেষ্টা করতে লাগলাম। মুখ দিয়ে যা আওয়াজ বেরোয় তাই বার করছিলাম কারণ কেউ একটা এসেছে, সে যদি বুঝতে পারে কেউ এই ঘরে বন্দী হয়ে আছে তাহলে আমার বাঁচার একটা সুযোগ হতে পারে। যদিও খুব একটা লাভ হচ্ছিল না অনেক চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে উঁ উঁ উঁ ছাড়া কিছুই বেরোলো না।
একটু পরেই দড়াম করে ঘরের দরজা ভেঙ্গে পুলিশ এসে ঢুকল, সঙ্গে জেঠু!
[সাত]
জেঠুর বাড়িতে বসে কথা হচ্ছিল। ক্যাথি আর বিলকে পুলিশ শ্রীঘরে নিয়ে গেছে। আমার খিদে পেয়েছে শুনে জেঠিমা আমার জন্যে এত খাবার দিয়েছেন যে প্রায় চারজন খেতে পারে।
জেঠুই বললেন কী হয়েছিল, “পুলিশ আমাকে ফোন করেছিল, জানিস। বলল মিসেস কুপার বলে যে মহিলা হ্যারিদের বাড়ির কাছে থাকেন তিনি নাকি ফোন করে পুলিশকে বলেছেন যে ‘আমি বাগানে কাজ করছিলাম। সেদিন যে স্টুডেন্ট মেয়েটা এসেছিল তাকে ক্যাথিদের বাড়িতে ঢুকতে দেখলাম কিন্তু বেরোতে দেখলাম না। হয়তো ও বেরিয়েছে আমি খেয়াল করিনি কিন্তু সে সম্ভাবনা কম। আমি তো আমার জায়গা থেকে নড়িনি তিন ঘন্টা হয়ে গেল। মেয়েটা অতক্ষণ ধরে ওদের বাড়িতে কী করছে?’। আমি তখন তোর ফোনে অনেক বার ফোন করলাম কিন্তু ফোন সুইচড অফ। তখন আমার চিন্তা হল।। তুইই বলেছিলি তুই তোর ফোন সুইচড অফ রাখিস না। ভাইব্রেটে রাখিস দরকার হলে। যাতে ওরা কলকাতা থেকে ফোন করলে তোকে পায়। তাই সুইচড অফ শুনে আমি পুলিশকে বললাম যে ব্যাপারটা গোলমেলে। ওরা তখন ওয়ারেন্ট জোগাড় করে ওখানে পৌঁছে গেল। বাকিটা তো ইতিহাস।”
আমি হেসে বললাম, “দেখি, মিসেস কুপারকে দামি কিছু গাছ উপহার দিতে হবে। উনি যদি পাশের বাড়িতে কে আসছে কে যাচ্ছে খেয়াল না রাখতেন তাহলে আমার তো হয়ে গিয়েছিল…”
***সমাপ্ত***
