সৌমির বালতিমাসি ও চাইনা
পূর্ণপ্রভা ঘোষ
[এক]
‘আমার মেইহেকেই আইনলাম গো বৌদিদি।’ ঘরের বাইরে মালতীর গলা শুনে আমার ধড়ে প্রাণ এল যেন। অমাবস্যায় চাঁদের আলো দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য হল এখন আমার। এগিয়ে দেখি, ওমা! লিকপিকে, এক্কেবারে প্যাকাটিপানা চেহারা! গায়ের রঙে আর চুলের রঙে কিছু তফাৎ নেই! ঝকঝকে সাদা দাঁতে গালভরা হাসি ছড়িয়ে পুটকি একখানা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মালতী।
ওদের হাসিমুখ দেখে তৎক্ষণাৎ আমার মুখেও বিশ্বজয়ের হাসি আসা উচিৎ ছিল। কিন্তু মালতীর মেয়ের ওই চেহারা দেখে আমার অবস্থা এক্কেবারে ধরনী দ্বিধা হও গোছের!
‘লে, পোনাম কর লো! সবুকথা বুইলে দিতে হবে লাকি লা? দেকো, দেকো বৌদিদি, এত্যো বড়টি হইছিন্! কুনোপোকার জ্ঞানগম্যি হইলনি! বুঝ বৌদিদি, কিমোন সিক্ষা পাইছেন্ বাপের থেনে!’ ততক্ষণে আমার পেছনে সবাই দাঁড়িয়েছে এসে! ওদেরকে দেখে আমাদের সকলেরই অবস্থা তখন বেসামাল!
আমাদের বড়জায়ের বড়ছেলে সুজয়। ট্রান্সফার নিয়ে এখন কলকাতায় ফিরেছে। বিয়ের পর থেকেই তাকে কলকাতার বাইরে বাইরে ঘুরতে হচ্ছিল। আমাদের সকলেরই বড্ড মন কেমন করত। নতুন বৌমার সঙ্গে তেমনভাবে আলাপ জমল কই! বৌভাতের পরের দিনই সুজয়কে দুড়দ্দাড় দৌড়োতে হয়েছিল কাজের জায়গায়। সঙ্গে সঙ্গে নতুনবৌমাকে আমরাই লেজুড় বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের সংসার ওরাই গুছিয়ে নিয়েছে। আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি স্মার্ট। তাছাড়া ওদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের। দু’জনের কেমিস্ট্রিও দারুণ ম্যাচ করে। দু’বছরের মাথায় নতুন অতিথি এল। আমাদের সকলের মনপ্রাণ ভরে উঠল! কিন্তু মনের সুখে নাতনিকে সোহাগে-আদরে ভরিয়ে তুলব, সেই সুযোগ কই!
বিশেষভাবে নাতনিকে কাছে না পাওয়ার জন্য আমরা সকলেই ম্রিয়মান! এখন ওরা কলকাতায় ফিরেছে। প্রাণে আমাদের খুশীর তুফান ওঠা আনন্দ। কিন্তু সেইসঙ্গে সত্যিকারের অবস্থাখানিও হযবরল! কেউ উপলব্ধি করতেও পারবে না। টগবগ খুশি হতে চেয়ে, পড়লাম কী সাংঘাতিক মহাসমস্যায়!
ওরা এতদিন যেখানে যেখানে থেকেছে সব জায়গাতেই সার্ভেন্ট কোয়াটার উইথ সার্ভেন্ট পেয়েছে সহজেই। কিন্তু এখানে কাজের লোকের সমস্যা চিরন্তন। ঘরের ছেলে এই কারণেই ফেরে না নিজের ঘরে!
এই পোড়ার দেশে ভালো একটা লোক পাওয়া আর আকাশের চাঁদ এনে হাতে দেওয়া, একই। একই রকমের, কঠিন দুঃসাধ্য কর্ম! সপ্তাহ দুয়েক ধরে এদিক ওদিক ক্রমাগত চেষ্টা করেও একেবারে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি দশা! ঠিক এইসময়ে আমার সবেধন নীলমনি হেল্পিং হ্যান্ড, মালতী-দয়াময়ী অগতির গতি হয়ে অবতীর্ণ হলেন রণক্ষেত্রে। কিন্তু তাতেও সেকি সাংঘাতিক ঝড়। উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গে ডুবে যাওয়া জাহাজের যাত্রী খড়কুটোকেই আঁকড়ে ধরতে চায়! আমিও তেমনই! অন্যায়টা কী করলাম? পুরোপুরি দু’টো দিন! সংসার যেন থেকে থেকেই আমার উপর টাইফুনের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে! থেকে থেকে সবাই মিলে একেবারে রসাতলেই পাঠাচ্ছে আমায়! কিযে প্রচন্ড অন্যায় করে ফেললাম! বেওকুফের মত সারাক্ষণ ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো কাজের লোকটিকে দু’দিনের ছুটি দিয়ে দিলাম কেন যে!
বিন্দুমাত্রও কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না! যে সেই চিরবিশ্বস্ত মালতী, আর একজনকে খুঁজে পেতে ধরে আনবে। তাও তো আমি কাউকে কিছুতেই সেই আসল কথাটা বলিনি!
রাহা খরচ বাবদ তার হাতে একটা পেটমোটা মানিব্যাগ ধরিয়ে দিয়েছিলাম। যাতে সে তাড়াতাড়ি ফেরে। পইপই করে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যে, আমাদের প্রয়োজন কত্তো! ক-ত্তোও বেশি।
দু’দিনের সঙ্গে বড় জোর আর একদিন লাগবে। আমাদের কাজ উদ্ধার করে যাতে তাড়াতাড়ি ফেরে সে। সেকারনেই টাকাটা একটু বেশিই দিয়েছিলাম। দু’দিন গেল। তিনদিনও গেল।! চতুর্থ দিনটাও!
প্রায় শেষ হবো-হবো! গত তিনদিন ধরে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ধাক্কায় এক্কেবারে বিধ্বস্ত দশা আমার। যেন ভীষ্মের শরশয্যা অবস্থা! ঠিক তখনই মা-মেয়ের উদয়। আমার কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ। আবির্ভাব!
তাহলে? এই মুহূর্তে আমার তো আনন্দসাগরে নেচে ওঠার কথা! অর্থাৎ এমন জয়লাভ! হাতের মুঠোয়! ফার্স্টক্লাস রেজাল্ট পেয়ে ফেল হতে হতে বেঁচে যাওয়া পরীক্ষার্থীনির তো আনন্দিত হওয়ার কথা! কিন্তু ওদেরকে দেখে হতভম্ব আমি! চোখে সর্ষেফুল দেখছি!
হায় রে, আমার পোড়াকপাল! সংসারে কেবলু বোকারাম থেকে গেলাম আমি চিরদিন! সমস্যার সমাধান হিসেবে যখনই বিশাল কিছু করে দেখাতে যাই! ব্যাস্! কীভাবে যে হয়ে যাই, ফিউজ্ দুম!
অমন পাটকাঠি চেহারার কেলটি মেয়েকে কীভাবে আমাদের মুশকিল আসান ভাবতে পারি?
আমাদের নাতনির বয়স সবে তিনবছর। টকাটক কথা বলতে শিখেছে। যদিও সবকথা গুছিয়ে বলতে পারত না! তবে গড়গড়িয়ে সবকথা বলতে গিয়ে খিচুড়ী পাকিয়ে ফেলে যখন, সবাই হেসে মরি।
এমনিতে নাতনিটি আমাদের বড্ড লক্ষ্মী। এতটুকুও দুষ্টু নয়। তবে ওর মায়ের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে মেয়ে নিয়ে। বিশেষকরে আমাদের পুরোনোকালের বাচ্চা মানুষ করার পদ্ধতি একেবারেই না-পসন্দ্। তাতে আমাদেরও অসুবিধের কথা নয়! আসল কাজটি অর্থাৎ নাতনিটি আমাদের ভালো থাকলেই হল।
বাড়িতে এই প্রজন্মের প্রথম শিশু।আমাদের সকলেরই খুব আদরের। পরিবারের সব্বাই উদ্বিগ্ন।
কোনোদিনই তেমন চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল না আমার। ছোট বড় সকলের কথাই চিরকাল মেনে চলি। তাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার নিজস্ব মতামত তেমন নেই। সেই নিয়ে বাড়ির সবাই এমনকি স্বামী, ছেলেমেয়ের কাছেও কথা শুনে শুনে অভ্যস্থ। কিন্তু অন্যের মতামতের অপেক্ষা না করে একটা ব্যাপারে আমি সর্বদা সচেষ্ট। জগৎ-সংসারে অর্থাৎ আমার চারপাশের সবাই যাতে ভালো থাকে। অন্তত নিজেদের লোকজন যেন যথাসম্ভব ভালো থাকে। সেই চেষ্টাই করতে দৌড়োই আমি নিজের বুদ্ধিমত।
শুধু সেইকারনে আমার অবস্থা থেকে থেকেই এই স্বর্গে তো, এই রসাতল! যখন তখন ঠাঁইবদল! অবশ্য সকলের হুকুম মোতাবেক কাজ করতে অভ্যস্থ আমি চিরকাল। তবে সেদিনের কাজটি আমি নিজের বোধ-বুদ্ধিতে করেছিলাম। কারও হুকুমের অপেক্ষা না করে! চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, নাতনিকে নিয়ে বৌমা আমার সারাক্ষণ জগৎসংসার উথালপাতাল করছেন। একমাত্র উপায় হিসেবে তাই মনে হয়েছিল, যদি ছোট্ট গোছের ছেলেমানুষ একটা হাতের কাছে পাওয়া যায়! কিছুটাতো সামাল দিতে পারা যাবে।
সেই টুকুই ছিল আামার সৎ উদ্দেশ্য। সেকি আমার অন্যায়? অবশ্য সংসারে সকলের কাছে হেয় হতে হতে আমার নির্বুদ্ধিতাই সর্বদাই প্রমানিত! এম্মা! আমিও সেদিন নিজে থেকেই একেবারে হতভম্ব!
নিজেই যখন নিজের হাতে মুন্ডুটাকে কেটে বাদ দেব কিনা ভাবছি, তখন দেখি উলটপুরাণ!
নির্ঘাৎ ফেলুমার্কা আমি পাস করলাম উইথ ডিস্টিংশন্! সেদিন একরকম বাঁচিয়ে দিয়েছিল আমাদের নাতনি স্বয়ং। আমার সারাক্ষণের এ্যাসিস্ট্যান্ট মালতিকে নিজ বুদ্ধিতে সে বলত বালতিমাসি। কথাটিও নেহাৎ অযথা নয়! চলতে-ফিরতে সারাদিনই মালতীর হাতে একটা বালতি থাকবে অবশ্যই!
যদিও কাজের প্রয়োজনে। এমনিতে সংসারের যাবতীয় ঝঞ্ঝাট সামলাতে তার জুড়ি মেলা ভার। বেশ কয়েক বছর ধরে সে আমাদের সংসারে একনাগাড়ে নিরবিচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে চলেছে।
তার নিজেরই তিনচারটে বাচ্চা। গ্রামের বাড়িতে তাদের বাপের হেপাজতে রেখে আমাদের বাড়ির কাজে এসেছিল সে অনেকগুলো বছর আগে। বাস এ্যক্সিডেন্টে তার স্বামীর একটা পা কাটা পড়েছিল। বেচারাকে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে যেতে হয়েছিল সেদিন থেকে। বাড়িতে বসে বিভিন্ন কাজকর্মে জান লড়িয়েও পরিবারের সকলের মুখে অন্ন জোগাতে পারছিল না। সেইকারনে মালতী শহরে এসেছিল বাড়ি বাড়ি কাজ খুঁজতে। তার তখন খুব টাকার প্রয়োজন।
দিনরাত এককরে কাজ করত সে। কিন্তু এ বাড়ি, ও বাড়ি ছুটে ছুটেও তেমন উপায় হত না! অর্থ উপার্জনে আরোও মনোনিবেশ করতে হবে। এই ভেবে তারপর কখন যেন আমাদের বাড়িতেই থেকে গেল পাকাপাকি। অতিরিক্ত কাজ করলে যদি ওরও দু’পয়সা বেশি আয় হয়, আমরাও দেখতাম।
আমরা প্রত্যেকেই তাকে সেভাবেই ব্যবহার করতাম। এইভাবেই আমরা এবং সে। দুই পক্ষই অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন থেকে। প্রথম প্রথম বছরে দুই একবার বাড়ি গেলেও পরে পরে তার নিজের বাড়ি যাওয়াও প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। ব্যাঙ্কের একটা পাসবই করে দিয়েছিলাম আমি। তাতেই ওর বেতন জমা হত। তেমন কখনও খুব প্রয়োজন হলে মালতীর বর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে টাকা নিয়ে যেত।
সেই বর বেচারাকে দেখলে মায়া হয়। তবে পুরুষমানুষ হয়েও এমন বুদ্ধি করে, হিসেব করে বুঝেশুনে সংসার চালাত। মাসে মাসে আসতে হত না। বছরে এক দু’বার এসে সে সারা বছরের পয়সা নিয়ে যেত। এদিকে আমাদের বাড়ির সমস্ত কাজের দায়িত্ব এমন ভাবেই মালতীর ঘাড়ে চাপানো ছিল যে, সেইসব ফেলে সেও আর নিজের ছেলেমেয়েদের কাছে যেতে পারত না।
ভগবান তাদের ঠিক মানুষ করে দেবেন। এই আপ্তবাক্য মেনে সেও নিজের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব সেরে ফেলেছিল। আসলে তখন যে একমুহূর্তে তার অনুপস্থিতে এই বাড়িতে মস্ত গন্ডগোল হয়ে যায়! সেকথাটি অনেকবার প্রমানিত। মালতী খুবই বুঝদার। সেই কারনে সেও বাড়ি যেত না।
অথচ এমতবস্থায় আমি নিজ দায়িত্বে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বেওকুফির দৃষ্টান্ত রাখতে গিয়েছিলাম সেদিন? কেন কে জানে!
এতসব হৈ-হট্টগোলের মাঝে মালতী ফিরে আসাতে শেষমুহূর্তে আমিও যেন বাঁচলাম!
বাড়ি গিয়ে প্রথমেই তার বাড়িরই আসেপাশে দু’চারটি গ্রামের চারদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল। কিন্তু এই বাড়ির জন্য উপযুক্ত একটি বাচ্চা মেয়ে কোথাও পায় না সে! কোনোভাবেই যখন যোগাড় করতে অপারগ, তখন ভেবেছে সে কেবল আমারই কথা! আমাকে ভরসা দিয়ে গিয়েছিল নিশ্চিন্ত হওয়ার!
আমার চাহিদামতো কাউকে জোগাড় করতে না পেরে সে একেবারে অকুল-সমুদ্দুরে পড়ে।
একেবারে নিরুপায় যখন, তখন তার বরই বুদ্ধি দেয়। সেজ মেয়েটা তো বেশ বড়ই হয়েছে এবং কাজেকর্মেও দড়। বড় ও মেজর বিয়ের পর তখন বাপের সংসারটি সেই সেজমেয়ে দেখভাল করে। অগত্যা তাকেই নিয়ে আসার কথা ভাবা। ছোটমেয়ে ও ছেলেটাকে নিয়ে সংসার ম্যানেজ করে নেবে বাপে। কথাটা মনে ধরে মালতীরও। তাই নিয়ে এসেছে সে সেজমেয়েকে।
সেসময় মালতির মেয়েকে দেখে আমাদের সকলেরই ভির্মি খাওয়ার যোগাড়! নাতনিটি কোথায় ছিল কে জানে! ছুটে এসে বালতীমাসির সেই কাঠিপানা মেয়েটির হাত ধরে প্রবল বিক্রমে টানতে থাকে নিজের দিকে। এমন খেলার সঙ্গীকে তার খুব পচ্ছন্দ হয়েছে। তার মায়ের যতই কেন না আপত্তি থাক!
কিছুতেই আর তাকে ছাড়বে না সে। অনেক ভুজুংভাজুং দেওয়া হল। বকেঝকেও কিছুতেই যখন কিছু হল না। অগত্যা সকলেই নিমপাতা গেলার মত মুখ করে ব্যাপারটি হজম করতে বাধ্য হলাম। সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম অতঃপর আমিও। মালতীর মেয়েও সেট হয়ে গেল এই সংসারে। তিনবছরের নাতনিটির কাছে সেদিন তেকে কৃতজ্ঞ থাকলাম আমিও।
ভবিষ্যতেও নাতনিটির কাছে যে আমাকে আবারও কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে সেদিন বুঝিনি!
[দুই]
আমার সংসার জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে সবকিছু বুঝে উঠতে। প্রায় তিনযুগ। গঙ্গার বুকে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে দিনরাত্রি ধরে। সেই জলও গিয়েছে বয়ে কত কত দেশদেশান্তরে। বয়স বেড়েছে। অভিজ্ঞতা! সমানুপাতিক হারে না হলেও, খুব কমসম হয়নি! যে যার মত বুড়োবুড়ি হয়েছি। এখন আমাদের সেই ছোট্ট নাতনিটি বিবাহযোগ্যা বয়সে পৌঁছেছে। আগে থেকেই অবশ্য নিজের জীবনসাথী নির্বাচন পর্ব সে নিজেই সেরে রেখেছিল। সেই ব্যাপারে আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত কিংবা সামান্য মাথা ঘামাতে হয়নি কখনও!
আর দিনকয়েক পরেই নাতনির বিয়ের তারিখ। বিয়েবাড়ির আনুসাঙ্গিক কাজকর্মের তাড়ায় সকাল সন্ধ্যে সবাই তখন চোখে অন্ধকার দেখছি! হঠাৎ একি! সামনে এসে দাঁড়ালো এরা কারা?
বেশ কয়েকবছর হল, আমাদের পুরোনো বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট হয়েছে।
এখন আমরা বাড়ির সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরামে ফ্ল্যাটবাড়ির সুবিধেগুলো নিয়ে বসবাস করি। যুগানুযায়ী কিচেনগুলো সবারই আালাদা। বলতে গেলে আমাদের বেশ নতুন ধরনের যৌথ পরিবার। এইযে জড়াজড়ি করে আমাদের পুরোনো ফ্লেভারটাকে আঁকড়ে থাকা। সচরাচর চোখে পড়ে না। এমনভাবে একসাথে। অথচ ফ্ল্যাটে থাকার প্রয়োজনে সমস্ত আধুনিক ব্যবস্থা। অন্য বাসিন্দারা দেখে বেশ মজা পায়। একটু যেন তাচ্ছিল্যের হাসি তাদের মুখে। কারণ সো-কলড আধুনিক হয়ে উঠতে না পারায় আমাদের গায়ে তখনও পুরোনো গন্ধ! আমরা অবশ্য কানে তুলি না সেসব কিছু। এইযে এখনও একসাথে থাকি। এর অনেক সুবিধে পাই আমরা এবং পরবর্তী প্রজন্মও সেভাবেই অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে।
আমাদের বিয়ে বাড়ি। মেলা হইচই। মেলা হাঙ্গামা! লোকজন, আত্মীয় স্বজনদেরও যাতায়াত সারাক্ষণ। কিন্তু সেইসবের মধ্যে এখন এরা কারা? আকর্ণ হাসি মেখে আমাদের বিয়ের কনে নাতনিটি। সকলের সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এইসময়ে এমনভাবে কাদেরকে নিয়ে এসেছে এইভাবে টানতে টানতে?
এতদিন যত অনুষ্ঠান হয়েছে আমাদের, অর্থাৎ ছেলেমেয়েদের বিয়ে। পুরোনো বাড়িতেই হয়েছে। সেই বিয়েতে অবশ্য এতখানি ঝিকঝাক আয়োজনের প্রয়োজন কিম্বা আয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মের ধরন-ধারনই আলাদা। তাদের চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্মও একেবারেই অন্যরকম। অবশ্য বিয়ের কনে নাতনি, নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বিয়েবাড়ির সমস্তরকমের হ্যাপা সামলাচ্ছে।
নতুন ধরনের উপস্থাপনায় আমাদের বিয়েবাড়িটাও বেশ হৈচৈ-তে সরগরমে কাটল কয়েকদিন। আমাদের চারভাই ও পাঁচ বোনের বৃহৎ যৌথ পরিবারে সবেমাত্র গতকাল বিয়েবাড়ির হাঙ্গামা মিটেছে।
মেয়েজামাই সকাল-সকাল বেরিয়ে গিয়েছে। নিজেদের গাড়িতে ঘন্টা খানেক দূরত্বে তাদের বাড়ি। সেখানেও তো অনেক কাজ। বিশেষ করে জামাই সেই বাড়ির একমাত্র ছেলে। অনেক কাজ রয়েছে তার।
আজ বাদে কাল বৌভাতের দিন স্থির হয়েছে। তারই জোগাড়যন্ত্রে আমরা এতগুলো মানুষ ব্যস্ত।
হঠাৎ দেখি সন্ধ্যেবেলায় নতুন নাতজামাইয়ের আবির্ভাব।
একী? এতগুলো মানুষ আমরা একসাথে আঁতকে উঠলাম! সব ঠিক আছে তো?
জামাইয়ের হাসিমুখ দেখে ধড়ে প্রাণ এল। কিন্তু একি কথা?
নাতনির হুকুম নিয়ে এসেছে নাতজামাই। তাদের বাড়িতে বালতিমাসি ও চাইনাকে চাই!
নইলে সেখানের এতবড় কর্মযজ্ঞ কে উদ্ধার করবে! সেই কথা শুনে আমরা এতগুলো মানুষ হাসব না কাঁদব? কুল কিনারা হারাই!
[তিন]
সেই দিনটির কথা খুব মনে পড়ছে। মালতি বাড়ি থেকে এল তার লিকপিকে মেয়ে নিয়ে।
বড়বৌমা তো রাগে অগ্নিবর্ণা। সুন্দর ফর্সাপানা মুখখানি তখন সূর্যের মত উত্তপ্ত! নাতনির বায়না-টায়না কিছুই তার কানে ঢুকছে না। এদিকে নাতনিরও তুমুল বায়না, লিকপিকে ওই কেলটি মেয়েটাকেই চাই তার। কিন্তু বৌমাও শুনবেন না কোনো কথা।
ধুন্ধুমার টানাপোড়েন! প্রবল অপচ্ছন্দের ঠেলায় ওই প্যাকাটি মেয়ের ‘সাবিত্রী’ নাম কখন যে হারিয়েই গেল! হয়ে গেল ‘চাইনা’। আর মালতি তো আগেই নাতনির মুখে বালতিমাসি ছিল।
চাইনা শুনে সবাই ভাবত ‘চায়না’। এই নতুন নামে তাই বিসদৃশ্য ঠেকত না। অবশ্য দেখতে অমন হলে কি হবে, সত্যিই মেয়েটা বেশ চটপটে, স্মার্ট। বলার আগেই কাজকর্ম বুঝে নিত।
আমাদের মত কথাবার্তাও শিখে নিল তাড়াতাড়ি। নাতনিটির সঙ্গে থেকে থেকে পড়াশোনাটাও শিখে নিচ্ছিল সে চটপট। ধীরে-ধীরে খানিকটা মাংস লাগল তার লিকপিকে প্যাকাটি-শরীরে।
বেশ এগোচ্ছিল দিন, হেসে খেলে!
মাঝখানের কয়েকটা বছর! কিযে হল! বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হবে। নিজেদের মধ্যেই গন্ডগোল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে সবাই এদিক ওদিক কাটালাম বছর কয়েক। ওরা মা মেয়েও ওদের নিজের গ্রামে ফিরে যাবে। ফ্ল্যাট কমপ্লিট হলে’পর সবক’টি সংসার আবার একত্রে ফিরলাম। কিন্তু ওরা আর ফিরে আসেনি। শুনেছিলাম গ্রামের ধারা অনুযায়ী চায়নার বিয়ে হয়ে গিয়েছে ততদিনে।
এতদিন পরে কোথা থেকে সেই তাদেরকেই খুঁজে আনল নাতনি? অবশ্য ভাগ্যিস্ এনেছিল! মালতী অনেকটা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। কাজেকর্মে আগের ক্ষিপ্রতার অভাব। অসুখে ভুগেছে অনেকদিন। কয়েক বছরে হাতে-পায়ে কমজোরি হয়ে গিয়েছে একেবারে। কিন্তু চায়না একাই একেবারে যেন দশভুজা। তুফান মেলের মতই ছোটাছুটি করে হাসিমুখে উতরে দিল এত বড় বিয়েবাড়ির যজ্ঞি।
পুরোনো বাড়িতে আমাদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। নতুন ফ্ল্যাটে নাতনীর বিয়েটা প্রথম। বিয়েপর্ব ভালোভাবেই মিটল। পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম বিয়ে। চাপটা ছিলই। ভাগ্যিস্ মালতীরা মা-মেয়ে এসে পুরোটাই সামলে দিয়েছে। আবার ওর শশুরবাড়িতেও এখন চাইনাকে নিয়ে বৈতরনী পার হতে চায়! মেয়ে জামাইয়ের দু’জনেরই ডিম্যান্ড! অতএব মানতে হয়। নাতনিটি আমাদের বেশ করিৎকর্মা।
ভাবছি, অনেকদিন আগের আমার বেওকুফি কম্মোটির কথা। নেহাৎ তবে মন্দ ছিল না!
ওদের বাড়ির অনুষ্ঠানটিও উতরে দিল ওরা মা-মেয়ে দু’জনের দুই দুই চারহাত। বৌভাতের নেমন্তন্ন খেয়ে ফেরার সময় আমি জোর করেই মালতীকে আনলাম বাড়িতে। কয়েকটা দিন চাইনাকে সঙ্গে রাখতে চায় নাতনি। সে নয় থাক! ওর শশুরবাড়িতে থেকে একটু গুছিয়ে দেবে। ভালো কথা। তবুও মনের মধ্যে কেমন একটা যেন খচখচ বিঁধছে! নিত্য দিনের কাজকর্ম সেরে একদিন মালতীকে ধরে বসালাম।
আমাদের সকলের ফ্ল্যাটে কাজ করলেও মালতী আমার কাছেই থাকে। যেহেতু আমরাও একা। কর্তা অবসর নিয়েছেন বছর কয়েক। ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে অনেক দিন। সবাই যে যার কর্মক্ষেত্রে। অনেকদিন থেকে নিজের কাজ নিজে করে করে হাত-পায়ে কড়া ধরিয়ে ফেলেছিলাম। এইবছর আমারও অবসর নেওয়া স্কুল থেকে। মালতীকে পেয়ে হাতে যেন স্বর্গ ফিরে পেলাম।
হাতের কাছে জলখাবারের প্লেট যথা সময়ে হাজির। চায়ের কথা ভাবতে না ভাবতেই গরম গরম চা-কফি হাতে ধরিয়ে দেয়। আবার ভাবি, এ-তো সাময়িক সুখ! নাতনীর বাড়ি থেকে চাইনা ফিরলেই মালতী তো নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরে যাবে। তাছাড়া চাইনার নিজেরও সংসার আছে।
একটু ফুরসৎ পেয়ে মালতীকে বোঝাতে বসলাম। অন্তত আবার যদি রাখা যায় এই বাড়িতে।
‘আয়। স্থির হয়ে বোস দুটো কথা বলি। এইতো চাইনা ফিরলেই চলে যাবি। কথা বলাই হবে না।’ মালতী ঘরে এসে খাটের অদূরে মেঝেতেই বস পড়ল। বললাম, ‘মেঝেতে কেন? বোস চেয়ারটাতে।’
জানুয়ারী ফুরিয়ে ফেব্রুয়ারীর শুরু। ঠান্ডা মেঝে। সে শোনেই না কোনো কথা।
কোনোদিনই কাজের লোক বলে মালতীকে দূরে সরিয়ে রাখিনি আমি। আগে যখন একসংসারে থাকতাম তখন তো মালতী এইভাবে দূরত্ব ব্যাপারটা জানত না। দেখলাম, কয়েকটা বছরে মালতীর হাবভাবে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্ভবত বয়সে কাবু করেছে কিংবা অনেকদিন পর বলে সঙ্কোচ।
তাকালাম ওর দিকে। আগে যেমন ছিল কালো গায়ের রঙ। মাথার চুলগুলো খুব চকচকে, কালো। এখনও তেমনই। তবে মুখমন্ডলে অনেক হিজিবিজি রেখা বাড়িয়েছে। বয়সের হিসেবে হয়ত! নইলে, এমন একঢাল কালো চুল দেখে কে বলবে যে ওর সত্যিই বয়স হয়েছে।
শরীরটা একটু বোধহয় ভারী হয়েছে। ক’দিনের কাজের ধকলে একটু কাহিল লাগছে যদিও! আবার সামলে নেবে নিশ্চয়ই। মালতী আমার থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট।
এখানে থাকাকালীন দেখতাম, জবজবে করে সরষের তেল মাখত গায়ে-পায়ে, মাথার চুলেও।
তেলে-জলে গায়ের চামড়া বেশ টানটান, চকচকে ভাব ছিল। এখন তেমন দেখছি না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হ্যাঁরে, এখন তোর খবর কি বল দেখি?’
‘সৌমি অর্থাৎ নাতনীর সঙ্গে কীভাবে আবার তোদের যোগাযোগ হল?’
অনেকটা সময় চুপ করে কী যেন ভাবল মালতী। তারপর ধীরে ধীরে বললে, ‘বৌদিদি, তুমাকে লুকাব কী! ভাবছিলাম, তুমাদের সঙ্গে ই-জন্মে আর কখুনো দিখা হবে না।’
বলতে না বলতেই চোখের জলে বন্যা। কথা বলতে পারছে না। চোখের জল বড্ড সংক্রামক। না বুঝে আমিও আক্রান্ত হই। হাউমাউ কাঁদল মালতী কিছুক্ষণ।
কিছুক্ষণ সময় দিলাম শান্ত হতে। বলি, ‘এত কান্না কেন কাঁদছিস এখন? ইচ্ছে করলেই আসতে পারতিস আমাদের কাছে। ফ্ল্যাট হওয়ার সময় এদিক ওদিক সরে গিয়েছিলাম নয় কিছুদিন। কিন্তু পরে একবার এসে খুঁজলেই আমাদের কাউকে না কাউকে পেয়েই যেতিস। যতদূর শুনেছিলাম, তোকে তো বাড়ি চলে যেতে কেউ বলেনি সেসময়! তুই-ই নাকি চলে গিয়েছিলি নিজে থেকে।’
সে সময় আমি এখানে ছিলাম না। ‘ছোটমেয়ের ডেলিভারি ছিল বলে মেয়ের কাছে ব্যাঙ্গালোরে বছরখানেক ছিলাম। এসে শুনি তোরা চলে গিয়েছিস। ফ্ল্যাটের জন্য আমরাও ঝঞ্ঝাট পোহালাম কিছুদিন। সেই থেকে আমিও তেমন কাউকে পাইনি, বুঝলি? তোর সঙ্গে যেমন এ্যাডজাস্ট হয়েছিল তেমন আর হল না রে কারও সাথে!’ কথার মধ্যে মালতীর আরও কান্না। বাপরে! কত কান্না জমা রেখেছিল কে জানে!
[চার]
সবার কাজ সেরে মালতী যখন আমার কাছে এসেছিল তখন ফুরোনো দুপুর। বিকেল ফুরিয়ে এখন সন্ধ্যে। আমাদের কমপ্লেক্সের মধ্যে কয়েকটা বড় গাছ রয়েছে। অনেক পাখির বাস সেখানে। সারাদিনের হিসেব-নিকেস নিয়ে পাখিদের কিচির-মিচির জমে উঠেছে। চারদিকটা মাতোয়ারা। আবাসনের চারপাশে ঝকঝক করছে উজ্জ্বল আলো। যেতে যেতে শীতটা একটু যেন ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
দুর্বল অসহায় মানুষের উপর একহাত নিতে কেউ ছাড়ে না! প্রকৃতিও কেন ছাড়বে! মালতী তখনও ঠান্ডা মেঝেতেই বসে রয়েছে। এবার জোরে বকুনি দিলাম। অবশেষে উঠে বসল চেয়ারে। সন্ধ্যে নেমেছে তবুও ঘরের আলোটা জ্বালতে ইচ্ছে করছে না। বাইরের আলো অনেকখানি ঘরের ভেতরে আসে। সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি অত নিয়ম কানুন মানি না। এইভাবেই কতদিন ঘরের আলো নিভিয়ে চুপচাপ বারান্দার চেয়ারে বসে থাকি আপনমনে। ভালো লাগে। সারাদিনে হাবিজাবি কত কথা মাথায় ঘোরে। একা বসে বসে পর্যালোচনা করি। কর্মজীবনের অন্তে এটা আমার নতুন বদভ্যাসই বলা যায়।
এই বাড়ির সেজবৌ আমি। সেইসূত্রে সৌমি আমায় সেজদিভাই ডাকে। মালতীদের এনে সেদিন বলেছিল, ‘সেজদিভাই, সবাইকেই কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। করেছি। এছাড়া অন্য উপায় ছিল না!’
তার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝি না! বিয়েবাড়ির হুলুস্থুলুতে অবশ্য ওর কথার অর্থ খোঁজার চেষ্টা সম্ভব নয়। তারপরে তো সে শশুরবাড়ি গেল। কিন্তু সেদিন থেকে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে কথাটা।
সেই কথার সূত্র কিছু পাই কিনা পরখ করতেই আজ মালতীকে নিয়ে বসেছি। ওই যে বলেছিলাম, চিরকালের বেওকুফ আমি। চাই চারপাশে সব্বাই ভালো থাকুক। ভালো কাজ করব, তাই।
বিয়েবাড়িতে এসেছে। আনন্দ করবে। কিন্তু আসা অব্দি মালতী এবং চাইনা দুজনকেই খুব শুকনো দেখছি। সমস্যাটি বের করব। সমাধানের সদিচ্ছা ঘুরছে সেই থেকে মাথায়।
মালতীর কান্না থেমেছে। নিস্তব্ধ। নিশ্চুপ। মাঝে মধ্যে কেঁপে উঠছে। কান্নার রেশটা রয়েছে।
সময় নিক। তবে আজই শুনব। কর্তা যতারীতি পাড়ার ক্লাবে সান্ধ্য দাবার আড্ডায়। রাত দশটার আগে বাড়িতে প্রবেশ করবেন না। মালতী কত সময় নেবে? আজ আমি বদ্ধপরিকর।
অবশেষে মুখ তোলে সে। ‘দুষ নিবে না বৌদি, বলতে চাইনি। তুমি জুর করছ। শুনো কিনে…।’ আবার চুপ। সুযোগ দিই। মনের ভেতরে দুঃখটা গুছিয়ে নিক। আজ সবটুকুই জানতে হবে। নাতনীর কথার সঙ্গে এদের কোথাও কী কিছু যোগসূত্র আছে?
কাশছে মালতী। ঠান্ডা লেগেছে নাকি কথা বলার শক্তি সঞ্চয় করছে।
বুঝতে পারছি না আমিও! এমন মহাভারত ভাবনা নিয়ে অধীর হচ্ছিই বা কেন! কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকবে ওদের মত মানুষের? আর নাতনী তো এমন হেঁয়ালী করেই কথা বলেই সর্বদাই। যার মাথামুন্ডু সত্যিই থাকেই না প্রায়শই! তবু আমি যে কেন বোকার মত যোগসূত্র খুঁজতে যাচ্ছি? এইজন্যই আমাকে সবাই বেওকুফ বলে! সেও সত্য বটে!
[পাঁচ]
আমার ছেলে, বড়জামাই, দুজনেই ইঞ্জিনীয়ার। বড়মেয়ে ইউনিভার্সিটির লেকচারার। ছোটো মেয়ে এবং জামাই দু’জনেই আইটি সেক্টরে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চাকরি কিছুতে আমার কোনো ক্রেডিট নেই। শুধু কাজের লোকের সাহায্য নিয়ে ওদের জন্য রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলে নিতাম।
ছেলেমেয়েদের যাবতীয় উন্নতি ওদের বাবার কল্যাণে। ছেলেমেয়েদের গর্বে বুক ভরে ওঠে আমার। স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে পড়ে। কপাল করে স্বামী পেয়েছি। কোন জন্মের পুণ্য ছিল।
একসময় ইউটেরাসে টিউমার নিয়ে ভোগান্তি হয়েছিল খুব।তখনই মালতীকে পাওয়া। সেও আমার ভাগ্য। আমার দেখভাল করার জন্যই ঢুকেছিল সে এই বাড়িতে। তারপর সকলের প্রয়োজনে কাজে লেগেছে। আমাদের সংসারে থেকে যায় তারপর অনেক বছর। তখন ওরও অর্থের খুব দরকার ছিল।
এবাড়ির বৌ হয়ে এসেছি আমার উনিশ বছর বয়সে। তখন আমি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সবে। বাবাকে কোন ছোটবেলায় হারিয়েছি আমরা। অকালপ্রয়াণ! সেইসময় থেকে জেঠু কাকাদের সংসার। মায়ের সম্মান ছিল সেখানে যথেষ্ট। আমাদের ভাইবোনেরও আদর ছিল যথাযথ। তবে আমাদের ঠাকুরমায়ের মনে কেমন এক শঙ্কা ভরে উঠেছিল কেন যে, বুঝে উঠতে পারতাম না আমরা! আমাদের দুইবোনকেই তড়িঘড়ি পাত্রস্থ করতে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
বায়না করেছিলাম, অন্তত গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করব। সবাই বলল, শ্বশুরবাড়িটি খুবই ভালো। ওরা শিক্ষিত পরিবার। এবং পাত্র ছেলেটি খুবই ভদ্র সভ্য। পড়াশোনার বায়না তুই শ্বশুরবাড়িতেই মেটা। সেই বরং ভালো হবে।
না! আমিও এইবাড়িতে এসে পর্যন্ত স্বামীর কোনো অসঙ্গতি কখনও দেখিনি। নির্ভেজাল চাকুরিজীবি সংসারী মানুষ। স্বামী হিসেবে আদর্শবান। পরিবারের বড়দেরকে মেনে চলতেন অক্ষরে অক্ষরে। ছোটদের খেয়াল রাখতেন এক্কেবারে মায়ের মমতায়। আমাকেও যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমি পরে মাস্টার্সও কমপ্লিট করলাম তাঁরই উদার মনোভাবের সাহায্যে। সংসার সামলে একটা স্কুলে কাজ করলাম তিরিশবছর। ছেলেমেয়ে এইভাবেই যৌথ পরিবারে মানুষ হয়েছে। সবই যথাযথ করেছেন তিনি। আমার থেকে পাঁচবছর আগে তিনি অবসর নিয়েছেন। তারপর একটাই নেশা আজকাল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, দাবা। সংসারে সে নিয়ে কোনো অসুবিধে নেই। কেবল দীর্ঘ সন্ধ্যেবেলা। প্রবল একাকীত্বে ভুগছি আমি।
তিরিশ বছরের কর্মজীবনে অনেক বন্ধু হয়েছে আমার। কেউ কেউ প্রাণাধিক! তবুও কেন জানি এক গভীর অবসাদ এসে ঘিরে ধরে আজকাল! সবকিছু পাওয়া হয়ে গেলে বুঝি এভাবেই মানুষ দুঃখ-বিলাসী হয়ে ওঠে? কী যেন পাওয়া হয়নি এখনও? কোন সুখের শীর্ষ ছুঁতে হবে?
আমার চারপাশে সবাই আছে। ইচ্ছে করলে কোথাও বসতে পারি কিংবা কাউকে ডাকতে পারি। তবুও বয়সের অভিমানে ভরে তুলি ঈশাণকোণ। বুঝতে পারি, ঠিক হচ্ছে না! তবু সামলাতে পারি কই!
এখন ভাবলাম ভালই হয়েছে। একার আড়ালে, এইবার মালতীর মুখোমুখি বসার সুবিধেই হল।
এইসব সাত-পাঁচ ভাবনায় অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করি, মালতী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টিতে। অথচ সম্ভবত ও আমায় দেখছে না।
হেসে উঠি, ‘কিরে হল কী তোর? সন্ধ্যের মধ্যে বলবি না সারা রাতের প্রোগ্রাম আজ? বল বাপু। ধৈর্যটাকে কতক্ষণ ধরে রাখব? দাদাবাবু এসে যাবে তো। দুই অলক্ষ্মীকে অন্ধকারে এইভাবে বসে থাকতে দেখলে আর রক্ষা রাখবে?’
‘কি শুনবেন গো..!’
‘হ্যাঁরে, তোর আরও একটা মেয়ে ছিল না? তোর বর, তোর মেয়েরা? কেমন আছে সবাই? একেবারে কোলেরটা তো ছেলে..’, কিছুটা সময় চুপ থেকে তারপরে মুখ খুলল মালতি।
‘বৌদিদি, আপুনি ছিলে না ইখানে। বড় বিপদ হঁইগ্যেছে। সোমিদিদির দয়ায় মা-মেয়ে পরানে বেঁচেইছি। নাইলে আজ আপুনের সামনে বসতি আইসতে পাইরতাম লা!’
‘খোলসা করে বল দেখি সবটুকু। আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না!’
‘বৌদিদি, শরমের কতা। কওয়া যায় না! মা মেইয়ে আমাদোর দু’জনাই লস্ট হই গেঁইছিন! বহুদিন আঁগেই..! সিকথা কাকৌই বুইলতে পারিলাই!’
অঝোর কান্না আবার। তার মাথাটা নামতে নামতে একেবারে হাঁটুতে নুইয়ে দিয়েছে সে!
‘মানে? কী বলছিস? কীসব আবোলতাবোল উদ্ভুট্টি কথা বলছিস তুই?’
‘নিজেদের লস্টের কথা কি মাইনষে এ্যামুনি বলেঁ বৌদিদি? না বইলতে পারে?’
‘তাহলে চাইনা? ও তো বাচ্চা মেয়ে.. তাছাড়া ওর বিয়ে দিবি বলে তড়িঘড়ি নাকি চলে গিয়েছিলি.. কিযে ছাই বলছিস এখন..’ আমার মুখের কথা শেষ হতে দেয় না। তখনই মালতী বলে,
‘মেয়ার বিয়ার কতা না হইলে গেরামে লিস্তার পাইতাম? সমথ্থ মাইয়া.. সুমিদিদি না থাইকলে..’ আবার হাউমাউ কান্নায় ঢেকে যায় তার স্বর।
‘কিন্তু এর ভেতরে সৌমি আসে কীভাবে?’
কোনোক্রমে কান্নাটাকে গিলে নিয়ে মালতী বলে, ‘আপুনি ছিলেন না সিসময়। আপুনাদের ঘরেও কেঁহ ছিলেন না! আপুনাদের ইঁঘর তখুন সবুলোগ আপুনারা খালি করি দিইছিলেন! তব্যে নীচের ঘরে যেমুন আমরা মা মেইয়েত্যে থাইখতাম, তেমন ছিলাম কিছুদিন। আপুনাদের সকলের ভাড়ার ঘরে গিঁয়া আমার মা মেইয়ে তখন আর সিঁধাই লাই! টাইমে টাইমে সবুঘরে গিয়া গিয়া কাজ কইরে আইসতাম। সারাদিন রাইত চইল্যেঁ যায়! রাতটুকু কিবল ইখানে ঘুমাঁইবার লাইগ্যে থাকা! সুমিদিদি আসিছিল ইকদিন! আপুনাদের সবু দাদারা, মিস্তিরিরা বহুলোগ আস্যেঁ যান। আমাদের কখুনো কোনো অসুবিঁধা হইত লাই। সিদিন চায়নার শরীরটো একটুন খারাপ ছিলঁ। উ সিদিন কাজে যায় লাই। ঘরেই শুঁয়্যে ছিল।
ব্যাপরটো বুইঝলেন? চাইনার কান্না শুন্যে সুমিদিদি দৌড়ে আসেন। কিন্তুক কইরতে লারেন কুছু। আপুনার মনে আছেন? অনেক দিন হইগেছেন বুল্যা, মিয়ের বাড়ি থিক্যান আপুনকে ফিইরতে কইছিলেন সুমিদিদি! তখুনই আমাদেরগেও গেরামে যাইত্যে হুকুম দিল্যেন। সিইবারে চাইনার বিয়ার কথা উঁঠাই গেছিন। বেবাক লোগ কছু অনুমান কইরছেলেন। তবে কেহই বুইঝেলাঁই কুছুই ঠিকঠাঁক!। আঁটবরস হঁইগ্ল।’
‘কিন্তু মালতী, কে সে? দাউদাউ আগুন জ্বলছে আমার মাথায়! ভেতর থেকে এক অন্য আমি জেগে উঠছে। বড্ড অস্থির লাগছে! বল? বল কে? কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এখন উচিত, সেই ইতর অপরাধিকে শাস্তি দেওয়া।’
‘একখান কিগো? সেযে কতজনা! কাহার কুথা কইবো বুলো?’
‘তবে সকলের নামই বলো! এতে তোমাদেরও কী সম্মতি ছিল? নইলে কাউকে বলনি কেন?আমি না থাকলেও অন্য কাউকে বলতে পারতে? অন্তত তোমার দাদাবাবুকে তো বলতে পারতে! মাথায় আমার দাউদাউ আগুনের উত্তাপ- উচ্চস্বরে ফুটছে!’ চমকে ওঠে মালতী!
‘পুলিশরাও যদিন লিজেরাই চুরি করেন, তব্যে চর ধইরবেন কে?’ অদ্ভুত হাসছে মালতী!
‘মানে? মাথায় আমার জীবন্ত ভলক্যানো! কী উল্টোপাল্টা বকছ?’
‘সিজন্যই বলতে চাইনিগো বৌদিদি। তুমি জোইর কইরলে..! আপুনার ই সমসার লিয়ে গব্বো..!’
কিছুই শুনতে পাচ্ছি না! মুহূর্তের জন্য মালতীকেও সহ্য করতে পারছি না। অথচ আমিই ওকে সব খুলে বলতে বাধ্য করছিলাম।
এমন সমস্যা এলে মানুষে কী করে? নিজেকে কিভাবে শান্ত রাখব?
ভাগ্যিস্ ঘরের আলোটা নেভানো! নইলে আমার এই ভয়ঙ্কর আপমানিত কালো মুখটা মালতীর সামনে কিভাবে দেখাতাম! আগ বাড়িয়ে কেন জানতে চাইলাম! আমি এখন যাব কোথায়? আমার এই সুখে সম্পদে সাজানো সংসার! সত্যিই কী এমনভাবে একনিমেষে ধুলিস্যাৎ হতে পারে?
দমাদম শব্দে কোথায় যেন লোহার পাতে কোনো অতিমানব ঘা মারছে সর্বশক্তি দিয়ে! মনে হচ্ছে বুক পেতে আমি শুয়ে আছি কোনো রেললাইনের উপর! বুকের উপর দিয়ে তীব্রগতিতে ছুটে চলেছে ট্রেনের ইঞ্জিন! আবার মনে হচ্ছে, আমি কী কোনো সমুদ্রের তলদেশে পড়ে রয়েছি। শ্বাসবন্ধ করে?
মালতীর কথাগুলো কানে বাজছে। দুম্! দুম্! দুম্!
‘মুদের প্যাটের আগুন লা বাবুদের শরীলের আগুন কুনটা বেশি? সম্মোতির কতা জিগাইছেঁন? মুদের মোতো মাইনষের সম্মোতি কুনকালে কেহউ লিইছেনগো পিথিমীতে?’
[ছয়]
অষ্টমঙ্গলায় এসেছে সৌমি একদিনের জন্য। কথার সুযোগ হচ্ছে না, তবুও একসময় সব বলে।
সে তার নিজেদের বাড়ির লোককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সঙ্কোচ করেনি একমুহূর্ত। নতুন জামাই ডাক্তার। তার সাহায্যেই চাইনাদের বিপদমুক্ত করতে পেরেছিল সে। সামান্য জটীলতার কারনে চাইনার এ্যাবর্সন সম্ভব হয়নি। মেয়ে হয়েছে। নিজের উদ্যোগে চাইনার মেয়েটিকে বোর্ডিংস্কুলে রেখেছে সৌমি। ওদের নার্সিংহোমের এক ভদ্র সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে চাইনার। ছেলেটি সব জেনেই চাইনাকে বিয়ে করেছে। জামাইয়ের সঙ্গে সেই সময়েই আলাপ হয় সৌমির। এবং নির্ভরতা।
চাইনাকে ট্রেন্ড করে নিয়েছে সুন্দরভাবে। নার্সিংহোমের গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করে দিযেছে।
এইটুকু মেয়ে সৌমি। সে যদি এভাবে সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারে। তাহলে আমি আর কিছুদিন সহ্য করতে পারবো না সেইসব মানুষগুলোকে? কে জানে ক’দিন এই পৃথিবীতে থাকব!
এতগুলো বছরে আমাকে কিছুই জানায়নি সৌমি। চায়নার মেয়ে, কার? বলবেই বা কিভাবে!
চাইনাকে এনেছিলাম আমি। মালতী এসেছিল আমার সেবার কাজে। বেওকুফি ছিল? প্যাকাটি শরীরে মাংস লেগেছিল আমারই আদর যত্নে। প্রাকৃতিক নিয়মে যৌবন এসেছিল প্যাকাটির, সেও অপরাধ? কিংবা মালতী? সেকী শুধু পয়সার জন্য? অন্য কোথাও কিংবা অন্য কারও দ্বারা বিপদে পড়তেই পারত!
আর আমাদের মত মানুষ-জন? যার যেভাবে খুশি এইসব মানুষকে ব্যবহার করার অধিকার জন্মায়? প্রয়োজনের সময় উপকার পেয়ে থাকি যাদের থেকে। তাদেরকে বলতে পারি কী কোনোভাবে এমন কথা? যে, তোমাদেরকে পয়সা দিয়ে আমরা কিনে নিতেই পারি! যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করতে পারি!
যেখানে যত বালতীমাসি ও চাইনা আছো, তোমাদের আমরা আর কখনও চাই না! এইকথাও যে জোরগলায় বলতে পারি না! দেখছি, ভীষণভাবে অক্ষম, দুর্বল আমরা! অথচ লোকে ভাবে উল্টোটাই!
***সমাপ্ত***
