উপন্যাস

ফিরে আসার দিন

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

সাইকেলটায় জোর ব্রেক কষে দাঁড়ায় অন্তু। ঘড়ির কাঁটায় চারটা বাজতে এখনো মিনিট কুড়ি। মহিমের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা টেনে বলে, ‘ভাল আছ মহিম কাকা ? কাকিমা এখন কেমন আছে?’

অন্যমনস্ক মহিম প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আগুর মতই আছে। আশা নাইর‍্যে বাপ। তা তুই এই ভর দুপর‍্যে সাইক্যেল লিয়্যে কুতায় যাবি ?’

‘বিবড়দা। চিন্তা করো না কাকা সব ঠিক হয়ে যাবে।’ অন্তু আর দাঁড়ায় না। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে ছুটতে থাকে।

       মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলায় পেঁচানো গামছাটায় মুখ মোছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে ওর। দূরের খাঁ-খাঁ মাঠগুলো পেরিয়ে মহিমের দৃষ্টি ছুটতে থাকে। ও জানে কিছুই ঠিক হবে না। এই রোগে একবার ধরলে আর ছাড়ে না রুগীকে। ভাদু মহিমকে বলে, ‘মুকখানা শুকনা কইর‍্যে ক্যেন্যে থাকিস ? কেউ চিরদিন থাকার লাইগ্যে আসে নাই।’ হ্যাঁ কেউই চিরদিন থাকে না। তাই বলে অবেলায় কেন চলে যেতে হয় ? ভাদুর বয়স পঁইত্রিশের বেশি হবে না। এক-দু’বছর কম হলেও হতে পারে। এটা কারুর যাওয়ার সময় হতে পারে না। মেয়েরা এই বয়সে সংসারে দানাবাধে। ছেলেপিলের জন্ম দেয়। স্বামীর ঘরটাকে নিজের ভাবতে শেখে। আর ভাদু…, নিজের অজান্তেই আরেকটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে মহিমের।

       প্রথম চৈত্রের রোদেই চারদিকটা হু-হু করছে। সুমুকপাহাড়ির হাটে হালের বলদ দুটোকে বেচতে গিয়েছিল মহিম। মাত্র আঠার হাজারে ছাড়তে হয়েছে বলদ দুটোকে। হাটের পাইকাররা চোখ দেখলেই টের পেয়ে যায় পেটের গোপন কথাগুলো। তখন যা খুশি দাম হাঁকতে থাকে। মহিম ভাল মতোই জানে আজকের বাজারে ওই বলদ দুটোর দাম কম হলেও তিরিশ বত্রিশের কম হবে না। তবু ওকে আঠারতে ছাড়তে হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে এলে মানুষ নিজেকেও আধা দামে বেঁচে দেয়। এত নিছক দুটো বলদ।

। ১।

সাইকেলটাকে রাস্তা ধারের বট গাছটার তলায় দাঁড় করিয়ে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। গরমে গলগল করে ঘামছে সারা শরীর। চুল দিয়ে ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম ঝরছে। সিগারেট টানতে টানতে বারবার সারদামাতা কলেজটার দিকে তাকায় অন্তু। কয়েকটা মেয়ে চুকচুক করে গেটের বাইরে ঘুরছে। অন্তু ভাল মতোই জানে ওগুলো বেশ চালুমাল। একটু পরেই এক একটা ছেলের সাইকেলে ঝুপ-ঝাপ চেপে ইকোপার্কের দিকে ছুটবে। ‘শালা ভাবখানা সব এমন যে দাদার অপেক্ষা করছে। দাদা এলেই বাড়ি ফিরবে। পাক্কা হারামি এক একটা…’ নিজের মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করে অন্তু। সিগারেটটায় বেশ জোরে আরও কয়েকটা টান দিয়ে রাস্তার উপর ছুড়ে ফেলে। বাতাসে সিগারেটের টুকরোটা ছুটতে ছুটতে ঘাসের গাদায় গিয়ে হারিয়ে যায়। ওই যে মেয়েটা এদিকে এগিয়ে আসছে ? ওর নাম পলি। ওর নাড়ি নক্ষত্র জানা হয়ে গিয়েছে অন্তুর। কবে ও রোহিতের সঙ্গে গিয়ে সপ্তপর্নায় ঠুকিয়ে এসেছে সেটাও অন্তুর জানা। মেয়েটাও মনে হয় জানে যে ওর ব্যপারে অন্তু সব জানে। তাই অন্তুকে অনিচ্ছাতেও সমীহ করে চলে।

       পলি মুচকি হেসে পেরিয়ে যায়। ওর হিরো এসে গেছে। এবার রাসলীলা চলবে কাজুবাদামের জঙ্গলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে অন্তু, চারটা বেজে পঁচিশ। আবার একটা সিগারেট ধরায়। এতক্ষণে বেশ অস্থির অস্থির দেখাচ্ছে ওকে। এই অপেক্ষা করার সময়টা বেশ বিরক্তিকর। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে পেরিয়ে যায়। এটা এক্কেবারে পছন্দ হয় না ওর। কিন্তু উপায় তো নেই। শিল্পী তো ওকে আসতে বলে না। উল্টে বারণ করে। অন্তুই বরং শোনে না।

আরও মিনিট দশেক পর যখন শিল্পী কলেজ থেকে বেরিয়ে এলো তখন রাগে বিরক্তিতে অন্তুর চোখ-মুখে আগুন জ্বলছে। ‘কোন স্যারের সঙ্গে এতক্ষণ ইয়ে করছিলি শুনি। জানিস না আমি একলা একলা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব শা…’ শেষের গালিটা খানিকটা জোর করেই গিলে নেয় অন্তু। সবাই তাকিয়ে দেখছে।

       বেশ আড়ষ্ট ভাবেই অন্তুর সাইকেলে চেপে বসে শিল্পী। অন্তু বুঝতে পারে শিল্পীর ঠিক কিছু একটা হয়েছে। নতুবা চুপ করে বসে থাকার মেয়ে শিল্পী নয়। ‘কী রে গুম হয়ে বসে আছিস যে ? বাড়িতে আবার…’ ঘাড় নেড়ে শিল্পী জানায় বাড়িতে কিছু হয়নি। ‘তাহলে কী হয়েছে সেটা বলবি তো ?’

‘আজকে চয়নিকা বলছিল…, তুমি ওকে আবার কিছু বলবে না তো ?’

‘না কিছু বলব না বল।’

‘চয়নিকা বলছিল তুমি নাকি আগে সুইটিকে ভালবাসতে।’

‘ওই পদ্দার দের রোগা মালটা ? শালা আমি লাইন মারব ওই যমের অরুচিটাকে। তোর বান্ধবীকে বলিস ওদের মতো চামড়া ছাড়া শকুন গুলোর ইয়েতে অন্তু রায় পেচ্ছাব করতেও যাবে না। ওই টিকটিকটা আমার পিছনে ঘুরঘুর করত। সন্দীপের দোকানে গেলেই শালা ঠিক দরজার বাইরে এসে দাঁতের দোকান ওপেন করে দাঁড়িয়ে থাকত। শালা তোকেও বলিহারি লেবেলটা অন্তত উঁচুর দিকে রাখ। ওর মাকে নিয়ে বললেও না হয়…’ কথাটা শেষ করার আগেই অন্তুর হাতে আলতো করে একটা চড় মারে শিল্পী। চলন্ত সাইকেলটা মৃদু টাল খায়। সামলে নেয় অন্তু। এতক্ষণে শিল্পীর মুখে হাসি ফুটেছে।

       দুপাসারি কাজুবাদামের জঙ্গলে মোড়া রাস্তা। আর কিছুদিন পরেই পাকতে শুরু হবে কাজুবাদাম। সূর্যের তেজ খানিকটা কমেছে এতক্ষণে। শরীরে বাতাস লাগছে এবার। ফুরফুরে হাওয়ায় ছুটছে সাইকেলটা। শিল্পীর চুলগুলো মাঝে মাঝেই উড়ে এসে অন্তুর মুখে পড়ছে। শ্যাম্পুর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। শিল্পীর ঘাড়ের কাছাকাছি নাকটা এনে গন্ধটাকে ধরার চেষ্টা করে অন্তু। গন্ধটা নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে বুকের উপর দিয়ে ছুটতে থাকে। পুরুষ পুরুষ শিহরণ জাগে শরীরে। এই অনুভূতিটুকু নিয়েই অন্তু প্রতিদিন বিছানায় যায়। ফেসবুকে এগুলোই ইনবক্স করে।

পার্কটা এখনো বেশ নিরিবিলি আছে। একটু পরেই প্রজাপতি মৌমাছি সব ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে। বোলতা যে আসবে না তা নয়। বোলতাগুলোও তাদের বিষাক্ত হুল নিয়ে ছুটে আসবে। ওদের অত্যাচারে কোথাও কেউ শান্তিতে বসতে পর্যন্ত পায় না। অন্তু শিল্পীর হাতটা ধরে ঝিলের দিকে এগিয়ে যায়। পা ঝুলিয়ে বসে। শিল্পী যে আজ চোখে কাজল দিয়ে এসেছে এতক্ষণ খেয়াল করেনি অন্তু। চোখে পড়তেই বলে, ‘কাজল পরলে তোকে তো বেশ লাগে। পরিস না কেন ?’

‘ধুর সাজতে আমার ভালই লাগে না।’

‘এই বয়সে সাজবি না তো সাজবি কখন বুড়ি হলে ?’

‘তুমি ভালবাসলেই হবে। আমি তো আর পাঁচজনকে রূপ দেখাতে আসি না।’

‘ও তাই বুঝি। তাহলে বিয়ে বাড়িতে এত ঘটা করে সাজুগুজু করিস যে ?’

‘মায়ের অত্যাচারে সাজতে হয় মশায়। সাধে কি মাঝে মাঝে ঝগড়া লাগে…’

       এই একটা জায়গাতেই ওরা এসে বসে। ঝিলের মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে স্বপ্নভেজা গল্প করে। দেখতে দেখতে তিন-তিনটা বছর পেরিয়ে গেল দুজনে প্রেম করছে। অন্তু আর শিল্পীর মধ্যে দুটো অদ্ভুত মিল আছে। ওদের বাবা নেই। তবে শিল্পীর মনে আছে বাবার মুখটা, অন্তুর সেটাও মনে পড়ে না। অন্তুর বাবা যখন মারা যায় তখন অন্তু সবে হামা টানতে শিখেছে। শিল্পীর তো তা নয়, ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় ও ক্লাস ফোর। দ্বিতীয় মিলটা হল ওদের দুজনের মা-ই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। সেই সূত্রে দুই মায়ে পরিচয় আছে। একে অপরের বাড়ি আসা যাওয়া করে। দুজনের যন্ত্রণার কেন্দ্রবিন্দু যখন এক তখন ভাব জমতেও বিশেষ সময় লাগেনি। সেই যন্ত্রণার রেশ ধরেই ভাব জমেছিল অন্তু আর শিল্পীর ভেতরেও। প্রথম প্রথম বাবাকে নিয়েই গল্প চলত দুজনের।

       বিজয়াদশমীর বিকেল ছিল সেদিন। শিল্পীর মা শিল্পীকে সঙ্গে করে প্রথমবার এসেছিল অন্তুদের বাড়ি। মা মেয়েতে ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল বাড়িটা। বেশ সাজানো গোছানো শৌখিন বাড়ি। এক চিলতে উঠোনে নানান ফুলের পাঠশালা। একমাথা পেয়ারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মাঝারি মাপের পেয়ারা গাছ। একটা বাতাবি গাছ। লাইন দিয়ে সাজানো টবগুলোতে রংবেরঙের পাতাবাহার। নাম না জানা কত রকমের সব অর্কিড। পরিবেশ বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন অন্তুর বাবা। বাড়িটার আনাচে কানাচে তার ছাপ। অন্তুদের বাড়িতে প্রথমবার এসেই শিল্পীর মনে হয়েছিল, এই বাড়িতে অনায়াসে কয়েক জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে ও।

রাত্রি নটা পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল সেদিন। সুখ দুঃখের অনেক স্মৃতিকথা বলেছিল অন্তুর মা লতিকা শিল্পীর মা শিবানীকে। সেদিন থেকেই শুরু। তারপর আসা যাওয়া বন্ধ হয়নি আর। লতিকা হয়তো তেমন কিছু বুঝতে পারে না কিন্তু শিবানী মেয়ের মনের কথা ঠিক পড়ে ফেলেছে। শিল্পী একা একা অন্তুর বাড়ি না এলেও অন্তু কাকিমার খোঁজ খবর নিতে মাঝে মাঝেই শিল্পীর বাড়ি হানা দেয়। কখনো কখনো দুপুরের খাবার খেয়ে আসে। শিল্পীদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দুজনে কত রকমের গল্প করে। ওই গল্পগুলোর কোনও নাম হয় না। ওগুলো শুধুই গল্প।

‘শালা রোজ এখানেই এসে বসে যেন বাপের বানানো জায়গা…’ কথাটা শুনেই দপ করে আগুন ধরে যায় অন্তুর মাথায়। বোলতাগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকছে এবার। একে-ওকে হুল ফোঁটানো ছাড়া ওদের আর কোনও কাজ নেই। সারা পার্ক উড়ে উড়ে বেড়ায়। কে কোথায় কী করছে, কী বলছে এই নিয়েই টোন কাটতে থাকে। শিল্পী শক্ত করে অন্তুর হাতটা ধরে। অন্তুর পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাবা তুলে কথা বললে এক্কেবারে সহ্য হয় না ওর। রক্তচক্ষু নিয়েই পিছন ফিরে তাকায় অন্তু। ছেলে দুটো এখনো যায়নি ওখান ঠেকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। রাগটাকে গিলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে অন্তু।

‘৩৪-২৮-৩৪ এক্কেবারে ঝাক্কাস মাইরি। যদি পেতাম না…’ কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শিল্পীর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কোনও কথাবার্তা কিচ্ছু নেই, সোজা গিয়ে একটা ছেলের গলাটিপে শূন্যে তুলে ধরে। পার্কের আর সবাই শিল্পীর মতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

‘আরে আরে কী হল কী হল’-করে কয়েকজন ছুটে আসে। অন্তুর মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। এখনো রাগে কাঁপছে অন্তু। ছেলেটা হাত পা ছুঁড়ছে যন্ত্রণায়। অথচ পাশের ছেলেটা কিচ্ছু বলছে না। অন্তুর হাবভাব দেখে কয়েক ফুট পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। গলটা ধরেই এবার ছেলেটাকে মাটিতে আছড়ে দেয় অন্তু। মাটিতে পড়ে খক্-খক্ করে কাশতে থাকে ছেলেটা। অন্তু এবার ওর একটা পা ধরে ঘষড়ে নিয়ে আসে শিল্পীর কাছে। পেটটায় এক লাথি মেরে বলে, ‘বল কী বলছিলি এবার বল। না বললে শালা তোকে এখানেই শেষ করে দেব।’ আরও একটা লাথি মারে অন্তু। ছেলেটার কথা বলার মতো শক্তি নেই এখন।

       পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়ে গুলো মজা দেখছে। কেউ কেউ বলছে, ‘মারুক কুকুরটাকে মারুক, বড্ড আজেবাজে কথা বলে।’ কেউ কেউ আবার বলে, ‘ছেড়ে দিন দাদা এবার ছেড়ে দিন।’ অন্তু কারু কথা শোনার মুডে নেই ও আরেকটাকে খুঁজছে। ওই তো চোখে পড়েছে…, ভিড়ের মাঝে নিজেকে চালান করে দিয়ে কাঁপছে ছেলেটা। চুলের মুঠি ধরে ভিড়ের ভেতর থেকে ওকে বের করে অন্তু। ‘আমি কিছু বলি…’ অন্তুর প্রথম চড়েই মুখটা বন্ধ হয়ে যায় ছেলেটার। তারপর আরও একটা চড় আরও একটা আরও…। এতক্ষণে পার্কের গার্ড দুটো ছুটে এসেছে। অন্তুকে লক্ষ্য করেই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল হয়তো। কিন্তু এসেই দেখল একটা মাতব্বর ধূলায় খেলা করছে। আরেকটার নাকমুখ রক্তে মিলেমিশে একাকার। তাই অন্তুকে কিছু না বলে বোলতা দুটোকে সঙ্গে নিয়ে কেটে পড়ে। একটাও উচ্চবাচ্য করল না।

       সার্কাস শেষে অন্তু আবার শিল্পীর পাশে এসে বসে। শিল্পী এখনো ভয়ে সিটিয়ে আছে। সময়ে ফোন না ধরলে, না করলে, রেগে যায় অন্তু। চিৎকার করে। কিন্তু তাই বলে…

‘কিরে ভয় পেয়েছিস ? এটা কী দেখলি, এটা তো কিছুই না। আজকে ঠিক করেই এসেছিলাম বুঝলি। মাইরি বলছি শালা কদিন থেকেই ভাবছিলাম দেবো-দেবো আজকে দিয়েই দিলাম।’

       শিল্পী হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অন্তুর দিকে। মনে মনে বলে, ‘ঠিক করেই এসেছিল আজকে…’ অন্তু শিল্পীর কানটা ধরে নাড়া দেয়। অন্তুর হাতটা আবার শক্ত করে ধরে শিল্পী। অকারণে চোখ দুটো ছল-ছল করে আসে। শিল্পী জানে, না ঠিক জানে নয় অনুভব করতে পারে অন্তু ওকে কতটা ভালবাসে। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই শিল্পীরও ভয় হয়। হারিয়ে ফেলার ভয়। আচ্ছা সত্যি সত্যি যদি অন্তু কখনো…, না ভাবতে পারে না শিল্পী। এটা ভাবতে গেলেই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যায়।

‘ওই পাগলী কোথায় ডুবে আছিস ? আরে ওদেরকে না মারলে ওরা পেয়ে বসছিল। শুনছিলি না ওরা তোকে নিয়ে কীসব আজে বাজে কমেন্ট করছিল।’

‘তুমি আমাকে সারাজীবন এভাবেই আগলে আগলে রাখবে তো অন্তুদা ? আমার খুব ভয় করে জানো ?’ শিল্পীর চোখের পাতা জলে ভরে আসে। ঠোঁট দুটো ফুলে-ফুলে ওঠে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে শিল্পী।

অন্তু কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারে না। শিল্পীর মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করে।

পশ্চিম কোনে মেঘ জমছে। মাঝে মাঝে বেয়াড়া বিদ্যুৎগুলো ঝিলিক মারছে মাঘের বুকে। বৃষ্টি নামবে মনে হয়। অন্তু শিল্পীর মাথায় চিবুক রেখে জিজ্ঞেস করে, ‘বাড়ি ফিরতে হবে তো ? পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখ মেঘ আসছে। ঝড় উঠবে মনে হয়।’

শিল্পী অন্তুর বুকে মাথা রেখেই উত্তর দেয়, ‘তুমি তো আছো। আসুকগে ঝড়। আমি এখন বাড়ি যাব না।’

অন্তু আর কিছুই বলতে পারে না। বুকের মাঝে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে শিল্পীর মাথাটা।

আকাশ কালো করে মেঘের দল এগিয়ে আসে। গাছের মাথাগুলো দামাল বাতাসে নাচতে শুরু করে। মাঝে মাঝে কড়-কড় শব্দ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। খানিক বাদে ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়। তারপর ঝম-ঝম শব্দে। পার্কে বসে থাকা কপোত কপোতীগুলো ভিজছে। ওদের ডানায় ডানায় প্রেমের গন্ধ। অন্তু আর শিল্পী ঝিলের ধার থেকে উঠে একটা বটগাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। জলের ঝাপটায় জামা-কাপড় ভিজতে থাকে। এমন ভাবে ওরা কখনো ভেজেনি এর আগে। এই ভেজাটার আনন্দ অনুভূতি আলাদা। শিল্পীর ঠোঁটে বৃষ্টির মুক্ত দানা। হাওয়ায় উড়ছে চুলগুলো। বারবার সামলে নেওয়ার পরেও পাখা মেলতে চাইছে ওড়নাটা। অন্তু শিল্পীর কাছে এগিয়ে আসে। আরও কাছে। আরও কিছুটা কাছে। শিল্পীর নাকের গরম বাতাস অন্তুর ঠোঁটে ধাক্কা মারে। তারপর চারটা ঠোঁট স্বপ্নের ভেলায় চড়ে ভাসতে থাকে। ওদের কোনও গন্তব্য নেই। অন্তুর হাত নিজের অজান্তেই ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে শিল্পীর নিটোল শরীরটা। এক সময় বৃষ্টিভেজা শরীর দুটোতে দুর্নিবার শিহরণ জাগে। কাছাকাছি কাশির শব্দ পেতেই সরে দাঁড়ায় দুজনে। ছেলে আর মেয়েটা হাসতে হাসতে পেরিয়ে যাচ্ছে। ওরা কী কিছু দেখেছে ? হয়তো দেখেছে। লজ্জায় শিল্পীর গালদুটো রাঙা হয়ে যায়। অন্তু ওকে অনেকবার চুমু খেয়েছে ঠিক কথা কিন্তু ওর বুকে হাত দেয়নি এর আগে। এতদিন শিল্পী বান্ধবীদের মুখে শুনে এসেছে…। সত্যি কেমন যেন পাগল-পাগল নেশা লাগে।

বৃষ্টি কমে এসেছে এতক্ষণে। আর একটু পরেই সন্ধা এসে কাজুবাদামের জঙ্গলে ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দুজনে দুজনার হাত ধরে হাঁটতে থাকে রাস্তার দিকে। পার্কটা ফাঁকা হয়ে আসছে। ‘আমি তোমার প্রেমে হব…’ অন্তুর মোবাইলে কল। ‘হ্যালো মা। আরে বোলো না রাজাদের বাড়িতে এসে বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছি। চিন্তা করো না আটটার আগেই বাড়ি ফিরে যাব। আচ্ছা ঠিক আছে…, আচ্ছা।’ মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে অন্তু বলে, ‘জানিস মা না আমাকে চোখের আড়াল করতেই চায় না। হয়তো বাবাকে হারানোর ভয়টা মায়ের পিছু ছাড়েনি। মাঝে মাঝে খেয়াল করে দেখেছি মা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগে।’

‘আমারও।’

‘আমাদের দুজনের এই একটা জায়গা এক্কেবারে এক বল ?’

‘হুম’

‘এই তুই কী এত ভাবছিস বল তো। সেই কখন থেকে দেখছি তুই মনমরা। কিছু হয়েছে তো বল না।’

‘না না হবে আর কী। এমনি কেমন যেন লাগছে।’

অন্তু কিছুক্ষণের জন্য গুম মেরে যায়। তারপর বলে, ‘আমাকে খুব বাজে ভাবছিস তাই তো ? তুই যেমনটা ভাবছিস আমি কিন্তু মোটেও তেমন নই। নিজের অজান্তেই কী করে কী যে হয়ে গেল…’

‘আমি কি সেই নিয়ে তোমায় কিছু বলেছি ?’

‘বলবি আর কী। তুই তো ধরেই নিয়েছিস আমি ছেলেটা…’ কথাটা শেষ করতে পারে না অন্তু। অভিমানের চোটে ওরা গলা ভেঙে যাচ্ছে।

‘বিশ্বাস করো অন্তুদা আমি মোটেও ওসব ভাবিনি। তোমার দিব্বি বলছি।’

অন্তু আর কিছুই বলে না। একটা সিগারেট ধরিয়ে শিল্পীর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। পার্কের থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। সাইকেলে চড়ে। খানিক আগেই পিচরাস্তার উপর সন্ধা আঁচল পেতে দিয়ে গেছে। এখন বাতাসে কাজুবাদাম জঙ্গলের গন্ধ। সাইকেলটা ছুটছে বিবড়দার দিকে…

। ২।

এখনো মুখ ভার করেই আছে আকাশটা। মাঝে মাঝেই গুড়-গুড় শব্দ ভেসে আসছে দূরের আকাশ থেকে। বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে। ঘরের দাওয়ায় বসে অন্যমনস্ক ভাবে একটা বিড়িকে রগড়াচ্ছে মহিম। ভাবনার ভেতর ঘরে ঢুকে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথাই হয়তো মনে করছে। তখন ভাদু বঠের মতো ছায়ার বেড়ায় ঘিরেছিল মহিমের জীবনটাকে। ভাদুর গায়ের রঙ ফর্সা না হলেও কালো ছিল না কোনও কালেই। টানাটানা চোখ। টিকালো নাক। তুলিতে দিয়ে আঁকা মুক্তা রঙের দাঁত। প্রথমবার দেখেই মন ভরে গিয়েছিল মহিমের। তাই বিয়েটা সেরেই নিয়েছিল। স্বপ্নের মতোই কাটছিল ওদের এক একটা দিন। দেশলাইটা ফোঁস করে জ্বালিয়ে বিড়িটা ধরায় মহিম। ঘরের দাওয়াটা দেশলাইয়ের আলোতে আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুব মারে। মহিমের ঘরে যদিও ইলেকট্রিক আছে তবুও বিলের অত্যাচারে ওই একখানি বাল্ব টিমটিম করে ভেতর ঘরে।

       বিয়ের প্রথম প্রথম ভাদুর সঙ্গে খুনসুটি করেই রাত কেটে যেত মহিমের। বছর পার হতে না হতেই একটা মেয়ে জন্মাল। মেয়েই চেয়েছিল ওরা। স্বাদ করে নাম রাখল পূর্ণিমা। দোলপূর্ণিমার রাতে জন্মেছিল বলেই এমন নাম রেখেছিল ভাদু। এই বছর দশেকের মেয়েটা দিনরাত এখন মায়ের সেবা করে। শুধু সেবা নয় কলের থেকে জল আনা। দুবেলা রান্না করা। এর সঙ্গে স্কুল। যদিও এখন ঠিকঠাক আর স্কুলে যাওয়া হয় না ওর। হঠাৎ করে আছড়ে পড়া অন্ধকারটাই যেন সময়ের আগেই কচি মেয়েটাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে। গাঁয়ের লোকে বলে লক্ষ্মী জন্মেছে ভাদুর কোলে। পূর্ণিমা দেখতেও হয়েছে টুকটুকে। কে বলবে দশ বছরের মেয়ে ? দেখলে মনে হয় চোদ্দ পনেরোর কম হবে না। তবে চাঁদের গায়ে যেমন কলঙ্ক থাকে ঠিক তেমন ভাবেই পূর্ণিমারও কলঙ্ক আছে। কথা বলতে পারে না মেয়েটা। না জন্ম থেকে নয়। কার্তিকদের গাছে কুল পাড়তে গিয়ে গাছের থেকে পড়েছিল। সেই থেকে কী করে যে কী হল… মেয়েটা আর কথা বলে না। তখন কত আর বয়স হবে ? ওই বছর চারেক। তবে শুনতে পায় সব। হাত-মুখের ইশারায় বুঝিয়েও দিতে পারে। তবুও তো… 

       বিড়িটায় শেষ টান দিয়ে উঠোনে টুকরোটা ছুড়ে ফেলে মহিম। এখন আর ভ্যাপসা গরমটা নেই। বিকেলের ঝড় বৃষ্টিতে এখন ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। ভেতর থেকে পূর্ণিমা হাতের ইশারায় ডাকে। ঘরের ভেতরে ঢোকে মহিম। ভাদুর পাশে বসে। মাথায় হাত বোলায়। এখন আর ভাদুর মাথায় চুল নেই। রেডিও থ্যেরাপির অত্যাচারে সব চুল গেছে। এক সময় চুলের খোপায় জবা ফুল গুঁজে মাঠের কাজে যেত ভাদু। শীতের দুপুরে ভেজা চুলে পিঠ ঢেকে রোদ খাওয়াত। ভাদুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মহিম জিজ্ঞেস করে, ‘বল কী বলবি বলছিলি।’

ডাগর চোখে ভাদু চেয়ে থাকে মহিমের দিকে। চোখের কোনায় জল জমা হয়। কিছু একটা বলতে গিয়েও কিছু বলে না ভাদু। ভেতরের কষ্টটা দলা পাকিয়ে গলায় যেন বারবার আটকে যাচ্ছে। মহিম জানে ভাদু বলদ দুটোর কথা বলবে। বলবে নাই বা কেন ? সে বছর চাষের আগে যখন মহিম হাজার খানেক টাকার জন্য হন্যে হয়ে এর ওর কাছে চেয়ে ফিরছিল, তখন নিজের সোনার চুড়ি দুটোকে বিক্রি করে মহিমের হাতে টাকা-কটা তুলে দিয়েছিল ভাদু। বিয়ের সময় ভাদুর মা দিয়েছিল ভাদুকে। ধান বিক্রির টাকার সঙ্গে ভাদুর দেওয়া টাকাতেই বলদ দুটো কিনেছিল মহিম। দুধসাদা বলদ দুটোকে দেখেই ওদের নামকরণ করেছিল ভাদু। ভোলা-শঙ্কর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোলা-শঙ্কর নিজেদের নাম চিনে নিয়েছিল। পাড়াতে ওদের খাতির ছিল আলাদা। যেমন হাল টানার চটক তেমনেই গাড়ি টানার। কাদাখেত থেকেও অনায়াসে ধানবোঝাই গাড়ি টেনে তুলত ভোলা-শঙ্কর। আজকে যখন হাটে ওদেরকে রেখে ফিরে আসছিল মহিম ? করুণ ভাবে তাকিয়ে ছিল ভোলা-শঙ্কর। ওরা অবলা কিন্তু অবুঝ তো নয়।

‘সোনাপুর‍্যের চাইর বিঘা জমি বিক্কির দিন অত কইর‍্যে বইল্লম ভোলা-শঙ্করকে মন্যেক বিক্কি কইর না…’ কান্নার চোটে কথাটা শেষ করতে পারে না ভাদু। মহিম পাথরের মতো বসে থাকে। ভাদুকে বোঝানোর মতো কিছু নেই ওর কাছে। ভাদু জানে ওর দিন ঘনিয়ে আসছে। ওষুধ দিয়ে ওকে বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না। মহিম ও জানে ভাদু চলে যাবে। তবুও যে কটা দিন নিজেকে নিগড়ে আঁকড়ে রাখা যায়।

       নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে আসে পূর্ণিমা। ওর ছোট্ট বুকের ভেতর মাকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা ঝড়ের মতো বইছে কদিন ধরে। ওর বয়সি ছেলেমেয়ে গুলো ছাড়া ওর মায়ের সুস্থ হওয়ার গল্প আর কেউ ওকে বলে না। সেদিন পরানের কাছে গিয়েছিল পূর্ণিমা। ও জানে পাড়ায় পাড়ায় কবিরাজি করে পরানদাদু। ভূত ছাড়ায়। ডাইনি তাড়ায়। গাঁয়ে মন্দ বাতাস বইলে ঠিক বুঝতে পারে। পূর্ণিমা ইশারায় ইশারায় জানতে চেয়েছিল, ওর মা কবে সুস্থ হবে?

‘জানি নাই। ঠাকুর জানে।’ বলে কেটে পড়েছিল পরান। পরানের মতো লোকও পারেনি নিষ্পাপ মেয়েটার মুখের উপর মিথ্যে কথা বলতে। কিন্তু পূর্ণিমা? ওর ছোট্ট মনটা তো উত্তর পায়নি ঈশ্বরের দরবারে। কেঁদেছে। একলা একলা কেঁদেছে পূর্ণিমা। পুকুর ঘাটে বসে বাসন ঘষতে ঘষতে উত্তর খুজেছে হাঁসের কাছে, মাছের কাছে, গাছের কাছে এমনকি জলের কাছেও। ওরা হয়তো বলেছে, ‘কাঁদছ কেন খুকু তোমার মা আবার সুস্থ হবে।’ কিন্তু পূর্ণিমা খেয়াল করে দেখেছে দিনকে দিন দড়ির মতো শুকিয়ে যাচ্ছে ওর মা। এখন মায়ের বুকে মাথা রাখলে বালিশের মতো আর মনে হয় না। মনে হয়, গুটিয়ে পড়া কাপড়ের উপর মাথা রেখেছে ও। পূর্ণিমা জানে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে ওর মা। মায়ের কষ্টের গভীরতা মাপতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটা। তারপর দু’চোখ জলে ডুবিয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

বামুন পুকুরের জলে এক টুকরো চাঁদ দুলছে এখন। আকাশে ছেঁড়া-ফাটা সাদাকালো মেঘ চরে বেড়াচ্ছে। অশ্বত্থ গাছটার ছায়া পড়ছে জলের উপর। পলাশ গাছের ঝোপঝাড় পেরিয়ে চৌধুরীদের জমিগুলোর ওপার থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। সাঁওতাল পাড়ার কুকুরগুলো সমানে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে শেয়ালেরগুলোর সঙ্গে। ঘুমিয়ে পড়েছে জয়নগর গ্রামটা। একা পুকুর পাড়ে বসে আছে মহিম। হাঁড়িয়ার মাতাল গন্ধ বাতাসে বাতাসে। নেশা ধরছে মহিমের। হাঁড়িয়ার গন্ধের সঙ্গে বিড়ির গন্ধ আর চানাচুরের গন্ধ মিলে মহিমকে পায়ে ধরে অতীতে টানছে।

‘আমার পিরিতি তুমার পিরিতি শ্মশাইন পার‍্যেতে সব শ্যেষ

কার লাইগ্যে এত মিছিমিছি বাঁচা ? কার লাইগ্যে এত ক্ল্যেশ ?  

তুমি রোজ যে অগুনেতি ছাই আমিও ত পুড়ি তাতে

আমি যাব-ক্ষণ ভোর‍্যের বেলা তুমি যাবে আইজ রাইতে…’ চাপা কান্নায় লটপট করতে থাকে গানের লাইনগুলো। ভাদুর মুখটা মনে করে আরও একগ্লাস গিলে নেয় মহিম। কয়েক দানা চানাচুর মুখে দিয়ে আধমরা বিড়িটায় ফোঁস-ফোঁস করে কটা টান মেরে ওটাকে আরও চাগিয়ে তোলে। গানটা আবার একবার গাইবার চেষ্টা করে। সুর কেটে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে এখন।

চাঁদটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জলের উপর জ্যোৎস্না ঢালছে। মহিম উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। পারে না। ওর পা নড়বড় করছে। ভেতরটা গুল্লিয়ে আসছে বারবার। বমি হবে হয়তো। মহিম অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যমনস্ক ? অন্যমনস্ক হতে গেলেও তো মনটাকে ঝোলানোর মতো একটা ডাল লাগে। মহিমের সে ডাল নেই। ডালটায় ঘুন ধরেছে। ওটা তো কদিন পরেই ভেঙে পড়বে। প্রথম প্রথম মহিম ঈশ্বরের কাছে নানান কৈফিয়ত চাইত। এখন আর চায় না। এত দিনে মহিম এটুকু বেশ ভালমতোই বুঝেছে, গরীবের কোনও ঈশ্বর থাকে না।

পুকুর পাড়ে বসে বসেই ঝিমোচ্ছিল মহিম। হঠাৎ কানে আসে কারা যেন পাড়ের ওপারে ফিস-ফিস করছে। সোজা হয়ে উঠে বসে। কান খাড়া করে শব্দগুলোকে ধরার চেষ্টা করে মহিম। দুটো দুরকমের শব্দ কানে এসে ধরা দেয় মহিমের। একটা ‘বোল হরি হরি বোল…’ এই শব্দটা নদীর দিক থেকে ভেসে আসছে। আরেকটা শব্দ খুব কাছাকাছি। চোরের মতো ফিসফিসে গলায়। খানিকবাদে গলাদুটা চিনতে পারে মহিম। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘বেশ্যামাগী। ভাতারটাকে খ্যায়েও ভোক মিটে নাই।’ মহিম জানে ওরা কারা। শুধু মহিম কেন জয়নগরের প্রায় সবাই জানে। পরিমল মরার আগে থেকেই তপনার সঙ্গে কাবেরীর লটরপটর চলছে। কতবার হাতেনাতে ধরা পড়েছে। একবার তো মার খেতে খেতে বেঁচেছিল তপনা।

এই কাবেরীর উপর পুরানো একটা রাগ আছে মহিমের। পাতমাকে সঙ্গে নিয়ে মহিম একবার বামুন পুকুরে মাছ ধরতে এসেছিল। কাবেরী পলাশ গাছের আড়ালে পায়খানা বসে দেখে ফেলেছিল সেটা। পরেরদিন গ্রামের কারু জানতে বাকি ছিল না। কাবেরী ফলাও করে রটিয়েছিল। সেদিনের পর থেকে মহিম একটা সুযোগ খুঁজছিল। আজকে পেয়েছে। অশ্বত্থ গাছটার আড়ালে সরে আসে মহিম। মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে…

। ৩।

মাকে বোঝাতে বেশি সময় লাগে না অন্তুর। শিল্পীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগেই ও ঠিক করে রাখে বাড়িতে ফিরে কী বলবে। আজকে তো বরুণ দেব পবন দেব দুজনেই সহায় ছিলেন। কলেজের পরই শিল্পীর টিউশন থাকে। সোম-বুধ-শুক্র। শিল্পীর মা আর দাদা জানে রবি-সোম-বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র। সপ্তাহে দুটোদিন অন্তুর জন্য রাখা।

       ঘরে ফিরে ভেজা জামাকাপড় পাল্টে স্নান ঘরে ঢোকে অন্তু। বৃষ্টি ভেজার পর স্নান না করলে সর্দি হয়ে যায় ওর। স্নান ঘরে ঢুকে গামছাটা খুলে দাঁড়ায়। ভাল করে দেখে শরীরটা। আজ সারা শরীর জুড়ে প্রেমের ছোঁয়া। হাতের তালুতে শিল্পীর বুকের গন্ধ। চোখ বন্ধ করে হাতের তালুটা শোঁকে অন্তু। সারা শরীরে নেশা ধরে। গায়ে জল ঢালার সময় আবার একবার শিল্পীর বৃষ্টি ভেজা শরীরটা মনে পড়ে। পুরুষ পুরুষ ইচ্ছেগুলো মনের ভেতর লাফিয়ে বেড়ায়। সাবানটাকে তালুতে মুড়ে চটকাতে ইচ্ছে করে ওর। পরে ‘ধ্যাত’- শব্দ করে হাসি মুখে নিজেই নিজের মাথায় একটা টোকা মারে।

       বাথরুম থেকে ফিরে এসেই মোবাইলের ডাটা অন করে অন্তু। ফেসবুকে দুটো মেসেজ জ্বলজ্বল করছে। ইনবক্স ওপেন করে দেখে, নদী পাঠিয়েছে মেসেজ দুটো। নদী শিল্পীরই ফেসবুক আইডি। দাদার চোখ এড়াবার জন্য ওকে নদীতে নামতে হয়েছে। অন্তু মেসেজটা ওপেন করে দেখে, প্রথমের মেসেজটা কবিতা। পরেরটা একটা স্মাইলি। নদী এখন অফলাইন। মোবাইলটাকে সোফায় নামিয়ে সূতির পাজামায় পা দুটোকে গলিয়ে নেয় অন্তু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার নিজের বুকটাকে দেখে। মনে মনে নিজের বুকের মাঝে শিল্পীর বুক দুটোকে কল্পনা করে।

       অন্তুর মা টেবিলে চা-চানাচুর-মুড়ি নামিয়ে দিয়ে যায়। চায়ে চুমুক দিয়ে কবিতাটা পড়তে থাকে অন্তু-

‘নিজের জীবনের কাছে কাটিয়েছি আজও এক বেলা

বুকের ভেতর হরিণ হরিণ ঢেউ সবুজ নিয়ে খেলা

আজ সারারাত বৃষ্টি পড়ুক, পুড়ুক জোয়ার ভাসা বুক

আজ শরীর সাগরে শরীর শুয়ে থাক, শরীরে লুকিয়ে মুখ’- চার লাইন লেখার পর বেশ কিছু ডট দিয়েছে শিল্পী। এটা ওর অভ্যাস। এই ডট দিয়ে দিয়ে লিখতেই ও ভালবাসে।

‘…তবুও

কেন যেন মনে হয় তুমি শুধু স্বপ্নে দেখা সোনার পাহাড়

আমি গতিহারা নদী, যার দুই পারে স্বপ্নভঙ্গ পড়ে আছে ভাঙা দুই পাড়।’

– এর পরের মেসেজ স্মাইলি। কবিতাটা আরও একবার পড়ে অন্তু। মনে মনে ভাবে কয়েক লাইন ছন্দ মিলিয়ে উত্তর দেবে। পারে না। অন্তু শিল্পীকে অনেকবার বলেছে কবিতাগুলো ভাল কোনও পত্রিকায় পাঠাতে। শিল্পী পাঠায় না। পাঠায় না বললে ভুল হবে, পাঠাতে চায় না। প্রথম প্রথম কবিতাগুলো বিরক্তি নিয়ে পড়ত অন্তু। তারপর কবে নিজের অজান্তেই ভাললাগা জন্ম নিয়েছে। এখন শিল্পীর প্রতিটা কবিতা অন্তু পড়ে। ভাবে। আবার পড়ে।

‘মা রান্না করছে। একটা কল করবে…’ আবার নদীর মেসেজ। ও কখন অনলাইন এসেছে খেয়াল করেনি অন্তু। ফেসবুক বন্ধ করে কল করে।

‘কী করছিলে?’

‘তোর কবিতাটাই পড়ছিলাম।’

‘ও…। কেমন লাগল ? বাড়িতে এসেই লাইনগুলো মাথায় এলো, লিখে ফেললাম। না লিখলে আর মনেও পড়ে না জানো। এই শোনো না…’

‘হ্যাঁ বল।’

‘আমার মনে হয় মা জানতে পেরেছে আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম।’

‘ধুর কেমন করে জানবে ?’

‘মা বলছিল, দিন দিন এমন ঘুরে বেড়ালে লোকে পাঁচ কথা বলবে কিন্তু।’

‘তুই কী বললি ?’

‘কী বলব কিছুই বলিনি। জানুক না, জানলেই তো ভাল।’

‘হুম… তাই ? তাহলে বলে দে আজকে কোথায় গিয়েছিলি কী কী…’

অন্তুর কথা কেড়ে নিয়ে শিল্পী বলে, ‘তুমি না বেশি বেশি কর।’

‘শোন না বাড়িতে এসে যখন স্নানে গেলাম শরীরটা কেমন কেমন…’

‘প্লিজ প্লিজ এখন না রাত্রিতে যা বলার বোলো। প্রবলেম হয় খুব।’

‘কী প্রবলেম ?’

‘ন্যাকা। আচ্ছা পার্ক থেকে বেরনোর সময় হঠাৎ অমন মনমরা হয়ে গিয়েছিলে কেন ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।

‘কী জানি। মাঝে মাঝে মনে হয় ইচ্ছে করেই নিজেকে অপরাধি সাজিয়ে কষ্ট পাই। এই কষ্ট পাওয়ার আনন্দই আলাদা। ও তুই বুঝবি না।’

‘বুঝব না কেন ? এটা সবাই করে, আমিও। আমিও মনে মনে ভাবি আমার দোষ নেই তবুও তুমি বকছ আমাকে। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেই আদর করছ।’

‘আহারে বেচারি বালিকা। এবার একটা অন্যকথা বলি ?’

‘হুম, বলো।’

‘তুই এখন কী পরে আছিস ?’

‘আমি ঠিক জানতাম এটাই জিজ্ঞেস করবে। নাইটি। আর যে গুলোর রঙ জিজ্ঞেস করবে ওসব কিছু পরে নেই। হয়েছে ?’

‘কেন ?’

‘কী কেন ? গরম করছে তাই পরিনি। আর কোনও প্রশ্ন না। রাতে কথা হবে, এখন রাখি।’

‘আচ্ছা আচ্ছা রাখ।’

‘উম্ম…আ। বাই।’ ফোনটা রেখে দেয় শিল্পী।

       ইদানিং প্রায় প্রতিদিন রাতেই ওদের কথা হয়। শিল্পী পড়ার নামে ঠাকুর ঘরে শুয়ে শুয়ে ফোনে কথা বলে। কোনও কোনওদিন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে আসে তবুও ওদের কথা শেষ হয় না। ফোন চার্জে লাগিয়ে কথা চলতেই থাকে। তবে মাস কয়েক হল অন্তু-শিল্পী দুজনেই খেয়াল করেছে, ওরা রাতের আঁধারে শুধু শরীর নিয়ে কথা বলে। প্রথম শুরু হয়েছিল শিল্পীর পেচ্ছাবের সমস্যা নিয়ে। তারপর থেকে…। এই তো কয়েক সপ্তাহ আগে যেদিন প্রথম অন্তু জানতে চেয়েছিল, ‘তোর ডেট কবে ?’ লজ্জা পেয়ে কয়েক মিনিট চুপ করে গিয়েছিল শিল্পী।

গালভর্তি লজ্জা নিয়ে বলেছিল, ‘বার থেকে পনেরোর ভেতর শুরু হয়।’

‘কতটা করে…’ জানতে চেয়েছিল অন্তু। উত্তর না দিয়েই সেদিন ফোনটা রেখে দিয়েছিল শিল্পী। অথচ এখন যথারীতি ফোনে সেক্স চলে। ভাললাগে শিল্পীর। এখন নিজের শরীরকে খোলা বই এর মতো তুলে ধরে অন্তুর সামনে। অন্তুর শরীরের প্রতিটা অনুচ্ছেদ জানতে ইচ্ছে করে। আরও বেশি বেশি করে জানতে ইচ্ছে করে।  

রাত্রির খাবার খেয়ে ছাদে এসে দাঁড়ায় অন্তু। একটা সিগারেট ধরায়। বিকেলে বৃষ্টি হয়েছে বলেই গরমের গুমোট ভাবটা নেই এখন। বেশ ফুরফুরে হাওয়া বইছে ছাদের উপর। গাছে গাছে চাঁদের আলো লেগে আছে। পার্কের ঘটনাগুলো পরপর মনে পড়ে অন্তুর। ‘আবার ভুল করছি না তো…?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। শিল্পীর সঙ্গে ফোনে সেক্স করার পরেও অন্তু নিজেকে এই প্রশ্নটা করে। প্রতিদিন করে। নিজের যুক্তিতে নিজেকে বোঝায়। তবুও কোথায় যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করে। হয়তো সেই অপরাধ বোধ থেকেই বুদ্বুদের মতো প্রতিদিন এই একটা প্রশ্ন উঠে আসে। কথাটা শিল্পীকে বলেছিল অন্তু। শিল্পী বলেছে, ‘ভালবাসায় ভুল বলে কিছুই হয় না। বরং নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটাই ভুল। আমরা পূজা করছি না, প্রেম করছি। প্রেমে শরীর এলে ক্ষতি কী ?’ কথাটা অস্বীকার করতে পারেনি অন্তু, কিন্তু শিল্পী তো অন্তুর গোপন ইতিহাস জানে না। মনের ভেতরকার নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে অন্তু প্রতিদিন নিজেকে নানান প্রশ্ন করে। নিজেই উত্তর দেয়। তবু চলতেই থাকে শরীরের খেলা। শরীর শরীর নেশাটা দুজনকে পেয়ে বসেছে।

‘অন্…তু এই অন্তু… ঘুমিয়ে পড়লি নাকি ?’ নিজের ভাবনার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে অন্তু খেয়াল করে দরজায় রাজা ডাকছে। ‘এখন রাজা ?’

নীচে নেমে আসে অন্তু। দরজা খুলে দেখে রাজা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন এলোমেলো লাগছে রাজাকে।

‘ঘুমিয়ে পড়েছিলি ?’

‘না ঘুমাইনি। কিন্তু তুই এখন ? আয় ভেতরে আয়।’

‘না না ভেতরে যাব না। একটা খারাপ খবর আছে বুঝলি।’

‘কী খবর ?’ অন্তুর মুখটা থমথমে হয়ে পড়ে। রাজার বাড়ি শিল্পীদের গ্রামে। এক পাড়াতেই। শিল্পীর কিছু…

‘কৌশিক গলায় দড়ি নিয়েছে। পুলিশ-টুলিশ বিশাল ঝামেলা।’

‘কৌশিক ?’ ঝপ করে অন্তুর চোখে কৌশিকের মুখটা ভেসে উঠে। বিশ্বাস হয় না। সেই পাঁচ ক্লাস থেকে কৌশিক অন্তুর বন্ধু। দুজনেই হাই স্কুলে পড়েছে বারো ক্লাস পর্যন্ত।  

‘দাহ করতে যেতে হবে। যাবি ?’

‘দু’মিনিট দাঁড়া।’ কথাটা বলেই অন্তু হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢোকে।

‘তোর মাকে বলে আসিস। দেরি হবে ফিরতে।’

‘মা ঘুমের ওষুধ নিয়েছে। সকালের আগে উঠবে না…’

লাল মাটির কাঁচা রাস্তা দিয়ে ছুটছে মোটর বাইকটা। কারু মুখে কোনও কথা নেই। ঘর থেকে বেরনোর আগেই অন্তু শিল্পীকে মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে, আজকে রাতে কথা হবে না। কিন্তু কৌশিক এমনটা করল কেন ? বারবার জলে ভরে আসছে অন্তুর চোখদুটো। তাহলে কী কণিকার জন্যই…। তাছাড়া আর কী হতে পারে ? কদিন আগেও কৌশিক বলছিল, ‘ঠকছি ভাই নিখুঁত ঠকছি। আমি সিওর ওর জামাই বাবুর ভাই এর সঙ্গে ওর একটা…’ এটাই কারণ ? কিন্তু এর জন্য কেউ…

আলো-অন্ধকারে অন্তুর ভাবনাগুলো জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ‘কণিকা যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় পাশে থাকিস ভাই নতুবা এক্কেবারে একা হয়ে যাব।’ সেদিন ঠিক এই মেসেজটাই ফেসবুকে না হোয়াটস্অ্যাপ-এ করেছিল কৌশিক। কেউ না জানুক অন্তু জানে কৌশিক কতটা ভালবাসত কণিকাকে। সেই এগার ক্লাস থেকে ওরা জুটি বেঁধেছিল প্রেমের খেলায়। খেলাটা এভাবে শেষ হয়ে যাবে জানত না অন্তু। দু’চোখ ঝাপসা করে স্মৃতি গড়িয়ে পড়ছে।

‘খুব খারাপ লাগছে তাই না ? প্রথমে আমারও বিশ্বাস হয়নি। যখন ওদের বাড়ি পৌঁছলাম তখন ওকে গাছের থেকে নামানো হয়েছে। দেখতে পারতিস না। ভয়ংকর লাগছিল ওর মুখটা।’

‘ইদানিং কিছু হয়েছিল ওদের ভেতর ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘কী করে বলি বলত। ও কয়েক মাস থেকেই ক্লাবে আসাও ছেড়ে দিয়েছিল। তবে রাস্তায় দেখা হলে খেয়াল করতাম কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকত। খুব একটা কথাও বলত না। কিন্তু এমনটা হবে ভাবিনি। খুব খারাপ লাগছে মাইরি…’ রাজা কি কাঁদছে ? হবে হয়তো। কৌশিক ছেলেটা আর যাই হোক খারাপ তো ছিল না। সবার পাশে দাঁড়াত, সব্বার। এই রাজার জন্যেও কম করেনি কৌশিক।

       ডাংরা নদীর ব্রিজ দিয়ে ছুটছে বাইকটা। নদীর এপারে জয়নগর ওপারে সোনাপুর। দুটো গ্রামের মাঝে ডাংরা রুগ্ন শরীর নিয়ে বয়ে গেছে। এই ডাংরার মরা বুকেই দু’গ্রামের শ্মশান। খানিক বাদে কৌশিককেও এখানেই আনা হবে। এই নদীটার রুগ্ন নীরস বুকেও দুটো গ্রামের মানুষের শৈশব খেলা করে। তারপর শৈশব বুকে নিয়েই বার্ধক্য পুড়ে শেষ হয়। কৌশিকের বার্ধক্য আসেনি। তবুও কৌশিক পুড়বে আজকে। স্কুল থেকে ফেরার পথে এই নদীটার তীরে কৌশিকের সঙ্গে বসত অন্তু। শরৎকালে কাশ ফুলে ভরে থাকত নদীর চর। বর্ষায় দুজনে দেখত, দূরে অনেক দূরে জেলে-ডিঙা ভেসে যাচ্ছে। অকারণে মনটা হু-হু করত। অন্ধকারেও অন্তুর মনে হয় একটা ডিঙা ভাসছে অনেক দূরে। ডান হাতে করে চোখের জল মোছে অন্তু।

       অন্তু ভেবেছিল কৌশিকদের ঘরের সামনে প্রচুর ভিড় হবে। না, যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে লোক অনেক কম। আত্মহত্যা বলে হয়তো অনেকেই ঝামেলার ভয়ে আসেনি। কিংবা এসেছিল ফিরে গেছে। কয়েকজন লোক একটা খাট আগলে বসে আছে। একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিকের মা। বাইক থেকে নেমে দুজনেই কৌশিকের মৃত দেহটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর থেকে কান্না ভেসে আসছে। কারা কাঁদছে ? জানে না অন্তু। আপন কেউ হবে হয়তো। ‘আপন…?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। কণিকার মুখটা মনে পড়ে। রাগে ঘেন্নায় অভিমানে হাতে হাত ঘষে অন্তু। কৌশিকের মুখে কি হাসি লেগে আছে ? ও কি ব্যঙ্গ করছে ? ভাল ভাবে তাকিয়ে দেখে অন্তু। না হাসি লেগে নেই। জিবটা অল্প বেরিয়ে আছে। তাহলে ও কি ভেংচি কাটছে কাউকে ? কাকে ভেংচি কাটছে কৌশিক ? কণিকাকে ?

‘চল ওদিকটা থেকে একটু ঘুরে আসি। ওর মামা ওরা আসছে। ওরা এলে তবেই বেরোবে।’ অন্তুর কাঁধে হাত রেখে ওকে নিরালায় নিয়ে আসে রাজা। বলে, ‘তুই কষ্ট পাবি জেনেও তোকে আনলাম, না আনলে তুই আরও কষ্ট পেতিস।’

‘কণিকা খবর পেয়েছে ?’

‘হাঁ আমি কল করেছিলাম।’

‘আসেনি ?’

‘না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা।

‘কী বলল ?’

‘কিছুই না। হয়তো আমার আগেই কেউ জানিয়েছে ওকে ?’

‘কাঁদছিল ?’

‘মনে হয়।’

‘তোর মনে আছে রাজা এই মেয়েটাই কৌশিক স্কুলে না এলে কেমন মনমরা হয়ে বসে থাকত দেবদারু গাছটার নীচে। কৌশিক রাগ করে কথা না বললে কাঁদো কাঁদো হয়ে আমাদেরকে রিকোয়েস্ট করত কৌশিককে বোঝানোর জন্য। সময় সব এলোমেলো করে দেয় বল ? সময় অতীতকেও মাড়িয়ে দেয় হয়তো। স্কুল জীবনে দাঁড়িয়ে ভেবে দেখ কৌশিক মারা গেছে। কণিকার মুখটা কল্পনা করতেও পারবি না। অথচ আজকে দেখ…’ অন্তুর হাতটা শক্ত করে ধরে রাজা। কিছু বলে না।

। ৪।

নদীটার চারদিকে গুড়ি-গুড়ি ছাই উড়ছে এখন। বাতাসে মাংস পোড়ার গন্ধ। কৌশিকের শরীরটা পুড়তে পুড়তে প্রায় শেষ। এখনো বৈষ্ণবগুলো ‘বোল হরি, হরি বোল…’ সুরে খোল বাজিয়ে যাচ্ছে। এটা বিদায়ী সুর। তলপেট আর নাভিমন্ডল পুড়লেই দাহ কমপ্লিট। জ্বলন্ত চিতার থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে বসে আছে রাজা আর অন্তু। বন্ধুকে পুড়তে দেখার মতো সাহস ওদের নেই।

‘একটা জীবনের সব গল্পই শেষ হয়ে গেল বল। আর কারুর প্রতি ওর অভিযোগ নেই। দায় নেই। এখন থেকে কৌশিক ছিল-র দলে চলে গেল। আচ্ছা রাজা পুলিশ এসে কোনও চিঠি বা কাগজ কিছু পায়নি ?’

‘পুলিশ ?’ পুলিশ শব্দটা উচ্চারণ করে ব্যাঙ্গের হাসি হাসে রাজা। বলে, ‘পুলিশ কিছু খোঁজার চেষ্টাই করেনি। আত্মহত্যাটাকে সাধারণ মৃত্যুর পর্যায়ে লিখে কিছু টাকা নিয়ে কেটে পড়ছে। আরে ভাই আজকের দিনে কেউ ঝামেলায় পড়তে চায় না।’

‘কেন কৌশিক আত্মহত্যা করেছিল, সেটা তাহলে জানার কোনও উপায় রইল না।’

‘জেনেই আর কী হবে বল। ও তো আর ফিরবে না কোনওদিন।’

‘আত্মহত্যাটা মুখের কথা নয় রাজা। মানুষ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। ভাবতে পারছিস একটা মানুষ কতটা যন্ত্রণা পেলে নিজেকে মিটিয়ে ফেলার কথা ভাবে ?’

‘আজকে থাক পরে এই নিয়ে আলোচনা করব। আজকে ওকে ভালভাবে বিদায় জানাই।’

       নাভির মাংসটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে পুড়িয়ে দিল ওরা। ওরাও কৌশিকের আপনজন। কেউ কাকা কেউ মামা কেউ দাদা। কৌশিকের বাবাও এসেছে। অনেক দূরে বসে চুপচাপ পুড়তে দেখছে ছেলেকে। উনার চোখে কোনও জল নেই। পঁচিশ ছাব্বিশটা বছরের ভালবাসা মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে কৌশিক। একজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে আরও যে কত ইচ্ছে কত স্বপ্নের মৃত্যু হয় সেটার তালিকা বানানো যাবে না। অন্তু তাকিয়ে থাকে কৌশিকের বাবার দিকে। সত্যিই কাঁদছে না লোকটা। পাথরের মতো দুটো চোখ দিয়ে যেন গিলছে ছেলের শেষ যন্ত্রণাটুকু।

দাহ যখন শেষ হল তখন পূবের আকাশ লাল হয়ে আসছে। জল ঢেলে ঢেলে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে চিতাটা। শেষ আগুন বিন্দুটুকু নিভে যাওয়ার পর চিতার উপরে মানুষের একটা রেখাচিত্র এঁকে প্রতিটা অঙ্গের থেকে হাড় কুড়িয়েছে কৌশিকের বাবা। ছেলের হাড়। এটাই এখানের নিয়ম। বাবা না থাকলে জ্যাঠা কাকা কিংবা দাদা যাকে হোক কুড়োতে হয়। ওই হাড়গুলো ত্রিবেণীতে ভাসিয়ে দিয়ে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করলেই সব শেষ।

এবার সবাই ফিরছে। সবার আগে বৈষ্ণবের দল হরিনাম করে করে চলেছে। সবার শেষে অন্তু আর রাজা। হরিনামের সুরে আবার ছলছল করছে অন্তুর চোখ দুটো। মনে পড়ছে কৌশিকের মুখটা বারবার। মনে পড়ছে কৌশিকের বলা কত কথা। বুকের ভেতর অবিরাম একটা কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘কৌশিক আর নেই… কৌশিক আর নেই…।’

বাড়ি ফেরার পথে নদীর তীরে বসে দুজনে। সিগারেট ধরায়। এখন ঘরে ফিরতেও ইচ্ছে করছে না অন্তুর। শিল্পী কয়েকটা মেসেজ করেছে অন্তুকে, সঙ্গে বার তিনেক ফোনও করেছে। ফোনটা ধরেনি অন্তু। মেসেজগুলোর উত্তর দিতেও ইচ্ছে করছে না। শিল্পীও হয়তো কৌশিকের ঘটনাটা শুনে থাকবে। অন্য পাড়া হলেও গ্রাম তো একটাই। সিগারেটে একটা বিষণ্ণ টান দিয়ে অন্তু রাজাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোদের ঝামেলাটা মিটেছে ?’

‘ধুর ওগুলো মেটার নয়। আগে আগে ভাবতাম এখন আর ভাবতেও ইচ্ছে করে না।’

‘তাহলে কী করবি ঠিক করলি ?’

‘কী আবার কিছুই না।’

‘দেখ হয় ঝামেলাটা মিটিয়ে নে নয় পুরোপুরি সরে পড়। কোনও কিছু ঝুলিয়ে রাখিস না।’

‘চিত্রা বিয়ে করতে চায়। বাট… আচ্ছা তুই তো জানিস আমার বাড়ির পরিস্থিতি। যে মেয়েটা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে সে পারবে পাছা পোড়া হাঁড়ির সেদ্দ ভাত হজম করতে ? এখন আবেগে বলছে, সব পারব। আমি জানি নেশাটা কাটতে সময় লাগবে না।’

‘সব যখন জানিস তখন পুরোপুরি সরে যা।’

‘সরে যা কথাটাতেও তো একটা যা শব্দ আছে, কিন্তু কোথায় যাই বলত ? কী বলব চিত্রাকে ? ভুলে যা। ফোন করিস না। যোগাযোগ রাখিস না। তুই বলত বলা সম্ভব ?’

‘কিন্তু এভাবে কতদিন টানবি ?’

‘টানছি না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছি। হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছি নিজেকে। আমার কথা ছাড় তোর কী খবর ?’

‘যেমন চলছিল তেমনই চলছে। সেই ফোন। ফেসবুক। পার্ক। মাঝে মাঝে মনে হয় কী হবে এই সব করে। পরে আবার ভাবি বেঁচে থাকার জন্যও তো আধার লাগে। কৌশিকটাকে দেখ নিরাশ্রয় হয়েছিল বলেই চলে গেল।’

‘আমি একটা কথা তোকে বলব কি বলব না বুঝতে পারছি না…’

‘বল না কী বলবি ?’ রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে অন্তু।

‘তুই কৌশিকের ব্যপারে ঠিক কী জানতিস ?’

‘তেমন কিছুই না। কৌশিক কণিকাকে ভালবাসত, কনিকাও বাসত। পরে কণিকা ওর দিদির দেওরের সঙ্গে…’

‘এই জন্য কেউ আত্মহত্যা করে ? তোর কী মনে হয় ?’

‘খটকা যে একটা লাগছে না তা নয় কিন্তু আমি এর বাইরে তেমন কিছুই জানি না।’

‘কৌশিককে দাহ করতে বিশেষ কেউ আসেনি খেয়াল করেছিস নিশ্চয় ?’

‘হ্যাঁ। তো ?’

‘তোকে বললেও হয়তো তুই বিশ্বাস করবি না।’

‘তুই বল না বিশ্বাস অবিশ্বাস আমার ব্যপার।’

‘কৌশিকদের পাড়ার দোয়েলকে মনে আছে তোর ?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই আরেকটা সিগারেট ধরায় রাজা।

‘ওই কলকাতা থেকে আসা মেয়েটা ? সাপকেটে মারা গেল তো কয়েক মাস আগে।’

‘হ্যাঁ। মেয়েটা কৌশিকের খুড়তুতো বোন। কৌশিকের দাদুরা তিন ভাই, জানিস হয়তো।’

‘না জানতাম না।’

‘যাই হোক দোয়েল কৌশিকের…’

‘ওই তিন ভাই এর একজনের নাতনি তাই তো ?’

‘ঠিক তাই। দোয়েলের বাবা বরাবর কলকাতায়। ফলে দোয়েলের জন্ম থেকে লেখাপড়া সব ওখানেই।’

‘তারপর ?’

‘তিনজন ছেলে মিলে ধর্ষণ করেছিল দোয়েলকে।’

‘হোয়াট ?’

‘এখনো আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছুই হয়নি। পুরোটা শুনে তারপর বলিস।’

‘ওই ঘটনাটার পর স্বাভাবিক ভাবেই দোয়েলের পক্ষে ওখানে থাকা সম্ভব ছিল না। ওরা সবাই গ্রামে চলে এলো। ব্যবসায় লস হচ্ছে, গ্রামে ফিরে এটাই বলেছিল দোয়েলের বাবা। কিন্তু আজকের দিনে কোনও কিছুই গোপন থাকে না, আর এ-তো ধর্ষণ। মুখরোচক খাবার। দু’চারজন করে সবাই জেনে গেল। এবার কী করবে দোয়েল ?’

‘তুই বলতে চাইছিস কৌশিক সাহারা দিয়েছিল দোয়েলকে ?’

‘সাহারা নয় দিশেহারা করেছিল দোয়েলকে। কণিকার বিষয়টা গোপন করে দোয়েলকে আপন করেছিল। তারপর যা হয়। দোয়েল নিজেকে ভার্জিন প্রমাণ করতে গিয়ে প্রেগন্যান্ট…। এবার সাপকাটা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা ছিল না ওর জন্য। এবার তুই বল বিষ খাবে না তো কী করবে মেয়েটা ? ’

অন্তু এক্কেবারে চুপ হয়ে গেছে দেখে রাজা আবার বলে, ‘এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় কী জানিস ? কৌশিক নিজের মুখে সব বলেছিল আমাকে।’

‘এর পরেও তুই ওকে দাহ করতে…’

‘আমি জানতাম এটাই বলবি। কারণটা আর কিছুই না। কৌশিক কণিকা-দোয়েল দুজনকে ভালবেসে ছিল। কেউ না জানুক আমি জানি। আমি ওকে কাঁদতে দেখেছি। আমি জানতাম কৌশিক একদিন এমনটা করবে। ওর খবরটা পেয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু আমি অবাক হইনি।’    

        এরপর অন্তু কী বলবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ বসেছিল। ভেবেছিল একটা গল্পের পিছনে ঠিক আরও কতগুলো গল্প থাকতে পারে। রাজা না বললে কণিকা চিরদিন অন্তুর চোখে অপরাধি হয়েই থেকে যেত। এখন অন্তুর মনে হচ্ছে কণিকা নির্দোষ না হলেও ওর দোষটা কৌশিকের তুলনায় কম। কিন্তু একটা বিষয় অন্তুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না, দোয়েল তো জানত ওকে তিনজনে মিলে খুবলে খেয়েছে তার পরেও ও নিজেকে ভার্জিন প্রমাণ করতে গেল কেন ? এটার পিছনে ঠিক কী গল্প থাকতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারল না অন্ত। তাছাড়া আরেকটা প্রশ্ন, দোয়েল তো মরেছে বেশ কয়েক মাস আগে। হঠাৎ এতদিন পর কৌশিক…। ভাবনাটা থামাতে হল অন্তুকে। চোখ পড়ল দুটো লোকের উপর। ওরা মনে হয় ঝগড়া করছে। ঠিক যেখানটায় কৌশিককে পড়ানো হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়েই ঝগড়া করছে লোকদুটো। দূরের থেকে কাউকেই চিনতে পারল না অন্তু।

। ৫।

নদীটার এপারে বুড়ো শিবের মন্দির। না, ঠিক মন্দির নয় শালগাছের নীচে বাবার বাস। লোকে মন্দির বলে। বড় বড় শালগাছগুলোর নীচে পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাতি ঘোড়াগুলো শিবের জন্য দেওয়া হয়নি। গ্রামের কুলদেবী বাসুলীর জন্য দেওয়া হয়েছে। ওরা ষাঁড়ের সঙ্গে মিলেমিশে আছে বহুকাল। গাছগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় ওরা কত বছরের ইতিহাস জানে। হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলোও বেশ পুরানো। কোনও কোনটার পা ভেঙেছে ঝড় বৃষ্টিতে। একসময় শুধুই শিবের পূজা হত এখানে। পরে বাসুলীও এখানেই জমি পায়। তবে জায়গাটাকে সবাই শিবমন্দিরই বলে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতি মঙ্গলবার এখানেই আবার বাসুলীর নামে মঙ্গলাচন্ডীর পূজা হয়। নদীর দুপারের দুটো গ্রাম থেকেই মেয়ে বউরা আসে পূজা দিতে। জ্যৈষ্ঠ মাসে ছোটখাটো হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলোকে দেখা যায় না। ওরা কাঁঠাল পাতায় ঢাকা পড়ে যায়। এই সময়টুকু খুব ভিড় হয়। জ্যৈষ্ঠ মাস পেরিয়ে গেলে মানত ছাড়া কেউ ফিরেও তাকায় না এদিকে। এক সময় চৈত্রসংক্রান্তিতে এখানে খুব বড় মেলা বসত। লোকে বলত শিবের গাজন। চড়ক মেলা। যাত্রাপালা হত। ঝুমুরগান হত। এখন মেলা বসলেও আর ধুমধাম করে বসে না। যাত্রাও হয় না। লোকের আর আগের মতো সময় কোথায় ? তাছাড়া দুগ্রামের যারা টাকা পয়সা খরচ করে যাত্রার দল আনত তারাও প্রায় সকলেই শহর মুখি। এখন ধুঁকতে ধুঁকতে কোনক্রমে মেলাটা বেঁচে আছে।

       ভোররাতে পুকুর পাড় থেকে ফিরে এসে শুয়ে পড়েছিল মহিম। ঘুম আসেনি আর। পাশের ঘর থেকে ভাদুর যন্ত্রণাকাতর শব্দগুলো ভেসে এসে মহিমের কানে ধাক্কা মারছিল। খুব কষ্ট পাচ্ছে ভাদু। শরীরটা শুকিয়ে শুকিয়ে এখন হাড়-কঙ্কালটুকু পড়ে আছে। আরও কদিন পরেই রেডিও থ্যেরাপির জন্য নিয়ে যেতে হবে। মহিম দেখেছে রেডিও থ্যেরাপির পর ভাদুর শরীর আরও দুর্বল হয়। মাঝে মাঝে কাউকে চিনতে পারে না। সব গুলিয়ে ফেলে। এমনকি নিজেকেও চিনতে পারে না কখনো কখনো। ওষুধ গুলোরও খুব দাম। কিন্তু ডাক্তার বলেছে ওগুলো না খেলে দু-এক মাসের ভেতরেই শেষ হয়ে যাবে ভাদু। ভাদুকে হারানোর ভয়টা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মহিমকে। ভাদু চলে গেলে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বে মহিম। হয়তো পূর্ণিমার বিয়েও দিতে পারবে না ও।

এই সব সাতপাঁচ ভাবনায় ভয়ে সকাল সকাল স্নান সেরে  শিবমন্দিরে এসেছিল মহিম। নিজেই কিছু বেলপাতা তুলে এনেছিল। বাবার পায়ের তলায় দিয়েছে সেগুলো। মনে মনে ভাদুর সুস্থতার জন্য মানত করেছে। মন্দিরের শান্ত পরিবেশটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করেনি ওর।

একটা শাল গাছের তলায় বসে গত রাতের ঘটনাগুলো মনে করছিল মহিম। বারবার কাবেরীর উলঙ্গ ঊরু দুটো ভেসে উঠছে চোখের পাতায়। এর আগে এমন উরু কখনই দেখেনি ও। হাঁড়িয়ার চেয়েও বেশি নেশা। জ্যোৎস্নার চেয়েও সাদা। বামুন পুকুর পেরিয়ে খালের ধারের শ্যাওড়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে মহিম অপলক ভাবে কাবেরীর দুটো ঊরু চেটেছিল কাল রাতে। কাবেরীর নিটোল সাদা শরীরটার উপর তপনার লিকলিকে কালো শরীরটা বেমানান লাগছিল ওর চোখে। কালো জোঁকের মতো তপনাকে কীভাবে ওই সাদা তুলতুলে হাত দুটো দিয়ে কাবেরী জড়িয়ে ধরেছিল সেটাই বুঝতে পারছিল না মহিম। ওর ইচ্ছে করছিল তপনাকে তুলে পুকুরের জলে ছুড়ে দিয়ে কাবেরীর শরীর সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পারেনি। কে যেন ভেতর থেকে বারণ করছিল বারবার। নিজের ভেতরকার ভাল মানুষটার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মাথা নামিয়ে নিতে হয়েছিল আদিম যৌন দেবতাকে। তবে ওখান থেকে ফেরার আগে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল মহিম। চরম উত্তেজনার মুহূর্তে কাবেরী আর তপনার শরীরদুটো ছাড়তে পারেনি একে অপরকে। কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে মহিম বলেই ফেলেছিল, ‘ওই সাদা গাটতে গু মাখিস না কাবেরী। উটা গু মাখার গা লয়।’

       হঠাৎ মহিম এসে পড়ায় ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল ওরা দুজন। এমন সময় কেউ আসতেও পারে সেই ধারনা ছিল না ওদের। তপন কর্মরত অবস্থাতেই বলেছিল, ‘টুকু দাঁড়ার‍্যে মহিম। এমন সাদ কুতাও পাবি নাই।’ পাছে মহিম গ্রামের সবাইকে গিয়ে বলে, সেই ভয়েই কথাগুলো বলেছিল তপন। কাবেরী কিছুই বলেনি। তপনার পিঠে জড়িয়ে রাখা হাত দুটোকে সরিয়ে নিয়েছিল শুধু।

       আর পিছু ফিরে তাকায়নি মহিম। হনহন করে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল। মহিম ওই কথাটা বলে কাবেরীকে কী বোঝাতে চেয়েছিল মহিম নিজেও জানে না। কেন যে ওর মুখ থেকে ওই কথাটা বেরিয়ে গিয়েছিল কে জানে। তপনাও ধরা পড়ার ভয়ে খেয়াল করেনি মহিমের কথাটা। আর কাবেরী ? হ্যাঁ একমাত্র কাবেরীর কানেই বেজেছিল মহিমের কথাটা। মহিম কী বলে গেল কেবেরি ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। কাবেরী এটাও বুঝতে পেরেছিল গাঁয়ে ফিরে মহিম কাউকে কিছুই বলবে না।

       মহিম বলব বলব করেও কাউকে কিছুই বলতে পারেনি। বলতে না পারার জন্য নিজে-নিজেই বিরক্ত হয়েছে তবুও পারেনি বলতে। হয়তো মহিমের ভেতরকার সুপ্ত বাসনাগুলো কিছু বলতে দেয়নি ওকে। নয়তো কাবেরীর উর্বর ঊরুদুটো মহিমের মুখ সেলাই করে দিয়েছে। মহিম চাইলেই ওই নরম সাদা শরীরটার মালিক হতে পারে। কাবেরীর ঊরুদুটো বারবার চোখে ভাসছে মহিমের। আদিম ইচ্ছেগুলোর ঘুম যেন ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু ভাদু ? ওই ভাদু নামের শব্দটাকে কিছুতেই টপকে যেতে পারে না মহিম। যাবতীয় শারীরিক উত্তেজনা ওই এক শব্দে এসে থিতিয়ে পড়ে।

       একটা শাল গাছের নীচে বসেই আকাশ পাতাল ভাবছিল মহিম। হঠাৎ চোখ পড়ল একটা লোকের উপর। লোকটা নদীর চরে দাঁড়িয়ে বস্তার ভেতর কয়লা কুড়োচ্ছে। মড়া পড়ানোর কয়লা। ‘ক্যে মইর‍্যেচে ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করেও কোনও উত্তর পেলো না। তবে মহিমের আবছা মনে পড়ল কালকে রাতে কারা যেন ‘বোল হরি হরি বোল…’ করতে করতে নদীর দিকে আসছিল। সোনাপুরের কেউ হবে হয়তো। ঠিক এমন সময় ভাদুর মুখটা ঝপ করে মনে পড়ল মহিমের। আর তো কয়েক মাস, তারপর ? তারপর তো ভাদুকেও এখানেই…। ভাদুকে পোড়ানো কয়লাগুলোও কি কেউ এভাবেই কুড়িয়ে নিয়ে যাবে ? শেষ চিহ্নটুকুও রাখবে না নদীর পারে ? মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল মহিমের। ভয়ংকর রাগ হল লোকটার উপর। ‘দাঁড়া শালা তকে…’ অস্ফুট শব্দে কথাটা উচ্চারণ করে উঠে দাঁড়াল মহিম। শিবমন্দিরটা পেরিয়ে হড়হড় করে নামতে লাগল নদীর পাড় বেয়ে। লোকটা এখনো আপন মনে পোড়া কয়লাগুলো বস্তায় ভরছে।

‘এই শালা মড়া পুড়ানর কয়লাগুল্যাইন ক্যেন্যে চুরি কচ্চিস ?’

হঠাৎ মহিমের প্রশ্নে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। মহিম দেখল লোকটার বয়স ওর মতোই হবে। চুল-দাড়িতে সবে পাক ধরতে শুরু করেছে। তবে লোকটা মুসলমান। লোকটা যে মুসলমান সেটা চেহারা দেখেই বুঝতে পারল মহিম। সেটা বুঝতে পারায় মাথাটা আরও বিগড়ে গেল, ‘হারামি হিঁদ্দুর চিতাতে মুছলমান হয়্যে কন আক্কেলে হাত দিলি তুই ?’

লোকটা কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। টুঁশব্দটুকুও বের করল না মুখ দিয়ে। এতে আরও বেশি সাহস পেয়ে গেল মহিম, ‘কয়লাগুল্যাইন যেখ্যানটায় ছিল রাক শালা সেখ্যানটাতে।’

‘ই গুল্যাইন তো পানিতে ভ্যাইসে যাব্যেক।’

‘তাতে শালা তর বাপের কী ?’

‘আমাক্যে বইলছ আমাক্যেই বল, বাপকে টাইনছ ক্যেন্যে ?’

‘কায়দা না কইর‍্যে কয়লাগুল্যাইন রাক। শালা ফুল্যের মালা জামা কাপড় সব কুড়্যাইছে।’ লোকটার আরেকটা বস্তা ঘেঁটে ঘেঁটে দেখতে থাকতে মহিম।

‘র‍্যাইখব নাই। কী কইরব্যে ?’

‘দেখবি শালা কী ক্যইরব…’ লোকটার কয়লা বস্তায় সজোরে একটা লাথি মারে মহিম।

‘এই শালা…’ এবার লোকটাও রেগে গিয়ে মহিমকে সজোরে একটা ধাক্কা দেয়। মহিম পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয়।

       আরও কয়েক মিনিট গালাগালি করার পর দুজন দুজনের গলা চেপে ধরে। লোকটার পাশবিক ক্ষমতা হাড়ে হাড়ে টের পায় মহিম। ও আরও জোরে লোকটার গলা চেপে ধরে। দুজনে লুটিয়ে পড়ে নদীর বালির উপর। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছে না। ঠিক এমন সময় অন্তু আর রাজা এসে দুজনকে ছাড়ায়। টেনে তোলে।

‘কী ব্যপার মহিম কাকা ?’ মহিমকে জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘আর‍্যে দ্যেক ত, শালাকে মড়া পুড়ানর কয়লাগুল্যাইন লিতে বারন কচ্চি তবুও…’

       লোকটা এবার একটু ভয় পেয়েছে। এরা এখন তিনজন। ও একা। অন্তু লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মড়া পড়ানোর কয়লা দিয়ে কী করবে চাচা ?’

‘ইট ভাঁটায় বিক্কি ক্যইরতম।’ অন্তু লোকটাকে চাচা বলায় মনে হয় একটু ভরসা পেয়েছে।

‘ভাঁটায় পোড়া কয়লা কেনে ?’ রাজা জিজ্ঞেস করে।

‘হঁ। কিনে বইকি। এক বস্তা দিলে পঞ্চাইশ টাকা।’

অন্তু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘শ্মশানে শ্মশানে সারাদিন কয়লা কুড়িয়ে মাত্র পঞ্চাশ টাকা ? এতে সংসার চলে?’

       লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘ওই ফুলের মালা আর জামা কাপড়গুল্যাইন বিকে আরও তিরিশ চল্লিশ হব্যেক…’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আরও বলে, ‘নিজের জন্যে লয় ছা-গুল্যানের জন্যে সব কত্ত্যে হয়। নইল্যে করিমপুর থেইক্যা ইখানে আসি কি ?’

‘করিমপু…র থেকে সাইকেলে, বাপরে! তা কটা ছেলে মেয়ে তোমার ?’

‘দুইটা। একটা বিটি একটা ব্যাটা।’

‘বাঃ।’

‘তা মহিম কাকা তুমি ঝগড়া করছিলে কেন উনার সঙ্গে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘মুছলমান হয়্যে আমাদের শ্মশানে…’

‘তুমিও না। পোড়া কয়লাগুলো নিয়ে কারু যদি একটা দিন চলে তা ক্ষতি কী ?’

‘মানুইষটা মরার পর ওটুকুই তো পইড়্যে থাকের‍্যে বাপ। চোকের জল ফ্যেলানের লাগ্যেও তো কিচু একটা চাই ?’

       অন্তু মহিমের মনের অবস্থাটা এতক্ষণে বুঝতে পারে। সমস্ত সমস্যার কারণটাও ওর চোখে পরিষ্কার হয়। অন্তু মহিমকে ঠিক কী বলবে খুঁজে পায় না। মহিম শিব মন্দিরের দিকে হাঁটতে থাকে। অন্তু লোকটার হাতে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলে, ‘চাচা কয়লাগুলো পড়েই থাক। ফুল-মালা, জামাকাপড়, বিছানা-বালিশ ওগুলো তুমি নিয়ে যাও।’

অন্তুর কথা শুনে লোকটা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর অন্তুর দেওয়া পঞ্চাশ টাকাটা ওকে ফিরিয়ে দিয়ে পড়ে থাকা কয়লার বস্তাটা চিতার উপরে ঢেলে দেয়। ফুল-মালা, জামা-কাপড়ের বস্তাটা সাইকেলে চাপিয়ে উদাসীন ভাবে হাঁটতে থাকে।

‘বিষয়টা বোধগম্য হল না!’ রাজা বলে।

‘বিষয়টা আর কিছুই নয়। মহিম কাকার বৌয়ের ব্রেইন ক্যানসার। খুব বেশি দিন হয়তো বাঁচবে না। আমাদের গ্রামের শ্মশানও তো এটাই। মনে মনে নিজের বৌয়ের চিতাটা…’

‘এবার বুঝতে পেরেছি। ওর খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। লোকটাকে তেমন ভাবে না চিনলেও দেখেছি। আমাদের গ্রামে জমি আছে মনে হয়।’

‘ছিল। বিক্রি করে দিয়েছে।’

‘ও। জানতাম না।’

       দুজনে গল্প করতে করতে ব্রিজটার দিকে হাঁটতে থাকে। নদীর বুকে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে এখন। লোকটা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে যাচ্ছে সোনাপুরের কাঁচা রাস্তার দিকে। মহিমকে আর দেখা যাচ্ছে না। শালগাছের আড়ালে হারিয়ে গেছে ও। হাঁটতে হাঁটতেই অন্তুর ফোনটা বাজতে শুরু করে। শিল্পী কল করছে হয়তো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে অন্তু। না, শিল্পী নয়। অন্তুর মা কল করছে। মাকে কিছুই বলে আসেনি অন্তু। ফোনটা রিসিভ করে, ‘হ্যালো মা…

মন্দিরটা পেরিয়ে গিয়ে একটা পাথরের উপরের বসে মহিম। টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসে চোখের পাতায়। ‘ভাদু কী আর…?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। উত্তর হিসেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাকমুখ দিয়ে।

‘আমাকে মাজে মাজে ইখানট্যায় লিয়ে আইসবে ত। খুব সুন্দর জায়গাটা। কত বাতাস ইখানে।’ ভাদুর কথাটা ঝুপ করে মনে পড়ে যায় মহিমের। তখন পূর্ণিমা তিনমাস পেটে। দুপুরের দিকে ভীষণ গরমছিল সেদিন। টিনের ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ছিল। মহিম ভাদুর হাতধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এসেছিল নদীটার দিকে। মহিমের ঘরটা পেরিয়ে ধানের জমি। ধান জমির আল ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে ছোট্ট পলাশের জঙ্গল। সেটা পেরিয়ে গেলেই ডাংরা নদীটা পড়ে। নদীটার দুপার জুড়ে প্রাচীন শালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। একটা সময় শাল জঙ্গলেই ভরাছিল গ্রাম দুটো। এখন নদীর দুই পারে ছাড়া কোথায় তেমন চোখে পড়ে না।

নদীর জলে পা ডুবিয়ে সেদিন বেশ কিছুক্ষণ বসেছিল দুজনে। গরমের সময় নদীটাতে তেমন জল থাকে না। কোমর-ভাঙা বুড়ির মতো ধীর গতিতে চলে তখন। আবার বর্ষায় ডাংরা পূর্ণগর্ভা। দূর-দূর থেকে নদীটার চলার শব্দ পাওয়া যায়। ছোটছোট ডিঙা ভাসিয়ে কত লোক মাছ ধরে। মহিমের কাঁধে মাথা রেখে সেদিন বসেছিল ভাদু। সংসারের ছোটখাটো সুখ দুঃখের গল্প করতে করতে নদীর পাড় থেকে উঠে এসে বসেছিল শিবমন্দিরের সামনে। বাবাকে মানত করে ভাদু বলেছিল, ‘আমাকে বিটিই দিবে বুড়াবাবা।’ ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল ভাদুর।

        সেদিনের পর আরও বেশ কয়েকবার এসেছে দুজনে। এই প্রাচীন শালগাছগুলো যেন নদীটার দুই পারে শান্তি বিছিয়ে রেখেছে। মনে হাজার দুশ্চিন্তা নিয়ে এলেও মনটা শান্ত হয়ে পড়ে। পূর্ণিমা জন্মানোর সময় ভাদুর স্বাদ পূরণ করার জন্য মহিম নার্সিং হোমে ভর্তি করেছিল ভাদুকে। সিজার করতে হয়েছিল। কুড়ি হাজারের মতো বাড়তি খরচ হয়েছিল তাতে। বেশ কয়েক বিঘা ধানিজমি বন্ধক দিতে হয়েছিল মহিমকে। সেই জমি আজও ছাড়াতে পারেনি মহিম। বাড়ি ফেরার পর ভাদু যখন শুনেছিল কত টাকা খরচ হয়েছে। কোন কোন জমিগুলো বন্ধকে গেছে। খুব কেঁদেছিল ভাদু। কিছু জমিছিল মহিমের ঠাকুরদার আমলের। কিছু ঠাকুরদার বাপ কাকার আমলের। সোনাপুরেও জমিছিল প্রচুর। কয়েক বিঘা মহিমের বাপ বিক্রি করে মাটির ঘরটা ভেঙে টিনের ঘর তুলেছিল। বিঘা দুয়েক জরিমানা দিয়েছিল। বাকি কয়েক বিঘা ভাদুর চিকিৎসায় গেছে। পূর্ণিমা জন্মানোর পর প্রায় নিয়ম করেই এখানে আসত দুজনে। মহিম ছেলেবেলার গল্প শোনাত ভাদুকে। মহিম যখন ছোট তখন নদীটার পশ্চিম পাড়ে একটা লেদা পলাশের গাছছিল। দুগ্রামের ছেলেরাই আসত গাছটার উপর থেকে নদীর জলে ঝাঁপ দিতে। গাছটা বেশ কয়েক বছর আগে বাণে ভেসে গেছে। ভাদু পূর্ণিমাকে কোলে নিয়ে চুপচাপ মহিমের গল্প শুনত।

       আজকে চোখের পাতায় সেই দিনগুলো ভেসে উঠছে। ঘরের কোনায় বসে চোখের জল ফেলার তেমন সুযোগ হয় না। হয়তো তাই মহিম এই একাকীত্বটুকু খুঁজছিল ভেতরে ভেতরে। পূজা দেওয়ার অজুহাতে নিজের ভেতরটাকে খোঁচানোর জন্যই এখানে আসা। এবার বাড়ি ফিরতে হবে। ভাদুর ভালমন্দ কিছু হলে পূর্ণিমা সামলাতে পারবে না। এখন ভাদুর পেচ্ছাব পায়খানাও মহিমকেই পরিষ্কার করতে হয়। ঘরের বাইরে গিয়ে ওগুলো করার মতো ক্ষমতাও হারিয়েছে ভাদু। পূর্ণিমা অনেক করে কিন্তু ওই ছোট্টহাত দিয়ে কাঁথা-কাপড় কাচার ক্ষমতা ওর নেই। প্রথম প্রথম মহিমের একটু গা ঘিনঘিন করত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।

       একটা বিড়ি ধরিয়ে পলাশ জঙ্গলটার দিকে হাঁটতে থাকে মহিম। বাড়ি ফিরেই একবার বাজারে যেতে হবে। রান্না করার মতো কিছুই নেই বাড়িতে। ভাদুর ওষুধ গুলোও শেষ হয়ে এসেছে। বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকে মহিম। পলাশ গাছের ফাঁক-ফোঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে ওর গায়ে। গুড়ি-গুড়ি ঘাম জমা হচ্ছে শরীরে।

। ৬।

‘খানকির বিটি বলে কি-না ডাইনি। পর‍্যের মরদ খায়। একশবার খাব মাগী। ইব্যার তর মরদটাক্যে খাব। ডাইনি, ডাইনি লয়? মাগী নিজে যেমন কত ভদ্দর মেয়্যা বঠে। আমার বুক দুইট্যা দেখার লাইগ্যে তোর মরদটারও চোক লকলকায়। আমার মরদটার না হয় উটা মুতার জন্যেই ছিল, তোর মরদটার তো করার জন্যে ? কই তুই পাচ্ছিস ভাতারের ভোক মিট্যাতে? দেখবি পোকাব্যেক মাগী তোর ইয়াটা। বলে কিনা ডাইনি।’ নিজের মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে থাকে কাবেরী। কিছুক্ষণ হল উনুনে ঘুঁটে দিয়েছে। গোটা ঘর মম করছে ধোঁয়ায়। আজকে সকালে পুকুর ঘাট থেকে ফেরার সময় সত্যবানের বৌ কাবেরীকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলছিল পারুলের মাকে। কথাগুলো না শোনার ভান করলেও সবগুলোই শুনেছিল কাবেরী। ডাইনি কথাটা ওর হজম হয়নি।

       ছোটবেলা থেকেই একটার পর একটা স্বপ্ন ভেঙেছে কাবেরীর। মাতাল বাপের ঘরে জন্মানোর অপরাধে লেখাপড়া শিখতে চেয়েও শিখতে পারেনি। বছর পনেরো হতে না হতেই গ্রামের নির্মল মাস্টারের প্রেমে পড়েছিল। পাড়ায় পাড়ায় টিউশনি পড়াত নির্মল। কাবেরীকে ভাললেগেছিল বলেই হয়তো বিনে পয়সায় পড়াত ওকে। কিন্তু প্রেমটা পাতা মেলার আগেই কাবেরীর বাবা পাতা খাওয়া পোকার মতো কেটে দিয়েছিল মেয়ের স্বপ্নগুলোকে। মদের ধার মেটাতে না পেরে পরিমলের কাছে টাকা নিয়ে কাবেরীর গলাতেই গছিয়ে দিয়েছিল পরিমলকে। দিনরাত নেশায় ডুবে থাকত পরিমল। প্রায় প্রতিদিনেই বাড়ির উঠোনে বসত মদের আসর। মদের চাট বানাতে হত কাবেরীকে। হাতে হাতে গ্লাস ধরিয়ে দিতে হত। কাবেরীর নরম হাত ধরে টানাটানি করত পরিমলের বন্ধুরা। নেশার ঘোরে মজা পেত পরিমল। কাবেরীকে শারীরিক সুখ দেওয়ার মতো ক্ষমতাও ছিল না পরিমলের। মিলন শুরুর আগেই বিচ্ছেদের সানাই বেজে উঠত পরিমলের বাঁশিতে। বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই কাবেরী এটা বুঝে গিয়েছিল, ওর খিদে মেটানোর ক্ষমতা পরিমলের নেই। ওই মাতাল দলের ভেতর থেকেই কাবেরী খুঁজে বের করেছিল তপনাকে। তপনার কিছু থাক না থাক শরীরী খেলায় ও লম্বা রেসের ঘোড়া।

       বাড়ির উঠোনে বসে সবাই যখন নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেদের শৌর্য-বীর্যের গল্প শোনাত, তপনা তখন সাঁতার কাটতো কাবেরীর নরম শরীরে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা লোক জানাজানি হল। পরিমল মরার পর সবাই জেনেছিল। এমনকি তপনার বৌ পর্যন্ত। কাবেরীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার লেগেছিল তপনার বৌয়ের। কিন্তু কিছুই হয়নি তাতে। যখন তপনের বৌ বুঝতে পারল বেশি বাড়াবাড়ি করলে তপন পিছনে লাথ মেরে বাপেরবাড়ি পাঠিয়ে দেবে, তখন থেকে আর কিছু বলেনি।

       সব ঠিকঠাক চলছিল। এই কিছুদিন হল কাবেরী ভেতর ঘরে উঁকি দিয়ে খেয়াল করেছে, ওর মন এখন অন্যকিছু চায়। প্রথম প্রথম এই অন্যকিছুটা যে কী সেটা নিজেও বুঝতে পারত না। এখন বুঝতে পারে। ও মা হতে চায়। একটা বাচ্চার জন্যে ওর ডাগর বুক দুটো এতো টনটন করে। তপনাকে বলেছিল কাবেরী। লাভ হয়নি। বিধবার মা হওয়াটা মুখের কথা নয়। গ্রামছাড়া করবে লোকে। এমনিতেই যারা কাবেরীর শরীরটা ঠিকঠাক ভোগ করতে পায়নি তাদের একটা রাগ আছে ভেতরে ভেতরে। পরিমল মরার পর অনেকেই এসেছিল কাবেরীর শরীরী গন্ধে। দু-তিনজন ছাড়া কেউ কিছুই পায়নি। পরিমল মরার পর যখন কাবেরী পায়খানা করতে যেত ? গ্রামের কত জনের যে সেই সময় পায়খানার বেগ চাপত সেটা কাবেরীর অজানা নয়।

       একমাত্র মহিম কখনো খারাপ চোখে দেখেনি কাবেরীকে। পুকুর ঘাটে কিংবা নদীর ঘাটে কখনো যদি মহিম দেখত কাবেরী স্নান করছে, ঘাটে নামত না মহিম। এতদিন কাবেরী ভাবত মহিম ওকে ঘেন্না করে বলেই কাছে আসে না। কালকে রাতে কাবেরী প্রথম বুঝতে পেরেছে মহিম ওকে আর যাই ভাবুক ঘেন্না করে না। মহিমের চোখে ধরা পড়াটাকে কিছুতেই মানতে পারছিল না কাবেরী। মহিমের কথাটার মানে বুঝতে না পারলেও কাবেরী এটুকু বুঝতে পেরেছে তপনাকে শরীর দেওয়াটা মহিমের ভাললাগে না। কাবেরীর কোথায় যেন একটা বিশ্বাস ছিল মহিম কাউকে কিছু বলবে না। সেই বিশ্বাসটার জোরেই আজকে সকালে ভাদুকে দেখার অজুহাতে মহিমের ঘরে গিয়েছিল কাবেরী। মহিম বাড়িতে ছিল না। মহিমের ফেরার অপেক্ষা না করেই ফিরে এসেছিল কাবেরী। আসার সময় মহিমের মেয়েকে ঘরে আসার জন্য বলে এসেছিল।

ভাত নামিয়ে ফ্যান গড়ানোর সময় হাজির হল পূর্ণিমা। হাতের ইশারায় কাছে ডাকল কাবেরী। ভাতের ফ্যান গড়ানো হলে দড়ির খাটিয়াটা পেতে কোলের কাছে বসাল পূর্ণিমাকে। বিয়ের পর এই প্রথম কোনও বাচ্চা ওর কোল ঘেঁষে বসেছে। কেমন যেন একটা অচেনা অনুভূতি। ভেতর থেকে একটা অচেনা সুর বেরিয়ে আসতে চাইছে। পূর্ণিমাকে আরও একটু কাছে টেনে কাবেরী জিজ্ঞেস করল, ‘তর বাপ ফির‍্যেচে ?’

খাটিয়ায় বসে পা দোলাতে দোলাতে পূর্ণিমা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ উত্তর দিল।

‘কুতায় গ্যেইছিল তর বাপ ?’

কিছুক্ষণ ভেবে ফুলছোড়া আর প্রনাম করার ভঙ্গিতে পূর্ণিমা বোঝানোর চেষ্টা করল।

মহিম যে পূজাদিতে গিয়েছিল সেটা বুঝতে পারল কাবেরী। পূর্ণিমার তুলতুলে দুগালে দুটো চুমু খেয়ে ঘরের ভেতর থেকে গোটা চারেক বিস্কুট এনে হাতে দিল ওর। মহিমের ঘর থেকে ফেরার পথেই কিনেছিল বিস্কুটের প্যাকেটটা। জিজ্ঞেস করল, ‘আর লিবি ?’

মাথা নেড়ে, না উত্তর দিল পূর্ণিমা। উত্তরটা দেওয়ার সময় পূর্ণিমার চোখ পড়ল কাবেরীর গোয়াল ঘরের দিকে। একটা পাঁঠিছাগল দুটো বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছে। দু’একদিনের কচি বাচ্চা। পূর্ণিমা দৌড়ে গিয়ে বসল বাচ্চাগুলোর কাছে। বাচ্চা দুটোর মুখের সামনে একটুকরো বিস্কুট তুলে ধরল। ওরা খেলো না যখন তখন নিজের মুখেই পাচার করল টুকরোটা।

       প্রায় আধ ঘণ্টার মতো ছাগলছানা দুটোর সামনেই বসে রইল পূর্ণিমা। কাবেরী দূরথেকে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমার ভেতর এতক্ষণ নিজের মেয়েবেলাটাকে খুঁজছিল। স্মৃতিতে স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসছিল চোখের পাতা। খেলা সেরে পূর্ণিমা কাছে এলে ওকে বুকে না জড়িয়ে পারেনি কাবেরী। কিন্তু পূর্ণিমাকে বুকে জড়াতে গিয়েই একটা ভয় হল ওর। মহিম কিংবা পাড়ার অন্যকেউ কিছু বলবে না তো আবার ?

‘যে যা বইলচ্যে বলুক। এমনিতেই ক্যে আর মুকটা বন্দ রাখে ?’ কিছুক্ষণ ভেবে নিজেই নিজেকে উত্তর দেয় কাবেরী। নিজের অগোচরে তাকায় ছাগলটার দিকে। উঠে দাঁড়িয়েছে ছাগলটা। দুধ দিচ্ছে বাচ্চা দুটোকে। আবার বুক দুটো টনটন করে ওঠে। পূর্ণিমা যদি ওর… ? ভাবতে পারে না কাবেরী। ওর কপালে মা হওয়ার সুখ-স্বপ্ন লেখেননি বিধাতা। তাই হয়তো পরের মেয়েকে নিজের ভাবতে গিয়েও কোথাও যেন বাজে।

দুপুরের রোদ এখন কাবেরীর উঠান জুড়ে দাউ দাউ করছে। পূর্ণিমা বাড়ি যাওয়ার পর নিজের ভেতর বিড়বিড় করেছে কাবেরী। স্বামী-সংসার বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কোন মেয়েটা ঘর করতে চায় না ? কাবেরীও চেয়েছিল। পোড়া কপাল সাথ দিল না। ‘একন কি কিচুই করার নাই ? সব শ্যেষ ?’- এই প্রশ্নটাই কুরে-কুরে খাচ্ছে কাবেরীকে।

‘একন রাঁইধছিস নকি ? তা এখন রাঁইধলে আর খাবিটা কখন শুনি ?’ ভাবনার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কাবেরী। তপনা এসেছে। কাবেরী ভাল মতোই জানে কেন এসেছে তপনা। আজকে রাতে কাবেরীকে কখন কোথায় যেতে হবে এটাই ও বলতে এসেছে। তপনা চাইলে কাবেরীর ঘরেই ফুর্তি করতে পারে। কিন্তু তপনা জানে এতে ধরা পড়ার ভয় অনেক বেশি।  বাইরে থেকে যে কেউ এসে দরজায় শিকল তুলে দিতে পারে।

বুকের আঁচল বাগিয়ে কাবেরী উত্তর দেয়, ‘তর বউ এর পারা আমি অত এস্পাট লই। তা এখন কী মনে কইর‍্যে?’

‘না না এমনি আইল্যম, বলি টুকু ঘুইর‍্যে আসি দেখি ছোটবউটা কী কইচ্চে।’ পান খাওয়া লালচে দাঁত গুলোকে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে হাসে তপনা।

কাবেরী ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, ‘বউ ভাইবল্যে ত ভাভনাই ছিল নাই। আমিও পাড়ার ম্যেয়া বউয়ের মত প্যেট ফুল্যাই ঘ্যুইরতম। বছরেই একটা কইর‍্যে ছা হত্যক তর ঘরের বউটার পারা।’

‘বড ফালতু বকিস তুই। ছা বিয়াই মা হল্যেই জীবনটা পুরা হব্যেক নাই বুঝলি। কুন্তিও তো মা হইছিল কিন্তু কেউ কন্নকে মাইন্যে লিল ? লিল নাই। লিব্যেক ক্যেন্যে বিধবার ছা কোনওদিন…’ তপনা কাবেরীর মুখ দেখে বুঝতে পারে কিছু একটা ভুল হচ্ছে। হড়বড় করে বলে, ‘ছাড় উসব রামায়ণ মহাভারত তর বুজার কথা লয়। তা সকালে যে মহিমের ঘর গ্যেছলি কিছু বইলছিল নাকি ? শালা রাত্যের বেলায় বাঁধের পাড়্যে একা একা কী কচ্চিল ক্যে জানে। শালার কইরব্যার মুরাদ নাই ধইরব্যার অস্তাদ। তবে উ শালা কাহুকে কিছু বইলব্যেক নাই। জানে তপনার পঁদে লাইগল্যে উয়ার পিচনেও দুব্বাঘাস গজা করাব।’

‘কারু পঁদে লাগা উয়ার স্বভাব লয়। আমি যখন উয়ার ঘর গ্যেছলম তখন ঘরে ছিল নাই।’

‘হ্যাঁরে উয়ার বউটা কি হাগা মুতাও বিছানাতেই করে ?’

‘তা কুত্যায় কইরব্যেক ? হাড়মাস কিছুই তো নাই। বড মায়া লাগে।’

‘তুই তো দ্যেখিস নাই বিহাঁর পরপর পাছা লাচাই লাচাই জলক্যে য্যাইত। কত লোকের নজর, উ শরীরে আর মাংস থাকে ? তবে মহিমকে সব্বশান্ত কইর‍্যে তবে যাব্যেক।’

‘সব্বশান্ত হবার আর বাকিটা কী আছে ? সবেই ত গ্যেল। কষ্ট হয় উয়াদের বিটিটার লাইগ্যে। অমন রানীর পারা বিটি…’

কাবেরীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তপনা বলে, ‘ইটা ঠিক্যেই বইল্যেছিস। মেয়্যাটা ববা হোক তবে সুন্দরি বঠে। এখুনি দ্যেইখেছিস ছোট ছোট লেবুর পারা হইছ্যে। ভাব পরে কী জিনিশ হব্যেক।’

হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে যায় কাবেরীর। ওই ছোট একটা বাচ্চা আর…  কাবেরী বলে, ‘তর বিটিটারও লেবুর পারা হইছ্যে। কদিন পরেই লাউয়ের পারা হব্যেক। লোকের বিটি বউয়ের বুকের দিকে না দেইখ্যে তো নিজের ঘরের গুল্যাইন দেখত্যে পারিস। কিছু না হক সাইজ গুল্যাই মনে থ্যাইকব্যেক।’

থতমত খেয়ে যায় তপনা। কী বলবে খুঁজে না পেয়ে বলে, ‘না মানে আমি আরকি বইলছিলম যে এই বয়সেই ডাগর হইছ্যে বিটিটা।’

‘আমিও আরকি উটাই বইলছিলম তর বিটিটাও ডাগর হইচ্যে। আর হঁ পাছা দুলানতে তর বউ এর আগে কেউ নাই। কলতলায় মরদ লোক থ্যাইকল্যে আবার বেশি-বেশি দুলে।’

রাগে লজ্জায় চোখমুখ লাল হয়ে উঠে তপনার। বলে, ‘তুই তো মাগী আমার বৌবিটিদের পঁদে ল্যাইগতে পাইল্যে আর কিছুই চ্যাইস নাই।’ কথাটা বলেই বেরিয়ে যাচ্ছিল তপনা। ফিরে এসে আবার বলে, ‘আইজ সন্দ্যায় নদী ঘাটের দিকে যাবি। ওই সেদিনের জায়গাটতে।’ কথাটা কোনও রকমে বলেই বেরিয়ে যায় তপনা।

ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে কাবেরী। এই কথাগুলো কোনও দিনেই বলতে পারেনি। আজকে যেন কী একটা শক্তি কাজ করছে ভেতর ভেতর।

।৭।

বিকেলের দিকে ফেসবুকে শিল্পীকে কয়েকটা মেসেজ করেছিল অন্তু। উত্তর আসেনি দেখে হোয়াটসঅ্যাপও করেছিল। উত্তর আসেনি। এখনো মোবাইল বেজে যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না শিল্পী। হয়তো অভিমান হয়েছে ওর। হওয়াটা স্বাভাবিক, কালকে রাতের থেকে অন্তুকে কতবার মেসেজ করেছে ফোন করেছে কিন্তু কোনও উত্তর দেয়নি অন্তু। উত্তর কি দেওয়া যেত না ? নিশ্চয় যেত। ইচ্ছে করেই উত্তর দেয়নি। না, উত্তর দেয়নি ঠিক তা নয়, উত্তর দিতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু এমনটা যদি শিল্পী করত ?

       সেবার প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েছিল অন্তু। শিল্পীর ফোন বন্ধ, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও অফলাইন। সারারাত মোবাইল হাতে কল করেই গিয়েছিল অন্তু। সকাল নটার পর ফোন ধরেছিল শিল্পী। কোনও কথা না শুনেই কী গালাগালিটাই না সেদিন করেছিল। কিছুই বলতে বাকি রাখেনি। এমনকি শিল্পী নিজের শরীর খারাপের কথা বললেও বিশ্বাস করেনি অন্তু। ‘তুই সিম পাল্টে অন্যকারুর সঙ্গে কথা বলছিলি ওসব শরীরখারাপ-টরীরখারাপ বাহানা। আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি ? তোদের মতো মেয়েদের স্বভাব আমার জানা আছে।’ গড়গড় করে কথাগুলো বলারপর ফোনটা কেটে সুইচ-অফ করে দিয়েছিল অন্তু। সারাদিন নদী-পারে বসে মদ গিলেছিল। চোখের জল ফেলেছিল। রাগে অভিমানে চোখের পাতা বারবার ভিজে গিয়েছিল অন্তুর। পরে রাজা খবর দিয়েছিল শিল্পীর খুব শরীর খারাপ। জীবনসুরক্ষা নার্সিং হোমে এডমিট। কয়েকটা আমড়া চুষে নেশা কাটিয়ে বাঁকুড়া ছুটেছিল অন্তু। ক্ষমা চেয়েছিল শিল্পীর কাছে। ‘আমাকে বলিসনি কেন ? তোর কিছু হয়ে গেলে…’ শিল্পীকে হাতদুটো ধরে কেঁদে ফেলেছিল অন্তু। বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল শিল্পীর মা। অন্তুর প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়নি শিল্পী। একবুক অভিমান নিয়ে বলেছিল, ‘খুব সহজেই তুমি আমাকে পরের করে দাও। এরপর যদি আর কোনওদিন…’ কথাটা শেষ করতে দেয়নি অন্তু। চোখের জলে ভেজা ঠোঁট দিয়ে শিল্পীর ঠোঁট বন্ধ করে দিয়েছিল।

‘কী জন্য বারবার কল করছ ?’ নদীর মেসেজটা ভেসে উঠল অন্তুর ইনবক্সে।

‘সরি’ লিখে একটা স্টিকার পাঠাল অন্তু।

‘সরি ? কেন সরি কেন ?’

‘বললাম তো সরি। প্লিজ প্লিজ রাগ করে থাকিস না।’

‘আমার যে রাগ হতেও পারে সেই বোধটুকু যে তোমার আছে এটাই তো যথেষ্ট।’

‘দেখ তুই তো সবেই শুনেছিস এমন একটা ঘটনা যে ঘটে যাবে সেটা তো কল্পনাও করিনি।’

‘আমি সেটার জন্য তো কিছুই বলছি না। কিন্তু কোথায় আছো ? কী করছ ? সেটুকুও জানানো যেত না ?’

‘ভুল হয়েছে। আর হবে না। প্লিজ রাগ করে থাকিস না।’

বেশ কিছুক্ষণ শিল্পী কোনও রিপ্লাই না দিলে অন্তু আবার ইনবক্স করে, ‘শুশুনিয়া যাবি ?’

‘না’

‘চল না ভাল লাগবে।’

‘বাড়িতে প্রবলেম হবে। আমি যেতে পারব না।’

‘তোর কলেজ টাইমে যাব বিকেলে ফিরে আসব।’

‘না আমার ইচ্ছে করছে না।’

‘ওকে’

একটা লাইক দেয় শিল্পী।

‘পরে কথা হবে। বাই।’ ফেসবুক বন্ধ করে ডাটাকার্ড অফ করে দেয় অন্তু। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে ছাদে এসে দাঁড়ায়। সিগারেট ধরায় একটা।

‘শালা প্রত্যেক কটা মেয়ের এই এক রোগ। একবার যদি বুঝেছে আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না ব্যাস অমনি বাঁশ দেওয়া শুরু। এই জন্যই তিতলি…’ কথাটা বিড়বিড় করে বলতে বলতেও নিজের জিবটাকে সামলে নেয় অন্তু। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে…

       তখন কলেজ জীবন। একলা ভাড়া বাড়িতে থাকা। টুক করে উড়ে এসে হৃদয়ে জুড়ে বসেছিল তিতলি। সকাল বেলায় মাছ কিনতে গিয়ে ভিড়ের চাপে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভিড় কমার অপেক্ষা করছিল অন্তু। পাশে আরেকজন ভদ্রমহিলা। ‘তুমি সুবিমলদার বাড়িতে ভাড়া থাকো তাই না ?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন ভদ্রমহিলা।

‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো ?’ প্রথমটায় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল অন্তু।

‘বাংলা অনার্স ?’

‘হ্যাঁ বাংলা।’

‘না মানে আমার মেয়েটার জন্য বাংলা টিউশন পাচ্ছি না তাই ভাবছিলাম যদি সপ্তাহে কটা দিন করে একটু…’

‘কোন ক্লাস ?’ জিজ্ঞেস করেছিল অন্তু।

‘এই তো এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে।’

       রাজি হয়ে গিয়েছিল অন্তু। পাঁচশ টাকার চুক্তিতে সপ্তাহে তিনদিন করে পড়ানো। প্রথমদিন পড়াতে গিয়েই অন্তু  তিতিলির ডানায় প্রেমের রঙ দেখেছিল। ওকে দেখেই তিতলির চোখদুটো যে আনন্দে চকচক করে উঠেছিল সেটা অন্তুর চোখ এড়িয়ে যায়নি। মুগ্ধ ভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অন্তু নিজেই নিজেকে বলেছিল, ‘সত্যিই তিতলি।’ টুকটুকে ফর্সা মুখের উপর কাজল আঁকা টানাটানা চোখ। নেশা ধরিয়ে দেওয়ার মতো গোলাপি ঠোঁট। চিবুকের নীচে ছোট্ট তিল। টিশার্টে মাথা উঁচিয়ে থাকা অপরিনিত বুক আর লেগিন্সের আভিজাত্যে মোড়া মায়াবী পায়ের গঠন। ঠিক যেন বার্বিডল। একজন কলেজ পড়ুয়া ছেলের বুকে শেল মারার জন্য এর বেশি মনে হয় আর কিছু প্রয়োজন হয় না।

তিতলিরা ছিল দুইবোন। তিতলি ছোট। দিদির বিয়ে হয়েগেছে। বাবা শিক্ষক। শনিবার সন্ধায় ফেরে সোমবার সকালে আবার কর্মস্থল। বাড়িতে প্রাণী বলতে ওই তিতলি আর ওর মা। না, ভুল বললাম। আরেকটা প্রাণী ছিল অবশ্য। কুট্টুস। তিতিলির পোষা কুকুর।

       সন্ধা হলেই তিতলির মা সিরিয়েলে ডুবে যেতেন। সিরিয়েলের করুণ কান্না ঠেকাতে তিতলিকে দরজা বন্ধ করে পড়তে বসতে হত। তারপর বন্ধ ঘরে যা হয় আরকি। এক মাস পার হতে না হতেই প্রথম চুম্বন। তারপর তিতলিকে কোলে নিয়ে কবিতা পাঠ। তারপর ফেনের বাতাসে কবিতা গল্পগুলো নিজেরাই পতপত করে সরবপাঠ করত আর তিতলির বুকে মুখগুঁজে নীরবপাঠে মগ্ন হত অন্তু।

       তিতলির শরীরের প্রতিটা শিরায় শিরায় সেক্স ছড়িয়ে যখন অন্তু বলত, ‘আজকে কনডম ছাড়া একবার…’

‘না না আমার ভয় করে। যদি কিছু হয়ে যায়।’

‘আমি তো আছি।’

‘সেটা তো জানি কিন্তু মা যদি…’

‘কিছু হবে না। প্লিজ লক্ষ্মীটি একবার ওরিজিনাল স্বাদটা নিতে দাও।’

তিতলির নরম গলার প্রতিরোধ অন্তুকে বেশিদিন ঠেকাতে পারেনি। আসলে তিতলিও চাইত অন্যকিছুর স্বাদ পেতে। শেষ পর্যন্ত লাজুক ভয়ে মেয়েটা একদিন বলেই ফেলল, ‘ঠিক আছে, কিন্তু এই একবারই।’

       আরেকটা সিগারেট ধরায় অন্তু। শরীরের বাইরেটার মতো ভেতরটাও ঘামছে এখন। সন্ধা নেমেছে। তিতলির হাসিটা মনে পড়ে অন্তুর। সত্যিই খুব মিষ্টি দেখতে ছিল মেয়েটা। শরীরী খেলার শেষে একদিন হঠাৎ বিছানার থেকে নগ্নদেহে নীচে নেমে তিতিলি অন্তুকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমার বুক দুটো আরও একটু বড় হলে বেশি ভাললাগত তাই না ?’ কথাটা বলেই শরীরের চারপাশটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্তুকে দেখাতে দেখাতে আবার বলেছিল, ‘কোথাও মেদ নেই দেখো।’

উত্তর না দিয়ে তিতলির নগ্ন শরীরটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিল অন্তু। আবার কাছে টেনে নিয়েছিল তিতলিকে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল তিতলির শরীরটা। বন্ধ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে সেদিন হয়তো তিতলির মা কিছু শুনে ফেলেছিলেন।

‘অন্তু…উ তোর ফোন এসেছে…এ।’ নীচের থেকে ডাক দেয় অন্তুর মা। নীচে নেমে এসে অন্তু দেখে সি-ডি-এম-এ মোবাইলটায় শিল্পীর দুটো মিসকল। কলব্যাক করে অন্তু

‘কোথায় ছিলে ?’

‘ছাদে’

‘সিগারেট ?’

‘হুম।’

‘ওটা কমাও নতুবা পরে শরীরের ভীষণ ক্ষতি হবে।’

‘আমি তো ছেড়ে দিতে চাইছি। কিন্তু ওটাই আমাকে ছাড়তে চাইছে না।

‘ওসব ফালতু কথা বলে লাভ নেই।’

‘আচ্ছা পরে ওটা নিয়ে ভাবব।’

‘ওকে। একটা কবিতা শুনবে ?’

‘অবশ্যই শুনব। কবিতা লিখতে পারি না বলে কবিতা পড়ি না তা তো আর নয়।’

‘আচ্ছা শোনো-

মাথার উপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটছে রাত

ভেবেছিলাম নতুন জন্ম। পরে দেখি ঘুম ভেঙেছে চোখের পাতায়।

ঘণ্টা খানেক আগে যেটা বুকের থেকে দলা পাকিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে ছিল!

আত্মা ছিল না ওটা ?

এই গরমের রাতে ঘাম জেগে থাকে শরীরে। মনে।

মনে ?

মাঝে মাঝে ভাবি মন বলে সত্যিই কোনও বস্তু হয় !

নাকি এটা শরীরের ভুল ? মায়া ? প্রাচীন সংস্কার সংশয় ?

ওরা শুধু ডাকে ইশারায়

বলে, ‘এসো এসো শ্মশানে-কবরে, ভাঙাবুক দেওয়ালে

তুমিও তো দৃষ্টিহীন চোখে পৃথিবী আপন দেখেছিলে।’

যেতে হবে জানি, না যাওয়ার মতো এখানে কোনও সম্পর্ক রাখিনি

কে কার মা ? কার বাবা ? কার স্বামী ? প্রেমিকা-ই বা কার ?

সবকিছু মৃত শরীরের শবে রক্তের হাহাকার, এটুকু আজ জেনে গেছি।

তবে কেন যেতে গিয়েও বারবার পিছু ফিরে চাই ?

কেন বারবার মনে হয় আরও আরও আরও দুদণ্ড এখানে দাঁড়াই ?

কেমন লাগল ?’

‘খুব খুব খুব সুন্দর কবিতা।’

‘তুমি তো দেখছি ফেসবুকের কমন কমেন্ট কারিদের মতো। দুঃখের বার্তা লিখলেও না পড়েই বলে ভাল হয়েছে। এমন লেখা আবার লিখুন। খুব অসহায় লাগে তখন।’

‘ভাললাগাটা জানালাম। এবার সহায় লাগুক আসহায় লাগুক আমি কী করতে পারি ?’

‘কবিতাটা পড়ে তোমার কিছু মনে হল না ?’

‘কবিতার ভেতর কবির জীবনকে খুঁজলে অনেক কিছুই হয়তো চোখে পড়ে কিন্তু আমার মনে হয় কবিতায় কবিকে না খোঁজাই ভাল।’

‘আমি নিজেও জানি না কেন এমন কবিতা লিখলাম।’

‘হবে হয়তো।’ কথাটা বলেই চুপ করে যায় অন্তু। দূরের কোনও গাছে বসে পিউ কাঁহা পাখি ডাকছে।

‘কী হল চুপ করে গেলে যে ?’

‘কিছু না এমনি। বল…’

‘হোয়াটসঅ্যাপটা খোলো একবার।’

‘কেন ?’

‘আরেই খুলেই দেখো না।’

মোবাইলের ডাটাকার্ড অন করে অন্তু। হোয়াটসঅ্যাপ খোলে…

। ৮।

একটুকরো রুটি ভাদুর মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে মহিম বলে, ‘খালি প্যেটে ওষুদ খাইল্যে শরীদ খারাব কইরব্যেক। আর একটা রুটি খা।’

মহিমের কথায় ভাদু কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। বলতে পারে না। শুকনো ঠোঁট দুটো কয়েকবার কেঁপে থেমে যায়।

‘কিচু বলবি ?’

ঘাড় নেড়ে ‘না’ উত্তর দেয় ভাদু। হয়তো ওর অনেক কিছুই বলার আছে কিন্তু সেগুলো না বলাই থেকে যাবে। কখনো কখনো আবার ভুলভাল নিজের মনেই বকতে থাকে। যারা বহুকাল আগে মরে ফুরিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে গল্প করে। তখন মহিম বা পূর্ণিমা কাউকেই চিনতে পারে না। এমনকি নিজেকেও না। কষ্ট হয় মহিমের। খুব কষ্ট হয়। পূর্ণিমার চোখ লুকিয়ে নিজের চোখের জল ফেলে আসতে হয় ওকে। মেয়েটা এখন ঘুমিয়েছে। পিছন ফিরে মহিম তাকায় পূর্ণিমার দিকে। ঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। খাবার খেয়েছে কি খায়নি সেটাও জানে না মহিম।

       ভাদুকে দুধ-রুটি-ওষুধ খওয়ানো হলে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। আজকে আকাশটা তারায় ভরে আছে। শিমূলগাছের মাথায় জোনাকির ভিড়। গতবছর এমন সময় বাড়ির উঠোনে পাশাপাশি খাট পেতে ভাদুর সঙ্গে শুয়ে থাকত মহিম। গল্প করত মাঝরাত পর্যন্ত। ভোরের দিকে রান্না ঘরে ঢুকে শরীরে শরীর ঘষে আগুন জ্বালাত। তারপর শোবার ঘরে গিয়ে পূর্ণিমার পাশে শুয়ে পড়ত দুজনে। এই বোবা মেয়েটাকে ঘিরেই তো ওদের চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসত।

‘আরেকটা ছেইল্যা লিবে ?’ বছর কয়েক আগে মহিমকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল ভাদু।

‘লিল্যে হৈত। ছ্যেলার মুক থ্যেইক্যে বাপ-মা ডাকটা শুইনত্যে না পাইল্যে ভিতরটা ঠিক ভরে নাই বল ?’

‘হ্যেঁগ পুনিটা আমাদের কোনওদিনই রা-কাইড়ব্যেক নাই ?’

‘ডাক্তর ত তাই বইল্যেচে। ইবার যদি ভগবান বলায় ত বইলব্যেক।’

‘লিব্যে আরেকটা ছেইল্যা ?’

       আরেকটা মেয়ে হয়েছিল ওদের। কিন্তু এক বছর হতে না হতেই ফিরে গেল মেয়েটা। ডাক্তার কবিরাজ ওঝা কোনটা বাকি ছিল না। তবুও বাঁচল না মেয়েটা…

‘কইর‍্যে মহিম হৈল তর। আর একটু পর‍্যেই শুরু হয়্যে যাব্যেক ত।’

‘আয়র‍্যে ভিত্রে আয় পাতমা।’ পাতামের গলা শুনেই মহিমের মনে পড়ে ওর আজকে রাধানগর যাওয়ার কথা। দুপুরেই পাতামের সঙ্গে কথা হয়েছে। রাধানগরে বাউল আছে আজ।

‘তুই তাড়াতাড়ি বের‍্যা ত। বাউল যাবার আগে টুকু ঢুকত্যে হব্যেক হঁ।’

       মহিম আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢোকে। লুঙ্গিটা পাল্টে কাচা লুঙ্গি পরে। ভাদু ঘুমিয়ে পড়েছে এখন। শরীর খুব খারাপ না হলে সকালের আগে ঘুম ভাঙবে না ওর। ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। কলমগায় রাখা কৌটোর ভেতর থেকে দুটো একশ টাকার নোট লুঙ্গির কড়ছে গুঁজে বেরিয়ে আসে মহিম।

‘মেয়্যা-লোকের মত বড দেরি করিস তুই।’

‘আর বলিস না, আমার মনেই ছিল নাই।’

‘সেটা ত বুজত্যেই পাচ্চি। চ এখন।’

খেজুর পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায় দুজনে। ঘরটার বাইরে কিছুলোক গোল করে বসে হাঁড়িয়া খাচ্ছে। ভেতরেও বসে আছে জনা কয়েক। পাকা কুলের মতো টক গন্ধ ছড়িয়ে আছে এলাকাটায়। রাধানগরের ফুটবল খেলার মাঠ থেকে হ্যালোজেনের আলো ভেসে আসছে। ওখানেই বসেছে বাউলের আসর।

‘তুই ইখ্যানেই দাঁড়া আমি এক ভাঁড় আনছি। দুপাট কইর‍্যে খ্যাই ত, পরে দেক্যা যাব্যেক।’ কথাটা বলেই পাতাম ভেতরে ঢোকে।

মহিম খেয়াল করে দেখে যারা বাইরে বসেছে ওদের হাতে কল্কে আছে। গাঁজা খাচ্ছে ওরা। সম্ভবত হরিরামপুরের হবে। কেউ চেনা মুখ নয়। একটা গাছের নীচে কয়েকটা গরু বাঁধা আছে। এদেরেই কারু হবে। শামুকমারির হাট থেকে সোজা এখানে এসেছে। বাউল শুনে বাড়ি ফিরবে। গরুগুলোর দিকে তাকিয়ে ভোলা-শঙ্করের কথা মনে পড়ে মহিমের। সুমুকপাহাড়ির হাটে ওদেরকে বিক্রি করেছে মহিম। একবার ভাবে ওদেরকে জিজ্ঞেস করবে কত করে দাম পড়ল। পরে আবার ভাবে জিজ্ঞেস করেই আর কী হবে ?

‘ইদিকটায় আয়র‍্যে…’ ডাকে পাতাম

       লোকগুলোর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসে দুজনে। পাতাম স্টিলের গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলে, ‘হাঁইড়্যার গ্যাইদে গন্দ মামাগ। আইজকে দিল-সে নাই।’

‘আইজকে থাইকব্যেক ক্যেন্যে-র‍্যে ? ভিড় কম হব্যেক ভাবচিস ?’

‘বাউল বল্যেই, নাহল্যে দিল-সে না পাল্যেও সিক্সটি ডেলি পাবি।’

‘আমি ত ইদিকে আসিও নাই। হপনের কাছে খাই।’

পাতাম গ্লাসটা খালি করে বলে, ‘হপনা শালা জল মিসায়। মদ খাচ্চি না মাড় খাচ্ছি ক্যেলা বুজত্যেই পারি নাই।’

‘ডেলি মিশায় নাই। ওই মাজে মাজে… এই মালটা বেশ কড়া আছে বল ?’

‘ইটা অরিজিলান মাল। দ্যেখ গলা ছুইল্যে দিচ্চ্যে।’ মুখে চানাচুর মুড়ি ফেলে লঙ্কাটায় কামড় দেয় পাতাম।

‘আচ্ছা হ্যেঁরে পাতমা ওই আশ্শমের ফকির বাবা কেন্সার সারাত্যে পার‍্যে ?’ গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘আমার এই ক্যেলাটা পারে। ওই মাগীগুলা রোগ সারাত্যে লয় প্যেট কর‍্যাতে যায়…’ আঙুলের অশ্লীল ইঙ্গিত করে পাতাম। আবার বলে, ‘খকনার ইয়াতে এত দম নাই যে ছেইল্যা কইরব্যেক। উয়ার বউয়েরটা ওই মামাগ ফইকর‍্যা বাবাই ফুট্যাইছে। ভুল কইর‍্যেও তোর বউকে লিয়ে য্যাইস না, নইলে…’

পাতামের মুখ থেকে কথা কাড়িয়ে নিয়ে মহিম বলে, ‘মাথাটা আমার খারাপ হয় নাই যে ওই শালার কাচকে যাব। শালার মুকটা দেখবি…’

‘মুরগির পঁদের পারা।’ গ্লাসটা শব্দ করে নামায় পাতাম।

‘ঠিক্যেই বইল্যেছিস…’ কথাটা বলতে বলতেই হেসে ফেলে মহিম।

পাতাম আরেক চুমুক দেওয়ার পর নিজেই নিজের কথাটা মনে করে হাসতে থাকে।

টলতে টলতে দুজনে রাধানগরের মাঠটার কাছে এসে দাঁড়ায়। লাল গেরুয়া পরে একতারা উঁচিয়ে এক বাউল এখন গাইছে,

গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই

বুকের নদী পাগল পারা

হাল দিয়েছি বুকের মাঝে

ফলবে ফসল হৃদয় ভরা

গানের বুকে প্রেমকে পাতি

গান দিয়ে গান গানেতে মাতি

সুখের আশে বুক বাঁধি না রে ভাই

পাইলে সুখ যাব মারা

গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই

বুকের নদী পাগল পারা

গান আমার গলার মালা

গান দিয়ে খুলি প্রেমের তালা

প্রেমের মালিক চিকন কালা

কানের ভিতর শুনি মোহন বাঁশির সুরা

গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই

বুকের নদী পাগল পারা

‘গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই/বুকের নদী পাগল পারা- দারুণ বইল্যেচে মাইরি বল ?’ মহিমকে জিজ্ঞেস করে পাতাম।

‘মনটাকে ভর‍্যাই দিল সত্তি। তর মনে আছে তুই আমি ন্যাপলা কবিলাল সবাই মিল্যে বামুনডিঙ্গার মাঠে বাউল শুইনত্যে কবিগান শুইনত্যে য্যাইতম ?’

‘উগুল্যান কি ভুলার বঠে-রে ? শালা বার মাইল হাঁট্যেই মাইর‍্যে দিতম। ডর ভয় কিচুই ছিল নাই তকন। ন্যাপলা মত্তেই সব ফুর‍্যাইল। মাঝে মাঝে ন্যাপলাটাকে বড মনে পড়ে। সারাদিন কাঁড়া চর‍্যাই চুবি কাট্যেও বামুনডিঙ্গার পত এক দম্যে মাইর‍্যে দিত। এই শালা বিয়্যা কইর‍্যেই যত কাল হৈল।’

‘ঠিকেই বল্যেছিস। তকন শালা কারুর বাপকে ডর‍্যাতম নাই। বনের গাচ কাট্যে বিক্কি করাই বল আর বাঁধে খিয়া দিয়্যে মাছ ধরাই বল…। কন শালা ফাতর ছুড়ছিস-র‍্যে ?’ পিছন ঘুরে জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘কন শালা-র‍্যে ?’ পাতামও হুঙ্কার দেয়।

পিছন থেকে হাতের ইশারায় কয়েকটা ছেলে ওদেরকে বসতে বলে। ওদের দেখতে অসুবিধা হচ্ছে মনে হয়। এতক্ষণে আরও একটা গান শুরু হয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়ে গাইছে,-

বুকের ভেতর তোতা পাখি

প্রেমের গান গায়

পুষব বলে দেয় না ধরা

এখন কী করি উপায়

চোখের জলে পাখির পালক

নৌকা হয়ে ভাসে

পাখিটারে ধরবে বলে

কী জানি কখন বিড়াল আসে

বুকের ভেতর তোতা পাখি

প্রেমের গান গায়

ঘুম আসে না পাখির গানে

এখন কী করি উপায়।।

আশা ছিল নরম মনে

বানাবো বাসা বুকের কোনে

আমার আশার মুখে ছাই।।

আমায় ছেড়ে পাখি কেন

পুরুষ পানে চায়

বুকের ভেতর তোতা পাখি

প্রেমের গান গায়

‘গান গাইচ্যে পাখি, গান গাইচ্যে উদিকে ভাল্…’ মহিমকে ঠেলা দেয় পাতাম।

‘পইড়্যে যাব ধাক্কা মাচ্চিস ক্যেন্যে ? যেমনি গলা তেমনি গাইল মাইরি…’

‘গাইল লয়র‍্যে পাখি এখনো গাইচ্যে। উই দিকটায় ভাল্।’

       এতক্ষণে মহিমের চোখে পড়ে। কাবেরী ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। হাসছে ? হবে হয়তো। দূরের থেকে বোঝা যাচ্ছে না।

‘উয়ার মরদটা কুতায় ? একা আইসব্যেক নাই।’

‘কে তপনা ?’ জিজ্ঞেস করে পাতাম।

‘তা লয় ত আবার কে ?’

‘উ শালা মাল মাইর‍্যে কুতায় পইড়্যে আচে কে জানে। বিধবা মাগী আবার হলুদ শাড়ি পইর‍্যে আইচ্যে। শালির সক কম লয়। দেক দেক কেমন শুকনির পারা ভাইলচ্যে। যা ন শালির ইয়াটা আইজক্যে ফুট্যাই দে। মাইরি বলচি তুই একবার বল্ল্যেই দিব্যেক।’

‘অমন খানকি মাগীর ইয়াতে মুতি আমি।’ পাশ ফিরে থুতু ফেলে মহিম। তারপর আবার বলে, ‘চল উদিকটায় বসি। ইখানটতে বৈসল্যে নেশা কাইট্যে যাব্যেক।’

‘তোর বইল্যেচে নাই শালা… একন ফুরত্তি করবি নাই তো বুড়াল্যে করবি ? সাপ আর এইটা…’ দুহাতের আঙুলকে বরফি বানিয়ে দেখায় পাতাম, ‘পাল্যেই মাইর‍্যে দিবি। জীবন একটা, আইজ আছিস কাইল শ্মশান।’

‘তোর ইচ্ছা হচ্ছে তুই যা…’

‘আমার মত মরদকে দিব্যেক নাই। তাছাড়া কবে ফাটাই দিতম…’ মহিমকে আবার একবার ঠেলা দেয় পাতাম, ‘এই ভাল্ ভাল্ তোকে ডাইকচ্যে।’

‘ডাকুক। গান শুনবি ত শুন না হল্যে ঘর চ।’

‘মামাগ বলচি ভাল্ ডাইকচ্যে তোকে। কিচু দরকারটাও ত থাইকত্যে পারে…’

‘আমার সাতে কনুই দরকার নাই। তকে ডাইকচ্যে তুই যা।’

‘মাইরি বলচি…’

‘বকিস না ন ক্যেলা। মন দিয়্যে গানটা শুন।’

মৌমাছি লো সই

আজ মনের কথা কই

বুকেতে বাজে মধুর বাঁশি

কেমন করি একলা রাতে রই

সকাল বেলায় সিনান ঘাটে

সখা কাপড় ধরে সাঁতার কাটে

সাঁঝের বেলা বাজায় বাঁশি

সুরেতে বাহির হই

বুকের ভিতর রাখে না আমায়

বুকের উপর রাখে

ঠোঁটের সুরে ডাকে না সখা

বাঁশির সুরে ডাকে

মৌমাছি লো সই

আজ মনের কথা কই

এখন শরীর জুড়ে শরীর খেলা

কেমন করি একলা রাতে রই

। ৯।

না এখন শুশুনিয়া যাওয়ার মতো কোনও বাস নেই। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এই তো সবে আটটা কুড়ি, নটা দশে বাস। অন্তু আর শিল্পী বাসস্ট্যান্ডেই একটা বটগাছের নীচে গিয়ে বসে। বেশ শান্ত নিরিবিলি। কেউ ‘খাতড়া খাতড়া…’ করে হাঁকছে। কেউ আবার ‘দুর্গাপুর দুর্গাপুর দুর্গাপুর…’ কারুর সুর শালতোড়া কিংবা পুরুলিয়া মুখি। শিল্পী আনমনে তাকিয়ে আছে অচেনা লোকগুলোর দিকে। কত বাস স্ট্যান্ডের ভেতরে ঢুকছে কত বেরিয়ে যাচ্ছে। কত লোক উঠছে-নামছে।

‘এই কী ভাবছিস ?’ শিল্পীর হাতে ঝাঁকা দিয়ে জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘কই কিছু না তো। দেখছি মানুষগুলোকে। সবাই নিজের ভাবনার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এমন ভাবেই ছুটছে যেন পৃথিবীর গতি অতিক্রম করে বাইরে কোথাও যাবে। ঠিক ট্রেনের ছুটন্ত হকারের মতো। এটাই জীবন তাই না ?’

‘এই গতিটাই তো জীবন। এটা থেমে গেলেই সব শেষ।’ কথাটা বলতে বলতে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু।

‘হুম। আনমনে এইসব দেখতে দেখতে কেন জানি না অচেনা অজানা মানুষের জন্যেও মনটা হু-হু করে ওঠে। তারপর বাবার কথা মনে পড়ে। আচ্ছা কেন এমন হয় ?’

‘ধুর পাগলী। অকারণ মনকেমন করা বারণ।’

শিল্পী ছোট্ট করে, ‘হুম’ বলে অন্তুর বাহু জড়িয়ে মাথাটা হেলান দেয়। হালকা হাওয়ায় ওর চুলগুলো অন্তুর চোখে মুখে উড়ে এসে পড়ে। শিল্পীর মাথায় মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে অন্তু।

       বাসটা এসে দাঁড়াতেই উঠে পড়ল দুজন। মিনিট কয়েক পরে হেলতে দুলতে চলতে শুরু করল বাসটা। জানালার ধারে বসেছে শিল্পী। রোদের আঁচ এসে লাগছে মুখে। যতদূর দৃষ্টি যায় খাঁ-খাঁ জমি। দীর্ঘদিন আবাদ না হয়ে পড়ে আছে। জমিগুলোর বুকচিরে মাথা তুলেছে পলাশ গাছ। জমিগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মন কেমন করা স্বাভাবিক। শিল্পী তাকিয়ে আছে বহুদূরে চরতে থাকা গরুর পালটার দিকে।

‘কীরে আবার আনমনা ? কী হয়েছে বল তো ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘কিছু না।’ জানালার ওপারে মুখ রেখেই উত্তর দেয় শিল্পী।

‘কিছু তো একটা হয়েছে। কিন্তু ঠিক ধরতে পারছি না।’

‘সত্যিই কিছু হয়নি।’

‘আচ্ছা মানলাম। আমার দিকে তাকা একবার।’

ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে অন্তুর দিকে তাকায় শিল্পী। ওর দু’চোখের পাতায় শিশিরের মতো জল জমা হয়েছে। শিল্পীর হাত দুটোকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে অন্তু বলে, ‘কাঁদছিস কেন পাগলী ?’

‘আমার না কেমন যেন ভয় করছে।’

‘কীসের ভয় ?’

‘জানি না। একটা অচেনা ভয় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে।’

‘শুশুনিয়া যাচ্ছিস, সেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ?’

‘না।’

‘তাহলে ?’

‘কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছে তোমাকে হয়তো হারিয়ে ফেলব। তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি থাকতে পারব না সত্যি।’ আর কান্নাটাকে চেপে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তুর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওড়না দিয়ে চোখের জল মোছে।

‘সত্যিই পাগলী তুই।’ অন্তুরও গলটা ভারী হয়ে এসেছে।

নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকায় শিল্পী। অন্তু খেয়াল করে ওদের সিটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা ওদের দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বাসটা এসে দাঁড়িয়েছে ছাতনায়। বেশ কয়েকটা ছেলে মেয়ে ঝুপঝাপ চেপে পড়ে।

‘কোথায় নামবেন ?’ অন্তুকে জিজ্ঞেস করে একটা মেয়ে। উত্তরে শুশুনিয়া শুনে সরে দাঁড়ায়।

এবার শালতোড়া রোড ছেড়ে শুশুনিয়ার দিকে ঘুরবে বাসটা। এর আগেও বন্ধুদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার পিকনিক করতে শুশুনিয়ায় এসেছে অন্তু। রাস্তাটা মোটামুটি ওর পরিচিত। ছেলে মেয়েগুলো কিছু একটা প্রশ্ন নিয়ে কোলাহল করছে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা। প্রশ্নের আলোচনা করতে করতেই আড়চোখে শিল্পী আর অন্তুকে দেখছে ওরা। চিমটি কেটে ফিসফিস করছে। ইচ্ছে করেই শিল্পীর একটা হাত নিজের কোলের উপরে তুলে নেয় অন্তু।

‘ছাড়ো ওরা দেখছে।’ হাতটা ছাড়িয়ে নেয় শিল্পী।

‘দেখছে বলেই না…’

‘তুমি না খুব ইয়ে…’

‘কীসের কীয়ে ?’ আবার শিল্পীর হাতটা কোলে তোলে অন্তু।

‘এমন পিরিতি কভু নাহি দেখি শুনি।’ টোন কাটে একটা ছেলে।

হাসি পায় অন্তুর। শিল্পীও জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। অন্তু-শিল্পীকে হাসতে দেখে লজ্জায় ওই ছেলেটাও হেসে ফেলে। বাসটা চলতে শুরু করলে আবার টোন কাটে ছেলেটা, ‘আমার টুনি কথা শোনে না।’ এবার নিশানা অন্যদিকে।

‘কেউ টুনিরে বোঝাও ভাই।’ ওই ছেলেটার পাশের ছেলেটা ফোঁড়ন কাটে।

‘ভাই তোর টুনির জন্য একবার গানটা হয়ে যাক।’ এবার বাসের পিছন থেকে অন্য ছেলে।

‘টুনি আমার খুনি আসামী।’ এবার সবাই হেসে ফেলে। হাসি থামলে সমবেত কণ্ঠে গানের আবদার। ঠেলাঠেলি। শেষ পর্যন্ত ছেলেটাকে শুরু করতে হয়,-

‘ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না

যার তার লগে ডেটিং মারে, আমায় চেনে না

ওহ টুনির মা তুমি টুনিরে বুঝাও ন

ফোন করা তো দূরের কথা মিসকলও মারে না…’ এবার অন্তু শিল্পী দুজনেই হেসে ফেলে।

পিছনের সেই ছেলেটা ফোঁড়ন কাটে, ‘পয়সা নাই ভাই গরীব গরীব।’

‘গলটা বেশ তাই না ?’ শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘হুম। কিন্তু টুনি কোনটা ?’

‘এখানেই থাকার কথা।’

‘আরে আছে নইলে গাইত না।’

ছেলেটা নিজের খেয়ালে গেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অন্যান্যরাও সুর মেলাচ্ছে।

‘টুনির মুখে মিষ্টি হাসি দেখতে চমৎকার

টুনির মতো একটি মেয়ে আমারও দরকার

টুনি পাশে থাকবো, টুনি ভালবাসবো

সুখে-দুখে একই সাথে দিন কাটাবো

ও টুনির মা তোমার টুনি…’

এবার সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। ছেলেটির উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই টুনি কি এখানেই আছে ?’

সমবেত কণ্ঠে উত্তর আসে, ‘আছে। আছে। বাসেই আছে।’

অন্তু এবার মেয়ের ঝাঁকটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের ভেতর কে-গো টুনি ?’

‘আমার নাম টুনি নয় বুঝেছেন।’ একটি ফর্সা ছিপছিপে মেয়ে ফোঁস করে ওঠে।

এবার হো হো করেই হেসে ফেলে অন্তু। অন্তুকে হাসতে দেখে সবাই হাসতে শুরু করে। এমনকি মেয়েটাও।

‘হেসেছে। হেসেছে।’ পিছনের ছেলেটা চিৎকার করে।

‘সব মেয়ে হাসলেই ফাঁসে না বুঝলি ব্যাঙ। তোর বন্ধুকে বলিস আমার বেয়াড়া বাঁদর পছন্দ নয়।’ আবার ফোঁস করে ওঠে টুনি।

ব্যাঙ ল্যাং খেয়ে চুপচাপ বসে পড়ে।

       কিছুক্ষণের জন্য সবাই শান্ত হয়ে পড়ে। অন্তুও। বাসটা এখন একটা পলাশ জঙ্গল পার হচ্ছে। শিল্পী অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটা তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। ভিড় সরিয়ে মেয়েটার সামনে এগিয়ে আসে ছেলেটা। বলে, ‘এই সবাই শুনলি তো পাপিয়া দেবীর বেয়াড়া বাঁদর পছন্দ নয়। এবার এটাও শুনে রাখ আজ থেকে এই মুখে ওই নাম আর উচ্চারণও হবে না। তোরাও আমার সামনে ওর নাম নিবি না। খুশি তো পাপিয়া দেবী ? চিন্তা নেই আমি আজকেই টিউশন ছেড়ে দিলাম। গুড বাই। এই বাস থামাও নামব…’

       কয়েক মিনিটের ভেতর সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সবাই চুপ। বাসটা থামতেই খালাসীর হাতে পয়সা দিয়ে নেমে পড়ল ছেলেটা। এখন জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছে শুশুনিয়া পাহাড়টাকে। নীলাভ সবুজ পাহাড়।

‘এই দেখো মেয়েটার চোখ ছলছল করছে। বাস থেকে নেমেই কেঁদে ফেলবে।’ শিল্পী অন্তুর হাতটা নিজের কোলে নিয়ে কথাগুলো বলে।

‘মেয়েদের দৌড় ওটুকুই।’

‘মোটেই না। তোমাকে প্রপোজ কিন্তু আমিই করেছিলাম। তোমার সেই সাহসটুকুও ছিল না।’

‘অমন পেঁচিমুখি মেয়েকে কে প্রপোজ করত ?’

       কথাটা ইচ্ছে করেই ভেতরে মেখে নেয় শিল্পী। মুহূর্তের ভেতর চোখ টলমল। একেই হয়তো বলে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো। সত্যিই কষ্ট পাওয়ার অধিকার থাকলে কখনো কখনো মানুষের মন নিখুঁত আর্ট হয়ে অভিমান ঝরায়।

শুশুনিয়া এলাকাটা নির্জন না হলেও জনবহুল নয়। দু-একটা দোকান দু’চারজন খদ্দের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তেমাথার মোড় থেকে যে রাস্তাটা ডানদিকে যাচ্ছে ওটাই পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা। অন্তুর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে শিল্পী। পাহাড়ি গরম বাতাস এসে ওদের চোখে মুখে ধাক্কা মারছে। ঘামছে ওরা। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে পাহাড়ের পায়ের তলায়। ওখানে দুপাসারি পাথর মূর্তির দোকার। শুশুনিয়ার পাথর শিল্পীরা ওখানে বসে পাথর খোদাই করে। মূর্তি বানায়। বিক্রি করে। কেউ কেউ অবশ্য ঘরে বসেই পাথর খোদাই করে। তবে বেশিরভাগ শিল্পীই পাহাড়ের নীচে নিজের নিজের দোকানে বসে কাজ করতেই ভালবাসে।

       পাহাড়টা যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঠিক সেখানেই শানবাঁধানো জল নেওয়ার জায়গা। প্রায় পুরো গ্রামটা এখানের জল খায়। এখন কিছু লোক স্নান করছে। শুশুনিয়া পাহাড়ের এই রহস্যময় জলের ধারা দেখতেই বহু-বহু লোক বাইরে থেকে এখানে আসে। পাথরের একটা সিংহ মূর্তির মুখ থেকে পাম্পের মতো জল ঝরছে। ভূগর্ভের ভেতর থেকে ছুটে আসছে এই জলের ধারা। একটা সময় এই জল বোতল বন্দী হয়ে ‘শুশুনিয়া’ নামে কলকাতার বাজারেও বিক্রি হত। পর্যটকদের কথা ভেবে সরকার ওটা বন্ধ করে দিয়েছে এখন।

       শিল্পীর ব্যাগ থেকে বোতলটা নিয়ে অন্তু জল ভরে নিয়ে আসে। অল্প উঁচুতে পাহাড়ে চড়ার রাস্তাটার পাশেই একটা আশ্রম। মা দুর্গার মূর্তি দেখা যাচ্ছে আশ্রমের ভেতর।

‘আমি ঘরে ফেরার পথে একটা শিবলিঙ্গ কিনব।’ শিল্পী বলে।

‘এদিক দিয়ে ঘরে ফিরব না। এদিকে চেপে ওপাশে নেমে যাব। এখুনি কিনে নে।’

       একটা দোকানে গিয়ে শিবলিঙ্গ-শিবমূর্তি হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে শিল্পী। নিখুঁত কাজ। প্রতিটা দোকানেই শয়ে শয়ে নানান দেবতার মূর্তি সাজানো আছে। সাজানো আছে পাথরের থালা-বাটি-প্রাদীপ। একটা শিবলিঙ্গ অন্তুর হাতে দিয়ে শিল্পী জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কেমন দেখো তো ?’

‘ওটা এখানকার পাথরের। পাথরটায় পালিশ কম কিন্তু নষ্ট হবে না। এই যে এই মূর্তিটা…’ খোদাইকার একটা মূর্তি শিল্পীর হাতে দেয়, ‘এটা রাজস্থানের। পাথর ভাল। কাজ করেও আরাম। দেখুন পালিশটাও বেশি। কিন্তু পাব্লিক বলছে বর্ষার সময় মূর্তিতে জল না পেলেও মূর্তির রঙ চটকে যাচ্ছে।’

‘এমন হচ্ছে কেন ?’ অন্তু জিজ্ঞেস করে।

‘দুনম্বরি দুনিয়া দাদা, এখন পাথরের ডাস্টেও সিমেন্টের কালার ডাস্ট মিশিয়ে নতুন পাথর বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কাকে কী বলবেন ? কিছু বলতে গেলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, আপনাকে বেচব না। দিদির বাঁ হাতে যে মূর্তিটা আছে ওটা নিতে পারেন। দামটাও কম পড়বে।’

‘কত দাম ওটার ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘সত্তর টাকা দেবেন।’

‘সত্তর নয় পঞ্চাশ টাকায় হলে দিন…’ শিল্পী বলে।

‘পঞ্চাশে দিলে কিছুই থাকবে না দিদি। এই তো বাজার, সারাদিনে দুটো মূর্তিও বিক্রি নেই। পঁয়ষট্টি দেবেন।’

শিল্পী আরও হয়তো দাম করতেই যাচ্ছিল কিন্তু অন্তু একটা একশ টাকার নোট লোকটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাকিটা ফেরত দিতে বলে। টাকাটা ফেরত নিয়ে অন্তু একটা গোলদারি দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট কেক, এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে শিল্পীর হাতে দেয়। অন্তুর দেখাদেখি শিল্পীও একটা স্লাইস কেনে। এরপর দুজনে পাহাড়ে উঠতে থাকে। পাহাড়ি রাস্তাটার দুপাশে ছোটবড় নানান ধরণের গাছ। বড় গাছগুলোর মাথায় হনুমান ঝুলছে।

‘তুমি পঁয়ষট্টি টাকা কেন দিতে গেলে ? ওটা পঞ্চাশে হয়ে যেত না ?’ অন্তুকে জিজ্ঞেস করে শিল্পী।

‘জানি হয়ে যেত।’

‘তাহলে দিলে কেন ?’

‘ওষুধ দোকানে গিয়ে দাম করিস না। সপিংমলে গিয়েও দাম করিস না। স্লাইসটার দরদাম করলি না তাহলে মূর্তিটার বেলায় কেন ? ওরা দিনরাত খেটে মূর্তিগুলো বানায়। ওদের মজুরি মেরে দেওয়াটা পাপ।’

‘কিন্তু…’

‘কোনও কিন্তু নয়, গরীবের দশ-কুড়ি টাকা মেরে দেওয়াতে বাহাদুরি নেই। রিক্সাওয়ালার পয়সা কমিয়ে বাদাম খেতে আমার দাঁতে বাজে। অন্তত আমার সঙ্গে যখন থাকবি তখন ওই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পকেট মারিস না প্লিজ।’

‘আচ্ছাবাবা সরি। আর হবে না।’

‘সরি বলার কিছু নেই বিষয়টা যুক্তি দিয়ে বোঝা উচিৎ।’

‘বুঝলাম তো।’

‘বুঝলেই ভাল।’

‘হুম।’

       আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অন্তুর পিছনে পিছনে শিল্পী হাঁটতে থাকে। এখন নীচের দিকে তাকালে ঘরবাড়ি গুলোকে দেশলাই বক্স বলে মনে হবে। পিচের রাস্তাটা যেন কালো কালির রেখা। আর উপরে উঠবে না ওরা। এবার পাহাড়ের বাঁদিকে হেঁটে যাবে। যেদিকটা নির্জন। নিরিবিলি। যেদিকে ওদেরকে কেউ বিরক্ত করবে না।

। ১০।

‘তুই এমন মরদের সঙ্গে ক্যেন্যে আইচিস যে নিজের খেয়াল র‍্যাইকতে পারে নাই…’

       কাবেরী জানত ওকে এই প্রশ্নটার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। জানত বললে ভুল বলা হবে। কাবেরী ভেতর ভেতর অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে মহিম ওকে এই প্রশ্নটা করে। উত্তর তৈরিই আছে কাবেরীর। তবুও সময় নেয়। ভাবখানা এমন যেন কিছু একটা গভীর ভাবে ভাবছে। মাথার উপর তারা জেগে আছে এখন। ঝোপঝাড়ের ভেতর শরীর লুকিয়ে অনর্গল চিৎকার করছে রাতের ঝিঁঝিঁপোকা। বাউলগান ভেসে আসছে গুমোট বাতাসে। ভেতরে ইচ্ছে ছিল ঠিকই তবে খানিকটা হলেও পাতামের চাপেই কাবেরীর সঙ্গে বাউল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে মহিম।

       বাউল শুনতে শুনতেই উঠে এসেছিল কাবেরী। বলেছিল, ‘আমার শরীদ ভাল লাইগছ্যে নাই। আমাকে ঘরে দিয়্যে আসবি চ।’

‘তপনাকে বলবি যা। উসব আমার দারা হব্যেক নাই।’ নেশার ঘোরে নেশার জোরে কথাটা বললেও শেষ পর্যন্ত মহিমকে কাবেরীর সঙ্গে আসতেই হয়েছে।

তপনার সঙ্গে কাবেরীর মেলামেশা নিয়ে মহিমের যে জ্বলন সেটাকে রাগ না বলে ঈর্ষা বললেই মনে হয় যুক্তি সংগত হবে। কাবেরীকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে যে মহিমের ছিল না এমনটা তো নয়। ভাদুর ভালবাসাকে ডিঙিয়ে কাবেরীর প্রেমে পা দেওয়ার মতো শক্তি ছিল না মহিমের। কাবেরীর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা কাবেরীকে গালাগালি দেওয়া সবেই তো কাবেরীর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকার দুর্বল কৌশল ছিল মাত্র। মহিম নিজেও ভাল মতোই জানত কাবেরী ডাক দিলে এই বেড়া একদিন ভেঙে যাবে। তবে হাঁ ভাদু অসুস্থ না হলে সহজে মহিমের পা ফসকাত না। ভাদুর অসুস্থতা কিছুটা হলেও মহিমকে কাবেরী মুখি করেছে।  

‘কী হৈল চুপ মাইর‍্যে রইলি যে ?’

‘ত কী বইলব ?’

‘অমন মরদের সাতে কী জন্যে আইচিস ? সাতে কইর‍্যে মেয়্যা আইন্যে কুতায় মদ মাইর‍্যে পইড়্যে আচে।’

‘তা কেমন মরদের সাতে আইসব ? আমার পারা মেয়্যার লাইগ্যে তোদের মত মরদদের সমুই কুতায়?’

       মহিম কী বলবে বুঝতে না পেরে একটা বিড়ি ধরায়। দেশলাই এর আলোয় মেঠো রাস্তাটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুব মারে। বিড়িতে ফোঁস-ফোঁস করে কয়েকটা টান দিতেই ঝিমিয়ে পড়া হাঁড়িয়ার নেশাটা আবার চেগে ওঠে। ঠিক এমন সময় কাছাকাছি ঝোপে লুকিয়ে থাকা কয়েকটা শেয়াল হুক্কা হুয়া করে ডেকে উঠতেই মহিমের হাতটা ধরে ফেলে কাবেরী। শিরায় শিরায় শিহরণ খেলে যায় মহিমের।

‘এত রাত্যে শিয়ালগুলা মানুষের গলা পাইছ্যে তাই ডাইকছ্যে।’

‘শিয়াল ডাইকল্যে আমার ডর লাগ্যে।’

‘শিয়ালকে আবার ডরটা কীসের ? শিয়াল কী কইরব্যেক ?’

‘ক্যেন্যে সাবির বিটিটাকে ত শিয়ালেই খাইছিল।’

‘রাত্যের বেলিতে সাত মাসের ছানাকে ঘরের ফাঁকে শুয়াই রাইখল্যে শিয়ালে ক্যেন্যে বিড়ালেও খাব্যেক।’

       মহিম অভয় দিলেও কাবেরী মহিমের হাত ধরেই হাঁটতে থাকে। একটা চাপা অস্বস্তি হয় মহিমের। ভাদুর শরীর খারাপের পর মহিমের শারীরিক ইচ্ছেগুলো ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওদের ঘুম ভাঙার শব্দটুকুও এখন অনুভব করতে পারছে মহিম। কাবেরীর শরীর ছুঁয়ে যে বাতাসটা মহিমের নাকে এসে লাগছে তাতেও যেন কামনার গন্ধ মিশে আছে। মনটাকে আনমনা করার জন্যেই হয়তো বিড়িটায় আরও কয়েকটা জোরে জোরে টান দেয় মহিম।

‘কী হৈল চুপ মাইর‍্যে গেলি যে ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘না মানে…। কিচু লয়।’

‘কী কিচু লয় ?’

‘কিচু লয় ঘর চ। ভোর হৈচ্চে।’

‘ভোর হৈত্যে ঢের দেরি এখন। আবার কী ডর লাইগচ্যে নকি ?’

‘না।’

‘তাহল্যে ?’

‘বইলব কি বইলব নাই সেটাই ভাবচি।’

‘বলার মত হৈল্যে বল।’

‘আমার গাইদ্যে জোরে মুতা লাইগ্যেছে।’

‘ত রাস্তা থেক্যে নাইম্যে ওই দিকটায় যায়্যে মুত। ইটা এত লুকাবার কী আচে।’

‘তুই ইখানেই দাঁড়া।’

       কিছুটা দূরে গিয়ে শাড়ি-সায়া কোমর পর্যন্ত তুলে পেচ্ছাব করতে বসে কাবেরী। মহিম অন্ধকারের বুকচিরে এক দৃষ্টিতে কাবেরীর সাদা পাছাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কাবেরীর পেচ্ছাবের শব্দ মহিমের শরীরে আরও তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দেয়। নিঃশব্দে কয়েকপা এগিয়ে এসে কাবেরীর পিছনে দাঁড়ায় মহিম। ওর পেচ্ছাবের শব্দটুকুকে দুকান ভরে শুনতে থাকে। পেচ্ছাব শেষে কাবেরী উঠে দাঁড়াতেই মহিম পিছন থেকে আবার কাবেরীর শাড়ি-সায়া তুলে ধরে। হাত বোলায় কাবেরীর পাছায়। কাবেরী বাধা না দিলে মহিমের অবাধ্য ঠোঁট কাবেরীর পাছায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেচ্ছাবের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগে। তাতে আরও নেশা ধরে মহিমের। শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠে কাবেরীর শরীরটা। একটা সময় কাবেরীকে উলঙ্গ করে ফেলে মহিম। নিজেও উলঙ্গ হয়। তারপর মরা ঘাসের বিছানায় গড়িয়ে পড়ে শরীর দুটো। দু’হাত-পা দিয়ে নাগিনীর মতো মহিমকে পেঁচিয়ে ধরে কাবেরী। অপার্থিব আনন্দে মুহুর্মুহু কুঁকড়ে ওঠে ওর শরীরটা। মহিমের শারীরিক প্রতাপ কাবেরীর শরীরটাকে পাগল করে তোলে।

বজ্রবিদ্যুতের পর এক সময় দুটো শরীর বেয়ে ক্লান্তি নামে। কাবেরীর ঘামে ভেজা বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে মহিম। পূবের আকাশে লালচে রেখা ফুটে উঠছে এবার। আর কিছুক্ষণ পর ভোর হবে। কাবেরী আলতো করে মহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এখন নিবিড় শান্তি বিরাজ করছে দুটো রনক্লান্ত শরীরে।     

। ১১।

‘আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি তাই না ?’

‘হঠাৎ এমন অদ্ভুত প্রশ্ন ?’

‘হটাৎ নয়। আমি জানি তবুও তোমার মুখ থেকেই শুনতে ইচ্ছে হল।’

‘মাঝে মাঝে তোর কী হয় বলত ?’ কথটা বলে গম্ভীর ভাবে শিল্পীর দিকে তাকায় অন্তু। একটা সিগারেট ধরায়। শাল গাছের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে শিল্পীর মুখে পড়ছে। বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছে শিল্পীর কপালে। গলায়। থমথম করছে শিল্পীর মুখটা।

‘বাসে আমাকে পেঁচামুখি কেন বললে ? আগেও বলেছ কয়েকবার। পছন্দ না হলেই ইয়ার্কিচ্ছেলে মানুষের মুখ দিয়ে এমন কথা বেরিয়ে আসে।’ চোখ দুটো ছলছল করছে শিল্পীর।

‘আমি মোটেই তোকে পেঁচামুখি বলিনি।’

‘মিথ্যে বোলো না। বলেছ তুমি।’ গলাটাও ভারী হয়ে এসছে শিল্পীর। এবার বৃষ্টি হবে হয়তো।

‘আমি মোটেই মিথ্যে বলচি না। আমি পেঁচামুখি বলিনি। পেঁচিমুখি বলেছি।’ কথাটা বলতে বলতেই খিক্-খিক্ করে হেসে ফেলে অন্তু।

‘দেখো ভাল হবে না কিন্তু…’ চোখের জল আর আটকে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তু শিল্পীকে কাছে টেনে নিয়ে কোলের উপর বসায়। দুহাত দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বড্ড অভিমানী তুই।’

       শিল্পী কিছু বলে না। অন্তুর বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। পাহাড়ের গা বেয়ে অনেকটা সরে এসেছে ওরা। কয়েকটা বড় মাপের শাল গাছের নীচে পাতার বিছানা পেতে বসেছে। টুপটাপ করে পাতা ঝরে পড়ছে এখন। শাল গাছগুলোর গা বেয়ে ঝুলছে নাম না জানা অর্কিড। তারেই গন্ধ বাতাসে। শিল্পীর খোঁপাতেও কয়েকটা হলদে রঙের বুনো-ফুল। অন্তুই গুঁজে দিয়েছে ওগুলো। ‘কীরে ওলের মতো মুখ করে মাথা গুঁজেই পড়ে থাকবি বুঝি।’

‘তোমার মুখটা বেগুনের মতো।’ অন্তুর বুকে মুখ গুঁজেই উত্তর দেয় শিল্পী। গলায় এখনো কান্নার ঘড়ঘড়ানি।

‘তাও ভাল। বেগুনের একটা চকচকে ভাব আছে।’ খিল-খিল করে হাসে অন্তু।

‘তোমার চেয়ে আমার মুখটা বেশি সুন্দর বুঝলে…’ দুহাত দিয়ে অন্তুর পিঠ খামচে ধরে শিল্পী। অন্তুও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শিল্পীকে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর অন্তু শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা হঠাৎ করে হোয়াটসঅ্যাপে অমন ছবি দিলি যে ?’

‘ইচ্ছে হয়েছে তাই দিয়েছি। কেন ভাল লাগেনি ?’

‘সারারাত ঘুমোতে পারিনি।’

‘না ঘুমিয়ে কী করেছো ?’

‘সবাই যা করে তাই করেছি।’

‘কী করে জানি না তো। বলো না কী করেছো ?’ হাসতে থাকে শিল্পী। অন্তু শিল্পীর মাথায় আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলে, ‘তিনবার জানিস ?’

‘তাই ?’

‘হুম।’

‘আচ্ছা সত্যি করে বলো ছবিটা পছন্দ হয়েছে না হয়নি ?’ অন্তুর কোল থেকে নেমে উঠে দাঁড়ায় শিল্পী। চোখে চোখ রেখে কথাটা জিজ্ঞেস করে। অন্তু উত্তর না দিয়ে দূরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কিছু একটা দেখায়। শিল্পী পিছন ফিরে দেখে পাহাড়ের আরেকটা ঢাল দিয়ে একটা মেয়ে একটা ছেলের হাত ধরে উপরে উঠছে। ওরাও হয়তো নিরিবিলি জায়গা খুঁজছে শান্তিতে প্রেমালাপ করার জন্য। অন্তু কিছু বলতে যাচ্ছিল শিল্পী নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করতে বলে অন্তুকে।

       কারা যেন উপরে উঠে আসছে। পাহাড়ের গায়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পায় অন্তু। শিল্পী অন্তুর কাছে এসে গাঘেঁষে বসে। একটা চাপা উত্তেজনায় কলকল করে ঘামতে থাকে দুজন। অন্তু ভাল মতোই জানে পাহাড়ের এমন জায়গায় বাজে লোকের হাতে পড়লে শিল্পীর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ওর একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হবে না। কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা পাথরকে নিঃশব্দে কুড়িয়ে রাখে অন্তু। শিল্পী ভয়ে ওর বাঁহাতের বাহু শক্ত করে ধরেছে।

‘চিন্তা করিস না আমি তো আছি…’ ফিসফিস করে শিল্পীর কানের কাছে মুখ এনে কথাগুলো বলে অন্তু।

‘খুব ভয় করছে আমার। যদি ওরা কোনও…’

‘চুপ কর শুনতে পাবে।’

       পায়ের শব্দগুলো আরও কাছাকাছি আসতেই অন্তু দুহাতে দুটো পাথরকে শক্ত করে তুলে ধরে। ওরা চুপচাপ এগিয়ে আসছে। কেউ কারুর সঙ্গে একটাও কথা বলছে না। হঠাৎ আক্রমণের আতঙ্কে অন্তুর কানের পাশ দিয়ে গরম ঘাম গড়িয়ে পড়ছে এখন। ঘামে শিল্পীর চুড়িদারের বগল থেকে পিঠ পর্যন্ত স্যাঁতস্যাঁত করছে।

       বেশ কিছুক্ষণ সব শান্ত। সব অসম্ভব রকম থমথমে। পায়ের শব্দগুলোও কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এতক্ষণে কিছু একটা দেখতে পায় শিল্পী। সেটা অন্তুকে আঙুল বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় না। উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দুহাতের পাথর দুটো ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘হনুমান।’

‘কৈ দেখি…’ উঠে দাঁড়ায় শিল্পী। হনুমানগুলোও অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। ওদের এলাকায় মানুষ দেখে ওরাও হয়তো একটু অবাক হয়েছে। অন্তু শিল্পীর হাতটা ধরে বলে, ‘বসে পড়। ওদেরকে পাত্তা দিস না। একটু পরেই ওরা পালিয়ে যাবে।’ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বসে পড়ে শিল্পী।

       হনুমানগুলো চলে যাওয়ার পর অন্তু বলে, ‘শালারা মুডটার বারটা বাজিয়ে দিল। ভাবলাম একটু রোমান্স করব… ধুর ভাল্লাগে না।’

‘ওগুলো মানুষ হলে কী হত শুনি ?’

‘কেলিয়ে…’

অন্তুর মুখের কথা কাড়িয়ে শিল্পী বলে, ‘থাক আর কেলিয়ে কাজ নেই। আর একটু হলেই প্যান্ট ভিজে…’

‘সেদিন পার্কে মনে আছে কাদের প্যান্ট ভিজে ছিল। তবে হ্যাঁ আজকে একটু চাপচাপ লাগছিল। দশবার জন হলে হয়তো বাজে কিছু একটা হতেই পারত…’

‘হুম। সর্বনাশ হত আমার।’

‘ওটা তো এবার হবে…’ বলেই শিল্পীকে আবার কোলে তুলে নেয় অন্তু। তারপর ওর ঠোঁট শিল্পীর ঘামে ভেজা গলার পথ ধরে ঘাড় হয়ে শিল্পীর ঠোঁটে গিয়ে মেশে। শিল্পীর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে কিছুক্ষণ সাঁতার দেওয়ার পর অন্তু জিজ্ঞেস করে, ‘ছবির প্যান্টিটা পরে আছিস ?’

‘জানি না। নিজে দেখে নাও…’ কথাটা বলেই শিল্পী অন্তুর ঠোঁটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্তু হয়তো ভেতর ভেতর এই উত্তরটারই অপেক্ষা করছিল। মুহূর্তের মধ্যে ওর হাত শিল্পীর ব্রায়ের ভেতর আত্মগোপন করে। সীৎকার করে ওঠে শিল্পী।

এখনো ব্লিড করছে শিল্পী। তবে পরিমাণ কমে এসেছে। শিল্পীর নগ্ন শরীরটার দিকে তাকিয়ে আরও একবার ইচ্ছে করছে অন্তুর। যদিও সেটা আর সম্ভব নয়। এখনো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে শিল্পী। ওর ব্রা-প্যান্টি-চুড়িদার সব ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। নিজের জামা প্যান্ট পরার পর অন্তু শিল্পীর পাশে গিয়ে বসে। পা দুটোকে সরিয়ে ব্লিডের পরিমাণটা দেখার চেষ্টা করে। তারপর শিল্পীর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘খুব ব্যথা করছে?’

‘খুব মানে খুব ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে পাহাড় থেকে নামতেই পারব না। আচ্ছা মা বুঝতে পারবে না তো ? আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে কিন্তু।’

‘ধুর কেউ কিছুই জানতে পারবে না।’

‘তুমি জানো না আমার মা সব বুঝতে পারে।’

‘এটা পারবে না। আর পারলে পারবে…’

‘বাঃ পারলে পারবে ? ভয় হচ্ছে না তোমার ?’

‘কীসের ভয় ? জানতে পারলে দুজনের বিয়ে দিয়ে দেবে তাই তো ? ভালই হবে। তখন রোজ রাতে যেমন করে খুশি…’

‘থাক আর বিবরণ দিতে হবে না। আমার সব তো এদিক সেদিক ছুঁড়ে দিয়েছ, ওগুলো এবার এনে দাও।’

‘আরও কিছুক্ষণ এভাবেই থাক। দুচোখ ভরে দেখি তোর শরীরটাকে।’

‘আর দেখে কাজ নেই। আগে একটা চাকরির জোগাড় করো। টিউশন করে তো আজকের দিনে সংসার চলবে না বলো। তারপর আমার মাকে বলে একটা ভাল দিন দেখে আমাকে নিয়ে যাও। ঘরে বসে যখন খুশি যতবার খুশি দেখো। এবার আনো ওগুলো। হঠাৎ কেউ এসে পড়লে…’

‘ধুর এখানে কেউ আসবে না। আর চাকরি ? তুই তো ভাল মতোই জানিস ওটা আমাদের জন্য নয়…’

‘সেটা বললে চলবে বলো ? চেষ্টা করতে হবে না ?’

‘হুমম হবে…’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্তু। চাকরির চেষ্টা তো আর কম করেনি। চাকরি কিন্তু অধরা রয়ে গেছে। না আছে কয়েক লাখ টাকা। না আছে বিক্রি করার মতো জমি। এস-টি এস-সি ও-বি-সি ওরাই পাচ্ছে না তার আবার আমরা। কে দেবে চাকরি ? লক্ষ লক্ষ বেকার হাহাকার করছে দপ্তরের দরজায় দরজায়। একটা চিনির জন্য যেখানে হাজার হাজার পিঁপড়ের ছোটাছুটি, স্বাভাবিক ভাবেই চিনিটা সেখানে বিক্রিই হবে। চাকরিগুলোও বিক্রি হচ্ছে। যার কেনার টাকা নেই তার ওসব নিয়ে ভাবাটা সময় নষ্ট মাত্র। ভাগ্যিস টিউশনগুলো আছে।   

       শিল্পী আর অপেক্ষা না করে নিজেই উঠে যায়। ব্রা-পরে প্যান্টিতে পা গলাতে গলাতে অন্তুর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটে। অন্তু চাতকের মতো চেয়ে থাকে শিল্পীর দিকে। একটা একটা করে সব পরা হলে শিল্পী অন্তুর পাশে এসে বসে। বলে, ‘হাঁটতে খুব সমস্যা হচ্ছে। নামতে পারব তো ?’

‘না পারলে আমি তো আছি। কোলে নিয়ে নামিয়ে দেবো।’

       শিল্পী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ ওর মোবাইলে ভায়োলিন বেজে উঠতেই চুপ করে যায়। ব্যাগের ভেতর থেকে বেরকরে মোবাইলটা। মোবাইলের স্ক্রিনে, ‘মা কলিং’ ভাসছে। এমন সময় শিল্পীর ক্লাসে থাকার কথা। ওর মা তো সেটা জানে, তারপরেও কল!

‘এখন মা কল করছে কেন ?’ শিল্পীর গলায় আতঙ্কটা পরিষ্কার।

‘কোন দরকার থাকতেই পারে…’

‘কিন্তু এখন তো আমার ক্লাসের সময়।’

‘বিশেষ দরকার হতে পারে। ফোনটা ধরে বলবি স্যার মা ফোন করেছে আমি কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে যাচ্চি। নতুবা সন্দেহ হতে পারে। কথাটা বলার পর লাউড স্পিকার দিবি।’

‘আচ্ছা। কিন্তু কিছু হবে না…’ শিল্পী কথাটা বলতে বলতেই কলটা কেটে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর আবার কলটা আসে। কলটা রিসিভ করেই শিল্পী বলে, ‘স্যার মায়ের কল। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি…’

‘আচ্ছা যাও।’ গম্ভীর গলাতেই শব্দ দুটো বলে অন্তু। তারপর আঙুলের ইশারায় লাউড স্পিকার দিতে বলে।

লাউড স্পিকার দিয়ে, ‘হ্যাঁ মা এখন কল করছ যে ? আমি ক্লাসে ছিলাম। বলো…’

‘তুই বাড়িতে আয়।’ শিল্পীর মায়ের গলা বেশ নার্ভাস শোনায়।

‘এখন ? কিন্তু কেন ?’

‘বাড়িতে এলেই জানতে পারবি। দেরি করিস না।’

‘আমার তো ক্লাস…’ টঁক টঁক করছে মোবাইল। মনে হয় শিল্পীর মা নিজেই ফোন কেটে দিয়েছে। ‘কেটে গেছে। আমার ভীষণ ভয় করছে। এবার কী হবে ?’

‘কিন্তু তোর মায়ের তো জানার কথা নয়।’

‘আজকে সকাল থেকেই আমার মনটা কু-গাইছিল। সত্যিই যদি মা জেনেছে আমি কলেজ ফাঁকি দিয়ে…। খুব বাজে ব্যপার হবে।’

‘চিন্তা করিস না, চল। বাড়িতে না গেলে তো কিছুই বুঝতে পারবি না।’                                

       দুজনে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসতে থাকে। সময়ে গাড়ি পাওয়া গেলেও বাড়ি পৌঁছাতে ঘণ্টা দুই আড়াই তো লেগেই যাবে। নীচে নামতে নামতে অন্তু খেয়াল করে শিল্পীর কষ্ট হচ্ছে নামতে। হয়তো ব্লিডিং হচ্ছে এখনো। ‘আচ্ছা সত্যিই যদি শিল্পীর মা সব জেনে গিয়ে থাকে ?’ ‘যদি শুশুনিয়া আসতে কেউ দেখেছে ?’ ‘মায়ের চাপে শিল্পী সব সত্যি বলে ফেলবে না তো ?’ বারবার প্রশ্নগুলো ঘুরে-ফিরে এসে দাঁড়াচ্ছে অন্তুর মনের ভেতর। মাথাটা ভার হয়ে আসছে। কৌশিক মারা যাওয়ার রাত থেকে ভাল করে ঘুম হয়নি ওর। আবার বাজে কিছু ঘটবে না তো ? তিতলির মুখটা চোখের পাতায় ভেসে উঠে। মাথাটা ঝাঁকিয়ে মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করে অন্তু। মনটা শুনছে না, আরও বেশি বেশি মনে পড়ছে তিতলির মুখটা। কদিন যেন একটু বেশি বেশি করেই তিতলির মুখটা মনে আসছে। কেন হচ্ছে এমন ? এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই অন্তুর।

‘আচ্ছা এখন বাস পাবো ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।

‘পৌনে দুটোর সময় একটা মিনি বাস আছে। পেয়ে যাব মনে হয়। তোর কি নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে ?’

‘তা একটু হচ্ছে তবে খুব নয়। ওই বাসটা পেলেই বেশি ভাল হয়।’

‘সাবধানে পা চালিয়ে নাম। হড়বড় করতে গিয়ে শুকনো পাতায় পা ফসকে গেলেই বিপদ। এখনো মিনিট কুড়ি সময় আছে।’ বলে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। গাছের ফাঁক দিয়ে মাথার উপর ছেঁড়াফাটা রোদ এসে পড়ছে। ঝিমঝিম করছে মাথাটা।

। ১২।

পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়ছে টিনের চালাটার উপর। কয়েকটা পায়রা চালায় বসে দিনের শেষ খুনসুটিতে ব্যস্ত। কয়েকটা বসে আছে দেওয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা মাটির হাঁড়িগুলোতে। মহিম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পায়রাগুলোর দিকে। এখন কিছুই ভাললাগছে না ওর। যুক্তি-তর্কের দরবারে এসে মনটা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। সকাল থেকে একবারের জন্যেও কথা বলেনি ভাদু। ও কি কিছু বুঝতে পেরেছে ? কিন্তু সেটাই বা কেমন করে সম্ভব! পূর্ণিমা সেই যে বাসন নিয়ে ডোবায় গেছে ফেরার নাম নেই।

‘মহিম ঘরে আচিসর‍্যে ? মহি…ম ?’ কথা বলতে বলতেই ঘরে ঢোকে পরান।

‘খুড়া না কে-ব ?’ হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করে মহিম। অন্যকেউ হলে হয়তো বিরক্ত হত কিন্তু পরানকে ভেতর ভেতর কোথায় যেন শ্রদ্ধা হয় মহিমের। মহিমের বাপ মরার সময় এই পরানই একমাত্র পাশে দাঁড়িয়েছিল। খাটটাকে সামনের দিকে অল্প টেনে মহিম বলে, ‘বৈস খুড়া। তা বড মনে কইর‍্যে যে-ব ?’

‘নার‍্যে টুকু দরক্যার ছিল বল্যেই আইসত্যে হৈল। বেশিক্ষণ বৈসব নাই। ফুলকি আবার ঘরে একল্যা আছে। বুজত্যেই ত পাচ্চিস সাঁঝের বেলা একা-একা ডরাব্যেক।’

‘ফুলকি আইচ্যে ?’

‘ওই গাঁয়ে শ্বশুর ঘর হৈল্যে যা হয়…।’

‘হঁ ইটা ঠিক্যেই বল্যেছ। তাহল্যে আইজক্যে আর আটকাব নাই। মেয়্যালোকের ডরটা টুকু বেশিই বঠে। এই ত কাইলক্যে রাত্যেই…’ কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায় মহিম। আর একটু হলেই মুখ ফসকে বেরিয়েই যাচ্ছিল।

‘কী হইছিল কাইলক্যে রাইত্যে ?’ পরানের চোখে মুখেও প্রশ্ন চিহ্ন ফুটে ওঠে।

‘ওই যে কাইল বাউল ছিল, ভাইব্যেছিলম যাব কিন্তুক…’ এত বড় মথ্যে কথাটা বলতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই কয়েকবার হোঁচট খায় মহিম।

‘না না যাইস নাই ভাল্যই কইর‍্যেছিস। ঘরে রুগী রাইখ্যে যাওয়াটা ঠিক লয়।’

‘হঁ সেই লাগ্যেই ত আর…’

‘তা শুন যে লাইগ্যে আইল্যম, কাইল ঝাড়ফুঁক কত্ত্যে পলাশকলি গ্যেইছলম বুঝলি। ওই বাদলার বিটিটার উপর‍্যা বাতাস লাইগ্যেছিল সেই লাইগ্যে। ত ফিরার পতে কালাচাঁদের সাতে দেক্যা। কতায় কতায় তর কতা জিজ্ঞ্যাইস কচ্চিল আমি ত সবেই বল্ল্যইম। সব শুনার পত্তে তোদের পুনির কতা জিজ্ঞ্যাইস কচ্চিল। আমি অবশ্যি বয়্যেস কম সে কতাটা বইল্যেছি। তাও বলি তকে একবার বলাটা দরকার। সেই লাগ্যেই আইল্যম আরকি।’

‘তুমিও ন খুড়া। এখন উয়ার বিহাঁ দিব্যার বয়সটা হৈল্যই নাই। তারউপর বউটার এমন শরীদ খারাব।’

‘হঁ বঠে ত। ইটা ত আমিও জানি। আসলে কালাচাঁদের ব্যেটার বয়সটাও ত গুটেক লয়। ওই কুড়ি-বাইশ হব্যেক। জমি-জমাও ঢের। কমেঝমে চুক্যে য্যাইত…’ পরান কথাটা শেষ করার আগেই পূর্ণিমা থালা-বাসন নিয়ে ঘরে ঢোকে। পরান জুলজুলে দৃষ্টিতে তাকায় পূর্ণিমার দিকে। পূর্ণিমার থালা বাসল রাখা হলে পরান হাতের ইশারায় ডাকে ওকে। জিজ্ঞেস করে, ‘পড়াশুন্যা কচ্চিস ত ? দিন র‍্যাইত থাল ধুল্যেই হব্যেক নাই।’

পূর্ণিমা হাসি হাসি মুখে ঘাড় নেড়ে জানায় পড়াশুনা ঠিকঠাক করছে বলে। পরান পূর্ণিমা মাথায় হাত বুলিয়ে ওর হাতে একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে বলে, ‘যা দকান থেইক্যে দুটা কিচু কিইন্যে খাবি যা।’ টাকাটা নিয়ে পূর্ণিমা একবার মহিমের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ছুটে বাইরে বেরিয়ে যায়। পূর্ণিমা বেরিয়ে গেলে পরান আবার বলে, ‘হঁ যেটা বইলছিলম আরকি। তর মেয়্যাটা ত কতা বইলত্যে পারে নাই সেই লাইগ্যেই ভ্যাইবলম যে ছেইল্যা ভাল যদি লাইগ্যে যায় ত…… এই আরকি। তা তুই যকন বইলছিস যে একন দিবি নাই তকন আর…’ কথাটা শেষ না করেই লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ে পরান।

‘কদিন আগুতে তারাপুর থেক্যেও দুলোক আইচিল। কিন্তু ওই যে বইল্লম, আমার বত্তমান যা অবস্তা তাতে কইর‍্যে আর সাহস হয় নাই। তারউপর পুনির বয়সটাও ত একটা কতা বঠে।’

‘দ্যেক যেটা ভাল বুজিস কর। তুই ত বাপ বঠিস আইজ হোক কাইল হোক বিটিকে ত বিহাঁ দিত্যেই হব্যেক। তোর বউটাও দেইখ্যে যাইতে পাইত্ত।’ কথাটা বলে উপরের দিকে তাকায় পরান। তারপর বলে, ‘না আইজ উঠি। ফুলকি একল্যা একল্যা কী কচ্চ্যে কে জানে। তবে আমার কতাটা তুই টুকু ভাইব্যে দেকিস…’

পাশাপাশি ঘরগুলোর শাঁখের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই অন্ধকার যেন মহিমের ভেতর জমাট হয়ে বসে। কিছুক্ষণ আগেই পূর্ণিমা তুলসী তলায় সন্ধা প্রদীপ নামিয়ে দিয়ে গেছে। তারই আলো ছড়িয়ে আছে উঠোনে। প্রদীপটার দিকে তাকিয়ে আকাশ কুসুম ভাবে মহিম। প্রশ্নের পোকাগুলো মাথার ভেতর কুটকুট করে চলেছে। একটা সময় ছিল যখন দশ বছরের ভেতরেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। মহিমের মা ঠাকুমার বিয়েও অনেক কম বয়সে হয়েছে। তাই বলে আজকের দিনে…। ভাবতেই পারে না মহিম। এখন দিন পাল্টেছে। আইন কানুন সব পাল্টেছে। আগে পুলিশের ভয় ছিল না। এখন খবর পেলেই ঘাড়ে ধরে হাজতে পুরে দেবে। এই পুলিশ-টুলিশকেই বেশি ভয় মহিমের। তাছাড়া কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য কতদিকে কত রকমের ঘটনা ঘটছে। ঘরে টভি না থাকলেও লোকের মুখে-মুখে সবই তো কানে আসে।

       সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘর ভেতরে ঢোকে মহিম। ভাদু দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে এখন। গলা দিয়ে ঘড়-ঘড় ঘড়-ঘড় একটা শব্দ বার হচ্ছে। ভাদুর মাথার বালিশটা একটু সরিয়ে বসে মহিম। মাথায় হাত বোলায়। ভাদু পাশ ফিরে তাকায় একবার। মহিম জিজ্ঞেস করে, ‘একন টুকু ভাললাইগচ্যে ?’

ভাদু হ্যাঁ-না কোনও উত্তর না দিলে মহিম আবার বলে, ‘ইবার যে অসুদ গুল্যাইন আইনলম সব দামি অসুদ। ইগুল্যানে ভাল কাজ হব্যেক।’

এবার কথা বলে ভাদু, ‘অসুদের দাম দিয়্যে ইরোগ সারব্যেক নাই। যে কটা দিন আছি যন্তনা কম হৈল্যেই হৈল। ভোলা-শঙ্করকে বিকে দামি অসুদ না আনল্যেও পাইত্তে। মুছলমানের হাতে পইড়ল্যে কাইট্যে…’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই ভাদু বলে, ‘উপর‍্যে যায়্যে আমি কী বইলব ? আমার লাইগ্যে গরু দুইট্যার জীবন…’ কান্নার চোটে কথাটা আর বলতে পারে না ভাদু। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। মহিম ভাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ওর চোখের কোনাতেও জল জমা হয়। পূর্ণিমা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। কোনও কিছুই ওর অজানা নয়। কিন্তু নিয়তির নির্মম বিচারে কান্নাটুকু ছাড়া ওর গলা দিয়ে কোনও কিছুই পরিষ্কার ভাবে বার হয় না।

কিছুতেই ঘুম আসছিল না মহিমের। কড়িকাঠের দিতে তাকিয়ে আকাশকুসুম ভাবছিল। ছেলেবেলার কথা। প্রাইমারি স্কুলের কথা। বাবা মায়ের কথা। বিয়ের কথা। পূর্ণিমার জন্মের কথা। ভাদুর ক্যান্সার ধরা পড়ার দিনটার কথা। এমনকি পরানের কথার রেশ ধরে পূর্ণিমার বিয়ে দেওয়ার কথাও। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাদুর গোঁগানিও যেন বাড়ে। তবুও ঘুমিয়ে আছে ভাদু। ঘুমের ওষুধের জোরেই হয়তো ঘুমোচ্ছে। ঘুমোতে ঘুমোতেই এপাশ ওপাশ করছে পূর্ণিমা। গরমে ঘামছে মেয়েটা। মহিম উঠে গিয়ে ভাদুর ঢাকাটা টেনে একটু সরিয়ে দেয়।

       ঘরের উঠোনে খাট পেতে বসে মহিম। চারদিকটা অন্ধকারে ভরে আছে। রাত ডাকছে নিজের সুরে। একান্ত আত্মমগ্ন হয়ে না শুনলে রাতের ডাক শোনা যায় না। শূন্য গোয়াল ঘরটার দিকে তাকিয়ে একটা বিড়ি ধরায় মহিম। বিড়িটা টানতে টানতেই কাগজি গাছটার নীচে গিয়ে পেচ্ছাব করে। গায়ে কাঁটা দেয়। শিরশির করে উঠে শরীরটা। হঠাৎ করেই কাবেরীর পাছা দুটো মনে পড়ে। মনে পড়ে গতকালের শেষ রাতটা। এখনো পেচ্ছাবের দ্বার থেকে ভুরভুর করে কাবেরীর যৌনাঙ্গের গন্ধ ভেসে আসছে। এই গন্ধটাতেই নেশা ধরেছিল কাল। বিড়িটা টানতে টানতেই আবার খাটে এসে বসে মহিম। শরীর আবার শরীর চাইছে। ভেতরের অস্বস্তিটাকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে মহিম। দূরের কোনও গ্রাম থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। এখনো ভোর হতে অনেক দেরি।

‘শালা তপনা কাবেরীর ঘর যায় নাই ত ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় আসে ওর। রাগে শরীরটা রিরি করে উঠে। ‘না না গ্যেলেও কাবেরী আর দিব্যেক নাই…’ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে মহিম। ‘কিন্তু তপনা যদি জোর কইর‍্যে…’ বিড়িটায় পর-পর কটা টান মেরে উঠে দাঁড়ায় মহিম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রাত্রি কটা হতে পারে অনুমান করার চেষ্টা করে। ঝলমলে তারার ভিড়ে অনুমান করতে পারে না।

       ঘরের সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। চারদিকটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে আছে। মনসা মন্দিরের বাল্বটুকু ছাড়া পুরো গ্রামটাই অন্ধকারের দখলে। ঝপ করে কাবেরীর উলঙ্গ শরীরটার উপর তপনার উলঙ্গ শরীরের ছবিটা চোখে ভেসে উঠে মহিমের। ফোঁস করে আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করে মহিম।

       অন্ধকারে পাড়ার কুকুরগুলোও মনে হয় মহিমকে চিনতে পারছে না। ঘেউ-ঘেউ করছে কুকুরগুলো। মহিম জিব দিয়ে চুকচুক-চুকচুক শব্দ করতে করতে এগিয়ে যায়। কাবেরীর ঘরটা পাড়ার এক প্রান্তে। ঘরটার চারপাশ জুড়ে পলাশ আর বাবলাগাছগুলো ভিড় করে আছে। ঘরের সামনে ডান হাতে করে মস্ত আমের গাছ। ছোটছোট আম ধরেও আছে প্রচুর। ঘরের পিছন দিকটায় একটা মরা ডোবা। ডোবাটার পাড়ে খেজুরগাছ দুটো অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। দূরের থেকে দেখলে মনে হয় গাছ দুটো যেন খড়ের চালা ভেদ করে উপরে উঠেছে। নিঃশব্দে এক একটা ঘর পেরিয়ে যায় মহিম। কারুর ঘরে এখন টুঁশব্দটুকুও নেই। এদিকটায় ঝোপঝাড় বেশি বলে সাপের ভয়ে কেউ খাট বা চাটাই পেতে গরমের রাতেও বাইরে ঘুমায় না।

       কাবেরীর ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায় মহিম। বিড়িটায় শেষ টান মেরে সেটাকে পাদিয়ে বেশ কয়েকবার রগড়ে দেয়। কাবেরীর ঘর থেকে কারুর গলার আওয়াজ আসছে কি না শোনার চেষ্টা করে। কিছুই শোনা যায় না। এখন দরজায় টোকা দিলে হয়তো কাবেরীও শুনতে পাবে না। দেওয়াল পাশের কচু গাছগুলোকে পায়ে করে সরিয়ে-সরিয়ে ডোবাটার দিকে সরে আসে মহিম। কাবেরীর ঘরের পিছন দিকটায় একটা জানালা আছে। জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে জানালায় টোকা দেয়। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে আবার টোকা দেয়। আবার টোকা দেয়। এতক্ষণে ভেতর থেকে গলার আওয়াজ ভেসে আসে, ‘ক্যে… ?’

‘আমি।’

‘আমিটা ক্যে ?’

‘মহিম-মহিম দরজা খুল।’

‘ত ইদিকট্যায় কী কচ্চিস ? টুকু দাঁড়া।’

       মহিম আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। তপনা যে ঘরে নেই সেটা বুঝতে পেরে ভেতর ভেতর আনন্দ হয় ওর। কিছুক্ষণ পর কাবেরী বাইরের দরজা খুলে দাঁড়ায়। মহিম দেখে কাবেরী একটা শাড়িকে বুক থেকে হাঁটু অবধি জড়িয়ে বাইরে এসেছে। সায়া-ব্লাউজ কিছুই পরে নেই। এতক্ষণ হয়তো গরমের জ্বালায় সব খুলেই শুয়েছিল।

‘তা তুই এত রাইত্যে ? ভিত্রে আয়।’

ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে মহিম বলে, ‘তকে দেক্যার লাইগ্যে ভিতরটা আঁকুপাঁকু কচ্চিল। তাই চইল্যে আইলম।’

কাবেরী দরজাটা বন্ধ করে বলে, ‘আমাকে দেক্যার লাইগ্যে না আমার সাতে শুয়্যার লাইগ্যে ?’

মহিম কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলে, ‘দুট্যায় বইলত্যে পারিস।’

‘হুম। সেইট্যায় বল। আমার মতন মেয়্যাকে মাঝ রাইত্যে দেক্যার লাইগ্যে কেউ আইসব্যেক নাই। এত পিরিত কারুর নাই। যৎদিন আমার শরীদ আছে তৎদিনেই মন আঁকুপাঁকু কইরব্যেক। শরীদ গ্যেল ত আঁকুপাঁকুয়ানিয় গ্যেল।’ ভেতর ঘরের দরজাটাও বন্ধ করে দেয় কাবেরী।

‘অমন কইর‍্যে বলিস না। সবাই ত আর তপনার পারা হয় নাই।’

‘উয়ার কতা না হয় ছাড়। তুই নিজের কতাটাই ভাব। যখন ভাদিকে রোগ্যে ধরেনাই তকন কি তুই কনদিন জানত্যেও আইচিস আমি কেমন আচি না আচি। পরিমল মরার পর‍্যেও একবার আসিস নাই। কাইলক্যে রাইত্যে যদি না দিতম আইজক্যেও আসতিস নাই। সব মরদগুল্যাইন এমন পারা। কাকে কি বইলব ? বইলত্যে গেল্যেই পঁদে ঝাল লাইগব্যেক। একন মদ্দা কতা হচ্ছে তোর একটা মেয়্যা লাইব্যেক আর আমার একটা মরদ…’  

মহিম কী বলবে খুঁজে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাবেরী নিজের মনেই বলে চলেছে। কাবেরীর প্রতিটা কথায় যুক্তি আছে, এটুকু বোঝার ক্ষমতা মহিমের না থাকা নয়। এতদিন আঙুর ফল টক ভেবেই কাবেরীকে বেশ্যামাগী ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় সম্বোধন করেনি মহিম। কালকে শরীরের স্বাদ পেতেই আজকে রাতে মেছো বেড়ালের মতো হাজির হয়েছে। এটা মহিম নিজেও জানে। এমনটাও নয় যে কালকের ঘটনাটা নেশার ঘোরে ঘটিয়েছিল মহিম। কালকের ঘটনাটা নিয়ে মহিমের আনন্দ ছিল অনুশোচনা ছিল না। তাই তো আজকে শরীরের খিদে আর মনের ঈর্ষা মেটাতেই ছুটে এসেছে।

       ‘…আমার বাপটা মাতাল না হৈল্যে আমার ভাল মরদও জুইটত ভাল সংসারও হৈত। কপাল, বুজলি কপাল। আইজকে দেখ শিয়াল কুকুরের পারা যে কেউ আইসছ্যে ঝাপটা ঝাপটি কইর‍্যে ফুত্তি কইচ্চে চইল্যে যাচ্চে। তুই কি ভাবিস তপনা একলা খায় ? মোটেই সেটা লয়। হঁ তপনা বহুদিন ধইর‍্যে খাইচ্চে ইটায় যা। সইন্দ্যা বেলায় কৈবরাইজ আইচিল। বইল্লম শরীদ ভাল নাই। হারামি বইল্ল, নাই থাকুক। আইচি যকন দিত্যেই হব্যেক, নইলে ডাইনি বইল্যে গাঁ ছাড়া কৈরব। শাড়ি-সায়া খুইল্যে সুত্যেই হৈল। ও বাবা কুকুরটা গ্যেল ত শিয়াল হাজির। গাঁয়ের মেম্বার বঠে দিত্যেই হব্যেক। শালারা শিয়াল কুকুর‍্যের পারা আঁচড়্যাই কামড়্যাই খায়।’

‘পরান খুড়াও আসে সৈত্তবানও আসে ?’ পরানের আসাটা শুনেই হকচকিয়ে গিয়েছিল মহিম। সত্যবানের কথা শুনে বিস্ময়ের সীমা রইল না।

‘সব শালা আসে খায় আর যায়। এই মাগীটা কী খায় কেউ জিজ্ঞ্যাইস করে ? তারবেলায় কেউ কইরব্যেক নাই। উয়াদের আর কী ? আমার শরীদ গেল্যে আরও কারুর শরীদ জুট্যাই লিবেক।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কাবেরীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। টিমটিমে আলোতে সেটা মহিমের দৃষ্টি এড়ায় না।

       কয়েক মিনিট সব চুপচাপ। কাবেরী হাঁটুতে মুখ গুঁজে নাক টানছে। মহিম কী বলবে বুঝে উঠতে না পেরে উঠে দাঁড়ায়। কাবেরী মুখ তুলে জিজ্ঞেস করে, ‘কুতায় যাচ্চিস ?’

‘না আইজক্যে যাই অন্যদিন…’

‘জানি ইবার তর গা ঘিনঘিন কৈচ্চ্যে ?’

‘না না সেটা লয়…’

‘তাহলে পলাই যাচ্চিস ক্যেন্যে ? ল্যে যে জন্যে আইছিলি কইর‍্যে যা।’ শরীরের থেকে কাপড়টা খুলে নগ্ন হয়ে মহিমের সামনে দাঁড়ায় কাবেরী। আধমরা আলোয় মহিম দেখে, কাবেরীর বুক-পেট-গলায় এমনকি যোনির দুপাশের ঊরুতেও রাক্ষুসে নখের ক্ষতচিহ্ন।  

।১৩।

জানালার ওপারে দুটো খেজুর গাছের ফাঁক দিয়ে টকটকে লাল সূর্য উঠছে। প্রতিদিন এভাবেই হয়তো সূর্যটা উঠে। তবুও কাবেরীর চোখে নতুন লাগে সূর্যটাকে। ঠিক যেমন ছোটবেলায় দেখে আসা পরিচিত সূর্যটা। ঘরের কপাট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। গোয়ালঘরের ভেতর ঢুকে ছাগলটাকে দেখে। একটা বাচ্চা মায়ের পাশে বসে আছে, আরেকটা দুধ খাচ্ছে মনের আনন্দে। কাবেরীর মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সব কেমন যেন নতুন লাগছে। অথচ কোনও কিছুই আজকের নতুন দেখা নয়। মায়ের পাশে বসে থাকা বাচ্চাটাকে কোলে নেয় কাবেরী। বাচ্চাটার মাথায় গাল বুলিয়ে আদর করে। তারপর বাচ্চাটাকে নিয়ে গোয়ালঘর থেকে বাইরে আসে। উঠোনে পেতে রাখা খাটে এসে বসে। চুমু খায় বাচ্চাটার মাথায়। বুকদুটো টনটন করে। মা হতে না পারার যন্ত্রণাটা যেন জেগে উঠতে চায়।

‘তুই মা হবি কাবেরী ?’ ঠিক এই কথাটাই গতকাল ভোররাতে জিজ্ঞেস করেছে মহিম। একবার নয় দু’দুবার জিজ্ঞেস করেছে। হাঁ না কিছুই বলতে পারেনি কাবেরী। ডাগর চোখে মহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। হঠাৎ মহিম কেন এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে সেটা জানে না কাবেরী। জানতেও চায় না। স্বপ্ন দেখতে ওর ভয় করে। তাছাড়া বিধবাকে স্বপ্ন দেখার অধিকার বিদ্যাসাগর দিলেও বিধাতা যে দেয়নি এটুকু বোঝার ক্ষমতা কাবেরীর আছে।

গ্রামের অঙ্গনওয়াড়ি দিদিমুনি কাবেরীকে একবার বলেছিল, ‘তুই আবার বিয়্যা কর কাবেরী। একটা বাচ্চাকাচ্চা হৈলে সব ভুইল্যে জীবনটা লতুন কইর‍্যে শুরু কত্ত্যে পারবি। এখন তো কত কত বিধবার বিয়্যা হৈচ্ছে। বিধবার বিয়্যা আইন সম্মত বঠে…’ আরও কত কিছুই না বলেছিল দিদিমুনি। সেদিন সেসব কথাগুলো শুনতেও ভাল লেগেছিল কাবেরীর। কিন্তু বিয়ে আর হল কোথায় ? নিজে গিয়ে তো নিজের জন্য পাত্র খোঁজা সম্ভব ছিল না। বাধ্য হয়েই পরিমলের ঘরে পতিতা হয়ে পড়ে রইতে হয়েছে। যে পেরেছে শরীরটা খুবলে খেয়েছে। কেউ বিয়ের কথাই বলেনি তার মা হওয়া। এই প্রথমবার কেউ মা হওয়ার মন্ত্র শুনিয়েছে ওকে। সেটা শোনার পর থেকেই শরীর জুড়ে কেমন যেন একটা নেশা ধরেছে।

       ছাগলের বাচ্চাটাকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে কাবেরী। শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে বুকের বোঁটায় মুখ লাগিয়ে দিয়েছে বাচ্চাটার। বেশ কয়েকবার চাটাচাটি করারপর বোঁটাটায় টান দেয় বাচ্চাটা। কিছুই পায় না। মুখে করে বার দুয়েক গুঁতিয়ে আবার টান দেয়। থরথর করে কেঁপে উঠে কাবেরীর শরীরটা। বুকে ব্যথা লাগে। বাচ্চাটাকে নামিয়ে দিয়ে নিজের মনেই খিলখিল করে হাসে কাবেরী। বাচ্চাটা দৌড়ে ওর মায়ের কাছে যায়। চুক-চুক শব্দে বাঁটগুলো টানতে শুরু করে।

       ঘরের কোনায় জমা করে রাখা পাতপালা দিয়ে উনুনটা ধরায় কাবেরী। তারপর টিনের বাটিতে চা-চিনি-জল একসঙ্গে চাপিয়ে দিয়ে বাবলা দাঁতনে দাঁত ঘষতে থাকে। চা এর জল ফুটতে শুরু করলে মুখটা ধুয়ে নেয়। আজকে ওকে একবার মহিমের ঘরে যেতে হবে। কী জন্য যেন যেতে বলেছে মহিম। গরম চা-এ বাসি রুটি ডুবিয়ে খেতে খেতে ভাবনার ভিড়ে ডুবছে আর উঠছে কাবেরী। মাঝে-মাঝে কুয়াশা জমছে চোখের পাতায়। আবার কল্পিত সুখের ইশারায় সেই কুয়াশা কেটেও যাচ্ছে। তবুও একটা ভয় বুকের ভেতর ঘুরঘুরে পোকার মতো ঘুরঘুর ঘুরঘুর করেই চলেছে। পোকাটাকে দূরে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে কাবেরী কিন্তু বেয়াড়া পোকাটা ঘুরেফিরে আসছে আবার। পোকাটাকে পা’দিয়ে মাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নিশপিশ করছে পা’দুটো, কিন্তু নাগালের ভেতরে থেকেও ধরা দিচ্চে না পোকাটা।

       চা-রুটি খাওয়ার পরেও আরও কিছুক্ষণ বসে রইল কাবেরী। ভাবনার ভেতর ছোটবেলার দিনগুলো ঘুরছে এখন। মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। আর সেই পোকাটা ? হাঁ সেটা আছেই। যখনি ভেতর থেকে কাবেরীর মনটা কাবেরীকে জিজ্ঞেস করছে, ‘তুই মা হবি কাবেরী ?’ ঠিক তখনই পোকাটা ঘুরেফিরে আসছে। ঘরদোর এখনো ঝাঁট দেওয়া হয়নি ভেবেই উঠতে যাচ্ছিল কাবেরী ঠিক সেই সময় বাইরের দরজায় টুকটুক করে টোকা পড়ল।

‘কাবেরী একবার দরজাটা খুল দরকার আছ্যে…’ তপনার গলা। বুকের ভেতরটা রাগে রিরি করে উঠল কাবেরীর। ঘরের কোনায় দাঁড় করিয়ে রাখা বঁটিটার দিকে একবার চেয়ে নিল। সদ্য শানদেওয়া বঁটিটা চকচক করছে।

এর আগেও বহুবার কাবেরীকে বহু জায়গায় নিয়েগিয়ে লাপাতা হয়েছে তপনা। কিন্তু কাবেরীর এমন রাগ হয়নি কোনওদিন। তবে কি মহিমকে বুকের ভেতর পেয়ে ধামাচাপা দেওয়া রাগটা ফুঁপিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে ? হবে হয়তো। তপনার মুখের উপর দরজাটা খুলে দাঁড়াল কাবেরী। তপনা ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল। কাবেরী দুহাত দিয়ে দরজা আগলে বলল, ‘যা বলবি বাইর‍্যে দাঁড়্যাই বল।’

‘ক্যেন্যে ভিত্রে ঢুইকল্যে কী হব্যেক ?’

‘অনেক কিচুই হব্যেক।’

‘দেকি ত কী হয়।’ কাবেরীর হাত সরিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে তপনা।

‘এই শালা তপনা…’ তপনার গলাটা চেপে ধরে কাবেরী। খকখক করে কেশে উঠে তপনা।

নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘মাগী নতুন মরদের বল পাইছ্যিস লয় ? তাহলে হিমানী ঠিক্যেই দেক্যেছে মহিম শালা আইচিল। তর বিষদাঁত আমি ভাইঙ্গে দিব, আমার নামও তপনা বঠে।’ কথাটা বলার পর আরও কিছুক্ষণ খকখক করে তপনা।

‘আমি আমার শরীদের উপর কাকে শুয়াব সেটা আমি ভাইব্য। খবুড়দার আমার দরজায় পা দিবি মাঁমেগুয়া। নইলে যেটার লাইগ্যে আসিস সেট্যাই কাইট্যে কুকুরক্যে খাঁওয়াই দিব। তখন মুতার লাইগ্যে ঝাঁপাই মরবি।’

‘দাঁড়া মাগী দাঁড়া তর দিন আইসছ্যে। সেদিন ক্যেন্যে তুই বাউল শুন্যার লাইগ্যে অত লাফাচ্চিলি সেটা বুজ্যেছি…’

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তপনা কাবেরী ওর মুখের কথা কাড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘যা বুজ্যেছিস বুজ্যেছিস। ইবার যদি দেখ্যি আমার ঘর দুয়্যারে আইছিস খালভর‍্যা, তাহল্যে তুই যা বুজবি সেটা ইয়ার আগুতে তকে কেউ বুজায় নাই। ইবার ইখ্যান ছাইড়্যে দূর-হ…’

‘আমিও দ্যেইখব লো মাগী এই রসের ব্যাইড় তর কতদিন থাকে।’

‘দূর-হ খালভর‍্যা আমার দুয়ার থ্যেইক্যে।’ বলেই তপনার মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দেয় কাবেরী।

       তপনা গজগজ করতে করতে চলে যাওয়ার পর ঘরেঢুকে শুয়ে পড়ে কাবেরী। বালিশে মুখ চাপাদিয়ে কাঁদতে থাকে। ও নিজেও জানে এর পরিণাম কী হতে পারে। আজকেই হয়তো…। ‘যা হবার হোক…’ মুহূর্তের ভেতর নিজের শক্তিটাকে ফিরে পেয়ে চোখের জল মুছে উঠে বসে কাবেরী। ‘অনেক হইচ্যে আর লয়…’ দিনদিন শেয়াল কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। এবার ফোঁস করতে না পারলে মরা ছাড়া ওর আর রাস্তা রইবে না।

       ঘরের জানলা কপাট বন্ধ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে কাবেরী। চোখ পড়ে পলাশ গাছগুলোর উপর। কচিকচি পলাশ পাতা থেকে ভুরভুর করে গন্ধ বেরিয়ে আসছে। আর কদিন পরেই শিবের গাজন। মেলা বসবে নদীর পারে। চড়কমেলা। হাঁটতে হাঁটতে মেলার দিনটা ভাবতে থাকে কাবেরী। মনের ভেতরকার রাগটা থিতিয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখন পথের ধারে, কপাট-জানালার ফাঁকে কত কৌতূহলী চোখ চেয়ে আছে ওর দিকে। ওরা জানতে চায় কাবেরী কোথায় যাবে। কাবেরী দেখেও দেখে না। নিজের মনে হাঁটতে থাকে। ও জানে ওদেরকে পাত্তা দিলেই পেয়ে বসবে ওরা। প্রশ্নের পাহাড় বানিয়ে পথ আগলাবে। ওরা সবাই মানুষের মতোই দুমুখো। এক মুখে সমবেদনা জানিয়ে আরেক মুখে কামড়ায়। ওরা সব জেনেও কিছুই জানে না কিংবা উল্টোটা কিছুই না জেনেও সব জানে ওরা।

। ১৪।

ফোনের রিংটোন বাজছে। ‘বাজুক শালা ধরবই না ফোনটা…’ পকেটে হাতটা ঢোকাতে গিয়েও হাতটা বেরকরে নিল অন্তু। সকাল থেকে স্নান খওয়া চুলোয় গেছে। কালকে বিকেল-সন্ধায় ঘরে ফেরার পর থেকে শিল্পীর কোনও খবর নেই। না মেসেজ না ফোন। ফেসবুক হোয়াটস্অ্যাপেও অনলাইন আসেনি একবারও। কালকে সারারাত দুশ্চিন্তায় ঘুম আসেনি ওর। একবার বিছানা একবার ছাদ করে করেই রাত গছে। রাত নটা-দশটা পর্যন্ত যখন কল আসেনি তখন ভয় হয়েছে অন্তুর। সম্ভাব্য বিপদগুলোর কল্পনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিল মনটা। বারবার শিল্পীকে হারিয়ে ফেলার ভয় হচ্ছিল। এভাবেই তো একদিন হারিয়েছিল তিতলি। আবার রিং হচ্ছে মোবাইলে। এবার বেশ বিরক্ত হয়েই ফোনটা পকেট থেকে বের করল অন্তু। না শিল্পীর কল নয় রাজা কল করছে। রাগটা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল এতে। রিসিভ করব কি করব না করতে করতেই কেটে গেল কলটা। অন্তু দেখল মোবাইলের স্ক্রিনে রাজারেই দুটো কল এসেছে। মানে আগের কলটাও শিল্পীর ছিল না। আবার কল আসছে…

‘হ্যালো…’ অন্তু এমন ভাবেই হ্যালো করল যেন নম্বরটা সেভ নেই ওর।

‘শালা ফোনটা ধরতে কি ফাটছিল নাকি ?’ রাজার গলায় বিরক্তির ভাবটা পরিষ্কার।

‘না মানে একটু…’

‘থাক থাক আর মানে শুনে কাজ নেই তাড়াতাড়ি স্পন্দন নার্সিং হোমে চলে যা।’

‘কেন বলত ?’ ভয়ে ভেতরটা ছলাৎ করে উঠল অন্তুর।

‘তুই জানিস না কিছু ?’

‘নারে ভাই। বল তো কী ব্যপার ?’ এবার কথাগুলোও লাটিয়ে গেছে অন্তুর। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

‘আরে গতকাল দুপুরে শানুর এক্সিডেন্ট হয়েছে তো। সিরিয়াস অবস্থা শুনলাম ভাই। পারলে একবার ঘুরে আয়। দরকার হলে আমার বাইকটা নিয়ে যা।’

‘তুইও চল না আমার সঙ্গে। একা একা…’

‘আরে আমি তো কালকে থেকেই বিষ্ণুপুরে আছি। শানুর ব্যাপারটা রঞ্জনের কাছে শুনলাম। আর হাঁ তোকে একটা ভাল খবর দেওয়া হয়নি।’

‘কী খবর ?’

‘বড়দির ছেলে হয়েছে বুঝলি। বাড়ি গিয়ে পার্টি হবে।’

‘মামা হয়ে গেলি তো তাহলে ?’

‘হুম। আচ্ছা শোন এই নিয়ে পরে কথা হবে। আমাই ঘরেই মোটর সাইকেলটা আছে। মাকে গিয়ে বলবি গাড়ির চাবিটা লাফিং বুদ্ধর নীচে রাখা আছে। বললেই চাবিটা দিয়ে দেবে।  তাছাড়া এক কাজ কর, তুই সাইকেল নিয়ে আমার বাড়ি চলে যা। আমি মাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি।’

‘সেটাই বরং ভাল। আর হাঁ ভাগ্নের একটা ছবি মনে করে হোয়াটস্অ্যাপ করিস।’

‘সিওর। সিওর।’

       ফোনটা কাটার পর একটা সিগারেট ধরাল অন্তু। আজকে বিকেলের টিউশনটা হয়তো হবে না। মোবাইলটা নিয়ে ফটাফট একটা মেসেজ লিখল, ‘আজকে আসিস না। বিশেষ দরকারে বাইরে যাচ্ছি। বরং কালকে চলে আসিস। সবাইকে জানিয়ে দিস মনে করে।’ বিপুল নামের একটা ছাত্রকে সেন্ড করল মেসেজটা। এদিক দিয়ে অন্তুর নিশ্চিন্ত জীবন। সপ্তাহে যে কোনও তিনদিন পড়িয়ে দিলেই হল। শুধু সবার সময়ের সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিতে হবে।

       সিগারেটটা শেষ করে সবে স্নানে ঢুকেছে, আবার ফোন বাজতে শুরু। বাধ্য হয়েই বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতে হল অন্তুকে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে আননোন নম্বর। বিপুল কিংবা শিল্পী হতে পারে ভেবেই ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যালো কে ? হ্যালো…’ ওপার থেকে টিভির আওয়াজ আসছে কিন্তু মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ‘হ্যালো কে?’ আবার জিজ্ঞেস করে অন্তু। এবারেও কলার নীরব শ্রোতা। ফোনটা কেটে কলব্যাক করে অন্তু। রিং হতে না হতেই রিসিভ হয় ফোনটা। কিন্তু এবারেও ওই টিভির শব্দটুকুই যা কানে আসে। ‘শালা কথা বলার নেই তো কল করিস কেন হারামজাদা ?’ বলে ফোনটা কেটে দেয় অন্তু। একরাশ বিরক্তি নিয়ে আবার বাথরুমে ঢোকে। ঢুকেই জলের কলটা খুলে দেয়। হদহদ শব্দে বালতিটা ভরতে থাকে। এই বালতিটুকু ভরে যাওয়ার ফাঁকে আননোন কলটা কে করতে পারে একবার ভেবে নেয়। নিশ্চিত ভাবে কারুর নাম মাথায় আসে না। বালতিটা ভরে বাইরে জল পড়ছে এবার…

       জামা-প্যান্টটা পরেই মাকে একটা কল করে অন্তু। মাকে না জানিয়ে গেলে চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ করে বসে থাকবে। হয়তো সেন্টার থেকে ফিরে কিছু খাবারও খাবে না, এটা ভালমতো জানে অন্তু। আগেও এমনটা হয়েছে। রিং হচ্ছে মোবাইলে। অথচ সেই রিংটোনের শব্দ অন্তু নিজেও শুনতে পাচ্ছে। রান্না ঘরের ভেতর বাজছে মোবাইল। রান্নাঘরে ঢুকে অন্তু দেখে সব্জির ঝুড়িতে মোবাইল। মুচকি হেসে একটা চিরকুট লিখে খাবার টেবিলের উপর মোবাইলটা চাপা দিয়ে দেয়।

স্পন্দন নার্সিং হোমের সামনে গিয়ে অন্তু যখন দাঁড়ায় তখন ঘড়ির কাঁটা পৌনে-পাঁচের ঘরে। রাজার মাকে সাতকাণ্ড রামায়ণ শোনাতে গিয়েই এত দেরি। ‘কে ভত্তি ?’ ‘ওমা তাই ?’ ‘তা কখন হৈল ?’ ‘কী কইরে?’ ‘না দেইক্যে সাইক্যেল চালাচ্চ্যিল নাকি ?’ ‘টাকের ড্রাইভার কি মদ খায়্যে ছিল ?’ ‘তা ভত্তি কুতায় কইর‍্যেছে?’ প্রশ্নের মেশিনগান রেডি করেই বসেছিলেন মনে হয়। একটা উত্তর দেওয়ার আগেই দুটো প্রশ্ন।

নার্সিং হোমের বাইরে যেমন ভিড় ভেতরেও তেমন। আরেকবার শিল্পীর মোবাইলে কল করে অন্তু। এবার সুইচ অফ। অন্তু চারদিকটা ভাল করে তাকিয়ে দেখে পরিচিত কেউ আছে কি না। কাউকে দেখতে না পেয়ে অনুসন্ধানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা শান্তনু ব্যানার্জ্জী কত নম্বর রুমে আছে ?’

‘শান্তনুউউউ… ব্যানার্জ্জী , হাঁ ১২১ নং রুম। তিন তলায় উঠে ডান দিকে।’ মিষ্টি দেখতে মেয়েটি মিষ্টি ভাবেই উত্তর দিল অন্তুকে। অন্তু ততোধিক মিষ্টি সুরে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে ছুটল উপরে।

       ১২১ নং রুমের সামনে এসে অন্তু দেখে রুমের দরজা খোলা। ভেতরে শিল্পীর মা একা বসে আছে। যে বেডে শান্তনুর থাকার কথা সেটা শূন্য। শিল্পীও নেই রুমের ভেতর। দরজার বাইরে জুতা খুলে ভেতরে ঢোকে অন্তু। শিল্পীর মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখন শান্তনু কেমন আছে কাকিমা ?’

‘ক্যে ?’ পিছন ঘুরে অন্তুকে দেখে বলে, ‘ও তুই আইচিস। আমি ভাইবলম…। এখনো-আইসি-ইউ থেকে ছাড়্যে নাই। বইল্যেচে বাহাত্তর ঘণ্টা পার না হৈলে কিচুই বলা সম্বব হবে নাই।’

‘চিন্তা করো না কাকিমা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘কী কইর‍্যে যে কী হব্যেক সেটাই তো বুইজত্যে পাচ্চি নাই। হ্যাঁরে বাবা শানু ভাল হব্যেক ত ?’

‘কেন হবে না, নিশ্চয় হবে।’

‘কাইল ভাত খায়্যে ক্যেন্যে যে আবার বের‍্যাইল… কপাল কপাল। কিন্তু আমি ত কারুর কনদিন খতি করি নাই তাহল্যে শানুটার এমন ক্যেন্যে হৈল ?’ বলে নিজের কপাল চাপড়ায় শিল্পীর মা। অন্তু পাশে এসে বসে। বাঁহাতটা শক্ত করে ধরে বলে, ‘এখন আপনাকে শক্ত হতে হবে কাকিমা। এখন এমন করলে চলে ? সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘ডাক্তার বইল্যেচে মাথায় চোট লাইগ্যেছে…’

‘ও কিছু না অল্প আঘাত লেগেছে হয়তো, আপনি চিন্তা করবেন না…’ অন্তুর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে। আবার সেই নম্বরটা। ফোনটা কেটে সুইচ অফ করে দেয় অন্তু। ‘আচ্ছা শিল্পী কোথায় ? ওকি বাড়ি গেছে ?’

‘না না খাবার আইনত্যে গেচ্যে। সারাদিন কিচুই খায় নাই।’

‘আচ্ছা আপনি বসুন আমি এখুনি আসছি। আর হাঁ চিন্তা বাঁ কান্নাকাটি একদম করবেন না। তখন আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসে অন্তু। নীচে নেমে নার্সিং হোমের বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরায়। শিল্পীর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত শান্তনুর ব্যপারে কিছুই জানা সম্ভব নয়।

       খানিকক্ষণ এদিক সেদিক খোঁজার পর শিল্পীকে দেখতে পায় অন্তু। নার্সিং হোম থেকে অল্পদূরের ছোট্ট একটা কালী মন্দিরের সামনে জোড়হাতে বসে রয়েছে শিল্পী। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় অন্তু। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকে, ‘শিল্পী এই শিল্পী ?’

মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে শিল্পী জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কখন এলে ?’

‘এই তো কিছুক্ষণ হল।’ অন্তু শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে এখনো মুখে কিছু দেয়নি ও। একদিনে চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। ওকে যে কী বলে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারে না অন্তু। পাশে থাকার অনুভবটুকু জানাতে নীরবে একটা হাত ধরে। কারু মুখে কোনও কথা নেই। অন্তুর চোখ ঝাপসা। শিল্পীর চোখে জোয়ার আসছে।

       একটা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। অন্তু জিজ্ঞেস করে, ‘মাছভাত হবে ?’

‘না বাবু এই অবেলায়… কিন্তু বলেন তো রুটি তড়কা কিংবা ডিমের অমলেট বানিয়ে দিতে পারি।’ দোকানের কর্মচারী জানায়।

‘আমার খিদে নেই। কিছু খেলেই বমি হয়ে যাবে। তুমি কিছু খাবে তো খাও।’ শিল্পী বলে।

‘বমি হবে না। কিছু না খেলে শরীর খারাপ করবে।’

‘সত্যিই আমি কিছুই খেতে পারব না…’

‘প্লিজ শিল্পী…’ অন্তুর গলাটা ভারী হয়ে আসে। শিল্পী কিছু বলে না আর। অন্তুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।

       খাবার টেবিলে পাশাপাশি বসে শিল্পীকে নিজের হাতেই খায়িয়ে দেয় অন্তু। ডিমের অমলেট দিয়েই দুটো রুটি খায় শিল্পী। একটা রুটি অন্তুকেও খেতে হয়।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোগুলো জ্বলছে এখন। নার্সিং হোমের সামনের তেতুল গাছটার মাথায় জোনাকির ভিড়। চারদিক জুড়ে ওষুধের উগ্রগন্ধ ছড়িয়ে আছে। শিল্পীর হাত ধরেই নার্সিং হোম পেরিয়ে হাঁটতে থাকে অন্তু। ভ্যাপসা গরমে সন্ধার বাতাসটা বেশ ভাল লাগছে এখন।

‘তোর মায়ের কাছে শুনলাম শান্তনুর মাথায় লেগেছে। কিন্তু ডাক্তার ঠিক কী বলছে বল তো ?’

‘মাথায় তো লেগেইছে কিন্তু…’ বলে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে শিল্পী। যেন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না কিছুতেই।

‘কিন্তু কী ?’

‘সমস্যা মাথা নিয়ে নয়।’

‘তাহলে ?’ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘ট্রাকের চাকায় দাদার ডান পা-টাই গুড়িয়ে গেছে। বাদ দিতে হয়েছে হাঁটুর উপর পর্যন্ত।’

‘হোয়াট ?

‘শুধু তাই নয় সাইকেলের ডান দিকের ব্রেকটা পেটে ঢুকেছিল বাজে ভাবে। প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গেছে। রক্ত দিতেও হয়েছে প্রচুর। এখন ঈশ্বর ছাড়া…’ কাঁদতে গিয়েও কান্নাটাকে কোনও রকমে গিলে নেওয়ার চেষ্টা করে শিল্পী। কান্নাটা মাছের কাটার মতো গলায় বিঁধে থাকে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে, ‘ফুটবল খেলার ভয়ংকর নেশার জন্য মা খুব বকাবকি করত দাদাকে জানো… দাদা বেঁচে বাড়ি ফিরলেও আর কোনওদিন…। আচ্ছা মা নিজেকে নিজের কাছে কী জবাব দেবে ? মায়ের তো কোনও দোষ ছিল না। মা তো দাদার ভালই চেয়ে এসেছে।’

‘এমন ভাবে কেন ভাবছিস। এমন ভেবে মিছিমিছি কষ্ট পাচ্ছিস।’

“কদিন আগেই মা দাদাকে বলেছিল, ‘সারাদিন ফুটবল আর ফুটবল তুই পা ভাইঙ্গে বাড়িত্যেই পইড়্যে থ্যাইকল্যে আমার বুক জুড়ায়’ দাদা সেদিন ‘তথাস্তু’ বলে বেরিয়ে গিয়েছিল জানো। আজকে দেখো…’ ওড়নার চোখের জল মোছে শিল্পী।

‘লক্ষ্মীটি কাঁদিস না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’

       শিল্পী জানে অন্তুর শুকনো সান্ত্বনাতে কিছুই ঠিক হবে না। তাই কিছু না বলে চুপ করে যায়। অন্ধকার নেমে আসছে চোখের পাতায়। ফুটপাতে। এবার ওদেরকে নার্সিং হোমে ফিরতে হবে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই চলে এসেছে ওরা।

। ১৫।

এখন নদীটার গতিতে কোনও সুর নেই। যাবতীয় সুর লেগে আছে শালগাছের মাথায় বসে থাকা টিয়া পাখিগুলোর ঠোঁটে। গাছের কোটরে ছানাপোনা নিয়ে ওদের সংসার। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মহিম তাকিয়ে ছিল উঁচু শালগাছটার দিকে। টিয়াগুলো জটলা পাকিয়ে কিছু একটা আলোচনা করছে বলে মনে হয় মহিমের। ওদের দিকে তাকিয়েই মহিম বিড়বিড় করে বলে, ‘শালা কাহুক্যে বিশ্বাইস কল্ল্যেই বাঁশ। পরান খুড়া… !’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিম। তারপর আবার বলে, ‘পার‍্যে পার‍্যে মানুইষ সব পার‍্যে। না পাল্ল্যেই বিপদ।’

‘কিন্তু আমি আর পাইরব নাই। ইবার যা বিপদ হবার হক।’

‘আমি উ পারাটার কতা বলচি নাই ত…’

‘তবে কন পারাটার কতা বলচিস ?’

‘আমি বলচি আইজক্যের দিনে মন্দর সাতে মন্দ না হল্যেই বিপদ। তর মত বিধবা মেয়্যার ত না দিয়ে উপায় নাই। কাকে আটকাবি… ?’ নিজেকেই প্রশ্ন করার ভঙ্গি করে মহিম ‘…একলোক ওঝা-কৈবর‍্যাজ আরেক লোক গাঁমের মেম্বার।’

‘আর লয়। অনেক হইচ্যে, অনেক। আইজ সকালে তপনা আইচিল, বিষদাঁত ভাইঙ্যে দিয়্যেছি। নেনা নাই সাপের কুলার পারা ফেনা। আমি কার সাতে শুব সেটা কি ওই আঁটকুড়ার বেটা গুল্যাইন ঠিক কইরব্যেক ? ইবার আসুক ত… কাইট্যে হাতে ধরাই দিব।

‘তর যদি এতই মুরাদ তাহৈল্যে এতদিন দিলি ক্যেন্যে ?

‘বুকে বল পাব্যার লাইগ্যে পাশে ত একটা মরদ লাগে, নইল্যে কার ভরসাট্যায় দাঁড়াব ? হয় ডাইনি বইল্যে গাঁছাড়া কইরব্যেক নাহৈল্যে বেশ্যা বইল্যে তাড়াব্যেক। আমার কতা শুনার লোক কুতায় ?’

‘ক্যনে তোর তপনা ছিল যে ?’ চিমটি কাটে মহিম।

‘উটা ত মাগীর অধম। যে খাচ্চ্যে খাক উয়ার তাতে কিছুই নাই, উ নিজে পাল্যেই হৈল। শালা হারামি সব জান্যেও এমন ভাব দেক্যাইত যেমন কিচুই জানে নাই। খালভরা কুতাকার…’

‘থাক মন্দিরে বইস্যে আর মুকখালি কৈত্ত্যে হব্যেক নাই।

‘আচ্ছা তুই একটা কতার উত্তর দিবি ?’ মহিমের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

খানিকটা হকচকিয়ে মহিম বলে, ‘বল কী বলবি ?’

‘তুই কি শাঙা করবি আমাক্যে ?’ মহিম উত্তর দিতে সময় নিলে কাবেরী আবার বলে, ‘মা হবার কতা বলছিলি যে?’ সাবলীল ভাবেই জিজ্ঞেস করে কাবেরী।   

মহিমের মুখটা ফিউজ বাল্বের মতো দুম করে অন্ধকার হয়ে পড়ে। কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না। সত্যিই তো কী উত্তর দেবে ও ? বাড়িতে ভাদু মৃত্যুর দিন গুনছে। এমন সময় এই প্রশ্নের কী উত্তর হতে পারে মহিমের জানা নেই। কিন্তু ও নিজেই তো ভোরেরবেলা কাবেরীকে মাতৃত্বের মন্ত্র শুনিয়েছিল। শালগাছের ফাঁকে ফাঁকে উত্তর খুঁজতে থাকে মহিম। অঙ্গুল দিয়ে শক্ত মাটিতে আঁচড় কাটে।

‘চুপ কইর‍্যে রইলি যে ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

‘না মানে ভাদু…’

‘তোর বউকে লিইয়্যে আমার কনু সমুস্যা নাই। তর বিটিকে নিজের ভাইবত্যেও সমুস্যা নাই। ইবার তর কী সমুস্যা বল?’

‘সমুস্যা কিচু নাই। কিন্তু ভাদু যৎদিন আছে তৎদিন আমি পাইরব নাই।’

‘সেটা ত আমি বলচি নাই। উ অধম্মের কতা আমি ভাবিও নাই। কিন্তু তর বউ যদি সার‍্যেও যায় তাতেও আমার সমুস্যা নাই, ইটাই বলচি।’

‘ই-রোগটা সারার রোগ লয়। ইটা মরার রোগ। তাও যৎদিন বাঁচে…’ মহিমের গলাটা ভারী হয়ে আসে। জিবের আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিতে একটা বিড়ি ধরায়। উড়োস্মৃতিগুলো চোখের পাতায় ভিড় করে আসে। কত চেনা চেনা ছবি চেনা কথা। আর নিজেকে সামলাতে পারে না মহিম। দুচোখ বেয়ে স্মৃতি গড়িয়ে পড়তে থাকে। ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে কাবেরীও নিজের কান্নাটাকে আগলে রাখে। শক্ত করে মহিমের হাতটা ধরে বলে, ‘আর আগ্যের পারা ঝুমুর গাইস না?’

‘না…’ বিড়ির ধোঁয়ায় মিশে মহিমের মুখের বাতাসে ‘না’ শব্দটা বেরিয়ে আসে।

‘তুই ঝুমুর গাবার সমুয় কাঁদতিস মনে আচে ?’

‘কাইদঁতম নাই আপনি চোক ভিজত। এই ত আবার কদিন বাদেই মেলা। ইবছর শুনছি ঝুমুরের বদলি রসের গান হব্যেক। বিজয় পাল না কে আইসব্যেক বইলছিল।’

‘ঝুমুর হব্যেক নাই ইবার ?’ কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না কাবেরীর। বড়বড় চোখে প্রশ্ন এঁকে তাকায় মহিমের দিকে।

‘সেটায় ত শুইনলম। আইজ-কাইলকার ছেল্যা-ছকরা উসব ঝুমুর-টুমুর শুইনব্যেক নাই। কে লিবি আমার পাকা পাকা আম, আমার গাড়ির টেঙ্কিতে পাইপ ঢুক্যাই ভইর‍্যে দিলি তেল…’

মহিমকে আটকে দিয়ে কাবেরী বলে, ‘ইগুল্যাইন গান ? শুইনল্যেই মনে হয়…’ কথাটা শেষ করে না কাবেরী, মুখের ভেতর একদলা থুতু পাকিয়ে সশব্দে সেটা ছুঁড়ে রাগ প্রকাশ করে।

‘উদিন বাউল দেইকত্যে কজন গ্যেইছিল ?’ বুড়ো আঙুল নাড়ে মহিম, ‘সব আপন আপন ধান্দায়।’

‘আমি কিন্তুক বাউল শুনার লাগ্যেই তপনাকে লিয়ে গ্যেইছলম…’

‘আমি তর কতা ত বলচি নাই…’

‘না আমি এমনি বলচি, আমার বাউল ঝুমুর ইসব ছোটর থেক্যেই ভাল্ল্যাগে।’

বিড়িতে শেষ টান দিয়ে মহিম গেয়ে উঠে,-

‘সকাল থেইক্যা টিপিক টিপিক পড়ছ্যে মেঘের জল

ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে

এখন বনের ধার ফাঁকা আচে

টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।

এই চৈত্ত মাসের ভ্যাপসা হাওয়া

ওই ডেবকা চৈখ্যের ফুড়ুৎ চাওয়া

গরমে থাকি কেমন্যে বল ?

ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে

এখন বনের ধার ফাঁকা আচে

টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।

আইজ্যেই আইসব্যেক বিটি জামাই

কাইল আইসব্যেক শাউড়ি শ্বশুর

এই পরবের কটাদিন কুতায় শুবি বল ?

তাই ত বলি…

ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে

এখন বনের ধার ফাঁকা আচে

টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।’

গানটা শেষ হলে উঠে দাঁড়ায় মহিম। উদাসীন ভাবে তাকায় আধমরা নদীটার দিকে। এই নদীর চরে বসে একদিন একলা একলাই গান বাঁধত মহিম। সুর দিত নিজের খেয়াল-খুশি মতো। এখন পাতা হলুদ হয়েছে বলেই গাছ থেকে ঝরে পড়েছে, সবুজ স্মৃতি মনে করা ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই নেই তার। গুমোট গরমে যখন ঘুম আসত না ? ঘরের থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে উঠোনে খাট পেতে আপন মনে সুর তুলত মহিম। ঘুম ভাঙা চোখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ভাদু তাকিয়ে থাকত ওর দিকে। মহিম দেখেও দেখতে পেত না। ও গেয়ে যেত। বাড়ির বাইরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার থেকে ডাহুক কিংবা পিউকাঁহা মাঝে মাঝেই সুর মেলাত মহিমের সুরে। এখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে। টিয়াগুলো উড়ে গেছে একটু আগেই।

‘কী ভাবিস ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

চমক ভাঙে মহিমের। স্মৃতির বারান্দা থেকে এক ঝটকায় ফিরে আসে নদীর পারে। বলে, ‘কিচুই ভাবি নাই। গান গাইল্যে সেই সব দিন গুল্যাইন মনে পড়ে। কষ্ট হয়। কান্না পায়…’ আবার গলাটা ভারী হয়ে আসে মহিমের। একটা অপঠিত দগদগে লু বইছে বুকের ভেতর। স্মৃতির ছেঁড়া-ফাটা টুকরোগুলো ঘুরছে বনবন করে।

‘তুই ভাদুকে দমে ভালবাসিস বল ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

‘অমন মেয়্যাকে ভাল না বাইস্যে কি থাকা যায়। ভাদু ভালবাইসত্যেও জানে বাসাত্যেও জানে।’

‘তর কপ্যালটা ভাল বঠে অমন বউ পাইছিলি। গামের বাকি বউগুল্যাইন ত…’

‘কপ্যালটা আর কুতায় ভাল বঠে ? কপাল ভাল হৈল্যে কি আর অমন রোগট্যায় উয়াকে ধরে ?

‘উগুল্যাইনে ত কারুর হাতের নাই। কী আর করবি। তর ত তাও মনে করার মত কিচু আচে। আমার উটুকুও ত নাই। জীবনের পুরাট্যাই খালি। বাপটাও পুরা মাতাল ছিল, ভাতারটাও তাই। না হৈল ছেল্যা-মেয়্যা না হৈল সংসার। অন্য মিয়্যা হৈল্যে কবেই গলায় দড়ি দিত। আমি বইল্যে শরীদ দিয়্যে দিয়্যে এখনো…’ কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরে কাবেরী। তবুও কান্নাটাকে চাপা দিতে পারে না। নিজেকে সামলানোর জন্য কিছুটা সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মহিমের হাতটা ধরে নদীটার দিকে কিছুটা এগিয়ে আসে। নদীর চরেও গরম হলকা বইছে এখন। কাবেরীর ব্লাউজের বগলদুটো ঘামে আগেই ভিজেছে। বুক-পিঠ ভিজছে এখন। কাবেরীর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে লুঙ্গিটাকে হাঁটুর উপর গুটিয়ে পরে মহিম। নদীর পারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা বড় শালগাছটার নীচে এসে দাঁড়ায় দুজনে। এখান থেকে দুটো গ্রামের কোনটাকেই ভালভাবে দেখা যায় না। পলাশ জঙ্গলে আড়াল হয়ে পড়ে নদীর দুপারের দুটো গ্রাম।

‘তর ভাত হৈয়্যে গ্যেচে ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘না। আজ ভোগ নাই। একবারেই সন্দ্যাবেলায় খাব।’

‘ক্যেন্যে ভোগ নাই ক্যেন্যে ? সারাদিন না খাইল্যে শরীদের কিচুই থাইকব্যেক নাই।’

‘না থাইকল্যেই ত ভাল। শিয়াল কুকুরে খাউয়া শরীদ থাক্যেই যে কী হব্যেক। একন মনে হয় উ না মইর‍্যে আমি মল্ল্যেই হায় হৈত।’

‘মরা বাঁচাটা কারুর হাতে লয়রে…

‘আমি মইরব বইল্যে আইস্যে ছিলম পুয়াল দড়ি হাতে

আমি মইরব বইল্যে আইস্যে ছিলম ঘুইটঘুইট্যা রাইত্যে

একন গাছের উপর উইঠ্যে দেখি জনাক পকা জ্বলে

মরার গান গায়না পকা, আশার পদীপ জ্বালে।’

‘পুরা গানটা মনে নাই তর ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

‘ধুর, ইগুলা সেই কতকাল আগুকার বাঁধান গান। এদ্দিন পর কী উসব আর মনে থাকে। তকন গাইতম, একটা লাইন গাইল্যেই আরেকটা লাইন নিজের থেইক্যে মনে আইসত।’

‘আমার তকন লতুন বিহাঁ হৈচে যকন তর এই গানটা শুইন্যেছিলম। দুইট্যা লাইন একনো মনে আচে আমার।’

‘কন লাইন দুইট্যা ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘ওই যে,

যারা বাঁচার লাইগ্যে ঘুইর‍্যে মরে স্বপন লিয়ে হাতে

কবেই তারা মইর‍্যে ভূত ঘুইটঘুইট্যা রাইত্যে লো মিশমিইশ্যা রাইত্যে।’

‘শেষের লাইন দুইট্যা এমন পার‍্যাই ছিল মনে হয়।’ মহিম মনে করার চেষ্টা করে। গানের কয়েকটা লাইন নিজের মনে বিড়বিড় করে আবার। ঠিকঠাক মনে পড়ে না।

‘এই লাইন দুইট্যাই ছিল…’                                                                   

‘হব্যেক হয়ত। তবে তর মনে আচে দেইখ্যে অবাক লাইগচ্যে।’

‘ইটাতে অবাক হবার কিচুই নাই। মনে ধইর‍্যেছিল তাই মনে আচে…’

‘একবার ঝুমুইর দলে আমাকে লিতে চাইয়্যেছিল, বইল্যেছিল থাকা খাওয়া সব দিব…’

‘ক্যেন্যে তুই ত গ্যেইচলি ?’ গলায় প্রশ্ন মাখিয়ে কথাটা বলে কাবেরী।

‘উটাকে কি আর যাওয়া বলে, একটা পালাত্যেও ত যাই নাই। তিন রাইত ছিলম এই যা।

‘তা পলাই আইছিলি ক্যেন্যে ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

‘সাদে কি আর আইচিলম। উয়াদের জীবনের কুনুই ঠিক ছিল নাই। কুনটা যে কার বউ কার বিটি বুজা ভার। যে যার সাতে পাইচ্চ্যে খাইচ্চ্যে যার সাতে পাইচ্চ্যে শুইচ্চ্যে। আসলে কী বলত, উটা ঝুমুইরের দল ছিলই নাই। উটা একটা ভবঘুইর‍্যা দলছিল। যারা ঝুমুইর গায় উয়াদের ঘর-দুয়ার-সংসার সবেই থাকে।বাউল হৈল্যে না হয় আলাদা কতাছিল।

‘কিন্তু উয়ারা ত আমাদের গাঁয়ে তিনদিন ধইর‍্যে ঝুমুইর গাইয়্যেছিল।’

‘ঝুমুইর ত গাইত কিন্তু উয়াদের…। মেয়্যাগুল্যাইন শরীদের ব্যবসা কইত্ত জানিস ?’

‘ইটা কিন্তু আমার মনে হৈইচিল। আমি একদিন রাত্যের বেলায় একটা বউকে সত্যবানের ঘরে ঢুইকত্যে দেইখ্যে ছিলম।’

‘শুদু সত্যবান লয় যে পাইর‍্যেচে কইর‍্যেচে। মুখোইশ পরা ভদ্দরলোক ত গাঁয়ে কম নাই। দিনের বেলিতে নিজের বউ এর সাতে শুত্যেও লজজ্যা লাগে রাত্যের বেলিতে পরের বউ ধইর‍্যে ঘুরে। এই ত আমাক্যেই দেক নিজের বউ ঘরে কোঁকাচ্চ্যে আমি ইদিকে তর সাতে ফুত্তি মাচ্চি। তাও দিনের বেলিতে।’

কাবেরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলে না। হয়তো নিজের ভেতর ডুব দিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। নয়তো পরিবেশটাকে সরল করতে সময় নেয়। কাবেরীকে চুপ থাকতে দেখে মহিম আবার বলে, ‘সব শালাই হারামি। সুযোগ পাল্যেই…’

মহিমকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে কাবেরী বলে, ‘মেয়্যা-বউগুল্যা যদি পাত্যে বইস্যে থাকে তাতে মরদের আর কী দোষ ? দিচ্চ্যে বল্যেই লিচ্চ্যে। আমি দিচ্চি বল্যেই…’

‘আমাকে বাদে তুই যাদেরকে দিয়্যেচিস উয়াদেরকে না দিয়্যেও তর উপায় ছিল নাই। ইদিকে তপনা তর সাতে শুচ্চ্যে উদিকে কাত্তিক তপনার বউ এর সাতে।’

‘বিটির সাতেও।’

‘উটা আমি জানিনাই। ওই বলে নাই, কন শালিকে বলবি ভাল ? বেগুন লিয়ে হাইগত্যে গেল। যাদেরকে বেশি ভাল ভাব্বি তারাই দেকবি বেশি ঢ্যামনা। শালা পরান খুড়া…’

‘তুই গাইদ্যে সাদাসিধ্যা বঠিস মাইরি…’

‘ক্যেন্যে ?’

‘না, বইল্ল্যে তর আবার রাগ হব্যেক। ওই পরাইন্যা মাম্যেগুয়া আমাকে নিজে বইল্যেচে…’

‘কী বইল্যেচে ?’

‘আগুতে বল মাতা গরম করবি নাই ?’ ভয়ে ভয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

‘ফেচ্যের ফেচ্যের না কইর‍্যে কী বলবি বল…’

‘আমাকে একদিন বইল্যেছিল ভাদিকে দেকল্যেই আমার ইয়াটা টনটনায় সেই লাগ্যেই বারবার উয়াদের ঘর যাই…, মাগীকে খাবই বতরে পাল্যে। তর বউ এর রোগ না হৈল্যে পরাইন্যা…’ কাবেরীকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই গলাটা চেপে ধরে মহিম। খকখক করতে করতে কয়েকপা ছিটকে যায় কাবেরী। প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে হাতের শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে মহিমের। গশগশ করছে চোখদুটো।

নিজেকে সামলে নিয়ে কাবেরী বলে, ‘আমাকে রাগ দেক্যাই কিচুই হব্যেক নাই। তর পিরিতের ওই পরান খুড়াই নামুপাড়ার লালচাঁদের বউটারও প্যেট কইর‍্যেছিল। শালা সবাই সব জানে শুদু তুই জানিস নাই। তুই কানা বঠিস তাই যারা তর পঁদে বাঁশ দিচ্চ্যে তুই তাদের ইয়াত্যেই ত্যেল দিচ্চিস।’

       মহিম আর একটাও কথা বলে না। হাতদুটোকে মুঠো করে নদীটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরব নদীর পাড়ে ওর গসগসে নিশ্বাসগুলো ছুটে বেড়ায়।

।১৬।

এই কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার ওই অপিরিচিত নম্বরটা থেকে কল এসেছে। নম্বরটা রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দেওয়ার পরেও অন্তু নিজের কৌতূহলটা দমিয়ে রাখতে পারেনি। মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘নাম না বললে কল করবেন না প্লিজ।’ ‘কথা বলার না থাকলে কল করবেন না প্লিজ।’ কিছুতেই কিছু হয়নি। এখনো নম্বরটা স্ক্রিনে ভেসেই মিলিয়ে যায়। কোনও সাড়াশব্দ হয় না। অন্তু বুঝতে পারে কলার কল করার চেষ্টা করেই চলেছে। কে হতে পারে ভাবতে গিয়ে অনেকের কথা মনে এসেছে, কিন্তু কলারকে সঠিক চিহ্নিতকরণ করতে এখনো পারেনি ও। একহাতে চা এর কাপ নিয়ে আরেক হাতে মোবাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতে মনের ভেতরকার মরচে পড়া মুখগুলোকে হাতড়াচ্ছিল অন্তু। কিছুক্ষণ আগেই ছুটি দিয়েছে স্টুডেন্টদেরকে। এই অচেনা নম্বরটার জ্বালায় স্টুডেন্টদের প্রতিও মন দিতে পারছিল না কদিন থেকেই।

‘কে ? কে হতে পারে ? তিতলি ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। মনের স্ক্রিনে তিতলির মুখটা ভেসে উঠে। সেইসব দিনের ছবিগুলো ভেসে উঠে। মাথাটাকে বেশ কয়েকবার ঝাঁকিয়ে নিজেকে বাস্তবে ফেরায় অন্তু। অতীত সাগরে ডুব দিয়ে দিয়ে বিষ পান করতে আজ আর ওর ভাললাগে না। অতীতনগর থেকে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই তো পাবারও নেই। এদিকে বর্তমানটাও জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। নার্সিং হোমে দাদাকে নিয়ে ছটফট করছে শিল্পী। সময়ে না খাওয়া না ঘুমের ছাপ পড়েছে ওর চোখেমুখে।

‘খাবার ঢাক দিয়া রইল, সমুয়ে খায়্যে লিবি…’ বলে বেরিয়ে যায় অন্তুর মা। সেন্টারের সময় হয়ে গেছে। রোজ আড়াই তিন কিমি পথ হেঁটেই যাওয়া আসা করতে হয়। তাই সকালের খাবার বানিয়েই ওর মা রোজ বেরিয়ে পড়ে। তারপর সেন্টার থেকে ফিরে দুপুরের খাবার বানায়। কোনও কোনও দিন খাবার বানাতে অবেলা হয়ে যায়।

চা এর কাপটা নামিয়ে মোবাইলটা চেয়ারের উপর রেখে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কুয়োর পাড় থেকে জলের বালতিটা নিয়ে ফুলের গাছগুলোতে জল দেয়। পিতৃরক্ত থেকেই এটুকু পাওয়া। জল দিতে দিতে উঠোনের কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে মাধবীলতা গাছটার দিকে। এই কদিন আগেই লাগিয়েছে নতুন চারাটা। এরমধ্যেই মাথা তুলে পেয়ারা গাছটাকে জড়িয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে। অকারণে মায়ের মুখটা ভেসে উঠে চোখের পাতায়। এই বয়েসেও মাকে ছাড়া ওর দিন চলে না। টিউশন পড়িয়ে যে কটা টাকা আসে তার প্রায় পুরোটাই খরচ হয় সিগারেট আর শিল্পীর পিছনে। শিল্পীর পিছনে বলতে শিল্পীকে টাকা দেওয়া বা শিল্পীর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়ে দামি খাবার খাওয়া নয়। এ খরচ ওর কোনওদিনই নেই। খরচ হয় মোবাইলে ব্যালেন্স ভরে। রিলায়েন্স সি-ডি-এমে তেও ফ্রি করাতে একশ নিরানব্বই টাকা লাগে। ভোডাফোন ইন্টারনেটে দু’শ একান্ন। এখন আর টু’জি কাজ করে না। বাধ্য হয়েই থ্রি’জি রিচার্জ করতে হয়। এর উপর পার্কের টিকিট। বেড়াতে গেলে গাড়ি ভাড়া। সিগারেট। টাকা আর থাকে কোথায়। আর চাকরি ? সে কথা না বলাই ভাল। এখনকার দিনে চাকরি পেতে হলে টেবিলের তলা দিয়ে গলতে হয়। একহাতে দাও আরেক হাতে নাও। নেতা মন্ত্রিদেরেই বা দোষ কী ? ভোটে জেতার আগে কেঁচোর মতো মাটি গিলেছে। ভোটে জিতলে জোঁকের মতো রক্ত চুষবে এটাই তো স্বাভাবিক। একটা সময় পর্যন্ত মাস্টারি করার স্বপ্ন অন্তুও দেখত। এখন সেই স্বপ্নগুলোও শুকিয়ে গেছে।

জলের বালতিটাকে কুয়োর পাড়ে রেখে চেয়ার থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে শিল্পীকে একটা কল করে অন্তু।

‘হ্যাঁ বলো।’ ওপার থেকে সাড়া দেয় শিল্পী।

‘শানু কেমন আছে এখন ?’

‘দাদা আজকে অনেকটাই ভাল আছে। খাবার খেয়েছে আজকে।’

‘কী খাবার ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘জলে ভেজানো বিস্কুট। ডাক্তার বলেছে দুপুরে ভাত খাওয়াতে।’

‘স্যালাইন চলছে ?’

‘হ্যাঁ ওটা আজ-কাল দুদিন চলবে বলেছে।’

‘ছুটি কবে দেবে কিছু বলেছে ?’

‘পরশু।’

‘তাহলে তো ভালই। দেখি যদি পারি আজকে বিকেলে একবার যাব ভাবছি।’

‘না না আজকে নয় এলে কালকে এসো।’

‘কেন কালকে কেন ?’

‘কালকে সকালে মা একবার বাড়ি যাবে। ছুটির দরখাস্তটাও তো করার সময় পায়নি। মা না থাকলে একা একা আমার একটু নার্ভাস লাগবে। তাই তুমি এলে ভাল হয়, এই আরকি।’

‘ও আচ্ছা। তবে তাই যাব। আর হ্যাঁ তোর মা আর কান্নাকাটি করেনি তো ?’

‘করেনি আবার ? সুযোগ পেলেই কাঁদছে। মা দাদাকে কী সামলাবে দাদাই মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। একটা ভাল খবর আছে…’

‘কী খবর ?’

‘আগে বলো কী খাওয়াবে ?’

‘আগে খবরটা তো শুনি।’

‘না আগে বলো কী খাওয়াবে তবেই বলব।’

‘আচ্ছা পাঁচটা চুমু খাওয়াব।’

‘ধুর… তোমার সবেতেই ইয়ার্কি। চকোবার খাওয়াবে ? তবে বলব।’

‘আচ্ছা খাওয়াব বল।’

‘কবিতা কলম পত্রিকায় আমার কবিতা বেরিয়েছে।’

‘তাই ?’ অন্তুর চোখমুখ আনন্দে চকচক করে উঠে।

‘ইয়েস।’

‘কোন কবিতাটা ? কে জানালো তোকে ?’

‘ওদের দপ্তর থেকে কল করেছিল। বলল পত্রিকা আর সাম্মানিক পাঠাবে। কবিতাটা তোমাকে ফেসবুকে দিয়েছি।’

‘সাম্মানিক কত দেবে কিছু বলেছে ?’

‘না না ওসব কিছু বলেনি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে জানো ?’

‘হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহলে জাতে উঠে গেলি বল ?’

‘ধুর তুমিও না…’

‘নারে পত্রিকাটা শুনেছি আজেবাজে লেখা ছাপে না…’ পত্রিকাটার নামেই শুনেনি অন্তু তবুও শিল্পীর খুশিতে মিথ্যে কথাটা বলতে কোথাও আটকায় না ওর। ‘আচ্ছা বিবড়দায় পাবো পত্রিকাটা ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘হ্যাঁ মাধবী বুকস্টলে পাবে।’

‘তাহলে বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসব…’

‘এই এখন রাখছি। ডাক্তার রাউন্ডে আসছেন। পরে কথা হবে, বাই…’ ফোনটা কেটে দেয় শিল্পী।

       অন্তু মোবাইলটা পকেটে রাখতে গিয়ে খেয়াল করে অপরিচিত সেই নম্বরটা থেকে দুটো মিসকল এসেছে। রিজেক্ট লিস্টে ফেলা আছে বলে কোনও সাড়াশব্দ হয়নি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা আবার চেয়ারের উপর নামিয়ে দিয়েই ঘরে ঢোকে অন্তু। ঢাকা দেওয়া খাবারের থালাটা হাতে তুলে নেয়। গুড়-পরোটা আর আলুভাজা করে দিয়ে গেছে ওর মা। অন্তুর চিরদিনের পছন্দের খাবার। পরোটার টুকরোর ভেতর গুড় ঢুকিয়ে সেটায় কামড় দিতে গিয়েও অপরিচিত নম্বরটা সম্পর্কে ভাবতে থাকে ও। একবার ভেবেছিল শিল্পীকে কথাটা বলবে, কিন্তু পারেনি। আসলে শান্তনুর এমন অবস্থায় শিল্পীকে আর চাপ দিতে ইচ্ছে করেনি। খাবারের থালাটা নামিয়ে রেখে উঠোনে এসে চেয়ার থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়েই নম্বরটায় কল করে অন্তু।

কলারটোন বাজছে, ‘একদিন আপ মুঝে মিল যায়েঙ্গে, ফুল হি ফুল…’ কদিন আগেও কোনও কলারটোন ছিল না। নতুন নিয়েছে মনে হয়। গানটা বেশ কিছুক্ষণ বাজার পর রিসিভ হয় কলটা। ওপারের মানুষটি হয়তো চাইছিল অন্তু গানটা শুনুক। গানটা শোনার পর অন্তুর সন্দেহটাও দ্বিগুণ মজবুত হয়। ওপারে ফোনটা ধরতে না ধরতেই অন্তু বলল, ‘তিতলি এসব করেও আর কিছুই হবে না। তুমি যদি মনে করো আবার সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে তাহলে ভুল ভাবছ কিন্তু…’

ওপার থেকে এবারেও কোনও সাড়াশব্দ নেই। হয়তো দীর্ঘশ্বাস পড়ছে। হয়তো কান্নার আওয়াজ। হ্যাঁ কান্নাই হবে হয়তো। আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।

       জলখাবার খেয়ে অন্তু খামারবাড়ির দিকে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নদীটার দিকে তাকিয়ে দেখে। নদীপাড়ের শালগাছগুলো চোখে পড়ে। শাল-পলাশ গাছগুলো সবুজ হচ্ছে নতুন পাতার আনন্দে। আরও কিছুটা এগিয়ে আসে অন্তু। এবার চোখে পড়ে বেশ কিছু লোক ত্রিপল টাঙাচ্ছে। তারমানে দুএকদিনেই সংক্রান্তি। শিবের গাজন। নীলপূজা। চড়ক। অন্তুর দুচোখে অনন্দের ঢেউ খেলে যায়। দিনটার কথা মনেই ছিল না। মুহূর্তে সেই অচেনা নম্বরটা মনের ভেতর তলিয়ে গিয়ে মনের ভেতরকার তলিয়ে থাকা শৈশবের স্মৃতিগুলো বুদ্বুদের মতো ভেসে আসে।    

       যাত্রাপালা পেরিয়ে যাওয়ার পরের দিন গ্রামের ছেলে মেয়েগুলো নদীর পাড়ে পড়ে থাকা মুচ-দাঁড়ি, ছেঁড়া চুল, রঙিন ফিতে কুড়িয়ে এনে যাত্রা যাত্রা খেলত। অন্তুর এখনো মনে আছে সেই খেলায় ও একবার কর্ণ হয়েছিল। মিতালির ফ্রকটা পরে ওকে মানিয়েও ছিল বেশ। মিতালি হয়েছিল কুন্তি। ওর পোশাক ছিল ওরই দিদির স্কুল যাওয়ার সাদা চুড়িদার। অর্জুন হয়েছিল বুবাই। সেই দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই হাসতে থাকে অন্তু। সেই বুবাই এখন আসানসোলে বাসের কন্ডাক্টর। অর্থের অভাবে এইট পাশ করেই বাগালিতে ঢুকেছিল। বয়স বাড়তেই বাড়ি ছেড়ে একদিন পালিয়ে গেল। মিতালিও বিয়ে করে একটার পর একটা বাচ্চার জন্ম দিয়েই চলেছে। এখন ওটাই হয়তো ওর জীবনের একমাত্র এম্বিশান। মনে মনে মিতালির মেয়ে বেলার মুখটা মনে করার চেষ্টা অন্তু। সেই ঝাঁকড়া চুল, ফোলা ফোলা গাল, গালের টোল, গজদন্ত হাসি…

শিল্পীকে দেওয়া কথার ভিত্তিতেই বিকেল বেলায় বিবড়দা গিয়ে ‘কবিতা কলম’ পত্রিকাটা কিনে নিয়ে আসে অন্তু। বেশ চকচকে পত্রিকা। অদ্ভুত অদ্ভুত কবিতাগুলোতে অদ্ভুত সব ছবি আঁকা। ছবিগুলোর উপর আঙুল বুলিয়ে কবিতাগুলো অনুভব করার চেষ্টা করে অন্তু। কবিতাগুলো ধরা দেয় না। মাথার উপর দিয়ে রাতচরা পাখির মতো উড়ে যায়। সুচিপত্র দেখে অন্তু শিল্পীর কবিতার পাতাটা বের করে,-

খেয়া ঘাটের মাঝি

                      শিল্পী ব্যানার্জ্জী

আর কয়েক পা পেরিয়ে গেলে নতুন জীবন

আর একটা হৃদয় পেলে জুড়ে যাবে ভেঙে যাওয়া মন

আমি বর্ষায় পুড়তে থাকা শানবাঁধানো শ্মশানের ঘাটে

এক-দুই-তিন… কর গুনে-গুনে মৃত্যু লিখে রাখি

আমি তো খেয়া মাঝি। শুধু এপার হতে ওপার

তোমার এক জীবন বিশ্রাম নেওয়া শেষ ?

অবশিষ্ট কাজটুকু আমার পড়ে থাকে।

কে আর মনে রাখে ? আমি রোজ রাতে দেখি

ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেয়ে উড়ে যায় অচিন পাখি আরেক শরীরে।

শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বনে মুধু শেষ হলে

শরীরের দেয়ালে হামা দিয়ে বার্ধক্য নামে

তারপর…? আমি বাকি পথটুকু পার করে দিয়ে আসি।

যে ছেলেটি গোলাপ হাতে এসে বলেছিল, ‘ভালবাসি, তোমাকেই ভালবাসি’

একদিন নাকে তুলো গুঁজে ধূপের গন্ধ মেখে সারা শরীর ফুলে ঢেকে

ওপারে গেছে। হয়তো উপরে গেছে।

আমি অপেক্ষায় থাকি

যেদিন শ্মশানে আঁতুড়ে মিলন হবে ?

সেদিন আবার শিস দেবে অচিন পাখি।

কবিতাটা পড়ার পর চুপচাপ ছাদের উপরে এসে বসে অন্তু। অকারণ মনকেমন। পশ্চিমের আকাশ লালচে রঙ আঁকড়ে গুম মেরে আছে। যখন তখন বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠিক সেদিন পার্কে যেমন…। পার্কের বিকেলটা মনে করতে গিয়ে শুশুনিয়ার দুপুরটা দুম করেই মাথায় আসে ওর। সেদিন শুশুনিয়া থেকে ফিরেই শিল্পীকে নার্সিং হোম ছুটতে হয়েছে কিন্তু সেদিন তো ওদের শারীরিক…, আর ভাবতে পারে না অন্তু। একটা অপরিচিত ভয় ওর ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।

       নীচে নেমেই বিছানা থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে শিল্পীর নম্বরটা ডায়েল করে অন্তু। ফোঁটা-ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে বাইরে। মোবাইলের ওপার থেকে ভেসে আসে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ, ‘আপনি যে নম্বরে ডায়েল করেছেন সেটির সঙ্গে এই মুহূর্তে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুণ। আপনে জিস নম্বর পে…’ কলটা কেটে দিয়ে আবার ডায়েল করে অন্তু। এবারেও সেই একই কণ্ঠের প্যানপ্যানানি। পরপর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও শিল্পীর নম্বরে কল ঢোকে না। পেটটা এবার কেমন যেন কনকন করে মোচড় দিয়ে ওঠে…

। ১৭।

ঘরের ভেতরটা আঁশটে গন্ধে ভরে আছে। পায়খানার গন্ধ। পায়খানার আঁশটে গন্ধ ? ঠিক তাই। অন্তত আজকে মহিমের সেটাই মনে হচ্ছে। মাছ ধরা রাতের পর সকালে পুকুর ঘাটের কাছ থেকে যেমন আঁশটে গন্ধ ভেসে আসে এই গন্ধটাও ঠিক যেন সেরকম। নাকেমুখে গামছা চাপা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। পূর্ণিমাও বাড়িতে নেই যে ওকে বলবে পরিষ্কার করে দিতে। ও এখন সকাল হলেই দে’ছুট। সোজা কাবেরীর ঘরে। ওখানে গিয়ে প্রথমে ছাগল বাচ্চাগুলকে আদর  করে। তারপর চা, কোনও কোনও দিন চা বিস্কুট কিংবা রুটি। পূর্ণিমার জন্যেই কাবেরীর সকালটাও ভাল কাটে। যে পৃথিবীতে নিজের মনের মতো গল্প করার লোক জোটে না সেখানে নির্বাক অসম বয়সীর সঙ্গেও অনায়াসে গল্প করা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মায়ের অসুস্থতার জন্যে পূর্ণিমার দিনগুলোও থমকে গিয়েছিল। সেই থমকে থাকা দিনগুলো কাবেরীকে পেয়ে আবার চলতে শুরু করেছে। বোবা মেয়েটা অপলক ভাবে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শোনে। কাবেরীর ছোটবেলার গল্প। সেই গল্পগুলোর সঙ্গে নিজের গল্পগুলো মিলিয়ে দেখতে খুব ভাললাগে ওর। একদিন মহিম খেয়াল করেছিল পূর্ণিমা কোলের উপর কাঠের একটা পাটা চাপিয়ে নিজের খেয়ালে হাত নাড়ছে। হাসছে। নীরব ভাষায় গল্প করছে। মনে মনে সেদিন হেসেছিল মহিম। বড় হচ্ছে মেয়েটা…

‘মহিম ঘরে আচিস র‍্যে ?’ বাইরের থেকে তপনার ডাক ভেসে আসে।

সচরাচর মহিমের ঘরে তপন আসে না। তপন কেন তেমন কেউই আসে না। আজকে হঠাৎ তপনার গলার আওয়াজ পেয়ে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মহিম। তাহলে কী তপন কাবেরীর ব্যপারে…

‘মহি…ম…’ দরজার বাইরে থেকে আবার ডাক দেয় তপনা।

‘আয় র‍্যে ভিত্রে আয়।’

       বাইরে থেকে কয়েকবার কেশে হাসি হাসি মুখে ভেতরে ঢোকে তপনা। বলে, ‘হারুর কাছে চুইল কাইটত্যে গেইছলম। ত ভাইবলম টুকু তর বউ এর খবুরটা লিয়ে যাই। তা কেমন আচে একন ?’ কথাটা বলতে বলতেই ভেতর ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তপন। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে বাড়ির উঠোনেই একদলা থুতু ফেলে বলে, ‘বাপর‍্যে বাপ এত গন্দ ? ঘর ভিতর‍্যে থাকিস কেমন কইর‍্যে ?’

‘কী কইরব ? এমনি কইর‍্যেই থাইকত্যে হচ্চ্যে। বউটাত আর ফেইল্যে দিবার লয়…’

‘ঘরটা ত পরিষ্কার কত্ত্যে পারিস। নিজে না পাল্ল্যে বিটিটাকে বল্যেই ত করাত্যে পারিস। কাবেরীকে বল্ল্যেও কইর‍্যে দিব্যেক। দিব্যেক নাই ?’

ঠিক এমন একটা প্রশ্ন যে আসতে পারে সেটা মহিম নিজেও ভাল মতোই জানত। এই জন্যেই তো তপনার আগমন। তবে প্রশ্নের সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার পরেও মহিম সেটার উত্তর তৈরি করে রাখেনি। তাই তপনার প্রশ্নের কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মহিমকে চুপচাপ থাকতে দেখে তপনা আবার বলে, ‘তর বিটিটাও ত একন সারাদিন উখেন্যেই থাকে। ভালই বঠে তর ঘরের দিনবেলির ভাতটা ত বাঁচে। কিন্তু…’ কিন্তু বলেই চুপ করে যায় তপন। হয়তো কিছু ভাবে, নয়তো ভাবার অভিনয় করে। মহিমের ভেতরে ভেতরে রাগ হলেও ও চুপচাপ তপনার পরবর্তী কথাটার অপেক্ষা করে। ‘একটা বিড়ি দ্যে ত…’ মহিমের কাছ থেকে বিড়িটা চেয়ে নিয়ে সেটাকে রগড়াতে থাকে তপন। হয়তো পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করতে চায়। তারপর বিড়িটা ধরিয়ে আনমনা একটা ভাব নিয়ে উঠোনে পেতে রাখা খাটিয়াটায় গিয়ে বসে। মহিম শুধুমাত্র তপনার হাবভাব গুলো লক্ষ্য করে। বিড়িটায় বেশ কয়েকটা টান দেওয়ার পর মুখ খুলে তপনা, ‘সেদিন খুড়া বইলছিল তর নকি দিনদিন কাবেরীর সাতে মিলামিশা বাইড়ছ্যে। সেটা যদিও তর নিজের বেপার…’ আরও কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে তপনা বলে, ‘দ্যেক দিনবেলিতে পরের বিধবা লিয়ে ইখ্যান উখ্যান ঘুইরল্ল্যে পাড়ার লোকে কতা বইলব্যেক বাপু।’

‘ত কে কার মুখ চাইপ্যে রাইখ্যেছে। যে শালা যা বইলচ্যে বলুক আমিও দেইখব কে আমার কটা ছিঁড়ত্যে পারে। গাঁয়ের কন মিয়্যা মরদটা কত ভাল সেটা ত আমার জানত্যে বাকি নাই। সব শালা শালির পঁদে গু আচে।’

বিড়িটায় ফোঁস-ফোঁস করে কয়েকটা টান দিয়ে সেটাকে মাটিতে ফেলে সাত তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় তপনা। চপ্পল দিয়ে বিড়ির টুকরোটা নিভিয়ে বলে, ‘তকে ত খাত্যে বারণ কচ্চি নাই। খা কিন্তু দিনবেলিতে লয়, লোকের লজরে লয়। আমিও ত খাইচি কিন্তু রাইত্যের বেলিতে। দিনবেলিতে লোকের চইখ্যে পইড়ল্যে…’

‘বইল্লমত ছিঁইড়ব্যেক আমার…’ বুড়ো আঙুল দিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করে মহিম।

‘ক্যেলা ছিঁড়া ছিঁড়ির কথাটা হচ্চ্যে নাই…’

‘তাহল্যে ?’ গলাটা চড়িয়েই জিজ্ঞেস করে মহিম।    

‘এই যে সেদিন রাত্যের বেলিতে তুই আমাদের দুজনকে দেকলি। তবেই ত সাহস পালি। আর উ মাগীর ত মরদ পাল্যেই হৈল। ইবার তকে কেউ দেইখব্যেক তকন আবার সেউ…’

       তপনার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর একটা রাগ হয় মহিমের। কিছু বলতে না পেরে নিজের ভেতরের আগুনে নিজেই পুড়তে থাকে। এতদিন মহিম ভাবত তপন হয়তো কোথাও না কোথাও ভেতর থেকে কাবেরীকে চায়, বাড়িতে বউ আছে বলেই ঘরে তুলতে পারে না। কিন্তু আজকে ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে এই খেলায় চাওয়ার কোনও জায়গা নেই পুরোটাই পাওয়ার হিসেব।

হাতের তালুতে তালু ঘষতে ঘষতে তপনা বলতে থাকে, ‘…দ্যেক যে মাগীর কেউ নাই সে মাগীকে খাল্যেও কুনই দোষ নাই, বারণ করারও কেউ নাই। কিন্তু মিল্যে মিশ্যে খাল্যে অনন্দটা বেশি। ইবার তুই যদি ভাবিস ভুল্যাই ফুইসল্যাই এক্যাই খাবি…’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘এই কদিন মাগী কাখুক্যেই দিত্যে চাইচ্যে নাই। তাই তকে বলছি উহাকে বুজা, বল যে গাঁয়ে থাইকত্যে হৈল্যে…’

‘এত্তদিন যা কইর‍্যেছিস ভাল কইর‍্যেছিস ইবার থেইক্যে উসব আর চইলব্যেক নাই। উদিকে আর পা বাড়্যাইস না।’

‘তুই আমাকে ধমকাচ্ছিস নকি ?’

‘না ভালভাবে বুজাচ্চি। তদের জোর জুলুমটা আর চইলব্যেক নাই বুঝলি। যত্তদিন উ নিজের থেইক্যে দিয়েছে তত্তদিন যা পাইর‍্যেছিস কইর‍্যেছিস একন যকন দিব নাই বইলচ্যে তকন আর তদের কিচুই করার নাই।’

‘দিব নাইটা ত বইলচ্যে তর জন্যে। সেটা তুই বুজা উয়াকে।’

‘যদি তর বউয়েরটা কেউ খুজে আর তকে বুঝাইত্যে বলে তুই বুঝাবি ?’

‘আজেবাজে কতা বলিস না। ওই শালি কন তর বউ বঠে ?’

তপনার প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মহিম তারপর বলে, ‘সেটা আমি বুইঝব।’

‘তকে এই লাইন্যের গবুরপকা ভাইবত্যম। তুই ত শালা ভিতরে ভিরতে বিশাল পেলেন কইর‍্যেচিস। খুড়া তাহল্যে ঠিক্যেই বইলছিল তর শাঁঙা করার মতলব আছে। ইদিকে তর বউত কদিন বাদ্যেই… ভালই বঠে। কিন্তু একটা কতা শুইন্যে রাক…’

‘আমার কন কতা শুন্যার দরকার নাই। কতা গুল্যাইন ওই শালাদেরকেই শুনাবি যা।’

‘দ্যেক তুই কিন্তু বিরাট উড়ছিস। ভাবিস না বেশিদিন তর ওই ডানা থাইকব্যেক। পরান খুড়া বল্যেই দিয়েচে সজা আঙুল্যে ঘি না উটল্যে আঙুইলটা বাঁকাত্যে হব্যেক…’ কথাগুলো বলতে বলতেই বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে যায় তপনা। তারপর বলে, ‘তুই ভুগবি গাইদ্যে ভুগবি…’ মহিমের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তপনা।

মহিম কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। সদর দরজার দিকে একদলা থুতু ছুঁড়ে উঠোনের খাটের উপর এসে বসে। একটা বিড়ি ধরায়। ভেতরকার রাগটা দাউ-দাউ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ইচ্ছে করছে ঘরের সব কিছু ভেঙে তছনছ করে ফেলতে। আজ নয় কাল যাব করে করে ভাদুর ক্যামোথেরাপিটাও করানো হয়নি। কবেই ডেট পেরিয়ে গেছে। এদিকে ভোলা-শঙ্করকে বিক্রি করার টাকাটাও অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে। উদাসীন ভাবে বিড়িতে একটা টান দিয়ে শূন্য গোয়াল ঘরটার দিকে তাকায় মহিম। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে। দিনদিন সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চেনা মানুষগুলোও অচেনা বলে মনে হয় আজকাল। কাউকেই বিশ্বাস হয় না। সবাই যেন মানুষের মুখোশ পরা শেয়াল। কাবেরীর মুখে পরান খুড়ার চরিত্র সম্পর্কে জানার পর থেকেই যেন সব হিসেব গোলমাল হয়ে গেছে। আজীবন সম্মান করে আসা বাপের বয়সী মানুষটাও যে এমন হতে পারে সেটা কিছুতেই বিশ্বাস হয় না মহিমের। অথচ কথাবার্তা শুনলে কে বলবে এই লোকটা রাতের অন্ধকারে…

‘জ…ল, জ…ল…’ ঘরের ভেতর থেকে ভাদুর অস্ফুট স্বর ভেসে আসে। বিড়িটা ফেলে দিয়ে ঘরের ভেতর গিয়ে ঢোকে মহিম। চোখ বন্ধ করেই পড়ে আছে ভাদু। দিনদিন শরীরটা শুকিয়ে শুকিয়ে দড়ির মতো হয়েচে। মাথার চুলগুলো রোমে পরিনত। অথচ সেই স্বপ্নের রাতগুলোতে ভাদুর চুলে আঙুল ঢুকিয়ে কত রাত মহিম গেয়ে উঠেছে,

‘সই তর চুল্যের পতে পা পিছল্যে আর পেমে পইড়ব কত       

ঠাকুরও বুজি পিছল্যে ছিল রাধার চুল্যে ঠিক আমার‍্যেই মত

আইজকে টুকু দাঁড়াল সই তর চুল্যের পতে আর কিচুদূর চলি

যে কতা-গুল্যাইন বইলত্যে বাকি আইজকে পরান খুল্যে বলি।’

সেই সব রাতগুলোর কথা মনে পড়তেই চোখ দুটো ঝাপসা আসে মহিমের। এক একটা দিনের রেশ ধরে আরও কত দিনের কথায় না মনে পড়ে যায়। ভাদুর মুখে কয়েক ঢোক জল দিয়ে ওর পাশেই বসে মহিম। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মাথায় মহিমের হাতের ছোঁয়া পেতেই চোখ মেলে তাকায় ভাদু। আজকে অনেকদিন পর মহিম ভাদুর মাথায় হাত রেখেছে বলেই হয়তো মুহূর্তের ভেতর ওর চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে ডান হাতটা কোনরকমে তুলে মহিমের হাতটা চেপে ধরে। হাতটা ধরার পরেই মৃদু হাসার চেষ্টা করে ভাদু। সেই হাসিতেও নিখাদ যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে। মহিমের হাতটা নিয়ে নিজের গালে ঘষা দেয়। ভাদুর গালে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মহিমের হাতে লাগে। এবার মহিমের চোখদুটোও জলে ভরে আসে। টপ-টপ করে ঝরে পড়ে কয়েক ফোঁটা। সেটা ভাদুর দৃষ্টি এড়ায় না। মৃত্যু পথযাত্রি মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে। প্রতিটা মানুষ চায় তার শেষ দিনগুলোতে চোখের জল ফেলার জন্য যেন কেউ একজন অন্তত থাকে। এমন মুহূর্তে চোখের জল ফেলা মানুষটার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার আসাটা বেকার যায়নি।

       মহিমের হাতটা শক্ত করে ধরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে ভাদু। পারে না। কিছুতেই পারে না। তীব্র একটা যন্ত্রণায় ওর ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে। তিরতির করে কাঁপতে থাকে…

।১৮।

বাজছে মোবাইলটা। আবার বাজছে, না ঠিক বাজছে নয় যেন চিৎকার করছে। দুহাত দিয়ে কান দুটোকে চাপা দেয় অন্তু। মোবাইলটাও চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ সব শান্ত। কানের পাশ থেকে হাত সরিয়ে নেয় অন্তু। মিনিট কয়েক পরে আবার বাজতে শুরু করে মোবাইল। অন্তু জানে ফোনটা আসছে আরেকটা আননোন নম্বর থেকে। না নম্বরটা আর আননোনও নয় এখন। অন্তু জেনে গেছে নম্বরটা তিতলির। মেসেজ করে তিতলি নিজেই জানিয়েছে অন্তুকে। অন্তুও বুঝতেই পারছিল নম্বরটা তিতলিরেই হবে। তিতিলি ছাড়া আর কারুর হওয়ার কথাও তো ছিল না। তবুও অন্তু নিজের ভেতরের ভয়টাকে অন্যপথে চালানোর জন্যই হয়তো আরও পাঁচটা মুখ কল্পনা করছিল।

কিন্তু আজ এতদিন পর তিতলি অন্তুর কাছে কী চায় ? কী চাইতে পারে তিতলি ? জানালার ওপারের বৃষ্টির শব্দ শুনতে-শুনতে সারাটা রাত কেটেছে। তবুও কোনও কূলকিনারা খুঁজে পায়নি। ভয় পেয়েছে অন্তু। সব হারিয়ে ফেলার ভয়। শরীরী স্মৃতির ইতিহাস শিল্পীর সামনে চলে আসার ভয়। আবার বাজছে মোবাইলটা। ‘বাজুক শালা যত বাজছে বাজুক। কিছুতেই ধরব না…’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে অন্তু।

‘অন্তু এই অ…ন…তু কে ফোন কইরছ্যে দ্যেক। কখন থ্যেইকে ফোনটা বাইজচ্যে ত বাইজচ্যেই…’ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে করতেই কথাগুলো বলে লতিকা।

বাধ্য হয়েই বিছানা থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে সাইলেন্ট করে দেয় অন্তু। এগারোটা মিসড কল। তার ভেতর নটা তিতলির। দুটো শিল্পীর। লাস্ট দুটো শিল্পীর। মোবাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতেই গত রাতের কথাগুলো মনে করতে থাকে অন্তু। শিল্পী ওষুধ খেতেই চায় না। সে কথা পরিষ্কার জানিয়েই দিয়েছে অন্তুকে। যদিও আজ এতদিন পর ওষুধ খেলেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বিষয়টা মাথায় ছিল শিল্পীর। ইচ্ছে করেই ওষুধ কেনেনি। অন্তু ওষুধ খাওয়ার কথা বলতেই শিল্পী পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘না ওষুধ আমি খাব না। কিছুতেই খাব না, তাতে যা হওয়ার হবে।’ কেন খেতে চায় না সেকথা জানতে চাইলে শিল্পী বলেছে, ‘সে তুমি বুঝবে না। তোমার বোঝার কথাও নয়। তুমি মেয়ে হলে হয়তো…।’ সত্যিই বুঝতে পারেনি অন্তু। এতে ছেলে-মেয়ের ব্যাপার আসছে কোথা থেকে সেটাও বুঝতে পারেনি।

       গত রাতে যখন শিল্পীর ফোনটা লাগল তখন ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর পেরিয়ে গেছে। ঝমঝম বৃষ্টি ছাড়িয়ে টিপটিপ শব্দ। এদিকে তিতলি মেসেজ করে নিজের পরিচয় জানিয়েছে বলেই হয়তো অন্তুর ঘুম আসছিল না। একটার পর ফোন লাগল শিল্পীর। শিল্পীর গলায় রাতজাগা ক্লান্তির ছোঁয়া থাকলেও ঘুম ছিল না। তাই প্রতিটা উত্তর ছিল পরিষ্কার। ঘুমের ঘোরে কোনও কথাই যে শিল্পী বলেনি সেটা ভাল মতোই জানে অন্তু। একদিক থেকে তিতলির ফিরে আসার পদধ্বনি আরেক দিকে কুমারী গর্ভ হতে শিশু-কান্না শোনার ভয়। সারারাত কান দুটোকে চাপা দিয়েই জানালার এপারে বসেছিল অন্তু। মাঝে মাঝে জানালার পথে বিদ্যুতের ঝিলিক এসে ঘরটা আলোকিত করে দিয়ে গেলেও অন্ধকার কিছুতেই কাটছিল না।

       এবার ফোনটা ভাইব্রেট হতেই রিসিভ করে অন্তু। ওপার থেকে শিল্পীর গলা ভেসে আসে, ‘ঘুমোচ্ছিলে নাকি?’

‘হ্যাঁ। কিছু বলবি ?’

‘না মানে জিজ্ঞেস করছিলাম কখন আসছ ?’

‘দশটা নাগাদ বের হব। তোর মা কি নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে গেছে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘না না এখনো যায় নি এই একটু পরেই বেরোবে।’

‘ও আচ্ছা ঠিক আছে…’

‘হ্যালো হ্যালো… আরেকটা কোথা শোনো না…’

‘হ্যাঁ বল কী বলবি…’

‘বলছিলাম কী; কালকে রাতের কথায় রাগ করেছো ?’

‘না না রাগ করতে যাব কেন। তাছাড়া তুই তো যুক্তিসঙ্গত কথাই বলেছিস।’

‘না আসলে কী জানতো…’

‘ওসব কথা থাক। পরে আলোচনা হবে, আমার এখন ওসব আলোচনা করতে ভাল লাগছে না। তাই প্লিজ…’ শিল্পীকে থামিয়ে দিয়েই গড়গড় করে কথাগুলো বলে যায় অন্তু।

শিল্পী খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলে, ‘আচ্ছা। আসার আগে একটা কল করে জানিও। বাই।’ কলটা কেটে দেয় শিল্পী। অন্তুর কথা শোনার জন্যে অপেক্ষাও করে না।

       মোবাইলটা পকেটে নিয়েই ছাদে এসে দাঁড়ায় অন্তু। মাথাটা ভার লাগছে ওর। সব কেমন যেন এলোমেলো, কেমন যেন অগোছালো। কোনও সূত্রে ফেলেই অঙ্কগুলোকে মেলানো যাচ্ছে না। আকাশের বুকে দাঁত বের করে রোদ হাসছে, তবুও অন্তুর মনে হয় এই ছাদটাই ওর একমাত্র নিরাপদ জায়গা। এখানে দাঁড়িয়েই নিজের সঙ্গে গল্প করা যায়। নিজের ভেতর ডুব দিয়ে স্বপ্ন কুড়িয়ে আনা যায়।

ছাদের কোনাটায় দাঁড়িয়ে নদী পারের দিকে তাকিয়ে থাকে অন্তু। শাল-পলাশের গায়ে সবুজের মেলা। এই সবুজে আড়াল হয়ে আছে ডাংরা নদীটা। ঘু-ঘু-চু  ঘু-ঘু-চু করে ঘুঘু ডাকছে দূরে কোথাও। দেখা যাচ্ছে না পাখিটাকে। মন উদাসীন করে দেওয়া সুর। এমন সুরে অতীতের অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। অন্তুর দুচোখের পাতায় তিতলির মুখটা ভেসে উঠে। ঠোঁটের নীচে বাঁদিকে একটা ছোট্ট তিল ছিল তিতলির। তিতলিত ঠোঁটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওই তিলটাও হাসত। টোল পড়ত গালে। ডাগর চোখদুটো ছোট হয়ে আসত।

‘আমার বুক দুটো আরও একটু বড় হলে বেশি ভাললাগত তাই না ?’ এই একই কথা একবার অন্তুকে জিজ্ঞেস করেছিল তিতলি। অন্তু কিছুই বলতে পারেনি। মুগ্ধ চোখে নির্বাক ভাবে তাকিয়েছিল তিতলির তুলতুলে শরীরটার দিকে। সত্যিই অমন মেয়েরই তিতলি নাম মানায়। ‘আচ্ছা তিতলির তো কোনও দোষ ছিল না ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। উত্তরের পরিবর্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাকমুখ দিয়ে। এই হারিয়ে ফেলাটাই হয়তো জীবন। তাই কোনও কিছুই চিরদিন থাকে না। কিন্তু হারিয়ে ফেলা সময় যদি বর্তমানের পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ে?

       পকেট থেকে মোবাইলটা বেরকরে রাজাকে রিং করে অন্তু। ‘দর্দ দিলোকে কম হো যাতে মে অর তুম…’ কলার টোন লাগিয়েছে রাজা। গানটা অন্তুর নিজেরও খুব প্রিয় একটা গান। আবার হঠাৎ করেই তিতলির মুখটা চোখের পাতায় ভেসে আসে। অন্তু নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলে শিল্পীর কল্পিত মুখটা এসে তিতলির মুখটাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। আচ্ছা ছবির আড়ালে ছবি লুকিয়ে রেখেও কী বেঁচে থাকা যায় ? হয়তো যায় নতুবা মানুষ বাঁচে কেমন করে। এক মুখ দিয়ে আরেক মুখ ঢেকে রেখেই তো মানুষ অতীতের স্মৃতিপথ থেকে বাস্তবের বর্তমানে ফিরে আসে।

‘হ্যাঁ বল…’ ফোনটা রিসিভ করে রাজা।

‘কোথায় ছিলি এতক্ষণ ধরে রিং বাজছে ?’

‘না না ভাইব্রেট করাছিল বলেই হয়তো বুঝতে পারিনি। বল…’

‘বলছিলাম একবার আসতে পারবি ?’

‘হঠাৎ এখন ? কোনও বিশেষ কিছু…’

‘না না তেমন কিছু নয়। আসলে একটা সমস্যায় পড়েছি বুঝলি…’

‘কী আবার হল। শানু তো শুনলাম ভালই আছে। শিল্পীর সঙ্গে কী কিছু…?’

‘আরে না না কারুর সঙ্গেই কিছু হয়নি। এত প্রশ্ন না করে শালা একবার আসতে বলছি আয়।’

‘আচ্ছা যাচ্ছি কিন্তু একটু দেরি হবে, বাজারে সব্জি কিনতে এসেছি…’

‘বেশি লেট করিস না আমাকে আবার বাঁকুড়া যেতে হবে।’

‘এক কাজকর মিনিট দশেক পরে তুই একবারেই রেডি হয়ে নদী পারের দিকে চলে আয় আমিও তাহলে ওখানেই আসছি। ওখান থেকেই তোকে আমি বাইকে করে বিবড়দায় পোঁছে দেবো। তুই বাঁকুড়া চলে যাস। কী বলিস ?’

‘আচ্ছা সেটাই বরং ভাল। আমি রেডি হয়েই বের হচ্ছি। বাই…’ ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।

       একটা সিগারেট ধরিয়ে পলাশ গাছগুলোর দিকে তাকায়। একজন কাউকে সব খুলে না বললে মনটা হালকা হবে না। ‘আচ্ছা শিল্পী কেন এমন সিধান্ত নিতে চাইছে ? তাহলে কী ও আমার উপর ভরসা রাখতে পারছে না ? ভাবছে যদি আমি ওকে…। ভাববে নাই বা কেন আজকালকার দিনে কতরকম তো হচ্ছে…। তাছাড়া তিতলির সঙ্গেও…’ প্রশ্নের পাকে পাক খেতে খেতে ঘামতে থাকে অন্তু। চোলাই মদ গেঁজিয়ে ওঠার মতো অন্তুর মনের ভেতরেও হাজার রকমের প্রশ্ন গেঁজিয়ে উঠছে এখন।

এবছর দোকানের সংখ্যাটা বাড়বে বলেই মনে হল অন্তুর। নদীর পাড় ধরে প্রায় তিনশ মিটার লম্বা লাইন দিয়ে দোকান বসছে এবছর। বেশ কয়েকটা ছোটবড় নাগরদোলাও বসেছে। দোকান গুলোকে বাঁহাতে রেখে শিবমন্দিরটা পেরিয়ে গিয়ে একটা শালগাছের নীচে বসে অন্তু। এদিকটায় লোকজন একেবারেই আসে না। তাই ঝোপঝাড়টাও বেশি মাত্রায়। বিশেষ করে শেয়াকুল ঝোপে ভরে আছে। শালগাছগুলোর ছায়াও বেশ ঘন। একটা শালগাছের গুড়িতে ঝুলে থাকা ছোট একটা ডালকে ভেঙে ওটার উপরেই বসেছে অন্তু। দূরে লোকজনের কোলাহল ভেসে আসছে। ওদের হাতে আর বিশেষ সময় নেই তাই কোলাহল করেই দ্রুত হাত চালাচ্ছে।

       এতক্ষণে অন্তু শুনতে পেলো রাজার মোটর বাইকের আওয়াজ। মন্দিরটার সামনেই দাঁড়াল বাইকটা। অন্তু মোবাইলটা হাতে নিয়ে রাজাকে কল করে জানিয়ে দেয় কোনদিকে আছে ও।

‘এদিকটায় এলি যে ? ওদিকেই তো ভালছিল।’ এসেই অন্তুকে জিজ্ঞেস করল রাজা।

রাজার প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে অন্তু বলল, ‘এখানেই বসে পড়।’

‘তা ব্যাপার কী বলত এত আর্জেন্ট কলিং ?’ মুচকি হেসেই জিজ্ঞেস করল রাজা।

‘হাসিস না তো শালা। আমার বলে পোঁদ ফাটছে আর তর শালা হাসি পাচ্ছে…’

‘আচ্ছা আচ্ছা একটা সিগারেট দে আগে…’ অন্তুর হাত থেকে সিগারেট নিয়ে রাজা আবার জিজ্ঞেস করে, ‘তা হয়েছেটা কী সেটা তো বলবি…’

‘বলব বলেই না ডাকলাম।’

‘আচ্ছা বল।’ সিগারেটটা ধরায় রাজা।

‘সেই পুরুলিয়ার কেসটা তো তুই জানিস ?’

‘ওই প্রজাপতি কেসটা ?’

‘হ্যাঁ যতটুকু বলেছিলি। তা আবার ফোনটোন করছে নাকি ? পরিষ্কার বলে দে তুই বুকিং আছিস। বেশি কেচাল করতে চাইলে আমাকে ওর নম্বরটা দিস তখন আমিই না হয়…’

‘বেশি বকিস না তো বাল…’

‘আচ্ছা আচ্ছা এবার সিরিয়াস নট জোকিং।’

‘কদিন থেকেই একটা আননোন নম্বরের কল আসছিল। বুঝতে পারছিলাম ওই হবে। নম্বরটা রিজেক্ট লিস্টে ফেলতেই…’

‘অন্য আরেকটা নম্বর থেকে কল, তাই তো ?’

‘সেটা পরে। আগে ওই নম্বর থেকেই মেসেজ পরে অন্য নম্বর থেকে কল। কিন্তু সমস্যা হল ফোন করলেও চুপ করেই থাকে…’

‘তাহলে বুঝলি কী করে ওই মেয়েটাই ?’

‘মেসেজ করে জানিয়েছে।’

‘ও আচ্ছা। তারপর ফোনে কথা বলেছিস ?’

‘না না কল রিসিভ করিনি।’

‘ধুর শালা কলটা রিসিভ করে তো জানতে পারতিস কী বলতে চাইছে।’

‘আমি জানি ও কিছুই বলতে চাইছে না। জাস্ট আবার সম্পর্কে ফিরতে চাইছে।’

‘সেটাই বা কেমন করে বুঝলি ?’ অন্তুর চোখে চোখ রেখেই জিজ্ঞেস করে রাজা।

‘সিম্পল, অন্যকোন দরকার হলে সেটা প্রথমবার কল করেই বলত। ফোনে ধরে চুপচাপ থাকত না। তাও আবার একবার নয় বহুবার।’

‘আরে ভাই মেসেজ করে যখন নিজের পরিচয় জানিয়েছে তখন এবার জানিয়ে দে আর সম্ভব নয় তুই অন্যকারুর সঙ্গে…’

‘আরে অতটা সহজ নয়। আমি তিতলিকে ভালমতোই চিনি।’

‘তাহলে কী করবি শুনি, এমনিই চলবে দুদিকে দুই রানি ?

‘তোর না শালা সবেতেই ইয়ার্কি।’

‘ইয়ার্কি কোথায়। তুই যদি তোর ওই তিতলিকে না বলিস তাহলে তো ও তোর পিছনে লেগেই থাকবে।’

‘কিন্তু…’ একটা লম্বা শ্বাস নেয় অন্তু।

‘কিন্তু কী ?’

‘আমি যতদূর জানি তিতলি যদি জানতে পারে তাহলে শিল্পীর কাছে খবরটা পৌঁছাতে সময় লাগবে না

‘তাহলে এক কাজ কর তুই নিজেই আগাম শিল্পীকে সব জানিয়ে দে।’

‘কী বলব শিল্পীকে ? শিল্পীকে বলব যে তোর আগেই একজনের সঙ্গে আমার ফিজিক্যাল সম্পর্ক ছিল ?’

‘ফিজিক্যাল সম্পর্ক ছিল মানে ? একথা তো তুই আমাকে বলিসনি।’ এবার রাজার মুখটাও থমথমে হয়ে আসে।

‘বলিনি নয়। বলতে পারিনি।’

‘হুম বুঝলাম। তাহলে এবার কী করবি ভাবছিস ?’

‘সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না…’ কথাটা শেষ করার আগেই অন্তুর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে। শিল্পী কল করছে। ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যাঁ বল…’

‘তুমি একটু তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ…’ মোবাইলের ওপারে থাকলেও শিল্পীর গলাটা যে কাঁপছে সেটা অন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারে।

‘কী হয়েছে কী তুই এরকম তত তত করছিস কেন ? শানু ভাল আছে তো ?’

‘দাদা কেমন যেন করছে। কথা বলতে গিয়ে…’ এর পরের কথাগুলো আর বুঝতে পারে না অন্তু। কান্নায় ঘড়ঘড় করছে শিল্পীর গলটা।

‘চিন্তা করিস না আমি আসছি।’ বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু।

‘কী ব্যাপার রে ? শানু ভাল আছে তো ?’

‘আরে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ও যা কাঁদছে তাতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।’

‘না মানে কিছু হয়নি তো ?’

‘না না কিছু হয়নি মনে হয়…’

‘চল আমিও যাই। বাইক নিয়েই যাব।’ হড়বড় করে উঠে দাঁড়ায় রাজা।

‘তাই বরং চল। তুই গেলে আমিও সাহস পাব…’ দুজনে মন্দিরটার দিকে এগিয়ে যায়। ওখানেই রাজার বাইকটা দাঁড় করানো আছে। বাইকে চড়তে চড়তে মন্দিরের হাতি-ঘোড়া গুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখে অন্তু। মনে মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘হে ভগবান সব ঠিক করে দিও…’

।১৯।

গ্রামের কাঁচা রাস্তাটা জুড়ে অন্ধকার পড়ে আছে। দুএকটা শেয়াল-কুকুর আর রাতচরা কয়েকটা পাখি ছাড়া পুরো গ্রামটাই ঘুমিয়ে। এমন নিস্তব্ধ রাত্রিতে ধিকধিক করে এক টুকরো আগুনের উজ্জ্বলতা কমছে আর বাড়ছে। ওটা বিড়ির আগুন। জীবনের যন্ত্রণায় জ্বলতে জ্বলতে বিড়ি টানছে মহিম। রাগে ক্ষোভে বিরক্তিতে ঘুম আসেনি ওর। ঘরের ভেতর ভাদু আর পূর্ণিমা গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে। ঘুমের ভেতরেও মাঝে মাঝে গোঙাচ্ছে ভাদু। ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছে হয়তো। এই যন্ত্রণাটুকু মহিম উপলব্ধি করতে পারলেও ওর করার কিছুই নেই। ওর কেন আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও কারুর কিছুই করার নেই। নির্বাক ভাবে তাকিয়ে শুধু দেখো প্রিয়জনের চলে যাওয়াটুকু। এই যন্ত্রণার সঙ্গেই কাবেরীর জীবন জড়িয়ে আরও এক নতুন যন্ত্রণাকে উসকে দিয়েছে মহিমের জীবনে।

       আজকে সন্ধার দিকে হারু নামের একটা ছেলেকে পাঠিয়ে মহিমকে নিজের ঘরে ডেকেছিল পরান। তপনা যাওয়ার পর থেকেই মহিমের মন বলছিল খুড়োর ডাক আসতে পারে, কিন্তু সেই ডাকটা যে আজকে সন্ধাতেই আসবে সেটা অবশ্য মহিম ভাবেনি। পরানের ঘরে গিয়েই মহিম দেখে ঘরের নিম গাছটার নীচে খাট পেতে পরানের সঙ্গেই সত্যবান আর তপনা বসে আছে। পরানের হাতে জ্বলন্ত কলকে। মহিম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওদের গল্প শোনার চেষ্টা করেছিল ঠিকই কিন্তু মহিমের কান এতোটা শক্তিশালী নয় যে শয়তানের শলাপরামর্শ শোনে।

       মহিম যখন পরানের ঘরে ঢোকে তখন সত্যবান, ‘এতেই ফাঁইসব্যেক এতেই ফাঁইসব্যেক…’ বলে কিছু একটা বলছিল কিন্তু মহিমকে ঘরে ঢুকতে দেখে চুপ করে যায়। পরান হাসতে হাসতে বলে, ‘বল্যেছিলম আমার কতা ফেইলত্যে লাইরব্যেক। দেকইর‍্যে দেক আইল কিনা। বাপ-কাকা সবেই এক, যারা সম্মান করার ঠিক্যেই কইরব্যেক। আয়র‍্যে ইখ্যেনেই আয়, তর কতাই হচ্চিল। আমি জাইনতম তুই আমার কতা ফেলবি নাই…’

‘হ-ব খুড়া তুমার কতা কাইটত্যে লাইরলম। তা সন্দ্যা বেলিতে ডাইকল্যে যে, কন বিশেষ কাম আছে নকি ?’ সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল মহিম। ভাব খানাও এমন ছিল যেন ও কিছুই জানে না কিছুই শুনেনি।

‘কামের কতা পরে হব্যেক ক্ষণ। তা দাঁড়াই রইলি যে, বৈস।’ পরানের কথাতে খাটের উপরেই বসে মহিম। তপনার চোখেমুখে এখনো তীব্র বিরক্তির ছাপ লেগে আছে।

‘তা তর বউ একন কে-কেমন আচে ?’ কল্কেতে কয়েকবার ফোঁস-ফোঁস করে সজোরে একটা টান দিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে পরান।

মহিম উত্তর দিতে গিয়েও থমকে যায়। কাবেরীর কথাটা মনে পড়ে ওর। পরানের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাদুর প্রতি ওর কামুক দৃষ্টিটাকে খোঁজার চেষ্টা করে মহিম। আলোন্ধকারে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। গাঁজার টানে পরানের চোখদুটো রক্তিম হয়ে আছে। কথা বলতে গিয়ে জিব লাটিয়ে যাচ্ছে। নিজের মাথাটাকে ঠাণ্ডা রেখেই মহিম উত্তর দেয়, ‘ওই রকম আচে। ই রোগেই আবার ভাল না মন্দ।’

‘সেটা ঠিক, ই রোগে কেউই বাঁচে নাই…’  সত্যবান বলে। তপনাও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস কম পড়ল ওর।

‘তা তুই কী ঠিক কল্লি ?’ কল্কেতে আরেকটা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করে পরান।

মহিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই ওর কাছে। তবুও ওর মুখ থেকে কিছু একটা শোনার জন্য ছ’টা চোখ অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে দেখেই মহিমকে বলতে হয়, ‘একন কিচুই ঠিক করি নাই।’

‘কী ঠিকের কতাটা খুড়া বইলল সেটা বুজত্যে পাল্লি ?’ জিজ্ঞেস করে সত্যবান।

‘না বুজার ত কিচুই নাই। তবে একন ঠিক কিচুই হয় নাই। যতদিন ভাদু আচে ততদিন এমন চইলব্যেক।’ বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই জবাবটা দেয় মহিম।

‘যেমন চলচ্যে সেটা ত আর ভাল কিচু লয়। অন্তত তু-তুই তর বউয়ের কতাটা না ভাইব্যে বাইরের একটা বিধবা মিয়্যার লাইগ্যে জীবন দিচ্ছিস। ওই মেয়্যাকে না ছাড়ল্যে চুলায়মুলায় তর সবেই যাব্যেক। শরীরের নেশা ততদিনেই ভাল যতদিন মনের নেশা থাকে। এই কটা দিন ত নিজের বউটাক্যেই সমুই দিত্যে পারতিস…’

       পরানের মুখটা মনে পড়তেই মহিমের ভেতরের রাগটা আবার দপ করে জলে ওঠে। পরান যে কবিরাজির নামে ধড়িবাজি করে বেড়ায় সেটা হয়তো গ্রামের কেউই তেমন জানে না। আর জানে না বলেই পরানের রোজগারটাও ভালই হয়। বেশ কয়েকটা ঘরে যজমান নিয়ে যথারীতি গুরুদেব হয়ে বসেছে ও। মহিম চিৎকার করে বলে বেড়ালেও হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। পরানের মোটা নামাবলী ভেদ করা মুখের কথা নয়। নতুবা মানুষের এমন সাহস হয় কী করে যে গর্বের সঙ্গে এমন কথা বলে, ‘তর খুড়ি মইর‍্যেচে বলেই কি আমার শরীদের খিদ্যা শেষ? ওই কাবেরীর ত কন মরদ নাই… এখন যদি তুই ওই খানকিকে বলিস ঘরে তুলবি সেটা বল্ল্যেই ত হব্যেক নাই। শুন শরীদ দিয়ে শরীদ খাউয়াটা পাপের লয়। এই যে বৈশাখীর বিটি টগরি আমার ঘরে ঝ্যাইট দেয়, বাসন ধুয়্যে, রান্না করে, সুদু এই কটা কাজের লাগ্যেই হাজার টাকা দিব মাসে ? অত লয়রে বাপ। তবে বৈশির বিটিটাও ভাল যকন বলি তকন শাড়ি খুইল্যে কোলের উপর বসে। এই ত গেল শনিবার সত্যবান আইচিল। জিগ্যাইস করে দেক আমার এক কতাতে টগরি উয়াকেউ দিয়েচে কি দেয় নাই…’

ঘাড় নেড়ে অহংকার করেই সত্যবান সে কথা স্বীকার করেছিল। ‘দেকইর‍্যে বাপ একটা ক-কতা বলি শুন, গাঁয়ে শরীদ দিবার মে-মেয়্যা-বউয়ের অভাব নাই। আর দিব্যেক নাই কইরব্যেকট্যা বা কী ? মরদে যা রোজগার করে তার দেইড়্যা টাকার মদ মারে। আবার ঘরে চাল নাই ডাইল নাই ইসব শু-শুনল্যেও বউ এর ষষ্টিপূজা। তাহল্যে বিশ-পঁচিশ টাকায় শাড়ি খুইল্যে সায়া তুইলব্যেক নাই ত কী কইরব্যেক ?’

       কথা আটকে আটকে গেলেও গাঁজার নেশাতে বুঁদ হয়ে কথা বলেই যাচ্ছিল পরান, ‘দেক ওই মাগিটাকে আ-আগল্যাই না রাইখ্যে আরও পাঁচ ঘাটের জল খা। আর হ্যাঁরে ওই শালা প-পরিমলকে মদের নেশাটা ক্যে ধর‍্যাই ছিল ? আমি ধ-ধর‍্যাইচি বুজলি। আমিই বইল্যেছিলম হাঁইড়্যা না খ্যালে তর পে-পেটের রোগ সা-সাইরব্যেক নাই। বাস ওইটুকু কতাতেই… কিন্তু তকন তর খুড়ি বাইচ্যেছিল বল্যেই তপনা ফুট্যাইছে… কীর‍্যে তপনা মিছা কতা বলছি ?’ সম্মতি জানিয়েছিল তপনা।

‘…শুন সরকার মুখ্যেই বইলব্যেক একশ দিনের কাইজ পাঁচশ দিনের কাইজ কিন্তু কে-কেল্যা কাইজ দিব্যেক। বচরে ওই দশ-পনের দিন। ইখানের রুখাশুখা জমি চাষ লয় বাঁশ হব্যেক। শুন পারিস ত হাবল্যাকে হাঁইড়্যার নেশাটা ধরা। উয়ার বউটাকে দেক্যেছিস ? শালা ক-কলশির পারা পাছা। ওই মাগিটাকে না খাল্যে আমার ঘুম ধইরব্যেক নাই। তবে হ ওই কাবেরী আমাদের সবার। তুইও খা আমরাও খাই। কেউ বলার নাই। আরেকটা কতা ওই হাবল্যাকে যদি নেশা ধরাত্যে পাইর‍্যেছিস তাহল্যে বাউরি বাঁধের যে মাটিকাটা হব্যেক উটাতে তোকেই সুপার-ভইজার কৈরব। কীরে সত্যবান ঠিক বইল্যেছি ত ?’     

এতক্ষণ পর্যন্ত মহিমের রাগ খুব বেশি ওঠেনি। ও ভাবছিল পরান নেশার ঘোরে বকছে, কিন্তু এর পরের কথাগুলো সহ্য হয়নি ওর। বারেক্কে গাঁজার নেশাটাও চাপছিল পরানের মাথায়। দুলছিল পরানের মাথাটাও, ‘এই যে তর বউটার শরীদ খারাপ হৈল দ্যাখেই আমার ভি-ভিতরিটা আ-আঁকুপাঁকু কইরচ্চিল, এমনি এমনি ? শালা তর বউটার রোগ না হয়্যে যদি ত-তর হৈত তাহৈল্যে কী কৈত্ত ? এই শালা পরাইন্যার কাচেই শা-শাড়ি সায়া খু…’ আর কথাটা বলতে পারেনি পরান। হিংস্র নেকড়ের মতো ওর টুঁটি চেপে ধরেছিল মহিম। তপনা আর সত্যবান মিলে মহিমের চুলের মুঠি ধরে ঘাড়ে কামড় বসিয়ে কোনও রকমে ছাড়িয়েছিল। আর কয়েক সেকেন্ড হলে হয়তো…। বেশ কয়েক মিনিট পরানই মুখ দিয়ে শুধুমাত্র সাঁই-সাঁই এই একটা শব্দই বেরিয়েছিল। কোনও কথা বার হয়নি। ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপছিল পরান। মহিম যে এমনটাও করতে পারে এই ধারনা ছিল না পরানের। শুধু পরান কেন তপনা বা সত্যবানেরও ছিল না। ঘাড়ে কামড় দেওয়া আর চুল টেনে ধরার জন্য তপনা-সত্যবানও গাল ভর্তি চড় খেয়েছে। প্রতিবাদ করেনি ওরা। চুপচাপ হজম করে নিয়েছে।

       তবুও রাগটা কমেনি মহিমের। আর কমেনি বলেই কিছুতেই ওর ঘুম আসছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমটা কমে এলেও একটা ভ্যাপসা ভাব কিন্তু আছেই। হয়তো তাই ঘরের বাইরে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে মহিমের মন্দ লাগছিল না। ‘আচ্চা ওই কুকুরগুইল্যা আইজক্যে রাইত্যে আবার কাবেরীর ঘরে যাই নাই ত?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। প্রশ্নটার উত্তর হিসেবে মহিমের পা দুটো চলতে শুরু করে কাবেরীর ঘরের দিকে।

       ঝিঁঝিঁ ডাকা আঁধারে ডুবে আছে কাবেরীর ঘরটা। কারুর কোনও সাড়াশব্দ নেই। কাবেরীর ঘরের সামনে শুয়ে থাকা কুকুরটাও একবার মুখ তুলে আবার চোখ নামিয়ে নিয়েছে। এই গরমে অযথা ঘেউ-ঘেউ করার ইচ্ছে হয়তো ওরও নেই। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই কাবেরীর নাম ধরে ডাকে মহিম। খানিক বাদে আবার ডাকে… আবার…

কয়েক মিনিট পর দরজা খুলে কাবেরী দেখে মহিম দাঁড়িয়ে রয়েছে। মহিমকে ভেতরে ঢুকতে বলে দরজাটা বন্ধ করে দেয় কাবেরী। ঘরময় ছাগল আর ছাগলের পেচ্ছাবের উগ্রগন্ধ। উঠোনে বিছিয়ে রাখা খাটিয়াটাও ছাগলের গন্ধে মম করছে। খাটিয়ার নীচে ঢুকে হয়তো গাঁ-ঘষা দিয়েছে কাবেরীর ধাড়ি ছাগলটা। মহিম বসতে গিয়েও উঠে দাঁড়ালে কাবেরী বলে, ‘উখানে ক্যেন্যে ভিত্রে আয়।’

       এতরাতে মহিম হঠাৎ কেন ওর ঘরে এসেছে সেকথা জিজ্ঞেস করে না কাবেরী। হালকা হলেও পরানের ঘরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা কাবেরীর কানে এসেছে। সত্যবানের বউ কলতলায় কাকে যেন বলছিল। কাবেরীকে দেখে চুপ করে গিয়েছিল।

কাবেরীর বিছানায় বসে মহিম কাবেরীকে জিজ্ঞেস করে, ‘পাতি তামুক আচে ?’

‘আচে কিন্তু ভাজা নাই কাঁচা।’

‘কাঁচাতেই হব্যেক। টুকু আনত। চুনটা বেশি দিবি।’

পাশের অন্ধকার ঘরটা থেকে চুন-তামাক নিয়ে এসে কাবেরী জিজ্ঞেস করে, ‘পরাইন্যার সাতে তর গন্ডগোল ক্যেন্যে হৈল ?’

মহিম হাতের তালুতে তামাক রেখে সেটাকে চুন দিয়ে রগড়াতে রগড়াতে বলে, ‘এমনি। তা তুই শুনলি কুতায় ?’

‘শুনাবার লোকের অভাব নাই শুনার কান থাইকল্যেই হব্যেক। কলের পাড়ে সত্ত্যবানের বউ মেজকিকে বইলছিল।’

‘কী বইলছিল ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।

‘বইলছিল খুড়ার সাতে মহিমের আইজ হৈচে ওই মাগীটার লাইগ্যে। আমাকে দেইখ্যে চুপ মাইর‍্যেদিল। দেক মহিম উয়ার হাতে পাটির লকের ক্ষেমতা আচে। তুই খামকা খেদাইড়্যে টিকটিকি নিজের গায়ে তুলিস না।’ শান্ত গলাতেই কথাগুলো বলে কাবেরী।

‘তর লাইগ্যে কনুই ঝগড়া হয় নাই। হইচ্যে ভাদুর লাইগ্যে।’

‘ভাদুর লাইগ্যেই বা কেমন কইর‍্যে হৈল ?’

‘ওই শালা হারামি ভাদুক্যে লিয়ে যা খুশি বইলছিল। তপনা আর সত্ত্যবান না থাইকল্যে আইজ্যেই শালাকে ফুট্যাই দিতম।’

কাবেরী এতক্ষণ পর্যন্ত এটাই জানত যে মহিম পরানের সঙ্গে ঝগড়া করেছে ওর জন্য। কিন্তু যে মুহূর্তে শুনল যে ওর জন্য নয় ভাদুর জন্য সেই মুহূর্তেই যাবতীয় ভাললাগাটা কেমন যেন বিস্বাদ ঠেকল বুকের ভেতর। তবুও ভেতরের ভাবনাটাকে ভেতর ঘরে দমিয়ে রেখেই কাবেরী বলল, ‘বউকে লিয়ে বল্ল্যে সবারই গায়ে লাগে। যতই হক বউ এর টানটা ভিত্রের টান।’

কাবেরীর কথাটা ধরতে পারে মহিম। আর ধরতে পারে বলেই কাবেরীকে কাছে টেনে কোলের উপর বসিয়ে বলে, ‘আর ইটা কি শুদুই শরীদের টান ? ভিত্রের টান লয় ?’

‘উটা আমার চায়্যেও তুই নিজে ভাল জানবি।’

‘ইটা মনের টানলো সখী মনের। মনটা টানে বলেই ত থাইকত্যে লারি। তবে শরীদটাও বড টনটনায়।’ কথাটা বলতে বলতেই কাবেরীর ব্লাউজের ভেতর হাত ঢোকায় মহিম। আঙুল দিয়ে ঘষা দেয় কিচমিচ দানা দুটোয়। ডানাভাঙা পায়রার মতো ঝটপট করে উঠে কাবেরী। মহিম আরও জোরে ঝাপটে ধরে ওকে। পাশবিক শক্তিতে চটকায় ওর বুকদুটো। কাবেরীর ভেতরেও আগুন জ্বলে। আর সেই আগুনে ওর নিজের শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ এমনকি মহিমের লুঙ্গি-গেঞ্জি সব পুড়ে ছাই হয় ধীরে ধীরে। তারপর দুটো শরীর বেয়ে বৃষ্টি নামে। ভোর হয়…

।২০।

নার্সিং হোমে ঢুকে শান্তনুকে যে রুমটায় রাখা হয়েছে সেটার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় অন্তু। অন্তুর দেখাদেখি রাজাও। শান্তনুর রুমটার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। ছেলেটাকে চেনা-চেনা মনে হল অন্তুর। আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই চিনতে পারল। অনির্বাণ। হ্যাঁ অনির্বাণেই তো, অন্তুর সঙ্গে এক কলেজেই পড়েছে। কিন্তু ও এখানে কী করছে বুঝতে পারল না অন্তু। তাই আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। এবার অনির্বাণও অন্তুকে দেখতে পেয়েছে। অন্তুকে দেখতে পেয়ে সাততাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো অনির্বাণ।

‘তুই এখানে ?’ জিজ্ঞেস করল অন্তু।

‘আরে শানু তো আমার মামার ছেলে। জানতিস না ?’

‘না কই জানতাম না তো। তা শানু এখন কেমন আছে ?’ জিজ্ঞেস করল অন্তু।

অন্তুর প্রশ্নে অনির্বাণের মুখটা কালো মেঘে ঢাকা পড়ল এক নিমেষে।

‘কীরে কেমন আছে শানু ?’ এবার প্রশ্নটা এল রাজার মুখ থেকে। ওরা তিন জনই এক কলেজের ছাত্র। অনির্বাণের সঙ্গে খুবভাল বন্ধুত্ব না থাকলেও বন্ধুত্ব ছিল ঠিকই।

‘শানু আর নেই-রে ভাই। ঘণ্টা খানেক আগেই…’ কান্নাটাকে কোনও রকমে গিলে নিল অনির্বাণ। চোখদুটো ছলছল করে আসছে ওর। নাকটা সশব্দে কয়েকবার টেনে অনির্বাণ আবার বলল, ‘মামি যখন গেল তখনো ভালই ছিল। তারপর হঠাৎ যে কী হল! বলল বুকটা নাকি বাজছে, খুব বাজছে। শিল্পী সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলো। উনারা কী বুঝলেন কী জানি ইসিজি করেই আবার আই-সি-ইউ। তার একঘণ্টার ভেতরেই…’ আবার গলাটা ভারী হয়ে এলো অনির্বাণের।

       বাইকে আসতে আসতে ঠিক এমন কিছুই একটা ভাবছিল অন্তু। কেন এমন মনে হচ্ছিল ও নিজেও জানে না। তবুও ওর বারবার মনে হচ্ছিল শানু আর নেই। অনির্বাণের মুখ থেকে তাই শান্তনুর চলে যাওয়াটা শুনেও খুব একটা অবাক হল না অন্তু। সেদিন কৌশিকের চলে যাওয়াটা অন্তুকে খুব কষ্ট দিয়েছিল, খুব। তারপর যখন কৌশিকের জীবনের ইতিহাস শুনল ও ? তখন কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়েছিল। একরকম ভাবে ভুলেই গিয়েছিল কৌশিকের যাওয়াটা। আজকে আবার শান্তনু…। যদিও শান্তনু কোনওদিনই অন্তুর বন্ধু ছিল না। তবুও ফুটবল মাঠের সেই চিরপরিচিত মুখটাকে আর দেখা যাবে না ভেবেই অন্তুর ভেতরটা মুচড়ে উঠল বারবার। এই মুচড়ে ওঠা পর্যন্তই মানুষের প্রতি মানুষের টান। বাকিটা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয় আজকাল। কত মানুষ আসছে যাচ্ছে কে তার হিসেব রাখে ? বুকটা মাঝে মাঝে মুচড়ে মুচড়ে ওঠে এটুকুই যা।

‘আমার মনে হয় পা বাদ চলে যাওয়াটাই মেনে নিতে পারল না শানু। শুনেছি দিনরাত শুধু ওই কথাটায় বলত। এই জন্যেই হয়তো হার্টফেল করেছে। আসলে যারা মন প্রান দিয়ে খেলাটাকে ভালবাসে তাদের পা চলে যাওয়াটাই মৃত্যু। ও জাতীয় দলের প্লেয়ার হয়তো ছিল না কিন্তু খেলত তো ভেতর থেকেই। ওই খেলাটাই তো একমাত্র স্বপ্নছিল ওর…’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে অনির্বাণ। হয়তো শান্তনুর এই অসময়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না বলেই নিজের ভেতর জোড়াতালি দিয়ে ওর যাওয়াটার কারণ খুঁজছে।

       অনির্বাণের একটা কথাও কানে ঢুকছিল না অন্তুর। ও শুধু ভাবছে কীভাবে সামলাবে শিল্পীকে। শিল্পীর কাছে ওর দাদার চলে যাওয়াটা তো কোনও সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। বাবার মৃত্যুর পর শান্তনুই তো ছিল ওর আদরের অভিভাবক। আর শিল্পীর মা ? ভাবতে পারে না অন্তু। ভাবতে গিয়ে ভয় হয় ওর। স্বামীর মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে ছেলে মেয়ে দুটোকে মানুষ করার পরেও যদি অসময়ে…

‘তুই একবার ভেতরে যা অন্তু। শিল্পী একা আছে।’ অন্তুর কাঁধে হাত রেখে কথাটা বলে রাজা। অন্তুর ভেতরের ভাবনাগুলো ও হয়তো বুঝতে পারছে।

অন্তু ভেতরে গেলে রাজা অনির্বাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁরে কাকিমাকে জানিয়েছিস ?’

‘মাথা খারাপ হয়েছে তোর, হঠাৎ এমন খবর দিলে উনারও কিছু হয়ে যেতে পারে।’

‘কিন্তু শানুর বডিটা তো বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। তখন তো উনি…’ রাজার জিবও আড়ষ্ট হয়ে আসছে। জল জমা হচ্ছে চোখের পাতায়। খুব ইচ্ছে করছে শানুর মুখটা একবার দেখার কিন্তু সেই সাহস ওর নেই। শান্তনু ওর গ্রামের ছেলে। পাড়ার ছেলে। এক সঙ্গেই বড় হয়েছে ওরা…

‘সে দেখা যাবে। কিন্তু এখন জানলে বিপদের সম্ভাবনা অনেক বেশি।’

‘আমার কিন্তু বেশ চাপ লাগছে অনি। কাকিমা নিজেকে আদৌ সামলাতে পারবেন তো ? অমল কাকু মারা যাওয়ার পর থেকে ওই শানুই তো কাকিমার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় ছিল বল। শিল্পী তো একদিন বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে কিন্তু কাকিমা থাকবে কী নিয়ে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’

‘তুই তো তাও অতদূর ভাবছিস আমি সেটাও তো ভাবতে পারছি না। এই খবরটা শোনার পর মামিরই না…।’ কথাটা ইচ্ছে করেই শেষ করল না অনির্বাণ। কিছু কথা শেষ না করেই মানুষ বেশি শান্তি পায়। নিজের কাছে নিজের মন ভোলানো সান্ত্বনা থাকে একটা।

সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে শান্তনুর মুখটা। শিল্পী শান্তনুর বেডের নীচে বসে বেডের একটা পায়ায় মাথা হেলান দিয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনও নড়নচড়ন নেই শরীরে। মাঝেমাঝে মাথাটা দুলছে। নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বলেই হয়তো দুলছে মাথাটা। শিল্পীর ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় অন্তু, কিন্তু কী দিয়ে শুরু করবে সেটা বুঝে উঠতে পারে না। মুখে কোনও শব্দের যোগান আসছে না যে। শেষ পর্যন্ত শিল্পীর মাথায় হাত রাখে অন্তু। ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে কান্নাটাকে গিলে ফেললেও চোখের জল আটকে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তুকে দেখার পর যেন কান্নার একটা আশ্রয় খুঁজে পায়। উঠে দাঁড়ায় শিল্পী।

‘দাদা আর নেই…’ বলেই অন্তুর বুকে মাথা রেখে হো-হো করে কাঁদে ফেলে।

শিল্পীকে বলার মতো কোনও সান্ত্বনা বাক্য খুঁজে পায় না অন্তু। যদিও কোনও মৃত্যুরই কোনও সান্ত্বনা থাকে না। তবুও তো কিছু একটা বলতে হয়। কাঁদিস না, কী আর করবি জন্মমৃত্যুতে তো কারুর হাত নেই… এমন কিছু একটা। কিন্তু বলতে পারে না অন্তু। কোনও মূল্য নেই এমন সব কথার।

‘জানো সকালে নিজের হাতে ছানারুটি খেয়েছিল দাদা…’ কথাটা বলতে গিয়ে শিল্পীর চোখ বেয়ে আরও কয়েক ফোঁটা জল অন্তুর বুকে গড়িয়ে পড়ে। তবুও অন্তু অসাড়ের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এতোটা নিস্পন্দ থাকার কথাও তো ছিল না অন্তুর! তবে কী ধীরে ধীরে আত্মগত হয়ে পড়ছে ও ? কমছে অন্যের প্রতি ফিলিংসগুলো ? নাকি বারবার তিতলির ফোন আর মেসেজ অন্তুকে অতীতে টানছে ?

‘মাকে কী বলব আমি ? হ্যাঁ মাকে বলবটা কী ? মা তো দাদার পা বাদ চলে যাওয়াটাই মানতে পারছিল না। এবার ? এবার কী বলব আমি। তুমি দেখো মাও এবার… হ্যাঁ মা সহ্য করতে পারবে না। একা হয়ে যাব আমি, সম্পূর্ণ একা। যে যার তালে আছে, সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাচ্ছে। বাবা-দাদা কারুরই কিন্তু যাওয়ার কথা ছিল না। দাদা বলেছিল, তোর বিয়েতে কোটপ্যান্ট করাব আমি। পুরো ব্ল্যাক। দাদা চলে গেল। আমার কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে… আচ্ছা কেন এমন হল ? দাদা কার ক্ষতি করেছিল ?’ শিল্পীর কাঁধ দুটোকে ঝাঁকিয়ে অন্তু ওকে শান্ত হতে বলে। মুহূর্তের ভেতর চুপ করে যায় শিল্পী। এই মৃত্যু এই কান্না কোনটাই কেন যেন ভাল লাগছে না অন্তুর।

রাজা ভেতরে ঢোকে। শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে, ‘শানুর দেহটা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কী বলছে নার্সিং হোম ? পোষ্ট মর্টেম হবে-টবে এসব কিছু বলেছে ?’ কথাটা বলার পর শান্তনুর ঢেকে রাখা মুখটার দিকে একবার তাকায় রাজা। সঙ্গে সঙ্গে দমকা কান্নার একটা স্রোত উগরে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নেয় রাজা।

‘না ওসব কিছুই বলেনি। আমি জিজ্ঞেসও করিনি। শুধু বলেছে টাকাটা জমা করলেই…। মা আজকে টাকার জোগাড় করতেই বাড়ি গেছে।’

‘কেমন কি লাগবে কিছু বলেছে ?’ এতক্ষণে পরিষ্কার ভাবে মুখ খোলে অন্তু।

‘বিরাশি হাজার।’

‘বিরাশি হাজার ?’ শব্দ দুটো নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে অন্তুর গলা দিয়ে।

‘ত্রিশ হাজার আগেই লেগেছে।’

‘কিন্তু এতোটা টাকা কাকিমা পাবে কোথায় ?’ জিজ্ঞেস করে রাজা।

‘মা বিরাশি জানে না মা জানে হাজার ষাট লাগবে। শেষবার আই-সি-ইউ নিয়ে যাওয়ার জন্য যে খরচাটা হয়েছে সেটা তো মা জানে না…’ কোনক্রমে চাপা দেওয়া কান্নাগুলো আবার বেরিয়ে আসতে চাইছে।

‘কিন্তু ষাট হাজার টাকাই বা পাবে কোথায় ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘আমি সেটা জানি না। তবে শুনেছি আমার বিয়ের জন্য জমানো কিছু টাকা আর কিছু গয়না আছে।’

‘দেখ আমার মনে হয় এবার কাকিমাকে খবরটা দেওয়া দরকার…’ রাজা বলে।

‘না না মাকে বোলো না মা শুনলে…’

‘কিন্তু না শুনলে তো শানুর শরীরটা এখানে এভাবেই পড়ে থাকবে। আমাদের কারুর তো অতটা টাকা নেই, যে জমা দিয়ে শানুর বডিটা নিয়ে যাব…’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুটাকেও মানিয়ে নিচ্চে মনগুলো। ওরা সামলে উঠছে ভেতরে ভেতরে। এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়। এখন টাকা জমা করে শান্তনুর লাশটা নিয়ে যাওয়ার সময়। লাশ ? হ্যাঁ লাশই তো। মানুষ মরলেই তো লাশ হয়ে যায়। তখন তাকে মড়া বলেই ডাকা হয়। লোকে কোনও নামকে পোড়াতে শ্মশানে যায় না, যায় মড়া পোড়াতে। যায় একটা লাশের দাহ করতে। এটাই নিয়ম এটাই নিয়তি।        

।২১।

‘খুশি দিনের অলস কোনে

অতীত যেদিন পড়বে মনে

সেদিন যদি আমার কথা

নাইবা মনে রয়

স্মৃতিটুকু দেবে আমার

ছোট্ট পরিচয়।’

-মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে মেসেজটা। শান্তনুকে দাহ করে আসার পর অন্তুর যখন ঘুম এলো তখন ভোর হব-হব। সারা দিনরাতের ক্লান্তিতে শুতে না শুতেই চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল। বেলা দশটা নাগাদ যখন ঘুম ভাঙল তখন জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। অন্তুর মুখে রোদ পড়ছিল বলেই ঘুমটা ভেঙেছে ওর। সময় দেখার জন্য মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে একটা মেসেজ এসেছে। তিতলির মেসেজ। সকাল সকাল মেজাজটা বিগড়ে গেল অন্তুর। অন্তত এই সময়টুকু শিল্পীকে ছাড়া অন্যকিছু ও নিজেও ভাবতে চায় না। শানুর চলে যাওয়াটা মা-মেয়ে কেউই মেনে নিতে পারছে না। আর মেনে নেবেই বা কেমন করে ?                     

       গতকাল বিকেলে শিল্পীদের বাড়িতে গিয়ে রাজাই শিল্পীর মাকে সব বলেছিল। বলেছিল নয় বলতে বাধ্য হয়েছিল। এত বড় একটা খবর শোনার পরেও একফোঁটা চোখের জল ফেলেনি শিবানী। শান্তনুকে আনার পরেও কাছে যায়নি ওর। পাথর হয়েছে মায়ের বুক। এই ভয়টাই তো পাচ্ছিল সবাই। অন্তু পাশে গিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু একটাও কথা বলেতে পারেনি। শুধু ঘামছিল দরদর করে। শ্মশান থেকে মাঝ রাতে অন্তু শিল্পীকে ফোন করে জানতে পেরেছিল, এখন ঘুমোচ্ছে তবে একবারও কথা বলেনি কারুর সঙ্গে।

আর বিছানায় ভাল লাগছে না। ঘাম দিচ্ছে খুব। বিছানা থেকে উঠে খালি গায়েই বাইরে বেরিয়ে আসে অন্তু। মা ঘরে নেই। খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। ঘুম জড়ানো চোখেই বাড়ির পিছন দিকের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় অন্তু। সূর্যের আলোয় চোখ জ্বালা করছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে রিং করে তিতলির নতুর নম্বরে। রিং হচ্ছে ওপারে।

‘এই ফোনটা ধরে চুপচাপ থাকবে না একদম। কী বলতে চাও সেটা বলো।’ অন্তুর গলায় ঘুম জড়িয়ে রইলেও গলাটা বেশ ঝাঁঝাল শোনাচ্ছে। বিরক্তিটাও পরিষ্কার।

‘কেমন আছো ?’ খুব মৃদু শব্দে ওপার থেকে ভেসে এলো প্রশ্নটা। অন্তু খেয়াল করে তিতলির গলায় কোনও পরিবর্তন আসেনি। সেই মিষ্টতাও কমেনি একবিন্দু। অন্তুর চোখের পাতায় ভেসে উঠল সেই হাসি হাসি মুখটা।

‘ভাল আছি। তুমি কেমন আছো ?’ এবার অন্তুর গলাও বেশ নরম। সেই হারানো সুর এখন অন্তুর গলাতেও।

‘ওই চলছে।’ এবার তিতিলির গলায় বিরক্তি। ঠিক বিরক্তি নয় ক্লান্তি কিংবা অন্যকিছু। ‘তুমি কি এই ঘুম থেকে উঠলে ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।

‘হ্যাঁ এই উঠলাম।’

‘এত অবেলায় ?’

‘আসলে গতকাল রাতে এক বন্ধুকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়েছিলাম, তাই…’

‘কোন বন্ধু ? কী হয়েছিল ?’

‘পাশের গ্রামের। ট্রাক এক্সিডেন্ট।’

খুব মৃদু শব্দে মুখ দিয়ে চুক-চুক করে তিতলি। ‘মন খারাপ কোরো না। কী আর করবে করারও তো কিছু নেই।’

‘ওই মন খারাপটাই তো করার আছে তাই ওটাই করছি। ছাড়ো বাদ দাও বাকি সব খবর কেমন ?’

‘বাকি সব বলতে ?’

‘ওই তোমার মা কেমন আছে ? কী করছ এখন ?’

‘মা ? মা বিন্দাস আছে। আর আ…মি, আমি এখন শুকনো সংসার করছি ?’

‘সংসার করছ ? বাঃ। তা বিয়ে করলে কখন ?’ অকারণে এবার অন্তুর গলাটা ভারী হয়ে আসে। না ঠিক অকারন নয় গলাটা ভারী হওয়ার কারণ তো একটা আছেই।

‘বিয়ে ?’ হাসতে থাকে তিতলি। ‘একটা পুরুষের হাত থেকে অনিচ্ছায় সিঁদুর পরাটাকে কি বিয়ে বলে ? বলে না তাই না ? তাই সেই পুরুষের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে থাকাটাকেও সংসার করা বলে না নিশ্চয় ?’

অন্তু কিছু না বলে চুপ করে থাকে। কারন ও এটা ভাল মতোই জানে স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকা কোনও মেয়েই তার আগের প্রেমিককে ফোন করবে না। ফোন তারাই করে যারা আগের প্রেমিকের কথা নীরবে ভাবতে থাকে। আর ভাবনা তাদেরেই আসে যারা স্বামীকে ভালবাসতে পারে না কিংবা স্বামীর ভালবাসা পায় না। তবে কারু-কারু ক্ষেত্রে আগের প্রেমিককে না ভোলার একটা প্রবণতাও দেখা যায়। তিতলি কোন পর্যায়ের সেটাই ভাবতে থাকে অন্তু।          

‘কী ভাবছ ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।

‘কী ভাবা উচিৎ আর কী ভাবা উচিৎ নয় সেটাই ভাবছি।’

‘তুমি সেই আগের মতোই আছো কোনও পরিবর্তন হয়নি। এখনো আগের মতোই হেঁয়ালি করে করে কথা বলো।’

‘আগে কেমন ছিলাম সেটাই তো ভুলে গেছি। তাহলে বলি কেমন করে আগের মতো আছি না পাল্টে গেছি? তা তোমার বিয়েটা হয়েছে কোথায় সেটা তো বললে না…’

‘টাউনেই হয়েছে।’

‘পুরুলিয়াতেই ?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী করে ছেলে ?’

‘আরও দুএকটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। রাত কাটায়। আর রাত কাটায় মানে অবশ্যই ওটাও করে। তাই না ? মদ খায়। এমন আরও অনেক কিছুই করে। তবে এগুলোর টাকা জোগাড়ের জন্য পুলিশে চাকরিও করে। টুকটাক রাজনীতিও করে। এবার তুমি বলো কী করে না ?’

‘সত্যিই মহাপুরুষ তো দেখছি। আর উনি এই সব করে বলেই তুমি অতীতে অতীতে ঘুরে বেড়াও ?’

‘ঘুরে বেড়াব কেন ? আমি তো অতীতেই আছি। বেশ ভাল আছি। যতদিন বাঁচব ওখানেই বাঁচব। বর্তমান ভবিষ্যৎ আমাকে টানে না।’

‘তাহলে আমাকে কল বা এস-এম-এস করো কেন ? আমি তো বর্তমানে বাঁচি।’

‘বর্তমানে বাঁচ বলেই তো অতীতে ডাকি। আমার একলা অতীত ভাল লাগে না। কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা, সব খালি মনে হয়…’

‘হুম বুঝলাম।’

‘কী বুঝলে ?’

‘পরে বলব। এখন একটু কাজ আছে। এখন রাখি।’

‘আচ্ছা কখন কল করব বলো ?’

‘করার দরকার নেই আমিই করে নেবো। বাই।’ ফোনটা রাখার পর দূরের মাঠ গুলোর দিকে তাকায় অন্তু। ফসলের স্মৃতি বুকে নিয়ে মাঠগুলো পড়ে আছে। ওরা তিতলির মতো শুধু অতীতের গল্প জানে। ওরাও শূন্য। এই তো কদিন আগে শিল্পী কার যেন একটা কবিতা সেয়ার করেছিল। কবিতাটা খুব ভাললেগেছিল অন্তুর। জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া কবিতা। ভাল লেগেছিল বলেই সেদিন সেভ করেছিল কবিতাটাকে। আজকে অন্তুর মনে হচ্ছে কবিতাটা কোথাও না কোথাও যেন ওর জন্যেই লেখা।

       ঘরে ঢুকে বিছানা থেকে স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে কবিতাটা খোঁজে অন্তু। ইমেজে সেভ করা আছে। একটা অন্ধকার ঘরের কালো দেওয়ালে সাদা কালিতে লেখা। কবির নাম নেই। হয়তো শিল্পী যার আইডি থেকে সেয়ার করেছিল তারই কবিতা হবে।

একলা আকাশ

আমার জানালায় একমুঠো

জীবন্ত একলা আকাশ

ফাঁকা মাঠে চেয়ে দেখি

সাইকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় স্মৃতির পাখি

দূর থেকে সুদূরের অতীত দিগন্তে

মাটির ফাটা-বুক থেকে রোদ

রোজ যখন সর্পিল ধোঁয়ার মতো রস চুরি করে

আমার একলা ঘরে পরিযায়ী প্রেমিকাদের আত্মা

ছায়ার শরীরে ভিড় করে দেওয়ালের গায়ে

আমার মনেও রস ছিল বুঝি ?

কোনও এক আম বকুল গন্ধ ভেজা দুপুরে ?

তারপর ডাহুক ডাহুকী মিলে

পালকের মতো নরম সন্ধার চাদর মেলে দেয়

গাছের পাতায় পাতায়।

আমি দেখি কারা যেন খিল-খিল করে হেঁটে চলে যায়

আমার চোখে ধারালো নখে জলের আঁচড় কেটে

ফেলে আসা মেঠো মনের রাস্তায়।

-কবিতাটা পড়ার পর মনে মনে হাসে অন্তু। বড্ড ম্লান সে হাসি। একটা সময়ছিল যখন সকাল-সন্ধা তিতলির স্মৃতি ভিড় করে আসত মনের পাতায়। চোখের পাতা ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। কী ভীষণ একা লাগত সেদিন নিজেকে। মনে হত এই দুঃখ এই যন্ত্রণা কোনওদিন কমবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি ম্লান হয়ে এসেছে। চোখের পাতাও শিখে গেছে জল লুকিয়ে ফেলতে। এর পরেই তো নদীর রূপে শিল্পী এসে ধরা দিয়েছে। আরেক নতুন জীবন। নতুন স্বপ্ন। তিতলি তো অতীতের কাছেও অতীত বলে মনে হত এতকাল। কিন্তু আজ এতদিন পর তিতলির সঙ্গে কথা বলে অন্তুর শুধুই মনে হচ্ছে ধুলো ধরা গিটারটায় কে যেন টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কান বন্ধ করলেও শোনা যাবে সেই সুর।

এদিকটায় খুব একটা আসা হয় না শিল্পীর। এদিকেই শ্মশানটা। দিনের বেলাতেও কেমন যেন গাঁ ছমছম করে। এদিকের নদীর পাড় জুড়ে ভাবরি আর শেয়াকুল কাঁটায় ভর্তি। নদীর দুপারের দুটো গ্রামের মানুষই এখানে দাহ করতে আসে । সারা বছর কমবেশি জল পাওয়া যায় এখানটাতেই। শিল্পী একটা পলাশ ঝোপের আড়ালে চুপচাপ বসে। নদীর কোনও পার থেকেই ওকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু শিল্পী দেখতে পায়, নদীর একটা জায়গায় পড়া কয়লা ছড়িয়ে রয়েছে। তার পাশেই কাঁথা বিছানা বালিশের স্তূপ। কত রকমের ফুলের তড়া, ফুলের মালা। শান্তনুকে পোড়ান হয়েছে ওখানেই। আর ওই ফুলগুলো দিয়ে গেছে নবারুণ ক্লাবের ছেলেরা। ওদের হয়েই তো খেলত শান্তনু। গত দু’বার যুবউৎসব ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যান-অফ-দ্যা-সিরিজ ছিল শান্তনু। শান্তনুর চিতাটার থেকে কিছুটা দূরে আরও একটা চিতা। পড়া কয়লার জমা করা স্তূপ ওখানেও। ওটা কৌশিকের। এক মাসের ভেতর এক গ্রামের দু’দুটো লাশ পেয়েছে নদীটা।

শান্তনুর চিতাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চুড়িদারের হাতা দিয়ে চোখের জল মোছে শিল্পী। শান্তনুর চলে যাওয়াটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। ‘ঝিলপি ওই ঝিলপি তোর কোনও সুন্দরী বান্ধবী থাকলে…’ এই কথাটা মাঝে মাঝেই বলত শান্তনু। বিরক্ত হত শিল্পী। খুব বিরক্ত হত। আর এই কথাটা বলবে না শান্তনু, কোনওদিন বলবে না। শান্তনুর এক একটা কথা যত মনে পড়ছে কান্নাটা ততই গাঢ় হচ্ছে শিল্পীর। ভাইবোন মিলে দাবা খেলা থেকে শুরু করে কিৎকিৎ ক্রিকেট সব ভিড় করে আসছে আজ চোখের পাতায়। ওড়নাটাকে মুখে চাপা দিয়ে নদীর এপারে বসে কাঁদতে থাকে শিল্পী। ওপারে বাঁশ বাঁধাবাঁধি চলছে। ষ্টেজ বানানো হচ্ছে। ঠিক যেন নতুন জীবনের আয়োজন।

।২২।

একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। অনেকটা ঠিক পূর্ণিমার মতোই দেখতে। মেয়েটা ছাগলের বাচ্চা দুটোকে নিয়ে খেলছে। কোঁকড়া চুল, টানা টানা চোখ, ফর্সা টুকটুকে গায়ের রঙ। কীযেন বলছে ছাগলের বাচ্চা দুটোকে। রান্নাঘরে বসে কাবেরী সেটা শোনার চেষ্টা করেও শুনতে পাচ্ছে না…

‘মাগী তর লইজ্জ্যা সরম নাই ? নিজের ভাতারটাকে খায়্যেও তর পেট ভরে নাই মাগী ? তর আবার শিশুযৌইবন হইচ্যে। পরের মরদ লিয়ে ফুত্তি মারিস হারামজাদী। সায়ার নিচ্যে ডানা গজ্যাইচ্যে লয় ? আমার বাপ কী দোষটা কইর‍্যেছিল-লো মাগী যে উয়াকে মার খুয়ালি ?…

       এতক্ষণ পর্যন্ত সুন্দর একটা স্বপ্নে ডুবেছিল কাবেরী। একটা ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্নে। মাতৃত্বের স্বপ্নে। মহিম যাওয়ার পর সাত সকালের ঘুমটা একটা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল। ঠিক এমন একটা স্বপ্নই তো কাবেরী দেখে এসেছে এতকাল। বিধবা জীবনের বন্ধা জমিতে মাতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে কার না ভাললাগে। এতদিন এই স্বপ্নটা দেখতে ইচ্ছে করলেও ভয় হত কাবেরীর। সমাজচ্যুত হবার ভয়। অসতীত্বের কলঙ্ক লাগার ভয়। মহিম জীবনে আসার পর থেকে স্বপ্ন দেখতে ভাললাগে। স্বপ্ন সাজাতে ভাললাগে। ইচ্ছে করে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে আবার সব নতুন করে শুরু করতে। কাবেরী এটুকু বুঝতে পারে মহিম ঘর বাঁধার গান গাইতে পারে। একজীবন বাঁচার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট।

       এত সুন্দর স্বপ্নটা মাটি হল ফুলকির চিৎকারে। ফুলকি পরানের মেয়ে। গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগেই পেট করিয়ে বসেছিল…। ওসব কথা থাক এখন। ফুলকি গাল দিচ্ছে মানে নিশ্চয় কারু মুখে শুনেছে গত সন্ধার ব্যাপারটা। বিছানা ছেড়ে উঠোনে বেরিয়ে আসে কাবেরী। এখনো ফুলকির মুখ থেকে ফুলকি বেরিয়েই চলেছে। কাবেরী পাত্তা না দিয়ে উনুনে ডালপালা গুঁজে আগুন ধরায়। বেলা ভালই হয়েছে। ফুলকির সঙ্গে মুখ লাগতে যাওয়াটা নেহাতেই মুর্খামি হবে সেটা ভাল মতোই জানে কাবেরী। গালা গালিতে ফুলকি ডিলিট পাওয়া। এখন অনায়াসে নতুন নতুন গালাগালি আমদানি করতে পারে। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে গালি দিতেই থাকে। যেদিন কারুর সঙ্গেই কিছু হয় না ? সেদিন পুরনো ঝগড়ার রেশ ধরে গালি দেয়। মোটকথা গালি না দিয়ে ফুলকি বাঁচবে না। আজকে সকালে কাবেরীকে গালি দেওয়া সবে শুরু হয়েছে নতুন কোনও কেস না পাওয়া পর্যন্ত এটা চলতেই থাকবে।

       মুখ ধোয়ার পর চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে কাবেরী স্বপ্নটাকে নিয়ে ভাবতে থাকে। এতদিন তপনা কোত্থেকে কোত্থেকে পিল এনে গেলাত…

‘আইজক্যে মাসের কত হৈল ?’ নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে কাবেরী। ঠিক মনে করতে পারে না। চা এর কাপটা হাতে নিয়েই ঘরের ভিতরে যায়। বাংলা ক্যালেন্ডার খুলে বার মিলিয়ে দেখে। ‘আইজ আঠ্যাইশ চৈত্ত। মানে কাইলক্যে নীল পূজা। পরশু চড়ক।’ ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে আবার খাটিয়ার উপরেই বসে কাবেরী। খুব মনোযোগ দিয়ে কর গোনে। ‘…নয় দশ এগার বার । মানে বারদিন পার হৈচ্যে এখনো শরীদ খারাব হয় নাই…’

‘কাবেরী এই কাবেরী ঘর‍্যে আচিস ?’

‘দিদিমুনির গলা না…’ ডাকটা আরেকবার শোনার অপেক্ষা করতে থাকে কাবেরী।

‘কাবেরী…’

‘যাচ্চি দিদিমুনি…’ হড়বড় করে এসে দরজাটা খোলে কাবেরী। ‘আসুন ভিত্রে আসুন। তা বহুদিন পর মনে পইড়ল বড ?’

‘মনে পড়ল্যেই কী উপায় আচে বল। এক সকাল সেন্টার, তারপর রান্নাবান্না কত্ত্যে কত্ত্যেই দুপুর। ইবার সিনান কইর‍্যে দুটা খাবি না গপ্প কত্ত্যে আসবি ?’

‘হঁ সেটা ত বঠেই। আপন আপন সংসারের কাম-কাইজ কত্ত্যে কত্ত্যেই বেলা শেষ। তা একন কুতায় গেইচল্যে ?’

‘বলচি বলচি টুকু জল দ্যে আগে, যা গরম। আর হ্যে-লো ওই মেয়্যাটা কে বঠে ? ডবাটার ওই দিকে দাঁড়াই গাইল দিচ্চ্যে দেইখলম…’

‘উটা পরানের বিটি…’ কথাটা বলেই ঘরের ভিতর ঢুকে মাটির কলশি থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে আসে কাবেরী। ‘উ মাগীর গাইল দিয়্যা ছাড়া আর কাইজ কী…’

‘তা তকে গাইল দিচ্চ্যে ক্যেন্যে ?’

‘আর বইল না, কাইল সন্দ্যায় মহিম নাকি পরাইন্যাকে মাইর‍্যেচে…’

‘ক্যেন্যে মাইর‍্যেচ্যে ক্যেন্যে ?’

‘মহিমের বউ এর নামে নকি কীসব বইল্যেছিল তাই টুটি চিপ্যে ধইর‍্যেচ্যে। আর পরাইন্যার বিটি ভাইব্যেছে আমি পাঠাইছি উয়ার বাপকে মাত্ত্যে।’

‘শুন ওই পরাইন্যার ল্যাঠায় থাকিস না। উয়ার অসাধ্য কনো কাইজ নাই।’

‘সেটা আর আমার চাইত্যে ভাল কে জানে। তা তুমি একন কুতায় গেইচল্যে বলল্যে নাই যে ?’

‘আমি গেইছলম সোনাপুর।’

‘এই সাত সকালে সোনাপুর ?’

‘উঁ গাঁয়ের দিদিমণির ছেইল্যাটা মইর‍্যেচে নাই। সত্তি মানুষ্যের জীবনের কনুই দাম নাই। শিবানী ত কত ভাল মেয়্যা। কনদিন সেন্টারের দুপয়সা মার‍্যে নাই। কেউ বইলত্যে লাইরব্যেক কারুর সাতে কনদিন গণ্ডগোল লাইগ্যেচে। কিন্তু দেক ওই বিধবার মাতাতেই আইজ বাজ পইড়ল।’

‘ইমা কাইল রাইত্যে তাই দেকছিলম নদীর ঘাটে আগুন জলচ্যে। জলজ্যান্ত ছেল্যাটা ছিল যে গো দিদিমনি। হটাত কী হৈচিল ?’

‘টাকের সঙ্গে এক্সিডেন। একটা পা বাদ দিত্যে হৈছিল। তাও বাঁইচ্যে থাক…’

‘ওই ছেইল্যাটাই ত ফুটবল খেইলত লয় ?’

‘হঁ হঁ ওই ছেইল্যাটাই।’

‘কপাল বুজলি কপাল। শিবানীকে দেইখ্যে চিনাই যায় নাই। কথাও বইলচ্যে নাই কারুর সাতে। ইবার পাছে উয়ার কিচু হৈয়্যে যায়…। তাই ত বলি যতদিন বাঁচ ফুত্তি কইর‍্যে বাঁচ। আইজ মল্ল্যে কাইল দুদিন। তা হ্যে-লো তকে যে বইল্যে ছিলম একটা বিহাঁটিয়া কর, তা কল্লি নাই।’

‘বিহাঁ কর বল্ল্যেই মরদটা কুতায় পাব ?’

‘মেয়্যা মাইনষ্যের শরীদ থাইকল্যে মরদের অভাব হয় নাই। আমি যকন বিধবা হইচি তকন অন্তু হামা দিচ্চ্যে। আমি চাইল্যেই বিহাঁ কত্ত্যে পাত্তইম। করিনাই ছেল্যাটাকে মানুইষ কইরব বইল্যে। তর ত তেমন কিচু নাই দেদার বিহাঁ কত্ত্যে পারিস। তা ছাড়া এক একটা মরদের সাতে রাইত কাট্যাতে একন ভাল লাইগব্যেক কিন্তু দুদিন বাদেই মনে হব্যেক বাঁচার মত কিচুই নাই। তাই বলচি…’

হঠাৎ করেই মুখটা থমথমে হয়ে আসে কাবেরীর। এর ওর সাতে রাত কাটানোর গল্প মানুষ কত সহজেই বলে, কিন্তু কেউ জানতেও চায় না কেন ওকে এর ওর সাতে রাত কাটাতে হয়। মানুষ কতটা অসহায় হলে তবে গিয়ে অনিচ্ছায় শরীর দেয় সেটা কাবেরী জানে।

‘তপনার ত বউ বিটি আচে তাহৈল্যে উটার সাতে পিরিত করিস ক্যেন্যে ?’

‘আগুতে যা যা কইর‍্যেচি দায়্যে পইড়্যে কইর‍্যেচি। এখন ত উসব কিচুই করি নাই। মহিমকেই শাঙা কইরব ভাবচি। মানুইষটাও ভাল, খেয়াল রাকে। কেউ মন্দ কতা বইলল্যে পতিবাদ করে। সেই জন্যেই ত পরাইন্যা মার খাইচ্যে।’

‘তা হ্যেঁ-লো উয়ার বউ এর ত শুইন্যেচি…’

‘থাকুক বাঁইচ্যে, উটায় ত ভাল। যদি মানুইষটাকে সেবা কইর‍্যে সারাই তুইলত্যে পারি…’

‘ধুর পাগলী, উ রোগ সাইরব্যার লয়। তবে তুই যে মুখে সেবা করার কতাটা বললি ইটাই ত অনেক। তুই একদিন সুখি ঠিক্যেই হবি দেখিস।’

‘একটা কতা বইলব দিদিমণি ?’ চোখের পাতায় লজ্জা আর কৌতূহল মাখিয়েই প্রশ্নটা করে কাবেরী।

‘হঁ বল। এত লইজ্জ্যা পাবার দরকার নাই।’

‘দিন বার হৈল আমার শরীদ খারাব করে নাই…’

কাবেরীর কথা শুনে হেসে ফেলে অন্তুর মা। পরে হাসি থামলে বলে, ‘উটা অনেক কারণেই হৈত্যে পারে। তবে পেচ্ছাব টেস্ট করাই লিয়াই ভাল। দেকি কাইল যদি আইসত্যে পারি…’

‘কাইল ত নীলের পূজা…’

‘ইমা তাই ত। আমি ত অন্তুকে ফলমূল কিচুই আইনত্যে বলি নাই। দেকি বিকালে একবার বিবড়দা পাঠাইত্যে হব্যেক। তুই চিন্তা করিস না আমি সমুই কইর‍্যে আইস্যে টেস্ট কইর‍্যে দিব। একন মহিমক্যেও কিচুই বলিস না।’

‘আচ্চা সেটা না হয় হব্যেক ক্ষণ। ইবার টুকু চাঁ করি…’ অপরিচিত মাতৃত্বের আনন্দে কাবেরীর চোখ দুটো চক-চক করতে থাকে।

‘না না আর চাঁ কৈত্ত্যে হব্যেক নাই। ঢের দেরি হৈচে, ঘর যায়্যে রান্না কত্ত্যে হব্যেক। ছেল্যাটা আবার কী কচ্চ্যে কে জানে। আমি একন উঠি।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কথাগুলো বলে অন্তুর মা।

‘চাঁ কত্ত্যে বেশি দেরি হব্যেক নাই…’

‘না না আইজ থাক। ওই যেদিন টেস্ট কত্ত্যে আইসব সেদিন খাব।’ উঠে দাঁড়ায় অন্তুর মা। তারপর কাবেরীর মুখের উপর চোখ দুটোকে মেলে দিয়ে বলে, ‘কাঁচা আমগুলাইন খায়্যে শেষ কইর‍্যে দিস না। আচার করার লাইগ্যে কয়েকটা আমাকে দিস। একন আবার তর জিবে টক টানাবেক…’

লজ্জায় কাবেরীর মুখটা লাল হয়ে আসে। কি বলবে খুঁজে না পেয়ে অন্তুর মায়ের কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। হাসতে হাসতে অন্তুর মা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। কাবেরীও পিছনে পিছনে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। নটা-দশটা বাজতে না বাজতেই সূর্য আপন পরাক্রম দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। মাঠ ঘাটগুলোতে যেন আগুন জ্বলছে দাউ-দাউ করে।

       এক দৃষ্টিতে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকায় মাথাটা ঝিমঝিম করে আসে কাবেরীর। ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে কিছুক্ষণ। মাথার ঝিমঝিমানি কমলে চালের হাঁড়িটার দিকে এগিয়ে যায়। হাঁড়ি মুখে ঢাকা দেওয়া টিনের থালাটা সরিয়ে হাত ঢুকিয়ে চালের পরিমাণ দেখে কাবেরী। টেনেটুনে দিন তিনেক চলবে আর। তারপর…

       পেটে হাত বোলাতে বোলাতে হাসে কাবেরী। সে হাসির অনেক অর্থ হতে পারে। একদিন এই পেট বাঁচাতেই তো তপনাকে…। না না আজ আর অন্ধকার দিনগুলো মনে করতে চায় না কাবেরী। সেদিন আর কোনও উপায় ছিল না। কোনও দরজা খোলা ছিল না ওর জন্য।

পেটে হাত বোলাতে বোলাতে নাভির নীচ দিয়ে হাতটাকে শাড়ি সায়ার ভেতর অল্প ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায় কাবেরী। তলপেটের ভেতরটা অনুভব করার চেষ্টা করে। কিছুই বুঝতে পারে না তবুও অনন্দ হয় ওর। সব যেন কেমন নতুন নতুন লাগছে। হঠাৎ লতিকা দিদিমণির কথাটা মনে পড়তেই বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। খেজুর পালায় বেড়া দেওয়া বাথরুমটায় ঢুকে পা ফাঁক করে শাড়ি-সায়া তুলে দাঁড়ায়। পেচ্ছাব করে। তারপর পেচ্ছাবটার দিকে তাকিয়ে নতুন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে…

‘কা…বেরি এই কা…বেরি…’ হন্তদন্ত হয়ে কাবেরীর ঘরের উঠোনে এসে দাঁড়ায় মহিম। কাবেরী পরীক্ষা নিরীক্ষা ফেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ‘তপনা উয়ারা কেউ আইচিল ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম। ঘামে ওর পুরো শরীরটা ভিজে চবচব করছে। চোখ-মুখ দিয়ে উত্তেজনার ছাপ ঠিকরে পড়ছে।

‘না আসে নাই ত। ক্যেন্যে কী হইচ্যেটা কী ?’ মহিমকে এমন উত্তেজিত এর আগে কোনওদিন দেখেনি কাবেরী।

‘তা হৈল্যে শালারা…’

‘কী হৈচ্যে সেটা বলবি ত…’ এবার কাবেরীর গলাতেও যথেষ্ট উত্তেজনা।

‘না না হয়নাই তেমন কিছুই। মানে কী হইচ্যে বুঝলি উয়ারা মানে ওই উয়ারা ন…’

‘কী মানে উয়ারা উয়ারা কচ্চিস ? ঘর ভিত্রে টুকু বৈস। জল খা। তারপর বল।’

‘হঁ জল দে-ত এক গেলাস।’

‘আয় ভিত্রে আয়।’ কাবেরীর পিছনে পিছনে ঘরের ভেতর ঢোকে মহিম। বিছানায় বসে। এখনো ওর চোখ-মুখ থেকে উত্তেজনার ছাপ লেশমাত্র উধাও হয়নি। হঠাৎ করে মানুষ ভয় পেলে যেমনটা হয় মহিমকে দেখেও ঠিক তেমন মনে হচ্ছে।

‘লতিকা দিদিমুনি আইচিল।’ মাটির কলশি থেকে জল ঢালতে ঢালতে কাবেরী বলে।

‘রাস্তায় দেইখলম। তা কী বইলছিল দিদিমুনি ?’

‘না না এমনি আইচিল। ওই সনাপুর গেইছল ত তাই আইচিল…’

‘হঁ হঁ সনাপুরের দিদিমুনির ছেইল্যাটাই মইর‍্যেচে লয় ? ওই শানু না সনু কী যে বেশ নামটা ছিল ছেইল্যাটার। ধুর কেল্যা মনেও পড়ছ্যে নাই। চাইড়্যে ফুটবল খেইলত ছেইল্যাটা…’

‘হঁ ওই দিদিমুনির ছেইল্যাটাই। তা তুই কী বলচিলি বল।’ মহিমের চোখের দিকে তাকায় কাবেরী।

‘কাইলক্যের ওই ঘটন্যাটার লাইগ্যে আইজক্যে মামেগুয়ারা ষোলআনা ডাইক্যেচে। বইল্যেচে পায়্যে ধইর‍্যে ক্ষমা না খুইজল্যে পুলিশে যাব্যেক।’ মহিমের কপালে চিন্তার বক্ররেখাগুলো পরিষ্কার ভাবে দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যায়।

‘তর কনুই দোষ নাই আর পুলিশের ভয় দেকাল্যেই হোইয়্যে যাব্যেক ?’

‘ওই গলাটা টিপেছি নাই, উটাই ত দোষের। লোক্যে বইলব্যেক মুকে-মুকে হচ্চিল হাত তুইল্ল ক্যেন্যে ?’

‘হঁ হাত তুইলব্যেক নাই। আঁটকুড়ার ব্যাটাগুলার মুক ভাইঙ্যে দিতে হয়…। তুই ছাড় ষোলআনায় দাঁড়াই আমি যা-বলার বইলব।’

‘তুই মেয়্যালোক তারপর উখান্যে থাকিস নাই…’

‘তুইও ত থাকিস নাই।’

‘আমিই ত ছিলম।’ কাবেরীর চোখের দিকে তাকায় মহিম।

‘না তুইও ছিলি নাই। উয়ারা মিছা বইলচ্যে…’

‘হঁ ইটা বিশ্বাইস কইরব্যেক ক্যেন্যে ?’

‘ক্যেন্যে কইরব্যেক নাই ? আমি ত বইলব সন্দ্যাই আমার ঘরে ছিল।’

‘যদি বলে তর ঘর‍্যে কী কচ্চ্যিল ?’

‘উসব তকে ভাইবত্যে হব্যেক নাই। আমি একলাই সামলাই লিব। আমি যা বইলব তুই শুধু সেটাত্যেই হঁ বলবি। ওই তিন শালাকে আইজ ছাইড়ব নাই। বহুদিন ধইর‍্যে বতর খুইজছিলম। আইজ রসের ঝাল মিট্যাই দিব খালভরাদ্যের…’

‘অত সজা লয়, তুই উয়াদিকে চিনিস নাই…’

‘আমাকে আর চিনাত্যে হব্যেক নাই।’

‘ছটায় তাহৈল্যে মনসাতলায় চইল্যে আসবি। দেক টুকু বাদেই কেউ না কেউ আইসব্যেক খবুর দিতে।’

‘আসুক তকে ভাইবত্যে হব্যেক নাই। তুই ঘর যায়্যে ঘুমাবি যা।’

এই গ্রামের ষোলআনার বিচার বরাবর উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তের পক্ষেই গেছে। কখনো কখনো জীবন দিয়েও জরিমানা ভরেছে নীচের মানুষগুলো। মহিমের শৈশব অভিজ্ঞতা সেকথাই বলে। ঘরপোড়া গরু তো তাই সিঁদুরে মেঘ দেখেই ছুটে এসেছিল কাবেরির কাছে।

।২৩।

‘আচ্ছা এখন কি তোমার সাহসটা কমে গেছে ? চিন্তা করে দেখো তো সেদিন আমার বাড়িতেই… তাও আবার মা বাড়িতেই ছিল। ভাবতে পার…’

‘না না বিষয়টা সাহসের নয় সময়ের। তখন অতশত বুঝতাম না।’

‘তা এখন কি একটু বেশিই বোঝো না অন্যের বউ ভেবে ভয় পাচ্ছ ?’ হাসতে হাসতেই কথাটা জিজ্ঞেস করে তিতলি। তিতলির প্রশ্নের ধরণ দেখে অন্তুও হেসে ফেলে। ‘কি বল ঠিক বললাম কি না ?’

‘মোটেই না। ওসব কিছুই নয়। আসলে আমিই চাইছি না আবার নতুন করে কোনও সমস্যা তৈরি হোক। যেটা পেরিয়ে গেছে সেটা ভুলে যাওয়াই ভাল।’

‘কিন্তু যেটা পেরিয়ে যায়নি ?’

‘মানে ?’

‘তুমি চাইছ না নতুন সমস্যায় জড়াতে কারণ তুমি শিল্পী নামের একটা মেয়েকে ভালবাস। এই জন্যেই তোমার কাছে মনে হচ্ছে সব পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো সেই সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে আছি।’

ফোনটাকে বাঁ-কানে চাপা দিয়ে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। তারপর ধোঁয়াটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, ‘দেখো তিতলি এটা সত্যি যে আমি এখনো তোমার প্রতি দুর্বল। তোমার কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে আমার। কিন্তু আমি এটাকে কখনোই আর ভালবাসা বলতে পারি না। এটা জাস্ট একটা টান। প্রতিটা মানুষের এই পিছুটান থাকে। থাকতেই হয়। আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলো, যদি সত্যিই তুমি অতীতে দাঁড়িয়ে রয়েছ তাহলে তুমি বিয়েটা করেছিলে কেন ?’ অন্তুর গলাতে বিরক্তিটা পরিষ্কার এবার।

‘বিয়ে না করলেই কি তুমি ওই মেয়েটাকে ছেড়ে আসতে ? আসতে না নিশ্চয় ?’

‘না যেতাম না।’

‘তাহলে বিয়েটা বিষয় নয়। আর তোমাকে আগেই বললাম কেন বিয়েটা আমাকে করতে হয়েছে…’ কথাটা বলে কিছুক্ষণ সময় নেয় তিতলি। তারপর বলে, ‘দেখো এগুলো নিয়ে আমার মনে হয় এত আলোচনার কিছুই নেই। তোমার প্রেমিকা আছে, আমার স্বামী। আমি তোমাকে বলছিও না তুমি ওকে ছেড়ে আমাকে ধরো। আমি জাস্ট বলছি আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। সেটা পাঁচ মিনিটের জন্য হোক বা পাঁচ ঘণ্টা। এতে এতো আপত্তির কী আছে ? নাকি তুমি ভয় পাচ্ছ আমি তোমাকে বিপদে ফেলতে পারি কিংবা তুমি নিজের ভালবাসার প্রতি ভরসা রেখে আমার সঙ্গে দেখা করতে পারছ না আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ভয়ে ?’

‘না এর কোনটাই নয়। আমার নিজের উপর নিজের ভালবাসার উপর যথেষ্ট ভরসা আছে।’

‘না নেই।’

‘যথেষ্টই আছে।’ জোর গলায় কথাটা বলে অন্তু।

‘থাকলে তুমি বলতে না তুমি এখনো আমার প্রতি দুর্বল। একজনকে সত্যি কারের ভালবাসলে আরেক জনের প্রতি দুর্বলতা আসে না। আর যদি তোমার নিজের ভালবাসার উপর এতটাই ভরসা তাহলে ওকে বলোনি কেন আমার কথা ? আমাদের সম্পর্কের গভীরতার কথা।’

‘বলিনি কারণ বিবেকে বেঁধেছে। নিজেকে ওর কাছে ছোট করতে চাইনি।’

‘এতে ছোট হওয়ার কিছুই যে ছিল না তুমি সেটা ভাল মতোই জান। আর এটাও জান যে তোমার অতীত জানার পর তোমার বর্তমান তোমার ভবিষ্যতে সঙ্গ দেবে না। এটা জান বলেই বলোনি। পারোনি বলতে। ভয় পেয়েছ, হারিয়ে ফেলার ভয়। আমিও চাই না তুমি তোমার অতীত বলে তোমার বর্তমান হারাও।’

অন্তু কিছু না বলে চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকে। তিতলির বিষাক্ত সত্যি কথাগুলো হজম করতে কানের পাটা লাল হয়ে আসছে ওর। তিতলি যেন কথার পরিবর্তে দংশন করছে কানের ভেতর।

‘কী হল চুপ করে গেলে যে ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।

‘এমনি। তোমার সঙ্গে বকবক করতে ভাল লাগছে না।’

‘উমহু বলো এত চূড়ান্ত সত্য সহ্য হচ্ছে না। যাও এবার কয়েকটা হজমের বড়ি খেয়ে পায়খানা করে এসো।’

‘ফালতু বোকো না। আজকে যখন স্বামী ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তখন অতীত হাতড়াতে এসেছ। এতদিন কোথায় ছিল তোমার অতীত প্রেম ? আসলে তোমার স্বামী এখন অন্য শরীরে সাঁতার কেটে ঘুরছে আর তোমার শরীরের সুইমিংপুলটা ফাঁকা পড়ে আছে তাই তুমি চাইছ আমি…’ টুঁক টুঁক টুঁক করছে মোবাইল। মানে তিতলি ফোনটা কেটে দিয়েছে। এই সব না বলে অন্তুর কাছেও দ্বিতীয় কোনও রাস্তা ছিল না। তিতলি ওর জিবটাকে ব্লেডের মতোই ব্যাবহার করছিল এতক্ষণ।

       ফোনটাকে পকেটে ভরে আরেকটা সিগারেট ধরায় অন্তু। অতীতের কিছু ছেঁড়া-ফাটা টুকরো ছবি সিগারেটের ধোঁয়ায় নাচতে নাচতে মিলিয়ে যায়। অতীতটাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারুরেই নেই তাইবলে অতীতে মুখগুঁজে পড়ে থাকাটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার ফোনটা বাজছে ওর। আবার হয়তো…

না তিতলি নয়। শিল্পী। ‘হ্যাঁ বল…’ গলার স্বরটাকে নীচে নামিয়ে কথাটা বলে অন্তু।

‘কী করছিলে ?’

‘কিছুই না। বল…’

‘না আসলে একটাও ফোন করনি তো তাই আরকি…’ সত্যিই শানুকে দাহ করে আসার পর থেকে শিল্পীকে একটাও কল করেনি অন্তু।

‘না আসলে ঘুম থেকে উঠতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে…’

‘ঘুম থেকে উঠে তো করতে পারতে।’

‘সরি-রে করা উচিৎ ছিল। তা কী করছিস এখন ?’

‘আমি তো সকাল থেকেই নদীঘাটে গিয়ে বসেছিলাম। এই ফিরলাম কিছুক্ষণ আগে।’

‘নদীঘাটে ? ওখানে গিয়েছিলি কেন ?’

‘এমনি। দাদার জন্য খুব খুব মন খারাপ করছে…’ কান্নার সুর মিশে শিল্পীর কথাগুলো যন্ত্রণার স্থির ছবি হয়ে অন্তুর কানে ধরা দেয়।

অন্তু দুচোখ বন্ধ করে শিল্পীর ভেজা চোখদুটো দেখতে পায়। অন্তত এই সময়টা অন্তুর উচিৎ ছিল শিল্পীর কাছে থাকা। কিন্তু অন্তু সেটা করেনি। তিতলির ফোন আর মেসেজগুলো ওকে যেন কেমন একটা করে তুলছিল। শান্তনুর মৃত্যুটাও স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল অন্তুর কাছে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এখন হালকা লাগছে নিজেকে। তিতলিকে কয়েকটা কথা শোনাতে পেরেই হয়তো অতীতের পাপবোধটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে এখন। এতদিন অন্তু নিজেকে আসামী সাজিয়ে বারবার অতীতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দোষ স্বীকার করেছে বারবার। কিন্তু সত্যিই কি ওরই সব দোষ ছিল। সময়, সুযোগ, বয়স আর তিতলির সঙ্গ এগুলো কিছুই ছিল না ?

‘একবার দেখা করতে পারবে ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।

‘কখন ? কোথায় ?’

‘ওই পাঁচটা নাগাদ। নদীঘাটেই এসো।’

‘না না নদীঘাট নয়। তুই বরং জোড়-বাঁধের কাছে আয়। ওটা তোর বাড়ি থেকে কাছেও হবে। বেশ নিরিবিলি। জায়গাটাও ভাল।’ অন্তু ইচ্ছে করেই নদীর দিকে শিল্পীকে আনতে চায় না। ওখানে এলে শান্তনুর চিতাটা দেখে ওকে আরও বেশি বেশি মনে পড়বে শিল্পীর। অন্তুর পক্ষেও সম্ভব হবে না তখন শিল্পীকে সামলানো।

‘আচ্ছা তাই এসো।’

‘ওকে আমি আসছি, টাটা।’ ফোনটা রেখে দেয় অন্তু।

এদিকটা সত্যিই বেশ নিরবিলি। শান্ত। এমন জায়গায় এসে বসলে নিতান্ত বেরসিকও আস্ত দুচারটা প্রেমের কবিতা নামিয়ে দিতে পারে। নদীটার থেকে বেশ কিছুটা দূরে জায়গাটা, সোনাপুরের ভেতরের দিকে। সোনাপুরের ধান জমিগুলোর বাড়তি জল গড়িয়ে এসে এই জোড়টার জন্ম দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সোনাপুরের লোকেরাই জোড়টাকে বেঁধেছে চাষের সুবিধার জন্য। এখনো যথেষ্ট জল আছে জোড়-বাঁধটায়। শালূক ফুলে ভরে আছে পুরো জলাশয়টা। জলে পা ডুবিয়ে বসেছে শিল্পী। অন্তু সাইকেলটা একটা পলাশগাছে হেলান দিয়ে রেখে শিল্পীর পিছনে এসে দাঁড়ায়। চুড়িদারের পা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে বসেছে শিল্পী।

‘তোর নদী নামটা সার্থক বলে মনে হচ্ছে আজকে। মনে হচ্ছে জোড়টা তোর পায়ে এসে মিশছে।’

অন্তুর কথা শুনে পিছন ফিরে তাকায় শিল্পী। হাসার চেষ্টা করে। বড্ড ম্লান দেখায় সে হাসি। শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ ছলছল করে আসে অন্তুর। এই একটা দিনে কী চেহারা হয়েছে মেয়েটার।

‘সকাল থেকে কিছু খেয়েছিস ?’ শিল্পীর পাশে এসে বসে জিজ্ঞেস করে অন্তু।

ঘাড় নেড়ে ‘না’ উত্তর দেয় শিল্পী।

‘কেন খাসনি কেন ?’ গলাটা ভারী হয়ে আসে অন্তুর।

‘খেতে ইচ্ছেই করেনি। জানো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না বাড়ি গিয়ে সত্যিই দাদাকে দেখতে পাব না। এই ছুটকিকে ছাড়া চলতই না ওর। ছুটকি চা, ছুটকি জামা, ছুটকি সাবান, ছুটকি কলমটা কোথায়, মোজাগুলো কোথায় রেখেছিস…। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হতাম জান। ভাবতাম এই বাড়িটার থেকে বিদাই হতে পারলে বাঁচি। আজকে দেখো সেই দাদাটাই চলে গেল। সেই অর্ডার সেই আপদার করার কেউ রইল না। কিন্তু বিশ্বাস কর ওর একটা পা না থাকলেও আমি ওর সব কাজ করে দিতাম একটুও বিরক্ত হতাম না। ও তো ভাল হচ্ছিল ধীরে ধীরে তারপর কেন… কেন ?…’ অন্তুর বুকে মাথা রেখে হো-হো করে কাঁদতে থাকে শিল্পী। অন্তুর মনে হয় শিল্পীর যন্ত্রণায় পুরো প্রকৃতিটাই যেন কাঁদছে। ও কী বলে শিল্পীকে সামলাবে বুঝে উঠতে পারে না। শিল্পীর মাথায় চিবুক রেখে দূরের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে শুধু।

       এখন জোড়-বাঁধের জলের উপর সূর্যের হালকা লাল-হলুদ আলো এসে পড়ছে। তাতে লালচে-গোলাপি শালূক ফুলগুলোকে আরও বেশি সুন্দর বলে মনে হচ্ছে। কয়েকটা বালিহাঁসও এসে বসেছে জলের উপর। ওরা তাকিয়ে আছে এদের দুজনের দিকে।

‘আমি চকলেট এনেছি, খাবি ?’ শিল্পীর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে অন্তু।

মাথা নাড়িয়ে ‘না’ উত্তর দেয় শিল্পী। ওর গলায় এখনো কান্না লেগে রয়েছে। চোখ আর মনের পাতা জুড়ে শুধুই শান্তনুর স্মৃতি। ওর খেতে ইচ্ছে না করাটাই স্বাভাবিক। তবুও তো খেতে হয়। খাওয়ার চেয়েও বড় কথা সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে হয়।

‘একটু খা নতুবা এবার তোর শরীর খারাপ করবে।’

এবার শিল্পী কিছু বলে না। অন্তুর বুক থেকে মুখ তুলে বাঁধের শান্ত জলটার দিকে চেয়ে থাকে। অন্তু পকেট থেকে একটা ক্যাটবেরি বের করে সেটার মোড়ক খুলে শিল্পীর মুখের সামনে তুলে ধরে। শিল্পী একবার চকলেটটার দিকে তাকায় একবার অন্তুর মুখের দিকে তাকায়…

       বালিহাঁসগুলো এখন ডানার ভেতর ঠোঁট ডুবিয়ে শরীরচর্চার মন দিয়েছে। সূর্যের রঙ লালচে। আকাশের রঙে মস্ত প্রজাপতির ডানা। শিল্পীর দুই ঠোঁটে চকলেটের রঙ। মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই একটা মৃদুমন্দ বাতাস বইছে এখন। এমন পরিবেশ বিরহীর মনেও প্রেম জাগিয়ে দেয়।

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোকে ?’

‘হ্যাঁ বলো।’ অন্তুর চোখে চোখ দুটোকে মেলে দেয় শিল্পী।

‘জানি না এমন সময় ঐ-সব প্রসঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে কী না তাও বলছি, আচ্ছা তুই ওষুধ খেলি না কেন ?’

‘এমনিই খাইনি। আসলে যেটা হয়েছে সেটা তো অনিচ্ছায় নয় তাহলে যদি কেউ আসে তাকে ইচ্ছে করে বাধা দেব কেন ?’

‘সেটা তো ঠিক আছে কিন্তু বিয়ের আগে…’

‘বিয়েটা কোনও বিষয় হতে পারে না, অন্তত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে।’

‘বিষয় বিয়েটা নয় বিষয় সমাজ, সংস্কার এগুলোই। আজও ভারতে কুমারী মায়ের সন্তানকে সম্মান দেওয়া হয় না।’

‘আজ হয় না কাল তো হবে। কেন মিছিমিছি সমাজের ভয়ে মাতৃত্বের প্রথম অনুভূতিটাকে নষ্ট করে দেবো বলো। এতো সমাজের দেওয়া নয়।’

‘কিন্তু তোর মা, আমার মা ওদেরকে…’

‘ওদের নিয়ে ভয় নেই।’

‘কেন নেই কেন ?’

‘ওরাও তো মা।’

‘কিন্তু…’

‘কোনও কিন্তুতেই আমি ওটা পারব না যেটা তুমি চাইছ। আমি বলছি না কেউ আসবেই, হতেই পারে কেউই এলো না। তবে এলে আমি ওকে আনব। তুমি পাশে না থাকলেও আমি ওকে আনব।’

‘আমি পাশে না থাকার কথা বলছি না। কিন্তু…’

‘তাহলে কীসের কিন্তু ? তুমি যদি তোমার মাকে বলতে ভয় পাচ্ছ তাহলে আমি বলব। উনি অন্তত আমার কথাটা বুঝতে পারবেন।’

‘শিল্পী আমার একটা অতীত আছে, আর সেটা না জেনে তোর এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া মনে হয় ঠিক হবে না।’

‘সে অতীত যাই থাক তাতে আমার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হবে না। তোমার কোনও সমস্যা না থাকলে বলতে পারো কী সেই তোমার অতীত।’

‘আমি ফোনে সব বলব তোকে। এখন চল সন্ধা হয়ে আসছে।’

‘আমার মনে হয় কিছু গল্প শোনার জন্য সামনা সামনি অন্ধকারটাই উপযুক্ত। হোক সন্ধা তুমি বলতে পার।’

‘না আসলে আমিই মনে হয় পারব না তোর সামনে বসে এই কথাগুলো বলতে।’

‘পারবে ঠিক পারবে। যখন নিজেকে নিজে বলতে পেরেছ তখন আমাকেও বলতে পারবে। আমি কথা দিচ্ছি যতই ভয়ংকর হোক তোমার অতীত আমি সেটা হাসি মুখে মেনে নেব।’ শিল্পীর কথা শুনে অন্তু শিল্পীর মুখটা দেখার চেষ্টা করে কিন্তু পাতলা অন্ধকারে শিল্পীর মুখটা ভালভাবে দেখা যায় না। এখন বাঁধের জলটাও কালো হয়ে এসেছে। খানিক আগেই সাঁই-সাঁই করে উড়ে গেছে বালিহাঁসগুলো। দু-একটা তারার মুখ উঁকি দিচ্ছে আকাশে। দু-একটা তারা ভাসছে জলে। অনেক দূরে কীসের যেন ঝগড়া হচ্ছে। অন্তুর হাতটা চেপে ধরে শিল্পী।

‘আমি জানি তুই শোনার পর ভুল বুঝবি আমাকে।’ অন্তুর গলাটা ধরা-ধরা লাগছে এবার। ভেতরের ভয়টা দলা পাকিয়ে গলায় এসে জাঁকিয়ে বসছে।

‘না হয় ভুলই বুঝলাম তাও তো জানব তুমি ঠিকটা বলেছিলে।’ অন্তুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে শিল্পী। হয়তো ভেতর ভেতর নিদারুণ কিছু একটা আঘাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ও।

‘কলেজ জীবনে একটা মেয়েকে ভালবাসতাম আমি…’

‘হ্যাঁ তাতে হয়েছেটা কী ?’

‘না মানে ওর সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল…’

।২৪।

‘পঞ্চ্যাইত ? কীসের পঞ্চ্যাইত। তুমাদের ওই ষোলুআনা-পঞ্চ্যাইত ঠিক কইরব্যেক আমি কার সাতে শুব, কাকে শাঙা কইরব ? কার সাতে কতা কইব ? শালা তুমাদের ওই পঞ্চ্যাইত আমাকে খাত্যে দেয় না তুমরা আমাকে খাত্যে দাও ?’ কাবেরীর এই কথাটা শোনার পরেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্তু। মনমেজাজ ভাল নেই বলে ইচ্ছে ছিল না ষোলোআনার তামাশা দেখার। যদিও ও জানত না তামাশা চলছে মহিম-কাবেরীকে নিয়ে। কাবেরীর গলা পেতেই…। কাবেরীর সঙ্গে মহিমের সম্পর্ক নিয়ে কানাকানি অন্তুও যে শোনেনি তা নয়, কিন্তু আমল দেয়নি তেমন। সাইকেলটাকে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে ভিড়ের ভেতর ঢুকে অন্তু যা দেখে তা এক জীবনে ভোলা সম্ভব নয়।

       ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় একশ নেকড়ে গোল করে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে আদিম কালের বিশ-পঁচিশটা ডাইনি। উস্খখুস্ক চুল, ধারালো নখ, দাঁত। জিব বের করে রক্ত চুষছে কাবেরীর। ওরা মেয়ে বা মহিলা হতে পারে না। ওরা ডাইনি, অন্তত অন্তুর তাই মনে হয়েছিল।

       হাঁ করে খোলা আছে কাবেরীর ব্লাউজটা। বাতাসে উড়ছে। না না কাবেরীর হাত দুটো বাঁধা নেই, হাত খোলাই আছে। আসলে কাবেরীর খেয়াল নেই ওর ব্লাউজের বোতাম খোলা আছে। খেয়াল থাকবেই বা কেমন করে? ওর শাড়ি-সায়াটাও তো খুলে মাটিতে পড়ে আছে। কয়েকশ কৌতূহলী চোখ কাবেরীর ডান উরুতে একটা কাটা দাগ খুঁজছে। হালকা আলোয় খুঁজতে সমস্যা হচ্ছে বলে কেউ কেউ আবার টর্চের আলোতে দেখে নিচ্ছে। কাটা দাগটা আছে কি না ?

শেয়াকুল গাছের কাঁটায় একবার কেটে গিয়েছিল কাবেরীর। তখন কাবেরী বছর আট-দশ হবে হয়তো। সেই দাগ আজও আছে। সেদিনও ছিল, যেদিন পরান সত্যবান কিংবা তপনা ঝুপঝাপ করে কাবেরীর উরুতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাহলে পরান কিংবা তপনরা মিথ্যে বলেনি, দাগ তো আছে। হিসেব খাপে-খাপ। তার মানে কাবেরী মিথ্যে বলেছে। পরানের কথাই ঠিক, ‘কাবেরী পয়স্যা লিয়্যে কত্ত্যে দেয়।’ প্রথমে পরানের কথাটা কেউ কেউ বিশ্বাস করেনি। আর কেউ কেউ বিশ্বাস করেনি বলেই প্রয়োজন হল প্রমাণ। প্রমাণ কাবেরীর ডান উরুর দাগটা। পঞ্চায়েত প্রধান এতটাও মূর্খ নন যে নিজের চোখে না দেখে বিশ্বাস করবেন। টর্চ জ্বালিয়ে ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখলেন। তপনা অবশ্য শাড়ি-সায়া তুলতে আর দাগটা খুঁজতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু শুধু পঞ্চায়েত প্রধান দেখলেই হবে ? ওই দাগ দেখার অধিকার জনগনেরও যথেষ্ট আছে। অতয়েব নিতান্তই নিরুপায় হয়ে কাবেরীর শরীর থেকে শাড়ি-সায়ার জঙ্গাল সরাতেই হল। এই অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য কাবেরী একবার ভেবেছিল ছুটে পালিয়ে যাবে। কিন্তু এত লোকের ভেতর দিয়ে পালিয়ে ও যাবেটা কোথায় ?

কাবেরী বলেছিল, ‘পয়সা লিয়ে কারুর সাতে শুই নাই আমি…।’ এটা মিথ্যে। কারণ কাবেরী শুয়েছে। এবার পয়সা নিয়ে শুয়েছে কি না নিয়ে সেটা পঞ্চায়েত প্রধানের বিচার করার বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হল, কাবেরী বেশ্যা। আর যেহেতু কাবেরী বেশ্যা তাই ওকে একঘরে করা হল। কেউ কোনও ভাবেই কাবেরীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে না। কোনও সাহায্য করতেও পারবে না। এমনকি কথা বলতেও না।

এই বিচারের প্রতীবাদেই কাবেরীর উত্তর ছিল, ‘পঞ্চ্যাইত ? কীসের পঞ্চ্যাইত… পঞ্চ্যাইত আমাকে খাত্যে দেয় না তুমরা আমাকে খাত্যে দাও ?’

অন্তু কাবেরীকে এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ছুটে গিয়ে কাবেরীর পায়ের তলা থেকে কাপড়টা কুড়িয়ে ওর কোমর থেকে বুক পর্যন্ত জড়িয়ে দেয়। এই ঘটনায় কেউ কেউ ঘাবড়ে গিয়ে টর্চ বন্ধ করে। প্রথম সারির কেউ কেউ দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়-চতুর্থ সারিতে গিয়ে গা ঢাকা দেয়।

নিজের অতীতটাকে নিয়ে একটা রাগ একটা অভিমান বুকের ভেতর দাউ-দাউ করছিল। শিল্পীকে সব কিছু বলার পরেও ভেতরটা হালকা হয়নি ওর। হয়তো সবকিছু আজকেই স্বাভাবিক হতে পারত। কিন্তু শিল্পীর সামনেই তিতলির ফোনটা এসে পরিবেশটাকে আরও গরম করে তুলল। ‘এই জন্যেই চাইছিলে আমি ওষুধ খাই, তাই না ? যদি বাচ্চা আসেও; নষ্ট করে দেবো, ঠিক নষ্ট করে দেবো দেখো। অন্তত তোমার বাচ্চার জন্ম আর দেবো না, কিছুতেই না…’ কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল শিল্পী। অন্ধকারে অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়েছিল অন্তু। অশুভ সুরে শেয়াল ডাকছিল জোড়-বাঁধটার ওপার থেকে…

বুকের ভেতর জমতে থাকা পুরো রাগটাই এসে জমাট বেঁধে গেল অন্তুর ঘাড় আর হাতের শিরায় শিরায়। ফুলতে শুরু করল শিরাগুলো। টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গলার শিরাগুলো। লাল চকচকে হয়ে আসছিল চোখের মনি দুটো। দুমদাম করে কয়েক পা ফেলেই পঞ্চায়েত প্রধানের দিকে এগিয়ে গেল অন্তু। উনি যে ফাইবারের চেয়ারটায় বসে বিচার করছিলেন সেই চেয়ারটারেই একটা পায়াকে ধরে টান দিতেই চেয়ারটা চলে এলো অন্তুর হাতে। প্রধান মহাশয় একপাক ঘুরে বেরিয়ে গেলেন চেয়ারের বাইরে। তারপর…

মিনিট কয়েক ধরে সপাৎ-সপ আর দুম-দাম শব্দে অস্থির হয়ে পড়েছিল প্রধান মহাশয় এবং প্রধান অন্তঃপ্রাণ কয়েকজন। তবে একথা না বললে অন্তুর প্রতি অন্যায় করা হবে হয়তো। প্রধান মহাশয়কে নিজের শরীরের দাগ দেখানোর জন্য ধুতি খুলতে হবে না। কেন না ধুতির ভেতরের দাগগুলোকে অনুমান করার জন্য বাইরের দাগগুলোই যথেষ্ট। তবে বাংলার জনগন তো ? নিজের চোখে পুরোটা না দেখে আবার কিছুই বিশ্বাস করতে চায় না। তাই প্রয়োজন হলে প্রধান মহাশয়কেও মাঝে মাঝে ধুতি উত্তোলন করতে হতেও পারে।

প্রধান মহাশয়কে উত্তমমধ্যম দেওয়ার সময় যাদের দর্শক হয়ে দেখার কথা ছিল তারা যে অন্ধকারের ভেতর ঝুপঝাপ-ঝপাং করে কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে। ভিড় কমার পর মহিমকে দেখতে পেয়ে অন্তুর খুব ইচ্ছে করছিল মহিমকেও কয়েকটা ঘা বসিয়ে দিতে। অন্তু যেটা করল সেটা অনেক আগেই মহিমের করা উচিৎ ছিল। কিন্তু মহিম পারেনি…

থকথকে পিচের মতো অন্ধকার ছড়িয়ে আছে মহিমের ঘরের উঠোনে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মহিমকে অনুস্মরণ করে ঘরে ঢুকল অন্তু আর কাবেরী। কাবেরীর মানসিক অবস্থা যে মোটেও ভাল নয় সেটা ওর নিঃশব্দ পা ফেলাতেই পরিষ্কার। সারা রাস্তা একটাও কথা বলেনি কাবেরী।

‘আচ্ছা মহিম কাকা তোমার মতো লোক প্রতিবাদ না করে চুপচাপ ছিল কী করে ? কষ্ট হয়নি তোমার ? ইচ্ছে করেনি ওদের মুণ্ডুগুলো ধড় থেকে আলাদা করে দিতে ?’

মহিম কিছু না বলে ঘরের ভেতর থেকে দড়ির খাটিয়াটা এনে উঠোনে পেতে দেয়। অন্তু বসলেও কাবেরী দাঁড়িয়েই থাকে। ‘জানো তো মহিম কাকা প্রতিবাদ না করাটাও একরকম অন্যায়। পাগলা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ শুনা বা কামড় খওয়াটা বাহাদুরি নয়। পাগলা কুকুরটাকে মেরে দেওয়াই বাহাদুরি। তুমি মিলিয়ে নিও ওই পঞ্চায়েত প্রধান অবনী আর কোনওদিন কোথাও বিচার করতে যাবে না।’

এতক্ষণে মুখ খোলে মহিম, ‘বচর তিরিশ আগুকার কতা। তকন আমার বয়স এগার-বার হব্যেক। ওই পঞ্চ্যাইতের একটা বিচার লিয়ে আমার বাপের সাতে পদানের পাড়াপাড়ি হইচিল। ধান চুরি না আলু চুরি… কিচু একটা ছিল মনে হয়। তা জানিসর‍্যে বাপ বচর ঘুত্ত্যে দিল নাই। ওই পদান আমাদের বিঘা দুয়্যেক জমি জরিমানা কইর‍্যে দিল। ঝাঁটা লিয়ে পদানকে মাত্ত্যে আইচিল আমার খুড়ি। কদিন বাদেই খুড়িক্যে ডাইন বইল্যে… শুধু বইল্যে লয় পমান কইর‍্যে আমাদের সবার সামনে বাঁইধ্যে পুড়্যাই মাইর‍্যেছিল…’ চোখের জল মোছে মহিম।

‘আর তোমার বাবা জ্যাঠারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল ?’ এবার অন্তুর গলাটাও যথেষ্ট নরম।

‘শুদু আমার বাবা জ্যাঠারা লয়, থানার পুলিশগুল্যাও দাঁড়াই দেইখ্যেছিল কেউ কিচুই কত্ত্যে পারে নাই।’

‘কেন ?’

‘ভয়ে। তাছাড়া কী বইলব্যেক ? বল্ল্যে ঘরে আগুন লাগাই দিব্যেক। যা শালা মারাবি যা…। পাটির লোক্যের সাতে বাদ কইর‍্যে বাঁচা সহজ ছিল নাইর‍্যে। মা তকন মাতা ছুঁয়্যায় পতিজ্ঞা কর‍্যাইছিল পঞ্চ্যাইতের সাতে যাতে কনুদিন না লাগি। আইজ মা নাই বইল্যে কী কতাটার দামট্যাও নাই ?’

‘কিন্তু কাকা তখনকার সময় আর এখনকার সময় তো এক নয় ? এখন সমাজ অনেক উন্নত…’

‘উন্নত ? হ্যেঁরে বাপ সেটা কুন দিক দিয়্যে ? একন ডেলি রেপ হচ্চ্যে, খুইন হচ্চ্যে কিন্তু বিচার হচ্চ্যে নাই হেইটা উন্নতি ? কদিন আগুত্যেই ত ডাইন বল্যে একটা বুড়িকে পড়্যাই দিল। যারা পড়্যাইল তাদের কী হৈল ? আমড়ার আটি হৈল। যে যাকে পাচ্চ্যে ধইর‍্যে কইর‍্যে দিচ্চ্যে কেউ দেক্যেও দেকচ্যে নাই। আর তুই বলচিস উন্নতি। ইস্কুক যাবার নাম কইর‍্যে বনের ভিত্রে বইস্যে ন্যাংটা ভিডুয়্যা দেকাটা আর যাই হক উন্নতি লয়র‍্যে বাপ। আইজক্যেও ত একশর উপর লোক আইচিল তামাশা দেইকত্যে। একন একলা পতিবাদ কত্ত্যে যাব, কাইল দিন আমার ঘরে ঢুইক্যে আমার বউ বিটিকে…’ কিছু একটা মাথায় আসতেই চুপ করে যায় মহিম। খানিক বাদে হতভম্ব সুরেই বলে, ‘ইবাবা পুনি গেল কুতায়? ঘরে ত নাই…’ কথাটা বলেই ঘর ভেতরকার অন্ধকারে অদৃশ্য হয় মহিম। তারপর টর্চ হাতে একছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে বলে, ‘ভিতর ঘরেও নাই। তাহল্যে কুতায় গ্যেল ? শালা মামাগ বলচি পুনির কিচু হৈল্যে তপনা উয়াদেরকে আমি কাইট্যে ফাঁক কইর‍্যে দিব…’

‘তুমি শান্ত হয়ে বোসো মহিম কাকা। আমি পাড়ায় খোঁজ করে আসছি…’

‘না না আমিই যাব…’ মহিমের গলাতে রাগ আর আতঙ্ক যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

‘আমিও যাব।’ এতক্ষণে কথা বলে কাবেরী।

‘না না তুই মেয়্যালোক এই অন্ধকারে তকে যাত্যে হব্যেক নাই। তুই বরংচ ভিত্রে যায়্যে বৈস।’

ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। মহিমের পিছুপিছু অন্তু। ঘুটঘুটে অন্ধকার মেখে পুরো পাড়াটা পড়ে আছে এখন। অনান্যদিন হলে রাস্তার ধারে খাট পেতে দু-একজনকে গল্প করতে দেখা যায়। খাট পেতে শুয়েও থাকে অনেকেই। আজকে কিন্তু কেউ বাইরে নেই। থমথম করছে পুরো পাড়াটা। মনসা মেলার ভেতরে বসে যে বুড়গুলো রোজ তাস খেলে ওরাও আসেনি আজ। অন্ধকারের ভেতর টর্চের আলো ফেলে এগিয়ে যায় মহিম আর অন্তু।

মহিম আর অন্তু বেরিয়ে গেলে কাবেরী অন্ধকার হাতড়েই ঘরের ভেতর ঢোকে। গোটা ঘর জুড়ে ভ্যাপসা একটা গন্ধ। ভাদু যে ঘরটায় শুয়ে রয়েছে সেটাতে টিমটিম করছে একটা বাল্ব। তেলচিট পড়ে প্রায় কালো হয়ে আছে বাল্বটা। কাপড় সেলাই করে করে বানানো সিলিংটাও ঝুলছে দোলনার মতো। ঘরের যেখানে সেখানে ইঁদুরের গর্ত, ইঁদুরমাটির স্তূপ।

ভাদুর বিছানাটার পাশে যে চেয়ারটা রয়েছে সেটাতেই বসে কাবেরী। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ভাদু। কাবেরী ডাকে, ‘ভাদি এই ভাদি চিন্ত্যে পাচ্চিস ?’

কাবেরীর ডাকে চোখ মেলে তাকায় ভাদু। ঘোলাটে হয়ে আছে ওর চোখ দুটো। ‘বল ত কে বঠি ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী। ভাদু কোনও উত্তর না দিয়ে আবার চোখ দুটোকে বন্ধ করে। মুখটাকে ধীরে ধীরে দেওয়ালের দিকে ফিরিয়ে নেয়। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটোকে মুছে নেয় কাবেরী। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেলে ভাদু আবার মুখ ফেরায়। তাকায় কাবেরীর মুখের দিকে।

‘কিচু বলবি ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।

ভাদু কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বার না হলে জিব বোলায় শুকন ঠোঁট দুটোতে। কাবেরী খাটের নীচে রাখা জলের গ্লাসটা নিয়ে ভাদুর মুখে অল্প একটু জল দেয়। জলটা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর ভাদু বিড়বিড় করে বলে, ‘পুনিকে দেকবি। পুনিকে…’

চোখদুটো ছলছল করে আসে কাবেরীরও। হ্যাঁ না কিছুই না বলে ভাদুর হাতটা শক্ত করে ধরে। ভাদু কাঁদতে গিয়েও কাঁদে না, ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে রাখে।

‘মহিম কই-র‍্যে মহিম, শালা আচ্চা বাপ বঠিস কেল্যা তুই…’

পাতমার গলা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। পূর্ণিমার কোনও খবর আছে ভেবেই সোজা উঠোনে এসে দাঁড়ায়। এদিকে মহিমের ঘরের ভেতর ঢুকতে গিয়ে কাবেরীকে দেখে টর্চটা বন্ধ করে থমকে দাঁড়ায় পাতাম, ‘তুই ইখানে ?’ জিজ্ঞেস করে।

পাতামের মুখ থেকে চোলাই মদের উগ্র টকটক গন্ধ কাবেরীর নাকে এসে ধাক্কা খায়। শাড়ির আঁচলে নাকমুখ চাপা দিয়ে কাবেরী বলে, ‘হঁ মহিম আইন্যেচে।’

‘তা ভালই কইর‍্যেচে। কিন্তু উ শালা কুতায় গেল ?’

‘পুনিকে খুঁজত্যে গেইচ্যে উয়ারা ?’

‘শালা বাপ না পাপ। তা কে কে গেইচ্যে খুঁজত্যে ?’ যথেষ্ট বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞেস করে পাতাম।

‘অন্তুর সাতে গেইচ্যে।’

‘অঁ দিদিমুনির ব্যাটার সাতে। আইজ ত পদানকে মাইর‍্যে ফুঁটাই দিয়েছ্যে শুইনলম।’

কাবেরী কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। শতাধিক লোকের সামনে নিজের অপমানটা চোখে ভেসে ওঠে। কাবেরীকে চুপ থাকতে দেখে পাতাম বলে, ‘পুন্নিমা আমার ঘরে আচে। সন্দ্যা বেলিতে আমার বউ এর সাতে ভাত খায়্যে ঘুমাই দিয়্যেছে।’

‘তর ঘর গেল কেমন কইর‍্যে ?’

‘কেমন কইর‍্যে আবার, আমি আইস্যে লিয়্যে গেইচ্যি। আমি আইচিলম ষোলআনায় যাব বল্যেই। আইস্যে দ্যেখি ঘরে কেউ নাই। পুন্নিমা একলা বইস্যে কাঁদছে, উদিকে উয়ার মায়ের দিশাদশা নাই। ভাইবলম মেয়্যাটা ভয় পাত্যে পারে। ইটা ভাব্যেই লিয়ে গেলম। আর ষোলোআনাতেও যাবার সমুয় হৈল নাই।’

‘দেক উয়ারা আবার কুতায় কুতায় খুইজ্যে বেড়্যাইচ্চে। মহিমকে তাহল্যে বইল্যে দিবি যা।’

‘খুঁইজ্যে মরুক শালা। ঘর ঢুকল্যে বইল্যে দিবি। আমি চইল্লম।’ হনহন পাতাম বেরিয়ে যায়।

       পাতাম বেরিয়ে গেলে কাবেরী অন্ধকার খাটিয়াটার উপরেই বসে। কাঁদে। ডুকরে ডুকরে কাঁদে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। তবুও ওকে স্বাভাবিক হতে হবে, স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। প্রয়োজনে হাসতেও হতে পারে। কাবেরিরা তো এভাবেই বেঁচেছে এতকাল।

।২৫।

ছাদের উপর মাদুর পেতে আকাশের দিকে মুখ করে চুপচাপ শুয়ে আছে শিল্পী। কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর। কান্না পাচ্ছে খুব কিন্তু কান্নাও আসছে না এখন। ওর মামা মামি আর কে কে যেন গল্প করছে নীচে। ওদের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে শিল্পীর কানে। সেটাতে আরও বেশি বিরক্তি লাগছে ওর। ওদের গল্পে শান্তনুর কোনও কথা নেই, ওরা গল্প করছে সেয়ারবাজার নিয়ে সারদা নিয়ে সব্জির দাম নিয়ে। অথচ ওরাই এই অসময়ের আত্মীয়। ওরাই কালকে কত চোখের জল ফেলেছে। এমনকি শিল্পীর মামিও জল ফেলার চেষ্টা করেছে।

       মাথার উপর দিয়ে লাল-নীল আলোয় ঝিকমিক ঝিকমিক করতে করতে একটা বিমান উড়ে যাচ্ছে এখন। একটা সময়ছিল যখন আকাশে গুড়-গুড় গুড়-গুড় শব্দ হলে দড়বড় করে দুই ভাইবোন ছাদে এসে দাঁড়াত। হাঁ করে তাকিয়ে থাকত উপরের দিকে।

‘দেক মেগট্যাকে সেলাই কইরচ্চ্যে। ওইটা ছুঁইচ গাড়ি। আর জল হব্যেক নাই…’

শান্তনুর কথা বিশ্বাস না করে পারত না ছোট্ট শিল্পী। কৌতূহলী দুচোখ নিয়ে দাদাকে প্রশ্ন করত, ‘ওই গাড়িট্যা কে চালাচ্চ্যে ?’ তখন শিল্পীর মুখেও বাঁকড়ি ভাষার গন্ধছিল।

শান্তনু উত্তর দিত, ‘ক্যে আবার চালাচ্চ্যে ভগবান চালাচ্চ্যে। তাছাড়া অত উপরে কি কেউ যাত্যে পারে ?’

       ছোটবেলার কথাগুলো মনে পড়তেই দুচোখ ভিজতে থাকে শিল্পীর। এলোমেলো ভাবে কত কথাই না মনে পড়ছে। শান্তনুর চলে যাওয়াটা কিছুতেই মানতে পারছে না ওর মনটা। যে ট্রাকটায় শান্তনুর এক্সিডেন্ট হয়েছিল তার মালিক বলেছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেড়লাখ টাকা দেবে। এমন ক্ষতির কোনও পূরণ হয় বলে শিল্পীর জানা নেই। তবুও কেমন অদ্ভুত না ? একদিন শান্তনু বলেছিল, ‘ছুটকি আমি চাকরি পেলে তোকে দেড়লাখ টাকা দেব।’ আসলে ‘দেড়লাখ’ শব্দটা শান্তনুর ঠোঁটে লেগেই থাকত।

‘জুতো দুটোর দাম কত নিল দাদা ?’

‘দেড়লাখ।’

‘কীরে কটা গোল হজম করলি ?’

‘দেড়লাখ।’

       মা মেয়ে দুজনেই তিতিবিরক্ত হত দেড়লাখের অত্যাচারে। আজকে শান্তনুর জীবনটার মূল্য নির্ধারিত হল দেড়লাখে। সত্যিই অদ্ভুত জীবনের হিসেবগুলো।

চোখেমুখে বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে শিল্পী। স্মৃতিতে স্মৃতিতে ভেঙে যাচ্ছে ভেতরটা। আসলে দাদার স্মৃতিতে মনটা এমন ভাবে ভরে না থাকলে হয়তো অন্তুর অতীতটা মেনে নেওয়াও এতোটা সহজ হত না। শেষ সময়ে তিতলির কলটা না এলে হয়তো…

বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়েছে অন্তুর। শেষ পর্যন্ত পাতামের বাড়ি না গেলে তপনাদের কপালে আজকে চূড়ান্ত দুঃখছিল। পাতামের বাড়ি গিয়ে পূর্ণিমাকে দেখার পর শান্ত হয়েছিল মহিম। যে লোকটা বুড়ো শেয়ালের মতো সবার সামনে দাঁড়িয়ে কাবেরীর অপমান দেখছিল সেই লোকটারেই কী ভয়ংকর পরিবর্তন! ভাগ্যিস তপনা বা সত্যবান ওরা ঘরে ছিল না। নয়তো হাত দিয়েই সিংহের মতো মুণ্ডু ছিঁড়ে নামিয়ে দিত। তপনাকে ঘরে না পেয়ে ‘শালা হারামি’ বলে ওদের আমগাছটায় এক লাথি মারতেই ঝড়-ঝড় করে কতগুলো যে আম ঝড়েছিল কে জানে। তপনার বউ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ‘মামেগুয়া…’ ডায়লগ দিয়ে মঞ্চে নামলেও মহিমের, ‘এই শালি…’ গর্জন শুনে আর টুঁশব্দটুকুও করেনি।

       মহিমের এই পরিবর্তনটা যথেষ্ট অবাক করেছে অন্তুকে। কোন ত্রিশ বছর আগে গ্রামের পঞ্চায়েত বিচার করে ওর ঠাকুমাকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে দিয়েছিল। মায়ের মাথায় হাত দিয়ে মহিমকে কথা দিতে হয়েছিল কোনওদিন পঞ্চায়েতের চক্করে পড়বে না ও। কেবলমাত্র সেই কথা রাখার জন্য ও কাবেরীর বস্ত্রহরণ দেখেছে, কল্পনাও করা যায় না। ‘শালা দুনিয়ায় কত রকমের মাল আছে… যাক কেউ কথা রাখে না বললে তাহলে ভুল বলা হবে, কেউ কেউ কথা রাখে…’ নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতেই হাসে অন্তু। 

       একটা চেয়ারকে বগলদাবা করে ছাদে উঠে আসে অন্তু। নদীটার দিকে মুখ করে বসে। মাঝরাত পেরিয়েছে তবুও কিছু লোক কাজ করেই চলেছে মনে হয়। তাই এখনো নদীটার এক একটা জায়গায় আগুন জ্বলছে। কাল সকাল থেকেই মেলা শুরু হবে। ‘হরেক মাল দশ টাকা দশ টাকা দশ টাকা…’ ‘দাদা দেখে যান দেখে যান একটা ছেলের দুটো মাথা…’ ‘মরণ কুয়া মরণ কুয়া মরণ কুয়া, কুয়ার ভেতর বনবন করছে তিন তিনটা মোটর সাইকেল…’ মুখস্ত হয়ে গেছে অন্তুর।

‘শিল্পী কি সত্যি কল করবে না নাকি ? কটা বাজে দেখি তো…’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অন্তু। দুটো বাজতে দশ। ‘ঘুমিয়ে পড়েছে ?’ আবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে অন্তু। মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিছুক্ষণ। এই তিতলির ফোনটা এসেই যত ক্যাচাল হয়ে গেল। ‘ধুর ভাল্ললাগে না শালা…’ চেয়ারটা থেকে উঠে ছাদের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। মোবাইলটা হাতে নিয়ে উল্টাতে পাল্টাতে কী যেন ভাবতে থাকে, তারপর দুম করেই কল করে তিতলিকে। ‘একদিন আপ মুঝে মিল যায়েঙ্গে…’ বেজেই চলেছে কলারটোন। আবার কল করে অন্তু। এতক্ষণে রিসিভ করেছে তিতলি, ‘কে বলছেন ?’ ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করে তিতলি।

‘আমি বলছি।’

‘কোন আমি ?’ আবার জিজ্ঞেস করে তিতলি।

অন্তু বুঝতে পারে তিতলির স্বামী ওর সঙ্গে আছে। সেটা বুঝতে পেরেই আরও জোরে জোরে বলে, ‘এই ন্যাকামি কেন করছ ? আজকে দেখা করব বললে কিন্তু এলে না। মাতাল বলদ বাড়ি ফিরেছে নাকি ?’ ফোনটা কেটে দেয় তিতলি। অন্তু আবার কল করে। ‘একদিন…’ হতে না হতেই আবার কলটা কেটে দেয় তিতলি। অন্তু আবার কল করে। এবার সুইচ অফ….

অন্তু জানে ওপারে মিলন না হলে এপারে বিরহ নিশ্চিত। তিতলির বর যদি তিতলিকে সন্দেহ করে নিজের কাছে টানে সেটাই বা মন্দ কী ? এই মাঝ রাতের অপরিচিত কল মাঝে মাঝে সম্পর্কের ভাঙা সেতুটা মেরামত করে দেয়। হাতের নাগালে থাকা জিনিশ নিয়ে কে আর কবে ভেবেছে, কিন্তু সেই নাগালের জিনিশ নাগালের বাইরে যাচ্ছে ভাবলেই মানুষ কোমর বেঁধে সেটাকে ঠেকানোর চেষ্টা করে।

অতীত-বর্তমান আর বর্তমান-অতীত এই পথটুকু হাঁটতে হাঁটতেই অন্তুর ভোর হয়ে আসে। নীচে নেমে আসার জন্য চেয়ারটা ছেড়ে উঠতে যাবে ঠিক এমন সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। ‘শালা তিতলি নয় তো…’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অন্তু। না, শিল্পী কল করছে। ‘শিল্পী কল করছে এখন ?’

ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যাঁ বল।’

‘জেগেই ছিলে নাকি ?’

‘হ্যাঁ জেগেই ছিলাম।’

‘আচ্ছা যার সঙ্গে কথা বলছিতে বলো, সরি টু ডিস্টার্ব ইউ…’ ফোনটা কেটে দেয় শিল্পী। ‘শালা আজব মেয়ে মাইরি…’ কলব্যাক করে অন্তু। রিং হতে হতে না হতেই রিসিভ করে শিল্পী।

‘যার সঙ্গে কথা বলছিলে মানে ? কার সঙ্গে কথা বলছিলাম আমি ?’ অন্তুর গলার রাগটা পরিষ্কার।

‘তোমার কথা বলার মানুষের অভাব…’

শিল্পীর মুখের কথা কাড়িয়ে নিয়ে অন্তু বলে, ‘অভাব বলেই না এত রাত পর্যন্ত…’

‘কাকে কল করবে ভাবছিলে ?’

‘দ্যাখ ফালতু বকবি না। আমি তোর কলেরেই অপেক্ষা করছিলাম।’

‘কেন অপেক্ষা কেন ? কল করলেই তো পারতে। আমার মোবাইল নম্বর তোমার কাছে না থাকা তো নয়। নাকি ডিলিট করে দিয়েছ ?’ ইচ্ছে করেই পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্ন করে শিল্পী।

‘ধুর শালা…’ ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।

       চেয়ারটাকে নিয়ে নীচে নেমে আসে। চুপচাপ বসে পড়ে বিছানায়। বিরক্তিতে চোখ ছলছল করে আসে ওর। এবার ফোনটাকে এক্কেবারে সুইচ অফ করে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে।

জানালার ফাঁক-ফোঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে এখন। জানালার ওপারে শালিকের কিচিরমিচির। ঘুমটা ভেঙে যায় অন্তুর। বিছানা থেকে উঠে চোখেমুখে জল নিয়ে এসে সোফায় বসে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে অন করতেই গত রাতের কথাগুলো মনে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা আবার বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওর মা ওঠেনি এখনো। দরজা বন্ধই আছে। অন্তু বাইরে বেরিয়ে এসে পেয়ারা গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মাধবীলতা গাছটা অনেকটাই উঠে পড়েছে। ঠিকঠাক জল পেলে এবছরই ফুল ফুটবে মনে হয়। অন্তু কুয়োর পাড় থেকে জলের বালতিটা নিয়ে এসে জল দেয় মাধবীলতা গাছটার গড়ায়, গায়ে। এই মাধবীলতা গাছটাকে দেখলে মায়ের মুখটা মনে পড়ে ওর। অন্তু নিজেও জানে না কেন এমনটা হয়। তবে এর পিছনে একটাই কারণ খুঁজে পেয়েছে ও। সেই স্কুলের মাধবীলতা গাছটা। প্রথম প্রথম মাকে ছেড়ে স্কুলে আসতে ভাললাগত না অন্তুর। মায়ের জন্য মনকেমন করত খুব। আর মায়ের জন্য মন খারাপ হলেই অন্তু মাধবীলতা গাছটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইত। লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে কতবার। এখন ঐসব দিনগুলো মনে পড়লে কেমন যেন বিষণ্ণতা গ্রাস করে। তবুও ভাললাগে ঐসব দিনগুলো মনে করতে।

‘আইজক্যে এত সকালেই উইঠ্যেছিস যে ?’

অন্তু খেয়াল করেনি কখন ওর মা ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পিছন ফিরে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হুম ঠিকঠাক ঘুম হয়নি রাতে। তা তুমি এত সকাল সকাল উঠেছ যে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।

‘কাইলক্যে রাইত্যে আর ঘুমের বড়িটা খাই নাই।’

‘কেন ?’

‘তর ফিত্ত্যে দেরি হচ্চ্যে দেইখ্যে কপাটটা ঠেস্যাই বস্যেই ছিলম। কখন ঘুমাইছি ক্যে জানে…’

‘বসেছিলে কেন ? খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে দিলেই তো হত।’

‘কাইলক্যে মনটা বড কু-গাইছিল। তা মহিম্যের কী হৈল-র‍্যে কাইল ?’

‘মহিম কাকার কিছুই হয় নাই। সব শেয়াল-কুকুরগুলো মিলে বরং কাবেরীকে…’

‘কী কইর‍্যেছে কাবেরীক্যে ?’

‘না মানে…’ অন্তু বলতে গিয়েও ভাবে বলবে কি বলবে না।

‘চুপ কইর‍্যে রইলি যে, কী কইর‍্যেছে ?’

‘আমি যখন পৌঁছাই তখন দেখি কাবেরীকে উলঙ্গ করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে সবার সামনে।’

‘অতবড় মানুষ্যের নাম ধইর‍্যে কতা বলিস না, পিসি কিম্বা কাকি বলবি…’ ধমক দেয় লতিকা। ‘তা তুই কিচু বইলত্যে পাল্লিনাই উয়াদিকে…’

‘ওই পঞ্চায়েত প্রধানকে বেদম পিটিয়ে দিয়েছি। ওর সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-তিনজনকে।’

‘ভাল কইর‍্যেছিস। তর বাপ থাইকল্যে ঘাড় ভাইঙ্যে দিত। যতদিন তর বাপছিল কার বুকের পাটা গাঁয়ে অন্যাই কইরব্যেক। তা কাবেরীর অপমান হওয়ার আগুতে তুই ছিলিটা কুতায় ?’

‘আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম।’ এই প্রশ্নটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না অন্তু।

‘সেটাই ত শুধাচ্ছি যে ছিলিটা কুতায় ?’

‘না মানে আমি সোনাপুর গিয়েছিলাম।’

‘কী জন্যে ? কাইলক্যেও ত ছেল্যামেয়্যা গুল্যাইন পইড়ত্যে আইস্যে ঘুর‍্যে গেল। ডেলি-ডেলি এমন কল্ল্যে কে পইড়ত্যে আইসব্যেক তর কাচে ?’

‘আমি রাজার কাছে…’

‘রাজা ত তকে খুঁইজত্যেই ঘরক্যে আইচিল। সত্তি-সত্তি বল তুই কার সাতে কুতায় ছিলি ?’ কথাটা বলেই লতিকা কুয়ো থেকে এক বালতি জল তুলে তার থেকে এক ঘটি জল নিয়ে চা-টা চাপিয়ে দিয়ে আসে। ‘মুক ধুয়্যেছিস ?’ জিজ্ঞেস করে লতিকা।

‘না এখনো ধুইনি।’

‘ধুইয়্যে-লে তর সাতে আইজক্যে আমার কতা আছে।’

       মা চলে যাওয়ার পরেও একা একাই দাঁড়িয়ে থাকে অন্তু। কিছুই বোধগম্য হয় না। মাকে এমন ভাবে কথা বলতে এই প্রথম দেখছে অন্তু। নিজের চোখ-কান কোনটাকেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর।

‘কী হৈল দাঁড়াই রইলি ?’ দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে লতিকা।

‘আরে যাচ্ছি যাচ্ছি।’

আজ দীর্ঘদিন পর অন্তুর মুখোমুখি চেয়ারে চা খেতে বসেছে লতিকা। চা এর কাপ শেষ হওয়ার মুখে অথচ অন্তু একবারের জন্যেও মায়ের মুখের দিকে চেয়েও দেখেনি। লতিকাও একটা কথা বলেনি এতক্ষণ। এবার চা এর কাপটা নামিয়ে বলে, ‘কাইলক্যে শিল্পীক্যে লিয়ে কুতায় গেইছলি ?’ সরাসরি প্রশ্নে বেশ ঘাবড়ে যায় অন্তু।

‘না মানে আসলে শানুর…’

‘শানুক্যে আইজক্যে অন্তত টানিস না। সত্তিটা বল…’

‘জোড়-বাঁধ গিয়েছিলাম।’

‘কী জন্যে লিয়ে গেইছলি পরের মেয়্যাকে ?’

অন্তু কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকে। ‘কী ভাইব্যেছিস ডানা গজ্যাই গ্যেছে তর ? মুখ থেইক্যে একনো মায়ের গন্দ যায় নাই আর পেম কত্ত্যে শিক্যেচিস।’

‘না আসলে…’

‘ওই আসল্যেটাই শুইনত্যে চাইছি নকল গল্প শুইনব নাই। সত্তি সত্তি ভালবাসিস না ফুত্তি কচ্চিস ?’

‘ও খুব ভালবাসে তাই…’

‘তাই কী ? তাই তুই ফুত্তি করিস ?’

‘না মানে আমিও বাসি…’ একটু হাসার চেষ্টা অন্তু করে কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিটা বাসি ফুলের মতো মনে হয়।

‘তাহল্যে শিল্পীকে ভালবাসিস ?’

‘হ্যাঁ। বাসি।’

‘আর ওই ইটলিক্যে ?’

‘কে ইটলি ? চিনি না তো আমি।’

‘ওই য্যে পুরুলিয়্যার মেয়্যাটা ?’

‘শালা মাকে কে বলল…’ বিড়বিড় করে অন্তু।

‘কী বলছিস জোর‍্যে বল।’ ধমক দেয় লতিকা।

‘ও ওই তিতলি ?’

‘হঁ হঁ ওই পুরুলিয়্যার মেয়্যাটা ?’

‘তিতলি তো আমার বোনের…’

‘চুপকর হতচ্ছাড়া বুন্যের মত…’ এবার হো-হো করে হেসে ফেলে লতিকা। এতক্ষণ সিরিয়াস অভিনয় এই প্রথম মনে হয়। আসলে কালকে রাতেই শিল্পী কল করে অন্তুর মাকে যা বলার বলেছে। লতিকাও ভেবেছিল রাতেই ছেলেকে পাকড়াও করবে কিন্তু সেটা আর হয়নি। যাই হোক অন্তুর মুখটা কিন্তু এখনো দেখার মতোই লাগছে। বেচারা এখনো পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছে না ওর মা একসঙ্গে এতগুলো তথ্য পেল কোথায়।

‘আমাকে কাইলক্যে রাইত্যেই শিল্পী ফোন কইর‍্যে সব বইল্যেচে…’

‘কী কী বলেছে ?’ এতক্ষণে স্বাভাবিক মনে হয় অন্তুর মুখটা।

‘উসব শুইন্যে তর লাভ নাই। আমিও শিবানীক্যে বইলব বইলব কইর‍্যে বলার সমুই পাই নাই। যাক শুইনলম শিবানীও সবেই জানে। ভালই বঠে। অমন মেয়্যা তর বউ হব্যেক সপ্নেও ভাবি নাই আমি। ভাইব্যেছিলম কীজানি কেমন মেয়্যা ঘর‍্যে আইন্যে ঢুক্যাইস… যাক পছন্দটা ঠিক্যেই কইর‍্যেছিস। তবে ওই ইটলি না তিটলি উসব মেয়্যাকে আর যদি ফোন করিস ত আমার চাইয়্যে খারাপ কেউ হব্যেক নাই বইল্যে দিলম।’

       অন্তু আর একটাও কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে, কোলে মাথা রাখে। লতিকাও কিছু বলে না। অন্তুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অন্তুর বাবার ছবিটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে। অন্তুর জন্মদিনটা মনে পড়ছে এখন। দুঃখ-সুখের স্মৃতিতে চোখদুটো ভারী হয়ে আসছে লতিকার…

।২৬।

‘পুনি বইলছিল আইজ থেক্যেই মেল্যা শুরু। তা তুই মেল্যায় যাবি নাই ?’ কাবেরীকে জিজ্ঞেস করে ভাদু। কাবেরী কিছু বলে না, জলের গ্লাসটা ভাদুর মুখের দিকে এগিয়ে দেয়। আজকে সকাল থেকে পূর্ণিমা আর কাবেরী মিলে ভাদুর ঘরটা পরিষ্কার করেছে। মহিমকে দিয়ে ঘরের ভেতরে এমনকি উঠোনেও নতুন বাল্ব লাগানো করিয়েছে। তারপর মহিমকে সঙ্গে নিয়ে উঠোনে বের করে স্নান করিয়েছে ভাদুকে। আজ কতদিন পর ভাদু আকাশ দেখল সেটা হয়তো ও নিজেও মনে করে বলতে পারবে না। বাইরে খাটিয়া পেতে তার উপর কাঁথা বিছিয়ে ভাদুকে ঘণ্টা খানেক বসিয়ে রেখেছিল কাবেরী আর মহিম। অপলক ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসেছিল ভাদু। যেন এর আগে কোনওদিন আকাশ দেখেনি। আসলে ভাদু হয়তো কল্পনাও করেনি আবার কোনওদিন আকাশ দেখবে, গাছ দেখবে, পাখি দেখবে। কাবেরীর মুখের দিকে কেমন ভাবে যেন চেয়েছিল ভাদু। সেই চাওয়াটাতে নিছক তৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

‘কির‍্যে তুই যাবি নাই ?’ আবার জিজ্ঞেস করে ভাদু। আজকে ভাদুর কথাগুলোও বেশ পরিষ্কার।

‘তকে একলা ঘরে রাইখ্যে ক্যেমন কইর‍্যে যাব।’

‘আমি একলা থ্যাইকত্যে পইরব।’

‘আচ্চা সেট্যা না হয় পরে ক্ষণ দেকা যাব্যেক। তুই একন টুকু ঘুম্যাইল্যে। আইজ সারাদিন ধকল অন্যেক হৈচ্যে…’ কাবেরী উঠে দাঁড়াতে গেলে ভাদু ওর হাতটা ধরে, ‘কী হৈচ্যে তর ?’

ভাদুর প্রশ্নের কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না কাবেরী। কাল সারারাত আজ সারাদিন ধরে শুধু গতকাল বিকেল-সন্ধার ভয়ংকর ছবিগুলো চোখের পাতায় ভেসেছে। বারবার ভিজেছে চোখের পাতা। মনটা তবুও শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই। গ্রামের সবাই দেখেছে ওর নগ্ন শরীরটা। একমাথা লজ্জা আর অপমান নিয়ে ঘরেও যেতে পারেনি ও। রাস্তায় বেরোলেই লোকে হাসবে……

ভাদুর হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে কাবেরী। বুকের ভেতর অসহ্য জ্বালা হচ্ছে। সারা শরীর জুড়ে যেন কিলবিল কিলবিল করছে কতশত চোখ। সবকিছু ছেড়ে ছুট্টে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে অনেক অনেক দূরে কোথাও, যেখানে ওকে কেউ চেনে না কেউ না।

‘কাঁদচ্যিস ক্যেন্যে তুই ? মনট্যাকে ছটু করিস না। আমি সব্যেই জানি লো। তুই আমার সতীন হৈল্যে আমার‍্যেই ত লাব। কনুই অন্যায় করিস নাই তুই। আমি আর কদিন, তারপর আমার পুনিক্যে ক্যে দেইকত ? পুনির বাপক্যে ক্যে দুইট্যা ভাত ফুট্যায় দিত…’ বলেই চলে ভাদু। ভাদুর পক্ষে কাবেরীর কান্নার এই কারণ ভাবাটাই স্বাভাবিক।

‘অমন কতা বলিস না। তর কিচ্যুই হব্যেক নাই, তুই আবার ভাল হৈয়্যে যাবি। তর ঘর-বর তর‍্যেই থ্যাইকব্যেক…’

‘ইটা আশা কইর‍্যে বাঁচার রোগ লয় লো। ই রোগে কেউ বাঁচে নাই। আমি বুজত্যে পাচ্চি আমার দিন ফুর‍্যাই আইসছ্যে। তুই আমাক্যে কতা দ্যে তুই আমার পুনির বিহাঁ দিবি…’

‘অনম কইর‍্যে বইলত্যে নাই। তুই নিজ্যেই নিজ্যের বিটির বিহাঁ দিত্যে পারবি।’        

‘উসব শুইন্যে আমার লাব নাই আমি জানি। তুই কতা দিল্যে শান্তিত্যে যাত্যে পাইরব। তুই কতা দ্যে আমাক্যে।’

‘কী কতা দিব ?’

‘পুনির বিহাঁ তুই দাঁড়াই থাইক্যে দিবি।’

‘কতা দিলম পুনির বিহাঁর সমুয় তুই না থাইকল্যে আমি নিজ্যে দাঁড়াই রইয়্যে পুনির বিহাঁ দিব। ল্যে ইবার হৈচ্যে ? একন তবে ঘুমা…’ উঠে দাঁড়ায় কাবেরী।

ভাদু আর একটাও কথা বলে না। কাবেরীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শোয়।

মহিম পূর্ণিমাকে সঙ্গে নিয়ে বিকেলের দিকে সেই যে বেরিয়েছে আর ফেরার নাম নেই। হয়তো মেলায় গিয়ে মেতেছে বাপবেটি। ‘আমার হৈচ্যে মরণ কে কী বইলব্যেক সেই ডরে না পাচ্চি ঘরক্যে যাত্যে না পাচ্চি ইখ্যানে থ্যাইকত্যে…’ বিড়বিড় করে কাবেরী। হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু দরজায় মহিমকে দেখে চুপ করে যায়। পূর্ণিমাকে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি পরিয়ে ঘরে ফিরেছে মহিম। নতুন বাল্বের আলোয় ঝলমল করছে পূর্ণিমার হাতদুটো। ওর হাতে ঝুলতে থাকা পলিথিন প্যাকেটেও প্রচুর চুড়ি রয়েছে। ওগুলোও কাঁচের চুড়ি।

       কাবেরী পূর্ণিমার গালদুটো আলতো করে নাড়িয়ে আদর করে। হাতদুটোকে নাড়িয়ে বাজায় চুড়িগুলোকে। তারপর বলে, ‘তর মাক্যে দেক্যায় আয় যা…’

পূর্ণিমা হাসতে হাসতে মায়ের কাছে গেলে কাবেরী মহিমকে বলে, ‘আমি একবার ঘর যাব।’

‘ক্যেন্যে এই সন্দ্যা ব্যেলায় ক্যেন্যে আবার। একবার‍্যেই কাইল সকালে যাবি। তারপর আইজ মেলা…’

‘না না আমি মেল্যায় যাব নাই। আর ঘরক্যে না গ্যেলে জাইনব ক্যেমন কইর‍্যে ছাগলগুল্যাইন…’

‘ছ্যাগল দেইকত্যে যাত্যে হব্যেক নাই, আমি রামপদক্যে ত বল্যেই দিয়্যেছি জল-পালা খাউয়্যাই দিত্যে। অবলা জীবের কাইজ রামপদ না করা হব্যেক নাই। আর মেল্যা যাবি নাই ক্যেন্যে ?’

‘না আমার যাবার ইচ্চ্যা নাই।’

‘ত ইচ্চ্যা নাইট্যা ক্যেন্যে সেইট্যা বলবি ত, শুধুই বইলছ্যিস যাব নাই আর যাব নাই। আইজক্যে বিজয় পাল আইসচ্যে। পু…রা রসের গান চইলব্যেক।’

‘উসব রসের গান তুই শুনবি যা, কাইলক্যে তর যা রস দেক্যার দেইখ্যেছি। এই মুক লিয়ে আর রসের গান শুইনত্যে যাবার কনুই ইচ্চ্যা নাই আমার।’

‘তর রাগ হউয়্যা মন খারাব হউয়্যা সবেই সাবাবিক কিন্তু আমি কী কইত্তম বল ?’

‘সেইট্যায় তুই আর কী কত্তিস ? ততে আর তপনাতে তাহল্যে ফারাকটা কুতায়। উ সইব্যাইকার সামনে আমাক্যে নেংটা কইল্ল আর তুই বাকি লোকগুল্যার মত ভালছিলি। অমন মরদের মইর‍্যে দিয়্যা দরকার।’

‘তাহল্যে অজ্জুন ভীম সব্যাইকার মইর‍্যে দিয়্যা দরকার ছিল। কাইলক্যে ত বইল্লম আমি মায়ের…’

‘তর লইজ্জ্যা লাগ্যে নাই মা খুড়িক্যে লিয়ে বানাই বানাই গল্প বলচিস ?’

‘একটা কতাও মিত্যা বলি নাই। এই তর মাতায়…’ কাবেরীর মাথায় হাত দেওয়ার জন্য মহিম এগিয়ে গেলে কাবেরী বলে, ‘থাক অন্যেক হইচ্যে। আমাক্যে ইবার ঘর যাত্যে হব্যেক।’

‘তুই কী চাইচিস আবার একটা খারাব কিচু হক, তক্যে একা পাল্যে উয়ারা ছাইড়ব্যেক ?’

মহিমের কথা শুনে হাসি পায় কাবেরীর, ‘আমার আর হারাবার কিচুই নাই। আর তুই যাদের কতা ভাইব্যে ভয় পাচ্চিস উয়ারা আমার লতুন কইর‍্যে আর কী ক্ষতিটা কইরব্যেক। কাইল যা হৈচ্যে তারপর…। ছাড় তুই উসব্যের আর কী বুজবি, সবার সামনে নেংটা কল্ল্যে কেমন লাগ্যে উটা তুই বুজবি নাই।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জলটা মুছে মহিমের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসে কাবেরী। মহিম কী করবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

রাস্তাটা ঠিক অন্ধকার নয়, কিন্তু নির্জন। কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। মেলার এই দুটোদিন বিকেল সন্ধা থেকেই গ্রামটা ফাঁকা হতে শুরু করে। সবাই গিয়ে জড়ো হয় নদীর পারে। নটা বাজতে না বাজতেই পুরো গ্রামটাই শুনশান। চারপাশটা ভালভাবে দেখে নিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে চলে কাবেরী। মহিমের সঙ্গে মেলায় ঘোরার ইচ্ছে যে ওর ছিল না এমনটা তো নয়, খুব ইচ্ছেছিল। কিন্তু কালকের ওই ঘটনাটা সব কেমন যেন এলোমেলো করে দিয়েছে। আবার চোখদুটো ছলছল করে আসে কাবেরীর। নিজেকে নিজের কাছেও অসহায় বলে মনে হয় ওর। মনে হয় শুধুমাত্র বাঁচার লোভেই শরীর নামক একটা বোঝা ও বয়ে চলেছে। কিন্তু করবেটাই বা কী?

       কিছুদূর আসার পরেই হাবলুর ঘরের সামনে থমকে দাঁড়ায় কাবেরী। হাবলুর ঘরের ভেতর থেকে তপনার গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। এমন সময় হাবলুর ঘরে তপনার উপস্থিতি সন্দেহ জাগিয়ে তোলে কাবেরীর মনে।

‘তপনা মেল্যায় না যায়্যে ইখ্যানে কী কৈচ্চ্যে ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে কাবেরী। এগিয়ে যায় হাবলুর ঘরের দিকে। দরজাটা দেওয়া রয়েছে। দুটো দরজার মাঝের ফাঁকটা দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে ও। অস্পষ্ট ভাবে তপনা সত্যবান আর হাবলুকে মদ গিলতে দেখেই কাবেরী বুঝতে পারে ভেতরে ঠিক কী নাটক চলছে। এর পরিনতি ভালভাবেই জানে ও। এর পরিনতি আরেকটা কাবেরীর জন্ম। যাকে যখন তখন ইচ্ছে মতো ভোগ করা যাবে।

       আর এক মুহূর্তের জন্য না দাঁড়িয়ে কাবেরী ঘরের দিকে ছুটতে শুরু করে। ফেলে আসা ইতিহাস ভাসছে এখন ওর চোখের পাতায়। সেই তপনা-সত্যবান-কার্তিক-পরান, পরিমল টলে-টলে পড়ছে নেশায়। পরিমলের চলার শক্তি নেই। চোখ খোলার শক্তি নেই। ভয়ে জড়সড় হয়ে মদের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাবেরী…

       সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরের দরজাটা খুলে নিজের ঘরে ঢোকে কাবেরী। পাঁঠিছাগলটা বারদুই ম্যাঁ-ম্যাঁ করে চুপ করে যায়। ভেতর ঘরের দরজা খুলতেই চোখ পড়ে চকচকে বঁটিটার উপর…       

।২৭।

‘তুই মাকে কেমন করে বললি ? তোর না কবে যে বুদ্ধি হবে ভগবান জানে, আর তিতলির কথাটাও বলে দিয়েছিস ?’ শিল্পীর মাথায় ছোট্ট করে একটা গাট্টা মারে অন্তু। শিল্পী কিছু না বলে মিচকে শয়তানের মতো মিটিমিটি হাসতে থাকে।

       মায়ের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে বিকেলেই অন্তু চলে এসেছিল শিল্পীদের বাড়ি। আজকে তেমন কেউ নেই। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল তারা বিদেয় হয়েছে সকাল সকাল। এরপর সবাই আবার আসবে ঘাটের দিন। কেউ কেউ শ্রাদ্ধের দিন। শিল্পীদের বাড়িতে ঢুকেই মনটা কেমন যেন খাঁ-খাঁ করে উঠেছিল অন্তুর। বাড়িটার আনাচে কানাচে শোকের ছায়া। অপরিচিত কেউ এসে বাড়িতে ঢুকলেও বুঝতে পারবে কিছু একটা হয়েছে। শিল্পী নিজের ঘরে একা। শিল্পীর মা শান্তনুর ছোটবেলার একটা ছবিকে আঁকড়ে অপলক ভাবে বসে রয়েছে। বাড়িটায় ঢুকে শিল্পীর মাকে দেখার পর কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছিল অন্তু। শিল্পী বলেছে, ‘মা সময় নিচ্ছে নিজেকে সামলাতে। মায়ের কয়েকটা মাস সময় লাগবে জীবনের স্বাভাবিক গতিটা ধরতে।’ অন্তু ভালমতোই জানে শিল্পী নিজেও স্বাভাবিক হতে পারেনি। ওর মায়ের অস্বাভাবিক আচরণই ওকে স্বাভাবিক হওয়ার নাটক করতে শিখিয়ে দিয়েছে। আসলে এমন একটা কল্পনাতীত ঘটনা ঘটার কয়েকদিনের ভেতর কেউই পারে না স্বাভাবিক হতে। সময় মানুষকে স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। এই সময়টা যতই নিষ্ঠুর নির্মম হোক না কেন সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়েই চলতে হয়।

       শিল্পীর মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শিল্পীর ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল অন্তু। কাবেরী-মহিমের আলোচনা দিয়ে আলাপ শুরু হলেও আলোচনা এসে থেমেছিল তিতলির কাছে। তারপর শিল্পীর অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতেই সন্ধা। এখন ওরা চলেছে মেলার পথে। ফুরফুরে বাতাসে ছুটছে অন্তুর সাইকেলটা। শিল্পী সামনে বসে টর্চ ধরে আছে। ও কিছুতেই আসতে চাইছিল না। কিন্ত শেষ পর্যন্ত অন্তুর ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে…’ ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে…’ কথাটা কাটতে পারেনি।

‘মাকে বলে অবশ্য ভালই করেছিস নতুবা আমাকে বলতে হত।’

‘মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার যে কত দম সেটা আমার ভালমতোই জানা আছে। বাইরেই তোমার যত দাদাগিরি জেঠিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা বেড়াল হয়ে যাও।’

‘দেখবি দম দেখবি…’ বলে চলন্ত সাইকেলটায় ঝাঁকুনি দেয় অন্তু।

‘বেশি কায়দা না দেখিয়ে ঠিকঠাক চালাও পড়লে আমি একা পড়ব না তুমিও পড়বে।’     

        ডাংরা নদীর ব্রিজ দিয়ে যেতে যেতেই মেলার আলোগুলো দেখা যাচ্ছে। হরেকরকম শব্দ কানে আসছে। আবার মাঝে মাঝেই শালগাছের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে আলোগুলো। তখন শান্তনুর কথা ভিড় করে আসছে শিল্পীর মাথায়। আনমনা হয়ে পড়ছে শিল্পী। অন্তু শিল্পীর মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলে, ‘এখানে খুব সুন্দর বাতাস বইছে চল এখানেই বসি কিছুক্ষণ।’

       সাইকেলটাকে বিজ্রের ধারে দাঁড় করিয়ে ব্রিজটার উপরেই বসে পড়ে দুজনে। মৃদুমন্দ বাতাসে ফুরফুর করে উড়ছে শিল্পীর চুলগুলো। এখান থেকে মেলার আলগুলোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হবে কে বা কারা যেন নদীটার ধারে আলোর মোটা রেখা টেনে দিয়েছে। নদীটার আধমরা স্রোতে আলোর দানাগুলো ঝিলমিল ঝিলমিল করছে এখন।

‘জলটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখ মনে হবে যেন আলোগুলো নাচ করছে।’

‘ওটাই তো দেখছি।’ অন্তুর কাঁধে মাথাটা হেলান দেয় শিল্পী। ভাললাগে অন্তুর।

‘মাকে নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছে জানো। আমিই পারছি না তা মা পারবে তো এই শোকটা কাটিয়ে উঠতে।’

‘সময় সব ঠিক করে দেয়। স্বামীর শোক কাটিয়ে ওঠার পর উনি যখন তোদেরকে মানুষ করেছেন তখন এটাও উনি ঠিক কাটিয়ে উঠবেন। তোর দাদার কাজগুলো পেরিয়ে গেলে দেখবি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে কাকিমা।’

‘হলেই ভাল। আচ্ছা বিয়ের পর তুমি আমার মাকে দেখবে তো ? মায়ের কিন্তু আর কেউ রইল না।’

‘এতদিনে এটুকু তুই নিশ্চয় আমাকে চিনেছিস। চিন্তা করিস না আমি দুই মায়ে ভেদাভেদ করব না। দুজনকেই সমান ভাবে দেখব।’

‘আমিও।’ বলে অন্তুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে শিল্পী।

‘এই মা বলেছে বৈশাখে ভাল দিন থাকলে বৈশাখেই বিয়ে দিয়ে দেবে…’

‘না দিলে চলবে কেন মশায়…’ অন্তুকে দেখিয়ে দেখিয়ে তলপেটটায় হাত বোলায় শিল্পী।

‘তোর ডেট পেরিয়ে গেছে ?’

‘যায়নি তবে পেরিয়ে যাবে আমি জানি…’

‘কী করে জানলি ?’

‘আমার মন বলছে তাই। আচ্ছা হলে কি তোমার সমস্যা হবে ?’

‘না আর সমস্যা হবে না। আসলে বিয়ে হওয়ার আগেই…। আমি কেন যেন ঠিক মেনে নিতে পারি না।’

‘বৈশাখে বিয়েটা হলে কোনও সমস্যা থাকবে না।’

‘হ্যাঁ তাহলে নো প্রবলেম।’

‘প্রবলেম নেই মানে ? এবার তো একটা চাকরি দেখো নইলে আমার বাচ্চা কী খাবে ?’

‘এটা খাবে…’ শিল্পীর বুকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় অন্তু।

‘ধ্যাত তুমি না যাতা একটা।’

       আরও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ায় দুজনে। অন্তু জড়িয়ে ধরে শিল্পীকে। চুমু খায়। তারপর সাইকেলটার দিকে এগিয়ে যায়। মেলায় গান শুরু হয়েছে এতক্ষণে…

‘কতক্ষণ থাকবে মেলায় ? এখানেই তো অনেক দেরি হয়ে গেল।’ সাইকেলে চড়তে গিয়ে জিজ্ঞেস করে শিল্পী।

‘মেলায় ভাল লাগলে ঘণ্টা খানেকের মতো আর ভাল না লাগলে বেশিক্ষণ না।’

‘মা একা ঘরে আছে তাই জিজ্ঞেস করলাম। যদিও রানু কাকিমা আসবে বলেছে কিন্তু কতক্ষণ থাকে…’

‘কে রানু কাকিমা ?’

‘তুমি চিনবে না আমাদের গ্রামের ভেতর দিকে ওদের বাড়ি।’

‘ও, তুই বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তাহলে থাকবে। তাছাড়া একবার কল করেনিবি।’

‘মা কল ধরলে তো ভালই হত…’

‘মা নয় তোর ওই কাকিমাকে।’

‘উনার ফোন নেই…’

অন্ধকার রাস্তার বুকে টর্চের আলো ফেলে ছুটছে সাইকেলটা। আর কিছুটা গিয়ে জয়নগর ঢোকার মুখে ডান দিকে বাঁক নিলেই মেলাটা যেখানে হচ্ছে সেখানে পৌঁছে যাবে ওরা। মেলার পরিচিত সুরগুলোও এতক্ষণে কানে ভেসে আসছে। শিল্পীর মাথায় চিবুক নামিয়ে হেলতে দুলতে সাইকেলটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্তু। মনের ভেতর থেকে বিয়ে নামক একটা মিষ্টি গন্ধ বেরিয়ে আসছে ভুরভুর করে। নিজের বরবেশ আর শিল্পীর কনে সাজটা মনে মনে একবার কল্পনা করে অন্তু। হাসি পেয়ে যায় ওর…

‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও…’

‘কেন ?’

‘কোথায় যেন খুব ঝগড়া হচ্ছে।’ ঝগড়া কথাটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে অন্তু। ঠিক কোত্থেকে গলার আওয়াজগুলো ভেসে আসছে শোনার চেষ্টা করে। মেলার হাজার রকম শব্দের ভেতরেও অন্তু এটা বুঝতে পারে যে গ্রামের ভেতর কোথাও একটা জোর ঝামেলা হচ্ছে। ‘চল জলদি চাপ। গ্রামে কিছু হয়েছে মনে হয়। কালকের ঘটনাটাকে নিয়ে মহিম কাকার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধতে পারে…’

‘আমার কিন্তু খুব ভয় করছে। তুমি তো বললে তুমি কালকে পঞ্চায়েত প্রধানকে পিটিয়েছ। ওরা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না তো ?’

‘ওদের সেই সাহস থাকলে সেটা কালকেই করতে পারত। আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশে জানাবে মনে হয়, পঁদে ভয় আছে বলে সেটাও করেনি। ওরাও ভাল মতোই জানে কালকে দোষটা কারা করেছিল।’

‘আচ্ছা ওই বিধবা বউটা তো পুলিশে জানাতে পারত…’

‘তাতেও কিছুই হত না। উল্টে থানাতেও ওকে কাপড় খুলতে হত। এটাই আমাদের দেশের আইন। ধর্ষণটা কীভাবে হয়েছে সেটা দেখানোর জন্য মেয়েটাকে আরও একবার ধর্ষিত হতে হয়। আর কেস আদালতে গেলে তো ধর্ষণের বিবরণ দিতে দিতে আরও কয়েকশবার ধর্ষণ…’

জয়নগরের দিকে সাইকেলটা বাঁক নিতেই অন্তু-শিল্পী দুজনেই দেখতে পায় রাস্তায় প্রচুর লোক ছোটাছুটি করছে। সবাই ছুটছে মহিমের ঘর যেদিকে সেদিকেই। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় অন্তু। কোনরকমে ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে। অন্তুর সাইকেলের সামনে পাশের গ্রামের একটা মেয়ে চেপে রয়েছে, তবু যেন কেউ দেখেও দেখছে না। সবাই হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। মহিমের ঘর যাওয়ার গলিটার দিকে সাইকেল ঘোরাতেই অন্তু দেখতে পায় ভিড়টা জমেছে হাবলুর ঘরের সামনে।

       সাইকেল আর শিল্পীকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে লম্বা পা ফেলে অন্তু এগিয়ে যায় হাবলুর ঘরের দিকে। ভিড় ঠেলে কোনক্রমে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয় না ওর। বঁটি হাতে পরানের গলায় একটা পা-দিয়ে উন্মাদিনীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে কাবেরী। পরান আদৌ বেঁচে আছে কি না সেটাও বুঝতে পারে না অন্তু। তপনার অবস্থা ততধিক খারাপ। কাঁধের কাছাকাছি বঁটির বেশ কয়েকটা কোপ পড়েছে। দরজার কাছেই রক্তে লাল হয়ে পড়ে আছে তপনা। সত্যবান আর কার্তিক হাবলুকে আঁকড়ে ঘরের চালাটার নীচে বসে রয়েছে। ওদের শরীরেও ক্ষতচিহ্ন। ঠেলাঠেলি করে কয়েকজনকে সরিয়ে ভেতরে ঢোকে অন্তু। এর পরই ওর চোখ পড়ে হাবলুর বউ এর উপর। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় উঠোনের কোনার বসে কাঁপছে বউটা। মনে হয় পিছন দিকে ঘুরিয়ে বাধা আছে ওর হাতদুটো।

‘আইজক্যের পত্তে আর কন বউ কন মেয়্যার দিকে ভাইলত্যে লারবি তরা…’ পরানের পেটে লাথি মারতে থাকে কাবেরী।

অন্তুও বুঝে উঠতে পারে না এখন কাবেরীর কাছে যাওয়াটা কতটা নিরাপদ। কিন্তু কাবেরীকে থামাতে না পারলে পরানের মৃত্যু নিশ্চিত, যদি ও এখনো বেঁচে আছে তো। বারেক্কে ভিড় বাড়ছে, কিন্তু সবাই দর্শক। ওরা নিজেদের ভেতর আলোচনা সমালোচনা করছে মাত্র। কাবেরীকে শান্ত করার লক্ষণ ওদের শরীরী ভাষাতে নেই। শেষ পর্যন্ত কাবেরীর দিকে অন্তু নিজেই কয়েক-পা এগিয়ে যায়। কেউ কেউ অন্তুকে কাবেরীর কাছে যেতে নিষেধ করে। অন্তু নিজেও জানে এমন মুহুর্তে যে কোনও পুরুষের ঘাড়েই কোপ বসিয়ে দিতে পারে কাবেরী। ভাল মন্দের বিচার করার ক্ষমতা এখন ওর নেই।

       আরও কয়েক-পা সামনে যেতেই অন্তুর দিকে রক্তচক্ষুতে তাকায় কাবেরী। আর পা নড়ে না অন্তুর। ভয় যেন গ্রাস করে পা-দুটোকে। ঠিক এমন সময় হাবলুর ঘরে ঢোকে মহিম। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেলা থেকে ফিরছে ও। পুরো উঠোনটায় একবার চোখ বুলিয়েই যা বোঝার বুঝে নেই মহিম। দ্রুত কাবেরীর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মহিমের দিকেও বঁটি উঁচিয়ে ধরে কাবেরী। মহিম পাত্তা দেয় না। কাবেরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর হাত থেকে কাড়িয়ে নেয় বঁটিটা। এক ঝটকায় ওকে টেনে নেয় পরানের কাছ থেকে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই জ্ঞান হারায় কাবেরী। মহিমের বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে।               

আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠছে এখন। রাত যত বেড়েছে হাবলুর ঘরের সামনে ভিড় ততই বেড়েছে। মেলার পুরো ভিড়টাই হামলে পড়েছিল এক সময়। মিনিট চল্লিশ হল পুলিশ এসেছে ইঁন্দপুর থানা থেকে। ভিড়টা তাই তুলনামূলক কম। পরান আর তপনাকে গবিন্দনগর হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এসেছে গ্রামের কয়েকটা ছেলে মিলে। ডাক্তার তপনাকে বিপদমুক্ত জানালেও বাহাত্তর ঘণ্টার আগে পরানের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে না জানিয়েছে। এটা তো গেল নিছক সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এর পরের ঘটনাটাই অবিশ্বাস্য…

       থানা থেকে পুলিশ এসে কাবেরীকে এরেস্ট করতে গেলে প্রথম বাধা আসে অন্তুর মা লতিকার কাছ থেকে। লতিকার দেখাদেখি বাধা দেয় শিল্পী সঙ্গে আরও পাঁচটা মেয়ে বউ। তারপর পাঁচটা-দশটা করে সেই সংখ্যা বাড়তেই থাকে। কুড়ুল হাতে সবাইকে অবাক করে চূড়ান্ত বাধাটা দেয় তপনার বউ, ‘হাত কাইট্যে ফাঁক কইর‍্যে দিব যদি উয়ার গায়ে হাত দিস…।’ তপনার বউ কোনওদিন কাবেরীর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াবে সেটা সত্যিই সবার কল্পনার অতীত ছিল। তপনার বউ কুড়ুল হাতে কাবেরীর পাশে দাঁড়াতেই মেলা দেখতে আসা মেয়ে-বউগুলো কীভাবে যেন লড়াইটাকে মেয়েলি লড়াই বানিয়ে তোলে। আর এতেই পিছু হাঁটতে হয় পুলিশকে।

       এই পরান, সত্যবান, তপনা, কার্তিক এদেরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে জয়নগরের মেয়ে-বউদের মনের ভেতর যে কালবৈশাখী দানা বাঁধছিল সেটা কাবেরীর আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়ল পহেলা বৈশাখের একদিন আগেই। আসলে এটা একদিন হওয়ারই ছিল। কাবেরী শুধুমাত্র দিনটা নির্ধারণ করে দিয়েছে।         

।২৮।

অন্তু শিল্পীর সঙ্গে কাবেরীকেও নিজের ঘরেই নিয়ে গিয়েছিল লতিকা। না নিয়ে গিয়ে উপায় ছিল না। বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল কাবেরীর। সেটা কাবেরীর নিজের ঘরে বা মহিমের ঘরে সম্ভব ছিল না কিছুতেই। শরীরখেকো শয়তানগুলোর বিরুদ্ধে কাবেরীর এই প্রতিবাদ জয়নগরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি। কে এই কাবেরী ? এটা জানতেই মেলা দেখতে আসা মানুষগুলো ভিড় করছিল কাবেরীর ঘরে। মহিমের ঘরে। কাবেরী নিজেও ভাবেনি ওর এই প্রতিবাদটা গ্রামের অন্ধকারে থাকা প্রত্যেকটা মেয়ে-বউ এর মনে ভোর এনে দেবে।

       বিকেলের দিকে লতিকা কাবেরীকে সঙ্গে নিয়েই মহিমের ঘরে আসে। ওদের পিছু পিছু অন্তু আর শিল্পী। সবাই মিলেই মেলায় যাবে আজ। লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুর ঘরে ঢোকে কাবেরী। আজকে ভাদুকেও বেশ ভাল লাগছে। ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে লতিকা, ‘চিনত্যে পাচ্চিস আমাক্যে ?’

ভাদু ঘাড় নেড়ে বলে, ‘দিদিমুনির মুক ভুইল্ল্যে উপরবালাও মাপ কইরব্যেক নাই।’

ভাদুর কথা শুনে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে লতিকা বলে, ‘শোন মেয়্যার কতা। তা আমার মুকটা কী এমন গুড় লাগা শুনি ?’

ভাদু এই কথার উত্তরে কিছু বলে না। শুধু ইশারায় দুজনকেই বসতে বলে। তারপর মাথার কাছে রাখা গোলাপি রঙের একটা শাড়ি কাবেরীর হাতে দিয়ে বলে, ‘আইজ এইট্যা পইর‍্যে মেল্যায় যাবি। পুনিকে দিয়ে বার কর‍্যাই রাইক্যেচি।’

কাবেরী কাপড়টা হাতে নিয়ে একবার লতিকার মুখের দিকে একবার ভাদুর মুখের দিকে তাকায়। বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কী বলবে।

‘এই কাপইড়ট্যা বিয়া বচরে পুনির বাপ দিয়্যেচিল। আমার খুব ইচ্চ্যা এইট্যা পল্ল্যে তকে কেমন লাইগচ্যে সেটা দেকার। আমি যাবার আগুত্যেই পুনিকে একটা মায়্যের পারা মা দিয়্যে যাত্যে চাই। ওই বোবা মিয়্যাট্যার জন্যে আমার বড চিন্ত্যা হয়। উয়াকে দেকিস, তাহৈল্যেই হব্যেক।’

লতিকা আর কাবেরী নির্বাক ভাবে ভাদুর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘পুনি হওয়ার আগুত্যে ওই মন্দির‍্যেই ত মানত কইর‍্যেছিলম…’ ভাদু নিজের খেয়ালে এক একটা গল্প শুনিয়ে যায়। অনেক অনেক গল্প বলার আছে ওর। ওর হাতে অত সময় নেই। তাই খুব কম সময়েই অনেক বেশি বেশি গল্প বলতে হবে ওকে…

পড়ন্ত বিকেলে মহিমের ঘরের পিছন দিকের লাল মাটির কাঁচা রাস্তাটা ধরে ডাংরা নদীটার দিকে হাঁটতে থাকে ওরা। সবার আগে আগে প্রজাপতির মতো উড়ে চলেছে পূর্ণিমা। তারপর কাবেরী আর শিল্পী। পশ্চিম আকাশটা আজকে কাবেরীর শাড়িটার মতো লালচে গোলাপি হয়ে আছে। বেশ ফুরফুরে লাগছে শিল্পীকেও। কাবেরীর সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে শিল্পী। ভোররাতে লতিকার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে শিল্পীর মা। শিল্পী কল্পনাও করেনি ওর মা ফোন ধরবে। রাতে বাড়ি ফিরতে না পারার জন্য উল্টে ভয় পাচ্ছিল শিল্পী। শিবানী শুধু ফোন ধরেছে তাই নয় শিল্পী আর অন্তুর বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও কীসব যেন বলেছে। যদিও ঠিক কী বলেছে সেটা লতিকা শিল্পীকে বলেনি। শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসেছে শুধু।

       পথ চলতে চলতেই লতিকা কীসব যেন বলছে মহিমকে। কাবেরীর টেস্টের ব্যাপারে কিছু হবে হয়তো। নিছক কৌতূহল মেটাতেই আজকে দুপুরের দিকে কাবেরীর পেচ্ছাব টেস্ট করেছিল লতিকা। রিপোর্ট পজেটিভ। যদিও সকালের প্রথম পেচ্ছাব হলে বেশি নিশ্চিত হওয়া যায় তবুও উত্তর যখন পজেটিভ তখন সম্ভাবনাই বেশি।

       সবার পিছনে হেলতে দুলতে আসছে অন্তু। মা সঙ্গে আছে বলেই শিল্পীর পাশাপাশি হাঁটা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। তার উপর সিগারেটের নেশাটা মাথায় চড়ে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। তাই ইচ্ছাকৃত ভাবেই পিছিয়ে পড়ছে ও। পলাশগাছ পলাশগাছ ভাবতে ভাবতেই এতক্ষণ এসেছে। কিন্তু সুযোগ আসেনি। এতক্ষণে রাস্তার ধারে মস্ত একটা পলাশের ঝোপ দেখতে পেয়েই ঝুপ করে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয় অন্তু। পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করে নিমেষে ধরিয়ে নেয়। একটা লম্বা টান দিয়ে উপরের দিকে মুখ তুলে সবে পেচ্ছাব করতে যাবে না মোবাইল বাজতে শুরু। ‘এই হয়েছে শালা এক বিরক্তি। সময় জ্ঞান বলে কিছু নেই…’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে তিতলির সেই নতুন নম্বরটা। এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে মোবাইলের কভারটা খুলে ফেলে অন্তু। তারপর ব্যাটারিটা তুলে নখ দিয়ে সিমটা টেনে বের করে। তারপর……, মুত্রে বিসর্জন। পেচ্ছাব আর সিগারেট শেষ হলে আবার রাস্তায় বেরিয়ে আসে অন্তু। এখন আর কোনও স্মৃতির টান নেই, সম্মুখে হেঁটে যাচ্ছে নতুন জীবন। এখন ওর অ-সিম আনন্দ।

আকাশে নানান রঙের হাট বসিয়ে সূর্যটা ডুবছে এখন। বছরের শেষ সূর্য এটা। কালকে পহেলা বৈশাখ। নতুন সকালের একটা গল্প নিয়ে নতুন একটা সূর্য আসবে কাল। হঠাৎ করেই অন্তুর চোখ পড়ে কাবেরীর উপর। সূর্যের শেষ কিরণগুলো এমন ভাবেই কাবেরীর খোলা চুল আর শাড়িতে পড়ছে, মনে হচ্ছে ঠিক যেন কোনও এক আলোকিতা নারী আলোকরশ্মি ছড়িয়ে সামনের দিকে চলেছে। অন্তু বিড়বিড় করে বলে, ‘এই সেই নারী যাকে কত সহজেই সেদিন সবার সামনে নগ্ন হতে হয়েছিল। আবার এই নারীই তো বঁটি হাতে শয়তানের বুকে পা রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেই নারীটিই এখন শরীরে শীতল সূর্য মেখে নতুন জীবনে ফেরার পথে এগিয়ে চলেছে।’ দুচোখ ভরা শ্রদ্ধা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত কাবেরীর চলার পথে তাকিয়ে থাকে অন্তু। তারপর নিজেও চলতে শুরু করে। ওরা সবাই অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে এখন অন্তুকেও লম্বা পা ফেলে চলতে হবে।

[সমাপ্ত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *