ছোটোগল্প

রণজয়

                                                                        মল্লিকা ধর

খোলা বারান্দায় পুরনো ইজি-চেয়ারে প্রিয়তোষ চুপ করে বসে থাকে । আজ আকাশটা কী তীব্র নীল! সাদা কাপড় বোলালে যেন নীল রঙ উঠে আসবে! একটুকরো মেঘ কোথাও নেই । হেমন্তের আকাশে শিরশিরে শীত, পুরানো পাতারা ঝরে যাচ্ছে । এমনই অভিমানী হেমন্তের দিন ছিল সেদিন । রণোর চলে যাবার দিন ।

কত বছর পার হল তারপর? চার বছর নাকি পাঁচ বছর? নাকি এ মাত্র দু’বছর আগের কথা? সব কেমন গুলিয়ে যায় প্রিয়তোষের ।

কোথায় যেন একলা একটা পাখি ডাকছে । একবার ডাকছে, থেমে থাকছে একটু, হয়তো শুনতে চাইছে কেউ সাড়া দেওয়া ডাক দিল কিনা, তারপরে আবার ডাকছে । একাই ডাকছে থেমে থেমে, কোনো সাড়া দেওয়া ডাক আসে না ।

প্রিয়তোষ কান পেতে শোনে । একটাই ডাক, নাকি সাড়া এল কোনোখান থেকে? 

পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য, বেলা ফুরিয়ে এল । প্রিয়তোষের চশমার কাচটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, সে চশমা খুলে মুছতে থাকে ।

নির্মলা আসে, প্রিয়তোষ চেয়ে থাকে ফাঁকা চোখে । আরো কার যেন আসার কথা ছিল?

“চলো ভিতরে চলো, ভিতরে গিয়ে চা খাবে । এখানে ঠান্ডায় আর থেকো না । চলো ।”

কে বলছে? নির্মলা? হ্যাঁ নির্মলাই তো! সে আর কার গলা শোনার জন্য কান খাড়া করে ছিল ?  সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মাঝে মাঝে সে কেন তার গলা শুনতে পায়?

এই তো সেদিন । সে শুনছিল, রণো কুন্ঠিত গলায় আস্তে আস্তে বলছে -ফিরতে দেরি হয়ে গেল বাবা । মাফ করে দাও । সারাদিন খাই নি, খুব ক্লান্ত । আজকে কিছু বোলো না ।

ঠোঁট নড়ে প্রিয়তোষের – আয় খোকা, আজ তোর জন্য মিষ্টি এনেছি । কিছু বলবো না রে, আয় । তোর মা মিষ্টি বেড়ে দেবে আমাদের, দু’জনে একসঙ্গে খাবো, আয় ।

রণজয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, এক পা ও এগিয়ে আসে না । প্রিয়তোষ এগিয়ে যায়, বলে –কী রে, কী হল? ভয় পাচ্ছিস? কাছে আয় । ভয় পাস না । কিছু বলবো না তোকে ।

রণজয় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আস্তে আস্তে বলে – আমি চলে যাচ্ছি বাবা, মাকে বোলো আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসতাম । মিতিনকে আর ছোটনকেও বোলো । তোমাদের সঙ্গে থাকতে আমার খুব ইচ্ছে ছিল ।  তোমরা যদি আমায় একটু, একটুখানি ভালোবাসতে, তাহলে — তোমরা তো আমায় দেখতে পারোনা, ভাইবোনদের সাথে আমায় খেলতে দাও না । ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি । তোমরা ভালো থেকো ।  

মিলিয়ে গেল রণজয়ের শীর্ণ, বিষন্ন, কিশোর চেহারা । প্রিয়তোষ চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হল না ।  

সে শুনল নির্মলা বলছে – কী হল তোমার? স্বপ্ন দেখেছ? বোবায় ধরেছে? উঠে বসো, উঠে বসো ।

 ওঃ, স্বপ্ন! সব স্বপ্ন! স্বপ্ন এত স্পষ্ট হয়?

প্রিয়তোষ উঠে বসল, গলা শুকিয়ে কাঠ । শুকনো গলায় কোনোরকমে বলল — জল, জল ।

জল এনে দিল নির্মলা । জল খেয়ে প্রিয়তোষ বলল – স্পষ্ট দেখলাম খোকাকে । আমি মিষ্টি খাওয়াতে চাই, ও আসে না, ভয় পায় । তারপরে চলে গেল ।

এটা হপ্তাখানেক আগের কথা। কিন্তু প্রিয়তোষ গত রাত্রেও স্বপ্নে দেখেছে রণোকে । হয়তো প্রতি রাত্রেই দেখতে পায়, সব স্বপ্ন তো মনে থাকে না!  

  আজ এই হেমন্তের সন্ধ্যায় প্রিয়তোষের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে ।

সে বলে – নির্মলা, জানো কাল রাতেও দেখ্লাম রণোকে । আমাকে এত স্বপ্নে দেখা দেয় কেন বলো তো? আমি যে ওকে অত কষ্ট দিয়েছিলাম, সেইজন্যেই কি আমার স্বপ্নে আসে এত? তোমার ওকে মনে পড়ে না? তুমি ওকে স্বপ্নে দেখতে পাও না? তুমি যদি ছোটো দুটোর মত ওকেও একটু আগলে রাখতে  …. তাহলে হয়তো আমি ওকে বোকার মতন ওভাবে…. তুমি ওর নামে কত নালিশ করতে, আর আমিও ওকে কীভাবে মারতাম ….আহ, কিছু বলতো না শেষদিকে, আমার সামনে কাঁদতোও না । মিতিন আর ছোটন আমার কাছে কত আবদার করতো পুজোর সময় জামার জন্য, রণো  কিছু চাইতো না । একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম বিশেষ কিছু ওর চাই কিনা, কেমন আস্তে আস্তে বলেছিল, “তোমার যা ইচ্ছে তাই দিও । তোমার যা ভালো লাগে, তাই দিও । তুমি যা দেবে, আমার তাই ভালো লাগবে ।  ” কেমন করে প্রণাম করতো দশমীর দিন, পায়ের পাতায় মাথা ছুঁইয়ে । আমরা ওকে বুঝতে পারিনি নির্মলা….

নির্মলা বলে – তুমি এমন কোরোনা । কেন শুধু নিজের উপরে সব নিচ্ছ? আমার দোষও তো কিছু কম না । মা হয়ে ওকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিতাম । ছোটন-মিতিনকে একবার নাকি ও বলেছিল ওর কেউ নেই । আমরা নাকি ওকে অনাথ-আশ্রম থেকে এনেছিলাম । তুমি ওকে যেসব সন্ধ্যেবেলা শাস্তি দিতে, রাতের খাবার দিতে বারণ করতে বলে কত রাতে ওকে খেতে দিই নি ! কিছু বলতো না, চাইতোও না খেতে । মিতিন নাকি একবার লুকিয়ে খাবার নিয়ে দিয়েছিল, ও নেয় নি, বলেছিল, বাবা তোকে বকবে বোন ।” বলতে বলতে নির্মলা চোখে আঁচল দেয় ।

প্রিয়তোষ বলে – মনটা শান্তি পায় না । চলো রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি আমরা ।

নির্মলা বলে – দিও । এখন শান্ত হও । মিতিনটা আছে, ছোটনটা আছে, ওদের তো মানুষ করতে হবে । ওদের মুখ চেয়েই সব সামলে নিয়েছি আমি । জানো, মিতিনের ড্রয়িং খাতায় রণো ছবি এঁকে দিত । মাঝে মাঝে ছোটনের খাতায়ও এঁকে দিত । ওদের কাছে মিনতি করে তোমাকে বলতে বারণ করতো । ওদের খাতায় ছবি এঁকে দিয়েছে শুনে যদি তুমি রাগ কর? তুমি ওদের সঙ্গে খেলতে বারণ করেছিলে বলে খেলতো না ও । তারপরে তো …. মিতিন বলছিল, দাদার সঙ্গে খেলা করতে ওদের খুব ইচ্ছে করতো । বলছিলো, ‘দাদা একা বলেই তো আমরা এসেছিলাম মা, ওর খেলার সাথী কেউ ছিল না কিনা! এবারে আমরাও চলে যাই তাহলে? ’

প্রিয়তোষ চমকে ওঠে – এইসব বলে ওরা? তুমি ওদের বুঝিয়ে বোলো । ওদের তো কোনোদিন আমরা কিছু কষ্ট দিই  নি! কোনোদিন ওদের কিছু বলবো না । চলো সবাই মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই, রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি । আহ, ছেলেটা… চলে গেল… কতবার কত মেরেছি, কিন্তু কোনওদিন ভালোবাসি বলা হল না । যখন বলবো বলে ছুটে গেলাম, তখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে ।

 দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকে প্রিয়তোষ ।

নির্মলা ওর মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে – শান্ত হও একটু । তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে সংসারের কী হবে? চলো, ঘরের ভেতরে চলো ।  

একটু সামলে নিয়ে মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে প্রিয়তোষ বলে -আমি ঠিক আছি । আর একটুখানি থাকি এখানে । তারপর ঘরে যাবো ।

ইজি-চেয়ারে এলিয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে সে । চোখ বন্ধ করতেই নীল আকাশভরা ঝলমলে রোদ্দুর, তার মধ্যে রণজয়ের অভিমানী মুখ ফুটে ওঠে, কী যেন সে বলে ।

প্রিয়তোষ বিড়বিড় করে -আহা তুই আলোর ছেলে, ভালোবেসে এসেছিলি আমার ঘরে, রাখতে পারলাম না। কত কষ্ট পেয়ে ফিরে গেলি । ক্ষমাও চাইতে সময় পেলাম না । একদিন তো দেখা হবে, সেদিন ক্ষমা চাইবো । ক্ষমা করে দিস খোকা সেদিন । করবি না?  

আকাশভরা আলোয় বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে ওঠে দু’টি অভিমানী চোখ, তাতে শিশিরের মতন অশ্রু, টপটপ করে ঝরে পড়তে থাকে প্রিয়তোষের বন্ধ চোখের পাতার উপরে ।

কানে আসে মন্ত্র, “মধু বাতা ঋতায়তে / মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ / মাধ্বীর্ণ সন্তোষধী….”

ওই মধুময় বাতাসের সঙ্গে সে মিশে গিয়েছে । যে আলোর ঘর থেকে এসেছিল, সেই আলোর ঘরে ফিরে গিয়েছে ।