সাবধান মিসেস মুখার্জ্জী, সাবধান মিসেস সেন
অগ্নিভ সেনগুপ্ত
আমাদের জীবনটা মনে হয় একটা রিলে রেসের মতো। আমাদের হাতে ব্যাটন তুলে দিয়েছিল আমাদের মা-বাবা। আর, আমাদের আজীবন চেষ্টা থাকে যাতে আমাদের দৌড় শেষ হলে ব্যাটনটা আমাদের সন্তানের হাতে তুলে দিতে পারি। মানুষ পাল্টায়, ব্যাটনটা পাল্টায় না। পাল্টায় না বলাটা ভুল, সমাজের ক্রমাগত রদবদলের সাথে-সাথে আমাদের মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক মিউটেশন তো অবশ্যম্ভাবী – চেঞ্জ ইজ দ্য ওনলি কনস্ট্যান্ট। তবুও, আমগাছে আমই ফলবে, আর আমার সন্তান আমার মতোই হবে – সেটাই স্বাভাবিক।
আমরা যে সময়ে বড় হয়ে উঠেছি, সেই সময়ে সেই ব্যাটন হাতে দৌড়ের মাঠটা আমাদের চেনা ছিল। চেনা পরিবেশ, চেনা পাড়াপ্রতিবেশী, চেনা আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি। কিন্তু, আজকে পৃথিবী ছোট হতে-হতে যখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে, চেনার গন্ডী ছেড়ে আমরা বেড়িয়ে পরেছি অজানার উদ্দেশ্যে। আমার বেশীরভাগ বন্ধুবান্ধবই যেমন পশ্চিমবঙ্গ, তথা ভারতবর্ষের বাইরে সেটলড। আমার মতো অনেকেই বিদেশে, অথবা অন্য রাজ্যে অনেকদিন ধরে বসবাস করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাইগ্রেন্ট ভারতীয়।

২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসে বেশীরভাগ ভারতীয় প্রবাসী হয় নলেজ মাইগ্রেন্ট (অর্থাৎ তারা বিশেষ দক্ষতার অধিকারী যা স্থানীয়ভাবে দুর্লভ), নাহয় ফ্যামিলি মাইগ্রেন্ট (অর্থাৎ, পরিবারের স্বার্থে যারা প্রবাসে এসেছেন)। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নলেজ মাইগ্রেন্টদের পরিবারই ফ্যামিলি মাইগ্রেন্টের গণনায় সংখ্যাত হচ্ছেন।
আর, সময়ের নিয়মে সেই প্রবাসেই গড়ে উঠেছে আমাদের সংসার। সেই সুবাদে আমাদের অনেকেরই সন্তানের জন্ম প্রবাসে, অর্থাৎ টেকনিক্যালি আমাদের সন্তানরা সেকেন্ড জেনারেশন ইমিগ্রেন্ট।

প্রধানত প্রথম প্রজন্মের মধ্যে যে অসুবিধাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে, দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসীদের ক্ষেত্রে সেই সমস্যার প্রভাব খুব-একটা নেই বলেই আমার মনে হয়।
ভাষা-সমস্যা তাদের নেই। তাদের বেড়ে ওঠা এবং পড়াশুনা প্রবাসেই, তাই ভাষাশিক্ষা তাদের স্কুলেই হয়ে যায়। আমার নিজের মেয়ে, বা তার বন্ধুবান্ধবরা ছোট বয়সেই ডাচ ভাষায় বেশ সরগর। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পিছুটানও খুব বেশী নেই, কারণ তাদের নিজের সমাজ প্রবাসেই গড়ে ওঠে।
প্রধান সমস্যা, অন্ততঃ আমার যা মনে হয়, গিয়ে দাঁড়ায় পরস্পরবিরোধী পরিবেশে। একটু খোলসা করে বলি। আমাদের, অর্থাৎ ভারতীয়দের সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতি ইয়োরোপিয়ানদের থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা। আমার মেয়ের যদি জ্বর হয়, একদিন পর থেকেই আমরা অস্থির হয়ে পরি। কিন্তু, ডাচ বাবা-মায়েরা অন্ততঃ পাঁচদিনের আগে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভাববেও না। আমরা ছোট থেকে যা দেখে এসেছি, যেভাবে বড় হয়ে উঠেছি, আমাদের সন্তানদের সেই হিসাবেই বড় করতে চাই। কিন্তু, তারা যখন দেখে যে তাদের বিদেশী বন্ধুরা সম্পূর্ণ অন্যভাবে বেড়ে উঠছে, তাদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
আমরা, যারা প্রথম প্রজন্মের প্রবাসী, চেষ্টা করি আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ধর্ম ইত্যাদি প্রবাসে বজায় রাখতে। তাই, আমরা স্বজাতীয়দের সাথে নিয়ে কম্যুনিটি তৈরী করি। কারণ, আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ে মাল্টিকালচারাল এক্সপোজার ছিল না বললেই চলে। কিন্তু, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সেই দায় নেই। তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশুনা, খেলাধুলা ইত্যাদি সবকিছুই শুধুমাত্র বাঙালী বা ভারতীয়-কেন্দ্রিক নয়।
আর, একটু বড় হয়ে গেলে তাদের বেশীরভাগ সময়টাই কাটে স্কুলে। নেদারল্যান্ডসে ডাচ সরকারী স্কুলের প্রাধান্য বেশী। সেখানে ডাচদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রবাসীরাও পড়াশুনা শেখে। ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আছে, কিন্তু সংখ্যায় কম এবং তুলনায় ব্যয়সাপেক্ষ। তবে, সঙ্গতভাবেই সেখানে মূলত প্রবাসীদেরই আধিপত্য।
তবে, উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদির সাথে ওঠাবসা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ছোট থাকার সময়ে এই সাংস্কৃতিক বিভেদগুলো অতটা চোখে পড়ে না। সেই সময়ে মূলতঃ বিভেদটা টিফিন বাক্সেই সীমিত থাকে। আমার মেয়ে যেমন প্রতিদিন নালিশ করে, “সোফি কেমন রোজ পিজ্জা নিয়ে আসে টিফিনে, তোমরাও তো আমাকে দিতে পারো।”
কিন্তু, বয়স বাড়ার সাথে সাথে, বিশেষতঃ বয়ঃসন্ধিতে সেই বিভেদটা প্রকট হয়ে ওঠে বলেই আমার মনে হয়। বয়ঃসন্ধি সময়টা এমনিতেই একটু গোলমেলে, শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে হিমসিম। তার সাথে যদি যোগ হয় সামাজিক অসামঞ্জস্য, তাহলে তো গোদের উপরে বিষফোঁড়া।
নেদারল্যান্ডসে যেমন দেখেছি, প্রাইভেট স্পেশ ব্যাপারটা বেশ গুরুত্ব পায়। এখানে আপনার যত প্রিয় বন্ধুর বাড়িতেই যান না কেন, আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিয়ে গেলে আপনি হয়তো ওনাদের বিরক্ত করতে পারেন। ওই, হঠাৎ করে “মাসীমা, মালপো খামু” বলে ঢুকে গেলেন, সেটা এখানে খুব-একটা আশকারা দেওয়া হয়না।
অবশ্য, এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে ভারতীয় সংসার বা দম্পতির মধ্যেও প্রাইভেট স্পেশের গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু, আমাদের কালচারাল শক হয় ব্যক্তির প্রাইভেট স্পেশের দাবীতে। আপনার স্বামী বা আপনার স্ত্রী যে একজন আলাদা ব্যক্তিসত্ত্বা, সেই হিসাবটা অনেক সময়ে আমাদের মেলাতে অসুবিধা হয়। তাও এখন যুগের হাওয়ায় মি-টাইম এসেছে, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সন্তান যদি মি-টাইম দাবী করে, তাহলে সেটা তার হার্ড-টাইম হয়ে যায়।
আমার এক বন্ধুর মেয়ের ঘরের দরজায় লেখা আছে, “প্লিজ নক বিফোর ইউ এন্টার”। খুব সহজ দাবী, কিন্তু কোথায় যেন আমাদের ভারতীয় অভিভাবকীয় চিন্তায় সেই নোটিশ নক করে গেল। বাচ্চা মেয়ে, তার ঘরে ঢুকতে গেলে আবার নক করতে হবে কেন? বাঙালী বাবা-মায়ের সেই চিরাচরিত চিন্তা, “ও, এখন এতো বড় হয়ে গিয়েছ যে তোমার ঘরে ঢুকতে গেলে নক করতে হবে?”
যাক, আমার সেই বন্ধুকে অনেক ধন্যবাদ, সে এমন কিছু নিশ্চয়ই তার মেয়েকে বলেনি। কারণ, যতই আপনি এক বাড়ীতে থাকুন না কেন, অন্যের ঘরে ঢুকতে গেলে সেটা তাকে জানান দিয়ে ঢোকাটা ইয়োরোপে খুব সাধারণ ভদ্রতা।
আমাদের, অর্থাৎ ভারতীয়দের অভিভাবকত্বের স্টাইল হচ্ছে মূল্যবোধ থেকে কেরিয়ার চয়েস, সবকিছু আরোপ করা। অবশ্যই, আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তাতে প্রধান অনুঘটক।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে নেদারল্যান্ডসে, তথা ইয়োরোপে পেশাদার কাউন্সেলিং এবং পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়। এখানে আপনি ডাক্তার হোন বা ট্রাক-ড্রাইভার, আপনার সাধারণ জীবনযাত্রায় খুব-একটা তফাৎ থাকবে না। আপনি অবশ্যই মিনিমাম ওয়েজ ল বা সোশ্যালিজমের দোহাই দেবেন, কিন্তু অনেক প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের মধ্যেও “ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারলে জীবনই বৃথা”-মার্কা চিন্তা হামেশাই প্রত্যক্ষ করা যায়। আবার, অনেকে প্রকাশ্যে উদার চিন্তার প্রদর্শন করেন, আর ডাইনিং টেবিলে সন্তানকে প্রশ্ন করেন, “অ্যাই, তোর থেকে ও বেশী নাম্বার পেল কেন রে?”
আসলে, আমাদের অবচেতনে সেই আরোপ-শৈলী এতোটাই গভীরে ঢুকে গেছে, যে প্রবাসের ভিন্ন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাতেও আমরা সেই অভ্যাস ছাড়তে পারিনা।
সেই, রবীন্দ্রনাথ কবে লিখে গেছেন, “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ করোনি”। বাঙালীরা একটু মায়ের আঁচল ঘেঁষে বড় হওয়ায় অভ্যস্ত। যত বড়ই হয়ে যাই, মা-বাবার কাছে আমরা এখনো সেই ছেলেমানুষ। অবশ্যই সেই অপত্য স্নেহের আবেগমূল্য আছে, কিন্তু বাস্তবিক জগতে আমাদের স্বাধীন পদক্ষেপ ফেলার ক্ষেত্রে সেই স্নেহ বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়ে।
সেই তুলনায় আপনি যদি বিদেশীদের দেখেন, ওনারা ছোট থেকেই নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত। আমরা যেখানে একটা বাল্ব পাল্টাতে গেলেও পাড়ার ইলেক্ট্রিশিয়ান দাদার খোঁজ পরে, সেখানে ডাচেরা বাড়ীর নিত্যনৈমিত্তিক কাজ তো করেই থাকে, এমনকি নিজের ঘর রং করা, কাঠের কাজ করা ইত্যাদিতেও পারতপক্ষে মিস্তিরি ডাকে না।
আমরা, অর্থাৎ প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা মূলতঃ বিদেশেও সমান্তরাল দেশের আবহ বানিয়ে নিতে চেষ্টা করি। আর, আমাদের আরোপিত অভিভাবকত্বের গুণে চেষ্টা করি যাতে আমাদের সন্তানরাও সেই বৃত্তে ঢুকে পড়ে, সে তাদের ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক। শুধুমাত্র সামাজিক আচার-ব্যবহারেই নয়, আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনধারাও প্রবাহিত হয় সেই ‘হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’-এর খাতে।
কিন্তু, আমাদের সন্তানরা? তাদের গন্ডীটা তো আমাদের থেকে আলাদা, স্কুলে-হবি ক্লাশে-ডে কেয়ারে। তাই, যখন তারা বাইরের জগতের সাথে ঘরের জগতকে মেলাতে পারেনা, তাদের মনে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা হয়তো আমি-আপনি বুঝতে পারব না। ট্যাঁশগরু তো গরু নয়, আসলেতে পাখি সে!

আমাদের সন্তানকে আমরা এইরকম বানাচ্ছি না তো?
এ তো গেল তাঁদের কথা, যাঁরা প্রবাসে সেটলড। কিন্তু, যাঁরা স্বল্প সময়ের জন্যে প্রবাসী? তাঁদের সন্তানরা এই সামাজিক কনফ্যুশনের জাঁতাকলে পড়ার আগেই দেশে ফিরে যান। তাঁদের মূল সমস্যা – পড়াশুনা। ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ডাচ শিক্ষাব্যবস্থার আকাশ-পাতাল তফাৎ। স্কুলে ভর্তি হয়ে সেই শিক্ষাব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে-না-নিতেই ঘরে ফেরার সময় এসে যায়। আবার নতুন করে অভ্যস্ত হওয়ার প্রচেষ্টা পুরানো ধরণ-ধারণের সঙ্গে।
সত্যি, আমি এদের জায়গায় থাকলে হয়তো ডাহা ফেল মারতাম।
পাঠকরা হয়তো এতোক্ষণে আমার উপরে বেজায় চটে গেছেন। মনে মনে বলছেন, খালি সমস্যার কথা লিখলে হবে, সমাধানটাও তো দিতে হবে! সত্যি বলতে কি, এই সমস্যার সমাধান আমিও খুঁজে চলেছি। তবে, ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, আমাদের সামাজিকতার দায় আমাদের সন্তানের উপরে অযাচিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রেখে আমরা সামান্য হলেও তাদের সাহায্য করতে পারি। যদি স্বেচ্ছায় ভালোবেসে তারা সেই ব্যাটন কাঁধে নিতে চায়, তাহলে তাদের ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!
আবার, অনেকে হয়তো বলবেন, এইসব কাল্পনিক সমস্যা, আসলে সব ঠিক আছে। তাঁদের জন্যে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ২০০৯ সালের একটা রিপোর্ট অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসে গর্হিত অপরাধের সাথে যুক্ত ৪৪৭ জন কিশোরের মধ্যে ৬৩ শতাংশ দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসী। অতএব, সাবধান মিসেস মুখার্জ্জী, সাবধান মিসেস সেন!
