ছোটোগল্প

তিনটি বিস্কুট

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

দীপা এসেছে। নীপা থাকে অনেক দূরে। আসতে পারে না তেমন। কী করে যে দুই মেয়েকে মানুষ করেছে আজ আর মনে পড়ে না মধুরীলতার। পড়ন্ত বিকেলে একচিলতে বারান্দায় বসে গোধুলীর শান্ত স্নিগ্ধ রোদ গায়ে মেখে বসে ভাবনাটা মাথায় এল। ছোট্ট দুটি ঘর। একফালি বসার যায়গা। সামনে একটি ফুলের বাগান। এই তার হালিশহরে জীর্ণ কুঠির। প্রাইমারী ইস্কুলের সামান্য মাস্টারির চাকরি সম্বল করে সে সখেরবাজার থেকে হালিশহরে হাজির হয়েছিল একান্ত প্রয়জনে। না হলে সে দুই মেয়েকে নিয়ে অচেনা অজানা আধা শহরে এসে হাজির হয়?

হয়ে ছিল নিজের শখ আল্লাদ মেটাতে নয়। নিরুপায় হয়ে। তখন পাশে কেউ নেই। এমন সময় কেউ থাকে না । আজ জগৎ টাই এমন। তাতে দুঃখ নেই মাধুরীলতার। নির্মল তার জীবনের দশ বছর ছিল। একদিন ভোর রাতে নাইট ডিউটি থেকে ফিরেনি সে। এক দিন পর তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল শখের বাজারের রাস্তায়। গলা কাটা। মাধুরীলতা প্রথমে বিশ্বাস করে নি। নির্মল গোপন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। সে জানত। কিন্তু তাকে কেউ খুন করতে পারে তা ছিল তার স্বপনের অগোচর। লোকে যখন খবর দেয়, সে অবাক হয়ে বলছিল, তোমরা ভুল বলছো না তো? না তারই ভুল, সে দেখল মৃতদেহটা যখন তার বাড়ির দরজা পেড়িয়ে বাড়িতে ঢুকছে।

তখন দীপা আর নীপা খুব ছোট। তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছিল বাবাকে। মাধুরীলতা দেখেছিল একটি মানুষ দশ বছর তাকে দিয়ে জীবনের বাকি বছর গুলো নিজে নিয়ে পালিয়ে গেছে গ্রহান্তরে। তখন মাধুরীলতার ত্রিশ। সত্তর বছর তো মানুষের গড় আয়ু তখন? নির্মলের এমন হলো কেন? তারা তলায় ইন্ডিয়ান অক্সিজেনের কারখানায় চাকরির আগে সে পাড়ার স্টেজে গান গাইতো বিপ্লবের ,প্রতিবাদের গান। উদাত্ত গলা ছিল নির্মলের, দেখতে সুপুরুষ নয় তবে চোখ ও মুখের উপর একটা সরলতার ছাপ ছিল । এমন মানুষের শত্রু হয় নাকি? কোন দিন ভাবতেই পারে নি মাধুরীলতা। বাড়িতে সিংগিল্ রিডের একটা হারমোনিয়াম ছিল। মাধুরীলতা নির্মলের সঙ্গে তার প্রভেদ করতে পারে নি। ভোরে সে হারমনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করতো। সন্ধ্যে এসে সেই যন্ত্র নিয়ে গান। এ তার নিত্য দিনের কাজ। মাঝে একদিন মাধুরীলতা বলেছিল, তুমি এই যন্ত্রটাকেই বিয়ে করতে পারতে। আমাকে খামকা টেনে এই সংসারের বলদ বানালে কেন?

নির্মল উদাত্ত গলায় হেসে বলেছিল, তুমি তো আমায় ঘানির বলদ বানিয়েছো। তুমি যা বলো সব আমাকে চোখ বন্ধ করে করতে হয়। তার বেলা?

খোঁচাটা হাসতে হাসতে হজম করেছিল মাধুরীলতা। একা একা মনের মধ্যে অনেক কিছু উঁকি দিয়ে হারিয়ে যায়। স্মৃতির একটা বড় গুণ সে মনের মধ্যে বেশীক্ষন থাকতে চায় না, ইচ্ছে হলে আসে, হেমন্তের বৃষ্টির মত নিজের থেকে চলে যায়। কিছুক্ষন মহোমুগ্ধ করে রাখে । তারপর আবার বর্তমানের কাছে পিঠে তাবু ফেলে বসে পরে। এখন জীবন অনেক এগিয়ে গেছে। তাকে পিছনের দিকে টেনে ধরার চেষ্টা করে নি মাধবীলতা।

দীপা এসেছে কাল। অনেক দিন পরপর আসে সে। মায়ের কাছে। ভিতরের ঘর থেকে জিজ্ঞেস করল, মা, ক’টা বিস্কুট? মাধুরীলতা বলল, তিনটে।

তিনটে? কেন?

সে তুই বুঝবি না। এমনি। বলে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে মাধুরীলতা। কথা বাড়ায় না । চিনি অনেক দিন বর্জন করেছে, দুধ কোনদিনই খেতো না। দীপা সেটা জানে। আর জানে বলেই তার চা বানাতে কোন অসুবিধা নেই। বারান্দায় বসে সে মায়ের পাশটিতে বসল। দু‘জনে বারান্দায়,সামনে দু কাপ চা ও বিস্কুটের প্লেট। ফুর ফুরে হাওয়া দিচ্ছে। বিকেলের রোদের তেজ কমে এসেছে অনেক। পশ্চিমাকাশে রঙ লেগেছে দিনের বিদায় বেলার। সন্ধ্যা হয় হয়।

                                                           ( ২)

মাধুরীলতার দিকে তাকিয়ে দীপা বলল, মা এবার তুমি আমার কাছে থাকবে। চল। একা আর থাকতে হবে না।

  • কেন? বেশ তো আছি। একা থাকতে কোন অসুবিধা নেই। নিরুদ্বেগ মাধুরীলতার গলা।
  • তা হোক। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। নাত্নির সঙ্গে সময় কাটাবে। মনটা সব সময় ভাল থাকবে মা। এখন তো কাজ নেই। নাত্নির সঙ্গে খেলবে।

মাধুরীলতা তাকাল মেয়ের দিকে। যেতে চাইলে তো অনেক দিন আগেই চলে যেতে পারত। যায়নি। দু টো মেয়ে মানুষ করেই তার জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এখন তাদের জীবন। তাদের জীবনে আর নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে না তার। সে তার জীবন দিয়ে দেখেছে, জীবন যার যার। প্রতিটি জীবনে এতো বিভিন্ন ধরনের ফল, ফুল, গন্ধ, যে কেউ কারোর সঙ্গে মেশে না। মেলে না। একজনের জীবনে অন্য জনের প্রবেশই গন্ডোগোলের মূল। কেন সে তা করবে? এখন অবসর। এখন অখন্ড সময়। নিজেকে দেখার এমন সময় তো আগে কোন দিন পায় নি মাধুরীলতা। একে ইস্কুলের কাজের চাপ, দু দুটো মেয়ের পড়াশোনার ব্যাস্ততা। নিজেই পড়িয়েছে যত দিন পেরেছে। তার পর আর টিউসন দিতে হয় নি। খুব মেধাবী না হলেও বুদ্ধিমতী ছিল দীপা ও নীপা। নিজেরাই সামলে নিয়েছে । কিন্তু তাদের পিছনে লেগে থাকতে হতোই। তার মধ্যেই দীপা কলেজ যেতো কোলকাতায়। ট্রেনে ।নীপা পড়েছে হুগলীর মহসীন কলেজে। গঙ্গা পেরিয়ে অন্য পারে তার কলেজ। দীপার বিষয় ছিল বাংলা, নীপা পড়েছে রসায়ন। বাড়ির কাছে কোন কলেজটাই নয়। তাই চাপা একটা টেন্সান তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতো।যদি কোন দিন দীপার ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পরে? বা নীপার লঞ্চ মাঝ গঙ্গায় প্রবল ঝড়ে ডুবে যায়? দিন শেষে সন্ধ্যে হলে জীবন অনেক সহজ হত । কলেজের গন্ডি পেরতে না পেরতেই প্রায় এক বছরেই বিয়ে হয় তার দুই মেয়ের।

মাধুরীলতা বলল, বেশ তো আছিস। আবার আমার ঝামেলা কেন? সকালে তোরা সবাই বেরিয়ে যাস। সারা দিন একা একা আমি কী করব। তারচেয়ে এখানে ভালোই আছি।

-দেখ, জানি তুমি ভালো আছো। তোমার বন্ধুদের নিয়ে আছো। সময় কেটে যায়। কিন্তু অসুস্থ হলে? কে দেখবে?

  • আছে অনেকেই আছে। সে ব্যাপারে কোন চিন্তা নেই আমার। বলে এক টুকরো বিস্কুট মুখে নিল সে।

দীপা বলল, তোমার ওই এক রোগ। কোনদিন কথা শোন না। বড্ড জেদী তুমি।

মাধুরীলতা দীপাকে সামান্য নিজের দিকে টেনে বলল, তুই সেই একই থেকে গেছিস। ছোট বেলায় আমাকে বলতিস, আমি খুব জেজী। জেদী শব্দটা বলতে পারতিস না।

-আচ্চা মা, আমাদের ছোটবেলা তোমার সব মনে আছে?

মাধুরীলতা যেন এক গভীর সমস্যার সামনে । সেই কথাটাই সে ভাবছিল বারান্দায় বসে। কোন কিছুই মনে পরে না তার। যখন সংগ্রাম করে তখন তার খুঁটিনাটি খেয়াল করে না মানুষ। কী উত্তর দেবে দীপা কে? যদি বলে, না অনেক কিছুই মনে পরে না, সেটাই সত্য, কিন্তু মানবে না দীপা। বলবে তা আবার হয় নাকি? তুমি বড় করেছ আমাদের আর তোমার’ই মনে নেই? তাহলে কার থাকবে মা?

  • সত্যি নেই। এখন হঠাৎ জেদী কথাটাই মনে এসে গেল । তাই বললাম।

-কী যে বলছো ?

-হঠাৎ হঠাৎ মনে পরে। অনেক আগের কথা তো? বড় বেলার কথা বেশী মনে পরে দীপা।

বলে নিজেকে সতর্ক করে মাধুরীলতা। মেয়েদের ছোটবেলার কথা বলতে চায় না মাধুরীলতা। নির্মলের এর চলে যাবার পর দুই মেয়ের যে শৈশব তা খুব সুখের নয় এটা মাধুরীলতা ছাড়া আর কেউ জানে না। অনেক প্রলোভন এসেছে, কম্প্রোমাইজ করলে চাকরি প্রস্তাব এসেছে, কোন কিছুই টলাতে পারে নি তাকে। তাই সে দুই মেয়েকে এক প্রানচঞ্চল, স্নেহভরা, আদরভরা শৈশব দিতে পারে নি। এই দুঃখ তার আজীবন। কিন্তু সে মেয়েদের কাছে কোনো দিন স্বীকার করে নি। বুকের মধ্যে লুকিয়ে কাটিয়েছে এতো দিন।

আঘাত পেল না তো মেয়েটা? তাদের ছোটবেলার কথা তাদের তো সব মনে থাকার কথা নয়। অল্প বয়সে সব মনে থাকে না। তারিই তো মনে রাখার কথা। কিন্তু সে অনেক দুরের দিন। দুই মেয়ের ঝামেলা সামলাতে তুফান মেলের মত পেরিয়ে গেছে সময় । ধরে মনে রাখার মত অবসর ছিল না জীবনে।

দীপা বলল, স্বাভাবিক। একা মানুষ তুমি, কত কী করতে হত। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দীপা এবার প্রশ্ন করল, আচ্ছা তুমি তিনটে বিস্কুট নিলে, কেন বললে না তো?

-কেন, দেখিস নি কোন দিন? পালটা উত্তর দিল মাধুরীলতা।

-দেখেছি। কিন্তু কোনদিন জিজ্ঞেস করি নি। লোককে দেখেছি দুটো বা চারটে বিস্কুট নেয় চায়ের সঙ্গে।

মাধুরীলতা একবার তাকাল দীপার দিকে। তার মনে থাকার কথা নয়।এরা বাবার ছবি দেখে বাবাকে চিনেছে। এতোদিন পর তার মুখ মনে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিদিন কারখানা থেকে বাড়ি ফিরে চায়ের সঙ্গে তিনটি বিস্কুট তার চাই ই চাই। এখন চোখ বুঝলে তাকেই মনে পড়ে প্রথম। তার প্রতিটি কথা মনে আসে। প্রতিদিন তিনটে বিস্কুট আর চা নিয়ে বসলে পাশে এসে বসে নির্মল। তার গায়ের গন্ধ পায় মাধুরীলতা। তার কন্ঠস্বর কানে বাজে। তার মোটা গোঁফ জোড়া চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন আর একদমই একা লাগে না তার। সে আপন মনে এক সুন্দর বাগানের দিকে তাকিয়ে, কথা বলে নির্মলের সঙ্গে। কে বলেছে সে একা? প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে চায়ের টেবিলে নির্মল আসে। গল্প হয়, কথা হয় বিগত দিনের। একসঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডনে বেড়ানো, লেকের পাশের বিকেল বা ঘাটশিলার গোধূলি । একে একে আসে। শনিবার ও রবিবারে বড়িতে বন্ধুদের নিয়ে তুমুল তাসের আড্ডা ছবির মত মনে পড়ে। তাঁর ঝলমলে মুখ থেকে হাসি গড়িয়ে পড়তো মাটিতে, তার উদাত্ত গলায় হেমাঙ্গ বিস্বাসের গান ছিল নিত্য সঙ্গী। নির্মলই ছিল তাঁর প্রথম প্রেম। এগুলো তার নিজস্ব জীবন সংগ্রহ ।

কী বললে না তো? চুপ করে আছো কেন? প্রশ্ন করল দীপা।

আবার তাকায় মাধুরীলতা। সে কী করে বোঝাবে এ অভ্যাস তার নয়, নির্মলের? তাকে কাছে পেতে সে প্রতিদিন এই অভ্যাসেকে টিকিয়ে রেখেছে আজীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *