ছোটোগল্প

অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে

সৌগত পাল

পাহাড়ের এই দিকটায় জনবসতি নেই j তির তির করে বয়ে যাচ্ছে কিছু দূর দিয়ে। জঙ্গল এতই গভীর এই ঝরনা চট করে দেখা যায় না। পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে তার একলা বয়ে চলা নদী হবে বলে।

ওড়িশার এই জঙ্গলে কেউ বেড়াতে আসে না। আসলে সেভাবে এটা বেড়াবার জায়গা না। নিয়ম গিরি পাহাড়ের আড়ালে এক আদিম সভ্যতার জনবসতি আজও টিকে আছে কোন ভাবে। প্রান্তিক মানুষের সভ্যতা নগরায়নের দৌলতে লুপ্ত । দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এইসব জঙ্গলের আড়ালে সেই প্রান্তিক সহজ সরল মানুষের বাস, তা এই জঙ্গলে না এলে তিন্নির জানাই হতো না।

তিন্নির আসার কথা ছিল না। পরীক্ষার পর তার সপরিবারে পুরী যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় হঠাৎ করে উড়িষ্যা government সব বন্ধ করে দেওয়ায় তার ট্যুর প্ল্যান বাতিল হয়ে যায়। অগত্যা সে বায়না ধরে বাবার সাথে তার কাজের জায়গার যাওয়ার। তিন্নির বাবা রণবীর বাবু কাজ করেন জিওলজি ডিপার্টমেন্টে। এই নিয়মগিরি পাহাড়ে প্রচুর বক্সাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারই আরো খোঁজ খবর করতে তাদের আসা। আর সেই ফাঁকে তিন্নিও ঢুকে গেল তাদের দলে।

পাহাড়ের গায়ে প্রচুর আনারসের চাষ হয়েছে। পাহাড়ি লোকেরা আরো অনেক কিছুর চাষ করে। যেমন কলা আদা শাক আরো কত কি।
তিন্নি অবাক হয়ে এই সব দেখছিল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। কয়েকটা পাহাড়ি মেয়ে তাদের নিজস্ব পোশাক পরে ফিরে যাচ্ছে তাদের বাড়ি। অদ্ভুত তাদের গড়ন, বৈচিত্র্যময় তাদের নাকের নথ, গয়না।

আসলে জঙ্গলের এই অঞ্চলে বাইরের শহরে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। আর সে কারণেই হয়তো এইসব মানুষগুলো তাদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে এখনো টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। নেহাত রণবীর বাবুর স্থানীয় ড্রাইভার বুলু তাদের সঙ্গে আছে বলেই তিন্নিরা এই জঙ্গলে আসতে পেরেছে। এই পাহাড় আর জঙ্গল সরিয়ে এখান থেকে বক্সাইট উৎপাদন করা হবে এ কথা ভাবতে ভাবতেই তিন্নির মন খারাপ হয়ে যায়।

তিন্নি মা…. আসন্তু।

বুলুর ডাক শুনেই তিন্নির হুশ ফেরে। তিন্নি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে নামতে থাকে। পাহাড়ে সন্ধ্যের পর রাত নামে ঝপ করে। তাছাড়া জঙ্গলে হাতির সংখ্যাও কম নয়। কখন কি ঘটে যায় কে বলতে পারে? রণবীর বাবুও গাড়িতেই অপেক্ষা করছেন।

সরু পাহাড়ি রাস্তা। বৃষ্টির জল পেয়ে খনিজ লাল মাটি কাদা হয়ে আছে। সেই পথ ধরে পা ফেলে ফেলে নামতে নামতেই তিন্নির চোখ আটকে গেল পাশের এক মন্দিরে। মন্দিরে কোন মূর্তি নেই কোন পূজারী নেই। শুধু সিঁদুর চন্দনে রাঙা ত্রিশূল আর কিছু পলা বেদীর জায়গায় রাখা। মন্দিরের সামনেই একটি দোলনা। কিন্তু সেই মন্দিরের দোলনার বসার জায়গাটি কাঁটা ওলা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি। কোন স্বাভাবিক মানুষের সেখানে বসা অসম্ভব। তিন্নি খুব অবাক হয়ে ক্যামেরাবার করে ছবি তুলতে যাচ্ছিল মন্দির আর দোলনার। কিন্তু বুলু তাড়াতাড়ি এসে তার ক্যামেরা বন্ধ করে দিল। সে যা বলল তার মানে দাঁড়ায় এই দোলনাটা দেবীর। যখন দেবীমা কারুর উপর ভর করেন মানে নেমে আসেন তখন সেই নারী এই দোলনার উপরে এসে বসে। তিন্নি এসব শুনে খুব অবাক হয়ে গেল। শহরের আবহাওয়ায় মানুষ হওয়া তিন্নির এসব কথা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। কিন্তু তবুও সে বুলুর কথা শুনলো। না শুনে উপায় আছে নাকি? নইলে বিষাক্ত তীর কোন দিক থেকে ছুটে আসবে কোন আদিম ধনুক হতে তা কে বলতে পারে?

তিন্নি গাড়িতে এসে বসতেই গাড়ি স্টার্ট করলো বুলু। রাত্রি নেমেছে জঙ্গলে। কাঁঠাল গাছের গায়ে ঝুলন্ত ছোট বড় কাঁঠালগুলো দেখেও কেমন যেন তিন্নির ভয় লাগলো। স্টেশন থেকে অল্প দূরে বুলু হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিল। কিছুদুর দিয়ে কিছু লোক খোল কত্তাল বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে। আর তাদের আগে আগে যাচ্ছে একটা এলো চুলের মেয়ে। মেয়েটির চলন গতিপ্রকৃতি ঠিক স্বাভাবিক নয়। ভীষণ জোরে মাথা নাড়াচ্ছে। রণবীর বাবু তিন্নিকে বললেন মেয়েটার বোধহয় হিস্টিরিয়া হয়েছে।

বুলু কথাটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল। সে বলল মেয়েটিকে দেবী মা ভর করেছেন। তাই সে এমন ব্যবহার করছে। গ্রামের মানুষ সেই দেবী মায়ের পূজা অর্চনার জন্যেই তার পেছন পেছন চলেছে।

তিন্নি কি বলবে ভেবে পেল না। মানুষের বিশ্বাস অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে সংস্কারের যে ধারাটা ভারতে আজও বয়ে চলেছে এ কথা ভাবতে ভাবতেই তিন্নি আর রণবীর বাবু স্টেশনে পৌছাল।

স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। ট্রেনের হুইসেলে ঢেকে গেল সেই খোল কর্তালের শব্দ। তিন্নি শহরে ফিরছে। অন্ধকার ভেদ করে ভোরবেলা ট্রেন পৌঁছবে শহরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *