সেই কথাটি
পূর্ণপ্রভা ঘোষ
মেঘ সরে গিয়ে অস্তগামী দিবাকরের শান্তস্নিগ্ধ উজ্জ্বল মুখখানি ভেসে উঠেছে আকাশে। শেষ বিকেলের আলোয় চারিদিকটা অদ্ভুত সুন্দর, মায়াময়। বেশ কয়েকটা ছোটবড় মাঝারি গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে একা একা। মাঝে খানিক দূরত্ব। নিজেদের মত অস্তিত্ব রক্ষার সাধনা তাদের অব্যহত। ডালে ডালে, পাতায় পাতায়, বনসবুজ আন্তরিকতা। পাখিরাও যে যার নিজের নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। কতযে হিসেব নিকেশ বাকি। সারাদিনের কত কথা। জীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত সকলেই। নিজেদের মধ্যেই কিচিরমিচির জুড়েছে তারা। প্রাণভরে শুনি এই প্রাণতরঙ্গের সুর।
ফিরছি আমি একাই। অনেকদিন এইভাবে নিজের দিকে তাকানো হয় না। বাড়ির পথে চলেছি, আশ্চর্য মায়ার বলয় যেন আজ আমাকে আবৃত্ত করে ফেলেছে। বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছি।
একটি ছোট নদী আমাদের গ্রামের গা ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে। তার চলার ছন্দে নৃত্যচঞ্চলা নবীনা যুবতীর চপলতা। এই নদীরই আর এক তরুনী সখী, আমাদের গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছে। মানুষের হাতে তৈরি এই খাল। পরিপূর্ণ গতিশক্তিতে দৌড়ে চলে। হাসিখুশি, প্রবাহমানা। বুকভরে জল নিয়ে রাত্রিদিন ছুটে আসে আমাদের জন্য। বাচ্চারা হুটোপুটি করে সাঁতার কাটে নোনা জলে। মাছ ধরে জেলেরা। কখনও সখনও কোনো ছোট ডিঙি নৌকা দাঁড় বেয়ে, লগি ঠেলে, ভেসে যায় জোয়ারের স্রোতে। দুইপারে কৌতুহলি চোখ। জরিপ করে ঘটমান পরিস্থিতি। প্রতিটি চলাচলেরই বেশ একধরণের ছন্দ থাকে। কেউ কৌতুহল বশে জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় চলেছ গো মাঝিভাই? কী আছে তোমার নৌকার অন্তরে? কোন বার্তা বয়ে এনেছ? বল শুনি, চলেছ কীসের টানে?’
সহাস্যে উত্তর দেয় মাঝি। রসিক বক্তার মর্যাদা রেখে উত্তর থাকে তেমনই তার মুখেও। তেমনই কোনো কথার সঙ্গে মিশে যায় এইভাবে ভেসে চলার ছন্দ। প্রকৃতির তৈরি নিজস্ব ছন্দ এইসবই। সবাই বুঝতে পারে না! হয়তো খেয়ালও করে না! তবে কেউ কেউ বোঝে। তাকিয়ে দেখে।
পথের বাঁকে এমন আন্তরিকতাময় আলাপ শুনে ভালো লাগে আমার।
আসা যাওয়ার পথে কখনও কখনও হিসেব এদিক ওদিক হয়ে যায়। জোয়ারের স্রোত হয়তো ফিরতে শুরু করেছে ভাঁটার টানে, উল্টো পথে। কিন্তু মাঝির যে উল্টোপথে চলার উপায় নেই। যেভাবেই হোক তাকে তার গন্তব্যের দিকেই এগোতে হবে। সাহায্যকারীর হাতে গুণদড়ি দিয়ে পাড়ে নামিয়ে দেয় তখন। সাহায্যকারী গুণ টেনে এগিয়ে চলে খালের পাড় বরাবর। হাল সামাল দিয়ে মাঝিও দুই পাড়ের লোকজন দেখতে দেখতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে। একান্ত অপারগ হলে কখনও কখনও আবার অপেক্ষা করতে হয়। পথের মাঝেই কোথাও নোঙ্গর ফেলে। প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করতে শুরু করে। রান্নাটা নৌকোর মধ্যেই সেরে নেয়। নৌকাতেই খাওয়া দাওয়া।
প্রায় ঘন্টা খানেক আগেই বাস থেকে নেমেছি! অযথা এতক্ষণ অপেক্ষা করলাম। লোকটা আসেনি! অথচ আমাকে বারবার আস্বস্ত করেছিল। আমার কপাল। আমি কৃপাপ্রার্থী। অপেক্ষা করতেই হয়।
কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরলাম। মনে পড়ল, মা চায়ের ছাঁকনি কিনে নিয়ে যেতে বলেছিল আজ।
অঢেল সময় রয়েছে হাতে। ঘুরেফিরে দরদাম করে অবশেষে কিনলাম। খামোকাই দশটা টাকা বেরিয়ে গেল! গোনাগুন্তির পকেট আমার। সামান্য এতটুকু হাল্কা হলেই বুক কাঁপে।
ছেঁড়া ছাঁকনিতে একধার দিয়ে কাজ চলে যাচ্ছিল। আরও ক’টাদিন চালিয়ে নেওয়া যেত নাহয়!
কষ্টের পয়সা! বড্ড গায়ে লাগে। এইটুকু উপার্জন করতেই আমার অনেক পরিশ্রম হয়, সময় যায়। আসলে লক্ষ্মী বড়ই চঞ্চলা। তাকে ধরে রাখা যায় না! ধরে রাখতে চাইলেও কেউ কী থাকে? কী আর করা। যে যায়, তাকে ফেরানো যায় না! ফেরে না কেউ, ফেরে না! কিচ্ছু ফেরে না!
ফেরে না? উমাও কী ফিরবে না? নয়, নাই ফিরল! মনকে প্রবোধ দিই। কিন্তু মন মানে কই!
ওহো! আপনারা তো উমাকে চেনেন না! আমাদের অত্যন্ত আপনজন ছিল সে। এখন আর নেই!
নিজেকেই আমি বারে বারে প্রবোধ দিই, ভবিতব্য খন্ডাবে কে!
অযথা মনটাকে নিয়েই হয়রানি। জানি, যা হওয়ার তা হবেই। তবুও কেন যে বেচাল হয়ে পড়ি!
আমাদের গ্রামের অদূরে এসে নদীটি হঠাৎ বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের কোলে সম্প্রতি নতুন একখানা চর জেগেছে। জোয়ারে প্রায় ডুবুডুবু হয়। আর ভাটার সময় সেই চর জেগে ওঠে। জোয়ার ভাটার ছন্দময় নৃত্য চলে প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে। সেই অনন্য নৃত্যশিল্পীর পায়ে পায়ে জেগে ওঠে প্রাণ। দেখতে দেখতে সবুজ গাছপালার বসতি শুরু হয়ে গেছে। এদিকে ওদিকে কাজের মাঝে বিশ্রাম নেয় মাছশিকারীর দল। তাদের পায়ে পায়ে রাস্তা জেগেছে। দু’য়েকজন অত্যুৎসাহী গরু ছাগল নিয়েও পৌঁছে যায়। দেখতে দেখতে কয়েকটা চালাঘর তৈরি হয়ে গেল ক’দিনেই।
ওইপারের লোকজন তাই ভীষন রাগান্বিত। নদী ওদের থেকে কেড়ে নিয়ে নাকি আমাদের দিয়েছে।
কি আর করা! এমনই তো জগতের নিয়ম। পাওয়ার হলে, পাবে। অন্যদিকে খোওয়ানোর হলে!
কে দেবে আর কে পাবে? তার বিচার তিনিই করেন। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝব কী!
বাস স্ট্যান্ড থেকে এগিয়ে উত্তরমুখো হাঁটছি। বারেবারেই চোখ যাচ্ছে অস্তগামী দিনমণির দিকে। মনটা আমার বড়ই বিষন্ন! কতদিনের কত স্বপ্নগাথা। শেষ হয়ে যাচ্ছে একে একে!
অথচ মনটাকে বোঝাতে হিমসিম খাই! কীভাবে নিজেকে সামলে রাখতে হবে বুঝতে পারি না! মায়ের জন্যই বেশি কষ্ট। কাজেকর্মে এদিক ওদিক যাই আমি। মনটাকে ভুলিয়ে রাখি দশজনের দশ কথায়। কিন্তু একা একাই সারাদিন কাটাতে হয় মাকে। নাহক দুশ্চিন্তাগুলো এসেই পড়ে!
খালের দুইপারে উঁচুবাঁধ। এইদিকে আমাদের চলার পথ। পঞ্চায়েত থেকে ঠিকঠাক করে দেয়। আমরা গ্রামের মানুষেরাই এইদিকের পথে চলাফেরা করি। প্রত্যেক বর্ষায় পথের মাটি ধুয়ে যায়।
খালের অন্যপারে লোক চলাচল কম। সেইপথ নিয়ে আমাদের তেমন চিন্তা নেই! কিন্তু এইদিকে? প্রতিটি বর্ষার সূচনায় একহাঁটু কাদা। একেবারে আপনজনের আন্তরিকতায় জড়িয়ে ধরে। মানুষজন বেকায়দায় পড়ে। গরুবাছুরের পায়ে পায়ে রাস্তার অবস্থা আরওই সঙ্গীন হয়। অহেতুক গন্ডগোল বাধে। ঝগড়াঝাঁটি, বাকবিতন্ডা চলতে থাকে। কখনও সখনও চরমে ওঠে। গায়ে মাখি না কিছুই! এইসবের মধ্যে একাকার হয়ে থাকি আমরা প্রতিটি গ্রামবাসী। নিজেদের মতই সবকিছুতে জড়িয়ে থাকতে চাই আন্তরিকতায়। ভালোমন্দ সবটুকু নিয়েই জীবনযাপন করি আমরা!
আবার কখনও চরমে ওঠে গন্ডগোল! সভাসমিতি ডেকে গ্রামের মান্যিগন্যি মানুষ বিচার করতে বসেন। কিছু সমস্যা মিটে যায়। আর কিছু কিছু সমস্যা বয়ে চলে ফল্গু নদীর চোরা স্রোতের মত। ধিকি ধিকি তুষের আগুন। জ্বলতে জ্বলতে কখন যে দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে! চোখের পলক পড়তে না পড়তেই মুহূর্তেই সব শেষ, দগ্ধ ধ্বংসস্তুপ! সম্পূর্ণরূপে ভস্ম হতে সময় নেয় না!
প্রকৃতির নিয়মে সেই পোড়াজমিতেই আবার কখন মাথা তুলে হেসে উঠবে কুতুহলী নবীন পাতা!
সম্পূর্ণরূপে নিঃস্ব হয়ে গেলেও রুক্ষতা ভেদ করে ধূসর ছাই থেকেই জেগে ওঠে নবীন সবুজদল।
সহসা হয়তো নজরে পড়ে না কারও! কিন্তু বহুদিন পরে হঠাৎ চোখে পড়লে অবাক হয়ে তাকায় লোকে! শেষ ও শুরুর ধারাবাহিক গল্প। শুরু থেকে শেষ, শেষ থেকে শুরু বৃত্তে আবৃত জীবন।
যে কথা বলছিলাম, নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকার ফলে নিয়মিত জোয়ারভাঁটা খেলে আমাদের এই শীর্ণ খালে। জোয়ারের জল নেমে গেলে দেখা যায় চকচকে রূপোলী নুনমাটীর প্রলেপ। ছোটবেলায় দেখেছি, সেই মাটি চেঁছে নিয়ে গিয়ে লোকে নুন বানাত। এইযুগে এত মেহনত আর করতে চায় না কেউ। হাটবাজারে সমস্তকিছুই এখন সহজ লভ্য। শুধু কড়ি ফেললেই চলবে। দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে যাবে সবকিছু। বাজারের গতিপ্রকৃতি এখন একেবারেই আলাদা। যেমন তেমন করে মানিয়ে চলার কষ্ট করতে হয় না কাউকে আজকাল। দিন বদলেছে! প্যাকেট জাত সমস্তকিছু। খাদ্যাখাদ্য প্রত্যন্ত গ্রামের অভ্যন্তরেও পৌঁছে যায়। মুঠোতেই রয়েছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ।
মন চাইবে যখনই, ছুঁয়ে নিও প্রদীপের অন্তর!
প্রদীপে আঙুল ছোঁওয়ালেই, ব্যাস! জিন হাজির হয়ে যাবে তুরন্ত! পলক না ফেলতেই হুকুম তামিল। এক্কেবারে সবকিছুই সর্বত্রই পাবে। প্যাকেটের নুনও সর্বত্র তার রাজত্ব বিস্তার করেছে। গ্রামে-গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। তবুও পুরোনো দিনের একজন মানুষ এখনও আধুনিক প্রথায় অভ্যস্থ হতে দ্বিধা বোধ করেন! আমাদের হরিশকাকা এখনও পুরোনো অভ্যাসে নুন বানিয়ে চলেছেন। পরিশ্রমের তুলনায় প্রাপ্তি সামান্যই! কিন্তু তৃপ্তি? অনেক বেশি। বৃদ্ধ হরিশকাকা আনন্দেই বাঁচেন।
কিছুক্ষণ আগেই ভাঁটা শুরু হয়েছে। কতগুলো কচিকাঁচা দিনের শেষবেলায় ছাঁকনিজাল হাতে নেমেছে। দু’য়েকটা পুচকে তো পুরোনো টুকরো কাপড় নিয়েই নেমে পড়েছে।
ওদের হুটোপুটি দেখতে দেখতে পথে চলেছি আমি। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা শেষ। এবার কালীপূজা।
বাতাসে বেশ শিরশিরে ভাব। হাঁটতে আমার বেশ ভালো লাগছে। কিন্তু বাচ্চাগুলো এইযে পড়ন্ত বিকেলে জলে নেমেছে। এটা তো ঠিক নয়!
কে জানে! বড়দের চোখের আড়ালেই হয়ত নেমেছে খালে! এইসময় ঠান্ডা লাগলে রক্ষা আছে? ধমক দেব, দাঁড়িয়ে পড়লাম। জালের ভেতর দু-একখানা মাছ পেল কি পেল না! হেসেই লুটোপুটি খাচ্ছে ওরা। নির্ম্মল শৈশবকে দেখছি আমি দু’চোখ ভরে। কতদিন আগে ফেলে এসেছি সবকিছু!
কাকে বকব? নিজেই হেসে ফেলি। কী সুন্দর সরল এই শিশুমতি।
হাল্কা লাগছে বেশ। পরিপূর্ণ ভালো লাগায় ভরে উঠেছে মন। কিছুক্ষণ বাচ্চাদের পাশাপাশি থাকলে সব দুশ্চিন্তা কীভাবে যেন গায়েব হয়ে যায়! শিশুদের সঙ্গ পাওয়ার অর্থ, স্বর্গের পাশে থাকা।
হাসতে হাসতে তারাই ডাক দিচ্ছে আমাকে মাছ ধরার জন্য। ইচ্ছে হয় ছুটে যাই, কিন্তু পারি না।
বড়রা তো ইচ্ছে করলেও অনেক কিছুই পারে না!
বকুনি না দিয়ে মিষ্টি করেই বলি, ‘এই, তোরা এবার জল ছেড়ে ওঠ। অনেক হয়েছে মাছ ধরা। ঠান্ডা লাগবে। বাড়ির লোকে দেখতে পেলে এইসান দেবে না! হ্যাঁরে, বকুনি খাওয়ার ভয় নেই তোদের? ভর সন্ধ্যেবেলা এখন। চারপাশে তাকিয়ে দেখ, অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।’
সবগুলো কুচো, একসঙ্গে হিহি হিহি করে হেসেই অস্থির! ‘এইকথা কে না জানে, সন্ধ্যে হচ্ছে। কিন্তু মাছ না নিয়ে ফিরলে, দেখতে হবে না! পিঠের চামড়া তুলবে মা!’
সেকি! চমক লাগে! বলে কী এরা? চারিদিকে তাকালাম! তারপরেও মুখে এমন হাসি আসে?
অদূরে দেখতে পাচ্ছি, মেয়ে-বৌদের ঘরসংসারে শেষ বেলার ব্যস্ততা। গরুবাছুর, হাঁসমুরগি, সকলেই বাড়ি ফেরার কারণে অস্থির হয়! বাড়ির লোকজনেরা সেই কাজেই অধিক মনোনিবেশ করেছে। বাচ্চাদের কথাতো কেউ খেয়ালই করছে না!
হিমের সন্ধ্যায় এইভাবে জলে পড়ে থাকবে?
ভাবতে ভাবতেই হাঁটা লাগালাম। অনেকখানি সময় মন্থর বিলাসিতায় গেল। বাড়ি পৌঁছোতে আমার আরও আধঘন্টা লাগবে। আমার পথচেয়ে বসে আছে মা। দেরি করলে বড্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন!
আজ শনিবার। হাটবার। কেনাকাটি সেরে মানুষজন বাড়ি ফিরছে। আমিও শুরু করেছি চলতে।
দু’য়েকজন কথা বলছেন। কথার পিঠে কথা জুড়ি আমিও। ‘কানুদা, কতদিন বাদে বাড়ি ফিরছো?’
পিছন থেকে কে তখন বললে, ‘দিনকাল কী পড়ল বল দেখি! মানুষের পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়!’ কেউ বললে, ‘তা, নতুন কথা কী! চিরদিনের নিয়ম। জীবন মানেই তো মরতে হবে একদিন! সবাই যাব! আগে কিম্বা পরে!’ কথার কথা। কেউ দার্শনিক নই! হিসেব করে কেউ বলে না!
পথ চলার কষ্ট ভুলতে কথার অবতারণা! আমাদের গ্রামেরও লোকজন আছেন। যাওয়ার পথে একথা, সেকথা। মামুলি বাক্য বিনিময়। কাজকর্মের খবর। কিম্বা এই দেশের কথা, দশের কথা। হাবিজাবি বানিযেও বলে কেউ কেউ। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়! সবকথা তলিয়ে ভাববারও নয়! চলে আসছিলাম যেমন আপন মনে একা একা, তেমনই চলি আমি সকলের সঙ্গে মিশে।
কথা বলছি সকলের সঙ্গে। সব প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছি। কিন্তু মনটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি!
( দুই)
অফিসে ছুটি নিয়েছে আজ শান্ত। মিথ্যে মিথ্যে আলসেমির চেষ্টা করছিল সে! কিন্তু আলসেমি তার ধাতেই নেই। প্রতিদিনের অভ্যেস মত আজও ঠিক পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গিয়েছে।
এপাশ ওপাশ গড়িয়ে আলসেমি করতে চাইলেও, পারে না। কীভাবে যে মানুষ ঘুম ভাঙার পরেও বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকে, কে জানে! ঘুম নিয়ে কখনও তার কোনো সমস্যা হয় না। যদিও কাল রাতে ঘুমটা ঠিকমত আসছিল না। কেমন ছাড়া ছাড়া। ঘুমের ঘোরে ভোররাতে ঝুমনিকে জড়িয়ে ধরা তার অভ্যাস। বেশ আমেজ আসে! দু’টো শরীরেই তখন উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ঠিক কিছুটা সময়। পরিতৃপ্তি আসে পরস্পরের। শান্ত হয়ে যায় মন। দম্পতির এটাই স্বাভাবিক ধর্ম।
এটাই প্রতিদিনের অভ্যাস। স্বাভাবিকভাবে তারপরেই বিছানা ছাড়ে শান্ত খুশি মনে!
এদিক ওদিক নিত্যদিনের কাজ সেরে নিতেই ছ’টা বেজে যায় রোজ। নিয়মমত শান্তই চা বানিয়ে নিয়ে এসে ঝুমনির ঘুম ভাঙায় আনন্দে। ঘুম ভেঙে আলুথালু ঝুমনি বিছানায় উঠে বসে, বেশ লাগে দেখতে তখন। আধশোয়া আমেজ নিয়ে শান্তমনে, শান্তর বানানো স্পেশাল ভালোবাসার ‘বেডটিতে’ চুমুক দেয়। শুধু এইটুকুই তার শখ। অত্যন্ত সাধারণ বিষয়! এক্কেবারে সামান্যই! শান্তও হাসিমুখে ঝুমনির এই সুখের আব্দারখানা মেটায়।
সামান্য এই সুখটির গোড়ায় যত্ন সহকারে সার-জল দিয়ে পরিপুষ্ট করেছে শান্ত দুই বছর ধরে।
আহা রে! তারপর থেকেই তো শুরু হবে আমানুষিক পরিশ্রম। রাতদিন জুড়েই ঝুমনির কাজ।
ঘুমোতে যেতে প্রতিদিনই খুব দেরি হয় তাদের। রাত একটার আগে কোনোদিনই বিছানায় আসতে পারে না ঝুমনি। সংসারের খুটিনাটি সবই তো সামলাতে হয় ঝুমনিকে। তার প্রতি সহানুভুতিশীল শান্ত। তবে সকালের প্রথম চা বানিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে দেয় না তাকে ঝুমনি।
পরের দিনের জন্য কিছু কাজ এগিয়ে রাখে ঝুমনি রাতেই। ভোর রাতের সামান্যটুকু সুখনিদ্রা। খানিক ঘুমিয়ে নিক। ঘুমন্ত ঝুমনির মুখখানা দেখলে বেশ একপ্রকার স্নেহ জেগে ওঠে শান্তর মনে। এই স্নেহময় অনুভূতিই আবেগের পরশ পেয়ে পরিপূর্ণ রূপ নিয়েছে। এই প্রেম, এই আবেগটুকুই তো সংসারে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে। এইতো প্রেমের সোনার ফসল। তবে সংসারের ফুলদানিতে ফুলের সাজটি সাজিয়ে রাখার কাজ অবশ্যই ঝুমনির হাতে। ঝলমলিয়ে সেজে উঠেছে তাইতো সংসারটি সুন্দরভাবে। ঝুমনিকে বড় ভালোবাসে শান্ত! আর এই কয়েকটা মাসে তো আরও বেড়েছে। এতদিনে ভালোবাসাটি যেন সম্পূর্ণ হয়েছে তাদের।
শান্তর হৃদয়জুড়ে এখনও কেবল ঝুমনি। শ্বাস-প্রশ্বাসে, ঘুমে-জাগরণে, সুখে-দুঃখে, দিনে-রাতে!
স্নানটান সেরে অফিস বেরোনোর তাড়া থাকে রোজ। যতই চেষ্টা করুক আগে বেরোবে, রোজই সাড়ে সাতটা বেজে যায় তার। কোনোরকমে ব্রেকফাস্ট গিলে নিয়েই দৌড় লাগানো।
এবং হুড়মুড়িয়ে অটোস্ট্যান্ডে এসে হতাশ হওয়া! প্রায় প্রতিদিনই একই দৃশ্য!
রোজই ভাবে আজ ঠিক তাড়াতাড়ি হবে। রোজই সেই অজগরের মতো আঁকা বাঁকা লম্বা লাইন। কতজনের পিছনে দাঁড়িয়েছে? হিসেব কষতে কষতে অটোর জন্য প্রহর গোনা!
অফিসে ঢোকার মুখে সকলের চোখেই তখন তীর্যকদৃষ্টি!
চেয়ারে বসতে না বসতেই উড়ে আসে ব্রম্ভাস্ত্র! মন্তব্যগুলো বুকে এসে বিঁধে তীক্ষ্ণশলাকার মত!
ঝুমনিকে বিয়ে করার পর থেকেই অফিসে সে একঘরে। তার পিসেও এই অফিসে কাজ করেন। তাঁর প্ররোচনাতেই শান্তর বিরুদ্ধে মানুষগুলো এতখানি অভদ্র। তাকে অপমান করতে সাহস পায়।
মাঝে মাঝে অসহ্য হয়ে ওঠে এইসব! এক একসময় মনে হয় অন্যকোথাও চলে যাবে। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে চাকরি ছাড়বে কোন সাহসে?
ভাবনাটাই হঠকারিতার! অন্য কোথাও আবার নতুন করে শুরু করা তো সহজকাজ নয়!
দাঁতে দাঁত চেপে তাই সয়ে নিতে হয়। বিয়ের পর থেকে তার এমন অপমানজনক পরিস্থিতি।
তাছাড়া, চাকরি ছাড়ার সঙ্গে অন্যকোথাও বাস উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে গেলেও ভয় হয়। গড়িয়ার এদিকটায় এখনও সাতহাজার টাকায় এতসুন্দর বাড়ি ভাড়ায় পাওয়া যায়।
তাদের বাড়িওয়ালা ভারি ভালোমানুষ। তাঁরা একতলায় থাকেন দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে।
এই বাড়ির বাচ্চা দু’টোও ঝুমনির ভীষন ভক্ত। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঝুমনিকে যেন চোখে হারায়। আর সুযোগ পেলেই দোতলায় উঠে আসে দু’টিতে। দোতলায় ঘরের লাগোয়া ছোট্ট একফালি ছাদ রয়েছে তাদের। ঝুমনিকে বিয়ে করার জন্যই নিকটজনের থেকে বিতাড়িত তারা। সব আনন্দ থেকে দূরে থাকা মরুভূমির জীবন তাদের!
টুকরো এই ছাদই এখন তাদের কাছে মরুদ্যান! এবং বাচ্চা দু’টো স্নিগ্ধ সজীব, ফুটন্ত গোলাপ। এই একটুকরো ছাদে কিছু ফুল ও পাতাবাহারের টব সাজিয়েছে ঝুমনি। দু’য়েকটা পাতা কিম্বা ফুলের কুঁড়ি দেখতে পেলেই আনন্দে ঝলমলিয়ে ওঠে সে। দু’চোখ ভরে সেই আনন্দ শুষে নেয় শান্ত একান্তে। হৃদয়ের অভ্যন্তরে। ছাদখানাতে বাচ্চাদের হাসিখুশি, খেলে বেড়ানোর দৃশ্যও তাদের বড় পাওয়া। বাড়িওয়ালা মান্নাদা এবং বৌদি তাদের অঘোষিত অভিভাবকের স্থানে রয়েছেন।
তাদের ভালোমন্দ সবই খেয়াল রাখেন। ঝুমনির শরীরের দিকেই এখন বৌদির কড়া নজরদারী।
ঝুমনি সদা চঞ্চল! তিড়িংবিড়িং লম্ফঝম্প চলে তার সারাক্ষণ! হুটপাট দৌড়ে চলার অভ্যাস। বৌদির কড়া ধমক খেয়ে অবশ্য খানিক পরিবর্তন হয়েছে। শান্তর কথা তো কানেই তুলত না! হুঁহুঁ, কেমন জব্দ এখন বাছাধন!
কেবলই হড়ুম-দাড়ুম ছোটাছুটি? দৌড় শুরুর আগেই বৌদির কথাগুলো মনে পড়ে। মনে পড়ে ধমকও! মুহূর্তে থমকে যায়! ঝুমনির থতমত মুখটা মনে পড়তেই হেসে ফেলে শান্ত!
ধড়পড় বিছানা ছাড়ে। আরে, কটা বাজল? আবোল তাবোল ভাবনাতে ডুবে ছিল এতক্ষণ?
ঘড়িতে চোখ পড়তেই হুঁশ ওড়ে!
উরি বাস্ রে!
সাতটা? ঠিক দেখছে তো? পাক্কা দু’টো ঘন্টা গড়াচ্ছে এইভাবে বিছানায়? কীভাবে সম্ভব?
হুড়ুমদাড়ুম গায়ে জল ঢালে। গা’ মোছা হল না, চেয়ারে রাখা শার্টটা টেনে নিয়ে গায়ে চাপায়।
তখনই নীচে থেকে মান্নাদার হাঁক। ‘হল শান্ত? বৌদি কিন্তু রেডি।’ ‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে নামে সে। নিচে নামতে না নামতেই বৌদির ধমক! থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে শান্ত মাঝ সিঁড়িতেই!
‘দৌড়োচ্ছ কেন? এতক্ষণ কি ঘুমোচ্ছিলে?’ বৌদির বকুনি।
থতমত খায় শান্ত। কী বলবে? তার মুখ দেখে তখন মিনি আর বাবানও হেসেই কুটোপুটি।
কেমন লাগছে নতুনকাকু বকুনি খেতে? কাকুকেও মায়ের বকুনি খেতে হচ্ছে কেমন!
‘চা খেয়েছ?’ বৌদির দৃষ্টি সোজা শান্তর মুখে।
হ্যাঁ, না, দুদিকেই মাথা নাড়িয়ে ফেলে সে ঘাবড়ে গিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আরও ধমক খায়।
‘বুঝেছি। আর বলতে হবে না! তুমি কী ঘাড়নাড়া বুড়ো? তখন থেকে ডাইনে-বাঁয়ে একই সঙ্গে মাথা নাড়ছে! এতক্ষণ পরে নিচে নামলেন বুড়ো আয়েস করে।’ শান্তর জন্য চা টেবিলেই রয়েছে। শান্তর হাতে তুলে দিতে গিয়ে বুদ্ধুবুদ্ধু মুখখানা চোখে পড়ে। হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে ওঠে তখন মনিমালার।
কত বয়স হবে? মণির ছোট ভাইয়ের মতই হবে হয়ত।
নতুন বাবা হওয়ার উদ্বেগে সে দিশেহারা! আনন্দ এবং উত্তেজনা দু’ই ফুটে উঠছে চোখে মুখে।
শান্ত এবং ঝুমনি। দু’জনেই ছেলেমানুষ। সুন্দর মনের যুবক-যুবতি দু’টি। কলকাতা শহরেই বাড়ি।
অথচ ওদের নিজের বাড়িতে ঠাঁই হয়নি! বুকের মধ্যে সেই কষ্টের দীর্ঘশ্বাস লুকোতে ভেতরের ঘরে ছুটে যান মনিমালা।
মান্নাবাবু বুঝতে পারেন মণির কষ্ট।
কতদিন হয়ে গেল!
মণির বাপের বাড়ির কেউ আর মণির খোঁজখবর নেয় না। অথচ ওদের বাবা যখন হঠাৎ মারা গেলেন, সেই অকালমৃত্যুর আঘাত সামলে সবাইকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল মণি নিঃস্বার্থভাবে। সবাইয়ের জন্য করেছে। নিজের কথা ভাবেনি কখনও। সবাইকে ভালোবাসে। ভাইবোন সকলেরই বড়দিদি যে সে। বুকদিয়ে সবাইকে আগলে রাখত এতদিন মায়ের মমতায়। এখন ভাইবোনেরা সবাই যথাযোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে।
ওদের মাও ছোটবোনের কাছে গিয়ে রয়েছেন দিব্যি। ছোটবোনের একটাই ছেলে, অটিস্টিক। তার হাজব্যান্ডের মার্কেটিংয়ের কাজ। প্রায়ই ট্যুরে যেতে হয়। ছোটবোনের শ্বশুরবাড়িতে তেমন কেউ নেই যে সাহায্য করতে পারে। বোন স্কুলে পড়ায়। তাই মায়ের সাহায্য না পেলে তারপক্ষে বাচ্চা সামলানো সম্ভব নয়! আর মেজ, সেজ দুই বোনই তাদের বিয়ের পর থেকে প্রবাসী।
আর সকলের ছোট ভাই। হায়ার স্টাডি করতে বিদেশে যাওয়া। তারপর থেকেই গেল সেখানে! সেইসময় তার বিদেশে পড়তে যাওয়াটাও আটকে গিয়েছিল। মণি যদি নিজের গলার হারখানা বিক্রি করে টাকাপয়সা না জোগাড় করে দিত! কিন্তু সকলেই সেসব কথা ভুলে গিয়েছে। ভুলে গিয়েছে সেই সংসারের প্রতি মনিমালার অবদান। বড্ড কষ্টের কথা এইসব!
আপাতত শান্ত এবং ঝুমনিকে পেয়ে সেই ব্যথাটা খানিকটা হলেও ভুলে থাকে মণি।
( তিন)
ভোরের আলোকোজ্জ্বল মুখ। ছায়া ছায়া, মায়াময়। কেমন যেন অচেনা ঘোমটায় ঢাকা। ‘আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে’র উদর থেকে হুশহাশ লোক নামছে তো নামছেই! বাপরে! এতগুলো লোক ট্রেনে ছিল? সকলের শেষে ‘বি টু্য়েল্ভে’র দরজায় এসে দাঁড়াল বিকাশ। ট্রেনের বাইরে চোখ রাখে। এই সাতসকালেও চারদিকে রাশিরাশি মানুষের মাথা। কতশত মানুষ। সবাই নামছে। তারও যাত্রা শেষ। নামবে সেও। এই প্লাটফর্ম, ওই প্লাটফর্ম আরও কত ট্রেন। কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। কারও যাত্রা শুরু হবে। হাওড়া স্টেশনে এখন যাত্রা শেষের যাত্রী কত? যাত্রা শুরুর অপেক্ষাতেই বা কত? প্লাটফরমে ট্রেন ঢুকতে না ঢুকতেই ওঠার জন্য তাড়াহুড়ো পড়ে। নিতে আসে কিম্বা দিতে আসে, সেই মানুষও অনেক। কেউ মিষ্টি হাসিতে অভ্যর্থনা জানায়। কেউ দুর থেকে নমস্কার করে। কেউবা হাতের ইশারায় দৃষ্টি আকর্ষন করছে। চারিদিকেই আপনার জনকে বুঝে নেওয়ার হাওয়া।
অনেকের উদভ্রান্ত দৃষ্টি দেখতে পায় সে! পরিচিতদের খুঁজে বেড়াচ্ছে যে চোখ, ব্যস্ততা তাদেরও!
বিকাশের কোনো তাড়া নেই।
কোনো আপনজন নেই তার এখানে। কেউ নিতে আসেনি তাকে। খুঁজছে না কোনো ব্যস্ত দৃষ্টি!
তার নিজের জায়গা নয়। তবে অপরিচিতও নয়। দীর্ঘ সতেরো বছর পরে কলকাতায় এল সে।
সতেরো বছর আগে, ছোটবেলাটা এখানেই কেটেছিল তার।
বয়স তখন দশ বারো। সেইসময় তাদের বাবা বদলি হলেন রাইপুরে।
সেখান থেকে তারপর তারা নাগপুরে যায়। বছর দু’য়েক রাইপুরে ছিল। মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র। দু’টো রাজ্যই তার সমান প্রিয়। এখন অবশ্য রাইপুরটা ছত্তিশগড়ে। তারা যখন ছিল, তখন ছিল মধ্যপ্রদেশ।
বাবা মারা গিয়েছেন, হয়ে গেল চোদ্দবছর। দাদাদিদিরা নাগপুরে ঘরবাড়ি বানিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা। কলকাতার সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ ছিল না তার। কলকাতায় আসবে সেই ভাবনাটাও ছিল না!
কিন্তু যখন যেখানে কাজ পড়ে! দেশের যেকোনো অংশে ছুটে যেতে হয় তার এই নতুন চাকরিতে।
আজ অবশ্য অন্য কাজেই আসা। কেবলমাত্র চাকরির প্রয়োজনে নয়।
এইসব হাবিজাবি ভাবনার সঙ্গে ধীরে ধীরে ট্রেন থেকে নামল বিকাশ। স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই সহসা চোখের দৃষ্টি হোঁচট খায়! ও বাবা! চারিদিকটাই তো আমুল পাল্টে গেছে!
কিছুই চিনতে পারে না সে। অবশ্য তখনও কী তেমনভাবে চিনত? তা নয়! তবুও!
একটা অস্পষ্ট ছবি ছিল মাথার ভেতর। তার কিছুই যে এখন মিলছে না!
মানুষের মিছিলে পা মিলিয়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এসেছে বিকাশ। কিন্তু যাবে কোথায়?
আপাতত একটু চা পেলে মন্দ হত না। তারপর ধীরেসুস্থে ভাববে পরবর্তী প্রোগ্রামের কথা।
বাসস্ট্যান্ডটা দেখে অদ্ভুত লাগে। কত দোকান ছিল এখানেই। তার একটাও পেল না! চারিদিকে তাকিয়ে বিহ্বল অবস্থা! একটুখানি ভেবে নিয়ে এগিয়ে চলল গঙ্গার পাড়ে। এদিকের দোকানগুলো প্রায় একই রকম আছে মনে হচ্ছে। আবছায়া মনে পড়ছে। এখানে দুপুরে খাওয়া সেরেছিল তারা।
বাইরের খাওয়ার কিছুতেই মুখে তুলবে না মা। কিন্তু তারা তিন ভাইবোন আর বাবা পেটপুরে তৃপ্তি করে মাছভাত খেয়েছিল। সেই স্বাদ এখনও মুখে লেগে।
স্মৃতিসুখে ভাবিত হয়ে প্রথম দোকানটার সামনেই গিয়ে দাঁড়াল বিকাশ।
দোকানগুলোর কিছু পরিবর্তন হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে। তা হবেই! সতেরো বছর, কম তো নয়!
এদিক ওদিক তাকাল। সবাই যে যার মত কাজে ব্যস্ত। তার দিকে কেউ খেয়ালই করল না।
মনে আছে, সেবারে তারা বাস থেকে নামতেই কয়েকজন ছুটে এসে ‘আসুন আসুন, এদিকে এদিকে’ বলে প্রায় হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই আপনজনের মতো।
মায়ের অবস্থা দেখে তারা ভাইবোনেরা খুব মজা পেয়েছিল সেইবারে। বাবা কিন্তু বেশ গম্ভীর ভাবে ঠিকঠাক জিজ্ঞাসাপত্র করে নিয়ে তবেই খেতে বসেছিল। এখন যেন সবার কেমন নির্লিপ্ত ভাব।
দিনকাল পাল্টেছে। বোঝে বিকাশ। যুগের ধর্ম। তা হলই বা!
‘চা হবে?’ এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ানো লোকটিকেই জিজ্ঞেস করে বিকাশ অবশেষে!
ঘুরে তাকাল লোকটা। দৃষ্টি সোজা তার মুখের উপর। অথচ উদাস নির্লিপ্ত গম্ভীরভাব! তারপর বলল, ‘বসুন।’ বসতে না বসতেই চোখ ফিরিয়ে ততক্ষণে নিজের কাজে ফিরে গেছে সেই লোক।
অবাক হয় বিকাশ। বাপরে! কী কড়ক পার্সোন্যালিটি! দোকান মালিক? নাকি মিনিষ্টার? বোঝা দায়!
হুঁ! কলকাতা শহরের মেজাজটাই আসল! রাজা তো রাজাই! বাবার মুখে শোনা যেত কথাটি। কলকাতার কথা উঠলেই বাবা এই কথাটাই সবসময় বলত। মনে পড়ে।
সত্যিই! রাজা বাদশার শহর! বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পরেও চায়ের কোনো নাম গন্ধ নেই।
অবাক হয় সে। একি রে বাবা! আর কত ধৈর্য ধরবে? নড়ে চড়ে বসল বিকাশ একবার।
তাকাল এদিক ওদিক। দোকানদার সেই যে তাকে বসতে বলে নিজেও ফিরে গিয়ে চেয়ার আলো করে বসেছে। আধঘণ্টা হতে চলল, তেমনিই বসে আছে নির্বিকার! অদ্ভুত তো!
অন্য কেউ হলে এতক্ষণে মেজাজ হারাত। কিন্তু বিকাশ সে সব না করে উঠে দাঁড়াল।
‘মর্নিং শো’জ্ দ্য ডে!’ তার মাথা জুড়ে অনেক চিন্তা ঘুরছে!
কব্জি উল্টে ঘড়িটা। না, না! ঘড়ি সে পরে না। বুক পকেট থেকে মোবাইল বের করল।
সবে সাড়ে পাঁচটা বাজে! কলকাতা শহরে এত ভোরে কারও বাড়ির দরজায় কলিংবেল বাজাতে চাওয়া শোভনীয় নয়। তাই একটু সময় কাটানো! নাগপুরে অবশ্য তাদের পাঁচটার আগেই দিনের কাজ শুরু হয় যায়। নিয়ম মাফিক ভোর পাঁচটাতেই রোজকার দিন শুরু তারও। কিন্তু এখানে?
না! আজ আর শোভন অশোভন ভাবনা চলবে না। যে কাজে এসেছে সেই কাজই শুরু করা দরকার! এখনই! ‘কুল, কুল, বিকাশ! কুল!’ নিজেকে ভালো করে বোঝায় মনে মনে। ঠান্ডা মাথায়, বুদ্ধির সঙ্গে কাজগুলো করতে হবে। নইলে এতদূর ছুটে আসার কোনো মূল্য হয় না! আপন মনে, নিজেই নিজেকে বোঝায়। এইভাবেই অভ্যস্থ সে বহুদিন।
বাবা নেই চোদ্দবছর! মাও বছর তিনেক আগে গেলেন! দাদা দিদিরা যে যার মত ব্যস্ত।
তার চাকরির বয়স সাতবছর পেরিয়ে আটে পড়ল। অনেকদিন থেকে সবাই তাকে ব্যতিব্যস্ত করছে। শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। হঠাৎ এমন ব্যস্ত হয়ে উঠল কেন তার ঘর বসানোর চিন্তায়? কে জানে! যদিও ধীরে ধীরে তার মনের মধ্যেও উঁকি দিচ্ছে ভাবনাটি। পাথরেরও ক্ষয় হয়!
তবে সেই কাজ করতে হলে আগে তাকে কলকাতায় আসতেই হত! নইলে অন্যকিছু ভাবতে পারবে না সে। অনেকদিনের চেষ্টার পরে, আজ তার পক্ষে কলকাতায় আসা সম্ভব হল।
দাদাদিদিরা কেউই কিন্তু আঁচ করতে পারবে না। কী কারণে সে কলকাতায় এসেছে!
যেহেতু তার কাজের ধরণটাই এমন। এদিক ওদিক দৌড়তে হয় প্রায়ই। একটা ব্যাগ সদা সর্বদা প্রস্তুত রাখে সে। নামকরা কেমিক্যাল কোম্পানীর মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট। খুব ভালো জায়গায় আছে সে। প্রথমদিকে অবশ্য জান লড়িয়ে খাটতে হয়েছিল তাকে। খাটুনি রয়েছে এখনও!
চোখকান বন্ধ রেখে খাটে সে। বছর পাঁচেক পরে ফলটি পাচ্ছে এখন। স্থিতিশীল পোষ্ট করায়ত্ত করে খানিকটা হলেও স্বস্তি। এখন তাকে অতখানি দৌড়তে হয় না। তাদের কোম্পানীতে এত কম বয়সে এই ধরণের এ্যাচিভমেন্ট। কোম্পানীর বড়রা খুব খুশি তার উপর। বড়দের স্নেহচ্ছায়াতে দ্রুত পদোন্নতি ঘটেছে। তাদের মর্যাদা রাখতে বিকাশও বদ্ধপরিকর।
সে খুব ভালোবাসে খাটতে। তার নিজের অভ্যাসবশেই দায়িত্বগুলোকে তুলে নেয় নিজের মাথায়!
(চার)
সকাল থেকে প্রমিতা খুব ব্যস্ত আজ। উল্টোপাল্টা নানা চিন্তায় কাল রাতে ঘুম হয়নি একেবারে।
মনটা বড্ড অস্থির লাগছে থেকে থেকে। কত বছর হল যেন? তিনি একাই থাকেন এই ফ্ল্যাটে।
ছেলে এবং মেয়ে দু’জনেই বিদেশে। তাদের দু’জনেরই দু’টো আলাদা দেশের স্থায়ী নাগরিকত্ব নেওয়া। বহুদিন থেকেই ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। ভালোই জমিয়ে নিয়েছে। তাঁকে সঙ্গে থাকার জন্য বারবার ডাকে। কিন্তু তাদের কাছে যাওয়ার কথা কখনও ভাবেন না। ব্যক্তি স্বাধীনতায় বরাবর বিশ্বাসী। সারাজীবন মাথাউঁচু রেখে দাপটের সঙ্গে এগিয়েছেন। এইবয়সে ছেলেমেয়ের সংসারে গিয়ে সমঝোতা করতে পারবেন না।
তিনি তাই একাই। দিব্যি ঝাড়া হাত পা। সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সে শিরদাঁড়া সোজা রেখে হাঁটেন। নিজের কাজ নিজের হাতেই করেন। স্বল্পাহারি। সারাদিনে একবার রান্নাঘরে গেলেই মিটে যায়। ঘরদোর পরিষ্কার করেন নিজের হাতে। ইচ্ছে হলে আসবাব পত্র এদিক ওদিক সাজিয়ে রাখতে পারেন। অবশ্য যেটুকু নাহলে নয়, তেমনই তাঁর ঘরের সাজ। অপ্রয়োজনীয় আসবাব একটিও রাখেন না! এইসব নিজের হাতেই করেন। একা, একাই!
আজ সকাল থেকে অবশ্য তাঁর ব্যস্ততা চোখে পড়ার মত। আজ তিনি মনপ্রাণ ভরে’ রান্না করছেন। কতদিন পরে? আজ তনু আসবে। একাই! তিনি জানেন না, এইসময় কেন আসছে তনু। একবারও প্রশ্ন করেন নি তিনি। সেই বৈশিষ্টের পরিচয় দিয়ে এসেছেন তিনি সারাজীবন। কারও কিছু বলার থাকলে ঠিকই বলবে সে। প্রশ্নে প্রশ্নে বিব্রত করতে চান না তিনি কাউকে।
আয়োজন সামান্য যদিও। তবুও যত্ন করে অসামান্যতার ছোঁয়া রাখেন তিনি সর্বত্র। সমস্ত কাজেই।
অনেকদিন থেকে হেঁসেলে আমিষ প্রবেশ করে না। নিরামিষ তরকারি আরও বেশি যত্ন দাবি করে। ঘন্টাখানেক আছেন রান্নাঘরে। মোটামুটি সেরে এনেছেন। নিশ্চিন্তি লাগছে বেশ। হঠাৎ কলিংবেল!
ঘড়ির দিকে তাকালেন। সবে সকাল সাতটা। কে আসতে পারে? ভেবে পেলেন না!
তেমন তো কেউ নেই যে এত সকালে আসবে। সাধারণত আত্মীয়স্বজন কেউই আসে না তাঁর কাছে। তাঁর এমনতর স্বাধীন মনোভাব, ভালো মনে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের কারও নেই! তাই তিনি একার জীবনেই অভ্যস্ত বহুদিন থেকেই।
ফ্ল্যাটে কোনো সেলসম্যানও আসতে পারে না। তনুর এসে পৌঁছতে এখনও ঘন্টা তিনেক বাকি!
বুঝে ওঠার আগে আবার কলিংবেল। এবার বেশ দ্রুতহাতে। কি-হোলে চোখ বুলিয়ে দরজা খুললেন। সিকিউরিটির সঙ্গে এক অপরিচিত যুবক। অবাক হলেন!
(পাঁচ)
নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে সোজা মিষ্টির দোকানে ছোটে। মনের খুশিতে অনেক টাকার মিষ্টি কিনে ফেলেছে শান্ত। তার যে খুশির সীমা নেই! যাকেই সামনে পায়, তাকেই খুশির খবর দিতে থাকে। মণিবৌদি ঝুমনির কাছে রয়েছে। সম্পূর্ণরূপে এখনও জ্ঞান ফেরেনি ঝুমনির। জাগে খানিক, আবার তন্দ্রার ঘোরে ডুবে যায়। মেয়ের মা হয়ে প্রথমেই মিষ্টিহাসিতে শান্তর দিকে তাকিয়েছিল ঝুমনি। তারপর নাকি সে মেয়ের মুখ দেখেছে। এইকথা শুনে আনন্দ উত্তেজনায়, সেইমুহূর্তে মণিবৌদিকেই কোলে তুলে নিতে গিয়েছিল শান্ত!
পাগল ছেলের কান্ডতে মণিবৌদি প্রথমটাতে ঘাবড়ে গেলেও পরে হেসে কুটোপাটি হন!
ভিজিটিং আওয়ারের অপেক্ষায় থাকে না শান্ত। মিষ্টি বিতরন শুরু করে দেয়।
গাবলু গুবলু বাচ্চাটা মায়ের পাশে ছোট্ট দোলনার মত কটে, সাদা তোয়ালে দিয়ে আগাপাস্তালা প্যাঁচানো। শুধু মুখটুকু দেখা যাচ্ছে। একটা গোলাপিরঙের পুতুল। তাদের ভালোবাসার মায়াময় প্রকাশ্যরূপ। বহুদিন স্বপ্নে দেখেছে খুদেটাকে! ভাবতে ভাবতেই শান্তর দু’চোখে জলের ধারা নামে।
কোন অভিমানে? কোন দুঃখে? কোন আনন্দে? কে জানে! ভেতরে ভেতরে প্লাবিত হয় সে! তাদের দু’জনকেই বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছে তাদেরই সবচেয়ে কাছের আত্মীয়স্বজনরা। সবচেয়ে নিকটজনেরা বিতৃষ্ণায় ধিক্কার দিয়েছে! ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কঠিনবাক্যে শুষ্ক মরুভূমির গভীরে ঠেলে দিয়েছে। কতখানি ঘৃণা জমেছিল তাদের ভেতর? স্নেহ-ভালোবাসা এতটুকু ছিল না? তৃষ্ণাকাতর হৃদয়কে সেদিন নিষ্ঠুরের মতো অগ্নিদগ্ধ করে দিয়েছিল! সেই অত্যন্ত আপন জনেরাই! আজ কেন তাদেরকেই মনে পড়ছে?
দেখে যাও। দেখে যাও, তোমরা। ঈশ্বর আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে পাঠিয়েছেন আমাদের কাছে।
তোমাদের অভিশাপের ফল? ফলেনি! ওই অভিশাপের কোনো গুরুত্ব নেই আর!
তাদের আধুনিক মনে, কোথাও অভিশাপের ছায়াকেও ঠাঁই দিত না তারা। তবুও! একটুকরো আশঙ্কার মেঘ যখন তখন ঢেকে ফেলত তাদের মাথার উপরের নির্ম্মল আকাশটাকে।
এই একবিংশ শতাব্দীতেও প্রবল জাত্যাভিমান? অদ্ভুত কুসংস্কারেরই বলি হতে হয়েছে তাদের।
একজনও কেউ মর্যাদা দেয়নি তাদের ভালোবাসাকে। সেইকারণে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুমনির হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন শান্ত। তার সেই একান্ত নিশ্চিন্তের আশ্রয় ছেড়ে।
কত উন্নত হয়েছে দেশ। পৃথিবীতে বিজ্ঞান আজ কোথায় পৌঁছে দিয়েছে মানুষকে! আজও এই জাতবিচার? চলবে? এমন অগ্রগতির যুগেও কিছু মানুষ পিছনপানে টেনে ধরে থাকবে এইভাবে?
ঝুমনি অনাথ আশ্রমের মেয়ে। তাকি তার অপরাধ? সে শিক্ষিতা। পরিশ্রমী। সর্বোপরি ভালোমনের মানুষ। এই সব গুণের কোনো মূল্য নেই কারও কাছে? এইযে নতুন শিশুটি এল তার কী জাত?
‘মানুষ’ এই পরিচয়টাই কী যথেষ্ট নয়?
আনমনা শান্ত। ক্রমশ ভাবনায় ডুবে যাচ্ছে। একার ভেতর! একার সঙ্গে! একান্তে, একা একাই!
(ছয়)
উমার খবর নিয়ে লোকটা আসেনি। কেন যে সত্যটা মেনে নিতে পারে না মা। অভিমান জমে। নাকি আমিই ঠিকমত খোঁজখবর করতে চাইছি না! কী করে বোঝাব মাকে। আমার উৎকন্ঠাও কোনো অংশে মায়ের থেকে কম নয়! এতটুকুও কম না!
ক্রমশ মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে একবার যদি উমার খোঁজ পাওয়া যেত। কিংবা আমাকে যদি সংসারে এতটুকু স্থিতিশীল দেখতে পেতেন।
ধৈর্যের পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে মা। ক্রমশ শক্তি কমে আসছে। আমিও পেরে উঠছি না! মা তো! নিতান্তই সাধারণ গ্রাম্য নারী। যার ভেতরে জমে আছে অনেকগুলো না পূরণের স্বপ্ন! দুধেভাতে সন্তানকে সুস্থির রেখে দেওয়ার স্বপ্ন! ঠিকঠাক যোগ্য জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়ার স্বপ্ন! এমন কতই!
কারখানা থেকে ইভিনিং ডিউটি সেরে ফিরছিলাম। মাঝরাতে, পথে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম ‘উমা’কে। শীতকাল ছিল। ডিসেম্বরের শেষের দিক। রুক্ষ পাহাড়ী এলাকায় প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ত। অক্টোবর থেকেই টুপি, সোয়েটার, চাপাতে হত। ডিসেম্বর, জানুয়ারীতে তো রাতের দিকে পারদের মাত্রা চার-পাঁচেও নেমে আসত। সেই সাংঘাতিক ঠান্ডায় সেদিন বাচ্চাটা মৃতপ্রায় পড়েছিল। আগেপিছে না ভেবেই তুলে নিয়েছিলাম সেদিন কোলে। জানি না, অন্য মানুষ হলেও নিশ্চয়ই একইভাবে আমার মতই বাচ্চাটাকে তুলে নিত প্রথমে।
এই অবস্থায় পড়লে কী বিচার বিবেচনার অবকাশ পেতেন কেউ? ঠান্ডায় নীল হয়ে গিয়েছিল বাচ্চাটা। পরিচিত রাস্তায় চোখবন্ধ রেখে চলাচল ছিল আমার! টুপি-জ্যাকেটে চোখমুখ ভালো করে ঢেকে সাইকেলের চাকা ঘোরাচ্ছিলাম দ্রুতপায়ে। প্রায় বাড়ির কাছাকাছি, পথের ধারে কেমন যেন অস্বাভাবিক আওয়াজ পেলাম। মানুষের আওয়াজ পেয়ে কুকুর কিম্বা শেয়াল জাতীয় কিছু সরে গেল! হাতের টর্চ ফেলতেই, একী!
তখনও ধুকপুক করছে প্রাণটা। প্রচন্ড ঠান্ডাতেও শুধুমাত্র পাতলা একটা কাপড় জড়ানো। সামান্য প্রাণ, চিঁচিঁ করছে। কান্নার শক্তিটুকুও নেই! যদি বাঁচানো যায় এছাড়া অন্য কোনো ভাবনাই মাথায় ছিল না! কে করতে পারে এমন কাজ? কিম্বা এমন অমানবিক আচরণ কী কোনো সুস্থ মানুষের হয়? তেমন ভাবনাটুকুও অনেক পরেই ভেবেছি! কিন্তু সেইমুহূর্তে অন্যকিছু ভাববার অবকাশ ছিল না আমার!
সোজা এসে মায়ের হাতেই তুলে দিয়েছিলাম। কেমন যেন শরীর খারাপ লাগছিল। এত ছোট্ট বাচ্চাকে আগে কখনও ছুঁয়েও দেখিনি। হাতে নেওয়া তো দূরের কথা!
মায়ের অক্লান্ত সেবাযত্নে বেঁচে উঠল সে। বলতে গেলে, তার পুনর্জন্মই ঘটেছিল মায়ের সেবাযত্নে।
ফেরার কথা ছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেদিন তাই আমরা গ্রামে ফিরে এসেছিলাম।
আমাদের মা ছেলের ছিল দিন আনি দিন খাই জীবন। উমা একটা বাড়তি বোঝা হয়ে গেল।
তবুও মা ছেলে দু’জনেই কেউ কাউকে কোনদিন বুঝতে দিতাম না। কষ্টের সংসারে বিয়ের স্বপ্ন দেখিনি আগে কখনও। আর ঘরে ঘরনী না এলেও মেয়ে হিসেবে পেয়ে গেলাম উমাকে।
বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজা শেষ হয়েছে মাস দেড়েক আগে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্যে আমি ঠিকাকর্মী হয়ে কোনোরকমে পেটের ভাত জোগাড় করছি তখন। সেখানে আমাদের বাসা ছিল না। তবে সেইসময় বাঙালীর বড় উৎসব, দুর্গা পুজার জন্যই নিয়ে গিয়েছিলাম মাকে। থাকতাম একজনের বাড়ির বারান্দা ঘেরা একটুকরো আস্তানায়। কাজের সময় এদিক ওদিকেই আমার কেটেই যেত। এমনিতে মা গ্রামের বাড়িতেই থাকে। অনেকদিন হল, সেইদিন আমাদের বাড়ি ফেরার কথাই ছিল। উমাকে নিয়ে তাই ভোরে ভোরেই ফিরেছিলাম গ্রামের বাড়িতে। দু’দিনের ছুটি নেওয়া ছিল। মাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে পরদিন ফিরে যাওয়ার কথা। দু’দিনের জায়গায়, সাতদিন ছুটি হল। মন চাইছিল না চাকরির জায়গায় ফিরি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে ফিরেছি।
নেই নেই করে বেশ কিছু বাঙালী ছিল আমাদের ফ্যাক্টরিতে। সবাই মিলে নম নম করেই দুর্গা পূজার ব্যবস্থা করতেন। সেই উৎসবে একযোগে মাতোয়ারা হওয়া বাঙালি অবাঙালি সবাইয়ের। সকলের আন্তরিক প্রাণের স্পর্শে সেই উৎসব পরিণত হত মহোৎসবে। আমরা মায়েপোয়ে অবশ্য কেমন এক হীনমন্যতায় যোগ দিতে পারতাম না সরাসরি! দূরে দূরে থাকতাম! অথচ মনপ্রাণ এককরে প্রতিবছর অপেক্ষায় থাকতাম সেই উৎসবের। সেই আলোক বৃত্তে প্রবেশ করতে চাইতাম সকলের সঙ্গে। অথচ পারতাম না! তাই বুঝি মা দুর্গা নিজেই চলে এলেন আমাদের ভাঙা ঘরে।
আমার সহকর্মী ভার্গিসের কোয়ার্টার ছিল। তারই বারান্দা ঘিরে কোনোক্রমে থাকতাম আমি। পূজাপাব্বনে মন লাগে না একা থাকতে। তাই মাকে এনেছিলাম। মা বেটার ঘেরা বারান্দার সংসারও দিব্যি চলছিল। তবু ফিরে এসেছিলাম গ্রামে। কী জানি কোন আশঙ্কায়, নাকি আনন্দে!
আমাদের একটেরে সংসার। শতকষ্টের মাঝেও, উমার উপস্থিতিতে হেসে খেলে ঝলমলিয়ে উঠেছিল।
আমাদের গ্রামে স্কুল ছিল না। উমার যখন পাঁচবছর বয়স হল ওকে স্কুলে ভর্তী করার প্রয়োজন। কারখানা থেকে অদূরে আদিবাসী পাড়ায় একটা টালির চালাঘর ভাড়া নিলাম। উমা স্কুলে পড়ত।
চমৎকার পড়াশোনার মাথা। প্রথম হয়ে নতুন ক্লাসে উঠেছে। খরচ বাড়ছিল।
ওভারটাইম করতাম, অবিশ্রাম পরিশ্রম। তাতেও কুলোয় না। মা একটা রান্নার কাজ নিল। উমা তার পড়াশোনা নিয়ে একাই থাকতে পারত ঘরে। তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে উমা। বেশ সাবলম্বী হয়েছে। একদিন কাজ সেরে এসে দেখি, উমা ঘরে নেই!
মা ঘন্টাখানেক আগেই ফিরেছে। বুঝতে পারছে না কী ব্যাপার! কেউ বলল স্কুল থেকে ফিরেছিল। কেউ বলছে ফেরেনি। বহু খোঁজখবর করলাম চারদিকে। কোথাও কোনো হদিশই পেলাম না।
অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া। সব জানালাম। দশ বছর আগে কেন জানানো হয়নি? পুলিশ তিনবছরের জন্য জেলে ভরে দিল আমাকেই। প্রচন্ড দুঃখের দিনে আরও বড় শাস্তি হল আমার!
চাকরি গেল। গ্রামের বাড়িতে ফিরে এল মা বাধ্য হয়ে। তিনটে বছর বেঁচে মরে থাকার সামিল।
জেল থেকে ছাড়া পেলাম। কিন্তু কাজ ফিরে পেলাম না! এই তিনটে বছর এদিক-ওদিক উঞ্ছবৃত্তি করেছে মা। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামে এসেছি। মা ছেলে পেটের ভাত জোগাড় হয় কীভাবে? বড়কষ্টে দিন কাটছে তখন জেল খাটা কয়েদীর! কাজের শহর আমায় ত্যাগ করেছে। আমাদের মেয়েকেও কেড়ে নিয়েছে সেই শহর। আমাদের মা ছেলের জীবন থেকে সমস্ত আনন্দ মুছে দিয়েছে।
তবে গ্রাম আমাদের ঠাঁই দিয়েছিল সানন্দে। মুখ ফেরায় নি কখনও! সেইসব দুর্দ্দিনে গ্রামের লোকে সাহায্য করেছে। আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে তারা আপনজনের মত। অনুন্নত এই গ্রাম। গ্রামের মানুষ তেমন আধুনিকতা শেখেনি। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এই গ্রাম। তবুও গ্রামের মানুষের কাছে আমরা ভীষণ কৃতজ্ঞ। এক্ষেত্রে শহরের থেকে অনেক উর্দ্ধে তাদের স্থান। উঁচু তাদের বিচারবোধ।
বছর কুড়ি হয়ে গেল। সামান্য কোনো খবর পেলে আশায় আশায় দৌড়ে যাই আজও। ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছি এদিক ওদিক। কখন কাজে, কখনও অকাজে! ওদিকে মা খুব অসুস্থ। ক্লান্তমনে শারীরিক ভাবেও কাহিল। হঠাৎ হঠাৎ এই যায় সেই যায় অবস্থা। আমার থেকেও বেশি দুরাবস্থা মায়ের। বাড়ি ছেড়ে যে কোথাও কাজের খোঁজে বেরোবো ভরসা পাই না। বুক ধুকপুক করে সারাক্ষণ! মা ঠিক আছে তো! কোনক্রমে টিকে থাকা এইভাবে! উমার পথ চেয়েই প্রাণখানা ধরে রেখেছে মা আজও!
কিন্তু কোথায় আর কীভাবে খুঁজব আমি উমাকে? এত বড় পৃথিবী, কোথায় খুঁজে পাই? লোকে উড়ো খবর দেয়। দৌড়ে দৌড়ে যাই। অবশেষে সমস্তই বৃথা হয়ে যায়! হয়রানের একশেষ হই। আজও দৌড়েছিলাম একবুক আশা নিয়ে! না! লোকটা এলই না! আজ অব্দি কতশত বার যে এইভাবে পাগলের মত দৌড়েছি! এমনভাবে অন্ধের মত দৌড়ে যাই আশা নিয়ে। বারেবারে গিয়েও কোনো সূত্র পাই না! আজও কোনো খবর জোগাড় করতে পারলাম না!
জানি না! বাড়ি ফিরে কী বলব মাকে আমি? এই অবস্থায় আমি মাকে কতদিন বাঁচিয়ে রাখব!
(সাত)
তিন ঘন্টা কেটে গেল! নিস্পন্দ বসে আছেন প্রমিতাদেবী। রান্নাটা সেরে নিয়েছিলেন ভাগ্যিস! নইলে আর হত না। তনুর আসার সময় হয়ে গেল। এবার তো উঠতেই হয়। কোনোকালেই তিনি শরীরমনে দুর্বল ছিলেন না। ছোটবেলায় গ্রামে কেটেছে। রীতিমত কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত। তারপর এই পঞ্চাশ বছরের নাগরিক জীবনেও সাধারণ ভাবে কখনও তেমন কোনো রোগভোগের কবলে পড়েননি। চানও না, রোগ তাঁকে পেড়ে ফেলুক। যথেষ্ট সাবধানে থাকেন। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন। সুগার, প্রেসার কেউই তাই কাছ ঘেঁষতে পারেনি এতদিন।
কিন্তু এখন ভয় পেলেন! উঠতে গিয়ে মাথাটা টাল খেল!
কোনোক্রমে দেওয়াল ধরে সামলে নিলেন। এখনই যদি ভেঙে পড়েন, পরবর্তী কালে কীভাবে কি করবেন? চিরকাল মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন। শেষ পর্যন্ত সেইভাবেই থাকতে চান। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন সর্বদা। শেষদিন পর্যন্ত যেন এইভাবেই থাকতে পারেন। শেষের দিনটিকেও যেন সম মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন। যে ভাবে এতদিন জীবনকে গ্রহণ করে এসেছেন।
ফিরে গেছে বিকাশ কিছুক্ষণ আগে। ঘন্টা দু’য়েক ছিল ছেলেটা। ঘরটা যেন ভরে উঠেছিল।
ছেলেটার মুখের উপর থেকে কিছুতেই চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলেন না প্রমিতাদেবী। বড়ই মায়াময়। যেন কোনো যাদুমাখা আছে ছেলেটির মুখে। কথা বলার ধরণটিও বড্ড মন কাড়া।
বিকাশকে খুব করে বলেছিলেন, এখানেই থাকতে। অন্তত তনুর না এসে পৌঁছনো অব্দি। শুনল না ছেলেটা। এরা আজকের জেনেরেশন। চিন্তাভাবনায় অনেক বেশি পরিনত।
এতক্ষণ বসে বসে এইসব কত কীযে হাবিজাবি কথা ভাবছিলেন প্রমিতাদেবী।
বিকাশের কথাই ঠিক। তনুর সামনে প্রমিতা ছাড়া অন্য কারও উপস্থিত থাকা উচিত হবে না। বিশেষ করে আজকের দিনটাতে। তনুরও আসার সময় প্রায় হয়ে এল। যত সময় এগিয়ে আসছে, আচ্ছা যখন তনু এসে পৌঁছোবে, সেই মুহূর্তে কী ঘটবে? ভাবতে গেলে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ভাবতে পারছেন না যেন ঠিকমত! এখন কী করা উচিত? কিম্বা কী না করা উচিত? শেষপর্যন্ত এই ছোট্ট ছেলেটা তাঁকে পথ বাতলে দিয়ে উপকৃত করে গেল! ভাগ্যিস!
কলকাতায় বিকাশের অন্য অনেক কাজ রয়েছে। যথাসম্ভব সে কাজগুলো সেরে নেবে আজ।
কালকে ঠিক এইসময়ে এসে উপস্থিত হবে। অবশ্যই তার আগে তনুমিতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে রাখবেন প্রমিতাদেবী। সেই ভালো!
কিছুটা সহজ হতে পারবে তনু। যতই হোক। ধাক্কাটাতো আচমকাই! সামলে নেওয়ার জন্য একটু সময় দিতেই হবে। পরিবেশও দিতে হবে।
রান্নাঘরে সামান্য কাজ বাকি। সেরে নিতে উঠলেন। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলাবেন কীভাবে?
ভোরে ভোরে উঠে যতখানি উৎসাহ নিয়ে দিন শুরু করছিলেন! তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই।
তবুও অভ্যস্থ হাতে সেরে নিলেন বাকি কাজ। আজ সকাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ফিরে ফিরে আসছে মনের মধ্যে। আর বারেবারেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছেলেটার মুখ।
সতেরো বছর পরে দেখলেন ছেলেটাকে। সেদিনের সেই ছোট্ট কিশোর? এখন পরিনত যুবক। স্মৃতিতে জেগে থাকা চেহারায় যে কৈশোরের কমনীয়তা মনে ছিল, তা এখন পাওয়ার কথা নয়। তবুও ঘুরেফিরে বিকাশের কৈশোরের মায়ামাখা মুখটাই মনে পড়ছে। ছেলেটা শিশুবয়স থেকেই তনুর নেওটা ছিল খুব। পায়ে পায়ে ঘুরত সারাক্ষণ। প্রমিতাকেও চোখে হারাত সে। ছেলেটাকে চোখে হারাতেন প্রমিতাদেবী নিজেও। বিকাশের মুখ চেয়েই কত যে যন্ত্রণা তিনি সামলে উঠতেন। আর মাপ করেও দিতে পেরেছিলেন সেই ঘৃন্য অপরাধীকে!
আচ্ছা, অপরাধী কি বলা যায় সেই মানুষটাকে? সেই বিচার কী সঠিক ছিল তাঁর? কোনোভাবে ভুল করেননি তো সেদিন?
এতদিন পরে এইসব ভাবনা কেন ভাবছেন? এতদিন তো নিজের বিচার বিবেচনাতে কখনও সন্দেহ জাগেনি! বরং নিজের উপরেই অনেক বেশি আস্থা রেখেছেন সবসময়। অথচ আজ!
যথেষ্ট পরিনত দেখলেন ছেলেটাকে। চোখেমুখে অন্য ধরণের দৃঢ়তা। হয়তো যৌবনের রূপ এমনই হয়! আগে তো কখনও কারও মুখের দিকে এইভাবে খেয়াল করে দেখেন নি! কিম্বা বাংলার বাইরের জলহাওয়ায় হয়তো এমন কাঠিন্য তৈরি হয়! অবশ্য এটাও ঠিক, কোনোকিছুই অনুমান করতে পারতেন না তিনি। আজ ছেলেটাকে স্বচক্ষে না দেখলে। আর শুধুই কি চেহারা? ছেলেটার বিচারবুদ্ধিরও পরিচয় পেলেন সুন্দরভাবে। সত্যি কথা বলতে কি, নিজের ছেলেমেয়েকেও তিনি এই ছেলেটির মত পরিনত দেখেন নি কখনও। যদিও তারা এই ছেলেটির চেয়ে যথেষ্ট বড়! নিজের ছেলে, আর পরের মেয়ে? ধারণাটাই গুলিয়ে যাচ্ছে এখন! কে তাঁর নিজের? কে পরের?
বসার ঘর থেকে ভেতরের শোয়ার ঘরে এলেন। আলমারীতে লম্বা আয়না বসানো! আলাদা করে ড্রেসিং টেবিলের দরকার মনে করেননি কখনও! চোখে পড়ল নিজের সাদামাটা শীর্ণ চেহারাখানি!
নিজেকেই ঘুরে ফিরে দেখলেন খানিকক্ষণ! মাথায় অনেক চুল ছিল একসময়! কবে থেকে পাতলা হয়েছে। খেয়াল করেন নি! আবছায়া মত কয়েকটা কালোচুল এদিক ওদিক পড়ে আছে ম্লানমুখে! বাকি সব সাদা! কতদিন যে আয়নার সামনে দাঁড়ানো হয়নি তেমন আগ্রহ নিয়ে! কিছুক্ষণ তন্ন তন্ন করে কিছু খুঁজে বেড়ালেন! কে তিনি? কোন পরিচয়ে দাঁড়িয়েছেন আজ আয়নার সামনে? নিজের ভেতর থেকে কোনোভাবেই এই বিষয়ের কোনো উত্তর পেলেন না!
অবশ্য এটাও ঠিক, অনেকদিন তিনি কলকাতাতে আছেন। বাংলার জলহাওয়াতে সেই আগের রুক্ষতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়! বাঙালী ছেলেমেয়েরা সত্যিই মায়ের আঁচলের সুরক্ষাবলয় থেকে না বেরোলে সত্যিকারের বড় হতে পারে না। তিনিও তো বহুযুগ ধরে মা! কিন্তু বাঙালী মা!
আচ্ছা কে বাঙালী? জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়ে? নাকি পরিবেশের প্রভাবেই গঠিত হয় মানুষের চরিত্র? তিনিও তো চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলেমেয়েরাও এইভাবে পরিনত হোক। বুদ্ধিদীপ্ত হোক। হোক জীবন যুদ্ধের লড়াকু সৈনিক! কিন্তু হয়েছে কী?
ছেলেমেয়ে তাঁর বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। চাওয়ার থেকেও অনেক বেশি ভালো ছেলেমেয়ে তাঁর।
আজ তবুও মনটা কেন এমন উদাস হয়ে যাচ্ছে? বিকাশকে দেখার পর থেকে? কেন?
ছেলেমেয়েকে ঘিরে তিনি কত স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্নের সার্থকরূপই যেন আজ দেখতে পেলেন বিকাশের মধ্যে! পরিবেশ? নাকি জিন? নাকি শুধুই বাংলার বাইরের জলহাওয়ার গুণ?
বাংলার বাইরের রাজ্যে, সবাই যেন কীভাবে বুঝতে শিখে যায়। জীবন মানেই প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ! প্রমিতার স্বামী ডঃ কৃষ্ণেন্দু সরকার এবং বিকাশের বাবা সুকান্ত শেখর একই কোম্পানীতে কাজ করতেন। শিক্ষাদীক্ষা কিম্বা পেশায় আকাশপাতাল ফারাক। তবুও কীভাবে বন্ধুত্ব হয়েছিল! কিম্বা পরবর্তীকালে যা সব ঘটে গিয়েছিল! বিনা স্ক্রীপ্টের নাটক? নাকি লাগ ভেল্কির জাদু? সেইসব দিনের যন্ত্রণার ইতিহাস মনে করতে চান না তিনি আর। সবই ভুলে গিয়েছিলেন!
কিন্তু আবার অনেকদিন পরে সেই ভাবনাগুলোই ফিরে ফিরে আসছে। তার মানে যা তিনি ভুলেছেন ভেবেছিলেন, কিছুই ভোলেন নি! এতদিন ধরে কেবল ভোলার অভিনয় করে গিয়েছেন!
বিকাশের মায়ের সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্পর্ক ছিল। সেইকথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে চান না আর। যদিও চোখ বন্ধ রাখলেও দিনের আলোর মতই পরিষ্কার দেখতে পান সমস্তকিছু।
যখন জানতে পেরেছিলেন সমস্ত কথা, তখন তাঁর কোলে দু’বছরের ছেলে। এবং তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা। জানার পরেও বিশ্বাস হচ্ছিল না কথাগুলো। সময় নিয়েছিলেন বুঝতে! নাকি সত্য বোঝার বাহানায় নিজেকেই বোঝাতে চাইছিলেন? ভুল, ভুল! হয়তো তাই! মনের ভেতর তখন উথাল-পাতাল! আঘাতে আঘাতে নিজেই নিজের মনটাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছিলেন। বিশ্বাস করতে প্রচন্ডভাবে কষ্ট হচ্ছিল! আরও সঠিকভাবে বোঝার জন্য সময় নিয়েছিলেন! নাকি বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল বলেই বুঝতে চাইছিলেন না! অবশেষে অবোধ্য সমস্তটুকুই তাঁকে বুঝতে হল! তখন আর দেরি করলেন না সিদ্ধান্ত নিতে।
শুধরে নেওয়ার সময় দিয়েছিলেন বৈকি। কিন্তু এতটুকুও সংশোধন হননি ডঃ কৃষ্ণেন্দু সরকার। বরং বিকাশের মায়ের ঘাড়েই দায়টা ঠেলে দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিকাশের মাকে তো ভালোভাবেই চিনতেন প্রমিতা।
অত্যন্ত সাধারণ এক ধর্মপ্রাণ গ্রাম্য মহিলা। তাঁর পক্ষে এমন সম্পর্ক বয়ে নিয়ে যাওয়া কিম্বা স্থাপন করাও অসম্ভব! কথাটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়! একসময় কিছুটা বুঝতে পারলেন প্রমিতা। ভদ্রমহিলার সৌন্দর্য সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু শুধুমাত্র এই কারণটাকে মাঝে রেখে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করার ব্যাপারটাকেও প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। যেখানে তিনি অন্যের স্ত্রী।
ডঃ সরকার নিজেও বিবাহিত এবং সন্তানের জনক। তারপর ডাক্তারির মত এমন একটি আদর্শ পেশায় রয়েছেন। তাঁর আচরণ তো অন্যদের গ্রহণীয় হতে হবে। আর ভাবতে পারেন না প্রমিতা।
বিকাশের বাবার সঙ্গে একদিন লুকিয়ে দেখা করেছিলেন প্রমিতাদেবী। সুকান্তবাবুকে সমস্ত কিছুই খুলে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন যে তাঁর জন্য আরও বেশি চমক অপেক্ষায় ছিল!
অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারলেন। বিয়ের আগে থেকেই তাঁর স্বামীর এমন স্বভাব। অর্থাৎ যখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র, তখন থেকেই এইরকম বহু অনৈতিক সম্পর্ক গড়েছেন। বুক উঁচিয়ে কাজগুলো করতেন। তাঁর বাড়ির লোকজন কেউ জানতেন না?
কিম্বা এত ভালো রেজাল্ট নিয়ে এগিয়েছেন, এইসব কেউ কখনও ভাবতেও পারেন নি!
আর সবকিছুই জানতে পারলেন যখন প্রমিতা, তখন যে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে!
কিন্তু একেবারে উপায়হীন তো তিনি নন।
একথা ঠিক, অতি সাধারন পরিবারের মেয়ে ছিলেন প্রমিতা। ছিলেন বোকাসোকাও। কিম্বা ভালো ভাবে বলতে গেলে, সহজ সরল। যা তাঁকে চিরকাল সানন্দে বলে এসেছেন আপনজনেরা। বিয়ের আগে এটাই যোগ্যতা ছিল তাঁর। নইলে কেবল মাত্র গ্র্যাজুয়েশনের ডিগ্রি সম্বল করে এমন পাত্র জোটে? ভালো পাত্রই জুটেছিল কপালে! বহুজন্মের সৌভাগ্য তাঁর। শতজনের মুখে এমন কথাই শুনেছেন তিনি। শুনতে শুনতে কথাগুলো বিশ্বাস করতেও শুরু করেছিলেন তিনি সেইসময়।
সেই সময় অর্থাৎ আশির দশক। তখন জামসেদপুর ঝলমলে শহর এক্কেবারে। লোকেরা কথায় কথায় আওড়ায়, ‘টাটার চাকরি আর বাটার জুতো!’ কোনো কথা হবে না এই আভিজাত্যে! ঠিক এই সময়কালে ইস্পাতনগরীতে চাকরিরত মানুষজনের কতই বোলচাল। তাঁর মত এমন সাধারণ গ্রাম্য মেয়ের পক্ষে সেইসময় বিপরীত পথে হাঁটা অসম্ভব দুঃসাহসীক কর্ম! দশের দরবারে কল্কে মেলা মুশকিলই ছিল। না রূপে, না গুণে! কোনোভাবেই ডঃ সরকারের স্ত্রী হওয়ার যোগ্য ছিলেন না তিনি! শিক্ষাতেও অযোগ্য!
প্রথম প্রথম আকার ইঙ্গিতে শুনেছেন এপাশে ওপাশে এমন নানা কথা। পরে দু’য়েকজনে মুখের উপরেও শুনিয়ে গিয়েছেন। সেইসময় না বোঝার ভাণ করে এড়িয়ে গেলেও, পরে হাড়ে হাড়ে টের পেতেন। শান্তচিত্তে বোকাবোকা মুখে থাকতেন বলেই লোকে মুখের উপর বলার সাহস পেত। কিম্বা যাদের ডঃ সরকারের প্রতি কোনোভাবে আকর্ষণ ছিল, তারা হিংসা করেও তাঁকে অপমান করতে চাইত এইভাবে। এমন কতই যে কটুক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে ঘরে বাইরে! বহু, বহুবার।
গায়ে মাখতেন না সেসব। পাথরের গায়ে আঘাত করে নিজেকে আহত করার কোনো যুক্তি তিনি খুঁজে পেতেন না! শান্তই থাকতেন সত্যটাকে মেনে নিয়ে।
তবে কেন তিনি বিবেচিত হয়েছিলেন এমন পাত্রের জন্য? মাঝে মাঝেই এই প্রশ্নটা জাগত। তাদের বাড়ি থেকে এই সম্পর্কস্থাপনে এগিয়ে আসে নি কেউ! বরং বারে বারে অনুনয় বিনয় এবং উপযাচক হয়ে গিয়েছেন পাত্রপক্ষ! তবে এ নিয়ে অভিযোগ করেননি তিনি কারও কাছে!
সেই অসহনীয় পরিস্থিতির দিনগুলিতে এগিয়েছেন একা একা। শুধুমাত্র কঠিন মনোবল সঙ্গে করে।
তাছাড়া ওই শহরে তাঁর স্বামীর বিরাট প্রতিপত্তি। খ্যাতির শিখরে তখন ডঃ সরকারের অবস্থান।
তবে তিনিও বা কেন আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন করবেন? মনুষ্যত্বকে বড় করে দেখেছেন তিনি সততার সঙ্গে। দারিদ্র, কিম্বা অপরিচয়ের অস্বাচ্ছন্দ্য তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি শেষপর্যন্ত। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে তিনি কী খুব বেশি কিছু চেয়েছিলেন? কিন্তু পেয়েছিলেন শেষপর্যন্ত কতখানি?
যৌথসম্পর্ক তাদের প্রায় চোদ্দ বছরের। ছিলেন তিনি সেই সময়কালে নিজস্বতা বজায় রেখে। চোদ্দবছর সময়টা খুব কম নয়! কতগুলো বছর যেন? রামের বনবাস কাল। তিনিও তো একপ্রকার নির্বাসনেই কাটিয়েছেন আত্মীয় পরিজনহীন অবস্থায়! স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে গুছিয়ে একসঙ্গে থাকার খুব চেষ্টা করেছেন। ছেলে সেইবছর ক্লাস এইট। সেন্ট্রাল বোর্ড। আর মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে। তারাও কিছু কিছু বুঝতে পারত। না চাইলেও অবশ্যম্ভাবীরূপে এদিক ওদিক থেকে অনেক কথা কানে আসত তাদেরও। এমন শুভাকাঙ্ক্ষীর তো অভাব ছিল না যে, ছেলেমেয়েদেরকেও মানসিকভাবে আহত করার। কিন্তু সেইমুহূর্তে কী করনীয় ছিল তাঁর? তিনি তখন ভালো করে নিজেকেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না! শুধু এইটুকু মাথায় ছিল, ছেলেমেয়ের মুখ চেয়ে এই সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখারই দরকার! সমাজের যা চিরাচরিত বিশ্বাস।
ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হচ্ছিলেন তিনি। নিজের মনকে বোঝার সঙ্গে অন্য কিছুকথা ভাবছিলেন। বহুবার বহু ধরণের অবাস্তব চিন্তা আসত মনের মধ্যে। কিন্তু মন কোনোকিছুতেই সায় দেয়নি!
সবাই বলবে, ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মা বাবার এমন আচরণ যথার্থ। আবার বুঝতে পারছিলেন না, নাকি ছেলেমেয়ের ভালোর জন্যই এই সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া উচিত?
তখন এই বিকাশের বাবা সুকান্তবাবু, পরিবার নিয়ে চলে গিয়েছেন জামসেদপুর থেকে।
ট্রান্সফার নয়! ভদ্রলোক টাটার চাকরি ছেড়ে ওই বয়সে অন্য চাকরি নিয়েছেন।
সেই সময়ের পরিস্থিতিতে টাটার চাকরি ছেড়ে যাওয়া? কিন্তু এমন পরিস্থিতি হয়েছিল কেন?
লোকমুখে বহুকথা কানে আসত। শুভানুধ্যায়ী মানুষ চারপাশে! তিলকে তাল আর তালকে তিল করতে ওস্তাদ মানুষ! সব শুনতে পেতেন। কিন্তু প্রথমদিকে বুঝতে চাইতেন না!
ঘটনাচক্রে সেই বিকাশদের পরিবারের সঙ্গেই আবার দেখা হল। সেই ঘটনাও যেন নাটকের মত। কলকাতায় ফিরে এসেছেন তিনি তখন। কিন্তু কলকাতায় থাকার জায়গা ছিল না প্রমিতাদেবীর। বাপের বাড়িতে ঠাঁই হয়নি। মা বাবা দু’জনেই তখন গত হয়েছেন। তাছাড়া বাবা মা থাকলেও, ছেলেমেয়ে ঘাড়ে নিয়ে এমন মান্যগন্যির সংসার থেকে, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারটিকে সমর্থন করতেন না তাঁরাও। স্বভাবতই সমর্থন করেনি দাদাবৌদিও। শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না! তারা বলতেন, প্রমিতাদেবী নাকি সন্দেহ বাতিক। এবং নিশ্চয়ই নিজে চরিত্রহীনা!
এখন ভাবলে হাসি পায়! হায় সন্তান স্নেহ! সন্তানের কোনো দোষ দেখতে পাননি শ্বশুর শাশুড়ি। বরং ছেলেকে বলেছেন, ‘ঝাঁটা মেরে বের করে দিতে হয় এমন বৌকে’। প্রমিতাকে এতদিন বের করে দেয়নি কেন? সেটাই নাকি দোষের! উচিত ছিল! এক্ষেত্রে সেখানে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না!
এমন সহায় সম্বলহীন মানুষকে কে বাড়িভাড়া দেবে? তাছাড়া, যেহেতু তিনি স্বামী পরিত্যক্তা নন! নিজেই ত্যাগ দিয়ে এসেছেন স্বামীকে। এতবড় দুঃসাহস?
এমন মহিলাকে লোকে খুব একটা সম্মান দিত না সেকালে! পুরুষমানুষের কোনো দোষ সহজে চোখে পড়ে না কারও! সেইকাল থেকে আজ পর্যন্তও জ্বলজ্বল করে কথাটি! সোনার আংটি। ট্যাড়া-বাঁকা হলই বা! সবাই সম্মানের চোখেই তাকাত সোনার ব্যাঁকা-ট্যাড়া আংটির দিকেই। এখানে প্রমিতাদেবী নিজে ছেড়ে এসেছেন স্বামীকে! একেবারেই প্রথাবিরুদ্ধ কাজ।
বহুকষ্টে একখানা আস্তানা যদিও বা জুটল, দেখলেন একী?
তবে কি সবই পূর্ব নির্দ্ধারিত ভাগ্য? নাকি ভগবানের মার? একেই কী বলে নিয়তি?
ভাড়াবাড়িতে থাকতে এসে একেবারে পাশের প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে পেলেন বিকাশদের। কী করবেন? ওইযে কথায় বলে, ‘অভাগা যেদিকে চায়..!’ অনেক কষ্টে বাড়িটা পেয়েছেন। ছেড়ে দেওয়া বোকামির কাজ হবে। তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন না। সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছুই নেই! কিন্তু দুর্ভোগ তখনও যে সঙ্গ ছাড়ে নি। বুঝতে সময় লাগল!
প্রথম প্রথম অনুনয়-বিনয়। কখনও বা ভয় দেখিয়ে ফিরে যেতে বলতেন স্বামী। পরের দিকে গালাগালি। তবুও তিনি ফেরেন নি! অতঃপর কলকাতাতে যাতায়াত শুরু করলেন স্বামী। এই সমাজে, পুরুষরাই ত্যাগ দেওয়ার ক্ষমতা ধরে। মেয়েদের এমন দুঃসাহস বরদাস্ত করে না সমাজ।
জামসেদপুর ছেড়ে আসবে কেন প্রমিতা ছেলেমেয়ে নিয়ে? কিছুদিন আগেও ব্যাপারটা নিন্দনীয় ছিল সকলের কাছেই। বন্ধুবান্ধব, মা বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন এমনকি পাড়া প্রতিবেশীর কাছেও! পুরুষমানুষের স্বভাবচরিত্র নিয়ে এত বাছবিচার চলে না! সামান্য মানিয়ে নিলেই হয়। সংসারের পক্ষে মঙ্গল। ছেলেমেয়েদের প্রতিও তো বাবার অধিকার আছে। এইসময় একবার মনে করেছিলেন তিনি, এইবারে শুধরে যাবেন ঠিক স্বামী। না, তা কিন্তু এতটুকুও হয়নি!
বিশ্বাস করেছিলেন নিজে থেকে। ঠকেছেন তিনি নিজেই। আবার বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন। তখন তো ঠকে যাওয়ারই। সম্পূর্ণরূপেই! তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে এসেছিলেন ছেলেমেয়ের হাত ধরে। নির্দ্বিধায়! মাবাবা নেই। দাদাবৌদি কোনোভাবেই ব্যাপারটিতে সায় দেবে না, জানা কথা। তবে একটুও দমে যাননি সেইসময় প্রমিতা।
ছেলেমেয়েরা যতটুকু বোঝে, তারাও যথাসম্ভব সহায়তা করেছে মাকে। যখন যেমন দরকার হয়। জামসেদপুর থেকে ফিরে এসে কলকাতায় বাস করা। স্কুলে ভর্তী করতে গিয়ে দম ছুটে গিয়েছিল। তাছাড়া জামসেদপুরে ছিল সেন্ট্রাল বোর্ড। এখানে কলকাতায় এসে স্টেটবোর্ডে পড়তে হবে। কলকাতাতে সেন্ট্রাল বোর্ডের স্কুল তখন খুব কম সংখ্যার। তাছাড়া সেন্ট্রাল এমপ্লয়ীর ছেলেমেয়ের জন্য যা সুযোগ পাওয়ার কথা, সেসব তিনি তখন পাবেন না! কোনোক্রমে একটা স্টেটবোর্ডের স্কুলে ভর্তী সম্ভব হয়। নতুন করে বাংলা শেখানোর কাজ। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে হয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে তাঁকেও! ঈশ্বরের অশেষ কৃপা। ভালো রেজাল্ট করেছিল ছেলেমেয়ে।
বোর্ডের ফাইন্যাল পরীক্ষার পরে দু’জনেই গেল বিদেশে। স্কলারশিপ যোগাড় করে পড়াশোনা করেছে তারা। সুযোগ পেয়েছে নিজেদের যোগ্যতায়। এখন তো চাকরি নিয়ে বিদেশেই সেটেলড।
ছেলেমেয়েরা কলকাতাতে ফেরেনি আর। কেন ফিরবে? কার কাছেই বা ফিরবে! ঘর-সংসার পেতেছে তারা বিদেশেই। দুই বাড়িতে দু’টি নাতি। সুন্দর টকাটক কথা বলে তারা দিদার সঙ্গে। ছেলেমেয়েরা কেউই তাদের বাবার পেশাতে গেল না। যা ভালো রেজাল্ট ছিল, সহজেই ডাক্তারি পড়তে পারত। অথচ দুই ভাইবোনে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছে। দু’জনেই তারা মাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডেকে চলে। রাখবে তারা মাথায় করেই। সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ। তবুও যাননি তিনি ছেলেমেয়ের কাছে।
কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে ধড়পড় করে উঠে বসেন। পুরোনো দিনের ভাবনার ভেতর কতক্ষণ ডুবে ছিলেন। চিন্তাজাল ছিন্ন হয়। ঘড়ির দিকে তাকালেন, দশটা পাঁচ। এখন তনু। আইহোলে চোখ রেখে দরজা খুললেন।
কতদিন পরে এল তনু একা! এবং হঠাৎ! স্বভাবমত প্রমিতাদেবী সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন।
(আট)
নয়’ই মে। পঁচিশে বৈশাখ। সকাল থেকে চারিদিকে সাজো সাজো রব। পাড়ায় পাড়ায় কচিকাঁচারা ভোর থেকেই কবিগুরুর গান গেয়ে প্রভাতফেরী করেছে। যে যেখানেই থাকুক দেশে কি বিদেশে। গ্রামে কিম্বা শহরে! ছোট্ট কুটিরে কিম্বা আকাশচুম্বি অট্টালিকায়! আজকের দিনে সব বাঙালির প্রণাম গ্রহণ করবেন ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। সমস্ত বাঙালির হৃদয়ে রবীঠাকুর আজ গুঞ্জরিত হবেন।
মাঠেঘাটে মঞ্চ সাজিয়ে অনুষ্ঠান হয়। শহরের অনুষ্ঠানগুলো অবশ্য বেশিরভাগ নির্দ্দিষ্ট মঞ্চেই হয়। মফস্বলের দিকে, স্থায়ী মঞ্চ কোথায়? পেলে ভালো। নইলে কুছ পরোয়া নেই। কয়েকটি চেয়ার টেবিল হলেই চলবে। বিশিষ্ট অতিথি এবং শিল্পীরা বসবেন চেয়ারে। বাকিরা মাটিতে ঘাসের উপর। মাথায় আচ্ছাদন থাকে ভালো। না হলেও কুছপরোয়া নেই! প্রকৃতির তৈরি সবুজ গালিচা, মহার্ঘ ঘাসের আসন আছে।
কোথাও হয়ত আরও একটু ভালো ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। নাচগান, নাটক, আবৃত্তি নিয়ে মেতে থাকে তো সবাই বেশ কয়েকটা দিন। ছোটবড় সকলেরই বড্ড ব্যস্ততা।
লন্ডন থেকে ডঃ কৃষ্ণেন্দ সরকার এসেছেন। আশির উপর বয়স তাঁর। এই বয়সেও যে কোনো যুবককে লজ্জা দিয়ে হন্ হন্ করে ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশবিদেশ। এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত। সর্বত্র। বিশ্ববিখ্যাত ডাক্তার। বিশিষ্ট সমাজসেবী হিসেবেও তিনি খ্যাত। এদেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হাসপাতাল গড়েছেন। এইসময়, এই তৃতীয় বিশ্বের সবথেকে বড় অসহায়তা দারিদ্র। প্রতিদিনের প্রয়োজনে দু’মুঠো পেটের অন্ন পায় না সকলে। সেইটুকু জোগাড় করতেই বহু মানুষ অপারগ। উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও দারিদ্রের সমাধান মেলে না। তারপর তো মাথার উপর ছাদ অর্থাৎ বাসস্থানের চিন্তা। সুস্বাস্থ্য আরও পরের কথা।
ভোট আসে, ভোট যায়! মানুষ তাকিয়ে থাকে অনিমেষে। প্রতিটি নির্বাচনেই শোনা যায় হাজারও মনোহারী প্রতিশ্রুতি। মানুষ আশায় আশায় বুক বাঁধে। এইবারে ঠিক..!
নেতা-হোতাদের মুখনিসৃত শতসহস্র সোনালী স্বপ্ন! তাদের জন্য সেইসব স্বপ্ন সফল হয় বৈকি! কিন্তু সাধারণের জন্য? সম্পূর্ণ অধরা থেকে যায়। শহরাঞ্চলে অনেক সুবিধে থাকলেও গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ন্যায্য প্রাপ্তির লবডঙ্কা! কতকিছুর অধিকার? দিবাস্বপ্ন! এইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য করতে, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়াই এখন তাঁর উদ্দেশ্য। সম্পূর্ণরূপে অরাজনৈতিক কর্মকান্ড। সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েই গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ান তিনি। গ্রামের মানুষ তাঁকে সাক্ষাৎ দেবতা মানেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে কুন্ঠিত হন।
এইযে মানুষের জন্য এটুকু করতে পারছেন তাঁর পরম সৌভাগ্য। সাধারণ মানুষ হা-পিত্যেস চেয়ে থাকে কখন তিনি আসবেন। দেবতার চরণে প্রণাম জানানোর সৌভাগ্য কবে পাবে তারা!
আজ সেই শুভদিন।
তিনি তাঁর মৃতা স্ত্রীর স্মৃতিকল্পে বসিরহাটের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেডিসিনের আউটডোর উদ্বোধন করবেন। ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে বহু আগেই। তাঁরই পাঠানো অর্থে। এবং প্রয়োজনীয় নির্দ্দেশ তিনি দিয়ে রেখেছেন তাঁর সেবাকল্পের দক্ষ কর্মচারীদের কাছে। সমস্ত কাজই সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছুই। আজ সকালবেলাতে কলকাতা থেকে কয়েকজন শিল্পী এবং বিশিষ্ট অতিথি আসার কথা। তাঁরা এলেই অনুষ্ঠান শুরু হবে।
আসপাশের গ্রামগুলো থেকে লোকজন ভোরবেলা থেকেই হাজির। ডাক্তারবাবু মানুষ নন, সাক্ষাৎ ভগবান। হাসপাতাল চালু হলেই সবদিক দিয়ে উপকার হবে। এই সেবামূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে এবং নিজেরা উপস্থিত থাকতে পেরে তারাও ধন্য।
ফুলচন্দন নিয়ে কুচোকুচো ছেলেমেয়েগুলো সকাল থেকে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। তেষ্টায় বুক ফেটে গেলেও নড়ছে না কেউ। মাস্টারবাবু বলেছেন, ‘অনুষ্ঠান হয়ে গেলে সবাই খেতে পাবে। কয়েক পেটি খাবারদাবার জমা রয়েছে একটা ঘরে। কয়েকজন গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে এসেছে। এবং কানে কানে পৌঁছে দিয়েছে সেই সুখবর। দাঁড়িয়ে থাকা সকলের কাছেই। এইসব খাবার যা বাচ্চাদের কাছে বেশ লোভনীয় ব্যাপার। তাই সুবোধবালক হয়ে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চারিদিকে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। মাস্টারবাবুরা এবং গ্রামের হোমরা চোমরা ব্যক্তিরা দৌড়ে বেড়াচ্ছেন এধার থেকে ওইধারে। অতিথিরা এসে গিয়েছেন। পরপর মোটরগাড়ীতে ধুলোর ঝড় তুলে শোঁশোঁ করে উড়ে এল অতিথিরা। সকলের চোখ তখন ধুলোর ঝড়ে বিধ্বস্ত। চোখমুখ অন্ধকার। ধুলো মেখে দিশেহারা সবাই ধীরে ধীরে চোখ রগড়ে সইয়ে নেবে অবসর মেলে না ফুলচন্দন নিয়ে দৌড়তে হয় তখনই।
এতখানি কুচোদের হাতে ফুলমালা, চন্দন যে, কলকাতা থেকে আগত সমস্ত অতিথিদের মাথা নুইয়ে গ্রহণ করতে হল। এমন আতিথ্য, সম্মান পাওয়া কম কথা? ব্যপারটি কতখানি সুখপ্রদ? অতিথিদের মুখে আলগা হাসি লেগে রইল সারাক্ষণ। তা মালুম হল না তাই আসল কি নকল! কলকাতা থেকে পৌঁছতে একটু দেরি হয়েছে। তাই দেরি না করে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল।
ঘোষক জানালেন, উপস্থিত আছেন এই অঞ্চলের প্রধান। তাঁকে আর একটি সভায় চলে যেতে হবে তাই প্রথম বক্তা হিসেবে মঞ্চে ডেকে নেওয়া। কলকাতা থেকে আগত অতিথি যারা ধুলো উড়িয়ে এসেছিলেন। যেসকল কৌতুহলি দর্শক কিছুক্ষণ আগে গাড়ির ধুলোতে চোখে অন্ধকার দেখেছিল, তারা সকলেই এখন প্রথম বক্তার কথার ঝড়ে প্রায় উড়ে যাওয়ার জোগাড়! সকলকে প্রায় বধির করে পাঁচমিনিটের জায়গায় পাক্কা পঞ্চাশমিনিট সময় নিলেন তিনি।
তারপরেও থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না! অতহপর ডঃ সরকার তাঁর বক্তব্য রাখতে উঠলেন। অতি সংক্ষিপ্ত কথন। কথায় নয়, তিনি কাজে বিশ্বাসী। বরাবর কম কথার মানুষ। নিঃশব্দে কাজ করে চলেন অতিমানবের মতো। কলকাতা থেকে আগত অতিথিরা সকলেই সেই বক্তব্য সমর্থন করলেন। করতালির ঝড় উঠল চারপাশে। তাবড় তাবড় বাচিকশিল্পী এসেছেন। তাঁরাও মন্ত্রমুগ্ধ। চেয়ে রইলেন সব্বাই এই বৃদ্ধযুবকটির দিকে। সত্যি আশ্চর্য হয়েই দেখলেন সবাই। যারা চেনেন, তারা তো মুগ্ধ হবেন। যারা প্রথমবার দেখছেন, তারাও আপ্লুত। উদ্বেলিত।
এই সবকিছুই উপভোগ করলেন ডঃ সরকার নিজেও।
আরও অনেক কাজকর্ম এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। স্থানীয় বিশিষ্ট মান্যগণ্য ব্যক্তিরা রয়েছেন। প্রকল্পটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন সবাই। কুচোদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিও বেশ মনোগ্রাহী ছিল। হয়তো শহরাঞ্চলের মতো খুব পারদর্শী নয়, কিন্তু খুবই আন্তরিক সবাই।
বিকেলের মধ্যে অতিথিরা ফিরে যাবেন। দু’য়েকজন থেকে গেলেন গ্রাম দেখার ইচ্ছে নিয়ে। সাংবাদিক দলের কয়েকজন আরও এক্সক্লুসিভ কিছু জোগাড় করার আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্য কেউ পায় নি তেমন কোনো খবর যদি জোটে। নিতেই হবে!
সমস্ত কাজ মিটল সুন্দরভাবে। সারাদিনের শেষে একটা সময় সবাইকে বিদায় জানিয়ে এসে ডঃ সরকার বসলেন একা। নিজের মুখোমুখি।
সবসময়ের পার্শ্বচর নিখিলকে বললেন, তাঁকে যেন কোনোভাবে ডিস্টার্ব না করা হয়।
সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। গ্রামের ঘরগুলো থেকে ভেসে আসছে ভিন্ন ভিন্ন নাদের শঙ্খধ্বনি।
সেই পবিত্র ধ্বণি, ধ্বনিত হচ্ছে আকাশে বাতাসে। হাসপাতালের ডক্টর্স কোয়ার্টারের অদূরেই একখানি ছোট্ট আস্তানা রেখেছেন তিনি নিজের জন্য। একটেরে এক কামরার কুটির।
সুন্দর। ছিমছাম। একখানা বাগান রয়েছে। দু’চারটে সাধারণ ফুলপাতার গাছ দিয়ে সাজানো।
অসম্ভব পরিশ্রম হয়েছে সারাদিন। শ্রান্তি ঘিরে ধরেছে। আর সইতে পারেন না! বয়স তো হচ্ছেই! কত যেন হল? তিনি অবশ্য হিসেবে রাখতে চান না! মনে মনে ভুলতে চাইলেও শরীর কী ভুলতে দেবে? রক্তের তেজে একসময় কম অত্যাচার তো করেন নি এই শরীরের উপর! যাইহোক, শ্রান্ত শরীরটাকে বিশ্রাম দিতে হবে এখন অন্তত কিছুক্ষণ।
বারান্দার একধারে ইজিচেয়ারে বসলেন গা’ এলিয়ে। আলো জ্বালতে বারণ করেছেন নিখিলকে। এইদিকে এখনও প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছোয়নি। এদিকে ওদিকে কয়েকটা আলোর প্রতিবিম্ব জ্বলছে। জোনাকির মত টিম টিম করে লো ভোল্টেজ লাইট রয়েছে কোথাও।
অন্ধকারের গা’ থেকে অদ্ভুত এক আলোর বিচ্ছ্যুরণ হয়। উপভোগ করছেন একা তিনি, একান্তে। সারাদিন কম ধকল পোহাতে হয়নি। চিরকালের উদ্যমী মানুষ তিনি। বয়সের বিচারে সেই উদ্যমে ভাঁটার টান পড়েছে যদিও। কিন্তু আজকাল শরীরে নিতে পারেন না সব ধকল। অথচ সবকিছু সামাল দিতে চেয়ে তিনি এগিয়ে চলেন সবার আগে আগে। সেই আগের মতোই দৃপ্ত পদক্ষেপে।
কয়েকদিনের পরিশ্রম। ক্লান্তিতে চোখ দু’টো জুড়ে এসেছিল। তন্দ্রা ছুটল। কে? কার উপস্থিতি টের পেলেন? অজানা বাতায়ন পথে যেন ভেসে এল মৃদু সৌরভ। কিন্তু সে আসবে কীভাবে?
মনকে প্রবোধ দেন যথাসম্ভব। কত বছর হল? কারও খোঁজখবর আর রাখেন না তিনি।
শুনেছেন অবশ্য, তাদের জীবনযাপনের লড়াইয়ের কথা। তবে সেসব গ্রাহ্য করেননি এক্কেবারে।
নিজের ইচ্ছেয় চিরকাল জীবনকে উপভোগ করে এসেছেন রাজার মত। ওইসব আদুলি মাদুলি মেয়েমানুষের প্যানপ্যানানি, ঘ্যানঘ্যানে সেন্টিমেন্ট! পাত্তা দেবেন কেন তিনি? পুরুষমানুষ ভোগ করবে জীবনকে। মেয়েরা ব্যবহৃত হবে পুরুষের ইচ্ছেমত। ডাক্তার হিসেবে এইযে বিশাল নামডাক। তাঁর হাতযশকে সবাই ঈর্ষা করে। তাই দু’চারটে কু’কথা রটে।
তিনি জানেন, সকলের কাছে তিনি ঈর্ষনীয়। নিজেকে দেখতে চেয়েছেন সেভাবেই, দেখেছেনও।
প্রায় বছর বিশেক আগে এইদেশ ছেড়ে লন্ডন চলে গিয়েছিলেন পাকাপাকি। শুধু দেশ নয়, সবকিছু ছেড়েই। কিন্তু সব ছেড়ে যেতে পেরেছিলেন কী? না! সব ছাড়তে তো পারেননি তিনি। কিছু স্মৃতি ছিল সঙ্গে। অগোচরেই! তাইতো আবার ফিরতে হল এই দেশে। এই দেশের মানুষের টানে? সেইকথাই বলেন তিনি সবাইকে। নাকি স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষায়?
তাঁর পুর্বজীবনে ছিল রাজার মত যাপন। এখন অবশ্য আমূল পরিবর্তন এনেছেন। তিনি কর্মবীর। নাকি কর্মশ্রমিক? মাঝে মাঝে নিজেকেই নিজে তিনি চিনে উঠতে পারছেন না।
অবসর গ্রহণ নাই তাঁদের পেশায়। কাজের ধরণটা তিনি কেবল পাল্টে নিয়েছেন নিজের মতো।
তিনি ডাক্তার। চিকিৎসা কর্মী। এখন স্বনিয়োজিত। যেসব অঞ্চলে চিকিৎসা পরিষেবা এখনও তেমনভাবে পৌঁছাতে পারেনি সরকার, সেইখানে পৌঁছে যান তিনি অনায়াসে। নিজের উদ্যোগে। প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশেই কী?
হয়তো!
মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন নিজেকে। নিজেই গুছিয়ে রাখেন উত্তর। কিন্তু সব কথা কাউকে বলতে পারেন না মন খুলে।
আজকে এই অসময়ে সেসব কথা মনে করছেন কেন? নিভৃত গ্রামে, যখন তিনি একেবারে একা! কোন অজানা ফুলের সৌরভের সঙ্গে জেগে উঠছে সেই পাথরচাপা স্মৃতি?
বাগানের কোথাও হয়তো বেলিফুল ফুটেছে। নাকি জুঁই? কিম্বা মাধবীলতা, করবীও হতে পারে। বড্ড ফুল ভালো বাসত সে। জামসেদপুরের কোয়ার্টারে অনেক ফুলের গাছ লাগিয়েছিল নিজের হাতে। বাগান নিয়েই ব্যস্ত থাকত দিনের অনেকটা সময়। তখন তিনি ফিরেও তাকাতেন না! গ্রামের মেয়ে, কেবল এইসবই তো পারে! আদিখ্যেতা পছন্দ করতেন না তিনি। ‘দেখো দেখো’ বলে আহ্লাদীপনা শুনলে আরওই তাচ্ছিল্য করতেন!
অথচ এখন সেই স্মৃতি জেগে উঠল! গন্ধটাও তেমনই! উস্কে দিচ্ছে পুরোনো কথা!
মতিভ্রম নিশ্চয়ই! বয়সটা কী ভীমরতির? নিখিলকে হাঁক দিলেন জোরে। শান্ত, স্তব্ধ নৈঃশব্দের মাঝে কানে বাজল তাঁর নিজেরই কর্কশ কন্ঠস্বর। কই? এল না তো নিখিল!
পরিবর্তে অন্য কে যেন এসে দাঁড়াল। অন্য মানুষ! কে? কে ওখানে?
চমকে উঠলেন ভয়ঙ্করভাবে!
ভুল ভাঙল নিখিলের ডাকে। ক’দিনের ভয়ঙ্কর পরিশ্রমে ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে তাঁকে। গলা দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ বেরোচ্ছে শুনে নিখিল ডেকে তোলে। বোধ হয় বুকের উপর হাত পড়েছিল।
জেগে উঠলেন। কিন্তু সমস্ত মাথা জুড়ে স্মৃতির আলোড়ন। ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছেন না! মুক্তি পেলেন না কোনোভাবেই!
বাকি রাত বিনিদ্রই কাটল!
(নয়)
শান্ত আর ঝুমনি নিশ্চিন্তমনে যে যার কাজে যায়। বাচ্চাটা তার মাম্মামের কাছে দিব্যি থাকে।
মনিকা ওদের বাচ্চার আদরের ‘মাম্-মাম্’। শান্তকে ডাকে ‘শান্তাব্বা’, ঝুমনিকে ‘জুমলিমা’।
মিষ্টি কচিমুখে দিব্যি লাগে শুনতে। শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে না কেউ।
মনিকার ছেলেমেয়েরা এমন জ্যান্ত পুতুল পেয়ে দারুন খুশি। জেঠুও ‘জিব্বাউ’ ডাকে মুগ্ধ। এই বাচ্চাটাকে ঘিরে কেটে যায় দিনরাতের পুরো সময়। কে বলবে বাচ্চাটা তাদের নয়। বাচ্চার মাবাবা দিব্যি ঝাড়া হাতপা। কোন জন্মে কী পুণ্য করেছিল। এমন ভালো বাড়িওয়ালা পেয়েছে। সেকথাই ভাবে ঝুমনি ও শান্ত।
মাম্মাম্ ডাকেন ‘সোনাঝুরি’। জিব্বাউ’ ডাকেন ‘ফুটুক’, ‘ঘুন্টি’, ‘পুঙ্কাইসোনা’। তাছাড়াও ‘রিমঝিম’, ‘ফুচি’, ‘কেবুলি’, ‘বমকাই’, এমনি আরও কত যে নাম। যেন অষ্টোত্তর শতনাম। শান্তর অবশ্য সে ‘বুই’মা।
ঝুমনির ‘কুট্টুস’। সবেতেই সাড়া দেয় সে, ‘ফুটফুটি’তেও। দেখতে দেখতে বছর পেরোলো।
ভালই বোঝে পাকুটা। সবার কাছেই গুরুত্ব পায়। সক্কলের মনোযোগ পেয়ে একেবারে মাথায় উঠছে। বললেই মনিকার কাছে ধমক খায় শান্ত ও ঝুমনি। আদরের সময় আদর খাবে না তো কী বকুনি খাবে? তাহলে তোমরাই খেও। ব্যাস। পুচকে আর কে পায়।
মাস কয়েক ছুটি পেয়েছিল ঝুমনি। ভেবেছিল আরও মাস ছয়েক ছুটি নেবে। কিন্তু মনিকাবৌদি ধমক দিয়ে মুশকিল আসান করে দিয়েছেন। অতএব নিশ্চিন্ত তারা। ‘পাকুমা’র মা বাবা।
নতুন বাবা হওয়ার আনন্দে মোহিত শান্ত। অথচ নতুন বাবা হওয়ার ঝক্কি পোহাতে হয়নি তাকে।
বছর ঘুরে গেল, এখনও না কিনতে হয় দুধের কৌটো, না পাল্টাতে হয়ে রাতের ন্যাপি। মনিকাবৌদির আন্তরিক হেপাজতে তারা আড়াইজনে দিব্যি হেসে খেলে থাকে।
‘শান্ত চক্রবর্তী’। উত্তর কলকাতার বিখ্যাত পুরোহিত বংশের ছেলে।
আর ‘ঝুমনি’? নামগোত্রহীন অনাথ।
হোমে থাকত। সেখান থেকেই এন.জি.ও.এর সাহায্যে পড়াশোনা শেখার সুযোগ পায়। তারপর নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে একটা প্রাইভেট হসপিটালে নার্সের চাকরি পেয়েছে।
শান্ত একবার সেই হসপিটালে ভর্তি ছিল অসুস্থ হয়ে। সেখানেই তাদের আলাপ এবং বন্ধুত্ব। আলাপের পরেও বছর কয়েক শুধুই বন্ধুত্ব। পরে একটু এগিয়ে সিদ্ধান্ত বিয়েতে পৌঁছয়।
সংসারের দন্ডমুন্ডের কর্তা তখন শান্তর দাদু। চক্রবর্তী পাড়ায় প্রবল প্রতাপ তাঁর। ছয়ফুটের উপর উচ্চতা, সোনার বরণ দেহ। অনাবৃত উর্দ্ধাঙ্গে পবিত্র শ্বেত উপবীত সগৌরবে ঝলমল করে। সংস্কৃত ভাষার বিদগ্ধ পন্ডিত। যথেষ্ট দখল রয়েছে ভাষাটির উপর। সত্তরোর্দ্ধ মেদহীন টান টান চেহারা। কাঠের খড়ম পায়ে যখন খটমটিয়ে চলেন। দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে মানুষের। দু’বেলা নিয়ম করে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন। বহুদূর থেকে অগণিত শ্রোতা আসেন সেই পাঠ শুনতে। শুধু তো পাঠ নয়, প্রতিটি শ্লোকের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেন। এই কালে, একবিংশ শতাব্দীতে যখন সংস্কৃতকে বলা হচ্ছে মৃতভাষা, তখনও এতখানি আকর্ষণ! এ শুধু ভাষার আভিজাত্যে নয়। মানুষটির চেহারার সৌন্দর্যেও। মেঘমন্দ্র কন্ঠস্বরে শ্রুতিমধুর বিশ্লেষন যে শুনেছে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছে। বারেবারেই ফিরে ফিরে আসতে হয় তাকে। এই কালের উত্তুঙ্গ সময়ে, মানুষের কী করনীয় এবং কী নয়, সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন। পরিস্কার ধারণায় ন্যায় অন্যায়ের যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য রাখেন। ভক্তিভরে শোনে সবাই। মুখে মুখে তাই নাম-ডাক ছড়ায়। অতি আধুনিক কয়েক জন নামকরা শিষ্য রয়েছেন দেশবিদেশে। গুরুর আদেশের অপেক্ষায় তারা প্রহর গোনে। ক্ষণিকের সুযোগ পেলেই গুরুর মহিমা কীর্তন শুরু করে দেয় শতমুখে।
কিন্তু না! তেমন গুরুদেব হতে চান না তিনি! প্রচারও চান না কোনোভাবেই। এইসব শুনলেই কঠিনভাবে তিরস্কার করেন তিনি। কিন্তু শিষ্যরা তাতে দমে না! মুখে কুলুপ এঁটে কিছুদিন শান্ত থাকে। আবার সুযোগ পেলেই গুরুকীর্তণ শুরু হয়। দেশবিদেশে এইভাবে বিখ্যাত হয়েছেন তিনি। দেশবিদেশের ভক্তিপ্লাবন উত্তর কলকাতার ওই চক্কোত্তি পাড়াতে উত্তাল হয়, ভেসে যায় গৌরবে!
এতকিছুর মধ্যেও তিনি শান্ত থেকে গভীর শাস্ত্রজ্ঞানের রসাস্বাদন করেন। সদাচারী, প্রকৃত মহাত্মা। অন্য মানুষ হলে এতদিনে বিরাট বাড়ি গাড়ি হাঁকিয়ে ফেলত। অন্তত গুরুর মতো হম্বিতম্বি করত খানিক! শিষ্যরা তো বটেই, ধন্য হয়ে যেত অন্য সব লোকজন, পাড়াপড়শীও।
অন্তত যত অবোধ মানুষকে সংযত, সন্ত্রস্ত করতে তেমন একটু আধটু হাঁকডাক শোনাতেন যদি! যা দেখলে আরও দশজনের সম্ভ্রম জাগবে।
কিন্তু তিনি তো তেমন করেন না। সেইকারণে আরও বেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে চর্চিত হন তিনি।
অবোধ মানুষের জন্য নির্মোহ শাস্ত্রজ্ঞানই তাঁর বিরাট ভরসাস্থল।
সেই সূত্রে তিনি জ্যোতিষচর্চাও করেন সময় সময়। আশ্চর্যভাবেই ভবিষ্যত দেখতে পান!
নিজের ছেলের বেলাও সতর্ক ছিলেন। কিন্তু সবই নিয়তি! বিপদ এড়াতে পারেন নি তিনি! ভবিষ্যতকে জানা যায়, কিন্তু কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
এক দুর্ঘটনায় শান্ত তার বাবাকে অকালে হারিয়েছিল। সেই শিশুবয়সেই, যখন তার বয়স মাত্র তিন। তারপর থেকে এমন পন্ডিত দাদু এবং চারজন পিসির আদরযত্নে বড় হয়ে উঠেছে সে।
এই সংসারে অবশ্য কখনও গুরুত্ব পায়নি শান্তর মা কোনোভাবেই! নেহাৎ এরা থাকতে দিয়েছে! এই পরিবারে শান্তর দাদু, বাবাও একমাত্র ছেলে ছিল। আবার শান্তও একমাত্র বংশধর। তার জন্মদাত্রী হিসেবে সংসারে ঠাঁই পেয়েছে তার মা। সে কত সৌভাগ্য! মুখ বুজে সংসারের খুঁটনাটি সমস্ত কাজ করে চলেন। পরমব্রত হিসেবে পালন করেন তিনি এই ধর্ম।
ছোটবেলায় কিছু বুঝত না শান্ত। কিন্তু বড় হওয়ার পর মায়ের ব্যাপারটা তাকে বেশ ক্ষুব্ধ করে তোলে। অথচ মাকেও কোনোভাবে নড়ানো যাবে না ওই সংসার থেকে। অনেকবার চেষ্টা করেছে শান্ত। মায়ের হয়ে উচিত কথা বলত। প্রতিকার চাইত। বিচার-বিবেচনা করে অধিকার সাব্যস্ত করতে চাইত। কিন্তু বারে বারে মায়ের থেকেই প্রত্যাখাত হয়েছে সে। মা চান না, তাঁকে নিয়ে সংসারে এতটুকু কথা হোক। বিশেষ করে ছেলে বলুক!
শান্ত বুঝিয়ে বললেও, না! অতএব একসময় মায়ের জন্য ভাবনা তাই ছেড়ে দিয়েছে শান্ত।
কিন্তু মেয়ের বাবা হওয়ার পরে, আজকাল মাকে খুব মনে পড়ে। যেদিন একবাক্যে শান্তর বেরিয়ে আসা সেই বাড়ি থেকে! সহজ মনে মেনে নিতে পারেন নি বাড়ির কেউই। মাও না! দাদু তো একেবারেই না। তাও আবার কিনা অজ্ঞাত কুলশীল ওই মেয়েটির জন্য? ঘটনাচক্রে, শান্তদের বিয়ের ঠিক একমাসের মাথায় দাদুর দেহবসান হয় হঠাৎ!
সেরিব্রাল এ্যাটাক! তার জন্য শান্তকেই দোষ দেয় সবাই। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে নাকি দাদুও অভিশাপ দিয়ে গিয়েছেন। শান্তরা নিঃসন্তান হবে। হবেই হবে। তাঁর মতো পন্ডিতব্যক্তি, সদ্ ব্রাম্ভনের মুখের কথা, হেরফের হতে পারে না! পরিবারের লোকেরা সবাই বিশ্বাস করে এসেছে কথাটা। এই বিশ্বাস তাদের যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। বেঁচে আছে তাদের মর্যাদা! শান্তর ছোটপিসেমশাই একই অফিসে চাকরির সুবাদে সেই কথাই প্রচার করেছেন শতমুখে। এবং সেকথা অফিসের নব্বই শতাংশ মানুষ বিশ্বাসও করেছে।
অভিশাপগ্রস্ত বেকায়দায় পড়া শান্তর করুণ মুখ দেখার অপেক্ষায় তারা প্রতিদিনই মুখিয়ে থাকত।
থাকত তারা আগ্রহে। গুমোর ভাঙা শান্তর হেনস্থা দেখবে বলেই থাকত অপেক্ষায়! কিন্তু এখন?
শান্ত এখন বুক ফুলিয়ে হাঁটে। ছোট্ট ওইটুকুন একটা বাচ্চা তাকে সেই সাহসটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
ছোট্ট কুট্টুস কন্যাটির কাছে তাই তার ঋণের শেষ নেই। এবং মেয়ের মা ঝুমনির কাছেও কৃতজ্ঞ সে। মাঝে মাঝে মনে হত সেকি কোনো প্রাগতৈহাসিক যুগের মানুষ?
পড়াশোনা তার আহামরি কিছু নয়! অতি সাধারণ বিষয়, ভুগোল নিয়ে কোনোরকমে মাস্টার্সটা কমপ্লিট করেছিল। এই অফিসের চাকরিতে কোনো কাজে আসে না ভুগোল। গুটিয়ে থাকত তাই। এখন সে যেন কোনো দেবতার বরে বলীয়ান। ছোট্ট বাচ্চাটাই সেই শক্তি দ্বিগুন করে দিয়েছে।
(দশ)
যা করার বিকাশ সব করেছে। প্রমিতা কিম্বা তনুকে এতটুকু মাথা ঘামাতে হয়নি।
গতবছরে তনু ইন্ডিয়াতে দিন দশেক কাটিয়ে গিয়েছিল। পুরো সময়টাই মায়ের কাছেই ছিল সে। একবার শশুরবাড়ি গিয়ে দেখা করে আসার কথা ভেবেছিল, কিন্তু সেবারে ফুরসৎটুকুও মেলেনি।
বিদেশে তার স্বামী ও ছোট্ট বাচ্চাকে রেখে এসেছিল। সেই চিন্তা ছিল, তাছাড়া ক’দিন বর্ধমান, হাওড়া, জামসেদপুর কী ছোটাছুটিই গেল। মাত্র কয়েকটা দিন। ফুরিয়ে গেল।
প্রমিতা যেতে পারেননি কোনোবারই। তবে আগাগোড়াই বিকুট অর্থাৎ বিকাশ সঙ্গে ছিল।
বিকাশের মায়ের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী বিকাশের এই দৌড়ঝাঁপ, ব্যস্ততা। শ্রদ্ধার্ঘ।
ছোট্ট বেলায় বিকাশ খুব বিস্কুট খেতে ভালোবাসত। প্রমিতা কিম্বা তনুর কাছে তার বায়না, বিকুট, বিকুট বলে। কখন যেন বিকাশ নামটা ‘বিকুট’ হয়ে গিয়েছিল। সেইসব দিনের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। তনু সেবারে পুরোনোকথা সব মনে করিয়ে দেয়! সেইসব পুরোনো দিনের মায়ায় আবার জড়িয়ে পড়ছেন নাতো? তাঁরও কী কিছু ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়ে গিয়েছে? মনের গভীরে?
না! না! তাহলে?
এই বয়সে আর পাওয়ার কিছু নেই! তবে শেষটুকু দেখার ইচ্ছে প্রমিতাদেবীর আজও রয়েছে। শেষপর্যন্ত কোনদিকে মোড় নেবে ঘটনা? একবার স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছেটুকু ফেলতে পারছেন না। তাঁর দিক থেকেও এই সামান্যটুকু মরনোত্তর সম্মান দেওয়া উচিত বিকাশের মায়ের জন্য। তবে তিনিও জানেন না, শেষ পর্যন্ত জল কোথায় গড়াবে।
বিকাশরা যখন সপরিবারে কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, তখন এতটুকু ছিল বিকাশ।
শৈশব ছেড়ে সদ্য কৈশোরে পা ফেলা সেই ছেলে, আজ বড় হয়ে এত বড় একটা দায়িত্ব নিয়েছে। সতেরো বছর পরে ছুটে এসেছে শুধু মাকে দেওয়া কথা রাখবে বলে!
এইযুগে যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, তেমনই মানুষের কাজের পরিধিও বর্ধিত। দ্রুত থেকে দ্রুততম হয়েছে সকলের চিন্তা-ভাবনা। ইন্টারনেটের সাহায্যে বিকাশ একসময় সমু, অর্থাৎ সৌম্যব্রত এবং তনুমিতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সমর্থ হয়।
প্রমিতার কাছে এসে সমস্তকিছু ঘটনা বুঝিয়ে বলে। বাকি যা সব করনীয় সেই ব্যবস্থাও করে। সমস্ত গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। দশদিন পরে যে যার মত ফিরে গিয়েছিল। তবে শেষটুকু কী হবে, সেই ধারণা কারও ছিল না।
একটা ধাঁধার জট খুলতে পারছিল না ওরা। কাজ অসমাপ্ত রেখে বিদেশে ফিরে গিয়েছিল তনুও। বিকাশও ফিরে গিয়েছে নাগপুরে। এইবছরে আরও কিছু নতুন তথ্য জোগাড় করে ফেলেছে ওরা। তাই আবার আসছে সবাই।
তনুর ফোনে এইসব শুনে প্রমিতা এবারে অন্যরকম উৎকন্ঠায় রয়েছেন। কী সেই নতুন খবর?
(এগার)
পঁচিশে বৈশাখ। বড়ছেলে সৌম্যব্রতর জন্মদিন। কাল রাতের ফ্লাইটে ওরা এসে পৌঁছেছে সবাই।
এইবারে বৌমাকেও এনেছে সমু। তনুও ছেলে এবং জামাইকে সঙ্গে এনেছে। আনন্দে ভরপুর প্রমিতাদেবীর মন। তবুও কেমন যেন আশঙ্কার মেঘ ঘিরে ধরছে থেকে থেকেই। কে জানে সব কিছু মিটবে কতদিনে!
মেয়ের শশুরবাড়ি বোলপুরে। আজকে শুভদিন, নাতি অর্ঘ্যদীপ এবং জামাই এখন শান্তিনিকেতনে। নিশ্চিন্ত মনে প্রমিতাদেবী সৌম্য, তনু এবং বিকাশের সঙ্গে বেরিয়েছেন ঘটনার শেষটুকু জানতে।
বসিরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি হাসপাতালের আউটডোর উদ্বোধন আজ। মহান সমাজসেবী ডাক্তারবাবুর বদান্যতায় এই উদ্যোগ। কলকাতা থেকে সাংবাদিকের দল এসেছে। তাদের সঙ্গে বিকাশ এবং তনুও সামিল। অকুস্থলের অদূরে হোটেল রুমে অপেক্ষায় থাকলেন প্রমিতা সারাদিন। সন্ধ্যেবেলায় বিকাশ, সৌম্য এবং তনু এসে যোগ দিল। অনেক খবর এনেছে। ফিরে এসে সেইসব কথা নিয়েই আলোচনায় বসল।
কোনোভাবেই সেই আলোচনায় যোগ দিতে পারলেন না প্রমিতাদেবী। শরীরটা খানিক বিগড়েছে। অথচ এতদিন নিজেকে সবথেকে ফিট বলে এসেছেন। মনের দিক থেকেও তুখোড় সাহসীনি!
কে জানে! সবটা হয়ত শারীরিক নয়! বিগত একবছর ধরে গোবেচারা মনটার উপর প্রেসার তো কম পড়ছে না। কম বয়সে একা সামলেছেন সমস্তকিছু। এখন বিকাশ, সৌম্য এবং তনুও রয়েছে সঙ্গে। ছেলেমেয়েরা বিরাট স্তম্ভ তাঁর। কিন্তু মেয়ে বলছেন কাকে?
নিজেকেই ধমকে উঠলেন। এসব কী ভাবছেন?
(বার)
অনেকদিন পরে শান্ত আবার একা রাতে। মনিকাবৌদির কাছে ঘুমোচ্ছে ‘বুইমা’। ঝুমনি বেরিয়েছে ভোরের আলো ফোটার আগেই। বসিরহাটে কোনো প্রোজেক্টের কাজে দু’জন ডাক্তার এবং একজন নার্সিং স্টাফ নিয়ে যেতে হয়েছে। সেখানে এক এন.জিওর উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতাল হয়েছে। আজ হাসপাতালের উদ্বোধন। এইসব তদারকির কাজে কিছুদিন ধরে ব্যস্ত ঝুমনি। কয়েকদিন আসা যাওয়া করছিল। কিন্তু আজ সেখানে থাকতেই হবে। অনুষ্ঠানের পরে সমস্ত সামলে বাড়ি ফেরা সম্ভব নয় আজ।
জানা ছিল। তবুও খালি খালি লাগছে। অনেকদিন পরে বলেই হয়তো। ইদানীং নাইট ডিউটি করে না ঝুমনি। নতুন মাকে এইটুকু সুবিধা দিয়েছেন কতৃপক্ষ। খুব ব্যস্ততায় কাটবে আজ। সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও অন্তত ঝুমনি রাতে একবার ফোন করবে। এই ব্যাপারে শিওর ছিল শান্ত।
রাত বাড়ছে, চিন্তাও শুরু! বার কয়েক ওপর নিচে ওঠানামা করে শান্ত। তার সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পেরে যদি মনিকাবৌদিকে ফোন করে। প্রচন্ড ব্যস্ততা থাকলেও মেয়ের খবর নিতে কোনো সময় ফোন করবে ঝুমনি।
সেখানেও খবর নেই! শান্তর সঙ্গে দাদাবৌদিও এবারে চিন্তায় পড়লেন। কি মেয়ে রে বাবা! সবকিছু ছাড়লেও মেয়ের খবর নিতে ফোন করবে না?
বাবান বাচ্চা, তবুও সমাধান দেয় উৎকন্ঠার থেকে। ‘হয়ত নেট ওয়ার্ক কাজ করছে না..’।
‘হতে পারে’, নিশ্চিন্ত হন দাদা। মনিকাবৌদিও একটা মেসেজ পাঠিয়েছেন। তাই ঘুমিয়ে পড়তে বললেন শান্তকে। মেসেজ দেখে ঝুমনি নিশ্চয়ই ফোন করবে একসময়। বৌদিদের পরামর্শ শুনে ঘুমোতে এল শান্ত।
কিন্তু শান্তর দু’টো দীর্ঘায়ত চোখে কিছুতেই ঘুমটা এসে বসছে না।
খুব জ্বালা করছে চোখ। শ্রান্ত, ক্লান্ত মনে এখনই ঘুম আসবে। কিন্তু কই? এল না তো!
(উপসংহারের পথে)
যেদিন প্রমিতাদের প্রথম সন্তান সৌম্য জন্মায়, তখন তাঁরা জামসেদপুরে ছিলেন। পঁচিশে বৈশাখ ছিল সেদিন।
পৃথিবী জুড়ে সমস্ত বাঙালীর অন্তরে সেদিন অন্য উন্মাদনা।
আর প্রমিতার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম, সাতই পৌষ।
দু’টি সন্তান এমন সুন্দর দু’টো দিনে জন্মেছে! ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত ছিল না তাঁর। পার্থিব সমস্যা, পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখকষ্ট থেকে মন সরাতে পারতেন সন্তানদের মুখে তাকিয়ে।
ডঃ সরকার হেসে হেসে বলতেন, ‘রবীবাবুর এমন একনিষ্ঠ ভক্তকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত! নোবেল কমিটি বোধহয় খবরটা পায় নি!’ রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রমিতার শ্রদ্ধা দেখে তাচ্ছিল্যই করতেন সর্বদা। রবীন্দ্রপ্রেমকে গাঁইয়াপনা ভাবতেন।
যেদিন দ্বিতীয় সন্তানের আসার কথা, সেদিনেই অন্য একটি নার্সিংহোমে ভর্তি সুকান্তবাবুরও স্ত্রীও। নামকরা গাইনি ডক্টর কে. সরকার। তাঁর আন্ডারেই দুই ভাবী মা, দু’টি আলাদা নার্সিংহোমে।
যথারীতি একজন জুনিয়রের হাতে নিজের স্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে ডক্টর সরকার সেদিন সুকান্তবাবুর
স্ত্রীর কাছে উপস্থিত ছিলেন। কর্মোপলক্ষে ঠিক সেই সময়টাতেই শহরে অনুপস্থিত সুকান্তবাবু।
ব্যাপারটি কারও কাছেই অস্বাভাবাবিক ঠেকেনি! তাছাড়া প্রমিতার কেসটা নর্ম্যাল ছিল।
সেখানে সুকান্তবাবুর স্ত্রীকে নিয়েই যমে মানুষে টানাটানি চলছিল দিনকয়েক ধরে।
প্রমিতার প্রথম সন্তান ছেলে। পরের বারে মেয়ে। খুশি মনে নিশ্চিন্ত। মা ও মেয়ে দু’জনেই সুস্থ। একই সময় অর্থাৎ ভোর রাতে সুকান্তবাবুর স্ত্রীরও একটি মেয়ে হল। সদ্যজাত ও মা দু’জনেরই অবস্থা খুবই খারাপ। অনেকগুলো জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সেই নিয়ে ডাক্তারদের নাস্তানাবুদ দশা। ওই নার্সিংহোমে সেইসময় ইনকিউবিটারও ছিল না। সুকান্তবাবুর মেয়েকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। রাত ফুরিয়ে প্রায় ভোর হতে যায়।
সেই মুহূর্তে সংবাদ পেলেন, প্রমিতার মেয়েকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
সেকি? কোন শত্রুতার জেরে এমন কান্ড ঘটালো কে? ব্যাপারটি ক্লোজ রাখতে বলে সিদ্ধান্ত নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। জানিয়ে দিলেন জুনিয়রকে।
সুকান্তবাবুর স্ত্রীকে মাসখানেক থাকতে হয়েছিল নার্সিংহোমে।
নতুন মা নয়। সুকান্তবাবুদের আগে দুটি সন্তান রয়েছে। কিন্তু এমন অসুবিধাতে পড়তে হয় এইবারে যা নিয়ে সবাই ভাবিত। ইতিমধ্যে সুকান্তবাবুও ফিরেছেন। জানতে পারেন, ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন্ থাকায় সদ্যজাতকে বাঁচানো যায়নি। কোনোক্রমে মাকে রক্ষা করা গেছে।
ওদিকে এক ছেলের পর একটি মেয়ে পেয়ে প্রমিতাদেবী ভীষণভাবে আনন্দিত। সুকান্তবাবুর স্ত্রীর কথা শুনে দুঃখ পেলেন। মা হয়ে মায়ের কষ্ট বুঝবেন। সেই ঘটনার ঠিক বছর দু’য়েক পরে সুকান্তবাবুর স্ত্রী আবার একবার সন্তানসম্ভবা হন। এইবারে প্রথম থেকেই সতর্ক ছিলেন ডাক্তার। সেই সন্তান ছেলে, আজকের বিকাশ। সেবারেও ডঃ সরকারের তত্বাবধানে ছিলেন সুকান্তবাবুর স্ত্রী। কিন্তু বিকাশের জন্মের বছর খানেক পরেই সুকান্তবাবুরা ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতায় চলে যান।
এই সময়কালের ঘটনায় সেইসময় আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল চারদিকে।
ইতিমধ্যেই অনেক কথা কানে এসেছে প্রমিতারও। কিছু বিশ্বাস করেছেন। কিছু নয়! মনকে প্রবোধ দিয়েছেন। ডঃ সরকারের নামযশে লোকে শত্রুতা করে রটাচ্ছে এইসব কুকথা।
ডক্টর সরকারের নামযশে সত্যিই হিংসে করতেই পারে! কিন্তু সত্যিই কি তাই?
সবটুকু রটনা ছিল না! অনেক সত্যির প্রমান পেয়েছেন পরে।
তাছাড়া ডঃ সরকার কিছুই ঢেকে রাখার চেষ্টাও করতেন না। যা করেছেন সজ্ঞানে। সদম্ভে। অহংকারে পাত্তা দিতেন না আসপাশের কাউকেই। ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না লোকনিন্দে।
বিকাশের বাবা অর্থাৎ সুকান্তবাবু ট্রান্সফার নিয়ে যাওয়ার পরে মানুষটি যেন আরও সাংঘাতিক হয়ে উঠলেন! সবই রটনা? এতটুকুও যদি তাই হত!
বিশ্বস্তসূত্রে, একদিন প্রমিতা শুনলেন, একটি কমবয়সী মেয়েকে সঙ্গে রেখেছেন ডঃ সরকার। শোনার পরে প্রমিতার মনে হচ্ছিল, ধরিত্রী মায়ের কোলেই প্রবেশ করবেন নাকি অবশেষে!
চোখে ঘুম আসত না। খাওয়া দাওয়া করতেও পারতেন না! এখন করনীয়?
অবশেষে একসময় সাহস নিয়ে চোখে চোখ রেখে অভিযোগ জানালেন। তর্ক-বিতর্ক চলল ক’দিন। এতদিনের শিক্ষা-দীক্ষা, সংযম ভেসে গেল। রাখতে পারলেন না নিজেকে ভদ্রতার আবরণে ঢেকে! প্রচন্ড ঘৃনায় বোধবুদ্ধি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল! থমকে তাকালেন নিজের দিকে। কী করছেন তিনি?
কিছুদিন সময় নিলেন নিজেকে বোঝার জন্য।
একসময় মনের মধ্যে উত্তর পেলেন। সেইমুহূর্তে ছেলেমেয়ের হাতধরে কোয়ার্টার ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। হয়তো আগেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তবে নিজের বিবেকের কাছে তিনি পরিস্কার। শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন স্বামীকে। ভবী না ভুললে, তিনি কী করতে পারেন?
কথার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে স্বামীর কাছে দ্বিতীয়বার না ফিরে এলেই ভালো করতেন।
আসলে তখন কলকাতার বাসাতেও স্বামীর যাতায়াত ঠেকাতে পারছিলেন না!
সেখানে তখনও প্রতিবেশী সুকান্তবাবুরা!
বিকাশের মাকে বাঁচাতে, নাকি নিজেকেই আর একবার পরীক্ষা করতে ফিরেছিলেন জামসেদপুরের কোয়ার্টারে? নাকি ছেলেমেয়েকে তাদের পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত না করতে? কে জানে!
ছেলেমেয়ে দু’জনেই যথেষ্ট বড় হয়েছে। লজ্জা, ঘেন্নায় নিজেকেই অপবিত্র বোধ করতেন প্রমিতা। পায়ের তলায় একটুকরো মাটি পেতে চেষ্টা করেছিলেন কলকাতায় ফিরে।
আর যেদিন বিকাশরা রাইপুরে চলে যাচ্ছিল সেদিনেই নাটকীয়ভাবে হাওড়া স্টেশনে দেখা তাদের। ভাবতে বসলে অবাক হন। গঙ্গা দিয়ে কত জল গড়িয়েছে তারপর। আকাশ থেকেও কত জল এসে মিশেছে গঙ্গায়। হিসেব কেউ রাখে না!
কিছুদিন পরেই লন্ডন চলে যান ডঃ সরকার। সেখানেও রীতিমত পশার জমিয়ে ফেলেন তিনি। লন্ডনের বাঙালী সমাজ তাঁকে মাথায় তুলে নিয়েছেন।
আজও তাঁর তেমনই পশার!
একদিনের সামান্য জ্বরে হঠাৎ সেই কমবয়সী মেয়েটির মৃত্যু হতেই চমকে উঠেছেন তিনি!
তিনি কি করেছেন?
এই বিয়েতে ইস্যু ছিল না। তাছাড়া তখনও প্রমিতার সঙ্গে ডিভোর্স হয়নি।
নিয়ম মাফিক প্রমিতা তখনও ডঃ সরকারের স্ত্রী।
ওদিকে বিকাশের মা একেবারে সাধারন হলেও ডঃ সরকারের চালাকিটা বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন।
বিকাশের বাবাও সবটা হয়ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতেন না! তবে অনুমান করতেন।
যা করার তিনি করেছেন একাই! বিকাশের মা সেইসবের কিছুই জানতেন না। ডাক্তার সরকারের উপর বদলা নেওয়ার পরিকল্পনা সুকান্তবাবুর। টের পেলেও বিকাশের মায়ের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভব ছিল না!
সুকান্তবাবুর কাজটা অন্যায়! হয়েছে প্রমিতার সঙ্গে। কিম্বা সন্তানসম না দেখা সেই প্রাণের উপর। ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেন নি! আবার বাধা দিতেও পারেন নি তিনি! সেই শক্তি ছিল না। মনের ভিতর অশান্তি বয়ে বেড়িয়েছেন বাকি জীবন। ক্ষমতার দম্ভে পৃথিবীতে রাজত্ব করে যারা তারা এমন সাধারণ মায়েদের মন বোঝে না!
কথায় আছে, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়। প্রাণ যায় নলখাগড়ার’। মৃত্যুর আগে ছোট ছেলের কাছে সমস্তকিছু বলতে পেরেছিলেন বিকাশের মা। ইচ্ছে ছিল তনুর মুখোমুখি হয়ে সত্যটা প্রকাশ করেন।
সেইকাজ তিনি পারেন নি! ছেলের উপর ভার দিয়ে গিয়েছেন।
এতগুলো বছরের চেষ্টায় আজ সেই কাজে সফল হয়েছে ছেলে বিকাশ।
এবং আরও খবর। বিকাশের বাবার ভাড়া করা লোকই প্রমিতার মেয়েকে চুরি করেছিল সেই রাতে। নিয়ে যাওয়ার পরে মারা গেছে ভেবে ফেলে যায় রাস্তার ধারে একটা ঝোপের পাশে। পরে জানতে পারেন এক বাঙালী ওয়ার্কার বাচ্চাটিকে কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মানুষ করেছে। বাঙলার জলবায়ুতে মিইয়ে যাওয়া জাঠ রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠেছিল ভীষণ ক্রোধে। সেদিন যদিও ডঃ সরকারের গায়ে হাত দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না কারওরই। সুকান্তবাবুও পারেন নি!
তাই দুর্বলের উপর আঘাত হানা। সেই বাচ্চা কিংবা ওয়ার্কারকে ধর্তব্যের মধ্যে ধরার নয়।
ব্যাপারটা সাংঘাতিক হলেও কারও কাছে প্রকাশ করতে পারেন নি বিকাশের মা।
প্রায় বছর পাঁচেক পরে একদিন আবার প্রতিহিংসায় মেতে উঠলেন বিকাশের বাবা। ওয়ার্কারের ঘর থেকে বাচ্চাটিকে ভুলিয়ে এনে হাওড়া স্টেশনে ছেড়ে যেতে নির্দেশ ছিল বিকাশের বাবার। বিশস্ত লোক তাই করেছে।
মায়ের শেষ সময়ে বলা কথাগুলো শুনেই কেঁপে উঠেছিল বিকাশ। সাংঘাতিক বিভৎস ঘটনা!
তনু, সৌম্য, প্রমিতা এবং ডঃ সরকারও শুনলেন। সকাল গড়িয়ে দুপুরও যায়, নিস্তব্ধ সবাই।
অনুষ্ঠানের পরদিন। সকাল থেকে ঝুমনির বড্ড তাড়া। ফিরতে হবে তাকে কলকাতায়। এতটুকু মেয়ে ছেড়ে এতদূরে আসা। কলকাতাতে নাইট ডিউটি একটু শুরু করলেও কম সময় থাকতে হয়। এখানে প্রায় তিরিশ ঘন্টা কেটে গেছে। মালিকপক্ষ তাদের ভালো প্যাকেজ দিয়ে থাকেন। ডিউটির বাইরে এতদূর সেইকারণেই আসা। তাছাড়া হোমে মানুষ ঝুমনির সংবেদনশীল মন। কোথায় থাকত সে আজ? যদি না কোনো এনজিওর সাহায্য পেত। তাই এই অনুরোধ ফেলতে পারেনি সে কোনোভাবে। বিশেষ করে ডঃ সরকারের। এতবড় ডাক্তার, অথচ কি অমায়িক। দেশে বিদেশে নামকরা বিশিষ্ট সমাজসেবী। অথচ এমন আন্তরিক। এমন মানুষের সঙ্গে কোনো কাজে যুক্ত হওয়া বহু পুণ্যের কাজ!
এইরকম মানুষদের দয়াতেই সে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েও জীবনের মূলস্রোতে ফিরতে পেরেছে। যথাসম্ভব নিজের পছন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করে মূলস্রোতে প্রবেশের অধিকার পায় সে। তাদের মত এইটুকু সুযোগও অনেকেই পায় না!
তবে এবার ফিরে যেতে হবে বাড়ি। কে জানে ‘বুইমা’ কি করছে।
সকালের কর্তব্যকাজ সেরে সে ডঃ সরকারের কাছে বিদায় নিতে এসেছে। ডঃ সরকার অফিসে বসেন নি। শুনতে পেল শরীর খারাপ। তাই আরও চিন্তিত হয়েই কোয়ার্টারে দেখা করতে আসা।
কিন্তু এসেই চুম্বকের মত পা আটকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।
কাল থেকে আছে, নেটওয়ার্কের গন্ডগোলে কাল শান্তর সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি! যদিও জানে মনিবৌদির কাছে মেয়ে নিশ্চিতভাবে সুরক্ষিত। তবুও মায়ের মন। অকারণে অনিষ্ট
আশঙ্কা হয়!
কিন্তু একি শুনছে? অস্পষ্ট কুজ্ঝ্বটিকার আড়ালে ভেসে ওঠা যে স্মৃতিরেখাটি, দিগন্তের ওপারে হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠত! সেই স্মৃতিপথটাকেই এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ঝুমনি। তার জীবনের জট খুলে গেল এইভাবে আচমকা! এইরকম এক জায়গায়? এইভাবে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে এসে?
ডাক্তারবাবুর ঘরে, কোনো নতুন মানুষদের একান্ত কথপোকথনের মধ্যে?
বড্ড অস্থির লাগছে! ঘোরের মধ্যে একসময় অযাচিত ভাবে প্রবেশ করে সে সকলের সামনে! পরিচয় দেয় সেই হারিয়ে যাওয়া ওয়ার্কারের মেয়ে উমা! এখন ঝুমনি নামে পরিচিত।
নিস্তব্ধতার আবরণ খুলে ডঃ সরকার উঠে দাঁড়ালেন। ‘আয় মা, কাছে আয়!’
(উপসংহার)
পাশের দু’টো গ্রাম পেরিয়ে নতুন হওয়া হাসপাতালে কিছু কাজ পাওয়ার আশা নিয়ে এসেছিলাম। লোকেরা বলেছিল, ‘ডাক্তারবাবু মানুষ নন, দেবতা! নিশ্চয়ই ব্যবস্থা হবে। অপেক্ষা কর।’
ক’দিন আশায় আশায় রয়েছি। কিন্তু ঘুনাক্ষরে ভাবতে পেরেছিলাম? কী দেখছি? কি শুনছি? ‘উমা’? ঝুমনি? ওই সুন্দর দেখতে নার্স দিদিমণি? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছি নাতো?
ডঃ সরকার নিজেকে নিঃশেষ করার ব্রত নিয়েছেন! নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছেন অন্যরূপে। সম্পূর্ণ নতুন করেই গড়েছেন নিজেকে। আগের মানুষটার এতটুকু ছায়াও আসতে দেন না নিজের মধ্যে। দেশের কাজে সম্পূর্ণ নিয়োগ করেছেন নিজেকে। সেদিন থেকে শরীরের কথা ভাবছেন না। কী এক দুর্বার শক্তি তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে এদিক ওদিক, দেশ থেকে বিদেশে।
আশির উপর বয়স। নিজের কুকীর্তির কথা শুনলেন। নিজের আত্মজদের মুখেই!
দুরন্ত শক্তি ধরেছেন এতদিন। দুর্বার গতিতে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু নিংড়ে চলেছেন এগিয়ে। প্রদীপ নেভার আগে জ্বলে উঠতে চাইলেন। শেষশক্তি পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন কর্মপ্রবাহ বজায় রেখেছেন।
হার মানলেন একসময়! শরীর সায় দিচ্ছে না! অথচ এই শরীর নিয়েই এতদিনের দম্ভ!
জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে নত হলেন অদ্ভুত কমনীয়তায়! সকলের কাছে ক্ষমা চাইলেন। বিশেষভাবে প্রমিতাদেবীর কাছে। স্বীকার করলেন, তনু এবং বিকাশের জনকও তিনিই।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সামনে এসে পড়লাম আমি!
অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম মৃত্যু পথযাত্রী ডঃ সরকারের শেষ বয়ানের সাক্ষী হয়ে। এইভাবে?
এক দৌড়ে ছুটলাম আমার মায়ের কাছেও। হৃৎপিন্ডের ভেতর কে যেন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। একই রকম নির্জীব অবস্থায় রয়েছেন মা। একটাই আশা। আমাদের উমাকে ঠিক খুঁজে পাওয়া। শেষ সময়ে এলেও খুশির খবর দিতে পারলাম মায়ের কানে।
দুর্গাপূজা শেষ হয়েছিল যখন, সেইদিন থেকে মায়ের শরীরটা আরও খারাপ হয়েছে। এদিকে ডাক্তার-বদ্যি পাওয়া যায় না তেমন। তাছাড়া আমার মত মানুষের পক্ষে সে খরচ সামলানোও অসম্ভব! ডাক্তারবাবুর নতুন হাসপাতালে তাই এসেছিলাম কাজের আশাতেই। আশা ছিল আমার মায়েরও এইবারে চিকিৎসা হবে। মা ছাড়া আমার আপনজন কেউ নেই আর। প্রতীকিভাবে দেবীর বিসর্জন ঘটলেও ঈশ্বরের অসীম কৃপা, আমাদের উমার বিসর্জন হয়নি।
মাযে নব নবরূপে ধরায় আসেন। সামান্য আশাটুকু নিয়েই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাঁচে।
সাতাশে বৈশাখ। হাসপাতালের অনুষ্ঠান মিটেছে। বাইরে থেকে অতিথিরা এসেছিলেন, ফিরে গিয়েছেন সবাই। হাসপাতালের সমস্ত বিভাগ তৈরি থাকলেও পুরোপুরি কাজ শুরু হতে কয়েকদিন লাগবে আরও। শেষের দিনগুলো এখানেই কাটাবেন স্থির করেছেন ডাক্তারবাবু।
ঈশ্বরেরও বোধহয় সেই বাসনা! ছেলেমেয়েরা শেষে ক্ষমা করতে পারল কিনা বুঝতে পারছি না। আমার মত সাধারণ মানুষের পক্ষে এইসব কথা বোঝা সম্ভব নয়! আমার সৌভাগ্য, আমার জন্য কাজের বন্দোব্যস্ত করে দিয়েছেন তিনি। আমি ধন্য। হাসপাতালে মাকে ভর্তি করাও হয়েছে।
সামান্য মানুষের, সামান্যই চাওয়া। পেট ভরানোর দু’মুঠো রসদ জোগাড় করতে পারব এবার।
গাছপালাগুলো সারাদিন সূর্যদেবতার রক্তচক্ষু সয়েছে। একটুকরো মেঘের ছায়া নেই আকাশে। হঠাৎ বেশ আরামদায়ক ঠান্ডা হাওয়া এল কোথা থেকে।
সন্ধ্যা হব হব, ডাক্তারবাবুর ঘরে গুরুগম্ভীর পরিবেশ। প্রভাব পড়েছে বাইরেও। সেইসব উপেক্ষা করে কোনো গাছের অন্তরাল থেকে হঠাৎ একটা কোকিল ডেকে উঠল। এইসময় কোকিল? অকাল বসন্ত?
তেইশবছর পরে উমাও ফিরে পেয়েছে কিছু মুছে যাওয়া স্মৃতি। ক্লান্ত, ক্ষয়প্রাপ্ত জীর্ণ শরীরের মাকে দেখে হাউহাউ কেঁদে ভাসায় সে! ‘আমরা অপারগ হতাম মা। এত সুন্দর জীবন দিতে পারতাম না তোকে কোনোভাবে! ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।’
গুছিয়ে কথা বলতে পারি না আমি! কিন্তু বলতে চাই।
কিছু না বলে, স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি ডাক্তারবাবুর পায়ের তলায়।
চোখের জল বোধহয় সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে গিয়েছে আমার! অন্যের সামনে প্রকাশিত হবে না! ডাক্তারবাবুর জন্য ছেলেমেয়েরা কাঁদছে। কাঁদছেন ডাক্তারবাবুর স্ত্রীও। এইযে নির্ম্মল অশ্রুরাশি, বহুদিনের অভিযোগ, ক্রোধ-কালিমা, ধুয়ে মুছে এখেবারে পরিস্কার। এইটুকুই প্রাপ্তি তাঁর!
একের পরে এক কত জটিলতাই আসে মানুষের জীবনে! বলতে পারি না সবকথা আমার মাকে। যাসব শুনেছি, সমস্তই সত্য। তবুও! ‘সেই কথাটি’, মায়ের কাছে অনুক্তই রাখি আমি! আমার মা অতি সাধারণ মানুষ। এই শেষের মুহূর্তে এসে নাই বা জানলেন জীবনের তিক্ততম দিকগুলো!
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হল। এযে আমাদের পরম প্রাপ্তি! শেষের দিনে আমার সাধারন মা, এইটুকু খুশি-আনন্দ নিয়েই সব কথার ওপারে নিশ্চিন্তে চলে যাচ্ছেন!
বলা বাহুল্য আমারও এইটুকুই সান্ত্বনা।
–সমাপ্ত–
