ছোটোগল্প

গোঙানি

পল্লব দাস

বেশ কয়েকদিন থেকে রাতের দিকে একটা গোঙানোর শব্দ শুনছে সূর্যস্নাতা। 

প্রথমদিকে ভাবছিলো পাশের ফ্ল্যাটের অখিলেশ বাবুর হাঁপানির সমস্যা, উনারই হয়ত গোঙানি।

কিন্তু আজ দুপুরবেলা অখিলেশ বাবুর ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া দেখে খানিক হতবাকই হলো সূর্যস্নাতা।

নিচে সিকিউরিটি গার্ড পরেশ কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার পরেশ? অখিলেশ বাবু কি কোথাও ঘুরতে গেছেন? দিনেরবেলা তো উনি বাড়িতেই থাকতেন।

পরেশ জবাব দেয়, হ্যাঁ ম্যাডাম, ওনার ছেলে আর বউমা এসে ওনাকে নিয়ে গেছে, এই ফ্ল্যাটটাও বেঁচে দেবে বোধহয়!

সূর্যস্নাতা-ওনার ছেলে বউমা তো বাইরের দেশে থাকে শুনেছি,তাহলে উনি কোথায় থাকবেন এখন?

পরেশ- আবার কোথায় থাকবেন, বুড়ো বাপ মা দের তো এখন একটাই ঠিকানা, বৃদ্ধাশ্রম। শুধু কষ্টটা কি জানেন ম্যাডাম, অখিলেশ বাবুর নাতনী, তিতলি, দারুণ বাঁধন ছিল ওদের, সবসময় একসাথে খেলতেন দুজনে, তিতলির আধো আধো বুলি শুনে আমাদের সবার মন ভালো হয়ে যেতো, সেই তিতলিও আগের বছর স্কুলবাসের দুর্ঘটনায় মারা গেলো, তারপর থেকে অখিলেশ বাবুও ভয়ানক চুপ হয়ে গেলেন, প্রতিরাতে নিজের ঘরে বসে গুঙিয়ে কাঁদতেন, একদিন ওনার ঘরে রাতে খাবার পৌঁছানোর সময় শুনেছিলাম।

 সূর্যস্নাতা মুখে বিষাদের ছাপ নিয়ে বললো, এটা তো জানতাম না পরেশ, আমরা তো মাসখানেকই হলো এই ফ্ল্যাটটা নিয়েছি, আগে জানলে নিজেরাই যেতাম অখিলেশ বাবুর সাথে কথা বলতে।বড্ড আফসোস হচ্ছে।

পরেশকে বিদায় জানিয়ে সূর্যস্নাতা অফিসের দিকে যেতে যেতে ভাবলো, মানুষের জীবনে কতই না দুঃখ।আমি আজই আবীরকে বলবো পুরো বিষয়টা, তারপর খোঁজখবর নিয়ে অখিলেশ বাবুর সাথে দেখা করতে যাবো, আমাদের এখনো কোনো ছেলে মেয়ে হয়নি বলে কষ্ট পাচ্ছি, আর ওদিকে বাচ্চা তিতলিকে হারিয়ে তার দাদু অখিলেশ বাবুর কতটা কষ্ট পাচ্ছেন, ভাবলেও খারাপ লাগছে।

হঠাৎ করে সূর্যস্নাতার আরেকটা জিনিস খেয়াল হলো, আসল কথাটা তো ভুলেই গিয়েছিলাম, গোঙানোর শব্দটা তাহলে কার?

আবির দু দিনের অফিস ট্রিপে ব্যাঙ্গালোর গেছে, আই টি প্রোফেশনাল ও, তাই মাঝে মাঝে এরকম ট্রিপে যেতে হয়। তাই সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে সূর্যস্নাতা রাস্তার হোটেল থেকে রাতের খাবার রুটি মাংস কিনে ফিরলো।

তিনতলায় ওদের ফ্ল্যাট, লিফটে করে উপরে উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে দেখে অখিলেশ বাবুর ফ্ল্যাটের দরজায় কোনো তালা নেই, ভাবলো ওনার পরিবারের লোকেরা হয়ত জিনিসপত্র নিতে এসেছেন, সকাল থেকেই মনে হচ্ছিলো খোঁজ নেবে, আবেগের বশে কলিং বেলটা টিপলো, একটা দুধ সাদা বাচ্চা মেয়ে এসে দরজাটা খুললো, কাকে চাই?

-অখিলেশ বাবুর কে হও তুমি?

-আমি দাদুর নাতনী?

-তোমার মা বাবা কোই?

-মা বাবা তো নেই, দাদু আছেন, ডাকছি, আপনি সোফায় বসুন।

এটা হয়ত অখিলেশ বাবুর আরেকটা নাতনী, এই ভেবে ভিতরে সোফায় বসতে যাবে, এমন সময় আবার সেই গোঙানোর শব্দ।

ভারী গলায় অখিলেশ বাবু বললেন, কাকে চাই?

-আমি আপনার পাশের ফ্ল্যাটে থাকি, আলাপ করতে এলাম।

-কেনো?

-না মানে, সব শুনলাম, কষ্ট লাগলো, তাই এলাম।

-আমাদের আর কোনো কষ্ট নেই।

এটা বলেই তিনি পাশের রুমে চলে গেলেন।

এতক্ষণ আঁধারে ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছিলাম না অখিলেশ বাবু বা তার নাতনিকে, লাইট না জ্বালিয়েই থাকেন হয়ত এনারা, আর যেভাবে কথা বলছেন,তাতে মনে হলো আমাকে দেখে খুব একটা ভালো ভাবেন নি, তাই বিদায় জানিয়ে বেরোতে যাবো, এমন সময় ড্রয়িংরুমের সোফা থেকে পাশের রুমের দিকে তাকিয়ে দেখি, অখিলেশ বাবু কাঁধের ওপর বাচ্চা মেয়েটা উঠে দাদুর মাথার চুল টানতে টানতে বলছে, বলো আমায় একলা ছেড়ে কোথায় গিয়াছিলে?অখিলেশ বাবু বললেন, তিতলি, তোর মা বাবা আমায় বৃদ্ধাশ্রমে দিতে গিয়েছিল, আমি গাড়িতে গোঙানো শুরু করি, ওরা ভাবে আমার হ্যার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাই জোরে গাড়ি চালাতে থাকে, আমি ওই অবস্থায় তোর বাবার স্টিয়ারিং র ওপর পড়ি, তোর বাবা টাল সামলাতে না পেরে ব্রিজ থেকে গাড়িটা নিচে ফেলে, আমি তো তোর কাছে চলে এলাম, ওরা এখন হাসপাতালের বিছানায়।

-দাদু,ওরা যদি এখানেও চলে আসে?

এক ক্রূর হাসি হেসে অখিলেশ বাবু বললেন, তুই মেয়ে বলে তোর বাবা মা তোকে স্কুলবাসে তোলার নাম করে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করিয়েছিলো, আমার সম্পত্তি নেবে বলে হাঁপানির পাম্প কিনে দেওয়া বন্ধ করেছিলো, এখন ওরা হাসপাতালে আরো বেশকিছু দিন গোঙাবে, সেই ব্যবস্থা আমরা করবো।

সূর্যস্নাতা এগুলো শুনে দরজার সামনে বেহুঁশ হওয়ার আগে শুনলো, দাদু নাতনী দুজনেই গোঙাচ্ছে আর হাসছে, সামনের দেওয়ালের আয়নায় শুধু দু জোড়া চোখ, আর কিছুই নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *