থিম
অনিতা ঘোষ
কলকাতার এক নামকরা পুজো। প্রতিবার তারা তাদের থিমে আনে চমক। তাদের থিম যে কি হতে চলেছে, শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু শেষমূহুর্তে সবাইকে চমকে দেয় তারা। বাজেটও মোটের উপর তাদের বেশ ঈর্ষণীয়, তা প্রায় ২ কোটি টাকা তো বটেই। বাজেটের সিংহভাগই আসে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের ডোনেশন থেকে। পাড়াটিও অভিজাত তাই মোটের উপর চাঁদাও কম ওঠেনা। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থেকেও আসে টাকা। সব মিলিয়ে বেশ এলাহি কান্ড যাকে বলে। এহেন পুজোর যিনি প্রধান কর্মকর্তা, শ্রী মিথিলেশ দাশগুপ্ত, তিনি বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই হঠাৎ করে একদিন পরলোক প্রাপ্ত হলেন। সাডেন হার্ট আ্যটাক। বেশী বয়সও হয়নি ভদ্রলোকের। কিন্তু হুট করেই চলে গেলেন। কর্মকর্তাদের তো মাথায় হাত। একজনের জন্য আটকে হয়তো যাবেনা এতবড় কর্মকান্ড, কিন্তু ওনার উপরে নির্ভরতা যে অনেকটাই ছিল। থিমের ভাবনা বা শেষমূহুর্তের ফান্ডের ঘাটতি বা গঠনমূলক যেকোন আলোচনা, সবেতেই উনিই ছিলেন যাকে বলে মুশকিল আসান। সামনে বেশী আসতেন না মানুষটি, আত্মসম্মান জ্ঞানও বেশ তীব্র মানুষটির। কিন্তু অহংকারী নন এবং সৎ। বিপদে যে কেউ সাহায্য চাইলে পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। এরকম একজন মানুষকে হারানো সত্যিই ক্ষতি।
=======================••••======
তবু দিন চলে তার নিজস্ব নিয়মে। সব নিয়ম মেনে একসময় শেষ হয় মিথিলেশবাবুর শেষ কাজ। আড়ম্বরহীন একটি ছোট্ট স্মরণসভাও অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর একমাত্র ওয়ারিশন তাঁর এক ভাইপো। সে বাইরে থাকে। সেই এসে কাকার যাবতীয় কাজকর্ম করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ডিসেম্বরে। পরবর্তী শারদীয়ার চিন্তাভাবনার জন্য সময় যথেষ্টই আছে, কিন্তু বড় পুজোয় যা হয়, ঠাকুর জলে পড়ার পরদিন থেকেই চিন্তা শুরু হয়ে যায় পরের পুজোর। এক্ষেত্রে তো মূল কর্মকর্তার একজন চলে গেছেন। সুতরাং ছকে নিতে হবে পরবর্তী কর্মসূচী। সেইমতন, দিন স্থির করা হয় পুজো কমিটির মিটিংয়ের জন্য। মিথিলেশবাবুর ভাইপো ইতিমধ্যে বাকি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, যে তিনি পরবর্তী মিটিংয়ে একটু আসতে ইচ্ছুক। কাকা মানে, মিথিলেশবাবুর কিছু কথা জানানোর আছে তাঁর সবাইকে।
===========•======================
যথাসময়ে মিটিং শুরু হয়েছে। মিথিলেশবাবুর ভাইপো উপস্থিত। মোটামুটি সাদামাটা চেহারার একজন বছর ত্রিশের যুবক। নজর কাড়ে চোখের বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি। বিরাট হ্যান্ডসাম না হলেও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা।
কর্মকর্তাদের মধ্যে সেক্রেটারী শ্রীমতি বসাক বলে ওঠেন, ঐ যুবককে উদ্দেশ্য করে,
—তোমাকে তুমি করেই বলি বাবা, বলো কি বলতে চাও।
উঠে দাঁড়ায় ছেলেটি, কোনরকম ভূমিকা না করেই বলতে শুরু করে।
ভরাট গলা শোনা যায়,
—নমষ্কার, আমি শুভঙ্কর দাশগুপ্ত। আমার কাকা মানে, মিথিলেশ বাবুর শেষ ইচ্ছা ছিল আসন্ন বছরের দুর্গাপুজোর থিমের দায়িত্ব আমি নিই। প্রমাণ হিসেবে কাকার লেখা একটি চিঠিও পেশ করতে পারি আমি। কাকা বিশেষ করে আমায় অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এখন যদি সবাই রাজি থাকেন তবেই আমি এ দায়িত্ব নেব। তবে আমার দুটি শর্ত আছে।
—কি শর্ত?
—কোন চাঁদা আমি নেবনা পুজোর জন্য এবং মহালয়ার আগে থিমও জানাবেনা কাউকে। যদি সবাই ভরসা করতে পারেন তবেই আমি নেব দায়িত্ব। নয় যেমন পুজো হচ্ছে হোক।
অল্পকথায় গুছিয়ে নিজের বক্তব্য পেশ করে থামে শুভঙ্কর।
একটু চাপা গুন্জন চলে। তারপর শ্রীমতি বসাক বলেন,
“তোমায় আমরা চিনিনা, ভরসা করি কিকরে? রেপুটেশন বলে একটা ব্যপার আছে তো?”
উত্তর আসে,
“ধরে নিন না এবছর পুজোটা হচ্ছেই না। কালাশৌচ বলেও তো একটা ব্যপার আছে। পুজো যখন সেটি তো ধার্য হতেই পারে। পরের বছর আবার করবেন যেমন পুজো হত তেমন।”
একটু থমকে যান সবাই। ছেলের যুক্তি যেমন আছে, ঔদ্ধত্যও বেশ ভালই।
সবার হয়ে কর্মকর্তাদের একজন, শ্রী রায় বলেন,
—- দুদিন সময় দাও একটু ভাবি। তোমায় জানাব।
—-খুব ভাল। আমি তবে আসি।
=================•===============
দিন চলে যায়। মোটামুটি সকল প্যান্ডেলের বাঁশ পড়ে গেছে। প্রতিমার বায়নাও শেষ। কিন্তু যে পুজোটির কথা আমরা বলেছি গল্পের শুরুতে, তার কোন প্রস্তুতি দেখা যায় না। না বাঁশ না কিছু। শুভঙ্করেরও নেই কোন পাত্তা। বলাই বাহুল্য কর্মকর্তারা মেনে নিয়েছেন শুভঙ্করের শর্ত। কিন্তু কোন উদ্যোগ যে দেখা যাচ্ছেনা পুজোর। কি হতে চলেছে? তবে কি পুজো হবেনা? এই নিয়ে সবার মধ্যেই চলছে চাপা গুন্জন। কিন্তু সামনে বলেনা কেউই কিছু। অবশেষে চলে এলো দেবীপক্ষ। বাঙালীর চিরন্তন ঐতিহ্যকে সাথে করে ঘরে ঘরে মুখরিত ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’। আড়মোড়া ভাঙছে বাঙালী চিরন্তন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর মেঘমন্দ্র কন্ঠস্বরের চন্ডীপাঠের সাথে।আজ মহালয়া ।
===========••••===================
মহালয়া কেটে গেছে। আজ দ্বিতীয়া। শুভঙ্করের ধার্য করা কমিটির মিটিংয়ের দিন। সে চেয়ে নিয়েছে সারাটা দিন ছজন কর্মকর্তার কাছে। সকাল থেকে শুরু করে পুরো দিনটা ।অনুরোধ বা একপ্রকার আব্দার করেই আদায় করেছে এই দিনটা সে পুজো কমিটির ছজন কর্মকর্তাদের থেকে। পাড়ার মোড়ে সকাল ৭ টায় সবার দেখা করার কথা।সেইমতো নির্ধারিত স্থানে হাজির সকলে। একটা টাটা সুমো এসে দাঁড়ালো। চালকের পাশের আসনে বসে ছিল শুভঙ্কর। ওদের বাড়ির ড্রাইভার অংশুদা বসে ছিলেন চালকের পাশের সিটে। সকলের দিকে একঝলক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে সে অনুরোধ করল গাড়িতে উঠতে। একটু দোনামোনা, “কিন্তু কোথায় যাব?” ইত্যাদি প্রশ্নের দোলাচলকে সাথে নিয়ে সবাই চেপে বসলো গাড়িতে। আজ শুভঙ্কর বেশ চনমনে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলে সে,
—চলুন আজ একটু ঘুরে আসি। সবাই একটু হকচকিয়ে যান, তবে না কেউ করেননা।অংশুদা, শ্রীমতি বসাক, রায়বাবু, সুমিত দা, সুজন বাবু, শ্রীমতি সেন, সুকমল দা এই সাতজন আর শুভঙ্কর এগিয়ে চলে টাটা সুমোয় চড়ে। কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গলকে পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলে হাইওয়ে ধরে। বোঝা যায় চলেছেন তাঁরা মফস্বল তথা আধা গ্রাম সদৃশ কোন গন্তব্যের দিকে।রাস্তার দুধারে দেখা যায় কাশফুলের সারি। শ্রীমতি সেন গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন, ‘অমল ধবল পালে লেগেছে..’. সুকমল বাবু সুর মেলান সাথে। শ্রীমতি বসাক বলেন,
— কিন্তু শুভঙ্কর পুরো তো আঁধারে রেখেছো, বলো কিছু।
একগাল হেসে শুভঙ্কর বলে,
—বসাক কাকীমা, আপনি একটু গান করুন না আর আধঘন্টা পরেই পৌঁছে যাব গন্তব্যে। সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন। ততক্ষন শহরতলির এই ড্রাইভটা এন্জয় করুন।
কিছু একটা আছে শুভঙ্করের ব্যক্তিত্বে, যাতে রাগ করে থাকা যায়না। আর এই মানুষগুলোও বেশ শিক্ষিত মার্জিত মানুষ, সুতরাং হুটপাট মাথা গরম করবেন এমনটাও নয়। আসলে এই পুজো কমিটির মানুষগুলো কেউ মনের দিক থেকে খুব একটা খারাপ নন। এটাও একটা কারন যেটা পুজোটাকে অন্য সব হেভীওয়েট পুজোর থেকে ব্যতিক্রমী করে। যাই হোক, সকলে, রাস্তার দুপাশের কাশফুলের আধিক্য, সকালের নরম আলো, গুনগুন গান, টুকরো গল্পগাছা করতেই মন দেন। দেখাই যাক না কি হয়।
========================•••=======
অবশেষে গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটি পুরনো দোতলা বাড়ির সামনে। শুভঙ্কর অংশুদাকে গাড়ির চাবিটা দিয়ে বলে,
—অংশুদা পিছনের দিকটায় পার্ক করো। পিছনের দিকটায় খানিকটা ফাঁকা জমি, বাগান মতন আছে, আমি এনাদের ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিই বাগানটা ততক্ষণে।
—আচ্ছা শুভদা।
বলে গাড়ি থামায় অংশু।অংশুকে শুভঙ্কর বলে,
—অংশুদা, আপনি চারপাশে ঘুরবেন আমাদের সাথে? নাকি ভেতরে আসবেন, যা আপনার খুশি।
—আচ্ছা। আপনারা এগোন তবে, আমি পার্ক করে আসছি ভিতরে।
—আচ্ছা, আপনি আসুন তবে।
বলে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে, “চলুন, বাগানটা দেখতে দেখতে যাই।”
বাগান দেখা হলে পর,সবাইকে নিয়ে শুভঙ্কর আসে একটি ঘরে। খুবই সাদামাটা ব্যবস্থা ঘরটিতে। কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা শুধু। শুভঙ্কর সবাইকে অনুরোধ করে চেয়ারগুলিতে বসতে।
সবাইকে উদ্দেশ্য করে তারপর বলতে শুরু করে শুভঙ্কর।
—অনেক অপেক্ষা করিয়েছি আমি আপনাদের। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আগেভাগেই এইরকম বেয়াড়া খামখেয়ালিপনার জন্য। থিম বলব আজ আমি সবাইকে। তার আগে একটি পরিসংখ্যান দিই। তারও আগে বলি, এই বাড়িটি আমার কাকারই। এখন এটিকে অনাথ আশ্রম বলাই শ্রেয়। বছর তিনেক আগে তিনি ১০ টি অনাথ শিশুকে থাকতে দেন এখানে। একজন বয়ষ্কা মহিলা, সম্পর্কে যিনি আমার দুর্সম্পর্কের পিসি, যাঁকে ওরা সবাই মা বলে, তিনিই চালান এই আশ্রমটি। পিসি নিজের বাড়িতেই আশ্রম চালাতেন। কিন্ত আত্মীয়দের চক্রান্তে তাঁর ভাগে পড়ে মাত্র একটি ঘর। ঐ একটি ঘরে আশ্রম চালানো অসম্ভব ছিল। কাকা তখন ওনার পাশে দাঁড়ান। পিসি ওবাড়ির পাট চুকিয়ে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন এখানে। নিজের হাতেই রান্না করেন সবার, খেয়াল রাখেন। হাতের কাজ করেন নিজের মতন করে। সাধ্যমতন পড়ান সবাইকে। আরও ১০ জন বাচ্চা থাকে এখানে। এই দশ জন হল ১০ টি রাস্তার কুকুর। যাদের কপালে খাওয়া জুটুক না জুটুক, মারধোর জুটতো অবশ্যই। মোটামুটি এই হল ভূমিকা হল এই বাড়ির, এবার আসি আমি যে পরিসংখ্যানের কথা বলব বলছিলাম সেই পরিসংখ্যানে।
এতটা বলে একটু থামে শুভঙ্কর। তারপর বলতে শুরু করে,
—একটি বাচ্চা এবং একটি স্ট্রে ডগির খাওয়া দাওয়া, বাচ্চাটির প্রাথমিক শিক্ষা এবং নূন্যতম স্বাস্হ্য পরিষেবা, ইলেকট্রিসিটি বিল ইত্যাদি সব নিয়ে একদিনের খরচ যদি আমি হিসেব করি সেটা দাঁড়ায় ১০০ টাকা। তবে মাসের খরচ হিসেব করলে দাঁড়ালো গিয়ে ৩০০০ টাকা । এরম ১০ জনের খরচ ৩০০০০ টাকা, মোটামুটি কনসোলিডেটেড হলে ২৫০০০ টাকায় মিটে যায়। ৫০০০ রাখা থাক বাড়ির ট্যাক্স, রান্নার জ্বালানী, ইন্টারনেটের বিল ইত্যাদির জন্য। দরকারমতন কুকুরগুলির ভ্যাকসিনেশন এবং স্টেরিয়ালাইজেসনেও লাগানো যাবে বেঁচে যাওয়া টাকা। আপনারা বাগানটা পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। লক্ষ্য করে থাকবেন বাড়ির পিছনের একফালি এই বাগানে লেবু, লঙ্কা, টমেটো, পেয়ারা, পেঁপে ইত্যাদি গাছ রয়েছে। ছেলেমেয়েরা আলুও ফলিয়েছে ইউটিউব দেখে। যতই হোক, বাঙালী বলে কথা, আলু ইজ মাস্ট। আর এসব থাকলে টুকটাক আলুসেদ্ধ খাবার খরচটা বাঁচে বা আলু না জুটলে ডালের পাতে লেবুটুকু জোটে। কুকুরগুলো ডিম না পেলে ডাল ভাত বা পেঁপেসেদ্ধ খায়। এর বেশী লাক্সারি ওদের নেই। পুরনো একটা কম্পিউটার ওদেরকে দিয়েছি আমি, টুকটাক ওরা শিখছে। ২৫০০০ টাকা যদি হয় মাসে, ১৫ বছরের খরচ দাঁড়ালো গিয়ে তবে ৪৫ লাখ টাকা। মোটামুটি ১ কোটি টাকা যদি ফিক্স করা হয়, মাসে কমবেশী ৫০ হাজার টাকা সুদ আসবেই এবং সেটি দিয়ে সারা মাসের খরচ চলেও বেশী । তাহলে ১০ টি বাচ্চা এবং ১০ টি কুকুরের ১৫ বছরের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং বেসিক এডুকেশনের প্রয়োজনীয়তা মিটবে। বাচ্চাগুলির গড়পড়তা বয়স পাঁচ। ১৫ বছর সময়টি যথেষ্ট তাদের নূন্যতম শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। আবাসিকদের জন্য ১৫ বছরের পরবর্তী কর্মসূচী ভাবা যাবে আগামী পাঁচ বছরে। মূলধন কিন্তু রয়েই যাচ্ছে। সুদেই চলছে। ছেলে মেয়েরা শিখছে হাতের কাজ আর কুকুরদেরও গড়পরতা আয়ু বছর ১৫ র মতনই। ডিসাস্টার রিকভারির ক্ষেত্রে বাকি এককোটি টাকা ফিক্স করা আছে, সেটি ভাঙা যাবে। ১৮-১৯ বছর বয়স হবার পর বাচ্চাদের স্বাবলম্বী হতে কিছু করতে হবে। হয় চাকরী বা হাতের কাজ। অর্থাৎ একবারের পুজোর থিমের টাকা দিয়ে বন্দোবস্ত হল ২০ টি প্রাণের ১৫ বছরের।
এই হল আমার এবারের থিম। মাতৃবন্দনা আমি করিনি, কিন্তু ১৫ বছরের সেল্ফ সার্ভাইভাল মডেল আমি গড়ে তোলার প্রয়াস করেছি, এটাও কি একধরনের বন্দনা নয়?তবে, এখানেই শেষ নয়, এখানকার আবাসিক ছেলেমেয়েরা রেখেছে কিছু বন্দোবস্ত। তারা নিজের মতন করে এবার মায়ের আরাধনা করবে তাদের অনাথালয়ে। এখানেই চলছে সে প্রস্তুতি। আমরা সবাই মিলে এই বাড়িতে করব মা দুগ্গার পুজো। আর আপনাদের হাত দিয়েই ওরা চায় আজ কাঠামো পুজো হোক।একদম ছোট করেই করব কিন্তু সবাই মিলে খিচুড়ি লাবড়ার বন্দোবস্তটুকুন করেছি পুজোর পাঁচটা দিন এবং আজকের দিনটাও। আশা করি আপনাদের পাশে পাব। আর এই সব খরচ আমি করেছি কাকার সম্পত্তির অর্থ থেকেই। এই পুজোটা ছিল তাঁর প্রাণ এবং সবসময় আমায় বলতেন তাঁর অবর্তমানে আমি যেন পুজোর ডোনেশনে কোন কার্পণ্য না করি। সাথে এই অনাথালয়ের জন্যও যেন আমি ওনার অবর্তমানে কিছু করি একথাও বলতেন বারবার। সময় পাননি নয়তো আলাদাভাবে বন্দোবস্ত সব করেই যেতেন। শুধু নিজের ব্যাঙ্ক এবং ফ্ল্যাটের সবকিছুর জয়েন্ট মালিকানায় আমায় রেখে গিয়েছিলেন, তাই সমস্যা হয়নি আমার এই সিদ্ধান্তটা নিতে। তাঁর প্রাণের প্রিয় পুজো আর অনাথালয়ের ভবিষ্যতকে একসূত্রে গাঁথার একটা প্রয়াস করলাম মাত্র। যেখানে পুজো হত সে স্থানটা পাল্টালো বটে, কিন্তু কচিকাঁচাদের ভবিষ্যত থিতু করা এবং তাদের হাতে মাতৃবন্দনা এটাকি খুব খারাপ কিছু হল?
একদমে এতগুলো কথা বলে থামে শুভঙ্কর। কর্মকর্তারা সকলেই বেশ ব্যোমকে গেছেন। নীরবতা ভেঙে সুকমল বাবু বলেন,
—-একদম পুরোপুরি যে তোমার চিন্তাকে আমরা বাহবা দেব এমনটা নয়। যদিও আমি আমার নিজের কথাই বলছি। তবু তোমার এই চিন্তা আমার খুব ভাল লাগল, না হয় এবার এখানকার কচিকাঁচাদের সাথেই আমরা পুজোটা এনজয় করব। তবে পুজোটা পাড়াতেই হবে, আর কচিকাঁচারা সহ সবাই আশ্রমের পুজোর কটা দিন আমাদের পাড়াতেই কাটাবে। কচিকাঁচা বলতে চারপেয়ে বন্ধুদের কথাও বলছি। ওদের যদি নিতে একান্তই অসুবিধে হয় তবে পাঁচদিন ওরা এখানেই যাতে ভোজ পায় সে বন্দোবস্ত করা হবে। সবাই কি বলেন?
শ্রীমতি বসাক এবং সেন বলেন,
—আমাদের দুজনেরও মতামতও সুকমল বাবুর মতনই।
সুজিত বাবু বলেন,
— বেশ তবে তো কথা হয়েই গেল। পজিটিভ কিছু ভাবলে বা আলাদা কিছু ভাবলে তবেই না আলাদা কিছু করতে পারব, আর যেভাবেই হয়ে থাকুক এইরকম থিম কেউ কোনদিন ভেবেছে বলে তো মনে হয়না। তবে পরের বার থেকে বলে দিচ্ছি আমরা বাজেটের ৫০ শতাংশ খরচ করব এরকম কোন গঠনমূলক কাজে আর বাকিটা দিয়ে হবে পুজো। আর কোন কথা নয়, চলো চলো এবার কচিকাঁচাদের সাথে আলাপ করি আর পাশেই একটা কচুরীর দোকান দেখেছি, সবাই মিলে জম্পেশ করে মহালয়ার ব্রেকফাস্টটা হয়ে যাক, তারপর বাকি সব প্ল্যান প্রোগ্রাম হবেক্ষন, কি বলুন?
বাকি কর্মকর্তারাও সানন্দে মাথা নাড়েন। সবাই হেসে ওঠে, আর দরজার পাশ থেকে মহিলাকন্ঠ ভেসে আসে,
“ সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে, চলে আসুন সবাই, আমরা
কাঠামোপুজোটা সেরে ফেলি, নাহয় এই কাঠামোই নিয়ে যাওয়া হবে পাড়ায়, সে সব প্ল্যান হবে আজ সারাদিন। আগে আমরা আজ একসাথে প্রাতরাশ এন্জয় করি আসুন।পুরো ঘরে তৈরী লুচি, আলুর তরকারী আর সুজি। চলুন চলুন আর দেরী নয়।”
