চলো আমরাই, চলো নিজেরাই বদলাই
অগ্নিভ সেনগুপ্ত
মা আসছেন। বাঙালীর “বিগেস্ট শো অন আর্থ” দুয়ারে আগত। এই সুযোগে পাঠকদের কাছে একটা ছোট্ট আবদার রেখে প্রতিবেদনটা শুরু করি।
আসুন না, আমরা সবাই মিলে এই বছরে আমরা একটা ছোট অথচ দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি। মনে হয়, খুব-একটা কষ্ট করতে হবে না, কিন্তু সম্মিলীত চেষ্টায় সাম্প্রতিক বিশ্বের এক বিশাল সমস্যার সমাধান হবে। কথায় আছে না, “ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু-বিন্দু জল, গড়িয়াছে মহাদেশ, সাগর অতল”।
মানুষের জীবনে অনেকক্ষেত্রে সমস্যা ট্রোজান হর্সের মতো, শত্রুকে সনাক্ত করাটাই শক্ত হয়ে যায়। তাই, যেকোন সমস্যা সমাধানের প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ হচ্ছে, সমস্যাটাকে সমস্যা হিসাবে স্বীকৃত করা। সেই চেষ্টাই করা যাক। যথারীতি, আমার আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু – নেদারল্যান্ডস এবং ভারতবর্ষ। বিষয়: বিদ্বেষ।
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এবং বিভিন্ন মানুষের সাথে কথাবার্তা বলে যা বুঝেছি – বিদ্বেষ ব্যাপারটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই, বিজ্ঞাপনের ভাষায়, “ও জানেই না যে ও মার্জারিন খাচ্ছে”। অনেকক্ষেত্রেই আমরা বুঝতেই পারিনা যে আমরা অজান্তেই বিদ্বেষ প্রচার করছি। এখন উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা আরো স্পষ্ট।
বিদ্বেষের প্রধান কারণ, অন্ততঃ আমার যা মনে হয়, অন্যকে নিজের থেকে হেয়জ্ঞান করা। আমাদের ছোটবেলায় ইংরাজী পার্টস অফ স্পিচের উদাহরণ হিসাবে একটা বাক্য প্রায়ই ব্যবহার হত, “হি ইজ পুয়োর বাট অনেস্ট”। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে আমাদের ছোট থেকেই শিক্ষা দেওয়া হত, মানুষ গরীব হলে তার অসৎ হওয়াটাই সাধারণ। যদি কেউ গরীব হয়েও সৎ হয়, সেটা ব্যতিক্রমী এবং উদাহরণযোগ্য। বর্তমানের সময়প্রবাহে বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি ইত্যাদির কল্যাণে অবশ্য আমরা অন্যরকম উদাহরণই বেশী পাই। কিন্তু, আমাদের বিদ্বেষ-শিক্ষার শুরুটা সেই সামান্য পার্টস অফ স্পিচের উদাহরণের মতোই অবচেতনে ঢুকে গেছে। গবেষকরা এইধরণের স্টিরিওটিপিক্যাল ছদ্ম-বিদ্বেষকে অভিহিত করেছেন ‘মাইক্রো-অ্যাগ্রেশন’ নামে। এইরকম উদাহরণ আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনে অহরহ দেখতে পাবেন। আমার-আপনার মতো সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই মাইক্রো-অ্যাগ্রেশনের প্রয়োগ করে চলেছি অবিরত।
আমার অভিজ্ঞতায় প্রধানতঃ বিদ্বেষের উদাহরণ পেয়েছি চারটি বিভাগে:
১. বর্ণ বা জাতি বিদ্বেষ
২. ধর্ম বিদ্বেষ
৩. লিঙ্গ বিদ্বেষ
৪. খাদ্য বিদ্বেষ
রাজনৈতিক বিদ্বেষকে এই তালিকায় রাখলাম না, কারণ বিদ্বেষই রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। এবং, শুধু আজকের যুগেই নয়, যুগযুগান্ত ধরে নেতারা এই চার-পাঁচ ধরণের বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছে তাদের সমর্থন ও রাজনৈতিক অগ্রগতি।
আপনি যদি একটু গভীরে চিন্তা করেন, উপলব্ধি করবেন যে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রাবল্যের সাথে ধর্ম ও জাতিবিদ্বেষের সরাসরি যোগাযোগ আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মেক্সিকানদের উৎখাত করে এবং সব মুসলমানদের উগ্রপন্থী আখ্যা দিয়ে আমেরিকাকে গ্রেট বানাচ্ছেন। অথবা, বরিস জনসন ব্রেক্সিটের বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ, ইতিহাস ঘাঁটলেই জানা যায় আমেরিকার ভূমিপুত্র রেড ইন্ডিয়ানদের উপরে ইয়োরোপিয়ানদের অকথ্য অত্যাচার এবং ফলস্বরূপ আমেরিকায় তাদের ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠার কাহিনী। ব্রিটিশ উপনিবেশের ইতিহাস তো কোন ভারতবাসীরই অজানা নয়। কিন্তু, সেই অত্যাচারের ইতিহাস দুর্ভাগ্যক্রমে আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে মেনস্ট্রীম নয়। যে চার্চিলের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে মন্বন্তর হয়, সেই চার্চিল ইংল্যান্ডের নায়ক।
অ্যাডল্ফ হিটলারের নাম শুনলেই আপনাদের নিশ্চয়ই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক স্বৈরাচারী একনায়কের ছবি। হাজার-হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার খলনায়ক। কিন্তু, বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের নাম কখনো শুনেছেন, যিনি লক্ষ-লক্ষ কঙ্গোবাসীকে হত্যা করেছিলেন নির্মমভাবে? হিটলার বা নাৎসি পার্টির নাম জার্মানী আজও লজ্জা ও ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করে। বার্লিনে গেলে দেখতে পাবেন, হিটলারের সৌধ তো দূরস্থান, হিটলারের বাঙ্কারের উপরে পার্কিং গ্যারাজ বানিয়ে তাকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে জার্মানী।
কিন্তু, লিওপোল্ড? বেলজিয়ামে রাস্তার নাম, মূর্তি, সৌধ – অনেক কিছুই আজও তার উদ্দেশ্যে সম্মানের ইতিহাস বহন করে। হিটলার আর লিওপোল্ডের মধ্যে একটাই পার্থক্য – হিটলার যাদের হত্যা করেছিলেন তারা ইয়োরোপীয়ান ছিলেন, এবং লিওপোল্ড হত্যা করেছিলেন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ‘অকিঞ্চিৎকর’ মানুষদের।
ইয়োরোপের ঔপনিবেশিক অত্যাচারের ইতিহাস এই মহাদেশে খুব-একটা চর্চিত নয়। আর, সেই কারণেই হয়তো, উদারমনস্কতার মুখোশের আড়ালে এই মহাদেশে বৈষম্যের উদাহরণ খুব-একটা বিরল নয়।
নেদারল্যান্ডসে উত্রেখ্ত ইউনিভার্সিটি ও ভ্রাই ইউনিভার্সিটির সম্মিলীত প্রচেষ্টায় একটি পরীক্ষা করা হয়, যেখানে ৫০০ চাকরীর আবেদন বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়। তার মধ্যে স্থানীয় ডাচ আবেদনপ্রার্থী যাদের অপরাধমূলক ইতিহাস আছে, এবং অ-ইয়োরোপীয় যাদের কোন অপরাধের ইতিহাস নেই, তেমন কিছু আবেদন যোগ করা হয়। দেখা যায়, যেখানে ২৮ শতাংশ অপরাধী ইতিহাস-সম্পন্ন ডাচ আবেদনপ্রার্থীদের পরবর্তী সাক্ষাৎকারের জন্যে ডাকা হয়েছে, সেখানে মাত্র ৯ শতাংশ অপরাধী ইতিহাসবিহীন প্রবাসী পদপ্রার্থীরা ডাক পেয়েছেন।
২০১৬ ও ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডস পুলিশের কাছে বৈষম্যের যতো অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে জাতিবৈষম্য-মূলক অভিযোগই গরিষ্ঠ। সাম্প্রতিক, দেন বস-এক্সেলশিয়রের ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন এক্সেলশিয়রের ফুটবলার আহমেদ মেন্ডিস মোরেইরাকে বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয়, সেই খবর হয়তো অনেকেই পড়েছেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ, নেদারল্যান্ডসের মতো প্রগতিশীল দেশেও এমন ঘটনা বিরল নয়।

২০১৬-২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডসে পুলিশের খাতায় বৈষম্যের অভিযোগ
(সূত্র: https://discriminatie.nl/files/2018-04/discriminatiecijfers-in-2017.pdf)
জাতিবিদ্বেষীদের প্রধান অভিযোগ, বহিরাগতরা এসে তাদের কর্মসংস্থান, বাসস্থান, সভ্যতা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নষ্ট করছে। যেমন, আমস্টেলভীনবাসী এরিক গ্রুটার্স। বিভিন্ন প্রবন্ধে, বক্তব্যে উনি বারবার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন যে ভারতীয় অনাবাসীরা এসে আমস্টেলভীনের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বাড়িভাড়া বাড়ছে, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান কমছে। তা ছাড়া, বিজাতীয় খাদ্য, বিজাতীয় উৎসব-পার্ব্বণ ইত্যাদি অসুবিধার সৃষ্টি করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
উদাহরণ-স্বরূপ একটা প্রবন্ধের লিঙ্ক দিলাম: https://rtva.nl/2018/06/we-wonen-in-amstelveen-en-niet-in-india-aan-de-amstel/
কর্মসংস্থানের অভিযোগটা অবশ্য এখন অনেক দেশেই উঠছে। কিন্তু, একজন বহিরাগত নতুন দেশে এসে নতুন ভাষার সম্মুখীন হয়ে বিনা অর্থবল ও সামাজিক বলে যদি আপনার চাকরী নিয়ে নেয়, তবে আপনার উচিৎ বহিরাগতদের নিয়ে চিন্তা না করে নিজের ক্ষমতা নিয়ে চিন্তা করা।
গ্রুটার্স-মশায় যদি নেদারল্যান্ডসের ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে একটু পড়াশুনা করতেন, তাহলে হয়তো আমস্টেলভীনের প্রবাসী ভারতীয়দের দ্বারা অসুবিধা সৃষ্টির বক্তব্য রাখার আগে কয়েকবার ভাবতেন। প্রত্যেক ঔপনিবেশিক দেশের মতোই নেদারল্যান্ডসের ইতিহাস দাসপ্রথা ও অত্যাচারে কালিমালিপ্ত, এবং সেই অত্যাচারের ইতিহাসে ভারতবর্ষ অন্যতম সংযোজন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে সুরিনামের ডাচ কলোনীতে পাঠানোর ইতিহাস, বা ইন্দোনেশিয়া-মালেশিয়ায় অত্যাচারের ইতিহাস, এবং লুন্ঠিত সম্পদ আজকের নেদারল্যান্ডসের আর্থিক প্রতিপত্তির এক মুখ্য অংশ।
অবশ্যই, আমরা এখন মধ্যযুগীয় বর্বরতার সময়ে বাস করিনা, এবং তাই “তুই আমার ঘর নোংরা করেছিস, তাই আমিও তোর ঘর নোংরা করব”-জাতীয় প্রতিহিংসার স্থান আজকের সভ্য সমাজে থাকা উচিৎ নয়। বিদেশের নিয়মকানুন, শিষ্টাচার ও সৌজন্য অবশ্যই প্রবাসীদের মেনে চলা উচিৎ।
কিন্তু, অবশ্যই, নিজের সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে নয়। ইন্টিগ্রেশন কখনো একপক্ষের প্রচেষ্টায় হয়না। তাই, আপনার সংস্কৃতি, আপনার অভ্যাস নিয়ে কেউ কটুক্তি করলে প্রতিবাদ করুন, বিব্রত হবেন না।
এইবার আয়নাটা ঘুরিয়ে নিন নিজের দিকে। বৈষম্যের উদাহরণ আমাদের, অর্থাৎ বাঙালীদেরও খুব-একটা অপ্রতুল নয়। এখন, ফ্রি ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, যেখানে আমরা সবাই রাজা, তা আরো প্রকট হয়ে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই ভুরি-ভুরি উদাহরণ আপনি হাতে-গরম পেয়ে যাবেন। সহজলভ্য তথ্যের যুগে মানুষের সহমর্মিতা কমেছে, শুধু একটা পোস্ট বা কমেন্ট দিয়ে কত বেশী লাইক পাওয়া যায়, সেই প্রতিযোগীতায় নেমেছে সবাই। আমার একটা কথা, আমার একটা পোস্ট, আমার একটা কমেন্ট যদি আমার একজন পরিচিতকেও আঘাত করে, তাহলে সেখানে লাইক-কমেন্টের হিসাবটা খুব নগণ্য হয়ে যায়।
ঔপনিবেশিকদের কোন দেশে প্রতিপত্তি-বিস্তারের এক অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র ছিল – ডিভাইড অ্যান্ড রুল। ও তোমার শত্রু, আমি তোমার বন্ধু – এই সত্য স্থাপন করতে পারলেই কেল্লা ফতে! বাকি কাজটা আমার-আপনার মধ্যে হিংসাই করিয়ে নেবে।
এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও প্রায় সেইরকমই। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির রমরমা পৃথিবী জুড়ে, আর সেই স্বার্থে দেশের ইতিহাসকেও পাল্টে ফেলা হচ্ছে। আর, আমি-আপনি অহরহ সেই ফাঁদে পা দিচ্ছি। “আমরা” বনাম “ওরা” পরিবেশ তৈরী করতে অনেকাংশেই সফল রাজনৈতিক নেতারা, আর সেই পরিবেশের শিকার হয়ে আমি-আপনি একে-অপরকে বাক্যবাণে জর্জরিত করে চলেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বন্ধু বিচ্ছেদ হচ্ছে, মানুষ মানুষের প্রতি সহনশীলতা দেখাতে, সামান্য শিষ্টাচার দেখাতে ভুলে যাচ্ছে। এ কোন পৃথিবীতে বাস করছি আমরা?
সরকারের কাজ আমার-আপনার ভালো থাকা নিশ্চিত করা, এবং তার জন্যে ধর্ম-জাতি-বর্ণ নির্বিচারে প্রত্যেক মানুষের জন্য চাই শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্যের সংস্থান। এখন আপনাকে যদি ধর্মের আফিম গিলিয়ে যদি ভুলিয়ে রাখা যায়, এবং নেতার গদি সসম্ভ্রমে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে প্রাথমিক প্রয়োজনের অভাবের জন্যে আমি-আপনি দায়ী।
ধর্মগুরুরা নিজেদের ব্যাবসা বাড়াবেন, নেতারা নিজেদের গদি বাঁচাবেন, আর আমি-আপনি খিদে-তেষ্টা ভুলে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে চলব – একটা দেশকে শাষণ করার জন্যে এর থেকে আদর্শ পরিবেশ আর কি হতে পারে?
তাই, আসুন, প্রতিবাদের পাশাপাশি প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমার-আপনার বিপদে-আপদে কোন নেতা বা ধর্মগুরু এগিয়ে আসবে না, আসবে আমাদের বন্ধু-আত্মীয়-পরিজনেরাই। তাই, তাদের ভালো রাখুন, ভালোবাসুন দল-মত-ধর্মের ঊর্দ্ধে উঠে। অনলাইন বা অফলাইন ট্রোলিং এবং বৈষম্য থেকে দূরে থাকুন।
আসুন, একসাথে প্রতিজ্ঞা করি নবারুণ ভট্টাচার্য্যের প্রাসঙ্গিক দুটো লাইন ধার করে:
“আয় মোরা সব গরিব যত, বাঁধব জবর জোট,
একসুরে আয় বলব তেড়ে, ভোটমারানি ফোট।”
ভালো থাকবেন, বৈষম্যের বিষম ফাঁদে পা দেবেন না।
