গাছেদের বিবাহ
সেলিম মণ্ডল
বর্ষার জল জমলে গাছেদের বড়ো অসহায় লাগে। অথচ, জল ছাড়া গাছেরা প্রাণ পায় না। বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া পাতায় যখন রোদ পড়ে তখন গাছেদের বিবাহ লাগে। এই বিবাহে সবাই আমন্ত্রিত। কে কনে পক্ষ আর কে বর পক্ষ তার তদবির করতে হয় না।
গাছ, আমার ছেলেবেলার বন্ধু। যেমন নদী। গাছেদের যত নিকটে এসেছি বুঝেছি তার আত্মার রং হৃদয়ে লাগলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। একটা বসন্ত আসে। এই বসন্তে একজন বাউল দোতারা বাজায়।
সেদিন ভোরে, বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি। এই বছরে এত বৃষ্টি হয়নি। বাগানে মাটি পড়েছে। নালা বন্ধ। সেই রাতেই মনে হচ্ছিল, গাছগুলো বাঁচবে তো? সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাগানে গিয়ে দেখি— থই থই করছে জল। লালশাক, সাদাশাক, বেগুনের চারাগাছগুলো ডুবে গেছে। নতুন ধরা উচ্ছেগুলোর জলের তলায় শুরু হয়েছে পচন। সদ্য পোঁতা সজনের গোড়ায় জল। জল সজনে ডালের বড়ো শক্র। কিন্তু কীভাবে সরবে জল? বাগানে কোথায় গর্ত করব? জল আর জল! পুরোনো ভরাট হওয়া নালাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচিলের ওপারে কয়েক বালতি জল ফেলার পর মনে হল, সাগরে থেকে জল তোমার মতো ব্যাপার।
আমার বুদ্ধি শেষ… দিদি-আব্বা-বউ কারো বুদ্ধিতে কুলোয় না। ভরসা ছিপাতদা। বৃষ্টিবাদলের দিনে ছিপাতদা বাড়িতে বসে। মাঠে মাঠে মুনিষের ছুটি। মা দ্রুত ডেকে আনে। ছিপাতদা এসেই বলে, আমি যখন এসেছি, জল ঠিক বার করবই? কিন্তু কীভাবে! এতই কি সহজ?
—কোথা দিয়ে জল বার করবে?
— তুমি চুপ করে দেখো না! আমি পাঁচিলের বাইরেটা ঘুরে আসি।
ছিপাতদা বাইরে একটা চক্রর দিয়ে বলল, শাবলটা দাও। দু-ঘা দিতেই গল গল করে বেরিয়ে পড়ল জল। ততক্ষণে হালকা রোদ উঠেছে। নুইয়ে পড়া গাছগুলো আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে। পাতায় পড়ছে নরম মিঠেরোদ।
ছিপাতদাকে বলি, খেয়ে যাবে। দূর, পাগলা এই সকালে কী খাব! বিস্কুট ছাড়া লিকার চা হলে খেতে পারি। আমি বলি, আজ গাছেদের বিয়ে, খালি মুখে যাওয়া ঠিক হবে না। মা, কুলের আচার আর রুটি দিল। ছিপাতদা খেল। কিন্তু, আমি কী বললাম, ঠিক বুঝল না! শুধু ফেরার সময় বলল, খোকন, তুমি কী বললে ঠিক বুঝলাম না। গাছেদের বিয়ে না কী… আমি বললাম, পাতার দিকে দেখো, কী দারুণ রোদ উঠেছে… বলল, সত্যিই তো!
***সমাপ্ত***
