জয় করো এই তা মসী রে
– অভিজি ৎ দেব
======================
অক্টোবর থেকে ইউরোপে দ্রুত ছোট হতে থাকে দিন; ধূসর হতে থাকে আকাশ; আর ক্রমেই গাঢ় হয়ে উঠে অন্ধকার রাত্রি। তাই প্রবাসী বাঙালীদের জন্য অক্টোবর মাস এক মিশ্র অনুভূতি তৈরী করে – এক দিকে দূর্গা পূজা আনে আনন্দের বার্তা; পক্ষান্তরে ছোট হতে থাকা দিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে আসে বিষাদের সংকেত।
নেদারল্যান্ডে বসবাস শুরু করবার আগে আমি থাকতাম সুইডেনে। সেখানে দিনের দৈর্ঘ্য আরো বেশী ছোট হয়ে আসত, ফলে অন্ধকার আরো বেশী প্রবল হয়ে উঠত। সেই সময়ে আমাদের জন্য আশার আলো ছড়িয়ে দিত এডভেন্ট লাইট। অন্য যে কোন ইউরোপীয় দেশের চেয়ে সুইডেনে প্রচুর সংখ্যক বাড়ীর জানালায় বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে এডভেন্ট লাইট জ্বালানো হয়। আমিও কিনে এনেছিলাম, চিরাচরিত মোমের আলোর বদলে সেগুলি ছিল বৈদ্যুতিক আলো। প্রভু যীশুর আগমন প্রতীকায়িত করাই হচ্ছে এডভেন্ট লাইটের পেছনের কাহিনী। জানলার পাশে সারিবদ্ধ এডভেন্ট লাইটের সাথে যোগ হয় শপিং মলে’র আলোকসজ্জা। সেসব দেখে প্রকৃতিও যেন প্রসন্ন হয়ে উঠে – শুরু হয় তুষারপাত। চারপাশে শুভ্র তুষার কণা থেকে প্রতিফলিত হয় এডভেন্টের আলো, দোকানপাটের আলো, আর ক্রিসমাস ট্রি’র আলো – সব মিলে অন্ধকারের বিরুদ্ধে প্রসারিত হয় আশা ও আনন্দের প্রতীক।
অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোক প্রজ্জ্বলন একটি প্রাচীন ও বিশ্বজনীন সংস্কৃতি। খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগের কথা। মিশর থেকে বিব্লিক্যাল এক্সোডাস পর্ব শেষ করে চলে আসা ইহুদীরা তদ্দিনে জেরুজালেমে এসে গুছিয়ে বসেছে; সাজিয়ে নিয়েছে তাদের নগরী; নগরীর কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের মন্দির। সেই সময়ে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে উঠল ব্যবিলোনিয়ানরা। শক্তিশালী ব্যবিলোনিয়ান বাহিনী গিয়ে অবরোধ করে ফেলল জেরুজালেম নগরী। যুদ্ধে বিদ্ধস্ত হল জেরুজালেম; পরাজিত হল জেরুজালেমের ইহুদীরা; সেই সাথে ধ্বংস হয়ে গেল সলোমনের প্রথম মন্দির। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের পরিণতিতে জেরুজালেমের ইহুদীদের বন্ধী করে দাস হিসেবে নিয়ে যাওয়া হল ব্যাবিলনে – এই হচ্ছে ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ব্যাবিলনিয়ান এক্সাইলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
কৈশোরে আমরা বনি-এম এর Rivers of Babylon গানটা শুনতাম। ব্যাবিলনিয়ান এক্সাইলের সময়ে বন্ধী অবস্থায় ইহুদীদের প্রবাস জীবনের কথাই বর্ণিত আছে সেই গানে –
“By the rivers of Babylon,
there we sat down…
The wicked carried us away in captivity
Now how shall we sing
the Lord’s song in a strange land?”
প্রায় অর্ধ শতক কাল “strange land” এ নির্বাসিত থাকার পরে, পারস্যের সম্রাটের হাতে ব্যাবিলনের পতন ঘটে। এর ফলশ্রুতিতে বন্ধী ইহুদীরা মুক্ত হয়; ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়ে তারা জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে; তারপর আবার তৈরী করে সলোমনের মন্দির – ইতিহাসে একেই আমরা বলি সলোমনের দ্বিতীয় মন্দির। এই যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস স্মরণ করার জন্য যে উৎসব তার নাম হানুকাহ। উত্তর গোলার্ধে যখন দিন ছোট হয়ে আসে, ডিসেম্বরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে – ঠিক তখনই মোম জ্বালিয়ে উদযাপন করা হয় হানুকাহ।
আর্য সভ্যতার অংশ হিসেবে ভারতবর্ষেও আলোক প্রজ্জ্বলনের সংস্কৃতি প্রচলিত। কার্তিকের অমাবস্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে পালন করা হয় এই আলোক সজ্জা। বাংলা ভাষায় নানান নামে এই উৎসব পরিচিত। এই উৎসবকে আমরা কখনো বলি দীপাবলি, কখনো দ্বীপান্বিতা, কখনো আবার বলি দেওয়ালি। এর পেছনের কাহিনীও নানান জনগোষ্ঠীর কাছে নানান রকম। রামায়ণে বর্ণিত আছে – কৈকেয়ীর চক্রান্তে পড়ে রাজা দশরথ রামচন্দ্রকে বনবাসে পাঠান। রাম, লক্ষণ ও সীতা সেই সুবাদে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে ছিলেন। বনবাসে থাকার সময়ে রামের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় লংকার রাবন। এর ফলশ্রুতিতে রাম-রাবনে যুদ্ধ বাঁধে; রাবন পরাজিত হয়; আর শেষ পর্যন্ত সীতা বন্ধীদশা থেকে উদ্ধার লাভ করেন। উত্তর ভারতীয়দের কাছে রাবনের বিরুদ্ধে রামের যুদ্ধজয়ের কাহিনী প্রতীকায়িত হয় দীপাবলি’র মাধ্যমে। যদিও অন্য কিছু জনগোষ্ঠীর কাছে এই উৎসবের পেছনের কাহিনী অন্য রকম – তাদের মতে দীপাবলি হচ্ছে নরকাসুরেরে বিরুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ জয়ের প্রতীকায়ন।
জৈন, বৌদ্ধ ও শিখ’রাও দীপাবলি’র সময়ে প্রদীপ জ্বেলে আলোকসজ্জা করে। অবশ্য তাদের আলোকসজ্জার পেছনের কাহিনীও কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন। জৈনরা আলোক প্রজ্জ্বলন করেন সাধক মহাবীরের নির্বাণ লাভ উদযাপন করতে। আর, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের বন্ধীশালা থেকে শিখ গুরু হরগোবিন্দের মুক্তিলাভ স্মরণ করতে আলোক প্রজ্জ্বলন করে উৎসব পালন করেন শিখরা।
আমরা যদি পৌরাণিক কাহিনীগুলির দিকে তাকাই তো স্পষ্টই দেখতে পাব যে, সেই কাহিনী গুলিতে নায়ক থাকে, ভিলেন থাকে, রক্তপাতও থাকে। কিন্তু সেসবের উর্ধে, থাকে একটি বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক উপাদান। সেই শৈল্পিক উপাদান হচ্ছে – আঁধারের বিরুদ্ধে আলোর বিজয়। শৈল্পিক উপাদান যে কোন অনুষ্ঠানের একটা বিশ্বজনীন আবেদন তৈরী করে। শিল্পীরা কবিতা লিখে, ছবি একে, ভাস্কর্য গড়ে, বা গান গেয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দেয় সবার কাছে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম আমার সুইডেনের প্রবাস জীবন নিয়ে। সুইডেনে থাকতে আমরা যে দূর্গা পূজাটা করতাম সেটাও আর সেই আগের মতন নেই। একত্রে বসে যারা আগে উৎসব উদযাপন করতে উৎসুক ছিল, তারাই আজ পৃথক হয়ে উদযাপন করতে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে।
নানা কারণেই মানুষে মানুষে বিভক্তি ঘটে। এই বিভক্তি চরমে পৌঁছুলে শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। ইতিহাসে আমরা দেখেছি যে ব্যাবিলনিয়ান এক্সাইল শেষে, অর্থাৎ খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর আগে সলোমনের যে দ্বিতীয় মন্দির তৈরী হয়েছিল, খ্রীষ্টের জন্মের ৭০ বছর পর সেটিও ধ্বংস হয়ে যায়। মেসোপটেমিয়ার ব্যবিলোনিয়ানদের বদলে এবার মন্দির ধ্বংস করে রোমানরা। মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়; কিন্ত শিল্প টিকে থাকে; মানুষ আজো আলো জ্বালিয়ে আঁধার দূর করতে চায়। তাই কিছু মানুষ যখন ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, তার বিরুদ্ধে মানবতার গান গায় আলোকিত মানুষেরা। আলোকিত মানুষেরা চায় দুঃসময়ে বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করতে; নিজেদের সম্পদ ভাগ করে নিতে; শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে চলতে।
আমাদের আপন আলোয় যদি আমারা নিজেদের আলোকিত করি তবেই উৎসব সার্থক হয়; উৎসবের আলোকে ধরিত্রী’র সজ্জা তাৎপর্যপূর্ণ হয়; অন্ধকারাচ্ছন্ন আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে আলোকিত মানবের জয় হয়। আমরা গান গেয়ে সেই বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই –
“জ্বালাও আলো, আপন আলো,
সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে …
জ্বালাও আলো, আপন আলো,
জয় করো এই তামসীরে॥
