মিষ্টি, কে সি নাগ আর ফেলুদা
অনিতা ঘোষ
– মিষ্টি, তার একটা শক্ত নামও আছে। মিথিলা।ক্লাস সেভেনের চনমনে কিশোরী সে। বাড়ির সবার কাছে সে মিষ্টি। আর সত্যিই ভারী মিষ্টি মেয়ে। পড়াশোনায় খুব ভাল, বিশেষত অঙ্কে তুখোড়। কিন্তু মিষ্টির ইদানীং মনে খুব কষ্ট। কেন? আসলে মিষ্টিদের স্কুলে সেলাইয়ের ক্লাসও হয় । আর এবছর ওদেরকে কুর্শিকাঁটার কাজ শেখানো হয়েছে। আর মিষ্টির দারুন লাগে কুর্শিকাঁটার কাজ। কিন্তু সেরম ভাল পারেনা, কিছুতেই বুঝতে পারেনা কিভাবে রাউন্ড,হাফ রাউন্ড করে। চেন, লং, হাফ লং পারে কিন্তু কিছু বানাতে পারেনা। সার্রকেলই না হলে আর কিকরে হবে? ওটাই তো বেস কুর্শিকাঁটার কাজে। ওর ক্লাসেরই রিমি দারুন পারে, কিন্তু মিষ্টি যদি জিজ্ঞেস করে মুখ বেঁকিয়ে বলে,” ও তুই পারবি না। “ মিষ্টি একদিন লুকিয়ে শুনেছে, রিমি বলছিলো, “হুঁহ্ পড়াশোনায় ভাল, অঙ্কে ভাল তাই তো কত কদর। করুক দেখি কুর্শি কাঁটা নিজে নিজে শিখে।” মিষ্টির মনে খুব দু:খ হয়েছিল, আচ্ছা রিমি যদি বলতো অঙ্ক বুঝবে ওর কাছে, ও কোনদিন না করতনা। কতদিন তো ওকে ক্লাসে বলেও দিয়েছে। কিন্তু…রিমি এমন ভাবে কেন? তবে ছোট হলেও মিষ্টি বোঝে, আসলে রিমি পড়াশোনায় অত ভাল না তাই ক্লাসে বকা খায় মাঝে মধ্যেই। কিন্তু সেলাইয়ে ওর মতন কেউ নয়, তাই হয়তো নিজের স্পেশালিটি টা শেয়ার করতে চায়না। মিষ্টির ইচ্ছে নেই ওকে টেক্কা দেবার বা কিছুর, আসলে ওর এমনিই কুর্শি কাঁটার কাজগুলো খুব ভাল লাগে। ঠিকাছে রিমি যদি না শেখায় ও নিজেই চেষ্টা করে শিখবে, কিন্তু কিছুতেই বাগে আসছে না, ধুরর। আজ শনিবার, কালকে ছুটি। রাত হয়েছে, বেশী রাত জাগলে মিষ্টির মা বকে। এমনিতে ও বেশী রাত করেনা কিন্তু আজ মা যাবার পরে উঠে বসলো মিষ্টি। ঘুমনোর ইচ্ছেটা নেই। ওর প্রিয় অঙ্কের বইটা খুলে বসলো। অঙ্কের বইয়ের শুধু অঙ্ক নয়, মুখবন্ধ, প্রশ্নমালার আগের লেখাগুলো পড়তেও ওর খুব ভাল লাগে। বিশেষত কে সি নাগের বইয়ের অঙ্কের ছকগুলো ওর খুব ভাল লাগে। ক্বলাস সেভেনের অঙ্ক বইটা রেখে দিয়ে যে বইটায় ঐকিক নিয়মের অঙ্কগুলো ছিল নীচু ক্লাসে, সেই বইটা নিয়ে বসে ও। প্রাণে ধরে কোন অঙ্ক বইই ফেলতে পারেনি মিষ্টি। এই ছক সমস্যা গুলো ওর ভীষণ ভাল লাগে। কেমন যেন মনে হয় জীবনের সব সমস্যাগুলোও ছক করা যায়। ঐ অঙ্কগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে কেমন একটা তন্দ্রামতন এল, আধো ঘুমে আধো জাগরনে মিষ্টি শুনলো একজন ব্যক্তিত্বময় স্নেহশীল মানুষ ডেকে বলছেন, —-আরে বোকা মেয়ে, অঙ্ক ভালবাসিস তোর ভয় কিসে রে? এমন কোন সমস্যা নেই যেটা অঙ্কে সল্ভ হয়না। সে জীবন হোক বা অঙ্কের খাতা। বড়জোর ভাগের শূন্য উপরে বা নীচে হবে, মানে শূন্য বা ইনফিনিটি। কিন্তু পথ পাবিই খুঁজে।তবে হ্যাঁ সমস্যাটা সল্ভ করার আগ্রহ থাকতে হবে এবং কিছুক্ষেত্রে বেসিক জানতে হবে। ধড়মড়িয়ে চোখ খোলে মিষ্টি, একজন মানুষ আবছা অবয়বে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সামনে, খুব চেনা মানুষটির মুখটা। কিন্তু কে ঠিক ঠাহর হলনা। মানুষটির সৌম্য হাসির দিকে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলে মিষ্টি, —-আচ্ছা, আমি তাহলে কুর্শিকাঁটায় সার্কেল কেন করতে পারিনা? কিরম হয় ব্যাঁকা নয় বেশীই সোজা হয়, গোল আর হয়না। “জিওমেট্রি, ইটস অল জিওমেট্রি।” এটা আবার কার গলা? হকচকিয়ে দেখে মিষ্টি, অবিশ্য এ ডায়লগ দিতে পারেন তো একজনই। সত্যি তো, এ যে মানিক রায়ের বইয়ের ডিট্টো ফেলু মিত্তির। সৌম্য লোকটির পরিচয়টিও বুঝেছে মিষ্টি এতক্ষনে, ইনি যে কেশব চন্দ্র নাগ। কিন্তু এ কিকরে সম্ভব? এনারা? মিষ্টির মনের কথা অনুমান করেই ফেলুদা বলে ওঠে যেন , , , “আরে আমরা দুজনেই মনে বাস করি তোর মিষ্টি, আর জীবনের পথে প্রবলেম সল্ভ করাই যে মোটো আমাদের।” “ঠিক বলেছেন, ফেলুবাবু, আপনি কল্পনা প্রসূত চরিত্রে আর আমি লিখেছি আমার অঙ্কের বইয়ে।” —একদম একদম কেশব বাবু, তা মিষ্টিরাণী যা বলছিলাম, সবই হল জিওমেট্রি। একটা ফুটকি, তাকে কেন্দ্র করে সার্কেল। তার বাইরে আরেকটা সার্কেল। —কিন্তু ঐ সার্কেলটাতেই তো গন্ডগোল। হয়না যে ঠিক করে। “কেন হয়না? “ কেশবববাবুর গলা, “আচ্ছা অঙ্কের পার্সপেকটিভে বল দেখি কখন সার্কেলটা ঠিক হয়না, কম্পাস দিয়ে আঁকিস যখন?” একটু ভেবে মিষ্টি বলে, “ধরো হাতটা নড়ে গেল বা একটু উঁচু নীচু হয়ে গেল।” “এক্স্যাক্টলি”, ফেলুদার গলা এবার, “এবার বল দেখি সার্কেলের ডেফিনেশন কি?” মিষ্টি:- ‘ঐ তো একটা বিন্দুকে কেন্দ্র করে যদি একটি বক্ররেখা থাকে যাতে যেকোন সময় ঐ বক্ররেখার উপরে কোন বিন্দু থেকে ঐ বিন্দুর দূরত্ব এক সেটাই হল বৃত্ত বা সার্কেল।’ ফেলুদা:- ‘একদম, একদম তোর সমস্যার সমাধান তবে এটাই, কুর্শি কাঁটায় যে তুই চেন বুনিস সেগুলোয় দূরত্বগুলো সবসময় মাঝের সেন্টারটা থেকে সেম হবে। মানে চেনগুলো গুনবি ঠিক করে তাহলেই হবে। আর । ব্যসার্ধসংখ্যা যত বাড়বে পরিধিও তত বাড়বে। কারন টু পাই আর সূত্রটা খাটতে হবে। ‘ কেশববাবু:-‘ তাহলে দাঁড়ালো গিয়ে ব্যাপারটা কিরম বল দেখি? সমস্যাছকটা দেখে নে চট করে, সমস্যাছক ====================== শুরুর চেন পরবর্তী গোলের পরিধির চেনসংখ্যা ২ ২ গুন পাই r( এবার তুই কত বড় গোলটা করবি তার উপর r হবে নির্ধারিত) এবার নিজের মতন করে শুরুর চেন সাজিয়ে নে। ‘ কিরে মিষ্টি, ফেলুদার গলা, “প্র্যাকটিশ, প্র্যাকটিশ তাহলেই দেখবি সমস্যাছকে আলো পড়ছে আর তারপরেই ঝলমলিয়ে উঠবে সমাধান, জিওমেট্রি ইটস অল জিওমেট্রি। বেসিকটাতো তুই জানিস তাই না?” —-হ্যাঁ ফেলুদা একদম জলের মত সোজা। ——ব্যাস, তাহলে লেগে পড়। —-সত্যি তো আমি এভাবে কেন ভাবিনি? একগাল হেসে নেন কেসি নাগ,” তাইজন্যই তো একটু নাড়া দিয়ে গেলাম রে তোর বুদ্ধির গোড়ায়। ছকটা বুঝে গেলে সবকিছু হয়ে যাবে।” —ঠিক ঠিক, সুতোর টান আর বুনোটটা একটু শিখে নিতে হবে পোক্ত করে। বেসিক তো জানি। কেশববাবু, “ব্যাস তাহলে আর কি? হয়েই তো গেল। সব জটিল অঙ্কই যোগ, বিয়োগ, গুন আর ভাগ। “ ফেলুদার গলা, “জীবনটাও তাই রে। “ মিষ্টি এবার লাফ মেরে বলে, “বুঝেছি বুঝেছি। সব বুঝেছি , তোমাদের অনেক থেঙ্কু গো। এবার আমি কুর্শি কাঁটায় সার্কেল করেই ছাড়ব আর ওটা হলেই সব পারব।” “বেশ, বেশ তাহলে আসি আমরা। একটা ছোট্ট গিফ্ট রেখে যাচ্ছি তোর জন্য মিষ্টি, এখন এটার মানে বুঝবিনা, কিন্তু জীবনের পথে বুঝবি।আসি রে। ঘুমো তুই।” ——মিষ্টি এই মিষ্টি, রবিবার বলে এতক্ষন ঘুমোবি? কি রে? ধড়মড় করে উঠে বসে মিষ্টি, ধুরর কত্ত বেলা হল। জাঙ্গল বুকটা মিস হয়ে গেল ধ্যাত। আচ্ছা কাল রাতে কি ছিল ওটা? স্বপ্ন ? আর সত্যিই আজ ভিতর থেকে মনে হচ্ছে কুর্শি কাঁটায় বোনার মতন ইজি কিছু নেই। জাস্ট ছকটা বোঝাই মেইন। আজকেই বানাতে হবে সার্কেল। দুপুরেই বানাবে। লাফাতে লাফাতে মুখ ধুতে এগোয় মিষ্টি, মার গজগজকে তোয়াক্কা না করে একটা হামি খেয়ে নেয় মার গলায়। আদুরে হুলো সাহেববাবুকে কোলে নিয়ে বলে, সাহেবু আজকে খেলব চ তোর সাথে। সাহেবু তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হাই তুলে বলে, মিউ ম্যাও। তখনই মিষ্টির চোখে পড়ে সাহেবুর গলার বকলেসটায় একটা চিরকুটের মতন কি ঝুলছে, তুলে নেয় মিষ্টি, কাগজটায় সোনালী কালিতে লেখা ছিল, “কুর্শি কাঁটারা উলে স্বপ্ন বুনে চলে, পশমের ওম তখন স্বপ্ন বুনন অঙ্কের হিসেব কষা যোগ বিয়োগ বা ইন্টিগ্রেশন, সবটাই ঘর গোনা, সুতোপ্যাঁচ আলগা তখন।।”
