ছোটোগল্প

মাধবীলতা

                                                        সুতপন চট্টোপাধ্যায়

[এক]

  

  শনিবার সন্ধ্যেবেলা মল্লিকার  ভিডিও কলটি ভেসে উঠতো ইন্দিরার স্মার্ট ফোনে।  ইন্দিরার  সঙ্গে এক ঝলক কথা বলে মল্লিকা এ্যড করত রিক ও রুপকে । তিন সন্তানকে এক পর্দায়  দেখে খুশীতে ঝলমল করে উঠত ইন্দিরার মুখ । মাঝেমাঝে উঁকি দিত রুপের বউ, মল্লিকার মেয়ে। তাদের সঙ্গেও সময় কাটাতেন ইন্দিরা ।  গল্প গুজবের পর্ব  শেষ হলে ইন্দিরা  খবর নিতেন কার বাড়িতে কি কি রান্না হয়েছে আজ। এটাই তার শেষ  এনঙ্কোয়ারি । অবশেষে টা টা । এভাবেই চলছিল এই শতাব্দীর দক্ষিন  কলকাতার  প্রান্তনিবাসি  মিত্র পরিবার।

গায়ে জ্বর , মাথা ব্যাথা, মাঝে মাঝে ঝিমুনি ভাব, এই সব উপসর্গ  তিন দিন ধরে  ব্যতিব্যস্ত্  করছিল ইন্দিরাকে।  বুঝতে পারছিলেন ভিতরের কল কব্জা  ঠিক ঠাক কথা বলছে না। তো সহজে ভেঙ্গে পরার মানুষ নন তাই তোয়াক্কা না করে সবকিছু করে যচ্ছিলেন। একদিন হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গেলেন ইন্দিরা । জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন কিচুক্ষন। আর দেরি করেন নি তারপর , পাড়ার বুবু তাকে নিয়ে এল  সোজা নারসিং হোমে। নিয়মিত পরীক্ষা করতে করতে কেটে  গেল দু দিন।  দিনসাতেক কেবিনের  অনিয়ন্ত্রিত ঠাণ্ডায়  তার বুকে স্লেশ্যা জমে ধীরে ধীরে কাশি এবং স্বাস কষ্ট  যখন বাড়ল , তখন তাকে আইসিউ তে ঢুকিয়ে দেয়া হল। তখন আর ইন্দিরার কাছে যাবার উপায় নেই। । সংক্রমণ যেমন নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল, মেডিক্লেমের  উপর তার থাবা  পরছিল তেমনি জোরাল। একদিন মেডিক্লেমের লিমিট টপকে গেল সংক্রমন। এবার ক্ষেপে ক্ষেপে টাকা জমা দেওযার পালা । সামাল দিচ্ছিল্ মেয়ে মল্লিকা। সে হলদিয়ায় থাকে,ইন্দিরার খবর পেয়ে চলে এসেছিল ।  রুপ থাকে দিল্লি তে। ছোট ছেলে  রিক বছর খানেক  হল স্কলারশিপ নিয়ে  জার্মানিতে।

[দুই]

যত দিন কেবিনে ছিলেন, মল্লিকা সকাল বিকাল খাবার নিয়ে দেখতে আসতো রোজ । খুব কাছে যেত না মল্লিকা। সেটা একদিন বুঝতে পেরে ইন্দিরা বলতেন  কিচ্ছু হবে না , কাছে  আয়। দূর থেকে গল্প করতে  ভাল লাগে না। এই ত দেখ, দুপুরে স্বপ্ন  দেখলাম। আমার  ফ্লাটের  বারান্দার মাধবীলতা ।  ফুলে ছেয়ে গেছে। তার লাল সাদা থোকা থোকা ফুল থেকে নাকে আসছিল মিষ্টি  গন্ধ। কত দিন হলে আমাকে কাছে পায় না আমার মাধবীলতা। মল্লিকা বলল,  তুমি এবার  বারান্দায় সব্জি ফলাও, বাজার থেকে কিনতে হবে না। টাটকা সবজি রান্না করতে পারবে। মন্দিরা বলেছিল, তোরা থাকিস না। তোরা না খেলে আমার ভাল লাগে না। তার চেয়ে ফুল ভাল, নিজে নিজে উপভগ করা যায়।মাধবীলতা আমাকে খুব মিস করে।  তোকে আর বেশি দিন সংসার ছেড়ে থাকতে হবে না। আমি খুব তাড়া তাড়া  বাড়ি ফিরে যাব। ডাক্তার কি বলছে রে ?  সত্যি করে বল তো?

মল্লিকা বানিয়ে বলে,চিন্তা করো না। তাড়াতাড়ি  ছেড়ে দেবে। এই তো কদিন আগের কথা। তার পরেই শ্বাসকষ্ট । ডাক্তার সেন আর দেরি করেন নি। আই সি উ তে ভরতি করে দিয়েছিলেন। এর পর কেবলি তিন  দিন অন্তর নোটের তাড়া । বিকালে দিকে ডাকতো আর বলে দিত, কাল পাঁচ  হাজার জমা দিতে হবে। এভাবে চলতে চলতে আজ সকালের একেবারেই  এই দুঃসংবাদ।  কাল রাতে গভীর ঘুমের মধ্যে ইন্দিরা চলে গেছেন।  কখন গেছেন  কেউ জানে না।

[তিন]

ইন্দিরার  কারও কথা শোনার খুব একটা অভাস ছিল না। নিজে যেটা ভাবতেন সেটাই করতে কোন অন্যথা হত না। এই  প্রবনতা বেড়ে  গেছিল হেমাঙ্গ মারা যাবার পর। রুপ বলেছিল, এক একা ফ্ল্যাটে  থাকা ঠিক নয় মা,কতো  লোক নানান ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়। তুমি এক থাকবে এটা জানা জানি হবেই। কি দরকার ? আমার সঙ্গে চল দিল্লিতে। ইন্দিরা  বলেছিলেন,আমি  হলদিয়াতেও  মাল্লিকার কাছে থাকতে পারি। রিক বলেছিল, তাহলে তাই কর। যখন যেখানে থাকতে ইচ্ছে হবে, সেখানে  থাকবে। আমরা কিছুটা নিশ্চিন্ত  হব। ইন্দিরা তাতে হেসেছিলেন। বলেছিলেন, না বাবা , কোথাও যাব না। আমার বারান্দায় মাধবীলতাকে কে দেখবে?। এই নিয়ে  ছেলেমেয়ের সঙ্গে ইন্দিরের অনেক মনমালিন্য  হয়েছে।  ইন্দিরা কিছুতেই বুঝতে পারে না, ইচ্ছে করলেই  সংসার ফেলে সব সময় চলে আসা যায় না। না রুপের না মল্লিকার।

নারসিং হোমের রিসেপ্সানে  বসে একা একা  ভাবছিল মল্লিকা।  রুপ আসবে দিল্লি থেকে, ডেথ সার্টিফিকেট লিখবে ডাক্তার।  বিল মেটাতে হবে তার পর ইন্দিরার মুক্তি এই হাসপাতালের  ঘেরা টোপ থেকে। কথা শুনলে এত বড় ঘটনাটা হত না। বাসব এপার্টমেন্টের  দোতলায় প্রতিদিন আশেপাশের ফ্ল্যাটের  সমবয়েশি মহিলাদের আড্ডা  হত। তার মধ্যমনি ইন্দিরা ।ইন্দিরা প্রথম দিকে মুখে মাস্ক পরত না। রিক এর বাকুনি খেয়ে সে তা পড়া শুরু করল। এই আড্ডায মিসেস রায় একদিন ট্রেন এ ভুবনেশ্বর  থেকে ফিরে জমিয়ে তিন ঘণ্টা  কাটিয়ে গেলেন। আর ঠিক তার পরেই ইন্দিরার উপসর্গ । প্রথম মিসেস রায় জানান নি। পরে জানা জায় তাকে ইন্দিরার আগেই হাসপাতালে  ভরতি করা হয়েছে। মিসেস রয়  সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন । ইন্দিরারার আর ফেরা হল না। মাথার ভিতর সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে মল্লিকার। ইন্দিরার তো কোন কঠিন অসুখ ছিল না। সুগার বাড়ত মাঝে মাঝে , নিজেই সামলে নিতেন। তাহলে? কেন এমন হল? উপসর্গের পরও তিন দিন অপেক্ষা করাই কি কাল হল? কিন্তু ইন্দিরা ত কভিড নেগেটিভ ।

বেলা দুটো হয়ে গেল এখনও ডিসচার্জ করার কোন হেলদোল  নেই। রুপের জন্য বসে আছে।  সে দুপুরের ফ্লাইটে আসছে। এত দিনের এই পরিশ্রম, উৎকণ্ঠা , অর্থের  চিন্তা সব যেন থমে গেছে একটি পয়েন্টে । ইন্দিরা শুয়ে আছে হাসপাতালের  কোন এক ঠাণ্ডা  ঘরে, শীতলতম কোন অলৌকিক জগতে ।  এর পর করার কি আছে? কোন কিছুই মাথায় আসছে না। চোখের কোলটা  দপ দপ করে চলেছে।

  [চার]

ক্যাশ কাউনটারের  ভিতর থেকে ফণা তুলে একটা  সাপের মত লম্বা বিল বেরিয়ে এল মল্লিকার হাতে। রুপ বলল, দেখ কত হয়েছে? মল্লিকা বিলটির আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে বলল,  তিন  লাখ। রুপ বলল, তিন লাখ ত মেডিক্লেম  ছিল।

মল্লিকা বলল, সে ত কবে শেষ। সেটা  বাদে। দাঁড়া আমি বিলটা ভাল ভাবে দেখি। বলে চোখের সামনে দেখতে দেখতেই তার মাথা গরম হতে লাগল।  ঘাম ফুটে উঠল কপালে। তার পর এক লাফে কাউনটারের  উপর ঝাপিয়ে পরে চিৎকার করে উঠল, কে এই বিল বানিয়েছে তাকে ডাকুন।

ভিতর থেকে একজন ষণ্ডা মার্কা  যুবক এগিয়ে এসে খুব শান্ত গলায় বলল, কি হয়েছে ম্যদাম , আমাকে বলুন আমি আপনাকে কি ভাবে হেল্প করতে পারি?

মল্লিকা তার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কে? ছেলেটি বলল, বলুন না যদি  হেল্প করতে পারি।

মল্লিকা বলল, প্রথম, আমার মা ডাক্তার সেনের  আন্ডারে  ভর্তি  ছিলেন, ডাক্তার মণ্ডলের  ভিসিটিং  ফীজ লাস্ট  বারো দিন সকাল বিকাল আমার বিলে চার্জ করেছেন। কেন ?

ছেলেটি যেন আকাশ থেকে পড়ল। তাই নাকি? দেখি, দেখিতো বলে বিলটি মল্লিকার হাত থেকে নিয়ে গেলে মল্লিকা তার হাত থামিয়ে দিয়ে বলল, দাঁড়ান।

দেখি না ম্যাদাম। বলে ছেলেটি বিলটি আবার নিতে গেলে মল্লিকা গম্ভির গলায় বলল, আরও বাকি আছে।  চার   বোতল প্লাজমার  দাম চার্জ করা হয়েছে । মার তো কোন অপারেশন হয় নি। প্লাজমা লাগেছে কেউ তো বলেনি?। কে করেছে এন্ট্রি  তাকে ডাকুন । আমি কথা বলতে চাই। মল্লিকার এমনি রাগ রুপ আগে কোনদিন দেখে নি। মল্লিকার উঁচু গলায় দু চার জন আসে পাশে জড়ো হযেছে এর মধ্যে।

একটু পরে একটি নার্স  এসে দাঁড়াল মল্লিকার সামনে। মল্লিকা জিজ্জেশ করল,  কে প্লাজমা  এন্ট্রি করেছে।? আপনি? মেয়েটি বলল না, আমার সিনিযার, উনি আজ আসেননি। ছুটীতে।

মল্লিকা বলল, ফোন করুন।

মল্লিকা এবার  ছেলেটি কে জিজ্জেশ করল, ডাক্তার সেন  গত সপ্তাহে চারদিন  কনফারেন্স এ বাইরে গেছিলেন সে টা জানেন? ছেলেটি বলল,  হাঁ,  চার দিন ছিলেন না। মল্লিকা বিলটি সামনে ধরে বলল, তাহলে তার চার দিন ভিজিট সকাল সন্ধ্যে চার্জ হল কি করে? ছেলেটি  বিলটি প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল, দাঁড়ান মাদাম, আমি বিল ঠিক করিয়ে দিচ্ছি। বলেই একটা হাঁক দিল, দিবাকর, ম্যাদাম যে ভুলগুলো বলছেন,  সে গুলো চেক করে বিল রিভাইজ কর। বিলে যেন গণ্ডোগোল না থাকে। বললেই ভদ্র শান্ত গলায় বলল, বসুন ম্যাদাম, একটু  সময় লাগবে। হয়ে যাবে। একটু  ওয়েট করতে অনুরোধ করব। ভুল তো মানুষ মাত্রেই হয়।  

রুপ বলল, আর কোন এবনরম্যাল  এন্ট্রি দেখলি?

 মল্লিকা বলল, বাকি তো  সবই ওদের ইন্টারন্যাল  এন্ট্রি। কি ওষুধ দিয়েছে, কি মেপেছে, কি ইঞ্জেকশান দিয়েছে দেখতে গেছি? জানি না তো । খুব অসহায় লাগছে রে। মা বেঁছে থাকলে অন্তত জিজ্ঞেশ করতে পারতাম। রুপ মাথা নাড়ল । তারপর বলল, তুই  প্রতিবাদ না করলে তো কিছুই জানা যেত না। তাহলে প্রতিদিন কী হয় বুঝতে পারেছিস?

মল্লিকা বলল, কেউ প্রতিবাদ করে না। কখন করবে? এই সময়  প্রিয়জনের কে হাসপাতাল  থেকে ছাড়াবে না বিল দেখবে? ওরাও খুব চালাক, ঠিক এই সময়ে বিলটা ধরিয়ে দেয়। যাতে দেখার সময় না পেয়ে পুর বিল পেমেন্ট হয়ে যায়।

রুপ বলল, হুম, তবু ওই ছেলেটা ছিল্‌ বলে ……।  

 না রে, তুই বুঝলি না? ওকে রেখেছে, সিচুয়েসান খারাপ  হলে ভদ্র ভাবে ম্যনেজ  করার জন্য। আমার মনে হয় ইচ্ছে করে প্লান্টটেড ।

[পাঁচ]

হাসপাতাল থেকে শ্মশান  ভিডিও করল মল্লিকা।   

 ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গাঢ় অন্ধ্কার। বাসব  আবাসনে আগেই খবর পৌছে গেছে তাই বারান্দায় বারান্দায় উকি ঝুকি মানুষের মুখ। কার মুখে কোন কথা নেই। সামনের  চত্তর পেরতে পেরতে মল্লিকা একবার উপরের দিকে তাকাল। সবই চেনে মুখ,  আজ যেন অচেনা এক বৃত্তের  মধ্যে গোটা আবাসনটি  নীরব দর্শক। । হঠাৎ তিন তলার সেনমাসি জিজ্জেশ করল, কবে জানতে পারলে পসিটিভ ?

মল্লিকা হাত নেড়ে বলল, কভিড নয়। কথাটা  বিশ্বাস করল বলে মনে হল না মল্লিকার। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আবাসনের একটি দরজারও খোলার শব্দ  পেল না সে। অন্যদিন মল্লিকা এসে মায়ের দরজায় দাঁড়ালে ইন্দিরা দরজা খুলে বলতেন, আসবি,জানাস নি কেন?  আজ শুধু ভিতরে জমাট অন্ধ্কার। আস্তে  বাড়িতে ধুকলো  মল্লিকা অর রুপ।  

 স্নান করে সোফায় বসল দুজনে। আর ঠিক সেই সময় ভিডিও কলটি ভেসে উঠল মল্লিকার মোবাইলে। রিক জার্মানি  থেকে ধরা ধরা গলায় বলল, কিছুই করা  গেল না দিদি?

না রে।

মার মুখটা খুব সরল লাগছে ভিডিও তে । যেন মনে হচ্ছে আমার করা চায়ের জন্য  ইচ্ছে করে শুয়ে আছে সকালে। যেমন যা রোজ করত। চা আমার হাতের চাই, বাকি সব মায়ের। তোরা কখন এলি?

মল্লিকা বলল, এই এলাম, স্নান করে বসেছি। তোর ফোন।

রিক বলল, দিদি, মাধবীলতাকে ভিডিও তা একবার দেখা। মায়ের খুব আদরের মাধবীলতা। মেয়ের মত খুব ভালবাসত ।

রুপ বলল, সে আবার কি?

মল্লিকা বলল, রিকই মায়ের কাছে থাকতো । ওই মাকে আমাদের থেকে অনেক কাছ থেকে জানে।বলছে যখন ………

রিক আবার বলল, মাধবীলতার সামনে একবার ভিডিওটা চালা দিদি, মাধবীলতাও একবার মায়ের চলে যাওযাটা দেখুক। মা খুশি হবে।

মল্লিকার মাথায় আসে নি কথাটা।  বারান্দায় এসে দেখল  সারা বারান্দার গ্রিলভরা মাধবীলতা। জল পায়নি অনেক দিন। পাতাঝরা শরীরে জড়িয়ে আছে গ্রিল। বিমর্শ  চেহারায় রুগ্ন দৃষ্টিতে  তাকিয়ে আছে তার  দিকে। মল্লিকা ভিডিওটি চালিয়ে দিল মাধবীলাতার দিকে ।একবার – দুবার –  তিনবার। তারপর ফুঁফিয়ে উঠল । রুপ বাইরে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে বলল, কি  হয়েছে রে?

মল্লিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বলল, এতো বার দেখালাম, কোন কথা বলছে না মাধবীলতা। কোন কথা বলছে না, বলতে বলতে  কান্নায় ভেঙ্গে পরল সে।

***সমাপ্ত***