ছোটোগল্প

  টেনিয়া

  সম্বিতা দত্ত

আমার নাম ভুদো । ক্লাস সেভেনে পড়ি । গরমের ছুটিতে মামার বাড়ি শিমূলতলাতে এসেছি।এই সময় বেশ অনেক দিন ধরেই স্কুল ছুটি থাকে।আমার মামাবাড়িতে দাদু ,দিদুন আর ছোটো মামা থাকে।লোকে বলে তিনি এক জন মস্ত বিজ্ঞানী।কতটা সত্যি তা জানি না। আর বড় মামা আজ দশ বছর হল আমেরিকায় থাকেন। ছোটো মামার একটা ল্যাবরেটরি আছে।তার নাম ল্যাব ঘর।তাতে কত রকমের যে গাছ গাছরা,শিকড়  বাকড় ,ছোট ছোট প্রাণী আর কত রকমের তরল পদার্থ আছে তার ঠিক  নেই।আমি এসবের এতটা বুঝি না।মামা আমাকে ওই ঘরে ঢুকতে দেয়না ।তাই আমিও নিজের ইচ্ছে টা পুরণ  করতে পারি না।আমার খুব ইচ্ছে যে ওই ঘরটায় আমি যাই। গিয়ে দেখি কি আছে ঐ ঘরে।মামা ওই ঘরের দরজা বন্ধ করে কাজ করে।আবার কাজ হয়ে গেলে দরজাতে তালা দিয়ে দেয়।মামা ঢোকা বেরোনোর ফাকে আমি উকি মেরে দেখার চেষ্টা করি মাঝে মাঝে। কখোনো যদি ফাক পেয়ে ও ঘরে ঢুকতে যাই মামা কড়া গলায় বলে,”এটা কাজের ঘর এখানে ঢুকবি না।বাচ্চাদের এসবে হাত দিতে নেই বুঝলি?কত রকমের অ্যাসিড আছে  এই ঘরে জানিস?”আমি মুখ কাচু মাচু করে মাথা নিচু করে চলে যাই। ওরা কেউ বোঝে না যে আমি আর ছোট নেই। কিন্তু কি করি ? বড়দের বোঝানো খুব মুসকিল।একদিন সেই সুযোগ হয়ে গেল।মামা ল্যাবরেটরি থেকে উস্ক খুস্ক চুল নিয়ে বেরিয়ে এসে বলল,”ভুদো আমার বন্ধু ফণিরামের বাড়িতে গৃহ প্রবেশের নেমন্তন্ন আছে,তুই কিন্তু বাড়িতে একা থাকবি।সাবধানে থাকবি বুঝলি। তোর মায়ের সাথে থাকবি। বাগানে ঘোরা ফেরা করবি না। আর তোকে একটা কাজ করতে হবে দুপুরবেলা ছাদে রাখা আঁচার গুলো পাহারা দিতে হবে।তার ফাকে দেখিস এদিক ওদিক পালাস না যেন। আজ আমি দুপুরবেলা পাহাড়া দিতে পারব না।আর তোকে  যদি ল্যাব ঘরের আসে পাশে ঘোরা ফেরা করতে দেখি তাহলে কিন্তু  এক সপ্তাহ তেঁতুলের আঁচার বন্ধ । বুঝলি?”

আমি মামার কথায় সুবোধ বালকের মতো মাথা নেড়ে  সম্মতি জানালাম।মামা ছাতা মাথায় দুপুর রোদে বেড়িয়ে গেল। দুপুর বেলায় খেয়ে দেয়ে দিদুন আঁচার আর শুকনো লঙ্কা রোদে দিয়ে সবে মনে হয় গোয়াল ঘরে গেছে।দাদুও পাড়ার বুড়োদের সাথে বাজারে আড্ডা দিতে গেছে। দাদুর দু বেলা আড্ডায় না গেলে মন ভরে না। মা ও ঘুমিয়ে পড়েছে।তা যাই হোক এই বড় সুযোগ। চুরি করে আমের আঁচার , তেঁতুলের আঁচার এগুলোর এক চামচ এক চামচ করে খেয়ে নি যাই।কিন্তু মামা নেই বাড়ি ।এই ফাঁকে একবার যদি ল্যাব ঘরে কি আছে দেখা যায় খুব ভালো হয়। এমন সুবর্ণ সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।এসব ভেবে চুপি চুপি চলে এলাম ছাদে। আঁচারের সাদা বয়ানের ঢাকনা খুলে টুক করে হাত ঢুকিয়ে আঁচার খেতে শুরু করলাম।ইয়াম ইয়াম কি দারুন খেতে।  কিন্তু হঠাৎ কি যেন ঢক ঢক আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? ছাদ থেকে উকি মেরে দেখলাম নিচে ল্যাব ঘরের দিকের জানালাটা যেন নড়ছে।বেশ কিছুক্ষন আঙুলে লেগে থাকা আঁচার চাটতে চাটতে বেশ ভালো করে দেখলাম কেউ একজন আছে ল্যাব ঘরের ভেতর। যে ঐ জানালাটা নাড়ছে। ক্যা ক্যা করে দুটো কাক উড়ে পালাল মাথার উপর দিয়ে। কাক দুটোকে একবার আড় চোখে দেখে  আর দেড়ি না করে ছাদ থেকে নেমে গেলাম চটপট।উঠোনের পাশে গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখি দিদুন খুদের  ভাত বানাচ্ছে লক্ষ্মীর জন্য। ও তোমাদের তো বলা হয়নি লক্ষ্মী কে? লক্ষ্মী হল দিদুনের গোরুর নাম।আমাকে দেখে দিদুন বলল, “ কি রে ভুদো? তুই ঘুমোসনি? তোর মা তো কখন খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দুপুরে একটু শুয়ে নে বাবা। স্কুল খুললে তো আবার  দুপুরে ঘুম হবে না।”

 হেসে বললাম,“ হ্যা দিদুন এই দিকে একটু ঘুরতে এসেছিলাম। কাল তুমি বলছিলে না বাগানের আম , কলা চুরি হয়ে যাচ্ছে। তাই দেখতে এসেছিলাম বাঁদর টাদর এদিকে এল কিনা?”

দিদুন বলল, “ তা কিছু দেখলি বাগানে ? “

“না কিছু দেখলাম না। তাই এই যাচ্ছি শুতে।”

দিদুন বলল, “ যা বাবা যা শো গে যা। শুতে যাওয়ার আগে আঁচারের শিশি গুলো আলমারিতে রেখে দিস।আচ্ছা আরো একটা কথা ছিল। তোর মা সিমলা থেকে একটা সান হেলাস এনেছিল খুঁজে পাচ্ছি না। তুই একটু দেখিস তো পাস কি না? কোথায় যে গেল জিনিসটা সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না । ছাদের আঁচার গুলোও দিন দিন কমে যাচ্ছে । কোথা থেকে যে চোরের উপদ্রব হচ্ছে কে জানে।“

“হুম, ঠিক আছে খুঁজে দেখব ওটা।আর ওটা সান হেলাস নয়। ওটা সানগ্লাস ।”

“ ওই সব একই হল।”

আমি আমি একটু হেসে চলে এলাম।মায়ের ঘরে একবার উকি মেরে দেখলাম মা ঘুমোচ্ছে  ।গুটি গুটি পায়ে চলে এলাম ল্যাব ঘরের সামনে । কিন্তু তাতে রয়েছে তালা দেওয়া। ল্যাব ঘরের মধ্যে থেকে  খট খট আওয়াজটা এবার আরো জোরে শোনা যাচ্ছে । তালাটা ধরে বেশ ভালো করে দেখলাম।তারপর চোখ চলে গেল ডান দিকের দেওয়ালে । সেখানে রাধা কৃষ্ণের ক্যালেন্ডার ঝোলানো ছিল সেখানেই ঝোলানো ছিল একটা চাবির গোছা। মনে হচ্ছে এটাতেই  এই ঘরের চাবি আছে। এই ভেবে আমি দেওয়ালের পাশে থাকা একটা টুল নিয়ে চাবিটা পারলাম। তারপর একটার পর একটা চাবি ট্রাই করতে লাগলাম। দুটো চাবি ট্রাই করার পর একটা চাবি দিয়ে খুঁট করে আওয়াজ করে তালাটা খুলে গেল। দরজাটা সামান্য খুলে দেখলাম ঘরের ভেতর থেকে যে আওয়াজটা আসছিল সেটা থেমে গেল।  গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকলাম। কোথা থেকে শব্দটা আসছিল তা খোঁজার জন্য আরো ভেতরে গেলাম।সুইচ বোর্ডের আলো জ্বালাতেই দেখলাম টেবিলের উপর থরে থরে রাখা টেস্ট টিউব, কাচের বোতল, বুনসেন্ট বার্নার। কিছু কিছু বোতলে রাখা অদ্ভুত সব প্রানীর মৃত দেহ। তার মধ্যে সাপ, ব্যাঙ ,গাছ গাছরা। 

 কত রকমের ছোট বড় নাম না জানা গাছ।একটা মৌমাছি হুট করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভন ভন আওয়াজ করতে লাগল।ভয় পেয়ে গেলাম।এক লাফ দিলাম।  একটা চেয়ারের উপর দাড়িয়ে পড়লাম।চোখ চলে গেল ঘরটার জানালার  দিকে । আরে একটা বাঁদর । হ্যা একটা জ্যান্ত বাঁদর তার দাঁত কপাটি বার করে কিচ কিচ করে হাসছে। ওরে মা গো…. বলে চেয়ার উল্টে পড়লাম । আ….. যা লাগল পায়ে। তবু  আমি উঠে দাঁড়ালাম।  বাঁদরটা আবার ই… হি…. ই… হি করে হাসতে লাগল। হেবি দুষ্টু তো।আমি পড়ে গেছি বলে বেশ মজা পেয়েছে বাঁদরটা ।মনে পড়ে গেল  বাঁদরের বাদরামোর একটা ঘটনা।গত পূজোর ছুটিতে সিমলা , কুলু, মানালি ঘুরতে গেছিলাম।তখন সিমলার কালী বাড়িতে ঘটেছিল এক মারাত্মক ঘটনা।মন্দিরের বাইরে অনেক গুলো বাঁদর ঘোরাফেরা করছে। কেউ কেউ রেলিংএ বসে বসে ল্যাজ ন্যাড়ছে। কেউ বাচ্চা কোলে ঘুরছে। কেউ কেউ আবার একে অপরের গায়ের পোকা বাঁচছে। মা মন্দিরের ভেতরে রয়েছে। মন্দিরের ছাদ থেকে সুন্দর পাহাড়ের দৃশ্য দেখছি। বাবা আমার একটা ছবি তুলে দিয়ে এদিক ওদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তুলছে। এমন সময় আমিও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে পড়লাম । রেলিংএ হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে পাহাড় দেখছি। হঠাৎ আমার হাত অজান্তেই একটা বাঁদরের বাচ্চার গায়ে পড়তেই তার মা মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল আমার দিকে। এই বুঝি আমাকে কামড়ে দেবে। আমি পালালাম। দৌড়তে দৌড়াতে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে বেঁচে গেলাম। না হলে ওই বাঁদর আমাকে কামড়ে দিত সেদিন।আর তারপর যে কত ইনজেকশন আমাকে দিতে হত কে জানে? সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। এই সব শুনে আর দেখে সবাই পরে খুব হাসাহাসি করল। তারপর থেকেই বাঁদর দেখলেই আমার পেটের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। যাই হোক এই বাঁদরটা বেদানা খাচ্ছিল। আমাকে দেখে  ও বেদানার ছিঁবড়ে গুলো  থু করে ছিটিয়ে দিল আমার মুখে।হি হি করে  দাঁত কপাটি বার করে হাসতে লাগল। দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা। বাঁদরের সাথে যে আমার কেন এত শত্রুতা তা ভগবানই জানে।কিন্তু ওকে এখানে কে এনেছে? নিশ্চিত এটা ছোটো মামার কাজ। এটাকে কোথায় পেলো ছোটমামা? কে জানে? দিদুন জানলে এক কান্ড হবে। দিদুন গোরু ছাড়া অন্য কোনো জন্তু পছন্দ করে না।  এবার বুঝেছি এই কারনে এই ল্যাব ঘরের দরজা তালা দিয়ে রাখে মামা।  হাত দিয়ে মুখটা পরিষ্কার করে এক পা এক পা করে ওর খুব কাছে গেলাম। দেখলাম ওর পায়ে একটা দড়ি বাঁধা । দেখে একটু অবাক হলাম। পায়ে বেশ দাগ পড়ে গেছে এটা দেখে খুব খারাপ লাগল। বাঁদরটা কে জব্দ করার ব্যাপারটা মন থেকে কেমন মুছে গেল। আমি বললাম, “কি রে? কি হয়েছে? এখানে এলি কি করে? কে এনেছে তোকে? তুই তাহলে এতক্ষন এখানে আওয়াজ করছিলি আর জানালা খোলার চেষ্টা করছিলি।”সে হুপ হুপ করে দু চারটে আওয়াজ করল। আর লাফাতে লাগল। আমি ওকে বললাম “ শোন চিন্তা করিস না। আমি তোকে খুলে দেব। তুই চলে যাস তোর বাড়ি। কেউ জানতে পারবে না। “ সে দেখলাম খানিকটা উদাস ভাবে কিছুক্ষন তাকাল আমার দিকে ।কিছু বুঝল কি না জানি না তবে সে লাফানো বন্ধ করে চুপটি করে বসল । আমি যেই ওর পায়ের বাধন খুলে দিলাম ও এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে হুপ হুপ করতে করতে পালিয়ে গেল ছাদে। এমন সময় ছোটো মামা কখন জানি সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। চিৎকার করে বলে উঠল ,”কি রে টেনিয়াকে ছেঁড়ে দিলি? “

আমি ঢোক গিলে বললাম , “ কে টেনিয়া?”

“ কে আবার ? টিং টিঙে টেনিয়া ওই রোগা ছোট্ট বাচ্চা বাঁদরটা ।  আমি ওর নাম দিয়েছি টেনিয়া।”

“আমি ভাবলাম….” কথা শেষ হল না ছোট মামা মাথায় হাত দিয়ে বলল , “ এটা তুই কি করলি? কত কষ্ট করে একটা পোষ্য জোগার করেছিলাম। ওকে পুষবো ভাবলাম। তুই সব ম্যাসাকার করে দিলি.”

আমি ব্যাপারটা ঘোরানোর জন্য বললাম ,”বাঁদরটা ছাদে গেল ছোটো মামা কি হবে বলত? “

ছোটো মামা চোখ উল্টিয়ে বলল, “ ও বাঁদর নয়। ও টেনিয়া। এখন চল চল … তাড়াতাড়ি ছাদে চল। না হলে ও সব আঁচার খেয়ে শেষ করবে।”

“ মানে? ওই তাহলে দিদুনের আঁচার চোর?”

“ তুই বেশি বকিস না । ও আঁচার হেবি ভালোবাসে তাই লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে এনে দিতাম। আর বলিস না ওকে লাট্টু পাহাড়ে পেয়েছিলাম এক মাস আগে ।কে একটা খুব বাজে ভাবে আহত করে ফেলে রেখে গেছিল।বড্ড মায়া হল। নিয়ে আসলাম। দেখেছিস তো ওর পায়ে কেমন ব্যাথা? এখোনো সারেনি।”

মামাকে মনে হচ্ছে সামলাতে পেরেছি। এই ভেবে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বললাম, “ হ্যা চল তাড়াতাড়ি ছাদে। দিদুন দেখলে আর রক্ষে নেই।”

আমরা ছাদে গিয়ে দেখলাম টেনিয়া দিব্য দিদুনের আঁচারের একটা বয়ান খুলে আঁচার খাচ্ছে। হঠাৎ দিদুনের চিৎকার এল নিচ থেকে আমার নাম ধরে ডাকছে , “এই ভূদো কই রে তুই?তুই কি ঘুমাচ্ছিস? আমার আঁচারের শিশি গুলো রেখেছিস আলমারিতে? আমি আসছি উপরে।”

সর্বনাশ। এবার কি হবে?

আমি জোর গলায় ছাদ থেকে নিচে তাকিয়ে বললাম ,”রাখছি দিদুন। “

মামা এতক্ষনে আয় আয় করছে টেনিয়াকে চলে আসতে বলছে । কিন্তু টেনিয়া নিমেষে আঁচারের বয়াম উল্টে ফেলে  দিল। সব আঁচার মাটিতে পড়ে একাকার কান্ড। এবার টেনিয়া চোখে একটা সানগ্লাস পড়ে একটা আম গাছের উপর বসে বসে আম খেতে লাগল। আরে ও সানগ্লাসটা পেল কোথা থেকে? এটা তো দিদুনের। হঠাৎ মায়ের গলার স্বর শুনতে পেলাম। মা  বলল, “তোরা আর বাঁদর ? ভুদো তুই এখানে কি করছিস?”

দিদুন ইতি মধ্যে এসে পড়েছে ছাদে।এবার আমাদের সব ধরা পড়ে গেল। এবার কি হবে? কি বলব ওদের। আমি আর ছোট মামা দুজনেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।আমি তো ভীষন অবাক হয়ে গেলাম এটা ভেবে যে টেনিয়া দিদুনের সানগ্লাস পেল কোথা থেকে ? 

দিদুন ছোট মামাকে বলল, “ছোটন তুই  বাঁদর পুষেছিস? আর ওই আমার আঁচার চুরি করে? আর ভুদো তোকে যে বললাম আঁচার গুলোকে আঁচারের আলমারিতে রাখতে।নষ্ট করে দিল তো আমের আঁচারটা।এবার মনে হচ্ছে বাগানের আম গুলোও শেষ করে দেবে বাঁদরটা। “

মা বলল, “ মা দেখো বাঁদরটা তো তোমার সানগ্লাস পরেছে। “

“ ওহ তাই তো ওটা আমারই সানগ্লাস “

আমরা দু জন মুখ কাচু মাচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। 

এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।টেনিয়া আম গাছের  গোটা পাঁচেক আম খাওয়া শেষ করে এক লাফে ছাদে নেমে এল। তারপর সানগ্লাসটা খুলে দিদুনের চোখে পরিয়ে দিল। দিদুনের হাত ধরে টেনে নিয়ে আঁচারের বয়ানের কাছে নিয়ে এল। দিদুন একটু ভয় পেয়ে ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে গেল। টেনিয়া আঙুল দিয়ে আঁচারের বয়ান দেখিয়ে কি একটা দেখানোর চেষ্টা করছে । আমরাও এগিয়ে গেলাম কাছে। দিদুন চোখের সানগ্লাস খুলে বলল ,”সর্বনাশ পাখিতে বাহ্যি করে গেছে আঁচারের মধ্যে। ইস ভাগ্যিস এই বাঁদরটা ছিল।”এবার ছোট মামা বলল , “ ও বাঁদর নয়।ওর নাম টেনিয়া।”

দিদুন বলল , “ তাহলে টেনিয়া কে আমরা কাছে রাখব।ওর জন্যই আমি আমার হারানো সানগ্লাস ফেরত পেলাম। আঁচারটাও যে খাওয়ার উপযুক্ত ছিল না তা ওই আমাদের বোঝালো।”

আমার মনে পড়ল দুপুরে আঁচার খেয়ে বয়ানের ঢাকনা আটকাতে ভুলে গেছিলাম। তখনই কাক গুলো এসব করেছে।সব আমার দোষ। আমি বললাম , “দিদুন আমিই আঁচার খেয়ে ঢাকনা আটকাইনি।”

 দিদুন একটু হাসল। তারপর টেনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ।ছোট মামা বলল, “ওকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো  মা । আমিই ওকে নিয়ে এসেছিলাম।কিন্তু ও তো আর ঘরের প্রাণী নয়।”

দিদুন বলল, “  ঠিক বলেছিস।যা টেনিয়া তোর যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়া। “

টেনিয়া আমাদের সবাইকে এক বার ভালো করে দেখল তার পর এগাছে ওগাছে লাফাতে লাফাতে  বাড়ির পেছনের বাগানে মিলিয়ে গেল।আকাশ লাল হয়ে সূর্য ডুবছে দূরে। সবার খুব মন খারাপ হয়ে গেল।

        পরের দিন ছোট মামা দাঁত মাজতে মাজতে বাগানে ঘুরছিল।ছোট মামা হঠাৎ দৌড়তে দৌড়তে এসে বলল ,”টেনিয়া এসেছে। টেনিয়া এসেছে।”আমরা সবাই বাড়ির উঠোনে এসে হাজির। আমি বললাম ,”টেনিয়া? কোথায়?”

মামা তার হাতের তর্জনি নির্দেশ করে বলল, “ওই যে পাঁচিলের উপর বসে। “

টেনিয়া পাঁচিল থেকে নেমে লেজ তুলে এগিয়ে এল। দিদুন তাড়াতাড়ি এক কাঁদি কলা এনে দিল টেনিয়াকে। ও খুশি হয়ে হাপুস হুপুস খেতে লাগল। এরপর থেকে টেনিয়া মাঝে মাঝেই মামা বাড়িতে আসে খায় চলে যায়।ও কাউকে ভোলেনি।

    এক বছর হয়ে গেল । এখন টেনিয়া মনে হয় অনেক বড় হয়ে গেছে।আমি আবার গরমের ছুঁটিতে মামা বাড়িতে যাচ্ছি। ট্রেনে বসে আছি।মজা হচ্ছে খুব  এই ভেবে যে টেনিয়ার সাথে আবার দেখা হবে। 

***সমাপ্ত***