ছোটোগল্প

অর্পণের দুই বন্ধু

বিনোদ ঘোষাল

বাচ্চা ছেলেটাকে দেখতে পেল অর্পণ। ওই তো একেবারে স্পষ্ট। এক মুহূর্তে ঘেমে স্নান। নড়তে চড়তেও যেন ভুলে গেল ও, আগেরবারের মতো। খাটের ওপরে বসেছিল, দেওয়ালের কোনে সিটিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক ধক করে শব্দ হচ্ছে। উফফ অসহ্য…ঘরে কেন মা, বাবা, লক্ষ্মীদি কেউ আসছে না? কেন আসছে না। চোখ বুজে ফেলতে চাইছিল অর্পণ, কিন্তু পারছিল না। কী যেন এক অদৃশ্য শক্তি ওকে বাধ্য করছিল চোখ মেলে রাখতে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিল ও। পলকও পড়ছিল না। বাচ্চাটাও ঘরের এককোনে ঠিক একইভাবে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অর্পণের দিকে। ঠোঁটে সেই বরাবরের মতো মুচকি হাসি। ঐভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল।

ছেলেটা চলে যাওয়ার পরেও ওই দরজার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল অর্পণ। মাথা পুরো ভোঁ হয়ে গিয়েছে। ইতিহাস পড়ছিল। তখনই এমন ঘটনা।

অবশ্য এই প্রথম নয়, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হল। কেন এমন হচ্ছে অর্পণ জানে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। ঘেমে স্নান। কিন্তু বিছানা থেকে সরে যে টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়াবে সেই ক্ষমতাটুকুও যেন শুধে নিয়েছে কেউ। কেউ, মানে ওই বাচ্চা ছেলেটা।

শুধু ওই বাচ্চা ছেলেটা নয় অর্পণের কাছে আরও একজন আসে, মাঝেমাঝেই আসে। তাকে কেমন যেন কিছুটা চেনা মনে হয় অর্পণের। সেই ঘটনা বলার আগে অপর্ণ সম্পর্কে কিছুটা বলে নেওয়া যাক।

চন্দননগরের একটি নামি বনেদি স্কুলের ক্লাস সেভেনে পড়া অর্পণ বকশীর পড়াশোনার থেকে খেলাধুলোয় মন বেশি। কী খেলা সেটা নির্দিষ্ট করে বলা খুব মুশকিল। সেটা ক্রিকেট কিংবা ফুটবল অথবা ব্যাডমিন্টন তো রয়েছেই তার সঙ্গে রয়েছে বেশ কিছু স্পেশাল খেলা। আর সেই স্পেশাল খেলাগুলোর জন্যই বন্ধুমহলে অপর্ণ খুবই পপুলার। মানে বছর খানেক আগেও স্কুলে, পাড়ায় বন্ধুদের কাছে অর্পণ বলতে বন্ধুরা অজ্ঞান। তার কারণটাও ছিল বেশ মজাদার। প্রচলিত খেলাধুলোর পাশাপাশি অর্পণ নানা রকমের খেলা জানত আবার নিজেও অনেক রকমের খেলা চটপট তৈরি করে ফেলতে পারত। অর্পণের যখন খুব অল্প বয়স তখন দাদুর কাছে বসে বসে দাদুর ছোটবেলার নানা রকমের খেলার গল্প শুনত। কী মজার মজার সেইসব খেলা। মার্বেল, ডাঙ্গুলি, পিড্ডু, রুমালচোর, চু কিত কিত, কিংকং তারপর ছোঁয়াছুঁই, লুকোচুরি, কিংকং আরও অনেক রকমের খেলা। দাদু খেলাগুলোর নিয়ম আর সেইসব খেলা নিয়ে মজার মজার গল্প বলত আর অর্পণ হাঁ করে শুনত। দাদু বলত এইসব খেলার মজাই আলাদা বুঝলি। তোর ওই সাহেবি খেলায় এত মজা নেই। এ হল বাংলার খাঁটি গাওয়া ঘীয়ের মতো।

অর্পণ জিজ্ঞাসা করত, দাদু এমন সব খেলা বাবাও খেলেছে?

খেলেছে মানে! আলবাত খেলেছে। সব শিখিয়ে দিয়েছিলাম তোর বাবাকে। সে ছেলেও ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল তোর মতো না না তোর এখনের থেকেও অনেক কম বয়সে।

আমাকে ও শেখাও না দাদু। আমিও খেলব।

শিখবি আচ্ছা বেশ শেখাব তোকে।

তিয়াত্তর বছরের রমেন বকশী নতুন করে মেতেছিলেন তার নাতিকে নিয়ে। চন্দননগর স্টেশনের প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে আমতলা নামের জায়গাটায় এখনও শহরের ছোঁয়া পুরোপুরি লাগেনি। অর্পণের বাড়ির সামনে সত্যিই বিশাল বিশাল বড় আম বাগান, সারাবছরই সূর্যের আলো মাটি ছোঁয়ার সুযোগ পায় কম। শুধু আম নয়, আরও অনেক রকমের গাছ রয়েছে এই পাড়ায়। বাঁশবাগান রয়েছে, বেশ কয়েকটি ছোট-বড় পুকুর রয়েছে। মানে প্রকৃতি এখানে এখনও অকৃপণ। এই পাড়ার বেশিরভগ বাসিন্দাই বহুকালের পুরনো। এবং প্রায় কোনও পরিবারই নিজের জমি জায়গা বিক্রি করে অন্যত্র চলে যায়নি বলে ফ্ল্যাট বাড়ি কিংবা শহুরে মানুষের আগমনের সুযোগ ঘটেনি। তাই আমতলা এখনও নিজের মতো। এখানের মানুষজনও কেবল টিভি, স্মার্ট ফোন হাতে পেলেও ঠিক ততটা আধুনিক নয়। সেই আমবাগানে এখনও পাড়ার ছেলে-মেয়েরা সকাল বিকেল খেলে, পুকুরে সাঁতার কাটে। দাদু বলত, তোর বাবা এখানে খেয়ে সাঁতরে বড় হয়েছে। তুইও এমনই হবি।

দাদুর ট্রেনিং-এ তৈরি হচ্ছিল অর্পণ আর সেইসব খেলায় মেতে উঠছিল বন্ধুদের সংগে। দেদার মজা। শুধু দাদুর শেখানো খেলাই নয় নিজেও অনেক খেলা আবিস্কার করে ফেলেছিল অর্পণ। তারমধ্যে দুটো খেলা ছিল স্পেশাল। এক, গাছ থেকে খসে পড়া শুকনো সুপুরি গাছের ডাল খসে পড়লে সেই ডালের খোলার ওপর চেপে বসবে একজন আর ডালের অন্যপ্রান্ত ধরে দুই-তিনজন মিলে ছুটবে। মাটিতে ঘষটে চলবে সেই ডাল। শক্ত খোলার ওপর বসে থাকার ফলে গায়ে আঁচড়ও পড়বে না চেপে বসা যাত্রীর। আরেকটা খেলাও ছিল ওই গাছের ডাল দিয়েই। তবে সেটা সুপুরির ডাল নয়, নারকেল গাছের ডাল। গাছে থেকে শুকনো ডাল খসে পড়লে সেই ডালের গোড়ার দিক থেকে পাঁচ ছয় হাত কাটারি দিয়ে কেটে আলাদা করে নেওয়া হত। তারপর সেটা উলটো করলেই ধনুকের ছিলার মতো। ওই উলটো করে মাটিতে বসিয়ে তার ওপর ঘোড়ায় চাপার মতো করে বসে ওটাকে চেপে ধরে দুই পায়ে ভর দিয়ে লাফালে স্প্রিং এর মতো ওটাও লাফাত। যেন ঘোড়া ছুটছে। বন্ধুরা মিলে ওই ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হত। কী সব মজার সেইসব খেলা!

দিব্বি চলছিল এইভাবেই। আমবাগানে, খেলার মাঠে, রাস্তায় পুকুরে এমন খেলার জীবন। ইশকুলের পড়াশোনাও চলছিল ছন্দে। হঠাৎই বছর খানেক আগে দাদু মারা গেল। প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে অনেকদিন মনমরা হয়ে ছিল অর্পণ। তারপর বাবা-মা বন্ধুরা মিলে খুব করে বোঝাল দাদু চলে গেছে, আমরা তো রয়েছি, কিন্তু অর্পণের মন কিছুতেই ভাল হচ্ছিল না। ওর বাবা-মা ভাবল ছেলেকে যদি সারাক্কণ পড়াশোনায় এনগেজ রাখা যায় তাহলে ওর মন ঠিক হয়ে যাবে। তাই ক্লাস সেভেনে উঠতেই মা আর বাবা হঠাৎ কেমন বদলে গেল। যে মা বাবা আগে কখনই পড়াশোনা নিয়ে অপর্ণকে বিশেষ কিছু বলত না তারাই যেন ওকে দিন রাত পড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লাগল। দু-তিনজন টিউটর নিযুক্ত হলেন, তারাও সপ্তাহে দু-তিনদিন করে বাড়িতে আসতে থাকলেন। কেউ বিকেলে তো কেউ সন্ধ্যায়। বাড়ির সকলের মুখে শুধু একটাই কথা, ক্লাস সিক্স পর্যন্ত যা হয়েছে হয়েছে কিন্তু এবার ক্লাস সেভেন। এবার আরও সিরিয়াস না হলে কিন্তু মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করতে পারবে না। সুতরাং অনেক খেলাধুলো হয়েছে এবার শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা।

অর্পণ খুব অবাক হয়েছিল। পড়াশোনায় তো ও কোনওদিনই খারাপ নয়। ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড না হলেও রেজাল্টের দিক থেকে ক্লাসে বরাবর প্রথম দিকেই থাকে। এবং বাবা- মা কেউই এতদিন ওকে ওইসব হওয়ার জন্য চাপ দেয়নি। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল মা আর বাবা যেন আচমকাই ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্পণের ওপর। দিন রাত পড় আর পড়। মাঠে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধুরা কয়েকদিন বিকেলে খেলার জন্য ডাকতে এসে ফিরে গেল। মা ফেরত পাঠিয়ে দিল তাদের। স্কুল থেকে ফিরেই বই খাতা নিয়ে বসে যাওয়া-নতুন রুটিন ইয়ে দাঁড়াল। গোটা পৃথিবীর আলো রঙ কেমন যেন নিভে যেতে শুরু করল, সব আনন্দ যেন খুব দ্রুত শুষে নিতে শুরু করল কেউ। কিছুই ভাল লাগত না অর্পণের। সারাক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত। বিকেলে কান্না পেত খুব। বাবা আর মা বোঝাত আর দু’বছর পরেই মাধ্যমিক। এখন থেকে সিরিয়াস না হলে হবে না। এই তিনটে বছর জীবনের সব সুখ আহ্লাদ ছেড়ে শুধু পড়তে হবে।

কিন্তু মা জীবনের এ তিনটে বছর এমন কী দোষ করল যে এদের সব আনন্দ থেকে বাদ দিতে হবে? প্রশ্নটা অর্পণের করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রায় মাস পাঁচেক এই নতুন নিয়মে চলার পরই সেই ঘটনাটা ঘটল। সেদিন প্রাইভেট টিউটর পড়িয়ে চলে যাওয়ার পর ডিনার সেরে আবার নিজের ঘরে পড়তে বসেছিল অর্পণ। হঠাৎই ওর খেয়াল হল দরজাটা যেন খুলে কে এসে ঘরের ভেতর ঢুকে দাঁড়াল। অর্পণ প্রথমে তাকায়নি। ভেবেছিল মা এসে দাঁড়িয়েছে বুঝি। কারণ মা অথবা বাবা মাঝেমাঝেই অর্পণের ঘরে ঢুকে পড়ে ও মন দিয়ে পড়ছে কি না সেটা ওয়াচ করার জন্য।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই অর্পণ টের পেয়েছিল ঘরের ভেতর দরজার সামনে ওর মা কিংবা বাবা দাঁড়িয়ে নয়, বরং অন্য কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখ তুলে তাকাতেই খুব চমকে উঠেছিল অর্পণ। একটা বাচ্চা ছেলে এই আট-নয় বছর বয়স, হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে দাড়িয়ে অর্পণের দিকে তাকিয়ে ফিচিক ফিচিক হাসছিল। ছেলেটার হাত একটা ক্যাম্বিস বল। বলটা মাটিতে ড্রপ খাওয়াচ্ছিল। আর লুফে নিচ্ছিল।

অর্পণ বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে থাকার পরে জিজ্ঞাসা করেছিল কে তুমি?

ছেলেটা সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলেটা আবার ফিক করে হেসে বলেছিল খেলবে ক্যাচ ক্যাচ?

অর্পণও আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। শুধু পালটা হাসি হেসেছিল একবার। ব্যাস অমনই সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি খাটে উঠে অন্য প্রান্তে বাবু হয়ে বসে অর্পণের দিকে আচমকা ছুড়ে দিয়েছিল ক্যাম্বিস বলটা। অর্পণও লুফে নিয়েছিল ঝপ করে। তারপর ও আবার ছুড়ে দিয়েছিল ছেলেটির দিকে। ছেলেটাও লুফে নিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ এমন খেলা চলেছিল সেদিন। তারপর হঠাৎই অর্পণের খেয়াল হল আরে তুমিতো আমার পড়ার সময় নষ্ট করছ ওঠো ওঠো মা দেখতে পেলে খুব রাগ করবে।

মুখ ভার করে উঠে গিয়েছিল ছেলেটা। অর্পণ আবার জিজ্ঞাসা করেছিল তুমি কে? থাকো কোথায়? আমার ঘরে কী করে এলে সেটা বললে না তো?

ছেলেটা উত্তর দিয়েছিল বলব না। আর তুমি যদি কাউকে আমার কথা বলো তাহলে আর কখনই আসব না। বলে দরজা খুলে চলে গিয়েছিল ছেলেটা। সেই রাত্রে ডিনার করতে বসে অর্পণের মুখে বার বার চলে আসছিল ছেলেটি কে সেই প্রশ্ন। কিন্তু প্রাণপণে নিজেকে আটকেছিল। কেন জানা নেই ওর মনে হয়েছিল বাচ্চা ছেলেটির কথা আর কাউকে না বলাই ভাল। আর ঠিক সেদিন রাতেই বারোটা নাগাদ ও যখন পড়ার চাপে প্রায় পাগল তখন আবার ঘরের মধ্যেই দেখতে পেল আরেকজনকে। না ওই বাচ্চা ছেলেটি নয় একেবারে দাদু একজনকে। নাহ নিজের দাদুর মতো নয় আরও বুড়ো একজন। কুঁজো, হাতে লাঠি, মাথা ভর্তি সাদা চুল সাদা দাড়ি গোঁফ। আবারও খুব চমকে উঠে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল অর্পণ, কিনতু তার আগেই দাদুটা খুনখুনে গলায় বলে উঠল, উঁহু উঁহু ভয়ের কিছু নেই ভয়ের কিছু নেই, আমাকে আবার তুমি ভয় পাচ্ছ কেন হে? আমাকে চেন না নাকি?

অর্পণ অতিকষ্টে বলল, না তো।

সে কি আমাকে চেনো না তাহলে তো ভারি চিন্তার বিষয়, বলে মাথা নাড়ল বুড়োটা। মাথা নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সাদা দাড়িটাও নড়ে উঠল, হাসি পেয়ে গেল অর্পণের।

খুক খুক করে হেসে বুড়ো বলল তা বাপু অর্পণ তোমার সঙ্গে অর্পণের দেখা হয়েছে তো?

মানে?

মানে অর্পণের সঙ্গে আজ তোমার দেখা হয়েছে তো। ওই যে তোমার ঘরে বাচ্চা ছেলেটি এসে হাতে বল ছুড়ে দিল।

তাই শুনে খুব ঘাবড়ে গেল অর্পণ। বলল ওর নাম মোটেও অর্পণ না, ওটা আমার নাম। আর ছেলেটাকে আমি চিনিই না, কোথা থেকে এসেছিল তাও জানি না।

শুনে খুক খুক করে হাসল বুড়োটা। তারপর দাড়ি নেড়ে বলল, হুঁ হুঁ অর্পণবাবু তোমরা নাম যেমন অর্পণ, ওর নামও অর্পণ। হ্যাঁ শুধু বয়সে ছোট।

আর তুমি কে?

আমি, আমিও অর্পণ, বলে দাদুটা হো হো করে হেসে উঠল।

ধেত তাই আবার হয় নাকি! বলে উঠল অর্পণ।

কেন হবে না? নিশ্চয়ই হয়।

আচ্ছা একটা কথা বলবে?

কী কথা বলো?

তোমরা দু’জনে কি ভূত?

অর্পণের কথা শুনে আবার হো হো করে হেসে উঠল দাদুটা। তারপর বলল হুঁ তা বলব না, তবে ভূত বলতে তুমি কি বোঝো তা তো আমি জানি না।

ভূত মানেও জানো না। মানুষ মরে গেলে ভূত হয়।

না গো অর্পণবাবু ভূত হওয়ার জন্য মরার দরকার নেই। এই যেমন আমি তো ভূত নয়ই।

তাহলে তুমি কি?

অর্পণের প্রশ্ন শুনে আবার খুক খুক করে হাসল বুড়োটা। রহস্য করে বলল, হবো একটা কিছু। যাই হোক শোনো তোমার কাছে যে কারণে আসা, তুমি শুধু পড়াশোনাই কোরো না, তাহলে তোমার দাদুর কাছ থেকে যেসব খেলাগুলো শিখেছিলে সেগুলো সব ভুলে যাবে।

কিন্তু খেলব কার সঙ্গে? আমার বাবা-মা তো কারও সঙ্গে খেলতে দেয় না খালি বলে পড় আর পড়। আচ্ছা বলো আমি কি আগে পড়তাম না, নাকি ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করতাম না? তবু আমার সঙ্গে এমন কেন করে…বলতে বলতে অভিমানে ফুঁপিয়ে উঠল অর্পণ।

বুড়োটা বলল আরে রে অর্পণবাবু কাঁদে না কাঁদে না। এই তো তুমি দু’জন বন্ধু পেয়ে গিয়েছ আর চিন্তা কীসের?

দু’জন বন্ধু! কোথায়?

কেন একজন হলাম আমি মানে এই দাদু অর্পণ আর অন্যজন্য হল ওই ছোট অর্পণ। আমরা তিনজনে এবার থেকে বন্ধু হয়ে গেলাম। তুমি তোমার সবথেকে প্রিয় খেলাগুলো ওর সঙ্গে খেলো।

কিন্তু বাবা-মা দেখতে পেলে যে খুব বকবে।

না না ওকে আর আমাকে তুমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পাবে না।

বেশ খেলা না হয় ওর সঙ্গে খেললাম আর তোমার সঙ্গে কী করব?

আমার সঙ্গে করবে গল্প। তোমার দাদুর সংগে যেমন গল্প করতে। কেমন?

অর্পণ মনে মনে খুশি হয়। এই দু’জন ভুত হোক বা যাই হোক, বন্ধু তো হল…কারও সঙ্গে খেলা করার আর গল্প করার সুযোগ তো পাওয়া গেল।

# # #

কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল অর্পণ বেশ বদলে গিয়েছে। প্রথমদিকটায় ওর মা বাবা বিশেষ খেয়াল করেনি। কিন্তু প্রায় দিন পনেরো –কুড়ি পর ওদের দু’জনেরও নজরে এল তাদের ছেলে কেমন যেন অন্যরকম। দিনের বেশিরভাগ সময়েই কাটায় নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে। দরজা কেন বন্ধ তা জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেয় পরাশোনায় মন বসে বেশি। শুধু তাই নয় আগে ও যেমন মন মরা হয়ে থাকত সেই মনমরা ভাবটা অনেকটাই কেটে গিয়েছে ওর। দিব্বি চনমনে হয়ে উঠেছে। সেটা ওর বাবা-মাকে নিশ্চিন্ত করলেও মনের ভেতরে একটা সন্দেহের বীজ দানা বাঁধতে শুরু করল। ওর বাবা-মা  খেয়াল করলেন অর্পণ বেখেয়ালে একা একাই কথা বলছে, হাসছে আর বাবা-মাকে এড়িয়ে চলছে। বিষয়টা বেশ চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল তাদের কাছে।

আর এদিকে অর্পণ তার দুই বন্ধুকে পেয়ে খুব খুশি।

# # #

মাস খানেক পরে এক দুপুর বেলার ঘটনা। বিখ্যাত শিশুমনোবিশষজ্ঞ ডক্টর সুব্রত সেন এর চেম্বারে বসে রয়েছে অর্পণ। সামনে ডাক্তারবাবু। অর্পণ অবশ্য প্রথমদিকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে শুনে বেশ ভয়ই পেয়েছিল, ওর কোনও শরীরখারাপ হয়নি কিন্তু তবু ওকে কেন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে সেটা নিয়ে যথেষ্টই আপত্তি জানিয়েছিল ও। কিন্তু বাবা-মা দুজনেই বলেছে এই ডাক্তার গল্প-মজা করার ডক্তার। ছোটদের নাকি কখনও এমন ডাক্তার দেখাতে হয়। ইত্যাদি। রাজি হয়েছিল অর্পণ। চেম্বারে ডক্টরের ঘরে একা ঢোকার পর বেশ কিছুক্ষণ আরষ্ট হয়ে বসেছিল। কোনও কথাই বলতে চাইছিল না, কিন্তু ডক্টর আঙ্কল বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর ওর খুব ভাল লেগে গেল। অনেক রকম গল্প করছেন তিনি। দারুন মজার মজার গল্প। ওই গল্প করতে করতেই ডক্টর সেন জেনে নিচ্ছিলেন অর্পণের নিজের কথা, ওর ভাবনা, ওর ইচ্ছে, ওর অভিমান সবকিছু। কথার মাঝেই জিজ্ঞাসা করলেন আচ্ছা অর্পণ বাড়িতে তুমি বাবা, মা আর লক্ষ্মীদি ছাড়া আর যাদের সঙ্গে কথা বলো, খেলা করো তাদের নাম কী বলো তো?

শুনে চমকে গেল অর্পণ। জিজ্ঞাসা করে ফেলল তুমি জানো!

সুব্রত হেসে বললেন, হুঁ আমি জানি তো। কিন্তু ওদের নাম জানি না। কী নাম ওদের?

অর্পণ গলা নিচু করে বলল, আর কাউকে বলবে না তো?

না না আম কাউকে বলব না। তুমি বলো।

ওই দাদুটার নামও অর্পণ, আর ছোটুটার নামও অর্পণ। বলে হি হি করে হেসে উঠল।

তাই বুঝি! এ তো দারুণ মজা। তা ওদের সঙ্গে তুমি কি খেলো আর গল্প করো?

না না আমি শুধু ছোট অর্পণের সঙ্গে খেলি আর দাদু অর্পণের সঙ্গে গল্প করি।

বাহ খুব ভাল তো। ছোট অর্পণের সঙ্গে কী খেলো?

আমার দাদু যে খেলাগুলো আমাকে শিখিয়েছিল যেগুলো আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে অনেক আগে খেলতাম সেগুলোই ওর সঙ্গে খেলি। জানো আঙ্কল ছটু অর্পণ আমি যে খেলাগুলো জান সেগুলো ও ও জানে।

বাহ এ তো খুব ভাল। আর দাদু অর্পণ?

ওর সঙ্গে আমি অনেক গল্প করি।

কী গল্প করো?

আমার দাদুর সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে যেসব গল্প করতাম সেইগুলো।

বাহ খুব ভাল। তা ওরা কখন আসে তোমার কাছে?

আমি ডাকলেই চলে আসে।

খুব মজার ব্যাপার তো। বলেই অর্পণ বলে, আঙ্কল তুমি আমার মা বাবাকে ওদের কথা বলবে না তো? তাহলে বাবা-মা ওদেরও আসতে বারণ করে দেবে।

ডক্টর সেন অর্পণের গাল টিপে আদর করে বললেন না আমি কিচ্ছু বলব না। প্রমিস। আচ্ছা তুমি এখন একটু বন্ধুদের সঙ্গে খেলো। আমি তোমার বাবা মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই কেমন। বলে উনি বেল বাজালেন। ঘরে ঢুকলেণ ডক্টর সেনের মহিলা সহকারী। ডক্টর বললেন আমাদের অর্পণকে একটু গ্রাউন্ডে নিয়ে যাও। ওখানে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলুক।

কাম ডিয়ার। হাত বাড়িয়ে খুব মিষ্টি করে ডাকলেন সেই আন্টি। তার সঙ্গে অর্পণ অন্য একটা ফ্লোরে গিয়ে দেখল সেখানে অনেক খেলার আইটেম। বেশ কিছু ছেলে মেয়ে যে যার নিজের ইচ্ছেমতো খেলছে। অর্পণও কিছুক্ষণের মধ্যে মিশে গেল ওদের সঙ্গে খেলায় আর তখন ডক্টর সেন অর্পণের বাবা মাকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বোঝাতে শুরু করলেন, দেখুন আপনার আপনাদের ছেলের ঘরে সিসিটিভি লাগিয়ে দেখেছেন আপনার ছেলে একা একা কথা বলছে, একা একা খেলছে হাসছে, এমন কি ঝগড়াও করছে, আর এমনভাবে সে এইধরনের এ্যাক্টিভিটিজ করে যেন তার সামনে সত্যিই কেউ একজন রয়েছে। অথচ ক্যামেরা স্পষ্ট বলছে তার সামনে কেউ নেই, শুধু তাই না ক্যামেরা না থাকলেও খুব সহজেই অনুমেয় ওই ফ্ল্যাটের মধ্যে আপনাদের তিনজনের উপস্থিতিতে ওর ঘরে কেউ আসবে আর সেটা আপনারা জানবেন না সেটা অবিশ্বাস্য। তাহলে প্রশ্ন হল অর্পণ কার সঙ্গে খেলে? কার সঙ্গে গল্প করে? বলে একটু থামলেন ডক্টর সেন।

অর্পণের বাবা এবং মা দুইজনেই কৌতুহলী মুখ নিয়ে তাকিয়ে ডক্টরের দিকে।

অর্পণ আসলে ওর নিজের শৈশব আর ওর বার্ধক্যের সঙ্গে কথা বলছে। বলে একটু থামলেন সুব্রত। তারপর বললেন, দেখুন অর্পণের খুব প্রিয় বন্ধু ছিল ওর দাদু যার কাছে ও অনেক নতুন নতুন খেলা শিখেছে এবং সেই দাদু ওকে অনেক বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন, তিনি চলে যাওয়ার পর অর্পণের জীবনে একটা শূন্যতা আসে আর ঠিক ওই সময়েই আপনারা দুইজনে মিলে একটা চুড়ান্ত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, অর্পণ যাতে ওর দাদুর স্মৃতি নিয়ে বেশিক্ষণ না থাকে তার জন্য ওকে জোর করে পড়াশোনায় মন দেওয়ানোর, বেশিক্ষণ লেখাপড়াতেই সময় কাটানোর চেষ্টা করলেন, এতেই বিপদ ঘটল। অর্পণ এই চাপিয়ে দেওয়া জীবন থেকে পালাতে চাইল, ওকে আপনারা বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন, ও বন্ধুহীনতায় একাকীত্বে ভুগতে ভুগতে নিজেকে বঁচানোর জন্য তৈরি করে ফেলল ওরই জীবনের দুটি সময় একটি ওর ভূত বা পুরনো জীবন মানে অতীতকে আর ওর দাদুর আদলে ওর ভবিষ্যতকে। ওদের সঙ্গেই ও দিব্বি নিজের একটা জগত বানিয়ে নিয়েছে। সেখানে দাদুর ছদ্মবেশে ওরই ভবিষ্যত ওকে এসে নতুন নতুন খেলা শেখায়, গল্প করে আর ওর অতীত ওর সঙ্গে খেলে।

তাহলে উপায়? প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে অর্পণের মা।

উপায় একটাই। যে বয়েসের যেটা স্বাভাবিক সেটাই করতে দিন ছেলেকে। পড়ার সময়ে পড়া, খেলার সময় খেলা। বন্ধুবান্ধব ছেড়ে জন্তু জানোয়াররাই বাঁচতে পারে না, আর মানুষ তো আরও অনেক বেশি সেন্সেটিভ এ্যানিমাল। আর অর্পণের মতো ছেলেরা যাদের মধ্যে বন্ধুদের শেখানোর মতো অনেক কিছু রয়েছে, অনেক বেশি ইনোভেটিভ, তাদের যদি অল্পবয়েসে এইভাবে বাধা আসে তাহলে অনেকসময়েই পারসোনালিটির নানারকম ডিসওর্ডার তৈরি হয়। সো…আই হোপ আপনারা আপনাদের ভুলটা বুঝেছেন। বলে মৃদু হাসেন ডক্টর সেন।

# #

এর প্রায় মাস চারেক পরের ঘটনা। আজ অর্পণের জন্মদিন। সন্ধেবেলায় অনেক বন্ধু আসবে। কেক কাটা, ডিনার ইত্যাদি হবে। কিছুদিন আগেই অর্পণের হাফইয়ার্লির রেজাল্ট বেরিয়েছে খুব ভাল রেজাল্ট হয়েছে ওর। বাবা- মা দু’জনেই খুশি। ডক্টর সেনের কথা শুনে ওরা দুজনেই অর্পণের ওপর চাপানো সব চাপ ওরা সরিয়ে নিয়েছিলেন। আবার বিকেল হলেই খেলার মাঠে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব ওর সেই স্পেশাল খেলাগুলো ছুটির দিনে বাড়তে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা। এমন চলতে চলতে মাস দেড়েকের মধ্যেই সেই ছোট অর্পণ আর দাদু অর্পণ এই অর্পণের সঙ্গে দেখা করা, খেলা প্রায় বন্ধ করে দিল। একদিন তারা আর এলই না। নাহ তাদের জন্য খুব দুঃখ পায়নি অর্পণ। তবে অনেকদিন আগে ওদের দুজনকে অর্পণ বলেছিল আমার জন্মদিনে তো মনে হয় মা আর বাবা কোনও বন্ধুকে ইনভাইট করবে না। তোমরা দু’জনে এসো কিন্তু। আজ জন্মদিনের সকালে অর্পণ একটা ছবি এঁকেছে প্যাস্টেলে। ছবিতে তিনজন মানুষ পাশাপাশি। দুইজন হাফপ্যাট শার্ট আর একজন ধুতি পাঞ্জাবি।  মাঝের জন বাকি দুজনের হাত ধরে। বাঁ দিকের ছেলেটি ছোট, মাঝের জনের হাইট মাঝারি, বয়েসে আরেকটু বড় আর তার ডানদিকের জন একজন সাদা চুল দাড়িওলা লোক। তিনজনেরই মাথায় বার্থডের স্পেশাল টুপি পরা আর ওই তিনজনের প্রত্যেকের পায়ের নিচে অয়েল প্যাস্টেল কালারে তাদের নাম লেখা  অর্পণ, অর্পণ, অর্পণ।  

***সমাপ্ত***